Sunday, 14 June 2026

অদ্বৈতবেদান্তোক্ত 'অখণ্ডার্থবোধ' কাকে বলে?

 


বেদ, উপনিষৎ প্রভৃতি অধ্যাত্ম শাস্ত্রমূলে যে তুরীয় ভূমা ব্রহ্মের সাক্ষাৎ অপরোক্ষ পরিচয় পাওয়া যায়, তাকে অদ্বৈতবেদান্তের ভাষায় বলা হয়েছে 'অখণ্ডার্থবোধ' 'তত্ত্বমসি', 'অহং ব্রহ্মাস্মি', 'অয়মাত্মা ব্রহ্ম' প্রভৃতি বেদান্ত মহাবাক্যের শ্রবণ, মনন নিদিধ্যাসনের ফলে সকল বাক্যমূলে যে শুদ্ধব্রহ্ম সাক্ষাৎকার উদিত হয়, তাকেই বলে অখণ্ডার্থবোধ বা অখণ্ডব্রহ্মবোধ। এই অখণ্ডার্থতা-বোধের পরিচয় দিতে গিয়ে অদ্বৈতবেদান্তী বলেছেনবাক্যের সংগঠক পদগুলোর মধ্যে পরস্পর সম্বন্ধ জ্ঞানোদয় না হয়ে, বাক্য হতে সমষ্টিগতভাবে বাক্যের রহস্য হিসেবে যে যথার্থ জ্ঞান উৎপন্ন হয়, তাই 'অখণ্ডার্থবোধ' বলে জানবে। চিৎসুখাচার্য বলেছেন

"সংসর্গাসঙ্গি সম্যক্ ধীহেতুতা যাগিরামিয়ম্।

উক্তাঽখণ্ডার্থতা যদ্বা তৎপ্রাতিপদিকার্থতা।।"

-(চিৎসুখী, ১ম পরিঃ, ১০৯ পৃঃ, নির্ণয় সাগর সং)

প্রত্যয়ার্থপ্রভৃতির সাথে সম্বন্ধরহিত শব্দার্থের সুনির্দিষ্ট জ্ঞানই এই অখণ্ডার্থতাবোধ। অপর কথায়, যে সকল শব্দ পর্যায়শব্দ নয়, এরূপ শব্দসমষ্টি হতে প্রতিটি শব্দের, শব্দার্থের এবং ওদের অন্তরালবর্তী পরস্পর সম্বন্ধের জ্ঞানোদয় না হয়ে, অর্থাৎ খণ্ডবাক্যার্থের বোধ না হয়ে, সামগ্রিকভাবে বাক্য হতে যে নির্বিকল্প জ্ঞানোদয় হয়, তাকেই বলে অখণ্ডার্থতাবোধ বা অখণ্ডবোধ। আচার্য মধুসূদন সরস্বতী অদ্বৈতসিদ্ধিতে বলেছেন

"অপর্যায়শব্দানাং সংসর্গাগোচরপ্রমিতিজনকত্বং বা তেষামেকপ্রাতিপাদিকার্থমাত্রপর্যবসায়িত্বং বা অখণ্ডার্থত্বম্।"-(অদ্বৈতসিদ্ধি ৬৬৩ পৃষ্ঠা, নির্ণয় সাগর সং).....

তথ্যসূত্রঃ- বেদান্তদর্শনঅদ্বৈতবাদ, তৃতীয় খণ্ড, কাব্য-ব্যাকরণ-সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ, বিদ্যাবাচস্পতি শ্রীআশুতোষ ভট্টাচার্য শাস্ত্রী।

শ্রীশুভ চৌধুরী

মে ১৫, ২০২৬ খৃষ্টাব্দ। See less

জীবন্মুক্তির শাস্ত্রপ্রমাণ—

 


জীবন্মুক্তি অবস্থা আছে কিনা অথবা জীবন্মুক্তি সিদ্ধি সম্ভব কিনা এরূপ সংশয় নিরসনের জন্য শ্রুতি স্মৃতি-বাক্য প্রমাণরূপে গৃহীত হয়। সেই বাক্যসকলের মধ্যে কঠবল্লীতে রয়েছে"বিমুক্তশ্চ বিমুচ্যতে", অর্থাৎ বিমুক্ত (—জীবন্মুক্ত) ব্যক্তি দেহান্তে বিদেহমুক্তি লাভ করেন। জীবৎকালেই প্রত্যক্ষবন্ধন বাসনা থেকে বিশেষরূপে মুক্ত হয়ে মৃত্যুর পর ভবিষ্যৎ জন্মরূপ বন্ধন থেকে বিশেষরূপে মুক্ত হয়ে যায়। সম্পূর্ণ শ্রুতিটি হল

