Sunday, 11 January 2026

হস্তামলকম্

 

শঙ্কর উবাচ।

কস্ত্বং শিশো কস্য কুতোঽসি গন্তা

কিং নাম তে ত্বং কুত আগতোঽসি।

এতদ্বদ ত্বং মম সুপ্রসিদ্ধং

মৎপ্রীতয়ে প্রীতি বিবর্ধনোঽসি ।।১।।

ভগবান্ শঙ্করাচার্য বলছেনহে শিশু! তুমি কে? কার পুত্র? কোথায় যাচ্ছ? তোমার নাম কি? কোথা থেকে আসছো? আমার প্রীতির জন্য এই প্রশ্ন কয়টির নিশ্চিত স্পষ্ট উত্তর দাও; তোমাকে দেখে আমার অতিশয় আনন্দ হচ্ছে।

হস্তামলক উবাচ।

নাহং মনুষ্যো দেব- যক্ষৌ

ব্রাহ্মণ- ক্ষত্রিয়- বৈশ্য- শূদ্রাঃ

ব্রহ্মচারী গৃহী বনস্থো

ভিক্ষুর্ন চাহং নিজবোধ রূপঃ ।।২।।

হস্তামলকাচার্য বলছেনআমি মনুষ্য, দেবতা কিংবা যক্ষ নই; ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য কিংবা শূদ্র নই; ব্রহ্মচারী, গৃহী, বানপ্রস্থী কিংবা সন্ন্যাসী নই; আমি নিজ বোধস্বরূপ (আত্মা)

নিমিত্তং মনশ্চক্ষুরাদি প্রবৃত্তৌ

নিরস্তাখিলোপাধিরাকাশকল্পঃ

রবির্লোকচেষ্টানিমিত্তং যথা যঃ

নিত্যোপলব্ধিস্বরূপোঽহমাত্মা ।।৩।।

সূর্য যেমন লোকচেষ্টার কারণ, সেরূপ যিনি মন চক্ষু প্রভৃতি ইন্দ্রিয়-গ্রামের প্রবৃত্তি-কারণ, সর্বপ্রকার উপাধিবিহীন আকাশতুল্য, আমি সেই নিত্যজ্ঞানস্বরূপ আত্মা।

যমগ্ন্যুষ্ণবন্নিত্যবোধ স্বরূপং

মনশ্চক্ষুরাদীন্যবোধাত্মকানি

প্রবর্তন্ত আশ্রিত্য নিষ্কম্পমেকং

নিত্যোপলব্ধিস্বরূপোঽহমাত্মা ।।৪।।

অগ্নির উষ্ণতার ন্যায় নিত্যজ্ঞান যাঁর স্বরূপ, যিনি নিশ্চল অদ্বিতীয়, যাঁকে আশ্রয় করে জড়প্রকৃতি মন চক্ষু প্রভৃতি ইন্দ্রিয়গণ নিজ নিজ কার্যে প্রবৃত্ত হয়, আমি সেই নিত্যজ্ঞানস্বরূপ আত্মা।

মুখাভাসকো দর্পণে দৃশ্যমানো

মুখত্বাৎ পৃথক্ত্বেন নৈবাস্তি বস্তু

চিদাভাসকো ধীষু জীবোঽপি তদ্বৎ

নিত্যোপলব্ধিস্বরূপোঽহমাত্মা ।।৫।।

দর্পণের দৃশ্যমান মুখপ্রতিবিম্ব যেমন প্রকৃত মুখ হতে পৃথক বস্তু নয়, সেরূপ বুদ্ধিদর্পণে যে আত্মপ্রতিবিম্বস্বরূপ আভাস, জীব নামে কথিত হলেও ব্রহ্ম হতে পৃথক্  নয়, আমি সেই নিত্যজ্ঞানস্বরূপ আত্মা।

যথা দর্পণাভাব আভাসহানৌ

মুখং বিদ্যতে কল্পনাহীনমেকম্

তথা ধী বিয়োগে নিরাভাসকো যঃ

নিত্যোপলব্ধিস্বরূপোঽহমাত্মা ।।৬।।

যেমন দর্পণাভাবে প্রতিবিম্বাভাব হলে দ্বিতীয়কল্পনাহীন একমাত্র মুখই থাকে, সেরূপ বুদ্ধির অভাবে যিনি আভাস-হীন হয়ে বিদ্যমান থাকেন, আমি সেই নিত্যজ্ঞানস্বরূপ আত্মা।

