স্থূলো মাংসময়ো দেহো সূক্ষ্মঃ স্যাদ্বাসনাময়ঃ ।
জ্ঞানকর্মেন্দ্রিয়ৈঃ
সার্ধং ধীপ্রাণৌ তচ্ছরীরগৌ ||১||
টীকা
-
নত্বা
শ্রীরামচন্দ্রাখ্যং তত্ত্বং বেদান্তগোচরম্।
কুর্বে
পুষ্পাঞ্জলিং টীকাং বাক্যবৃত্তেরবিস্তরম্ ||
ইহ
খলু ভগবান শ্রীশঙ্করাচার্যঃ চতুর্লক্ষণমীমাংসাপ্রতিপাদিতাম্
অপি ব্রহ্মবিদ্যাম্ অতিকৃপালুতয়া সংক্ষেপতঃ উপদেষ্টুকামঃ শাখাচন্দ্রন্যায়েন উপাধিস্থং ব্রহ্ম দর্শয়িতুম্ আত্মনঃ উপাধিত্রয়মধ্যে প্রথমং স্থূলোপাধিং নির্দিশতি — স্থূল ইতি। মাংসময়ঃ – মাংসাস্থিরক্তাদি
প্রধানঃ দেহঃ আত্মনঃ স্থূলোপাধিঃ
স্যাৎ। বাসনাপ্রধানঃ লিঙ্গদেহঃ সূক্ষ্মোপাধিঃ জ্ঞাতব্যঃ। ধীশব্দেন মনসঃ অপি উপলক্ষণং
প্রাণশব্দেন একস্য এব মহাপ্রাণস্য প্রাণাদয়ঃ
পঞ্চবৃত্তয়ঃ জ্ঞানেন্দ্রিয়াণি কর্মেন্দ্রিয়াণি চ, এবম্ সপ্তদশকলাত্মকং
লিঙ্গশরীরম্ আত্মনঃ দ্বিতীয়োপাধিরিত্যর্থঃ ||১||
টীকানুবাদ
- বেদান্তগোচর শ্রীরামচন্দ্রাখ্য তত্ত্বকে নমস্কার করে সংক্ষিপ্তভাবে বাক্যবৃত্তির
'পুষ্পাঞ্জলি' নামক টীকা প্রণয়ন
করছি।
ভগবান
শ্রীশঙ্করাচার্য চতুর্লক্ষণান্বিত' মীমাংসা প্রণয়ন করেও অতি কৃপাপরায়ণ
হয়ে সেই ব্রহ্মবিদ্যাকে সংক্ষিপ্তভাবে
উপদেশ করার ইচ্ছায় শাখাচন্দ্রন্যায়ের[
শাখাচন্দ্রন্যায়ঃ - একটি শিশুকে চন্দ্র
দেখানোর জন্য প্রথমে বৃক্ষশাখা
ও পরে তন্মধ্য দিয়া
প্রকাশিত চন্দ্রকে দেখানো হয়ে থাকে। একে
শাখাচন্দ্রন্যায় বলা হয়। এখানেও
সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম আত্মতত্ত্বের অধিগম নিমিত্ত প্রথমে স্থূলোপাধি পরে সুক্ষ্ম তৎপরে
কারণকে প্রদর্শন করা হচ্ছে। ] দ্বারা
উপাধিস্থ ব্রহ্মতত্ত্বকে নির্দেশ করতে আত্মার উপাধিত্রয়মধ্যে
প্রথম স্থূলোপাধিকে নির্দেশ করছেন 'স্থূল' প্রকৃতি বাক্যে। মাংসময়ঃ – মাংস, অস্থি, রক্তাদি প্রধান দেহ আত্মার স্থূল
উপাধি। বাসনাপ্রধান সূক্ষ্মশরীরকে সূক্ষ্ম উপাধিরূপে জানবে। ধী শব্দের দ্বারা
উপলক্ষণে মনকেও বুঝতে হবে। প্রাণশব্দের দ্বারা
এক মহাপ্রাণ ও এর পাঁচপ্রকার
কার্যকে বুঝাচ্ছে এবং পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয় ও পঞ্চ
কর্মেন্দ্রিয়' – এই সপ্তদশ কলাযুক্ত
সূক্ষ্মশরীর আত্মার দ্বিতীয়োপাধি ||১||
অজ্ঞানং
কারণং সাক্ষী বোধস্তেষাং বিভাসকঃ ।
বোধাভাসো
বুদ্ধিগতঃ কর্তা স্যাৎপুণ্যপাপয়োঃ ||২||
টীকা
- তৃতীয়োপাধিমাহ — অজ্ঞানমিতি। অনাদ্যনির্বাচ্যম্ অজ্ঞানম্ কারণৌপাধি স্যাৎ। যজ্জ্ঞানার্থম্ এতদুপাধিত্রয়ম্ উপক্ষিপ্তং তৎ তত্র স্থিতং
শুদ্ধব্রহ্মস্বরূপং নিরূপয়তি — সাক্ষীতি। সাক্ষাৎ ঈক্ষতে অমৌ সাক্ষী বোধঃ,
"আত্মানম্ অন্বিচ্ছন" -( জাবালোপনিষৎ, ৬; নারদপরিব্রাজকোপনিষৎ, ৩/৮৭
), "গুহাংপ্রবিষ্টম্"
-( কঠোপনিষৎ, ১/৩/১
) ইত্যাদি শ্রুতিপ্রসিদ্ধঃ পরমার্থ সত্যঃ পরমানন্দঘনঃ প্রত্যগাত্মা কূটস্থঃ। তেষাং পূর্বোক্তানাং ত্রয়াণাম্ উপাধীনাং বিভাসকঃ সত্ত্বাস্ফূর্তি প্রদত্বেন প্রকাশক ইত্যর্থঃ। এবং শুদ্ধাত্মনঃ স্বরূপমুক্তা