পুরমেকাদশদ্বারমজস্যাবক্রচেতসঃ

অনুষ্ঠায় শোচতি বিমুক্তশ্চ বিমুচ্যতে এতদ্বৈ তৎ -(কঠ উপনিষৎ-২।২।১)

ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য এই শ্রুতির ভাষ্যে বলছেনশরীর নামক এই নগরটি একাদশদ্বারবিশিষ্ট অর্থাৎ এর এগারটি দরজা, যথামস্তকস্থিত সাতটি (চক্ষুদ্বয়, কর্ণদ্বয়, নাসারন্ধ্রদ্বয় মুখ), নাভিসহ অধঃস্থিত তিনটি (নাভি, পায়ু উপস্থ) এবং মস্তকে একটি (ব্রহ্মরন্ধ্র) আচ্ছা এই নগরটি কার? উত্তরঅজের অর্থাৎ দেহ নগরের ধর্ম হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন জন্মদিবিকাররহিত রাজার সাথে তুলনীয় আত্মার, যিনি অবক্রচেতা অর্থাৎ যার চৈতন্য (—জ্ঞান) বক্র অর্থাৎ কুটিল নয়, যা সূর্যালোকের মতো নিত্য প্রকাশমান একরূপবিশিষ্ট, সেই রাজস্থানীয় আত্মরূপ ব্রহ্মের এই শরীররূপ নগর।

সেই শরীররূপ নগরস্বামী পরমেশ্বরের অনুষ্ঠান অর্থাৎ অনুধ্যান করেকারণ শ্রবণমননসহায়ে আত্মাকে সম্যগ্ রূপে জেনে নিয়ে যে অনুধ্যান-করণ, তাই তাঁর অনুষ্ঠান। অতএব মুমুক্ষু ব্যক্তি সকল এষণা হতে মুক্ত হয়ে সর্বভূতস্থ সেই আত্মাকে নিদিধ্যাসনপূর্বক অভয়প্রাপ্তিহেতু শোকাতীত হয়ে যান এবং এই দেহেই (জীবিত অবস্থাতেই) অবিদ্যাকৃত কাম কর্মরূপ বন্ধন হতে বিমুক্ত হয়ে দেহান্তে বিদেহ মুক্তি লাভ করেন অর্থাৎ তিনি আর শরীর ধারণ করেন না।

জীবন্মুক্ত বিষয়ে বরাহ শ্রুতিতে একটি সুন্দর সংজ্ঞা দেয়া আছে

যস্য নাহঙ্কৃতো ভাবো বুদ্ধির্যস্য লিপ্যতে

কুর্বতোঽকুর্বতো বাপি জীবন্মুক্ত উচ্যতে

-(বরাহ উপনিষৎ-/২৫)

অর্থাৎ "যাঁর 'আমি কর্তা' এইরূপ ভাব নেই, যাঁর বুদ্ধি লিপ্ত হয় না, তিনি কিছু করুন বা না করুন তিনিজীবন্মুক্ত বলে কথিত হন।"

এই বিষয়ে ভগবান্ ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য ব্রহ্মসূত্রের (//১৩) বলছেনপূর্বসিদ্ধ কর্তৃত্ব ভোক্তৃত্বের বিপরীত যে কালত্রয়েই অকর্তৃ অভোক্তৃস্বরূপ ব্রহ্ম, তিনিই আমি; এর পূর্বেও আমি কর্তা বা ভোক্তা ছিলাম না, বর্তমানকালেও তা নয়, ভবিষ্যৎকালেও তা হব না; নির্গুণব্রহ্মবিদ্ এপ্রকার অনুভব করে থাকেন। তাঁর স্বশরীরও "উইঢিবিতে পরিত্যক্ত সর্পত্বকের ন্যায়" প্রতিভাত হয়। জীবন্মুক্ত অপরোক্ষ ব্রহ্মাত্মজ্ঞানীর জীবদ্দশাতে অনুভূত যে অশরীরতা তা কেবল যে যুক্তিসিদ্ধ তা নয়, বরংচ শ্রুতিসিদ্ধ। বৃহদারণ্যকে পঠিত হচ্ছে