মনশ্চক্ষুরাদের্বিযুক্তঃ স্বযং যো

মনশ্চক্ষুরাদের্মনশ্চক্ষুরাদিঃ

মনশ্চক্ষুরাদেরগম্যস্বরূপঃ

নিত্যোপলব্ধিস্বরূপোঽহমাত্মা ।।৭।।

স্বয়ং মন চক্ষু প্রভৃতি ইন্দ্রিয়শূন্য হলেও যিনি মনের মন, চক্ষুর চক্ষু এবং মন চক্ষু প্রভৃতি ইন্দ্রিয়গণের অগম্য, আমি সেই নিত্যজ্ঞানস্বরূপ আত্মা।

একো বিভাতি স্বতঃ শুদ্ধচেতাঃ

প্রকাশস্বরূপোঽপি নানেব ধীষু।

শরাবোদকস্থো যথা ভানুরেকঃ

নিত্যোপলব্ধিস্বরূপোঽহমাত্মা ।।৮।।

যে অদ্বিতীয় পদার্থ স্বতঃশুদ্ধ চৈতন্যরূপে স্বয়ং প্রকাশিত হন, শরাবস্থিত জলে প্রতিবিম্বিত সূর্যের ন্যায় যে প্রকাশস্বরূপ পদার্থ নানা বুদ্ধিতে নানারূপে প্রতীয়মান হয়ে থাকেন, আমি সেই নিত্যজ্ঞানস্বরূপ আত্মা।

যথাঽনেকচক্ষুঃ- প্রকাশো রবির্ন

ক্রমেণ প্রকাশীকরোতি প্রকাশ্যম্

অনেকা ধিয়ো যস্তথৈকঃ প্রবোধঃ

নিত্যোপলব্ধিস্বরূপোঽহমাত্মা ।।৯।।

বহুচক্ষুঃপ্রকাশক সূর্য যেমন যুগপৎ সমস্ত বহির্বস্তুকে প্রকাশিত করেন (ক্রমে নয়), তেমনই যে অদ্বিতীয় চিৎস্বরূপ একদা বহুবুদ্ধি প্রকাশিত বা উদ্ভাসিত করেন, আমি সেই নিত্যজ্ঞানস্বরূপ আত্মা।

বিবস্বৎ প্রভাতং যথা রূপমক্ষং

প্রগৃহ্ণাতি নাভাতমেবং বিবস্বান্

যদাভাত আভাসয়ত্যক্ষমেকঃ

নিত্যোপলব্ধিস্বরূপোঽহমাত্মা ।।১০।।

যে প্রকার সূর্যালোকে প্রকাশিত রূপকে চক্ষুরিন্দ্রিয় গ্রহণ করে, অপ্রকাশিত রূপকে গ্রহণ করতে পারে না, সেই একই সূর্য সেই প্রকার যাঁর দ্বারা প্রকাশিত হয়ে চক্ষুরিন্দ্রিয়ের প্রকাশকত্ব সাধন করে থাকেন, আমি সেই নিত্যজ্ঞানস্বরূপ আত্মা।

যথা সূর্য একোঽপ্স্বনেকশ্চলাসু

স্থিরাস্বপ্যনন্যদ্বিভাব্যস্বরূপঃ

চলাসু প্রভিন্নঃ সুধীষ্বেক এব

নিত্যোপলব্ধিস্বরূপোঽহমাত্মা ।।১১।।

প্রকৃতপক্ষে জলের সাথে মিলিত না হয়েও সূর্য যেমন চঞ্চল জলে এবং স্থির জলে (প্রতিবিম্বিতরূপে) অনেক বলে প্রতিভাত হন, কিন্তু স্বরূপতঃ (আকাশে) একরূপেই বিরাজমান থাকেন, সেরূপ যিনি এক হয়েও বিভিন্ন চঞ্চল বুদ্ধিসমূহের সাথে সম্বন্ধশূন্য থেকে (প্রতিবিম্ববৎ) বহুরূপে প্রতীয়মান হন,— আমি সেই নিত্যজ্ঞানস্বরূপ আত্মা।

