Monday, 10 August 2026

শ্রীরঙ্গনাথাষ্টকম্

 


আনন্দরূপে নিজবোধরূপে ব্রহ্মস্বরূপে শ্রুতিমূর্তিরূপে

শশাঙ্করূপে রমণীয়রূপে শ্রীরঙ্গরূপে রমতাং মনো মে ||||

অনুবাদ - যিনি পরম আনন্দস্বরূপ, আত্মজ্ঞানস্বরূপ, পরমব্রহ্মস্বরূপ এবং মূর্তিমতি বেদস্বরূপ; যিনি চন্দ্রের ন্যায় পরম শান্ত-মনোহর পরম সুন্দর রূপধারীসেই শ্রীরাঙ্গনাথের দিব্যরূপে আমার মন আনন্দিত লীন হোক ||||

কাবেরিতীরে করুণাবিলোলে মন্দারমূলে ধৃতচারুচেলে।

দৈত্যান্তকালেঽখিললোকলীলে শ্রীরঙ্গলীলে রমতাং মনো মে ||||

অনুবাদ - কাবেরী নদীর তীরে যাঁর অপার করুণার তরঙ্গ প্রবাহিত, যিনি পারিজাত/মন্দার বৃক্ষমূলে মনোরম পীত বস্ত্র পরিধান করে বিরাজমান, এবং যিনি অসুরসংহারকালে লীলচ্ছলে সমগ্র জগৎ পরিচালনা করেনসেই শ্রীরঙ্গনাথের অলৌকিক লীলায় আমার মন নিবিষ্ট হোক ||||​

লক্ষ্মীনিবাসে জগতাং নিবাসে হৃৎপদ্মবাসে রবিবিম্ববাসে

কৃপানিবাসে গুণবৃন্দবাসে শ্রীরঙ্গবাসে রমতাং মনো মে ||||

অনুবাদ - যিনি দেবী লক্ষ্মীর ধাম, সমস্ত জগতের একমাত্র আশ্রয়স্থল, ভক্তের হৃদপদ্মে নিবাসকারী, সূর্যমণ্ডলে বিরাজমান, পরম কৃপার আধার এবং সকল কল্যাণময় গুণরাশির আলয়সেই শ্রীরঙ্গনাথের পরম ধামে আমার মন রমণ করুক ||||

ব্রহ্মাদিবন্দ্যে জগদেকবন্দ্যে মুকুন্দবন্দ্যে সুরনাথবন্দ্যে

ব্যাসাদিবন্দ্যে সনকাদিবন্দ্যে শ্রীরঙ্গবন্দ্যে রমতাং মনো মে ||||

অনুবাদ - যিনি ব্রহ্মা প্রভৃতি দেবতাগণ কর্তৃক পূজিত, সমগ্র জগতের একমাত্র বন্দনীয়, মুক্তিদাতা মুকুন্দরূপে সমাদৃত, দেবরাজ ইন্দ্রের নমস্য, এবং বেদব্যাস সনকাদি পরম ঋষিগণ কর্তৃক নিরন্তর স্তুতসেই পরম পূজনীয় শ্রীরঙ্গনাথে আমার মন লীন হোক ||||

ব্রহ্মাধিরাজে গরুডাধিরাজে বৈকুণ্ঠরাজে সুররাজরাজে

ত্রৈলোক্যরাজেঽখিললোকরাজে শ্রীরঙ্গরাজে রমতাং মনো মে ||||

অনুবাদ - যিনি স্রষ্টা ব্রহ্মারও অধিপতি, গরুড়বাহন মহারাজ, বৈকুণ্ঠধামের পরম শাসক, দেবরাজ ইন্দ্রেরও রাজা, ত্রিভুবনের সম্রাট এবং সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের একমাত্র অধীশ্বরসেই শ্রীরঙ্গরাজ শ্রীরঙ্গনাথে আমার মন আমোদিত হোক ||||

অমোঘমুদ্রে পরিপূর্ণনিদ্রে শ্রীযোগনিদ্রে সসমুদ্রনিদ্রে।

শ্রিতৈকভদ্রে জগদেকনিদ্রে শ্রীরঙ্গভদ্রে রমতাং মনো মে ||||

অনুবাদ - যাঁর সঙ্কল্প মুদ্রা অমোঘ, যিনি পরিপূর্ণ পরম শান্তিতে অবস্থানরত, যিনি শ্রীযোগ নিদ্রায় নিমগ্ন, ক্ষীরসমুদ্রের তরঙ্গে যাঁর শয়ন, যিনি আশ্রিতদের একমাত্র পরম কল্যাণকারী এবং মহাপ্রলয়ে সমগ্র জগতের একমাত্র বিশ্রামস্থলসেই মঙ্গলময় শ্রীরঙ্গনাথে আমার মন নিবিষ্ট হোক ||||​

