Saturday, 11 April 2026

মুনি কে?

 


আচার্য গৌড়পাদ্ মাণ্ডুক্যকারিকায় বলছেন

অমাত্রোঽনন্তমাত্রশ্চ দ্বৈতস্যোপশমঃ শিবঃ

ওঙ্কারো বিদিতো যেন মুনির্নেতরো জনঃ

-(মাণ্ডুক্যকারিকা, আগমপ্রকরণ-২৯)

মাত্রাহীন তুরীয় ওঙ্কার, মাত্রা বা পরিচ্ছেদ দ্বারা যাকে সীমাবদ্ধ করতে পারা যায় না অর্থাৎ অনন্ত, সমস্ত দ্বৈতপ্রপঞ্চের উপশমহেতু তুরীয়ব্রহ্ম এই ওঙ্কার শিবস্বরূপ। এই ওঙ্কারকে যিনি জানেন, পরমার্থতত্ত্বের মনন হেতু তিনিই মুনি; শাস্ত্রবিদ্ হলেও অন্য কেউ মুনি পদবাচ্য নন।......

তথ্যসূত্রঃ- মাণ্ডুক্যকারিকা, ভগবান্ শঙ্করাচার্যের ভাষ্য সমেত।

শ্রীশুভ চৌধুরী

অক্টোবর , ২০২৫ খৃষ্টাব্দ।

ব্রহ্মসূত্রকে কেন "শারীরকমীমাংসা" বলা হয়?

 


ভগবান্ ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য অধ্যাসভাষ্যে বলছেন

এবম্ অয়ম্ অনাদিঃ অনন্তঃ নৈসর্গিকঃ অধ্যাসঃ মিথ্যাপ্রত্যয়রূপঃ কর্তৃত্বভোক্তৃত্বপ্রবর্তকঃ সর্বলোকপ্রত্যক্ষঃ৷ অস্যানর্থহেতোঃ প্রহাণায় আত্মৈকত্ববিদ্যাপ্রতিপত্তয়ে সর্বে বেদান্তা আরভ্যন্তে যথা অয়মর্থঃ সর্বেষাং বেদান্তানাম্, তথা বয়মস্যাং শারীরকমীমাংসায়াং প্রদর্শয়িষ্যামঃ৷

এইপ্রকারে এই অনাদি, অনন্ত এবং নৈসর্গিক অধ্যাস মিথ্যাজ্ঞানরূপ, কর্তৃত্ব ভোক্তৃত্বের প্রবর্ত্তক, এটা সকল লোকের প্রত্যক্ষ। (জন্মমরণরূপ-) অনর্থের হেতুস্বরূপ এটার আত্যন্তিক নাশের জন্য এবং আত্মৈকত্ববিদ্যালাভের জন্য সমস্ত বেদান্তশাস্ত্র আরম্ভ করা হচ্ছে। আর যে প্রকারে বেদান্ত সকলের (জীব ব্রহ্মের একত্বজ্ঞানরূপ) এই অর্থ (সিদ্ধ) হয়, তা আমরা এই শারীরকমীমাংসাতে প্রদর্শন করব।

শারীরকমীমাংসাশব্দটার অর্থ এইশরীর কুৎসিত হওয়ায়শরীরশব্দের উত্তর কুৎসিতার্থেকন্প্রত্যয় করেশরীরকশব্দটা নিষ্পন্ন হয়। এটার অর্থকুৎসিত শরীর সেই কুৎসিত শরীরে জীব অবস্থান করে বলেসঃ অস্য নিবাসঃএই অর্থেশরীরকশব্দের উত্তরষ্ণপ্রতায় করে যেশারীরকশব্দটা নিষ্পন্ন হয়, তার অর্থজীব। সেই জীবের ব্রহ্মত্ব প্রতিপাদন করার জন্য বেদান্তদর্শন (ব্রহ্মসূত্র) গ্রন্থে মীমাংসা (–বিচার) করা হচ্ছে বলে এই শাস্ত্রটাকেশারীরকমীমাংসাশাস্ত্র' বলা হয়। যদিও উপনিষদে এবং তদনুসরণকারি এই মীমাংসাশাস্ত্রে প্রাণাদি উপাসনা বর্ণিত হয়েছে, তথাপি তাতে এদের মুখ্য তাৎপৰ্য্য নেই, কারণ উপাসনার দ্বারা চিত্তের একাগ্রতা হলেই, 'তত্ত্বমসি' শ্রবণানন্তর জীব ব্রহ্মের অভেদজ্ঞানের স্ফুরণ হয় বলে উপনিষদে তারা বর্ণিত এই শাস্ত্রে বিচারিত হয়েছে।.......