ঘনচ্ছন্নদৃষ্টির্ঘনচ্ছন্নমর্কম্

যথা নিষ্প্রভং মন্যতে চাতিমূঢঃ

তথা বদ্ধবদ্ভাতি যো মূঢ- দৃষ্টেঃ

নিত্যোপলব্ধিস্বরূপোঽহমাত্মা ।।১২।।

অতি মূঢ় ব্যক্তি যেমন তার দৃষ্টি মেঘের দ্বারা রুদ্ধ হলে সূর্যকে মেঘাচ্ছন্ন প্রভাহীন মনে করে, সেরূপ যিনি মূঢ়দৃষ্টি ব্যক্তির নিকট বদ্ধের ন্যায় প্রতিভাত হন, আমি সেই নিত্যজ্ঞানস্বরূপ আত্মা।

সমস্তেষু বস্তুষ্বনুস্যূতমেকং

সমস্তানি বস্তূনি যন্ন স্পৃশন্তি

বিয়দ্বৎসদা শুদ্ধমচ্ছস্বরূপং

নিত্যোপলব্ধিস্বরূপোঽহমাত্মা ।।১৩।।

একমাত্র যে বস্তু সমস্ত বুস্তুতে অনুবিদ্ধ, সমস্ত বস্তুই যাঁকে স্পর্শ করতে পারেনা, যে বস্তু আকাশের ন্যায় সর্বদা শুদ্ধ স্বচ্ছস্বরূপ, আমি সেই নিত্যজ্ঞানস্বরূপ আত্মা।

উপাধৌ যথা ভেদতা সন্মণীনাং

তথা ভেদতা বুদ্ধিভেদেষু তেঽপি

যথা চন্দ্রিকাণাং জলে চঞ্চলত্বং

তথা চঞ্চলত্বং তবাপীহ বিষ্ণো ।।১৪।।

বিশুদ্ধ স্ফটিকাদি মণি যেমন ভিন্নবর্ণ বস্তুর সন্নিধানে (রঞ্জিত হয়ে) বিভিন্ন বলে বোধ হয়, সেরূপ ভিন্ন ভিন্ন বুদ্ধি দ্বারা তোমারও ভেদ (কম্পিত) হয়। যেমন জলে চন্দ্রকিরণের চঞ্চলতা, সেরূপ বুদ্ধিভেদেহে সর্বব্যাপী! তোমারও চাঞ্চল্য প্রতীত হয়ে থাকে।

।।ইতি হস্তামলকম্ সম্পূর্ণম্ ।।

শ্রীশুভ চৌধুরী

অক্টোবর ২২, ২০২৫ খৃষ্টাব্দ।

তথ্যসূত্রঃ- শিবাবতার শঙ্করাচার্যের গ্রন্থমালা, দ্বিতীয় খণ্ড, পণ্ডিতপ্রবর পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত।

Photo editing credit Thākur Vishāl

আচার্য জ্ঞানোত্তম—

 


