Saturday, 4 July 2026

সুরেশ্বরাচার্য


সুরেশ্বরাচার্য ছিলেন ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্যের শিষ্য। তিনি নর্মদা নদীর তীরবর্তী মহিষ্মতীর অধিবাসী ছিলেন। সুরেশ্বরাচার্যের গৃহস্থাশ্রমের নাম ছিল মণ্ডন মিশ্র। তাঁর পিতা হিম মিত্র কাশ্মীরের রাজদরবারে একজন সম্মানিত পণ্ডিত ছিলেন। তিনি কান্যকুব্জ গৌড় ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বিদ্যারণ্যকৃত শঙ্কর দিগ্বিজয়ে দেখা যায় যে, মণ্ডনমিশ্র উম্বেক এবং বিশ্বরূপ নামেও পরিচিত ছিলেন। শঙ্কর দিগ্বিজয় অনুসারে, পূর্বাশ্রমে তিনি একজন কট্টর মীমাংসক আচার্য ছিলেন। মণ্ডনমিশ্র মীমাংসক শিরোমণি কুমারিল ভট্টের নিকট মীমাংসা শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। কুমারিল ভট্টপাদ্ মণ্ডনমিশ্রের প্রতিভায় এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, ভগবান্ শঙ্করাচার্য যখন কর্মমীমাংসার বিরুদ্ধে তর্কযুদ্ধ ঘোষণা করে কুমারিল ভট্টের নিকট বিচারার্থ গমন করেন, তখন কুমারিল ভট্ট তাঁকে মণ্ডনমিশ্রের সাথে বিচার করতে অনুরোধ করেন। এটা হতে মণ্ডনমিশ্র যে অসাধারণ পণ্ডিত ছিলেন, তা বেশ বোঝা যায়।

সাধারণত শিষ্যই গুরুর কৃপা লাভের আশায় ভক্তি, নিষ্ঠা সেবার মাধ্যমে গুরুর সান্নিধ্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করে থাকেন; কিন্তু এক্ষেত্রে শ্রীশঙ্কর ভগবৎপাদ্ নিজেই শিষ্যের সন্ধানে মহিষ্মতীপুরে গমন করেছিলেন। সেই যুগে পাটলিপুত্রকে রাজধানী করে মগধ সাম্রাজ্য সুদূর বিস্তৃত ছিল। বিশাল মগধ সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি নগরী ছিল মহিষ্মতীপুর। তিনি মহিষ্মতীপুরে একজন বৈদিক কর্মকাণ্ডী গৃহস্থাশ্রমী হিসেবে তাঁর স্ত্রী উভয় ভারতীর সাথে বসবাস করতেন। উভয় ভারতী ছিলেন শোণভদ্র নদের তীরে বসবাসকারী বিদ্বান ধার্মিক ব্যক্তি বিষ্ণু মিত্রের কন্যা।

মণ্ডন মিশ্র উভয় ভারতী ছিলেন এক আদর্শ দম্পতি; বিদ্যাচর্চা, নৈতিক চরিত্র এবং বৈদিক অনুশাসন পালনের কঠোর নিষ্ঠায় তাঁরা একে অপরের সমকক্ষ ছিলেন। মণ্ডন মিশ্রকে যেমন ব্রহ্মার অবতার বলে মনে করা হতো, তেমনই উভয় ভারতীকে জ্ঞান বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীর অবতার বলে গণ্য করা হতো। তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য সর্বজনীন শ্রদ্ধার কারণে তিনিমণ্ডন মিশ্রউপাধিতে ভূষিত হন; তাঁর প্রকৃত নাম ছিল বিশ্বরূপ।

শ্রীভগবৎপাদ্ তাঁর শিষ্যবর্গ অনুগামীদের নিয়ে মহিষ্মতীপুর নগরে পৌঁছলেন। শঙ্করাচার্য স্পষ্ট বাক্যে মণ্ডনকে বললেনতিনি এখানে ভিক্ষা গ্রহণের জন্য আসেননি, বরং এসেছেন শাস্ত্রীয় তর্কে অবতীর্ণ হতে। পাণ্ডিত্যের ক্ষেত্রে এর আগে কখনও সমকক্ষ কাউকে না পাওয়া মণ্ডন মিশ্র তর্কমূলক এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রস্তুত ছিলেন এবং তিনি সানন্দে তা গ্রহণ করলেন। তর্কের জন্য পরদিন সময় নির্ধারিত হলো।