তথ্যসূত্রঃ- বেদান্তদর্শনম্, প্রথম খণ্ড, ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্যের 'শাঙ্করভাষ্য' স্বামী বিশ্বরূপানন্দের ভাবদীপিকা, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।

শ্রীশুভ চৌধুরী

মার্চ , ২০২৬ খৃষ্টাব্দ।

Photo editing credit Thākur Vishāl

মুক্তপুরুষগণের কি জগৎস্রষ্টৃত্ব আছে অথবা নেই?

 


সগুণ ব্রহ্মের উপাসনা প্রভাবে যাঁরা মনের সহিত ঈশ্বরসাযুজ্য প্রাপ্ত হন, তাঁদের ঐশ্বর্য কি নিরঙ্কুশ (অসীম) নাকি তারতম্যযুক্ত (সসীম)?

'আপ্নোতি স্বারাজ্যম্'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-১।৬।২) অর্থাৎ 'স্বারাজ্য প্রাপ্ত হন'; 'সর্বেস্মৈ দেবা বলিমাবহন্তি' -(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-১।৫।৩) অর্থাৎ 'সকল দেবতা তাঁর জন্য উপহার আনয়ন করেন' ইত্যাদি শ্রুতিতে মুক্তপুরুষগণের অপ্রতিহত ঐশ্বর্য বর্ণিত হয়েছে, সেহেতু সংশয় হয়এই যোগিগণের কি জগৎস্রষ্টৃত্ব আছে অথবা নেই? তদুত্তরে ভগবান্ সূত্রকার বাদরায়ণ বলছেন

জগদ্ব্যাপারবর্জং প্রকরণাদসন্নিহিতত্বাচ্চ৷৷

-(ব্রহ্মসূত্র-..১৭)

ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য এই সূত্রের ভাষ্যে বলছেনজগতের সৃষ্টি, স্থিতি প্রলয় বিষয়ক ব্যাপারকে বর্জন করে অণিমা প্রভৃতি অন্যপ্রকার ঐশ্বর্য মুক্তগণের হয়ে থাকে, এটাই সঙ্গত। জগতের উৎপত্তি প্রভৃতি বিষয়ক ব্যাপার কিন্তু নিত্যসিদ্ধ ঈশ্বরেরই। যেহেতু শ্রুতিতে জগদ্ব্যাপার বিষয়ক প্রকরণে মুক্তপুরুষের কোন উল্লেখ নেই, কারণ এই প্রকরণে একমাত্র নিত্যসিদ্ধ ঈশ্বরই প্রস্তাবিত। 'নিত্যং বিভুং সর্বগতং ...ভূতযোনিম্'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-..) ইত্যাদি শ্রুতিতে 'নিত্য' এই শব্দের দ্বারা তাঁর নিবন্ধন হয়েছে। সেই ঈশ্বরের অন্বেষণ এবং জিজ্ঞাসাপূর্বকই কিন্তু জীবগণের অণিমাদি ঐশ্বর্য অর্থাৎ 'তেষাং সর্বেষু লোকেষু কামচারো ভবতি'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-..) 'সকল লোকে তাঁদের সচ্ছন্দ গতি হয়' ইত্যাদি শ্রুতিতে বর্ণিত হয়েছে। সেহেতু তাঁরা জগৎব্যাপারে অসন্নিহিত।

আর মুক্তপুরুষগণের জগৎস্রষ্টৃত্ব অঙ্গীকৃত হলে মনোযুক্ত হওয়ায় তাঁদের মধ্যে ঐক্যমত না হলে কারও জগতের স্থিতি বিষয়ক অভিপ্রায় হবে, কারও সংহার বিষয়ক অভিপ্রায় হবে, এই প্রকার বিরোধও কদাচিৎ হতে পারে। ফলে জগতের সৃষ্টি স্থিতি বিষয়ে কোন প্রকার নিয়ম থাকবে না অথবা পরস্পরের ঐশ্বর্যের ব্যাঘাতক হওয়ায় কারও ঈশ্বরত্ব সিদ্ধ হবে না, সৃষ্টি ক্রিয়ারও ব্যাঘাত হয়ে পড়বে। অতএব মুক্ত পুরুষের শক্তি অপরিসীম নয়, সীমিত মাত্র।