জগদ্গুরু শ্রী শ্রী জ্ঞানোত্তমাচার্য শৃঙ্গেরি শারদাপীঠের মঠাধীশ (৯১০-৯৫৪ খৃষ্টাব্দ) ছিলেন। প্রাচীন কুম্ভকোণম্ (কাঞ্চী) মঠের গুরু পরম্পরাতেও আচার্যের নাম পাওয়া যায়। তৎকালীন ভারতের চোল প্রদেশের মঙ্গল নামক গ্রামে আচার্য আবির্ভূত হন। তাঁর পিতার নাম নাগেশ। জ্ঞানোত্তমাচার্য একজন মহান দার্শনিক তার্কিক ছিলেন। তিনি তৎকালীন অদ্বৈত বিরোধী অসংখ্য দার্শনিক মতকে খণ্ডন করে অদ্বৈতবেদান্তের শ্রীবৃদ্ধি সম্পাদন করেন। শ্রী সুরেশ্বরাচার্যের নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধির উপর 'চন্দ্রিকা' নামে একটি অপূর্ব টীকা রচনা করে তিনি পণ্ডিত সমাজে সমাদৃত হন। তিনি তাঁর চন্দ্রিকা টীকাতে তাঁর গুরু শ্রী সত্যবোধ এবং পরমগুরু শ্রী সর্বজ্ঞাত্ম মুনির কথা বলেছেন। তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ রচনা "বিদ্যা শ্রী" ভগবান্ শঙ্করাচার্যের ব্রহ্মসূত্র ভাষ্যের অতি উপাদেয় টীকা হিসেবে পরিচিত। তাছাড়া তিনি ব্রহ্মসিদ্ধির উপর "বেদান্তন্যায়সুধা" টীকা  "জ্ঞানসিদ্ধি" নামক গ্রন্থ রচনা করে অদ্বৈতবেদান্তের বিশেষ পুষ্টি সাধন করেন।

আচার্য সর্বদা চন্দ্রমৌলীশ্বরের ধ্যান করতেন। ভগবান্ শিবের ধ্যানে তন্ময় হয়ে থাকতেন তিনি। অনেকের মতে তিনি মূলতঃ গৌড় (বাংলা) থেকে এসেছিলেন এবং পরবর্তীকালে তাঁর পূর্বাশ্রমের সময় দক্ষিণ ভারতে বসতি স্থাপন করেছিলেন, তাই তিনি শ্রী গৌড়েশ্বরাচার্য নামেও পরিচিত। জ্ঞানোত্তমাচার্যের বিশিষ্ট শিষ্যদের মধ্যে দুইজন বিখ্যাত ছিলেন, একজন বিজ্ঞানাশ্রম নামে বিশ্রুত, আরেকজন প্রখ্যাত দার্শনিক চিৎসুখাচার্য, যিনি তাঁর প্রসিদ্ধ অদ্বৈত গ্রন্থ "তত্ত্ব-প্রদীপিকা" (চিৎসুখী) এর জন্য বিখ্যাত। এই গ্রন্থে, চিৎসুখ শ্রদ্ধার সাথে তাঁর গুরু জ্ঞানোত্তমকে ভগবান্ দক্ষিণামূর্তি, ব্যাস এবং শঙ্করের উজ্জ্বল মূর্ত প্রকাশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

জ্ঞানানাম্ উত্তমং জ্ঞানং জ্ঞানিনাম্ উত্তমঃ যতঃ। 

জ্ঞানোত্তম ইতি খ্যাতং গুরুম্ তম্ অহম্ আশ্রয়ে।।

সকল জ্ঞানের মধ্যে যে জ্ঞান সর্বোত্তম, এবং জ্ঞানীদের মধ্যে যিনি সর্বশ্রেষ্ঠযিনিজ্ঞানোত্তমনামে খ্যাত, সেই গুরুকেই আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি।......

তথ্যসূত্রঃ-

. "অদ্বৈতসিদ্ধি মধুসূদন সরস্বতী", শ্রী ব্যোমকেশ ভট্টাচার্য, ভাগবতরত্ন।

. অদ্বৈতসিদ্ধিঃ, প্রথমভাগ, যোগেন্দ্রনাথ তর্কসাংখ্যবেদান্ততীর্থ পরিশোধিতা, তৎকৃতটীকা, বঙ্গানুবাদ, তাৎপর্যসমেতা।

.https://www.sringeri.net/jagadgurus/the-early-acharyas

. https://www.kamakoti.org/peeth/origin.html

শ্রীশুভ চৌধুরী

জানুয়ারি , ২০২৬ খৃষ্টাব্দ।

Photo editing credit Thākur Vishāl

আচার্য রঙ্গরাজাধ্বরি—

 


