Showing posts with label সনৎসুজাতীয় সংবাদ শাঙ্করভাষ্য. Show all posts
Showing posts with label সনৎসুজাতীয় সংবাদ শাঙ্করভাষ্য. Show all posts

Tuesday, 19 November 2024

বিদ্বান কে?

 


ভগবান্ সনৎসুজাত বলেছেনবিষয়ভোগ বিনাশকারী পুরুষই যথার্থ বিদ্বান।

যোঽভিধ্যায়ন্নুৎপতিষ্ণূন্নিহন্যাৎ অনাচারেণাপ্রতিবুধ্যমানঃ।

বৈ মৃত্যুং মৃত্যুরিবাত্তি ভূত্বা হ্যেবং বিদ্বান্ ষোঽভিহন্তীহ কামান্।।

-(মহাভারত, উদ্যোগপর্ব, ৪২তম অধ্যায়, সনৎসুজাতীয় সংবাদ-১২)

নশ্বর বিষয়সুখকে অশুচি দুঃখাত্মক বোধে তুচ্ছজ্ঞান করে যিনি তা পরিত্যাগ করেন বিষয়সমূহ আর স্মরণ করেন না, তিনি মৃত্যুরও মৃত্যুরূপ হয়ে স্বয়ং মৃত্যুকেও যেন গ্রাস করে থাকেন। এরূপ বিষয়ভোগ বিনাশকারী পুরুষই যথার্থ বিদ্বান অর্থাৎ আত্মবিৎ।

রূপরসাদি বিষয় জগতে চিরকালই আছে এবং থাকবে। তা হতে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় বিবেক অর্থাৎ বিচার। বিষয় তুচ্ছ মিথ্যা এরূপ বিচার করতে করতে চিত্তে বিষয়ের আকর্ষণ ক্ষীণ হয় আত্মস্বরূপ প্রকটিত হয়। এরূপ ত্যাগী পুরুষই যথার্থ বিদ্বান। তিনি মৃত্যুরও মৃত্যুস্বরূপ অর্থাৎ মৃত্যুঞ্জয়ী।.........

তথ্যসূত্রঃ- "সনৎসুজাতীয় সংবাদ", ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্যের ভাষ্য নীলকণ্ঠকৃত টীকা।

শ্রীশুভ চৌধুরী

অক্টোবর ২৭, রবিবার, ২০২৪ খৃষ্টাব্দ।

Monday, 15 January 2024

অধ্যারোপ অপবাদ ন্যায়ে নিত্য অপরোক্ষ ও পরমপুরুষার্থস্বরূপ পরমাত্মার নির্দেশ—

 


ভগবান্ শ্রীসনৎসুজাত বলেছেন

তস্যৈব নামাদি বিশেষরূপৈঃ ইদং জগদ্ভাতি মহানুভাব।

নির্দিশ্য সম্যক্ প্রবদন্তি বেদাঃ তদ্বিশ্ববৈরূপ্যমুদাহরন্তি।।

-(সনৎ-সুজাতীয় সংবাদ-/)

হে মহানুভব! সেই পরমাত্মারই মায়াকল্পিত বিভিন্ন নাম-রূপাদি বিশেষ ভেদে এই দৃশ্যমান জগৎ প্রতিভাত হচ্ছে। বেদসমূহও মায়াকল্পিত বহুবিধ রূপ নির্দেশ করে তৎ পশ্চাৎ কার্যকারণাতীত যাবতীয় ভেদ-রহিত সর্বানুভবস্বরূপ ব্রহ্মকেই প্রতিপাদন করেছেন। সেই ব্রহ্ম দৃশ্যমান বিশ্বের বিপরীত স্বরূপ একথা মুনিগণও বর্ণন করে থাকেন।

এখানে প্রথমে অধ্যারোপ দেখানো হল, অর্থাৎ কোন অধিষ্ঠানে ভ্রান্তি দ্বারা আরোপিত মিথ্যাবস্তুবিষয়ক জ্ঞান 'অধ্যারোপ' শব্দে কথিত হয়ে থাকে। তৎপর অপবাদ বর্ণিত হল, যথাশ্রীগুরু কৃপায় অপরোক্ষ ব্রহ্মাত্মৈক্য সাক্ষাৎকার প্রভাবে আরোপিত যাবতীয় অনাত্মবস্তুর মিথ্যাবোধে বাধ অর্থাৎ নিবৃত্তি হলে একমাত্র পরমার্থ ব্রহ্মরূপ অধিষ্ঠানই পর্যবসিত হন। শ্রুতি এই বিষয়ে প্রমাণ