তাহলে স্বারাজ্য প্রাপ্তিবোধিকা শ্রুতির গতি কি? তদুত্তরে  আচার্য ভারতী তীর্থ বৈয়াসিক ন্যায়মালাতে বলছেনঈশ্বরের অধীনভাবে স্বারাজ্য প্রাপ্তি হয়, এই অভিপ্রায়ে উক্ত শ্রুতির প্রবৃত্তি হয়েছে। যেহেতু ঈশ্বর যোগিগণের ভোগের জন্য স্বারাজ্য প্রদান করেন এবং বিদ্যার দ্বারা মুক্তি প্রদান করেন।

তথ্যসূত্রঃ-

. ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের শারীরকমীমাংসা ভাষ্য।

. আচার্য ভারতী তীর্থের বৈয়াসিক ন্যায়মালা।

শ্রীশুভ চৌধুরী

এপ্রিল ১০, ২০২৬ খৃষ্টাব্দ।

শব্দব্রহ্মবাদ বা শব্দাদ্বৈতবাদ—

 


শব্দব্রহ্মবাদী বৈয়াকরণদিগের মতে শব্দ চার প্রকার () পরা, () পশ্যন্তী, () মধ্যমা, () বৈখরী। 'পরা' বাক্ স্থিরবিন্দুরূপে মূলাধারে অবস্থান করেন। 'পশ্যন্তী' দেহ মধ্যস্থ বায়ুদ্বারা চালিত হয়ে মূলাধার হতে নাভিদেশ পর্যন্ত গমন করে তথায় অবস্থান করে। পরা এবং পশ্যন্তী, এই দ্বিবিধ বাক্ই ব্রহ্মরূপ সরস্বতী। এটা অব্যক্ত নাদ্, অনাহতধ্বনি বা শব্দব্রহ্ম বলে পরিচিত। এটা আমাদের অবাঙ্মনসগোচর, ঋষির জ্ঞাননেত্রে, যোগীর যোগদৃষ্টিতে শব্দব্রহ্মের এই অব্যক্ত সূক্ষ্মরূপ ব্যক্ত বা প্রকাশিত হয়ে থাকে। যে বাক্ আমাদের হৃদয় দেশে অবস্থান করে তার নাম 'মধ্যমা'; কান বন্ধ করলে দেহের মধ্যে যে শব্দ শোনা যায়, তাই 'মধ্যমা' বাক্ বলে অভিহিত করা হয়। বাগিন্দ্রিয়ের সাহায্যে যে বাক্য উচ্চারিত হয়ে আমাদের শ্রুতিগোচর হয় তাকে 'বৈখরী' বাক্ বলা হয়ে থাকে। বিখর শব্দে ইন্দ্রিয় বা দেহ ইন্দ্রিয়ের সংঘাতকে বোঝায়। এজন্য দেহেন্দ্রিয় সংঘাতের ফলে উৎপন্ন কণ্ঠদেশে অবস্থিত বাক্যের নাম 'বৈখরী'

মধ্যমা বাক্ হৃদয়ে অবস্থান করে, আমাদের হৃদয়স্থ ভাব প্রকাশে সাহায্য করে বলে বৈয়াকরণগণ এই মধ্যমা বাক্ কে আখ্যা দিয়েছেন 'স্ফোট' এই স্ফোটরূপ শব্দই নিত্য ব্রহ্মবোধক শব্দ। 'বর্ণাতিরিক্ত বর্ণাভিব্যঙ্গঃ অর্থপ্রত্যায়কঃ নিত্যঃ শব্দঃ স্ফোটঃ' (সর্বদর্শনসংগ্রহ) 'বর্ণ হতে ভিন্ন, অথচ বর্ণের দ্বারা অভিব্যক্ত, অর্থের বোধ উৎপাদক যে নিত্য শব্দ, তাই 'স্ফোট' এটা স্বপ্রকাশ এবং জ্ঞানস্বরূপ। অর্থকে প্রস্ফুটিত করে বলেই এটাকে স্ফোট বলা হয়। শব্দব্রহ্মবাদী উপনিষদ্ সম্প্রদায়ের আচার্য ভর্তৃহরি তাঁর বাক্যপদীয় গ্রন্থের প্রারম্ভ শ্লোকেই শব্দব্রহ্মের পরিচয় প্রদান করতে গিয়ে বলেছেন