সংসারাভিমানবাহকস্য জীবাত্মনঃ স্বরূপমাহ — বোধাভাস ইতি। স্বরূপপ্রতিবিম্বিতঃ চিদাভাসঃ সাধিষ্ঠানঃ
পুণ্যপাপকর্মণাং কর্তা স্যাদিত্যর্থঃ ||২||
টীকানুবাদ
- তৃতীয় উপাধি সম্বন্ধে বলা হচ্ছে 'অজ্ঞানম্'
ইত্যাদি বাক্যে। এই অনাদি অনির্বাচ্য
অজ্ঞানই কারণ-উপাধি বলে
পরিচিত। যাঁর জ্ঞানের জন্য
এই উপাধিত্রয় ক্ষয় করা হয়
সেই শুদ্ধব্রহ্মস্বরূপকে 'সাক্ষী' প্রভৃতি শব্দের দ্বারা নিরূপণ করা হচ্ছে। সাক্ষাৎভাবে
দেখাবেই 'সাক্ষী' বলা হয়। 'আত্মাকে
অন্বেষণ করে', 'হৃদয়গুহায় প্রবিষ্ট অর্থাৎ অধিষ্ঠিত হও' ইত্যাদি
শ্রুতিপ্রসিদ্ধ, পরমার্থ সত্য, পরমানন্দঘন, প্রত্যগাত্মস্বরূপ, কূটস্থ আত্মাই সাক্ষী। ঐ আত্মাই পূর্বোক্ত
উপাধিত্রয়ের বিভাসক অর্থাৎ সত্ত্বাস্ফুর্তিপ্রদায়ী প্রকাশক। এইরূপে শুদ্ধ আত্মার স্বরূপ বলে সংসারাভিমানের বাহক
জীবাত্মার স্বরূপ 'বোধাভাস' প্রভৃতির দ্বারা বলছেন। এই প্রতিবিম্বিত আত্মচৈতন্য
মূলসত্ত্বার সহিত অধিষ্ঠিত হয়ে
বুদ্ধির মাধ্যমে পূণ্য পাপকর্মসমূহের কর্তা হয়ে থাকেন ||২||
স
এব সংসরেৎকর্মবশাল্লোকদ্বয়ে সদা ।
বোধাভাসাচ্ছুদ্ধবোধং
বিবিচ্যাদতিযত্নতঃ ||৩||
টীকা
- কিঞ্চ স এব জীবাত্মা
প্রারব্ধকর্মবশাৎ ইহ অমূত্র চ
সুখদুঃখভোত্তৃত্বাদিরূপং
সংসারম্ অনবরতম্ অনুভবতি, অতো বোধাভাসাৎ সংসারিণো
জীবাৎ শুদ্ধবোধং কূটস্থম্ অতিপ্রযত্নেন বিবিচ্যাৎ – পরমার্থসত্যে পরমানন্দঘনে সাক্ষিণি অবিদ্যাকল্পিতম্ উপাধিজাতং সাক্ষ্যং মিথ্যাভাসত্বাৎ নাস্তি এব, সাক্ষী এব
তু পরমার্থসত্যঃ কেবলো বিদ্যতে ইতি বিবেকদৃষ্ট্যা শুদ্ধম্
আত্মানং জানীয়াৎ ইত্যর্থঃ ||৩||
টীকানুবাদ
- আরও, সেই জীবাত্মাই প্রারব্ধকর্মবশে
ইহ ও পরলোকে সুখদুঃখভোক্তৃত্বাদিরূপ
সংসারকে সর্বদাই অনুভব করে থাকে। অতএব
বোধাভাস হতে অর্থাৎ সংসারি
জীব হতে কূটস্থ, শুদ্ধবোধস্বরূপ
আত্মাকে অতিযত্নসহকারে বিবেকবশতঃ – পরমার্থসত্য, পরমানন্দঘন, সাক্ষিস্বরূপ আত্মাতে উপাধিজাত সাক্ষ্য অবিদ্যাকল্পিত ও মিথ্যাভাসবশতঃ অস্তিত্ববিহীন,
সাক্ষিস্বরূপ পরমার্থ সত্যই কেবলমাত্র বর্তমান এইরূপ বিবেকদৃষ্টিদ্বারা শুদ্ধ আত্মাকে জানাই কর্তব্য ||৩||
জাগরস্বপ্নয়োরেব
বোধাভাসবিডম্বনা ।
সুপ্তৌ
তু তল্লয়ে বোধঃ শুদ্ধো জাড্যং
প্রকাশয়েৎ ||৪||
টীকা
- কিঞ্চ জাগ্রৎ-স্বপ্নাবস্থয়োঃ বোধাভাস-বিড়ম্বনা, চিদাভাস-ব্যবহারঃ। সুষুপ্তৌ তু চিদাভাসলয়াৎ শুদ্ধবোধঃ
কূটস্থঃ জাড্যম্ অজ্ঞানম্ প্রকাশয়েৎ, সুষুপ্তিসময়ে সর্বলয়ে অপি কূটস্থচৈতন্য নির্বিকারতয়া
তিষ্ঠতি ইত্যর্থঃ "ন হি দ্রষ্টুদৃষ্টের্বিপরিলোপো
বিদ্যতেঽবিনাশিত্বাৎ"
ইতি শ্রুতেঃ। সুপ্তোত্থিতস্য, সুখাজ্ঞানয়োঃ অনুভূয়মানয়োঃ পরামর্শদর্শনাৎ চ ||৪||
টীকানুবাদ
- আরও, জাগ্রৎ-স্বপ্নাবস্থায় জীবাত্মার কর্মবৈচিত্র্য অর্থাৎ প্রতিবিম্ব চৈতন্যের ক্রিয়া ঘটে থাকে। কিন্তু
সুষুপ্তিকালে প্রতিবিম্বিত চৈতন্যের লয়বশতঃ কূটস্থ শুদ্ধচৈতন্য জাড্য অর্থাৎ অজ্ঞানকে প্রকাশিত করে থাকে। সুষুপ্তিকালে
সমস্ত কিছুর বিলয় ঘটলেও নির্বিকার
কূটস্থচৈতন্য অবস্থান করেন, '(দ্রষ্টা) অবিনাশী বলে দ্রষ্টার দৃষ্টির