চিত্রশায়ী ভুজগেন্দ্রশায়ী নন্দাঙ্কশায়ী কমলাঙ্কশায়ী

ক্ষীরাব্ধিশায়ী বটপত্রশায়ী শ্রীরঙ্গশায়ী রমতাং মনো মে ||||

অনুবাদ - যিনি অদ্ভুত সুন্দররূপে শায়িত, নাগরাজ অনন্তদেবের শয্যায় শয়ান, বাল্যকালে নন্দমহারাজের কোলে এবং দেবী লক্ষ্মীর অঙ্কে শায়িত, যিনি ক্ষীরসমুদ্রে প্রলয়কালে বটপত্রে শয়ন করেনসেই শ্রীরঙ্গক্ষেত্রে শায়িত শ্রীরঙ্গনাথে আমার মন আনন্দ লাভ করুক ||||​

ইদং হি রঙ্গং ত্যজতামিহাঙ্গম্ পুনর্নচাঙ্কং যদি চাঙ্গমেতি

পাণৌ রথাঙ্গং চরণেম্বু গাঙ্গম্ যানে বিহঙ্গং শয়নে ভুজঙ্গম্ ||||

অনুবাদ - যাঁর হস্তে সুদর্শন চক্র, যাঁর চরণে পবিত্র গঙ্গা ধারা, যাঁর বাহন পক্ষীরাজ গরুড় এবং শয্যা নাগরাজ অনন্তদেবসেই পরম পবিত্র শ্রীরঙ্গমে যেসব জীব দেহ ত্যাগ করে, তারা পুনরায় মাতৃ জঠরে (সংসারচক্রে) প্রবেশ করে না, অর্থাৎ পরম মুক্তি লাভ করে ||||

ফলশ্রুতিঃ

রঙ্গনাথাষ্টকং পুণ্যম্ প্রাতরুত্থায় যঃ পঠেৎ

সর্বান্ কামানবাপ্নোতি রঙ্গিসায়ুজ্যমাপ্নুয়াৎ ||

অনুবাদ - যে পুণ্যবান ব্যক্তি প্রাতে গাত্রোত্থান করে এই পবিত্র 'শ্রীরঙ্গনাথাষ্টকম্' পাঠ করেন, তিনি ইহলোকে সর্বপ্রকার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন এবং অন্তে ভগবান শ্রীরঙ্গনাথের 'সাযুজ্য মুক্তি' (ভগবৎ-ধামে নিত্যবাস পরম ঐক্য) লাভ করেন ||

ইতি শ্রীমচ্ছঙ্করাচার্য বিরচিতং শ্রীরঙ্গনাথাষ্টকং সম্পূর্ণম্॥

শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য বিরচিত শ্রীরঙ্গনাথাষ্টকম্ সম্পূর্ণ।


শ্রীনন্দিকেশপঞ্চরত্নমালিকাস্তুতিঃ

 


নমজ্জনাখিলাশুভাশুশুক্ষণিং নগস্থিতং

নগেন্দ্রজাপতিপ্রিয়ং নরাশভঙ্গবিক্রমম্

নিতান্তমীশসন্নিধৌ ভক্তবর্গসন্নুতং

নমামি নন্দিকেশ্বরং শিলাদজং গণেশ্বরম্ ||||

অনুবাদ - যিনি প্রণামকারী ভক্তগণের অশুভ বা পাপরাশিকে অগ্নিসদৃশ ভস্মীভূত করেন; যিনি কৈলাস পর্বতে অবস্থান করেন; যিনি পার্বতীপতি দেবাদিদেব মহাদেবের পরম প্রিয়; যিনি নরসিংহ অবতারের গর্ব চূর্ণ করেছিলেন; যিনি সর্বদা পরমেশ্বর শিবের নিকটে অবস্থান করেন এবং ভক্তবৃন্দের দ্বারা সম্যক্ স্তুত পূজিত হনসেই মহর্ষি শিলাদের পুত্র, শিবগণের অধিপতি নন্দিকেশ্বরকে আমি প্রণাম জানাই ||||