যদা সর্বে প্রমুচ্যন্তে কামা যেঽস্য হৃদি শ্রিতাঃ

অথ মর্ত্যোঽমৃতো ভবত্যত্র ব্রহ্ম সমশ্নুতে ইতি।  তদ্ যথাঽহিনির্ল্বয়নী বল্মীকে মৃতা প্রত্যস্তা শয়ীতৈবমেবেদং শরীরং শেতে অথায়মশরীরোঽমৃতঃ প্রাণো ব্রহ্মৈব তেজ এব'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-//)

অর্থাৎ "পরমার্থদর্শীর কোন কাম্য বস্তু না থাকায় জ্ঞান হওয়ার পূর্বে তাঁর হৃদয়ে (বুদ্ধিতে) আশ্রিত যে সকল কাম (বাসনা) ছিল, তারা যখন সমূলে বিনষ্ট হয়, তখন যিনি জ্ঞান হওয়ার পূর্বে মরণশীল ছিলেন তিনিই জ্ঞানোদয়ের পর অমৃত (অমর) হন এবং জন্মান্তরপ্রাপক মৃত্যুর বিনাশহেতু তাঁর জন্মান্তরপ্রাপ্তি আর সম্ভব হয় না বলে এই দেহেই ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হন অর্থাৎ ব্রহ্মই হয়ে যান। ব্রহ্মজ্ঞের দেহান্তরের অপ্রাপ্তি বিষয়ে দৃষ্টান্ত এইসাপের খোলস যেমন বল্মীকে (উইঢিবিতে) নিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে থাকে, ব্রহ্মজ্ঞের এই শরীর ঠিক তেমনি পড়ে থাকে। অতঃপর ইনি (জীবন্মুক্ত পুরুষ) শরীরে বর্তমান থাকলেও শরীরাভিমান না থাকায় অশরীর, অমৃত, প্রাণস্বরূপ (প্রাণের প্রাণ, পরমাত্মা), ব্রহ্মস্বরূপ, তেজস্বরূপই হয়ে থাকেন।"

তাঁর স্বদৃষ্টিতে তখন স্বীয় শরীর জগদাদি সমস্ত পদার্থই বাধিত হয়ে পড়ে। ভেদক উপাধি বিনষ্ট হওয়ায় তিনি তখন শুদ্ধ জলে মিলিত শুদ্ধ জলের ন্যায় নিত্যশুদ্ধবুদ্ধ পরমানন্দস্বরূপ ব্রহ্মই হয়ে পড়েন। অর্থাৎ যে বিদ্বানের উপাধিকৃত ভেদদর্শন নষ্ট হয়ে গিয়েছে এবং যিনি বিশুদ্ধ বিজ্ঞানঘন একরস অদ্বিতীয় আত্মাকেই কেবল দর্শন করেন, সেই মননশীল অর্থাৎ জ্ঞানীর আত্মার স্বরূপ কি হয়?

যথোদকং শুদ্ধে শুদ্ধমাসিক্তং তাদৃগেব ভবতি এবং মুনের্বিজানত আত্মা ভবতি গৌতম ৷৷-(কঠ উপনিষৎ ২।১।১৫)

যেইরূপ শুদ্ধ অর্থাৎ নির্মল উদকে (জলে) প্রক্ষিপ্ত নির্মল জল একরসই হয় অর্থাৎ অন্যপ্রকার হয় না কিন্তু তদ্রূপই হয়, সেইরূপ হে গৌতম! আত্মৈকদর্শী জ্ঞানীর আত্মাও ঠিক এইরূপই হয়।

আর 'স্থিতপ্রজ্ঞস্য কা ভাষা'-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-/৫৪) "স্থিতপ্রজ্ঞের লক্ষণ কি"? ইত্যাদি স্মৃতিতেও স্থিতপ্রজ্ঞের লক্ষণসকলের বর্ণনা করতে গিয়ে জীবন্মুক্তের কথায় বর্ণিত হয়েছে। তাছাড়া এটা বলা বাহুল্য যে, ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ গীতায় স্থিতপ্রজ্ঞ, গুণাতীত, ভগবৎভক্ত প্রভৃতির নামে জীবন্মুক্তেরই লক্ষণ তুলে ধরেছেন। যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণের বশিষ্ঠরাম সংবাদের উৎপত্তি প্রকরণে বর্ণিত আছে

নোদেতি নাস্তমায়াতি সুখে দুঃখে মুখপ্রভা।

যথাপ্রাপ্তে স্থিতির্যস্য জীবন্মুক্ত উচ্যতে।"