বিনাশ নাই' এইরূপ শ্রুতিতেও
পাওয়া যায়। এবং এটাও
দেখা যায় যে, সুষুপ্তি
হতে উত্থিত ব্যক্তি সুখ ও অজ্ঞানের
অনুভূতি অর্থাৎ জাগতিক সর্বপদার্থের অজ্ঞতা জ্ঞাপন করে থাকে ||৪||
জাগরেঽপি
ধিয়স্তূষ্ণীম্ভাবঃ শুদ্ধেন ভাস্যতে ।
ধীব্যাপারাশ্চ
চিদ্ভাস্যাশ্চিদাভাসেন সংযুতাঃ ||৫||
টীকা
- সম্প্রতি হস্তপ্রাপ্যমিব কূটস্থচৈতন্যং জাগ্রতি দর্শয়তি — জাগরে ইতি। জাগ্রদবস্থায়াম্ অপি
বুদ্ধেঃ তুষ্ণীম্ভাবঃ শুদ্ধেন অবিকারি-চৈতন্যেন কূটস্থেন ভাস্যতে, বৃত্তিরহিতম্ অন্তঃকরণম্ শুদ্ধচৈতন্যেন অনুভূয়তে ইত্যর্থঃ। সবৃত্তিকান্তঃকরণস্য চৈতন্যদ্বয়াবভাস্যত্বম্ আহ — ধীব্যাপারাঃ ইতি।
চিদ্ভাস্যাঃ নির্বিকার চৈতন্যভাস্যাঃ ধীব্যাপারাঃ বুদ্ধিবৃত্তয়ঃ চিদাভাসেন সংযুতাঃ ধীস্থজীবেন সহিতা ভাস্যন্তে, সবৃত্তিকম্ অন্তঃকরণং নির্বিকার-সবিকার-চৈতন্যাভ্যাম্ ভাসাতে, নির্বৃত্তিকম্ অন্তঃকরণং তু কেবলেন নির্বিকার-চৈতন্যেন একেন এব ভাস্যতে
ইত্যর্থঃ ||৫||
টীকানুবাদ
- বর্তমানে কূটস্থচৈতন্য যেন হস্তগত হয়েছে
এইরূপে দেখাচ্ছেন — জাগরে প্রভৃতি বাক্যে। জাগ্রদবস্থায়ও বুদ্ধির শান্ত অবস্থা শুদ্ধ, কূটস্থ, অবিকারি-চৈতন্য দ্বারা প্রকাশিত হয়, অর্থাৎ বৃত্তিরহিত
অন্তঃকরণ শুদ্ধচৈতন্য দ্বারা অনুভূত হয়। সবৃত্তিক অন্তঃকরণ
শুদ্ধ ও প্রতিবিম্বিত চৈতন্যদ্বয়ের
অবভাসক এটা বলার জন্য
'ধীব্যাপারসকল' ইত্যাদি বলছেন। বুদ্ধিবৃত্তির কার্যসকল প্রতিবিম্বিত চৈতন্যের সহিত সংযুক্ত হয়ে
ঘটতে থাকে। অর্থাৎ সবৃত্তিক অন্তঃকরণ নির্বিকার ও সবিকার চৈতন্যদ্বয়
দ্বারা প্রকাশিত হয় কিন্তু নির্বৃত্তিক
অন্তঃকরণ কেবলমাত্র নির্বিকার চৈতন্য দ্বারাই প্রকাশিত হয় ||৫||
বহ্নিতপ্তজলং
তাপয়ুক্তং দেহস্য তাপকম্ ।
চিদ্ভাস্যা
ধীস্তদাভাসয়ুক্তান্যং ভাসয়েত্তথা ||৬||
টীকা
- চৈতন্যদ্বয় ভাসিতেন অন্তঃকরণস্য বাহ্য পদার্থোপলব্ধিং দর্শয়তি — বহ্নিতপ্তম্ ইতি। বহ্নিতপ্তং সৎ
যথা জলং তাপযুক্তং ভবতি,
তথা চিদ্ভাস্যা কূটস্থচৈতন্যেন প্রকাশিতা বুদ্ধিঃ তদাভাসযুক্তা চিদাভাসেন প্রকাশিতা চ সতী অন্যং
ঘটাদিবিষয়ং ভাসয়েৎ। কূটস্থ-চিদাভাসচৈতন্যাভ্যাং প্রকাশিতয়া বুদ্ধ্যা ঘটাদিবিষয়ং জ্ঞানমুৎপাদ্যতে ইত্যর্থঃ ||৬||
টীকানুবাদ
- চৈতন্যদ্বয় দ্বারা উদ্ভাসিত অন্তঃকরণের বাহ্যপদার্থ উপলব্ধির প্রকার প্রদর্শনের জন্য 'বহ্নিতপ্ত' প্রভৃতি অবতারণা করছেন। বহ্নিতপ্ত হয়ে জল যেরূপ
তাপযুক্ত হয়, সেইরূপ চৈতন্যের
দ্বারা আভাসিত কূটস্থচৈতন্য দ্বারা প্রকাশিত বুদ্ধি, শুদ্ধচৈতন্যাভাসযুক্ত অর্থাৎ চৈতন্যাভাস দ্বারা প্রকাশিত হলে অন্য ঘট
প্রভৃতি বিষয়কেও প্রকাশ করে। তাৎপর্য এই
যে, আমাদের ঘটাদি বাহ্যবিষয়ের জ্ঞান শুদ্ধ চৈতন্য দ্বারা আভাসিত বুদ্ধির দ্বারা হয়ে থাকে ||৬||
রূপাদৌ
গুণদোষাদিবিকল্পা বুদ্ধিগাঃ ক্রিয়াঃ ।
তাঃ
ক্রিয়া বিষয়ৈঃ সার্ধং ভাসয়ন্তী চিতির্মতা ||৭||
টীকা
- বুদ্ধিগাঃ ক্রিয়াঃ মনোব্যাপারাঃ রূপাদৌ বিষয়ে গুণদোষাদীন্ বিকল্পয়ন্তি। তা গুণদোষাদিবিকল্পাঃ ভবন্তি রূপাদি