পরদিন নিজ নিজ আশ্রমের প্রাত্যহিক ক্রিয়াকর্ম স্নান-আহ্নিক সেরে তাঁরা বিচারার্থে মিলিত হলেন। মণ্ডন মিশ্রের স্ত্রী উভয় ভারতী বিচারকের ভূমিকা পালনে সম্মত হলেন; কারণ তাঁরা উভয়েই তাঁর নিরপেক্ষতার ওপর আস্থা রেখে এবং তাঁর প্রজ্ঞা পাণ্ডিত্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর সহায়তা চেয়েছিলেন। তিনিই ছিলেন একমাত্র বিদুষী নারী যিনি তর্কের খাতিরে তাঁদের চিন্তাধারাকে সেই উচ্চমার্গীয় স্তরে অনুসরণ করতে সক্ষম ছিলেন।

গৃহবধূ হিসেবে উভয় ভারতীকে দৈনন্দিন গৃহস্থালির কাজও করতে হয়, যার মধ্যে ছিল তর্কে লিপ্ত ব্যক্তিদের জন্য প্রতিদিনের আহার প্রস্তুত করা, অতিথিদের সেবা শুশ্রূষা করা ইত্যাদি; তাই তিনি তাঁদের দুইজনকে একটি করে ফুলের মালা দিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন যে, যার গলার মালাটি সবার আগে শুকিয়ে বা ম্লান হয়ে যাবে, তিনিই পরাজিত বলে গণ্য হবেন। তর্কযুদ্ধকে আরও অর্থবহ করে তুলতে তাঁরা একটি পণ বা শর্তও স্থির করলেন। ঠিক হলো, বিতর্কে যিনি পরাজিত হবেন, তিনি বিজয়ীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করবেন এবং বিজয়ীর আশ্রম বা জীবনধারাকেই আপন করে নেবেন। তাঁরা উভয়েই ছিলেন অসামান্য পাণ্ডিত্যের অধিকারী এবং বেদজ্ঞানে শ্রেষ্ঠ। তাঁদের প্রাত্যহিক আচার-অনুষ্ঠান, বিশ্রাম অন্যান্য আবশ্যিক কাজকর্মে কোনো ব্যাঘাত না ঘটিয়েই এই আলোচনা প্রতিদিন চলতে লাগল।

দিন যতই গড়াতে লাগল, শ্রীভগবৎপাদের যুক্তির মাঝে মণ্ডন মিশ্র এক নতুন আলোর সন্ধান পেলেন। নিজের পূর্ববর্তী মতবাদের ওপর তাঁর আস্থা ক্রমশ টলমল হয়ে পড়ছিল, আর অন্যদিকে শ্রীভগবৎপাদের প্রতি তাঁর বিশ্বাস এক গভীর উদ্দীপক উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছিল। তর্কের অষ্টম শেষ দিনে মণ্ডন মিশ্র শ্রীভগবৎপাদের মতবাদের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হলেন। শ্রীভগবৎপাদ্ যেমন বলেছিলেন, ‘একবার সেই আবরণ শক্তি বা অবিদ্যা দূর হয়ে গেলেই সেই অদ্বৈত ব্রহ্মাত্ম জ্ঞানের উদয় হয়।নিজের মতবাদের সীমাবদ্ধতা এবং শ্রীভগবৎপাদের মতের সত্যতা উপলব্ধি করার মুহূর্তে তিনি দেখলেন যে, তাঁর গলার ফুলের মালাটি ম্লান হয়ে গেছে। তিনি শ্রীভগবৎপাদের সামনে সাষ্টাঙ্গে প্রণত হলেন, তাঁর চরণ স্পর্শ করলেন এবং কম্পিত কণ্ঠে বললেন, ‘হে জগদ্গুরু শঙ্কর, আমাকে আমার ধৃষ্টতাকে ক্ষমা করুন। এই আট দিন ধরে আমি আপনার প্রতি অপরাধ করেছি। আপনার ক্রোধ সংবরণ করুন এবং এই দীন দাসের ওপর কৃপা বর্ষণ করুন আমাকে শিষ্য পদে বরণ করুন।তারপর শ্রীভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য তাঁকে শিষ্যপদে বরণ করে সন্ন্যাস প্রদানপূর্বকশ্রীসুরেশ্বরাচার্যনাম প্রদান করলেন এবং দক্ষিণাম্নায় শৃঙ্গেরি শারদাপীঠের প্রথম পীঠাধীশপদে অভিষিক্ত করলেন।