-(যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণ, উৎপত্তিপ্রকরণ, /)

যিনি সুখপ্রাপ্তিতে হর্ষ, দুঃখের দ্বারা দৈন্যপ্রাপ্ত হন না, যাঁর যদৃচ্ছালব্ধ বস্তুতেই দেহযাত্রা নির্বাহ হয় তাঁকেই জীবন্মুক্ত বলা হয়।

ভগবান্ দত্তাত্রেয় জীবন্মুক্তি গীতায় বলেছেন

জীবঃ শিবঃ সর্বমেব ভূতেষ্বেবং ভূতে ভূতে ব্যবস্থিতঃ।এবমেবাভিপশ্যন্ হি এবমেব পশ্যতি যো জীবন্মুক্তঃ উচ্যতে। এবং ব্রহ্ম জগৎসর্বমখিলং ভাসতে রবিঃ। সংস্থিতং সর্বভূতানাং জীবন্মুক্তঃ উচ্যতে। একধা বহুধা চৈব দৃশ্যতে জলচন্দ্রবৎ। আত্মজ্ঞানী তথৈবৈকো জীবন্মুক্তঃ উচ্যতে। সর্বভূতে স্থিতং ব্রহ্ম ভেদাভেদো বিদ্যতে। একমেবাভিপশ্যংশ্চ পশ্যতি জীবন্মুক্তঃ উচ্যতে। -(জীবন্মুক্তি গীতা- -)

অর্থাৎ এই যে জীব, ইনিই শিব। ইনি সর্বভূতে বিরাজমান। ইনি সর্বব্যাপী। এই জীবনে এই জীবকে যিনি এইভাবে দেখতে পেরেছেন, তিনিই জীবন্মুক্ত। অর্থাৎ গগনে রবির উদয়ে বিশ্বচরাচর প্রকাশিত হয়। সেইভাবেই চৈতন্যস্বরূপ পরমাত্মা পরব্রহ্ম জগতের প্রতিটি বস্তুর মধ্যে বিরাজ করে ব্রহ্মাণ্ডকে প্রকাশ করছেন। এইরকম জ্ঞানলাভ করে যিনি জ্ঞানী হতে পেরেছেন তাঁকেই বলা যায় জীবন্মুক্ত। অর্থাৎ আকাশের বুকে একটি মাত্র চাঁদ স্নিগ্ধ কিরণ নিয়ে ভাসমান। স্রোতের মালা নিয়ে জলে সেই এক চাঁদকে অনেক, অনেক রূপে দেখা যায়। সেই রকম এক পরমাত্মা প্রতিটি জীবের বুদ্ধিতে এক-একভাবে প্রকাশিত। এইরকম আত্মজ্ঞানীই জীবন্মুক্ত বলে অভিহিত হন। অর্থাৎ সমুদয় জীবের অন্তঃকরণেই সেই এক ব্রহ্ম বিরাজ করছেন। স্থাবর-জঙ্গম ভেদে জীবদেহ পৃথক পৃথক হলেও, তিনিই সেই এক। তার মধ্যে ভেদও নেই, অভেদও নেই। এইরকম জ্ঞানে যিনি জ্ঞানী হতে পেরেছেন, তিনিই জীবন্মুক্ত।

অষ্টাবক্র মুনি অষ্টাবক্র-গীতার শান্তিশতকম্ প্রকরণে বলছেন

কৃত্যং কিমপি নৈবাস্তি কাপি হৃদিরঞ্জনা।

যথা জীবনমেবেহ জীবন্মুক্তস্য যোগিনঃ।।১৩।।

অর্থাৎ জীবন্মুক্ত জ্ঞানীর সঙ্কল্পবশে কিছুই করার নেই। তাঁর মনেও কোন বিষয়ের প্রতি বিন্দুমাত্রও অনুরাগ হয় না। কারণ আসক্তির হেতু অবিদ্যা তাঁর বিনষ্ট হয়ে গেছে। তথাপি জীবনহেতু অদৃষ্ট অর্থাৎ প্রারব্ধ অনুসারেই তাঁর সর্ব কর্ম সম্পন্ন হয়ে থাকে।.......