বিষয়ে, ইদং সমীচীনম্ ইদম্
অসমীচীনম্ ইতি কল্পনং মনোব্যাপারকৃতম্
ইত্যর্থঃ। ন তু চৈতন্যকৃতম্।
তস্য নির্বিকারত্বাৎ তাঃ ক্রিয়াঃ তান্
মনোব্যাপারান্ বিষয়ৈঃ রূপাদিভিঃ সার্বং ভাসয়ন্তী প্রকাশয়ন্তী চিতিঃ নির্বিকারা মতা। এতেন স্বয়ম্প্রকাশরূপায়াঃ
চিতেঃ অসৎ জড়-পরিচ্ছিন্নরূপৈঃ
অন্তঃকরণাদিধর্মৈঃ সবিকারতা ন সম্ভবতি ইতি
প্রতিপাদিতম্ ||৭||
টীকানুবাদ
- বুদ্ধিগত কার্যসকল অর্থাৎ মনের ক্রিয়াসমূহ রূপ
প্রভৃতি বিষয়ে গুণদোষসমূহ কল্পনা করে থাকে। সেই
গুণদোষের লক্ষণাদি রূপাদিবিষয়েতেই ঘটে থাকে, 'এটা
সমীচীন, এটা অসমীচীন' এইরূপ
কল্পনাই মনোব্যাপারকৃত – এটাই তাৎপর্য। কিন্তু
তা চৈতন্যকৃত নয়। শুদ্ধচৈতন্যের নির্বিকারত্বহেতু
বুদ্ধির ক্রিয়া সকল মনোব্যাপার রূপাদি
বিষয়ের সহিত প্রকাশিত হয়।
অতএব চৈতন্য নির্বিকার – এটাই অভিমত। ফলতঃ
স্বয়ম্প্রকাশ চৈতন্যের অসৎ, জড়-পরিচ্ছিন্ন
অন্তঃকরণাদিধর্মের দ্বারা বিকারী হওয়া সম্ভব নয়,
এটাই প্রতিপন্ন হচ্ছে ||৭||
রূপাচ্চ
গুণদোষাভ্যাং বিবিক্তা কেবলা চিতিঃ ।
সৈবানুবর্ততে
রূপরসাদীনাং বিকল্পনে ||৮||
টীকা
- কিঞ্চ সা এব চিতিঃ
কেবলা নিরূপাধিত্বাৎ স্বয়ংপ্রকাশা অপি রূপাদি বিষয়াৎ
তত্রত্যাভ্যাং গুণদোষাভ্যাং চ বিবিক্তা ভিন্না
সতী, রূপরসাদি বিষয়াণাং বিকল্পনে পৃথকত্বগ্রহণে অন্তঃকরণাদি-উপাধিবশাৎ অনুবর্ততে, ন স্বতঃ, শুদ্ধচৈতন্যস্য
বিকারাভাবাৎ ইতি ভাবঃ। তদুক্তং
যোগবাসিষ্ঠে –
"যেন শব্দং
রসং রূপং গন্ধং জানাসি
রাঘব। তমাত্মানং পরং ব্রহ্ম জানীহি
পরমেশ্বরম্ ||" ইতি।
"অত্রায়ং পুরুষঃ
স্বয়ংজ্যোতির্ভবতি"
-( বৃহদারণ্যকোপনিষৎ, ৪/৩/৯
) ইত্যাদি শ্রুতয়ঃ আত্মনঃ স্বয়ংপ্রকাশত্বং বোধয়ন্তি ইত্যর্থঃ ||৮||
টীকানুবাদ
- (এবং) সেই চৈতন্যসত্ত্বা যা
শুদ্ধ, নিরূপাধিক, স্বয়ংজ্যোতি, রূপাদিবিষয়সমূহ এবং তদীয় গুণসকল
হতে ভিন্ন রূপে অবস্থিত, তা
রূপরসাদিবিষয়ের পৃথকত্বগ্রহণ করলে অন্তঃকরণাদি উপাধিকেই
অনুসরণ করে, কিন্তু শুদ্ধচৈতন্যের
বিকাররাহিত্য হেতু, স্বভাবতই নয়। তাই যোগবাসিষ্ঠে
উক্ত হয়েছে – 'হে রাঘব! যাঁর
দ্বারা তুমি শব্দ, রস,
রূপ, গন্ধ জানছো তাকেই
পরমাত্মা, ব্রহ্ম, পরমেশ্বর বলে জানবে।' এই
প্রসঙ্গে শ্রুতি 'এই পুরুষ স্বয়ংজ্যোতি
হয়ে থাকেন' ইত্যাদি বাক্যে আত্মার স্বয়ং প্রকাশত্ব জ্ঞাপন করছেন ||৮||
ক্ষণে
ক্ষণেঽন্যথাভূতা ধীবিকল্পাশ্চিতির্ন তু ।
মুক্তাসু
সূত্রবদ্বুদ্ধিবিকল্পেষু
চিতিঃ তথা ||৯||
টীকা
- ধীবিকল্পাঃ বুদ্ধিবৃত্তয়ঃ প্রতিক্ষণম্ অন্যথাভূতাঃ পরিণামিনো দৃশ্যন্তে, চিতিঃ তু ন তথা,
কুতঃ, পরিণামাভাবাৎ আত্মচৈতন্যস্য, তদ্ এব দ্রঢ়য়তি
মুক্তাফলেষু যথা সূত্রম্ অনুস্যূতম্,
এবম্ বুদ্ধিবৃত্তিষু চিতিঃ অনবরতম্ অনুস্যূতত্বেন স্থিতা। এতেন জড়-পরিণামি-দৃশ্যেভ্যঃ বুদ্ধিবৃত্তিভ্যঃ চিদানন্দঘনম্ অপরিচ্ছিন্নং সাক্ষিস্বরূপ ভিন্নং বিদ্যতে ইতি জ্ঞেয়ম্ ||৯||
টীকানুবাদ
- চিত্তবৃত্তিসকল প্রতিমুহূর্ত পরিণামী দৃষ্ট হয়। কিন্তু চৈতন্য
পরিণামী হয় না। কিরূপে?