'অনাদিনিধনং ব্রহ্ম শব্দতত্ত্বং যদক্ষরম্।

বিবর্ত্ততেঽর্থভাবেন প্রক্রিয়া জগতো যতঃ।।

শব্দের যা প্রকৃত তত্ত্ব তা অনাদি নিধন ব্রহ্মবস্তু। শব্দব্রহ্মের কোনরূপ ক্ষয়-ব্যয় নেই, এজন্য তাকে অক্ষর বলা হয়ে থাকে। বিভিন্ন অর্থ প্রকাশ করবার জন্য শব্দব্রহ্মের বিবিধপ্রকার বিবর্তরূপের উদ্ভব হয়ে থাকে এবং তার ফলে নিখিল বাঙ্ময় জগতের অভিব্যক্তি হয়।

শব্দব্রহ্মের বিবর্ত সমগ্র বাঙ্ময় জগৎই কার্য অনিত্য। বর্ণ, পদ, প্রভৃতি কার্য শব্দেরই বিভিন্ন অভিব্যক্তি। কার্য বা অনিত্য শব্দের মধ্য দিয়ে নিত্য শব্দব্রহ্মের ভাতি বা প্রকাশ হয়ে থাকে। বিবর্তবাদী বৈদান্তিকের অখণ্ড জ্ঞান যেমন ঘটাদি জ্ঞেয় বস্তুর আকারে আকার প্রাপ্ত হয়ে সসীম, সখণ্ড হয়ে প্রকাশিত হয়, সেরুপ নিত্য শব্দব্রহ্ম অনিত্য বর্ণ, পদ, বাক্য প্রভৃতির আকারে আকার প্রাপ্ত হয়ে পদস্ফোট, বাক্যস্ফোট প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন রূপে অভিব্যক্ত হয়ে থাকে। এটা শব্দব্রহ্মের সোপাধিকরূপ, সুতরাং মিথ্যা। স্ফোটরূপ নিত্য, চিন্ময় অখণ্ড শব্দব্রহ্মই সত্য।

প্রসিদ্ধ দার্শনিক মণ্ডন মিশ্র তাঁর 'ব্রহ্মসিদ্ধি' গ্রন্থে শব্দাদ্বৈতবাদ বা শব্দব্রহ্মবাদ সমর্থন করেছেন। ব্রহ্মসিদ্ধির প্রথম শ্লোকে 'অক্ষরম্' এই পদটির মণ্ডনোক্ত ব্যাখ্যার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে, মণ্ডন যে তাঁর গ্রন্থে শব্দব্রহ্মবাদ প্রতিপাদন করেছেন তা নিঃসন্দেহে বোঝা যায়। 'ওমিতি ব্রহ্ম, ওমিতীদং সর্বম্'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ ১।৮।১), 'ওঁকার এবেদং সর্বং'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-২।২৩।৩), 'ওঁকার এব সর্বা বাক্, পরঞ্চাপরঞ্চ ব্রহ্ম যদ্ ওঙ্কারঃ'-(প্রশ্ন উপনিষৎ-৫।২), এই সকল শ্রুতিবাক্যের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে মণ্ডন মিশ্র প্রণব বা ওঁকারই যে সমস্ত বাঙ্ময় জগতের আদি প্রস্রবণ, ওঁকারই ব্রহ্ম, এই শব্দব্রহ্মবাদ অতি স্পষ্ট ভাষায় বিবৃত করেছেন। শব্দব্রহ্মবাদীর মতে প্রণব হতে গায়ত্রী, গায়ত্রী হতে বেদবাণীর বিকাশ হয়েছে এবং বেদ হতে ক্রমে সমস্ত বাঙ্ময় জগতের অভ্যুদয় হয়েছে। সূতসংহিতায় বর্ণিত আছেপ্রণবের দুটি রূপ আছে, একটি তার পর বা উৎকৃষ্ট ব্রহ্মরূপ, অপরটি স্থূল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য শব্দরূপ। স্থূল শব্দরূপকে বাদ দিয়ে ওঁকারের পরব্রহ্মরূপ উপলব্ধিই সর্বপ্রকার জ্ঞানের পরাকাষ্ঠা। ভগবান্ শঙ্করাচার্য তদীয় অদ্বৈতবেদান্তে শব্দব্রহ্মবাদ সমর্থন করেন নি। তিনি ভর্তৃহরির অঙ্গীকৃত স্ফোটবাদ ব্রহ্মসূত্রভাষ্যে ( ব্রহ্মসূত্র ১।৩।২৮ শঙ্করভাষ্যে) দৃঢ়তার সাথে খণ্ডনকরেছেন। মণ্ডন মিশ্র শঙ্করাচার্যের নিকট সন্ন্যাস গ্রহণ করার পর, সুরেশ্বরাচার্য নামে পরিচিত হয়ে যে সকল গ্রন্থরাজি রচনা করেছেন, তাতে কোথাও তিনি এই স্ফোটবাদ বা শব্দাদ্বৈতবাদ অনুমোদন করেন নি। শঙ্কর-সম্মত ব্রহ্মাদ্বৈতবাদই প্রতিপাদন করেছেন। আচার্য বিমুক্তাত্ম-ভগবান্ তদীয় ইষ্টসিদ্ধি গ্রন্থে বলেছেন যে—'তস্মাদাত্মাদ্বৈতমেব সিধ্যতি, শব্দাদ্বৈতং  ঘটাদ্বৈতং বা।' অর্থাৎ আত্মা বা ব্রহ্মাদ্বৈতবাদই প্রকৃত অদ্বৈতবাদ্, শব্দাদ্বৈতবাদ বস্তুতঃ অদ্বৈতবাদ নয়, ওটা ঘটাদ্বৈতবাদের ন্যায় অদ্বৈতবাদের এক বিকৃত রূপ।.....