আচার্য রঙ্গরাজাধ্বরি অদ্বৈতবেদান্তের আরেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি প্রসিদ্ধ আচার্য অপ্পয় দীক্ষিতের পিতা ছিলেন। কাঞ্চী নগরী ছিল এই দুই রত্নের বাসভূমি। কাঞ্চী সর্বদা পণ্ডিতের আকর। কাঞ্চীর নিকটবর্তী 'অড়য়প্পন' নামক গ্রামে দীক্ষিত পরিবার বাস করতেন। রঙ্গরাজাধ্বরির পিতার নাম ছিল আচার্য দীক্ষিত বা বক্ষঃস্থলাচার্য। আচার্য দীক্ষিত নানারকম যজ্ঞ সম্পন্ন করেছিলেন বলে দীক্ষিত উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। রঙ্গরাজ বিজয়নগরের রাজা শ্রীকৃষ্ণদেবের সমসাময়িক ছিলেন। কৃষ্ণদেব ১৫০৯ খৃষ্টাব্দ থেকে ১৫৩০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত বিজয়নগরের রাজা ছিলেন; সুতরাং রঙ্গরাজের স্থিতিকাল খৃষ্টীয় ষোড়শ শতকের প্রথম ভাগ বলে নির্ণয় করা যায়।

রঙ্গরাজ বিভিন্ন শাস্ত্রে অসামান্য পাণ্ডিত্য লাভ করেছিলেন এবং ন্যায়, বৈশেষিক, সাংখ্য প্রভৃতি বিভিন্ন দার্শনিক মতের খণ্ডনে এবং অদ্বৈতসিদ্ধান্ত স্থাপনে অলোকসামান্য মনীষার পরিচয় প্রদান করেছেন। এইরূপ পাণ্ডিত্য বড়ই বিরল। রঙ্গরাজ "অদ্বৈতবিদ্যামুকুর" পঞ্চপাদিকা বিবরণের উপর "পঞ্চপাদিকা-বিবরণ-দর্পণ" নামের টীকা রচনা করে অদ্বৈতবেদান্তের শ্রীবৃদ্ধি সম্পাদন করেন। তাঁর অতিমানুষ প্রতিভা অসাধারণ বিদ্যাবত্তা স্বীয় পুত্র অপ্পয় দীক্ষিতের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করেছিল। অপ্পয় দীক্ষিত পিতার নিকটই শিক্ষা লাভ করে ব্যাকরণ, অলঙ্কার, ন্যায়, মীমাংসা প্রভৃতি শাস্ত্রে অসামান্য পাণ্ডিত্য অর্জন করেন এবং অদ্বৈতবেদান্তে দীক্ষা লাভ করেন। রঙ্গরাজই অপ্পয় দীক্ষিতের বিভিন্ন শাস্ত্রে সর্বাতিশায়ী পাণ্ডিত্যের মূল প্রস্রবণ। অপ্পয় দীক্ষিত ন্যায়রক্ষামণির প্রারম্ভে এবং বেদান্তকল্পতরু পরিমলের প্রথম পাদের সমাপ্তিতে উচ্ছ্বসিত ভাষায় তদীয় পিতৃদেবের বিভিন্ন শাস্ত্রে অলোকসামান্য বিদ্যাবত্তার সর্বতোমুখী প্রতিভার প্রশংসা করেছেন।

যং ব্রহ্ম নিশ্চিতধিয়ঃ প্রবদন্তি সাক্ষাৎ তদ্দর্শনাদখিলদর্শনপারভাজম্ তং সর্ববেদসমশেষবুধাদিরাজং শ্রীরঙ্গরাজমখিলং গুরুমানতোঽস্মি।

— (ন্যায়রক্ষামণির প্রারম্ভ শ্লোক)

তাছাড়া অপ্পয় দীক্ষিত "সিদ্ধান্তলেশ-সংগ্রহে" অদ্বৈতবিদ্যাকার বলে তদীয় পিতৃদেবের অদ্বৈতবিদ্যামুকুরের বিষয় উল্লেখ করেছেন এবং সিদ্ধান্ত স্থাপনে স্বীয় পিতৃদেবের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। রঙ্গরাজের পৌত্র নীলকণ্ঠ দীক্ষিতও তদীয় "নলচরিতে" রঙ্গরাজের গ্রন্থের বিষয় উল্লেখ করেছেন।