মণ্ডনমিশ্র সন্ন্যাস গ্রহণের পূর্বে মীমাংসা দর্শনে মীমাংসানুক্রমণিকা, ভাবনাবিবেক বিধিবিবেক, এই তিনখানা গ্রন্থ রচনা করেন। তন্মধ্যে বিধিবিবেক আয়তনে বৃহৎ বিচারবহুল। এই গ্রন্থে বৈদিক বিধির স্বরূপ আলোচনা করা হয়েছে। এটা গদ্যে পদ্যে লিখিত। এটার উপর বাচস্পতি মিশ্রের ন্যায়কণিকা নামে টীকা আছে। তাছাড়া তিনি ভর্তৃহরির অপরাপর বৈয়াকরণ আচার্যগণের অঙ্গীকৃত স্ফোটবাদের সমর্থনে স্ফোটসিদ্ধি গ্রন্থ, ভ্রমজ্ঞানের স্বরূপ আলোচনায় বিভ্রমবিবেক অদ্বৈতবেদান্তের ব্যাখ্যায় ব্রহ্মসিদ্ধি নৈষ্কর্মসিদ্ধি নামক প্রসিদ্ধ গ্রন্থদ্বয় রচনা করেন। তবে ব্রহ্মসিদ্ধির দার্শনিক মত শঙ্করবেদান্ত সিদ্ধান্তের অনুরূপ নয়। তাই এটি তাঁর পূর্বাশ্রমের রচনা হিসেবে গণ্য করা হয়। অর্থাৎ এটি শঙ্কর পূর্ববর্তী বেদান্তের গ্রন্থ। মণ্ডনমিশ্রের ব্রহ্মসিদ্ধি () ব্রহ্ম কাণ্ড, () তর্ক কাণ্ড, () নিয়োগ কাণ্ড এবং () সিদ্ধি কাণ্ডএই চার কাণ্ড বা পরিচ্ছেদে বিভক্ত। প্রত্যেক কাণ্ডই পদ্যে গদ্যে লিখিত। ব্রহ্মসিদ্ধির উপর বাচস্পতি মিশ্রের তত্ত্বসমীক্ষা টীকা রয়েছে। তত্ত্বসমীক্ষা ব্রহ্মসিদ্ধির প্রাচীন প্রামাণিক টীকা। তত্ত্বসমীক্ষা ব্যতীত ব্রহ্মসিদ্ধির উপর নিত্যবোধঘনাচার্যের টীকা, আনন্দপূর্ণের ভাবশুদ্ধি টীকা, চিৎসুখাচার্যের অভিপ্রায়প্রকাশিকা টীকা আচার্য শঙ্খপাণির টীকার পরিচয় পাওয়া যায়।

সুরেশ্বরাচার্যের নৈষ্কর্মসিদ্ধি শঙ্করবেদান্তের অতি উপাদেয় প্রামানিক গ্রন্থ। এটিও গদ্যে পদ্যে লিখিত। এটিও চার অধ্যায়ে সমাপ্ত। নৈষ্কর্মসিদ্ধির উপর আচার্য জ্ঞানোত্তম মিশ্রের চন্দ্রিকা টীকা চিৎসুখাচার্যের ভাবতত্ত্বপ্রকাশিকা নামে টীকা আছে। তবে চন্দ্রিকা টীকায় প্রাচীন প্রসিদ্ধ টীকা। এই টীকাদ্বয় ব্যতীত নৈষ্কর্মসিদ্ধির উপর জ্ঞানামৃতের বিদ্যাসুরভি, অখিলাত্মনের নৈষ্কর্মসিদ্ধি-বিবরণ রামদত্তের সারার্থ নামক টীকাও রচিত হয়েছিল বলে জানা যায়।