তথ্যসূত্রঃ-

. আচার্য ভর্তৃহরির 'বাক্যপদীয়' হেলারাজ-কৃত টীকা সমেত।

.বেদান্তদর্শনঅদ্বৈতবাদ, প্রথম খণ্ড, আশুতোষ ভট্টাচার্য শাস্ত্রী।

. বেদান্তদর্শন, প্রথম খণ্ড, স্বামী বিশ্বরূপানন্দের ভাবদীপিকা, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।

শ্রীশুভ চৌধুরী

এপ্রিল , ২০২৬ খৃষ্টাব্দ।

Saturday, 21 February 2026

শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন—

 


"আত্মা বা অরে দ্রষ্টব্যঃ শ্রোতব্যো মন্তব্যো নিদিধ্যাসিতব্যো"-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-//) ভগবান্ শঙ্করাচার্য এই শ্রুতির ভাষ্যে বলছেন—"অতএব আত্মাই দ্রষ্টব্যসাক্ষাৎকারের উপযুক্ত, অর্থাৎ আত্মবিষয়ক দর্শন সম্পাদন করা আবশ্যক। সেই জন্য শ্রোতব্যপ্রথমে শাস্ত্র আচার্য হতে জ্ঞাতব্য; পশ্চাৎ মন্তব্য, অর্থাৎ অনুকূল তর্ক দ্বারা তা সমর্থন করতে হবে; তারপর নিদিধ্যাসিতব্য অর্থাৎ নিসংশয়ঃরূপে তাকে ধ্যান করতে হবে। এইরূপে শ্রবণ, মনন নিদিধ্যাসনের সাহায্যে পরিশোধিত হলে পর, আত্মা প্রত্যক্ষগোচর হয়ে থাকে। যখন উক্ত সাধনগুলো একই আত্মবিষয়ে অনুগতভাবে প্রযুক্ত হয়, তখনই ব্রহ্মৈকত্ব-বিষয়ে সম্যক্ দর্শন উপস্থিত হয়, নচেৎ কেবল শ্রবণমাত্রে হয় না।"

এইপ্রকার পাঠের পর শ্রুতিতে পঠিত হচ্ছে—"মৈত্রেয্যাত্মনে বা অরে দর্শনেন শ্রবণেন মত্যা বিজ্ঞানেন ইদং সর্বং বিদিতম্" অরে মৈত্রেয়ী! আত্মবিষয়ে দর্শন, শ্রবণ, মনন বিজ্ঞান হলেই এই দৃশ্যমান জগৎ বিজ্ঞাত হয়ে যায়।