তথ্যসূত্রঃ-

. আচার্য বিদ্যারণ্য স্বামী প্রণীত জীবন্মুক্তিবিবেকঃ, স্বামী অলোকানন্দ অনূদিত, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।

. কঠোপনিষৎ, শাঙ্করভাষ্য, স্বামী জুষ্টানন্দ অনূদিত, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।

. গীতা সংগ্রহ, গ্রন্থিক সংস্করণ।

. বৃহদারণ্যকোপনিষদ্, শাঙ্করভাষ্য আনন্দ গিরি টীকা, মহামহোপাধ্যায় দুর্গাচরণ সাংখ্যবেদান্ততীর্থ অনূদিত, দেব সাহিত্য কুটীর।

. অষ্টাবক্র গীতা, স্বামী ধীরেশানন্দ অনূদিত, উদ্বোধন কার্যালয় কলকাতা।

শ্রীশুভ চৌধুরী

মে ৩১, ২০২৬ খৃষ্টাব্দ। See less

Tuesday, 5 May 2026

ব্রহ্মানুচিন্তনম্ বা আত্মচিন্তনম্ বা মহাবাক্যসিদ্ধান্তস্তোত্রম্

 


অহমেব পরং ব্রহ্ম বাসুদেবাখ্যমব্যয়ম্

ইতি স্যান্নিশ্চিতো মুক্তো বদ্ধ এবান্যথা ভবেৎ ||||

অনুবাদ - "আমিই সেই অবিনাশী বাসুদেবস্বরূপ পরব্রহ্ম" এইরূপ নিশ্চয়াত্মিক বুদ্ধি যার হয়েছে, তিনিই মুক্ত, যার এইরূপ বুদ্ধি হয় নাই, সেই বদ্ধ ||||

অহমেব পরং ব্রহ্ম নিশ্চিতং চিত্ত চিন্ত্যতাম্

চিদ্রূপত্বাদসঙ্গত্বাদবাধ্যত্বাৎ প্রযত্নতঃ ||||

অনুবাদ - যেহেতু, আমি চিদ্রূপ, অসঙ্গ এবং অবাধিত অর্থাৎ অবিনাশী, এইহেতু আমি নিশ্চয়ই পরব্রহ্মস্বরূপ-হে চিত্ত! তুমি যত্নসহকারে এইরূপ চিন্তা কর ||||

অহমেব পরং ব্রহ্ম চাহং ব্রহ্মণঃ পৃথক্

ইত্যেবং সমুপাসীত ব্রাহ্মণো ব্রহ্মণি স্থিতঃ ||||

অনুবাদ - "আমিই পরম ব্রহ্ম, আমি ব্রহ্ম হতে পৃথক্ নই" ব্রহ্মধারণায় স্থিত ব্রাহ্মণ এইরূপেই সর্বদা ব্রহ্মোপাসনা করবেন ||||

সর্বোপাধিবিনির্মুক্তং চৈতন্যং নিরন্তরম্

তদ্ব্রহ্মাহমিতি জ্ঞাত্বা কথং বর্ণাশ্রমী ভবেৎ ||||

অনুবাদ - "সকলপ্রকার উপাধিবর্জিত এবং চৈতন্যমাত্রস্বরূপ যে ব্রহ্ম, সেই ব্রহ্মই আমি" এইরূপ যিনি জানেন, তিনি কিরূপে বর্ণাশ্রমধৰ্মাভিমানী হতে পারেন? ||||

অহং ব্রহ্মাস্মি যো বেদ সর্বং ভবতি ত্বিদম্

নাভূত্যা ঈশতে দেবাস্তেষামাত্মা ভবেদ্ধি সঃ ||||

অনুবাদ - যিনি জানেন 'আমিই ব্রহ্ম' তিনি এই সমুদায়স্বরূপ হয়ে থাকেন। দেবগণ তাদের বিভূতিদ্বারা তার উপর প্রভুত্ব করতে পারেন না; কারণ, তিনি দেবগণেরও আত্মস্বরূপ ||||

অন্যোঽসাবহমন্যোঽস্মীত্যুপাস্তে যোঽন্যদেবতাম্

বেদ নরো ব্রহ্ম দেবানাং যথা পশুঃ ||||

অনুবাদ - "আমার উপাস্য দেবতা অন্য এবং আমি অন্য" এইরূপে যে অন্য দেবতাকে উপাসনা করে, সে ব্রহ্মকে জানে না। সে দেবতাদের পশুই হয়ে থাকে ||||