তাছাড়া তিনি অদ্বৈতবেদান্তের বার্তিককার নামেও প্রসিদ্ধ। ভগবান্ ভাষ্যকার শঙ্করাচার্যের ভাষ্যের উপর বৃহদারণ্যক ভাষ্য বার্তিক, তৈত্তিরীয় ভাষ্য বার্তিক, পঞ্চীকরণ বার্তিক, কাশীমোক্ষনির্ণয়, দক্ষিণামূর্তি স্তোত্রের উপর মানসোল্লাস বার্তিক যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতির উপর বালক্রীড়া নামক টীকা রচনা করেছেন।

তিনি শৃঙ্গেরির পাশাপাশি মূলাম্নায় কাঞ্চী কামকোটি পীঠের রক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। জ্যৈষ্ঠ শুক্ল দ্বাদশী তিথিতে (৮৩৪ খৃষ্টাব্দ মতান্তরে ৪০৭ খৃষ্টপূর্বাব্দ) রাত্রিকালে তিনি সিদ্ধি লাভ করেন। কথিত আছে যে, কাঞ্চীপুরমেরপুণ্যরসনামক এক অত্যন্ত পবিত্র স্থানে তিনি লয়যোগের এক উচ্চস্তরে প্রবেশ করেন এবং নিজের শরীরকে শিবলিঙ্গে রূপান্তরিত করে ইহলীলা সংবরণ করেছিলেন। সেই সিদ্ধিস্থানটি পরবর্তীকালে তাঁর পূর্বাশ্রমের নামানুসারেমণ্ডনমিশ্র অগ্রহারনামে পরিচিত হয়।

তিনি ছিলেন এক মহান যোগীশ্বর। ভগবৎপাদ্ শ্রীশঙ্করের পরম্পরাভুক্ত পরবর্তী অনেক আচার্যের গুরু ছিলেন তিনি। সংক্ষেপ শারীরককার আচার্য সর্বজ্ঞাত্ম মুনি তাঁরই শিষ্য ছিলেন। তাঁর অসাধারণ প্রশাসনিক দক্ষতা জ্ঞানের কারণে শ্রীশঙ্কর তাঁকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমস্ত পীঠের কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বভারও অর্পণ করেছিলেন।

তথ্যসূত্রঃ-

. বেদান্তদর্শনঅদ্বৈতবাদ, প্রথম খণ্ড, আশুতোষ ভট্টাচার্য শাস্ত্রী।

.https://www.srisharadapeetham.com/.../sri-sureshwaracharya

শ্রীশুভ চৌধুরী

জানুয়ারি ২৯, ২০২৬ খৃষ্টাব্দ।

Photo editing credit Thākur Vishāl See less

Sunday, 14 June 2026

অদ্বৈতবেদান্তোক্ত 'অখণ্ডার্থবোধ' কাকে বলে?

 


বেদ, উপনিষৎ প্রভৃতি অধ্যাত্ম শাস্ত্রমূলে যে তুরীয় ভূমা ব্রহ্মের সাক্ষাৎ অপরোক্ষ পরিচয় পাওয়া যায়, তাকে অদ্বৈতবেদান্তের ভাষায় বলা হয়েছে 'অখণ্ডার্থবোধ' 'তত্ত্বমসি', 'অহং ব্রহ্মাস্মি', 'অয়মাত্মা ব্রহ্ম' প্রভৃতি বেদান্ত মহাবাক্যের শ্রবণ, মনন নিদিধ্যাসনের ফলে সকল বাক্যমূলে যে শুদ্ধব্রহ্ম সাক্ষাৎকার উদিত হয়, তাকেই বলে অখণ্ডার্থবোধ বা অখণ্ডব্রহ্মবোধ। এই অখণ্ডার্থতা-বোধের পরিচয় দিতে গিয়ে অদ্বৈতবেদান্তী বলেছেনবাক্যের সংগঠক পদগুলোর মধ্যে পরস্পর সম্বন্ধ জ্ঞানোদয় না হয়ে, বাক্য হতে সমষ্টিগতভাবে বাক্যের রহস্য হিসেবে যে যথার্থ জ্ঞান উৎপন্ন হয়, তাই 'অখণ্ডার্থবোধ' বলে জানবে। চিৎসুখাচার্য বলেছেন

"সংসর্গাসঙ্গি সম্যক্ ধীহেতুতা যাগিরামিয়ম্।

উক্তাঽখণ্ডার্থতা যদ্বা তৎপ্রাতিপদিকার্থতা।।"