এখন প্রশ্ন হল শ্রবণ, মনন নিদিধ্যাসন কি? এই বিষয়ে আচার্য বিদ্যারণ্য মুনীশ্বর বলেছেন

ইত্থং বাক্যৈস্ তদ্ অর্থানুসন্ধানং শ্রবণং ভবেৎ

যুক্ত্যা সম্ভাবিতত্বানুসন্ধানং মননং তু তৎ ।।

তাভ্যাং নির্বিচিকিৎসেঽর্থে চেতসঃ স্থাপিতস্য যৎ।

একতানত্বম্ এতদ্দ্ হি নিদিধ্যাসনম্ উচ্যতে ।।

-(পঞ্চদশী, প্রথম অধ্যায়, ৫৩,৫৪)

এইরূপে তত্ত্বমসি প্রভৃতি মহাবাক্য চতুষ্টয়ের দ্বারা তাদের তাৎপর্যরূপ জীব ব্রহ্মের যে একত্ব (অভেদ), ওটার অনুসন্ধানকে শ্রবণ; আর যুক্তিদ্বারা, এই একত্ব সম্ভবপর বলে যে জ্ঞান হয়, তাকে মনন বলে। সেই শ্রবণ-মনন দ্বারা নিঃসন্দেহে প্রতিষ্ঠিত জীব-ব্রহ্মের একত্বরূপ অর্থে ধারণাবিশিষ্ট চিত্তে যে একাকার বৃত্তিপ্রবাহ, তা নিদিধ্যাসন বলে উক্ত হয়।

পতঞ্জলির যোগশাস্ত্রে বর্ণিত ধ্যান, ধারণা সমাধি এই নিদিধ্যাসনেরই অন্তর্গত। শ্রীগীতার টীকার প্রারম্ভে পূজ্যপাদ মধুসূদন সরস্বতী বলেছেন"ততস্তৎপরিপাকেন নিদিধ্যাসননিষ্ঠতা। যোগশাস্ত্রস্তু সম্পূর্ণমুপক্ষীণং ভবেদিহ"(১৭ শ্লোক)

শ্রবণ, মনন নিদিধ্যাসন আত্মসাক্ষাৎকারের হেতু। শ্রুতিবাক্য হতে আত্মশ্রবণ করবে, যুক্তিসমূহের দ্বারা তার মনন করবে, এরূপ মনন করে পরে সর্বদা সেই আত্মার ধ্যান করবে। পুরাণসমূহেই এই বিষয়ের তাৎপর্য স্পষ্টরূপে বর্ণিত আছে

সর্ববেদান্তবাক্যানামাচার্যমুখতঃ প্রিয়াৎ।

বাক্যানুগ্রাহকন্যায়শীলনং মননং ভবেৎ।।

নিদিধ্যাসনমৈকাগ্র্যং শ্রবণে মননেঽপি চ।

নিদিধ্যাসনসংজ্ঞং মননং দ্বয়ং বুধাঃ।।

ফলোপকারকাঙ্গং স্যাত্তেনাসম্ভাবনা তথা।

বিপরীতা নির্মূলং প্রবিনশ্যতি সত্তমাঃ।।

(মানব উপপুরাণ অধ্যায়)

প্রিয় আচার্যের মুখ হতে, সকল বেদান্তবাক্যের ব্রহ্মবিষয়ে তাৎপর্যজ্ঞানের অনুকূল যে সকল ন্যায় বা যুক্তি আছে, তা শ্রবন করে, সেই সকল যুক্তির বারংবার যে অনুশীলন, তাই মনন হয়ে থাকে। বেদান্তবাক্যের শ্রবণে এবং তার অর্থ-মননে চিত্তের যে একাগ্রতা, তাই নিদিধ্যাসন। নিদিধ্যাসন মনন এই দুইটি হে পণ্ডিতগণ! ফলের উপকারক অঙ্গ হয়ে থাকে। হে সাধুশ্রেষ্ঠগণ! সেই মনন নিদিধ্যাসনের দ্বারা, ব্রহ্মতত্ত্ব বিষয়ে যে অসম্ভাবনা বিপরীত জ্ঞান, তা মূলের সহিত উচ্ছিন্ন হয়ে থাকে।