দিগীশ্বরার্চিতাঙ্ঘ্রি পঙ্কজাতমদ্ভুতাকৃতিং

নিতান্তশম্ভুনর্তনাত্তমদ্দলং বৃষাননম্

দিবাকরক্ষপেশবহ্নি লোচনত্রয়োজ্জ্বলং

নমামি নন্দিকেশ্বরং শিলাদজং গণেশ্বরম্ ||||

অনুবাদ - দিকপালগণ ( অষ্টদিকপাল ) যাঁর চরণকমলে অর্চনা করেন; যাঁর আকৃতি অদ্ভুত অলৌকিক; যিনি ভগবান শিবের তাণ্ডবনৃত্যকালে অত্যন্ত আনন্দ সহকারেমদ্দল’( মৃদঙ্গ বাদ্যযন্ত্র ) বাজান; যাঁর মুখমণ্ডল বৃষের (ষাঁড়) মতো এবং সূর্য, চন্দ্র অগ্নিএই ত্রিনেত্রের দ্বারা যিনি উজ্জ্বল ভাস্বরসেই শিলাদনন্দন গণাধিপতি নন্দিকেশ্বরকে আমি প্রণাম জানাই ||||​

পুরা হি জাতু রক্ষসামধীশ্বরং স্বমাননং

হসন্তমীক্ষ্য কোপতঃ শশাপ যো বৃষেশ্বরঃ

তথৈব বিষ্ণুবাহনঃ প্রশিক্ষিতশ্চ লীলয়া

নমামি নন্দিকেশ্বরং শিলাদজং গণেশ্বরম্ ||||

অনুবাদ - পূর্বে( ত্রেতাযুগের ঘটনা ) যিনি রাক্ষসরাজ রাবণকে যাঁর বানর/বৃষতুল্য মুখমণ্ডল দেখে পরিহাস করতে দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে অভিশাপ দিয়েছিলেন (যে বানরগণের দ্বারাই তাঁর বিনাশ হবে); এবং যিনি লীলাচ্ছলেই শ্রীবিষ্ণুর বাহন গরূড়কেও শিক্ষাদান দমিত করেছিলেনসেই নন্দিকেশ্বর বৃষেশ্বর শিলাদপুতকে আমি প্রণাম জানাই ||||

মুধা পরো মুকুন্দ এব সর্বদেবতাস্বিতি

প্রজল্পয়ন্তমগ্রতো মুনিং পরাশরাত্মজম্

ক্রুধা স্বকীয়হুঙ্কৃতেরশিক্ষয়চ্চ যোগিরাট্

নমামি নন্দিকেশ্বরং শিলাদজং গণেশ্বরম্ ||||

অনুবাদ - "সর্ব দেবতার মধ্যে কেবল শ্রীবিষ্ণুই (মুকুন্দ) সর্বশ্রেষ্ঠ"—পরাশরপুত্র ব্যাসদেব যখন অহেতুক এমন প্রলাপ উচ্চারণ করছিলেন, তখন যিনি ক্রুদ্ধ হয়ে স্বীয় হুংকারমাত্রে সেই পরম যোগী ব্যাসদেবকে সত্য শিক্ষা দিয়েছিলেন নিবৃত্ত করেছিলেনসেই শিলাদপুত্র গণপতি নন্দিকেশ্বরকে আমি প্রণাম জানাই ||||​

মুহুর্মুহুর্জপন্বরং পরং রৌদ্রমাদরাৎ

অবাপ যো মহেশ্বরাশ্চ নিত্যনির্বিকল্পতাম্

সুকেতুতাং প্রবাহতাং গণেশতাং সাম্যতাং

নমামি নন্দিকেশ্বরং শিলাদজং গণেশ্বরম্ ||||

অনুবাদ - যিনি সাদরে নিরন্তর পরম রুদ্রমন্ত্র জপ করে মহেশ্বরের কৃপায় নিত্য নির্বিকল্প পদ, উত্তম ধ্বজত্ব( শিবের প্রধান ধ্বজারূপ মর্যাদা ), সর্বব্যাপী প্রবাহ রূপতা, গণাধিপতিত্ব এবং স্বয়ং মহাদেবের সমতুল্য রূপ গুণ লাভ করেছিলেনসেই শিলাদজাত গণেশ্বর নন্দিকেশ্বরকে আমি প্রণাম জানাই ||||​