-(চিৎসুখী, ১ম পরিঃ, ১০৯ পৃঃ, নির্ণয় সাগর সং)

প্রত্যয়ার্থপ্রভৃতির সাথে সম্বন্ধরহিত শব্দার্থের সুনির্দিষ্ট জ্ঞানই এই অখণ্ডার্থতাবোধ। অপর কথায়, যে সকল শব্দ পর্যায়শব্দ নয়, এরূপ শব্দসমষ্টি হতে প্রতিটি শব্দের, শব্দার্থের এবং ওদের অন্তরালবর্তী পরস্পর সম্বন্ধের জ্ঞানোদয় না হয়ে, অর্থাৎ খণ্ডবাক্যার্থের বোধ না হয়ে, সামগ্রিকভাবে বাক্য হতে যে নির্বিকল্প জ্ঞানোদয় হয়, তাকেই বলে অখণ্ডার্থতাবোধ বা অখণ্ডবোধ। আচার্য মধুসূদন সরস্বতী অদ্বৈতসিদ্ধিতে বলেছেন

"অপর্যায়শব্দানাং সংসর্গাগোচরপ্রমিতিজনকত্বং বা তেষামেকপ্রাতিপাদিকার্থমাত্রপর্যবসায়িত্বং বা অখণ্ডার্থত্বম্।"-(অদ্বৈতসিদ্ধি ৬৬৩ পৃষ্ঠা, নির্ণয় সাগর সং).....

তথ্যসূত্রঃ- বেদান্তদর্শনঅদ্বৈতবাদ, তৃতীয় খণ্ড, কাব্য-ব্যাকরণ-সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ, বিদ্যাবাচস্পতি শ্রীআশুতোষ ভট্টাচার্য শাস্ত্রী।

শ্রীশুভ চৌধুরী

মে ১৫, ২০২৬ খৃষ্টাব্দ। See less

জীবন্মুক্তির শাস্ত্রপ্রমাণ—

 


জীবন্মুক্তি অবস্থা আছে কিনা অথবা জীবন্মুক্তি সিদ্ধি সম্ভব কিনা এরূপ সংশয় নিরসনের জন্য শ্রুতি স্মৃতি-বাক্য প্রমাণরূপে গৃহীত হয়। সেই বাক্যসকলের মধ্যে কঠবল্লীতে রয়েছে"বিমুক্তশ্চ বিমুচ্যতে", অর্থাৎ বিমুক্ত (—জীবন্মুক্ত) ব্যক্তি দেহান্তে বিদেহমুক্তি লাভ করেন। জীবৎকালেই প্রত্যক্ষবন্ধন বাসনা থেকে বিশেষরূপে মুক্ত হয়ে মৃত্যুর পর ভবিষ্যৎ জন্মরূপ বন্ধন থেকে বিশেষরূপে মুক্ত হয়ে যায়। সম্পূর্ণ শ্রুতিটি হল

পুরমেকাদশদ্বারমজস্যাবক্রচেতসঃ

অনুষ্ঠায় শোচতি বিমুক্তশ্চ বিমুচ্যতে এতদ্বৈ তৎ -(কঠ উপনিষৎ-২।২।১)

ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য এই শ্রুতির ভাষ্যে বলছেনশরীর নামক এই নগরটি একাদশদ্বারবিশিষ্ট অর্থাৎ এর এগারটি দরজা, যথামস্তকস্থিত সাতটি (চক্ষুদ্বয়, কর্ণদ্বয়, নাসারন্ধ্রদ্বয় মুখ), নাভিসহ অধঃস্থিত তিনটি (নাভি, পায়ু উপস্থ) এবং মস্তকে একটি (ব্রহ্মরন্ধ্র) আচ্ছা এই নগরটি কার? উত্তরঅজের অর্থাৎ দেহ নগরের ধর্ম হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন জন্মদিবিকাররহিত রাজার সাথে তুলনীয় আত্মার, যিনি অবক্রচেতা অর্থাৎ যার চৈতন্য (—জ্ঞান) বক্র অর্থাৎ কুটিল নয়, যা সূর্যালোকের মতো নিত্য প্রকাশমান একরূপবিশিষ্ট, সেই রাজস্থানীয় আত্মরূপ ব্রহ্মের এই শরীররূপ নগর।