অহমাত্মা চান্যোঽস্মি ব্রহ্মৈবাহং শোকভাক্

সচ্চিদানন্দরূপোঽহং নিত্যমুক্তস্বভাববান্ ||||

অনুবাদ - আমি আত্মাই, দেহাদি অন্য কিছু নই। আমি ব্রহ্ম স্বরূপই; অতএব, আমি শোকভাগী হই না। আমি সর্বদাই মুক্তস্বভাব এবং সচ্চিদানন্দস্বরূপ ||||

আত্মানং সততং ব্রহ্ম সম্ভাব্য বিহরন্তি যে

তেষাং দুষ্কৃতং কিঞ্চিদ্দুষ্কৃতোত্থা চাপদঃ ||||

অনুবাদ - যারা সর্বদা আত্মাতে ব্রহ্মভাবনা করতঃ বিহার করেন, তাদের কোনও পাপ হয় না, অতএব পাপনিমিত্ত আপৎপ্রাপ্তিও তাদের হয় না ||||

আত্মানং সততং ব্রহ্ম সম্ভাব্য বিহরেৎ সুখম্

ক্ষণং ব্রহ্মাহমস্মীতি যঃ কুর্যাদাত্মচিন্তনম্ ||||

তন্মহাপাতকং হন্তি তমঃ সূর্যোদয়ো যথা

অজ্ঞানাদ্ব্রহ্মণো জ্ঞাতমাত্মাকাশং বুদ্বুদোপমম্ ||১০||

আকাশাদ্বায়ুরুৎপন্নো বায়োস্তেজস্ততঃ পয়ঃ

অদ্ভ্যশ্চ পৃথিবী জাতা ততো ব্রীহিযবাদিকম্ ||১১||

অনুবাদ - সর্বদা আত্মাকে ব্রহ্মরূপে চিন্তা করতঃ সুখে বিচরণ করবে। 'আমি ব্রহ্ম' এই রূপে যে ক্ষণকালও আত্মাচিন্তা করা হয়, সেই ক্ষণকালের ভাবনাই সূর্য্যোদয় যেরূপ অন্ধকার নাশ করে, সেইরূপ মহাপাতক নাশ করে থাকে। ব্রহ্মাশ্রিতা এবং ব্রহ্মবিষয়া মায়া হতে বুদ্বুদোপম আকাশ উৎপন্ন হয়ে থাকে, আকাশ হতে বায়ু উৎপন্ন হয়ে থাকে, বায়ু হতে তেজ, তেজ হতে জল, জল হতে পৃথিবী এবং পৃথিবী হতে ব্রীহিযবাদি উৎপন্ন হয়ে থাকে ||-১১||

পৃথিব্যপ্সু পয়ো বহ্নৌ বহ্নির্বায়ৌ নভস্যসৌ

নভোঽপ্যব্যাকৃতে তচ্চ শুদ্ধে শুদ্ধোঽস্ম্যহং হরিঃ ||১২||

অনুবাদ - পৃথিবী জলে স্থিত, জল বহ্নিতে, বহ্নি বায়ুতে, বায়ু আকাশে, আকাশ অব্যাকৃতে এবং অব্যাকৃত শুদ্ধ ব্রহ্মে স্থিত। আমিই সেই শুদ্ধচৈতন্যস্বরূপ শ্রীহরি ||১২||

অহং বিষ্ণুরহং বিষ্ণুরহং বিষ্ণুরহং হরিঃ

কর্তৃভোক্ত্রাদিকং সর্বং তদবিদ্যোত্থমেব ||১৩||

অনুবাদ - আমিই বিষ্ণু, আমি বিষ্ণু, আমিই বিষ্ণু, এবং আমিই হরি। আর কর্তৃত্বভোক্তৃত্ব প্রকৃতি সকলই অবিদ্যাকল্পিত ||১৩||

অচ্যুতোঽহমনন্তোঽহং গোবিন্দোঽহমহং হরিঃ

আনন্দোঽহমশেষোঽহমজোঽহমমৃতোঽস্ম্যহম্ ||১৪||

অনুবাদ - আমিই অচ্যুত, আমিই অনন্ত, আমিই গোবিন্দ, আমিই হরি, আমিই আনন্দ, আমি অবিনাশী, আমি অজ এবং আমি অমৃত ||১৪||

নিত্যোঽহং নির্বিকল্পোঽহং নিরাকারোঽহমব্যয়ঃ

সচ্চিদানন্দরূপোঽহং পঞ্চকোশাতিগোঽস্ম্যহম্ ||১৫||

অনুবাদ - আমি নিত্য, আমি নির্বিকল্প, আমি নিরাকার এবং অব্যয়, আমি সচ্চিদানন্দরূপ এবং আমি পঞ্চকোশের অতীত ||১৫||