আত্মচৈতন্যের পরিণামের অভাবহেতু। তাই দৃঢ়ীকরণ হচ্ছে
– যেরূপ মুক্তামালার মুক্তাগুলির মধ্য দিয়া সূত্র
অনুস্যূত থাকে, সেইরূপ বুদ্ধিবৃত্তিতে চৈতন্য অবিরত অনুস্যূত থাকে। এর দ্বারা চৈতন্যঘন,
অপরিচ্ছিন্ন, সাক্ষিস্বরূপ আত্মা জড়, পরিণামী, দৃশ্য
হতে তথা বুদ্ধিবৃত্তিসমূহ হতে
ভিন্নরূপে বিদ্যমান জানা যাচ্ছে ||৯||
মুক্তাভিরাবৃতং
সূত্রং মুক্তয়োর্মধ্য ঈক্ষ্যতে ।
তথা
বৃত্তিবিকল্পৈশ্চিৎস্পষ্টা
মধ্যে বিকল্পয়োঃ ||১০||
টীকা
- তদ্ এব শুদ্ধ চৈতন্যাত্মকং
কূটস্থস্বরূপং যুগ্মেন স্পষ্টম্ উপপাদয়তি — মুক্তাভিরিতি। যথা মুক্তাভিঃ আবৃতম্
আচ্ছাদিতম্ সূত্রং মুক্তয়োঃ দ্বয়োঃ মুক্তাফলয়োঃ মধ্যে ঈক্ষতে স্পষ্টং ভাসতে প্রকাশতে, তথা বিকল্পৈঃ বুদ্ধিবৃত্তিভিঃ
আবৃতা আচ্ছাদিতা চিৎ কূটস্থচৈতন্যং বিকল্পয়োঃ
বুদ্ধিবৃত্ত্যোঃ মধ্যে স্পষ্টা সতী প্রকাশতে। তদ্
উক্তং বিদ্যারণ্যশ্রীপাদৈঃ পঞ্চদশপ্রকরণ্যাম্ –
"সন্ধয়োঽখিলবৃত্তীনামভাবাশ্চাবভাসিতাঃ।
নির্বিকারেণ
যেনাসৌ কূটস্থ ইতি চোচ্যতে ||" -( পঞ্চদশী, ৮/২১ )
অতঃ
বুদ্ধিবৃত্তিসন্ধিযু সাক্ষি-শুদ্ধ-চৈতন্যানুভবঃ ভবতি ইতি ভাবঃ
||১০||
টীকানুবাদ
- সেই শুদ্ধচৈতন্যাত্মক কূটস্থস্বরূপকে যৌথভাবে স্পষ্টীকরণ নিমিত্ত 'মুক্তাদ্বারা' প্রভৃতি বাক্যে বলছেন। যেরূপ মুক্তাদ্বারা আবৃত মালার সূত্র
মুক্তাফল দুইটির মধ্যভাগে স্পষ্টভাবে দৃষ্ট হয় তদ্রুপ বিপরীত
বুদ্ধিবৃত্তি দ্বারা আচ্ছাদিত শুদ্ধ, কূটস্থ চৈতন্যসত্তা দুইটি বৃত্তির মধ্যস্থলে প্রকাশিত থাকে। তাই শ্রীমৎবিদ্যারণ্য স্বামী
'পঞ্চদশী' প্রকরণ গ্রন্থে বলেছেন – 'বৃত্তিসমুদয় ও তাদের অভাব
- এই দুইয়ের মধ্যভাগে যা অবিকৃতভাবে প্রকাশিত
থাকে তাই কূটস্থ নামে
আখ্যায়িত'। অতএব বুদ্ধিবৃত্তির
সন্ধিস্থলে সাক্ষি-শুদ্ধচৈতন্যের অনুভব হয়ে থাকে ||১০||
নষ্টে
পূর্ববিকল্পে তু যাবদন্যস্য নোদয়ঃ
।
নির্বিকল্পকচৈতন্যং
স্পষ্টং তাবদ্বিভাসতে ||১১||
টীকা
- কিঞ্চ বুদ্ধিবৃত্তিরূপে পূর্ববিকল্পে নষ্টে সতি যাবৎ বুদ্ধিবৃত্তিরূপস্য
অন্যস্য বিকল্পস্য উদয়ঃ আবির্ভাবঃ ন
ভবতি, তাবৎ স্পষ্টং নির্বিকল্পচৈতন্যং
শুদ্ধাত্মস্বরূপং শুদ্ধ-ত্বং-পদলক্ষ্যং বিভাসতে,
নিবৃত্তিকম্ অন্তঃকরণং শুদ্ধ-চৈতন্য-রূপেণ কূটস্থেন অনুভূয়তে ইত্যর্থঃ। অতএব উক্তং – "জাগরেঽপি
ধিয়স্তুষ্ণীম্ভাবঃ শুদ্ধেন ভাস্যত" ইতি ||১১||
টীকানুবাদ
- বুদ্ধিবৃত্তিরূপ পূর্ববিকল্প নষ্ট হলে যখন
বুদ্ধিবৃত্তিরূপ অন্য বিকল্পের উদয়
হয় না, সেই মধ্যাবস্থায়
সুস্পষ্টরূপে শুদ্ধ ত্বম্ পদবাচ্য নির্বিকল্পচৈতন্য, শুদ্ধাত্মস্বরূপ প্রকাশিত হয়। অন্যভাবে বলতে
গেলে তখন বৃত্তিরহিত অন্তঃকরণ
কূটস্থ শুদ্ধচৈতন্য দ্বারা অনুভূত হয়। সুতরাং পূর্বশ্লোকেও
কথিত হয়েছে 'জাগ্রতকালেও বুদ্ধির শান্ত অবস্থা শুদ্ধচৈতন্য দ্বারা প্রতিভাত হয়' ||১১||
একদ্বিত্রিক্ষণেষ্বেবং
বিকল্পস্য নিরোধনম্ ।
ক্রমেণাভ্যস্যতাং
যত্নাদ্ব্রহ্মানুভবকাঙ্ক্ষিভিঃ
||১২||
টীকা
- এবম্ অনুভবঃ শুদ্ধান্তঃকরণৈঃ সম্পাদনীয়ঃ ইতি আহ — একেতি।
ব্রহ্মানুভবকাঙ্ক্ষিভিঃ
মুমুক্ষুভিঃ এক-দ্বি-ত্রি-ক্ষণেন এবম্ অনুক্রমেণ প্রযত্নাৎ
বিকল্পস্য অন্তঃকরণ-বৃত্তিমাত্রস্য নিরোধনম্ অভ্যস্যতাম্। অন্তঃকরণম্ নির্বৃত্তিকং কৃত্বা শুদ্ধচৈতন্য-স্বরূপানুভবঃ জ্ঞানিনা অনুভবিতুং শক্যতে ইত্যর্থঃ ||১২||