এর তাৎপর্য এই যে, ধ্যান মনন এই দুইটি সাধন দ্বারা শ্রবণ দৃঢ়ীকৃত হয়, এই কারণে এই দুইটিকে ফলোপকারক অঙ্গ বলা হয়। এদের মধ্যে প্রথম অর্থাৎ মননের দ্বারা ব্রহ্মবিষয়ে যে অসম্ভাবনা, অর্থাৎ ব্রহ্ম প্রমাণের দ্বারা সিদ্ধ হয় না বলে তার অস্তিত্বেরই সম্ভাবনা নেই, এই প্রকার যে জ্ঞান, তা দূর হয়ে থাকে। নিদিধ্যাসন বা ধ্যানরূপ দ্বিতীয় উপায়টি দ্বারা, যে সকল ভ্রান্ত ধারণা বা বিপরীত প্রতীতি আছে, তাও নষ্ট হয়। এইরূপে অসম্ভাবনা বিপরীত প্রত্যয়রূপ দ্বিবিধ প্রতিবন্ধক নষ্ট করে, মনন নিদিধ্যাসন, শ্রবণের সাহায্য করে বলে, এই দুইটি হেতুকেই শ্রবণের সহকারী অর্থাৎ ফলোপকারক অঙ্গ বলে নির্দেশ করা হয়েছে।

সুতরাং শ্রবণ, মনন, নিদিধ্যাসন অসম্ভাবনা বিপরীতভাবনার নিবর্তক। এই যে ভেদজ্ঞানের প্রাবল্য, এটাই বিপরীতভাবনা। বস্তুতঃ দেহাদি পদার্থ সকল সত্য, তাতে আত্মবুদ্ধি, জীব ব্রহ্মের ভেদ সত্য, ইত্যাদি এইপ্রকার যে বিপরীত বুদ্ধি, তাই 'বিপরীতভাবনা' নিদিধ্যাসনের বলে এটা নিরাকৃত হয় এবং চিত্তের একাগ্রতা সুক্ষ্মবিষয়গ্রহণযোগ্যতা সম্পাদিত হয়।

বৃহদারণ্যক শ্রুতিতে বর্ণিত আছে

তমেব ধীরো বিজ্ঞায় প্রজ্ঞাং কুর্বীত ব্রাহ্মণঃ। নানুধ্যায়াদ্বহূঞ্ছব্দান্ বাচো বিগ্লাপন হি তৎ।

-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-//২১)

"ধীর ব্রহ্মনিষ্ঠ পুরুষ সেই আত্মাকেই নিঃসংশয়রূপে অবগত হয়ে প্রজ্ঞালাভ করবেন অর্থাৎ অপরোক্ষ জ্ঞান লাভ করবেন। বহুশব্দের চিন্তা করবেন না, কারণ তাতে বাগিন্দ্রিয়ের অবসাদ জন্মে থাকে।"

অনন্যাশ্চিন্তয়ন্তো মাং যে জনাঃ পর্যুপাসতে

তেষাং নিত্যাভিযুক্তানাং যোগক্ষেমং বহাম্যহম্ ৷৷

-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা -/২২)

"আমাকেই আত্মভাবে চিন্তাপূর্বক যে সর্বত্যাগীগণ আমার ধ্যান করেন, সেই নিত্য-সমাহিত মুমুক্ষুগণের যোগ ক্ষেম আমি বহন করি।"

এইরূপ  শ্রুতিবচন স্মৃতিবচন বিপরীতভাবনার নিবৃত্তির জন্যই আত্মাতে সর্বদা বুদ্ধির একাগ্রতার বিধান করছেন।

তথ্যসূত্রঃ-

. ভগবান শঙ্করাচার্যের বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ ভাষ্য।

. আচার্য বিদ্যারণ্য মুনীশ্বর প্রণীত 'পঞ্চদশী'

. আচার্য বিদ্যারণ্য মুনীশ্বর বিরচিত "বিবরণ-প্রমেয়-সংগ্রহ"

শ্রীশুভ চৌধুরী

ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬ খৃষ্টাব্দ।

 Photo editing credit Thākur Vishāl

মুনি কে?

  আচার্য গৌড়পাদ্ মাণ্ডুক্যকারিকায় বলছেন — অমাত্রোঽনন্তমাত্রশ্চ দ্বৈতস্যোপশমঃ শিবঃ । ওঙ্কারো বিদিতো যেন স মুনির্নেতরো জনঃ ॥...