অকর্তাঽহমভোক্তাঽহমসঙ্গঃ পরমেশ্বরঃ

সদা মৎসন্নিধানেন চেষ্টতে সর্বমিন্দ্রিয়ম্ ||১৬||

অনুবাদ - আমি কর্তা কিংবা ভোক্তা নই। আমি অসঙ্গ এবং আমিই পরমেশ্বর। আমার সান্নিধ্যবশতঃই সর্বদা ইন্দ্রিয়গণ চেষ্টা করে থাকে ||১৬||

আদিমধ্যান্তমুক্তোঽহং বদ্ধোঽহং কদাচন

স্বভাবনির্মলঃ শুদ্ধঃ এবাহং সংশয়ঃ ||১৭||

অনুবাদ - আমি আদি-মধ্য এবং অন্তবর্জিত। আমি কখনও বদ্ধ নই। আমি সেই স্বভাব-নিৰ্মল শুদ্ধ চৈতন্য, এতে কোন সংশয় নাই ||১৭||

ব্রহ্মৈবাহং সংসারী মুক্তোঽহমিতি ভাবয়েৎ

অশক্নুবন্ভাবয়িতুং বাক্যমেতৎসদাঽভ্যসেৎ ||১৮||

অনুবাদ - আমি ব্রহ্মই, সংসারী নই, আমি মুক্ত-এইরূপ ভাবনা করবে। ভাবনা করতে অশক্ত হলেও সর্বদা এই বাক্যের অভ্যাস করবে ||১৮||

যদভ্যাসেন তদ্ভাবো ভবেদ্ভ্রমরকীটবৎ

অত্রাপহায় সন্দেহমভ্যসেৎকৃতনিশ্চয়ঃ ||১৯||

অনুবাদ - যার অভ্যাসে অর্থাৎ "আমি ব্রহ্মইত্যাদি যে বাক্যের অর্থ ভাবনা করতে করতে ভ্রমরধৃত কীটবৎ তৎস্বরূপতা প্রাপ্ত হওয়া যায়, সন্দেহবর্জনপূর্বক নিশ্চিতমনে এই বাক্যার্থেরই ভাবনা করবে অর্থাৎ কোন কীট যেমন ভ্রমরকর্তৃক ধৃত হয়ে ভয়ে সর্বদা ভ্রমরের চিন্তা করতঃ তদ্রূপতা প্রাপ্ত হয়, সেইরূপ সর্বদা 'অহম ব্রহ্মাস্মি' ইত্যাদি বাক্যার্থ পয্যালোচনা করতে করতে জীব ব্রহ্মরূপতা প্রাপ্ত হয়ে যায় ||১৯||

ধ্যানযোগেন মাসৈকাদ্ব্রহ্মহত্যাং ব্যপোহতি

সংবৎসরং সদাঽভ্যাসাৎসিদ্ধ্যষ্টকমবাপ্নুয়াৎ ||২০||

অনুবাদ - এক মাস এই বাক্যার্থ ভাবনা করলে ব্রহ্মহত্যা হতে মুক্ত হওয়া যায় এবং এক বৎসর ভাবনা করলে অণিমাদি অষ্টসিদ্ধি লাভ হয়ে থাকে ||২০||

যাবজ্জীবং সদাঽভ্যাসাজ্জীবন্মুক্তো ভবেদ্যতিঃ

নাহং দেহো প্রাণো নেন্দ্রিয়াণি তথৈব ||২১||

মনোঽহং বুদ্ধিশ্চ নৈব চিত্তমহঙ্কৃতিঃ

নাহং পৃথ্বী সলিলং বহ্নিস্তথাঽনিলঃ ||২২||

চাকাশো শব্দশ্চ স্পর্শস্তথা রসঃ

নাহং গন্ধো রূপং মায়াঽহং সংসৃতিঃ ||২৩||

অনুবাদ - যাবৎ জীবন উক্ত প্রকার অভ্যাস করলে যতি জীবন্মুক্ত হয়ে থাকেন। আমি দেহ নই, প্রাণ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, চিত্ত অথবা অহঙ্কার নই। আমি পৃথ্বী নই, সলিল নই, বহ্নি নই, বায়ু নই, আকাশ নই, শব্দ নই, স্পর্শ নই, রস নই, গন্ধ নই, রূপ নই, মায়া নই এবং সংসারও নই ||২১-২৩||