"দ্বে বাব ব্রহ্মণঃ রূপে মূর্ত্তং চৈবামূর্ত্তং "-(বৃহদারণ্যক উপনিষদ্-২।৩।১), ব্রহ্মের দুইটী মাত্ররূপ মূর্ত্ত এবং অমূর্ত্ত', এপ্রকার আরম্ভ করে ক্ষিত্যাদি পাঁচটি মহাভূতকে দুইটী রাশিরূপে বিভক্ত করে বায়ু আকাশরূপ অমূর্ত্ত ভূতের যা রস অর্থাৎ সার পদার্থ এবং যা 'পুরুষ', এই শব্দের দ্বারা কথিত, তার সমষ্টি করণাত্মা হিরণ্যগর্ভশরীরের এবং দক্ষিণ চক্ষুতে স্থিত ব্যষ্টি লিঙ্গশরীরের মাহারজনাদি রূপসকল (-হরিদ্রারঞ্জিত বস্ত্র প্রভৃতি বর্ণের ন্যায় বর্ণসকল) প্রদর্শন করে পূনরায় পঠিত হচ্ছে

'অথাত আদেশ নেতি নেতি'-(বৃহদারণ্যক উপনিষদ্-২।৫।৬) "অতএব অতঃপর এটা নয়, এটা নয়, এটাই নির্দেশ" অর্থাৎ 'নেতি নেতি' শ্রুতি ব্রহ্মে কল্পিত প্রপঞ্চকেই প্রতিষেধ করছেন এবং প্রতিষেধের অবধি অধিষ্ঠানরূপে ব্রহ্ম অবশিষ্ট থাকছেন।.....

শ্রীশুভ চৌধুরী

জানুয়ারি , ২০২৪ খৃষ্টাব্দ।

Thursday, 5 October 2023

জ্ঞানীর প্রশংসাঃ-

 


সনৎসুজাতীয় সংবাদে ভগবান সনৎকুমার বলেছেন

অনাঢ্যা মানুষে বিত্তে আঢ্যা বেদেষু যে দ্বিজাঃ।

তে দুর্দ্ধর্ষা দুষ্প্রকম্প্যা বিদ্যাৎ তান্ ব্রহ্মণস্তনুম্।।

-(মহাভারত, উদ্যোগপর্ব-৪২/৩৬)

যে দ্বিজগণ লৌকিক সম্পদবিহীন কিন্তু বেদবিদ্যায় পারদর্শী বেদপ্রতিপাদ্য অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য শমদমাদি সাধন সম্পন্ন, তাঁরা অজেয় অর্থাৎ কোন প্রতিকূল অবস্থাই তাঁদের স্বীয় তত্ত্বনিষ্ঠা হতে বিচ্যুত করতে পারে না, তাঁরা অচল, অটল অর্থাৎ বর্ষা বা বিদ্যুৎপাতে অবিচলিত পর্বতশিখরের ন্যায় নির্বিকার; তাঁদেরকে ব্রহ্মের সাক্ষাৎ মূর্তি অর্থাৎ ব্রহ্মস্বরূপভূত বলে জানবে। ব্রহ্মের সহিত তাদের কোন ভেদ নেই। শ্রুতিতে বর্ণিত আছে—"ব্রহ্ম বেদ ব্রহ্মৈব ভবতি"-(মুণ্ডক উপনিষৎ, //) অর্থাৎ ব্রহ্মবিৎ ব্রহ্মস্বরূপই হয়ে যান।.....

শ্রীশুভ চৌধুরী

সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।

Wednesday, 5 July 2023

আচার্যই যথার্থ জন্মদাতাঃ-

 


শরীরমেতৌ কুরুতঃ পিতামাতা ভারত।

আচার্যতস্তু যজ্জন্ম তৎ সত্যং বৈ তথামৃতম্।।

-(সনৎ-সুজাতীয় সংবাদ -৩।৭)

হে ভারত! মাতা পিতা উভয়ে এই শরীর মাত্র উৎপাদন করেন, তাঁহারা আত্মজ্ঞান উৎপাদন করেন না। কিন্তু আচার্য হইতে যে জন্মলাভ হয়, উহাই সত্য পরমার্থভূত অবিনাশী জন্ম। সুতরাং তিনিই যথার্থ জন্মদাতা।

পূর্বে ভগবান্ সনৎকুমার 'আচার্যযোনিমিহ..' এই শ্লোকে (৩।৫) আচার্যকে যোনি অর্থাৎ জন্মস্থান বলেও সম্বোধন করিয়াছেন। শিষ্য হওয়াই গুরুর গর্ভভূত হওয়া। শ্রুতিতে শ্রীগুরুকৃপায় বেদান্তবাক্য শ্রবণানন্তর তত্ত্বজ্ঞানলাভে কৃতকৃত্য শিষ্যগণ আচার্যকে পূজা করিতে করিতে বলিলেন—"আপনিই আমাদের পিতা, কারণ আপনি আমাদিগকে অবিদ্যার পরপারে লইয়া গেলেন।"-(প্রশ্ন উপনিষৎ, ৬।৮)