সেই শরীররূপ নগরস্বামী পরমেশ্বরের অনুষ্ঠান অর্থাৎ অনুধ্যান করেকারণ শ্রবণমননসহায়ে আত্মাকে সম্যগ্ রূপে জেনে নিয়ে যে অনুধ্যান-করণ, তাই তাঁর অনুষ্ঠান। অতএব মুমুক্ষু ব্যক্তি সকল এষণা হতে মুক্ত হয়ে সর্বভূতস্থ সেই আত্মাকে নিদিধ্যাসনপূর্বক অভয়প্রাপ্তিহেতু শোকাতীত হয়ে যান এবং এই দেহেই (জীবিত অবস্থাতেই) অবিদ্যাকৃত কাম কর্মরূপ বন্ধন হতে বিমুক্ত হয়ে দেহান্তে বিদেহ মুক্তি লাভ করেন অর্থাৎ তিনি আর শরীর ধারণ করেন না।

জীবন্মুক্ত বিষয়ে বরাহ শ্রুতিতে একটি সুন্দর সংজ্ঞা দেয়া আছে

যস্য নাহঙ্কৃতো ভাবো বুদ্ধির্যস্য লিপ্যতে

কুর্বতোঽকুর্বতো বাপি জীবন্মুক্ত উচ্যতে

-(বরাহ উপনিষৎ-/২৫)

অর্থাৎ "যাঁর 'আমি কর্তা' এইরূপ ভাব নেই, যাঁর বুদ্ধি লিপ্ত হয় না, তিনি কিছু করুন বা না করুন তিনিজীবন্মুক্ত বলে কথিত হন।"

এই বিষয়ে ভগবান্ ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য ব্রহ্মসূত্রের (//১৩) বলছেনপূর্বসিদ্ধ কর্তৃত্ব ভোক্তৃত্বের বিপরীত যে কালত্রয়েই অকর্তৃ অভোক্তৃস্বরূপ ব্রহ্ম, তিনিই আমি; এর পূর্বেও আমি কর্তা বা ভোক্তা ছিলাম না, বর্তমানকালেও তা নয়, ভবিষ্যৎকালেও তা হব না; নির্গুণব্রহ্মবিদ্ এপ্রকার অনুভব করে থাকেন। তাঁর স্বশরীরও "উইঢিবিতে পরিত্যক্ত সর্পত্বকের ন্যায়" প্রতিভাত হয়। জীবন্মুক্ত অপরোক্ষ ব্রহ্মাত্মজ্ঞানীর জীবদ্দশাতে অনুভূত যে অশরীরতা তা কেবল যে যুক্তিসিদ্ধ তা নয়, বরংচ শ্রুতিসিদ্ধ। বৃহদারণ্যকে পঠিত হচ্ছে

যদা সর্বে প্রমুচ্যন্তে কামা যেঽস্য হৃদি শ্রিতাঃ

অথ মর্ত্যোঽমৃতো ভবত্যত্র ব্রহ্ম সমশ্নুতে ইতি।  তদ্ যথাঽহিনির্ল্বয়নী বল্মীকে মৃতা প্রত্যস্তা শয়ীতৈবমেবেদং শরীরং শেতে অথায়মশরীরোঽমৃতঃ প্রাণো ব্রহ্মৈব তেজ এব'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-//)

অর্থাৎ "পরমার্থদর্শীর কোন কাম্য বস্তু না থাকায় জ্ঞান হওয়ার পূর্বে তাঁর হৃদয়ে (বুদ্ধিতে) আশ্রিত যে সকল কাম (বাসনা) ছিল, তারা যখন সমূলে বিনষ্ট হয়, তখন যিনি জ্ঞান হওয়ার পূর্বে মরণশীল ছিলেন তিনিই জ্ঞানোদয়ের পর অমৃত (অমর) হন এবং জন্মান্তরপ্রাপক মৃত্যুর বিনাশহেতু তাঁর জন্মান্তরপ্রাপ্তি আর সম্ভব হয় না বলে এই দেহেই ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হন অর্থাৎ ব্রহ্মই হয়ে যান। ব্রহ্মজ্ঞের দেহান্তরের অপ্রাপ্তি বিষয়ে দৃষ্টান্ত এইসাপের খোলস যেমন বল্মীকে (উইঢিবিতে) নিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে থাকে, ব্রহ্মজ্ঞের এই শরীর ঠিক তেমনি পড়ে থাকে। অতঃপর ইনি (জীবন্মুক্ত পুরুষ) শরীরে বর্তমান থাকলেও শরীরাভিমান না থাকায় অশরীর, অমৃত, প্রাণস্বরূপ (প্রাণের প্রাণ, পরমাত্মা), ব্রহ্মস্বরূপ, তেজস্বরূপই হয়ে থাকেন।"