সদা সাক্ষিস্বরূপত্বাচ্ছিব এবাস্মি কেবলঃ

ময়্যেব সকলং জাতং ময়ি সর্বং প্রতিষ্ঠিতম্ ||২৪||

অনুবাদ - আমি সর্বদাই সাক্ষিস্বরূপ, অতএব আমি কেবল অর্থাৎ নির্বিশেষ শিবই। আমাতেই সকল উৎপন্ন হয়েছে এবং আমাতেই সকল পদার্থ প্রতিষ্ঠিত আছে ||২৫||

ময়ি সর্বং লয়ং যাতি তদ্ব্রহ্মাস্ম্যহমদ্বয়ম্

সর্বজ্ঞোঽহমনন্তোঽহং সর্বেশঃ সর্বশক্তিমান্ ||২৫||

অনুবাদ - আমাতেই সমস্ত লয়প্রাপ্ত হয়। আমি সেই অব্যয় ব্রহ্ম। আমি সর্বজ্ঞঃ, আমি অনন্ত, আমি সর্বেশ্বর এবং আমি সর্ব্বশক্তিমান ||২৫||

আনন্দঃ সত্যবোধোঽহমিতি ব্রহ্মানুচিন্তনম্

অয়ং প্রপঞ্চো মিথ্যৈব সত্যং ব্রহ্মাহমব্যয়ম্ ||২৬||

অনুবাদ - "আমি আনন্দ এবং অবাধিত জ্ঞানস্বরূপ। এই সংসার মিথ্যা। আমি সত্যস্বরূপ অদ্বৈত ব্রহ্ম"-এইরূপ চিন্তাকেই ব্রহ্মানুচিন্তন বলে ||২৬||

অত্র প্রমাণং বেদান্তা গুরবোঽনুভবস্তথা

ব্রহ্মৈবাহং সংসারী চাহং ব্রহ্মণঃ পৃথক্ ||২৭||

অনুবাদ - বিষয়ে বেদান্ত, গুরু এবং বিদ্বদনুভূতি প্রমাণ রয়েছে। আমি ব্রহ্মই, সংসারী নই এবং আমি ব্রহ্ম হতে পৃথক্ নই ||২৭||

নাহং দেহো মে দেহঃ কেবলোঽহং সনাতনঃ

একমেবাদ্বিতীয়ং বৈ ব্রহ্মণো নেহ কিঞ্চন ||২৮||

অনুবাদ - আমি দেহ নই এবং দেহও আমার নয়। আমি নির্বিশেষ এবং সনাতন। যেহেতু ব্রহ্ম এক এবং অদ্বিতীয় এবং ব্রহ্ম ভিন্ন অপর কোন পদার্থই নাই ||২৮||

হৃদয়কমলমধ্যে দীপবদ্বেদসারং

প্রণবময়মতর্ক্যং যোগিভির্ধ্যানগম্যম্

হরিগুরুশিবযোগং সর্বভূতস্থমেকং

সকৃদপি মনসা বৈ চিন্তয়েদ্যঃ মুক্তঃ ||২৯||

অনুবাদ - যিনি একবার মনে মনে হৃদয়মধ্যে দীপবৎ প্রকাশস্বরূপ বেদের একমাত্র প্রতিপাদ্য, ওঁকারময়, অতর্ক্য, যোগিগণের ধ্যানগম্য, হরি, গুরু এবং শিবস্বরূপ, সৰ্ব্বভূতে স্থিত, অদ্বৈততত্ত্বকে চিন্তা করেন-তিনি মুক্ত ||২৯||

ইতি শ্রীমদ্ শঙ্করাচার্য বিরচিতং ব্রহ্মানুচিন্তনং সমাপ্তম্

তথ্যসূত্রঃ- শিবাবতার শঙ্করাচার্য্যের গ্রন্থমালা, ৩য় খণ্ড, স্বামী চিদ্ঘনানন্দ সম্পাদিত, পঞ্চানন তর্করত্ন কর্তৃক অনুবাদ।

অদ্বৈতবেদান্তোক্ত 'অখণ্ডার্থবোধ' কাকে বলে?

  বেদ , উপনিষৎ প্রভৃতি অধ্যাত্ম শাস্ত্রমূলে যে তুরীয় ভূমা ব্রহ্মের সাক্ষাৎ অপরোক্ষ পরিচয় পাওয়া যায় , তাকে অদ্বৈতবেদান্তের ...