টীকানুবাদ
- পূর্বকথিত অনুভূতি শুদ্ধ অন্তঃকরণ দ্বারাই সম্পাদনীয় এইরূপে বলছেন — 'এক' প্রভৃতি বাক্যে।
মোক্ষাকাঙ্ক্ষীদের দ্বারা এক, দুই, তিন
এইরূপ ক্রমানুসারে আগত অন্তঃকরণের বৃত্তিমাত্রেরই
সযত্নে নিরোধ অভ্যাস করা উচিত। এইরূপে
অন্তঃকরণকে বৃত্তিশূন্য করে জ্ঞানী শুদ্ধচৈতন্যস্বরূপের
অনুভব করতে সমর্থ হয়
||১২||
সবিকল্পজীবোঽয়ং
ব্রহ্ম স্যান্নির্বিকল্পকম্ ।
অহং
ব্রহ্মেতি বাক্যেন সোঽয়মর্থোঽভিধীয়তে ||১৩||
টীকা
- এতৎ এব প্রতিপাদয়ন্ আহ
— সবিকল্পক জীব ইতি। গুরু-শাস্ত্র-আদি-উপদেশাৎ পূর্বম্
অয়ং সবিকল্পক-চৈতন্যরূপঃ জীবঃ জ্ঞানোপদেশসময়ে অহং
ব্রহ্মেতি মহাবাক্যানুভবেন নির্বিকল্পং শুদ্ধ-সৎ-চিৎ-আনন্দ-স্বরূপং ব্রহ্মৈব স্যাৎ, সঃ অয়ম্ উপনিষদ্ভিঃ
প্রতিপাদিতঃ অর্থঃ অস্মিন্ গ্রন্থে অভিধীয়তে, প্রতিপাদ্যতে, যথা রজ্জুসর্পঃ রজ্জু
অতিরিক্তঃ নাস্তি এবং জীবঃ অপি
ব্রহ্মব্যতিরিক্তঃ নাস্তি ইতি এবং বেদান্তমর্যাদা
ইত্যর্থঃ ||১৩||
টীকানুবাদ
- বিবিধ বিকার সমন্বিত জীব কি প্রকারে
ব্রহ্মস্বরূপতা প্রাপ্ত হয় তা প্রতিপাদন
করার জন্য 'সবিকল্পক জীব' প্রভৃতি বাক্যে
বলছেন। গুরু-শাস্ত্র প্রভৃতির
উপদেশ লাভের পূর্বে স্থিত এই সবিকল্পক জীব
জ্ঞানোপদেশবলে 'আমি ব্রহ্ম' এই
মহাবাক্য অনুভব দ্বারা নির্বিকার শুদ্ধ-সৎস্বরূপ, চিৎস্বরূপ, আনন্দস্বরূপ ব্রহ্মই হবেন – এইরূপই উপনিষদ-সমূহের দ্বারা প্রতিপন্ন অর্থ এই গ্রন্থেও
প্রতিপাদন করা হয়েছে। যেরূপ
'রজ্জুসপ' ক্ষেত্রে রজ্জু ভিন্ন সত্তা নাই তদ্রুপ জীবও
ব্রহ্মব্যতীত অন্য কিছু নয়,
এটাই বেদান্তের সার তত্ত্ব ||১৩||
সবিকল্পকচিদ্যোঽহং
ব্রহ্মৈকং নির্বিকল্পকম্ ।
স্বতঃসিদ্ধা
বিকল্পাস্তে নিরোদ্ধব্যাঃ প্রযত্নতঃ ||১৪||
টীকা
- কিঞ্চ সবিকল্পক চৈতন্যরূপঃ অপি জীবঃ নির্বৃত্তিকে
অন্তঃকরণে অভ্যাসবশাৎ কৃতে সতি, নির্বিকল্পকং
শুদ্ধবোধস্বরূপম্ একম্ অখণ্ডং ব্রহ্মৈব
ভবতি অতঃ স্বতঃ সিদ্ধাঃ
বিকল্পাঃ অন্তকরণবৃত্তয়ঃ প্রযত্নতঃ বৃত্তি-উৎপত্তি-নিরসনেন নিরোদ্ধব্যাঃ, বৃত্তিরহিতান্তঃকরণে শুদ্ধচৈতন্য স্বরূপম্ অনুভূয়তে অতঃ বৃত্তিরহিতম্ অন্তঃকরণং
কৃত্বা আত্মসুখম্ অখণ্ডম্ অনুভূয়তাম্ ইত্যর্থঃ ||১৪||
টীকানুবাদ
- সবিকার চৈতন্যস্বরূপ হয়েও জীবের অন্তঃকরণ
বৃত্তিশূন্য হলে তত্ত্বাভ্যাসবশতঃ নির্বিকার
শুদ্ধজ্ঞানস্বরূপ অখণ্ড ব্রহ্মই হবেন। অতএব স্বতঃসিদ্ধ অন্তঃকরণের
বিকারসমূহকে বৃত্তি উৎপত্তির মূল অজ্ঞানের বিনাশ
দ্বারা যত্ন সহকারে নিরোধ
সাধন কর্তব্য, এবং ঐ বৃত্তিরহিত
অন্তঃকরণে শুদ্ধচৈতন্যস্বরূপের অনুভব হয়। অতএব অন্তঃকরণকে
বৃত্তিরহিত করে অখণ্ড আত্মসুখের
অনুভব কর্তব্য ||১৪||
শক্যঃ
সর্বনিরোধেন সমাধির্যোগিনং প্রিয়ঃ ।
তদশক্তৌ
ক্ষণং রুদ্ধ্বা শ্রদ্ধালুর্ব্রহ্মতাত্মনঃ ||১৫||
টীকা
- তৎ এব উপপাদয়তি — শক্যঃ
ইতি। যদি সর্ববৃত্তিনিরোধঃ শক্যঃ
ভবেৎ তর্হি জ্ঞানিনাং বসিষ্ঠাদীনাং প্রিয়ঃ ইষ্টঃ সমাধিঃ এব স্যাৎ। অথ
তৎ অশক্তৌ সর্বদা অন্তঃকরণবৃত্তিনিরোধ অসামর্থ্যে সতি, ক্ষণং রুদ্ধা
ক্ষণমাত্রমপি বৃত্তিনিরোধং কৃত্বা আত্মনঃ ব্রহ্মতা শ্রদ্ধেয়া অনুসন্ধেয়া। তথা চ শ্রুতিঃ
–
"যদা পঞ্চাবতিষ্ঠন্তে
জ্ঞানানি মনসা সহ।