তাঁর স্বদৃষ্টিতে তখন স্বীয় শরীর জগদাদি সমস্ত পদার্থই বাধিত হয়ে পড়ে। ভেদক উপাধি বিনষ্ট হওয়ায় তিনি তখন শুদ্ধ জলে মিলিত শুদ্ধ জলের ন্যায় নিত্যশুদ্ধবুদ্ধ পরমানন্দস্বরূপ ব্রহ্মই হয়ে পড়েন। অর্থাৎ যে বিদ্বানের উপাধিকৃত ভেদদর্শন নষ্ট হয়ে গিয়েছে এবং যিনি বিশুদ্ধ বিজ্ঞানঘন একরস অদ্বিতীয় আত্মাকেই কেবল দর্শন করেন, সেই মননশীল অর্থাৎ জ্ঞানীর আত্মার স্বরূপ কি হয়?

যথোদকং শুদ্ধে শুদ্ধমাসিক্তং তাদৃগেব ভবতি এবং মুনের্বিজানত আত্মা ভবতি গৌতম ৷৷-(কঠ উপনিষৎ ২।১।১৫)

যেইরূপ শুদ্ধ অর্থাৎ নির্মল উদকে (জলে) প্রক্ষিপ্ত নির্মল জল একরসই হয় অর্থাৎ অন্যপ্রকার হয় না কিন্তু তদ্রূপই হয়, সেইরূপ হে গৌতম! আত্মৈকদর্শী জ্ঞানীর আত্মাও ঠিক এইরূপই হয়।

আর 'স্থিতপ্রজ্ঞস্য কা ভাষা'-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-/৫৪) "স্থিতপ্রজ্ঞের লক্ষণ কি"? ইত্যাদি স্মৃতিতেও স্থিতপ্রজ্ঞের লক্ষণসকলের বর্ণনা করতে গিয়ে জীবন্মুক্তের কথায় বর্ণিত হয়েছে। তাছাড়া এটা বলা বাহুল্য যে, ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ গীতায় স্থিতপ্রজ্ঞ, গুণাতীত, ভগবৎভক্ত প্রভৃতির নামে জীবন্মুক্তেরই লক্ষণ তুলে ধরেছেন। যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণের বশিষ্ঠরাম সংবাদের উৎপত্তি প্রকরণে বর্ণিত আছে

নোদেতি নাস্তমায়াতি সুখে দুঃখে মুখপ্রভা।

যথাপ্রাপ্তে স্থিতির্যস্য জীবন্মুক্ত উচ্যতে।"

-(যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণ, উৎপত্তিপ্রকরণ, /)

যিনি সুখপ্রাপ্তিতে হর্ষ, দুঃখের দ্বারা দৈন্যপ্রাপ্ত হন না, যাঁর যদৃচ্ছালব্ধ বস্তুতেই দেহযাত্রা নির্বাহ হয় তাঁকেই জীবন্মুক্ত বলা হয়।

ভগবান্ দত্তাত্রেয় জীবন্মুক্তি গীতায় বলেছেন

জীবঃ শিবঃ সর্বমেব ভূতেষ্বেবং ভূতে ভূতে ব্যবস্থিতঃ।এবমেবাভিপশ্যন্ হি এবমেব পশ্যতি যো জীবন্মুক্তঃ উচ্যতে। এবং ব্রহ্ম জগৎসর্বমখিলং ভাসতে রবিঃ। সংস্থিতং সর্বভূতানাং জীবন্মুক্তঃ উচ্যতে। একধা বহুধা চৈব দৃশ্যতে জলচন্দ্রবৎ। আত্মজ্ঞানী তথৈবৈকো জীবন্মুক্তঃ উচ্যতে। সর্বভূতে স্থিতং ব্রহ্ম ভেদাভেদো বিদ্যতে। একমেবাভিপশ্যংশ্চ পশ্যতি জীবন্মুক্তঃ উচ্যতে। -(জীবন্মুক্তি গীতা- -)