আপস্তম্ভ ঋষিও বলিয়াছেন—'বিদ্যাপ্রদানে আচার্য জন্ম দিয়া থাকেন। উহাই শ্রেষ্ঠ জন্ম। মাতাপিতা মাত্র শরীরটিকে উৎপন্ন করিয়া থাকেন।"....

শ্রীশুভ চৌধুরী

গুরু পূর্ণিমা, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।

বেদার্থ জ্ঞাতাই যথার্থ ব্রাহ্মণঃ-

 


বেদের বেদস্বরূপ আত্মার প্রতিপাদনপ্রকার সম্যক্ অবগত হয়ে যিনি তা ব্যাখ্যা করতে সমর্থ তিনিই যথার্থ ব্রাহ্মণ। বেদ বাক্যার্থ বর্ণনকুশল, অপরোক্ষ জ্ঞানবান্ পুরুষই যথার্থ ব্রাহ্মণ, ভগবান্ শ্রীসনৎ সুজাত তাই বলেছেন

"অভিজানামি ব্রাহ্মণমাখ্যাতারং বিচক্ষণম্।"

-(সনৎ-সুজাতীয় সংবাদ -/৪৫)

অর্থাৎ উপক্রমোপসংহারাদি ষড়বিধ তাৎপর্য লিঙ্গানুসারে বাক্যার্থ বর্ণনকুশল, শ্রুতার্থানুচিন্তন সমর্থ, পরিপক্ক নিদিধ্যাসন বলে অপরোক্ষ জ্ঞানবান্ পুরুষকেই যথার্থ ব্রাহ্মণ বলে আমি মনে করি।.....

শ্রীশুভ চৌধুরী

জুন ২৫, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।

Saturday, 17 June 2023

ব্রহ্মজ্ঞই সর্বজ্ঞঃ-

 


ব্রহ্মজ্ঞই সর্বজ্ঞ, এই কথা ভগবান্ সনৎকুমার বলছেন

প্রত্যক্ষদর্শী লোকানাং সর্বদর্শী ভবেন্নরঃ।

সত্যে বৈ ব্রহ্মণি তিষ্ঠন্ তদ্বিদ্বান্ সর্ববিদ্ভবেৎ।।

-(সনৎ-সুজাতীয় সংবাদ-/৫০)

যোগবলে ভূর্ভুবাদি সর্বলোকসমূহ প্রত্যক্ষদর্শনকারী পুরুষ সর্বদর্শী হয়ে থাকেন। বিদ্বান সর্বরূপে পরমাত্মাকেই দর্শন করে থাকেন। এই বিদ্বান সত্যাদি লক্ষণযুক্ত ব্রহ্মেতেই স্থিত হয়ে তাঁতেই মন সমাহিত করে থাকেন। সত্যস্বরূপ এই ব্রহ্মকেই বিদ্বান নিজের সহিত অভিন্নরূপে জানেন বলে তিনি সর্ববিৎ অর্থাৎ সর্বজ্ঞরূপে কথিত হন। ইনিই যথার্থ সর্বজ্ঞ। কেবল অনাত্মমাত্র দর্শনকারী সর্বজ্ঞ নন।

কোন বস্তুরই অধিষ্ঠানাতিরিক্ত সত্তা নেই। অধিষ্ঠানের সত্তাই কল্পিত বস্তুর সত্তা। অতএব যিনি সর্বজগদধিষ্ঠান ব্রহ্মকে জেনেছেন তিনি স্বরূপতঃ সর্ববস্তুকেই জেনেছেন বলে তিনি যথার্থ সর্বজ্ঞ।......