বুদ্ধিশ্চ
ন বিচেষ্টতে তামাহুঃ পরমাং গতিম্ ||
তাং
যোগমিতি মন্যন্তে স্থিরামিন্দ্রিয়ধারণাম্।
অপ্রমত্তস্তদা
ভবতি যোগো হি প্রভবাপ্যয়ৌ
||" -( কঠোপনিষৎ, ২/৩/১০-১১ ) ইতি ||১৫||
টীকানুবাদ
- পূর্ববর্ণিত তত্ত্বই বিশেষভাবে 'শক্য' প্রভৃতি এই শ্লোকে বর্ণিত
হচ্ছে। যদি চিত্তের সকল
বৃত্তির নিরোধ হয় তাহলে বসিষ্ঠ
প্রভৃতি জ্ঞানীদিগের একান্ত কাম্য সমাধি হবেই। যদি সর্বতোভাবে সর্বদা
অন্তঃকরণবৃত্তির নিরোধে অসমর্থ হয় তাহলে সাধক
অন্ততঃপক্ষে একক্ষণের জন্যও বৃত্তিনিরোধপূর্বক শ্রদ্ধাসহকারে নিজ ব্রহ্মত্বের অনুসন্ধান
করবেন। এই পক্ষে শ্রুতিতেও
কথিত আছে – 'যখন মনের সহিত
পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় আত্মাতে অবস্থান করে, বুদ্ধিও যখন
নিশ্চেষ্ট থাকে, তাকেই পরমা গতি বলা
হয়। এই ইন্দ্রিয়ের স্থিরতাই
যোগ বলে কথিত হয়।
তখন সাধকের অপ্রমত্তভাব অবলম্বনীয়, কারণ যোগ হইল
উৎপত্তি ও বিনাশশীল' ||১৫||
শ্রদ্ধালুর্ব্রহ্মতাং
স্বস্য চিন্তয়েৎ বুদ্ধিবৃত্তিভিঃ ।
বাক্যবৃত্ত্যা
যথাশক্তি জ্ঞাত্বাদ্ধাভ্যস্যতাং সদা ||১৬||
টীকা
- স্বীয়-ব্রহ্ম-সুখম্ আত্মাকারান্তঃকরণেন জানীয়াৎ ইত্যর্থঃ। এবং যথাবুদ্ধি অনুসারেণ
বাক্যবৃত্ত্যা বাক্যবৃত্তিগ্রন্থালোচনেন যৎ বা মহাবাকাবৃত্ত্যা
স্বস্য ব্রহ্মত্বং একাগ্রতয়া জ্ঞাত্বা সদা অভ্যস্যতাম্।
"আসুপ্তেরামৃতেঃ কালং
নয়ে বেদান্তচিন্তয়া।
দদ্যান্নাবসরং
কিঞ্চিৎ কামাদীনাং মনাগপি ||" ইতি বচনাৎ ||১৬||
টীকানুবাদ
- আত্মাকারাকারিত অন্তঃকরণবৃত্তি দ্বারা নিজ ব্রহ্মসুখ অনুভব
করবে। এই হেতু নিজ
সামর্থ্যানুযায়ী বাক্যবৃত্তি গ্রন্থে আলোচিত ও নিরূপিত মহাবাক্য
অনুসারে বুদ্ধির একাগ্রতা দ্বারা নিজ ব্রহ্মত্বকে অনুভব
করার অভ্যাস কর্তব্য। এইরূপ বলা হয়- 'নিদ্রায়
যাওয়ার পূর্বপর্যন্ত এমনকি মৃত্যুকাল পর্যন্ত বেদান্ত চিন্তায় কালক্ষেপ করবে। একক্ষণের জন্যও মনকে বিষয়বাসনার চিন্তা
করতে অবসর দিবে না'
||১৬||
তচ্চিন্তনং
তৎ কথনমন্যোন্যং তৎপ্রবোধনম্ ।
এতদেকপরত্বং
চ ব্রহ্মাভ্যাসং বিদুর্বুধাঃ ||১৭||
টীকা
- তৎ এব অভ্যাস স্বরূপং
দর্শয়তি — তচ্চিন্তনম্ ইতি। মনসা বিষয়ান্তর
নিরাসেন তস্য ব্রহ্মণঃ এব
চিন্তনম্, তস্যৈব কথনম্ বেদান্ত বাক্যজাতেন তস্যৈব অন্যোন্যং বোধনে প্রকারঃ এতদেকপরত্বং শুদ্ধচৈতন্য এক পরতাজ্ঞানম্, "তমেবৈকং জানথ
আত্মানমন্যা বাচো বিমুঞ্চথাঽমৃতস্যৈষ সেতুঃ।" ইতি
শ্রুতেঃ, এতৎ সর্বং ব্রহ্মাভ্যাসলক্ষণম্
আচার্যেঃ প্রতিপাদিতম্ ইত্যর্থঃ ||১৭||
টীকানুবাদ
- পূর্ববর্তী শ্লোকে কথিত মহাবাক্যের অভ্যাস
কিরূপে করতে হবে তাই
নির্দেশ করতে 'তচ্চিন্তনম্' ইত্যাদি শ্লোকে বলছেন। ব্রহ্ম ভিন্ন বিষয়সমূহের নিরসনপূর্বক মনের দ্বারা সেই
ব্রহ্মেরই চিন্তন, তারই কথা আলোচনা,
বেদান্তবাক্যসমূহ দ্বারা পরস্পরে তারই বোধ এই
সমুদয়ের শুদ্ধচৈতন্যস্বরূপে একতন্ত্রতাই শ্রুতি মুখেও উপদিষ্ট হয়েছে – 'সেই ব্রহ্মকেই কেবল
জান, অন্য সমস্ত বৃথা
বাক্য পরিহার কর, এটাই আত্মজ্ঞান
লাভের সেতুস্বরূপ।' এই সমুদয়ই ব্রহ্মতত্ত্ব
অভ্যাসের উপায় বলে আচার্য্যগণকর্তৃক
প্রতিপন্ন হয়েছে ||১৭||
দেহাত্মধীবৎ
ব্রহ্মাত্মধীদার্ঢ্যে কৃতকৃত্যতা ।
যদা
তদায়ং ম্রিয়তাং মুক্তোঽসৌ নাত্র সংশয়ঃ ||১৮||