অর্থাৎ এই যে জীব, ইনিই শিব। ইনি সর্বভূতে বিরাজমান। ইনি সর্বব্যাপী। এই জীবনে এই জীবকে যিনি এইভাবে দেখতে পেরেছেন, তিনিই জীবন্মুক্ত। অর্থাৎ গগনে রবির উদয়ে বিশ্বচরাচর প্রকাশিত হয়। সেইভাবেই চৈতন্যস্বরূপ পরমাত্মা পরব্রহ্ম জগতের প্রতিটি বস্তুর মধ্যে বিরাজ করে ব্রহ্মাণ্ডকে প্রকাশ করছেন। এইরকম জ্ঞানলাভ করে যিনি জ্ঞানী হতে পেরেছেন তাঁকেই বলা যায় জীবন্মুক্ত। অর্থাৎ আকাশের বুকে একটি মাত্র চাঁদ স্নিগ্ধ কিরণ নিয়ে ভাসমান। স্রোতের মালা নিয়ে জলে সেই এক চাঁদকে অনেক, অনেক রূপে দেখা যায়। সেই রকম এক পরমাত্মা প্রতিটি জীবের বুদ্ধিতে এক-একভাবে প্রকাশিত। এইরকম আত্মজ্ঞানীই জীবন্মুক্ত বলে অভিহিত হন। অর্থাৎ সমুদয় জীবের অন্তঃকরণেই সেই এক ব্রহ্ম বিরাজ করছেন। স্থাবর-জঙ্গম ভেদে জীবদেহ পৃথক পৃথক হলেও, তিনিই সেই এক। তার মধ্যে ভেদও নেই, অভেদও নেই। এইরকম জ্ঞানে যিনি জ্ঞানী হতে পেরেছেন, তিনিই জীবন্মুক্ত।

অষ্টাবক্র মুনি অষ্টাবক্র-গীতার শান্তিশতকম্ প্রকরণে বলছেন

কৃত্যং কিমপি নৈবাস্তি কাপি হৃদিরঞ্জনা।

যথা জীবনমেবেহ জীবন্মুক্তস্য যোগিনঃ।।১৩।।

অর্থাৎ জীবন্মুক্ত জ্ঞানীর সঙ্কল্পবশে কিছুই করার নেই। তাঁর মনেও কোন বিষয়ের প্রতি বিন্দুমাত্রও অনুরাগ হয় না। কারণ আসক্তির হেতু অবিদ্যা তাঁর বিনষ্ট হয়ে গেছে। তথাপি জীবনহেতু অদৃষ্ট অর্থাৎ প্রারব্ধ অনুসারেই তাঁর সর্ব কর্ম সম্পন্ন হয়ে থাকে।.......

তথ্যসূত্রঃ-

. আচার্য বিদ্যারণ্য স্বামী প্রণীত জীবন্মুক্তিবিবেকঃ, স্বামী অলোকানন্দ অনূদিত, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।

. কঠোপনিষৎ, শাঙ্করভাষ্য, স্বামী জুষ্টানন্দ অনূদিত, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।

. গীতা সংগ্রহ, গ্রন্থিক সংস্করণ।

. বৃহদারণ্যকোপনিষদ্, শাঙ্করভাষ্য আনন্দ গিরি টীকা, মহামহোপাধ্যায় দুর্গাচরণ সাংখ্যবেদান্ততীর্থ অনূদিত, দেব সাহিত্য কুটীর।

. অষ্টাবক্র গীতা, স্বামী ধীরেশানন্দ অনূদিত, উদ্বোধন কার্যালয় কলকাতা।

শ্রীশুভ চৌধুরী

মে ৩১, ২০২৬ খৃষ্টাব্দ। See less

সুরেশ্বরাচার্য

সুরেশ্বরাচার্য ছিলেন ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্যের শিষ্য। তিনি নর্মদা নদীর তীরবর্তী মহিষ্মতীর অধিবাসী ছিলেন। সুরেশ্বরাচার্যের গৃহস্থ...