ফলশ্রুতিঃ

সুপঞ্চরত্নমালিকামিমাং পঠন্তি যে নরাঃ

সুপুত্রমিত্রভৃত্যধান্য সৎকলত্রসম্পদঃ

অরোগতাং যোগসিদ্ধিমপ্যহো যদীপ্সিতং

সমৃদ্ধিমপ্যযাচিতং ভজন্তি বাগ্বিলাসতাম্ ||||

অনুবাদ - যে মানবগণ এই উত্তমপঞ্চরত্নমালিকা স্তোত্রপাঠ করেন, তাঁরা সৎপুত্র, সুহৃদ, ভৃত্য, ধান্য, সাধ্বী স্ত্রী এবং নানাবিধ ধনসম্পত্তি লাভ করেন। শুধু তা- নয়, তাঁরা অশেষ শারীরিক সুস্থতা, যোগসিদ্ধি, মনাকুল কাঙ্ক্ষিত ফল, অযাচিত প্রাচুর্য এবং চমৎকার বাক্পটুতা বা বাক্সিদ্ধি প্রাপ্ত হন ||||

|| ​ইতি শ্রীশঙ্করভগবৎপাদবিরচিতা শ্রীনন্দিকেশপঞ্চরত্নমালিকাস্তুতিঃ সমাপ্তা |

ভগবানের "নারায়ণ" নামের মাহাত্ম্য



 'নর' হলেন আত্মা বা পরমাত্মা। সেই নর (পরমাত্মা) থেকে উৎপন্ন আকাশ আদি কার্যসমূহ হলো 'নারা' এই পরমাত্মা উপাদান কারণরূপে সেই সমস্ত কার্যকে ব্যাপ্ত করে থাকেন। অতএব, এই কার্যসমূহ (নারা) তাঁর ব্যাপ্তির আশ্রয় বা বাসস্থান (অয়ন); তাই তিনি নারায়ণ।

শ্রুতিতে মন্ত্রবর্ণিত রয়েছে

"যচ্চ কিঞ্চিজ্জগৎসর্বং দৃশ্যতে শ্রুয়তেঽপি বা।

অন্তর্বহিশ্চ তৎসর্বং ব্যাপ্য নারায়ণঃ স্থিতঃ ।।" -( নারায়ণোপনিষৎ, ১৩/- )

​"জগতে দৃশ্যমান বা শ্রুত যা কিছু রয়েছে, নারায়ণ তার অভ্যন্তরে এবং বাইরে সর্বত্র ব্যাপ্ত হয়ে বিরাজ করছেন।"

মহাভারতে বলা হয়েছে— 

"নরাজ্জাতানি তত্ত্বানি নারাণীতি ততো বিদুঃ।

তান্যেব চায়নং তস্য তেন নারায়ণঃ স্মৃতঃ ।।"

​"নর (পরমাত্মা) থেকে উৎপন্ন তত্ত্বসমূহকে পণ্ডিতগণ 'নারা' বলে জানেন। সেই তত্ত্বসমূহ যাঁর অয়ন (আশ্রয়), তিনি নারায়ণ নামে স্মৃত।"

অথবা, 'নারা' অর্থাৎ জীবসমূহের 'অয়ন' বা প্রলয়স্থান (যেখানে প্রলয়কালে তারা লীন হয়), তাই তিনি নারায়ণ। কারণ শ্রুতিতে বলা হয়েছে"যৎপ্রন্ত্যভিসংবিশন্তি" -( তৈত্তিরীয়ারণ্যকম্ , / ), "যাঁতে প্রলয়কালে সকল জীব প্রবিষ্ট লীন হয়।"

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণেও বলা হয়েছে"নারাণাময়নং যস্মাত্তস্মান্নারায়ণঃ স্মৃতঃ",​"যেহেতু তিনি নরগণের( জীবসমূহের ) অয়ন (লয়স্থান), তাই তিনি নারায়ণ বলে স্মৃত।"

অথবা মনুস্মৃতির বচনানুসারে— 

"আপো নারা ইতি প্রোক্তা আপো বৈ নরসূনবঃ।

তা যদস্যায়নং পূর্বং তেন নারায়ণঃ স্মৃতঃ ||" -( মনুস্মৃতি, /১০ )

​"জলকে 'নারা' বলা হয়, কারণ জল হলো 'নর' (পরমাত্মা)-এর উদ্গমস্থল। সেই জল পূর্বে যাঁর অয়ন (আশ্রয় বা বিচরণস্থল) ছিল, তাই তিনি নারায়ণ স্মৃত।" ​শ্রীনারসিংহপুরাণে বলা হয়েছে