তথ্যসূত্রঃ- "বেদান্তদর্শনঅদ্বৈতবাদ", প্রথম খণ্ড, আশুতোষ ভট্টাচার্য শাস্ত্রী।

শ্রীশুভ চৌধুরী

নভেম্বর ২৩, ২০২৫ খৃষ্টাব্দ।

Photo editing credit Thākur Vishāl

ব্রজের গূঢ়লীলা—

 


প্রশ্ন এইআত্মা নির্গুণ, ভোগবর্জিত অর্থাৎ সুখ দুঃখ তাঁর নেই, বাসুদেব যদি আত্মস্বরূপ হয়ে থাকেন, তাহলে বিবিধ ছলচাতুরী পরস্ত্রীগণের সহিত ক্রীড়া করছেন কেন?

তদুত্তরে ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য প্রবোধসুধাকরে বলেছেনঅভিনবরূপসম্পন্ন সুন্দর শ্রীকৃষ্ণ দর্শনে গোপিকাগণ মনে মনে তাঁর অভিলাষিণী হয়ে মদনজন্য বিরহব্যথা প্রাপ্ত হয়েছিলেন। অর্থাৎ ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ ভোগার্থে কোন প্রযত্ন করেন নি। গমন, অবস্থান, গৃহকর্মপরায়ণতা এবং ভোজন সবসময়ই তাঁরা শ্রীকৃষ্ণ ব্যতীত অপর বিষয় সম্মুখে থাকলেও কখনোই গ্রহণ করতে পারতেন না। গোপরমণী যে কার্যই করুন না কেন, মন তাঁদের সর্বদা কৃষ্ণময়ই হয়ে থাকত। সম্মুখে স্থিত বস্তুকেও কৃষ্ণরূপে দর্শন করতেন। এই অসামান্য সাধনায় ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের প্রতি অনুগ্রহ করেছিলেন। সর্বত্র কৃষ্ণদর্শনপরায়ণা গোপীগণের এই প্রেমভাব ভোগ বা আসক্তির পরিচয় নয় বরংচ যোগ বা আত্মদৃষ্টিতে সমদর্শিতার পরিচয়।

দুঃসহ বিরহজনিত ভ্রমে গোপীগণ নিজ নিজ পতি‌, তরু মানব পশুদের 'ইনি শ্রীকৃষ্ণ'— এইরূপে দর্শন করেছিলেন, অসীমপ্রীতিবশে সসম্ভ্রমে আলিঙ্গনও করেছিলেন। কোন কোন গোপী কৃষ্ণবৎ হয়ে পূতনানুকারিণী হয়ে অন্য গোপীর স্তন পান করছেন, এটা ব্যাসদেব ভাগবতে বলেছেন। কৃষ্ণের তন্ময়তাবশতঃ ব্রজরমণীগণ নিজ নিজ পতিদের কৃষ্ণাকারে দর্শন করেছিলেন। আর ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ স্বজন পরজন, পতি পত্নী সকলেরই সাক্ষাৎ অন্তর্যামী। রাসলীলায় গোপীগণের শ্রীকৃষ্ণতন্ময়ত্ব সাধনা বিবৃত হয়েছে। এইরূপ সাধনার ফলস্বরূপ যে কৃষ্ণরতিভোগ, তা প্রাকৃত সুখ নয়, তা হল যোগানন্দ লাভ।

রাসক্রীড়ায় সর্বপ্রকার চিত্তরঞ্জনের দ্বারা গোপীগণের ভক্তি উদ্রিক্তা হলে, তারা কৃষ্ণানুরাগিণী হয়ে নিজেদেরকেই কৃষ্ণ বলে জানত, কৃষ্ণের কথিতব্য কথা বলতে থাকত, এবং কেবল জগদীশ্বরের সৌন্দর্যের অনুরাগিণী হয়ে জীবাত্মা পরমাত্মায় যে অভেদ জ্ঞান, যা যোগীর যোগের এবং জ্ঞানীর জ্ঞানের চরমোদ্দেশ্য, তা প্রাপ্ত হয়ে ঈশ্বরে বিলীন হত। বিষ্ণুপুরাণে বর্ণিত আছে