টীকা
- গ্রন্থাভ্যাসফলমাহ — দেহাত্মধীবৎ ইতি। যথা দেহাত্মবুদ্ধিঃ
দৃঢ়তরা অস্তি, তথা ব্রহ্মাত্মবুদ্ধিদার্ঢ্যে সতি কৃতকৃত্যত্বম্ ইত্যর্থঃ।
তদুক্তং উপদেশসাহস্র্যাং –
"দেহাত্মজ্ঞানবজ্ঞানং দেহাত্মজ্ঞানবাধকম্।
আত্মন্যেব
ভবেদ্যস্য স নেচ্ছন্নপি মুচ্যতে
||" -( ৪/৫ )
এবং
যদা তদা অয়ং ম্রিয়তাং,
পঞ্চভূতাত্মকং দেহকঞ্চুকং পরিত্যজ্য অপরিচ্ছিন্নব্রহ্মস্বরূপেণ তিষ্ঠতু, এবস্তৃতা অবস্থা এব বিদেহমুক্তিঃ ইত্যর্থঃ।
"আত্মলাভাৎ ন পরং বিদ্যতে'
ইতি" -( মানসোল্লাস, ১/২ ), "ব্রহ্মবেদ
ব্রহ্মৈব ভবতি" -( মুণ্ডকোপনিষৎ, ৩/২/৯
),
"ভিদ্যতে হৃদয়গ্রন্থিশ্ছিদ্যন্তে
সর্বসংশয়াঃ।
ক্ষীয়ন্তে
চাস্য কর্মাণি তস্মিন্ দৃষ্টে পরাবরে ||" -( মুণ্ডকোপনিষৎ, ২/২/৮
) "অধ্যাত্মযোগাধিগমেন
দেবং মত্বা ধীরো হর্ষশোকৌ জহাতি"
-( কঠোপনিষৎ, ১/২/১২
) ইত্যাদি শ্রুতয়ঃ আত্মবিদঃ অনর্থহানিম্ আত্ম-স্বরূপ-সুখপ্রাপ্তিং
চ প্রতিপাদয়ন্তি ইত্যর্থঃ ||১৮||
টীকানুবাদ
- 'দেহাত্মধীবৎ' ইত্যাদি শেষ শ্লোকে এই
গ্রন্থোক্ত সাধন ফল বলছেন।
যেরূপ অজ্ঞানীর দেহাত্মবুদ্ধি দৃঢ়তর হয় সেইরূপ ব্রহ্মাত্মবুদ্ধির
দৃঢ়তা হলে জীবনের কৃতকৃত্যতা
হয়। উপদেশসাহস্রী গ্রন্থেও তা বলা হয়েছে
– "যেমন অজ্ঞানী পুরুষের দেহে আত্মজ্ঞান নিঃসংশয়
বলে বোধ হয় সেইরূপ
যাঁর আত্মাতে 'দেহ আত্মা নয়'
-এইরূপ নিঃসংশয় বাধক জ্ঞান উৎপন্ন
হয়েছে তিনি মুক্তির ইচ্ছা
না করলেও অবশ্য মুক্ত হবেন।"
এইরূপ
অবস্থা যখন প্রাপ্ত হয়
তখন জ্ঞানী যেখানে যে কোন অবস্থায়
মৃত্যু ঘটলেও পঞ্চভূতাত্মক এই দেহকে জীর্ণ
বস্ত্রের ন্যায় পরিত্যাগ করে অপরিচ্ছিন্ন ব্রহ্মস্বরূপে
অবস্থান করবেন। এইরূপ অবস্থাই বিদেহ মুক্তি বলে কথিত। 'আত্মলাভ
অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আর কিছুই নাই',
'ব্রহ্মজ্ঞ ব্যক্তি ব্রহ্মস্বরূপই হয়ে যান', 'সেই
পর অবর স্বরূপ ব্রহ্মানুভূতি
হলে হৃদ্গত বাসনাগ্রন্থি
ভিন্ন হয়ে যায়, সর্বপ্রকার
সংশয় ছিন্ন হয় ও (প্রারব্ধ
ব্যতীত) সর্ববিধ কর্ম ক্ষয় প্রাপ্ত
হয়'। 'অধ্যাত্মযোগ সাধনের
দ্বারা সেই শুদ্ধব্রহ্মের অনুধ্যান
সহায়ে ধীর ব্যক্তি হর্ষশোককে
অতিক্রম করিয়া থাকেন' ইত্যাদি শ্রুতি আত্মবিদের অশুভবাসনাদি অনর্থের হানি এবং আত্মস্বরূপের
সুখপ্রাপ্তি প্রতিপন্ন করছে ||১৮||
অন্তর্যামী
সমস্তেশো যঃ সাকেত পতির্বিভুঃ।
সন্তস্তমেব
পৃচ্ছত্ত যদত্র স্খলিতং মম ||
কৃত্বা
পুষ্পাঞ্জলিং টীকাং ভগবচ্চরণাব্জয়োঃ।
পুণ্যং
ময়ার্জিতং কিঞ্চিৎ তদ্ ব্রহ্মণি সমর্পিতম্
||
অনুবাদ
- এই লঘুবাক্যবৃত্তি ব্যাখ্যাকালে আমার যদি কোন
ত্রুটি থাকে তাহলে প্রজ্ঞাবান
পাঠক সকলের অন্তর্যামী, সকলের প্রভু, সর্বব্যাপী সেই সাকেত পতি
মদীয় ইষ্ট শ্রীরামচন্দ্রকে জিজ্ঞাসা
করবেন। শ্রীমৎ ভগবান শঙ্করাচার্যের শ্রীচরণকমলে পুষ্পাঞ্জলিস্বরূপ এই টীকা প্রণয়ন
করে যে কিছু পুণ্য
আমা কর্তৃক অর্জিত হয়েছে তা সেই ব্রহ্মেতেই
সমর্পণ করছি ||
|| ইতি লঘুবাক্যবৃত্তিটীকায়াং
পুষ্পাঞ্জল্যভিধায়াং বেদান্ত প্রকরণং সম্পূর্ণম্ ||
|| ইতি শ্রীমৎপরমহংস
পরিব্রাজকাচার্যস্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্যস্য
শ্রীমচ্ছঙ্করভগবতঃ কৃতৌ লঘুবাক্যবৃত্তিঃ সম্পূর্ণা
||
.jpg)