"নারায়ণায় নম ইত্যয়মেব সত্যঃ

       সংসারঘোরবিষসংহরণায় মন্ত্রঃ।

শৃণ্বন্তু ভব্যমতয়ো যতয়োঽস্তরাগা

       উচ্চৈস্তরামুপদিশাম্যহমূর্ধ্ববাহুঃ ||"

​"সংসারের ঘোর বিষ সংহরণের জন্য 'নারায়ণায় নমঃ'—এই মন্ত্রটিই একমাত্র সত্য মন্ত্র। হে শুভবুদ্ধি সম্পন্ন আসক্তিহীন সন্ন্যাসীগণ! তোমরা শোনো, আমি ঊর্ধ্ববাহু হয়ে উচ্চস্বরে এটি উপদেশ করছি"


তথ্যসূত্রবিষ্ণুসহস্রনাম, শাঙ্করভাষ্য, ২৪৫তম নাম, গীতাপ্রেস গোরক্ষপুর

 

Saturday, 1 August 2026

জ্ঞানী ভোগ্যবিষয়ে মনের কঠিনতা আর ভগবদ্বিষয়ে মনের কোমলতা সম্পাদন করে—

 


আচার্য মধুসূদন সরস্বতী ভক্তিরসায়নে বলছেন

কাঠিন্যং বিষয়ে কুর্যাদ্ দ্রবত্বং ভগবৎপদে।

উপায়ৈঃ শাস্ত্রনির্দিষ্টৈরনুক্ষণমতো বুধাঃ।।

-(ভক্তিরসায়নম্, প্রথম উল্লাস, ৩১)

বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন পুরুষ শাস্ত্রনির্দিষ্ট উপায়ে নিরন্তর ভোগ্যবিষয়ে চিত্তের কঠিনতা ভগবদ্বিষয়ে চিত্তের কোমলতা সম্পাদন করবে অর্থাৎ ভোগ্যবস্তুতে মনের আসক্তি রহিত করে ভগবৎপদে মনের অনুরাগ বর্ধিত করবে।

চিত্তের যে বিষয়াকারে পরিণতি, তা চিত্তের স্বাভাবিক ধর্ম নয়; ওটা আগন্তুক বা সাময়িক কারণ হতে উৎপন্ন হয়। দেখ, জাগরণ অবস্থায় চিত্তের যে স্থূল বিষয়াকারতা, ইন্দ্রিয়ের সাথে বাহ্যবিষয়ের সন্নিকর্ষ বা নিকটসম্বন্ধ প্রভৃতিই তার কারণ। স্বপ্নাবস্থায় যে চিত্তের সূক্ষ্ম বিষয়াকারতা, তার কারণ মনের বাসনা; আর সুষুপ্তিদশার ন্যায় উক্ত উভয়প্রকার কারণের অনুপস্থিতিতে চিত্ত নির্বিষয় হয়, অর্থাৎ তখন চিত্তে কোন প্রকার বিষয়াকারই থাকে না।

চিত্তের যে ভগবদাকারতা অর্থাৎ ভগবদাকারে পরিণতি, তা কিন্তু চিত্তের স্বভাবসিদ্ধ ধর্ম, আগন্তুক নয়; কারণ চিত্তের কারণীভূত যে সূক্ষ্মভূত, সেগুলোরও কারণ যে অনেকবিধ বিচিত্র শক্তিযুক্ত অনির্বচনীয় মায়া, তারও আশ্রয়ভূত সর্বান্তর্যামী সর্বব্যাপী ভগবান সকল বস্তুতেই অনুস্যূত রয়েছেন।

এখন প্রশ্ন, চিত্তের ভগবদাকারতা স্বভাবসিদ্ধ বলে যদি তার জন্য আর সাধনের অপেক্ষা না থাকে, তাহলে সাধনশাস্ত্রের উপযোগিতা কোথায়? হ্যাঁ, চিত্তের অন্যবিষয়াকারতার বিরোধী ভগবদাকারতা সম্পাদনেই সাধনের সার্থকতা জানবে। চিত্তের যে স্বভাবসিদ্ধ ভগবদাকারতা, তা বিষয়াকারতার সহচর অর্থাৎ সঙ্গে সঙ্গে থাকে বলে এবং বিষয়াকার সমুৎপাদনে সহায়তা করে বলে প্রকৃতপক্ষে বিষয়াকারতার বিরোধী নয়, কিন্তু শাস্ত্রজনিত অর্থাৎ শাস্ত্রোক্ত সাধন অনুষ্ঠান ক্রমে সমুৎপন্ন যে ভগবদাকারতা, ওটা প্রথমত সাধন অভ্যাস সময়ে পরোক্ষরূপে প্রকাশ পায় এবং অল্প অল্প করে বিষয়াকারতা ক্ষয় করতে থাকে; শেষে সাধনার পরিপক্কদশায় অপরোক্ষভাব প্রাপ্ত হয়ে সেই বিষয়াকারতাকে সমূলে বিনষ্ট করে দেয়। এইজন্যই ভাগবতে উদ্ধবের প্রতি স্বয়ং ভগবান বলছেন