"কৃষ্ণ অন্যত্র চলে গেলে গোপীগণ কৃষ্ণচেষ্টার অনুকারিণী হয়ে দলে দলে বৃন্দাবনমধ্যে ঘুরেফিরে বেড়াতে লাগল; এবং কৃষ্ণে নিরুদ্ধহৃদয়া হয়ে পরস্পরকে এরূপ বলতে লাগল, ‘আমি কৃষ্ণ, এই ললিতগতিতে গমন করছি, তোমরা আমার গমন অবলোকন কর।অন্য গোপী বলল, ‘আমি কৃষ্ণ, আমার গান শ্রবণ কর।অপর গোপী বললদুষ্ট কালিয়! এখানে থাক, আমি কৃষ্ণ,’ এবং বাহু আস্ফোটন-পূর্বক কৃষ্ণলীলার অনুকরণ করল। আর কেউ বলল, ‘হে গোপগণ! তোমরা নির্ভয়ে এখানে থাক, বৃথা বৃষ্টির ভয় কর না, আমি এখানে গোবর্ধন ধরে আছি।অন্যা কৃষ্ণলীলানুকারিণী গোপী বলল, ‘এই ধেনুককে আমি নিক্ষিপ্ত করেছি, তোমরা যদৃচ্ছাক্রমে বিচরণ কর।এরূপে সেসকল গোপী তখন নানাপ্রকার কৃষ্ণচেষ্টানুবর্তিনী হয়ে ব্যগ্রভাবে রম্য বৃন্দাবন বনে সঞ্চরণ করতে লাগল।" -(বিষ্ণুপুরাণ, পঞ্চমাংশ, ত্রয়োদশ অধ্যায়, ২৪-২৯)

যিনি বাক্য মনের অগোচর, তিনি ব্ৰহ্ম ; ব্ৰহ্মই আনন্দামৃতরূপ রস। শ্রুতি বলেছেন— "রসো বৈ সঃ" (তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-/) অর্থাৎ ব্রহ্মই রসস্বরূপ। এই রস আস্বাদনার্থই ভগবানের সৃষ্টিকাৰ্য; জীব সেই বাসনাবিদগ্ধ হয়ে, রসের পিপাসু হয়ে, ঘুরে মরছে। গোপীভাবের সাধনায় সেই রস-রতির জ্ঞান হয়, হৃদয়ে তা প্রকাশ পায়। ভগবান ভক্তের স্বরূপগত অভেদাত্মক মিলনের নামই রমণ; যোগীর এটাই সমাধি। মহাভারতের বিষ্ণুসহস্রনামের ভাষ্যে শঙ্করাচার্য বলেছেন— "নিত্য আনন্দস্বরূপ ভগবানের সহিত যোগীজন রমন করেন, সেজন্যই তিনি 'রাম' নামে অভিহিত হন।" ভগবান্ ভক্তের সহিত রমণ করবেন, ভক্তও ভগবানের সহিত রমণ করবেন। রমণ বা মিলন পরস্পরের ইচ্ছায় নয়, স্বাভাবিক। ভগবান এই প্রকারে যে নিজশক্তি বা প্রকৃতির সহিত রমণ করেন, রমণ মায়িক জগতের কেউ জানতে পারে না, —এটাই ব্রজের অমানুষী গূঢ়লীলা।.....

তথ্যসূত্রঃ-

. শিবাবতার শঙ্করাচার্যের গ্রন্থমালা, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রবোধসুধাকরঃ, পণ্ডিতপ্রবর পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত।

. বিষ্ণুপুরাণ, নবভারত পাবলিশার্স।

. ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্যের বিষ্ণুসহস্রনাম ভাষ্য।

. স্বামী নিগমানন্দ সরস্বতীর "প্রেমিকগুরু" শীর্ষক গ্রন্থ।

শ্রীশুভ চৌধুরী

রাস পূর্ণিমা, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ।

হস্তামলকম্

  শঙ্কর উবাচ। কস্ত্বং শিশো কস্য কুতোঽসি গন্তা কিং নাম তে ত্বং কুত আগতোঽসি। এতদ্বদ ত্বং মম সুপ্রসিদ্ধং মৎপ্রীতয়ে প্র...