যর্হ্যব্জনাভচরণৈষণয়োরুভক্ত্যা

চেতোমলানি বিধমেদ্গুণকর্মজানি

তস্মিন্ বিশুদ্ধ উপলভ্যত আত্মতত্ত্বং

সাক্ষাদ্ যথাঽমলদৃশোঃ সবিতৃপ্রকাশঃ

-(শ্রীমদ্ভাগবত, ১১//৪০)

যখন পদ্মনাভ শ্রীহরির চরণলাভের ইচ্ছায় প্রবল ভক্তিপ্রভাবে সত্ত্বাদিগুণানুগত কর্মজাত রাগদ্বেষাদি চিত্তমলসকল বিনষ্ট হয়, তখন সেই বিশুদ্ধ চিত্তেনির্মল নয়নে সূর্যালোকের ন্যায় আত্মতত্ত্ব সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষ হয়।

ভগবান্ পরবর্তীতে আরও বলছেন

যথাগ্নিনা হেম মলং জহাতি

ধ্মাতং পুনঃ স্বং ভজতে রূপম্

আত্মা কর্মানুশয়ং বিধূয়

মদ্ভক্তিযোগেন ভজত্যথো মাম্

যথা যথাত্মা পরিমৃজ্যতেঽসৌ

মৎপুণ্যগাথাশ্রবণাভিধানৈঃ

তথা তথা পশ্যতি বস্তু সূক্ষ্মং

চক্ষুর্যথৈবাঞ্জনসম্প্রয়ুক্তম্

বিষয়ান্ ধ্যায়তশ্চিত্তং বিষয়েষু বিষজ্জতে

মামনুস্মরতশ্চিত্তং ময়্যেব প্রবিলীয়তে

তস্মাদসদভিধ্যানং যথা স্বপ্নমনোরথম্

হিত্বা ময়ি সমাধৎস্ব মনো মদ্ভাবভাবিতম্

-(শ্রীমদ্ভাগবত, ১১/১৪/২৫-২৮)

স্বর্ণ যেমন অগ্নিসংযোগে উত্তপ্ত হয়ে মলরাশি ত্যাগ করে এবং নিজের স্বাভাবিক রূপ প্রাপ্ত হয়, আত্মাও তেমনই মদীয় ভক্তিযোগ লাভ করে বাসনারাশি পরিত্যাগ করে আমাকে প্রাপ্ত হয়। আমার পুণ্যকথার  শ্রবণ কীর্তনাদি দ্বারা আত্মা যেমন যেমন পরিমার্জিত (বিশুদ্ধ) হয়, অঞ্জনযুক্ত চোখের ন্যায় আত্মাও সেই পরিমাণেই সূক্ষ্মবস্তু (পরমাত্মা) দর্শন করতে সমর্থ হয়। যে লোক বিষয়চিন্তা করে, তার চিত্ত বিষয়েই আসক্ত হয়, আর যে লোক কেবল আমাকেই স্মরণ করে, তার চিত্ত আমাতেই বিলীন হয়। অতএব স্বপ্নদৃশ্যের ন্যায় অসৎ বিষয়ের অনুধ্যান পরিত্যাগ করে মনকে আমার ভাবে ভাবিত করে আমাতেই সমাহিত কর।.....

তথ্যসূত্রঃ- মধূসুদন সরস্বতী বিরচিত, ভক্তিরসায়নম্, মহামহোপাধ্যায় দুর্গাচরণ সাংখ্যবেদান্ততীর্থ অনূদিত সম্পাদিত, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।

শ্রীশুভ চৌধুরী

জুলাই ২১, ২০২৬ খৃষ্টাব্দ।

শ্রীরঙ্গনাথাষ্টকম্

  আনন্দরূপে নিজবোধরূপে ব্রহ্মস্বরূপে শ্রুতিমূর্তিরূপে । শশাঙ্করূপে রমণীয়রূপে শ্রীরঙ্গরূপে রমতাং মনো মে || ১ || ​ অনুবাদ - য...