শ্রীশুভ চৌধুরী

জুন ১৬, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।

Thursday, 2 July 2020

জ্ঞানীর ও অজ্ঞানীর কৃত কর্ম্মফলের ভেদঃ-



ভগবান সনৎসুজাত বলিতেছেন- 
অস্মিন্ লোকেতপস্তপ্তং ফলমন্যত্র ভুজ্যতে। 
ব্রাহ্মণানাং তপঃসু-ঋদ্ধম্ অন্যেষাং তাবদেব তৎ।
-(শ্রীমহাভারত, উদ্যোগপর্ব, ৪৩তম অধ্যায়, সনৎ-সুজাতীয় সম্বাদ-১০)
শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- ইহলোকে যে তপস্যাদি অনুষ্ঠিত হয় তাহার ফল পরলোকে ভোগ হইয়া থাকে-ইহাই সাধারণ নিয়ম। অনাত্মবিদ্ অর্থাৎ সকাম কর্ম্মীর অনুষ্ঠিত তপস্যা ততটাই ফল প্রদান করে যতটা শাস্ত্রে উল্লেখিত আছে কিন্তু ব্রহ্মবিদের তপস্যার ফল অধিক সমৃদ্ধ হইয়া থাকে।
ব্রহ্মবিদের তপস্যা ফলবৃদ্ধির হেতু হয়। কারণ শাস্ত্র বলেন-'যে কর্ম্মবিজ্ঞান, শ্রদ্ধা ও উপাসনাদিসহ সশ্রদ্ধচিত্তে জ্ঞানপূর্ব্বক অনুষ্ঠিত হয় তাহা অধিক ফলপ্রদ ও শক্তিশালী হইয়া থাকে।'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ ১।১।১০)
তাৎপর্য্য এই যে, সকাম কর্ম্মীর কর্ম্মফল পরলোকে ভোগ হয়, উহা সীমিত, স্বল্পকাল স্থায়ী। কিন্তু তত্ত্ববিদের যে জ্ঞানফল তাহা তিনি ইহলোকেই প্রাপ্ত হন এবং ঐ জ্ঞানফল মোক্ষ, অনন্তকাল স্থায়ী। কর্ম্ম অদৃষ্ট (পরলোক প্রাপ্তব্য) ফল প্রদান করে কিন্তু জ্ঞান দৃষ্ট ফল প্রদাতা-ইহাই বিশেষ। জ্ঞানী দৃষ্ট ফল মোক্ষ, বর্তমান শরীরেরই অনুভব করিয়া কৃতার্থ হইয়া থাকেন-ইহাই জ্ঞানের পরম বৈশিষ্ট্য।

Thursday, 14 May 2020

বিদ্বানের জ্ঞান দ্বারাই মোক্ষপ্রাপ্তিঃ-


ভগবান সনৎসুজাত বলিতেছেন-
'জ্ঞানেন চাত্মানমুপৈতি বিদ্বান্ ন চান্যথা বর্গফলানুকাঙ্ক্ষী।
অস্মিন্ কৃতং তৎ পরিগৃহ্য সর্বম্ অমুত্র ভুঙ্ক্তে পুনরেতি মার্গম্।।'৯
(শ্রীমহাভারত, উদ্যোগপর্ব, ৪৩তম অধ্যায়, সনৎ-সুজাতীয় সম্বাদ-৯)

শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- বিদ্বান তত্ত্বজ্ঞান দ্বারাই অজ্ঞানবিনাশপূর্বক পরমাত্মাকে প্রাপ্ত হইয়া থাকেন, অন্য কোন প্রকারেই নহে। আবার ঈশ্বরার্থে কর্ম্মানুষ্ঠান না করিলে ও সর্ব্বপাপ বিনষ্ট না হইলে কেহই তত্ত্বজ্ঞান লাভ করিতে পারে না। বর্গ অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গণ, তাহার প্রিয়ফল বিষয়সুখ, তদাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তিই বর্গফলানুকাঙ্ক্ষী অর্থাৎ সকামী স্বর্গাদি ফলাভিলাষী জীব ভোগপ্রদ কর্মানুষ্ঠানোদ্ভব অপূর্ব (অর্থাৎ শাস্ত্রবিহিত ও নিষিদ্ধক্রিয়া হইতে উৎপন্ন কালান্তরভাবি সুখদুঃখের হেতুভূত যে পূণ্য ও পাপ তাহাই পূর্বমীমাংসকগণ কর্তৃক স্বীকৃত অপূর্ব) সঙ্গে লইয়া পরলোকে যায় ও ঐসকল কর্ম্মের ফলভোগ সেখানে শেষ হইলে পূনরায় অবশিষ্ট কর্ম্মফলের দ্বারা প্রেরিত হইয়া জন্মমৃত্যু প্রবাহসঙ্কুল এই সংসারগতি প্রাপ্ত হইয়া থাকে। ছান্দোগ্য শ্রুতিও তাই বলিতেছে-
'কর্ম্মক্ষয় পর্যন্ত স্বর্গলোকে বাস করিয়া পূনরায় তাহারা এই সংসারগতি প্রাপ্ত হইয়া থাকে।'-(ছান্দোগ্য উপনিষদ্-৫।১০।৫)

Sunday, 1 March 2020

যথার্থ মৌন কে?


ধৃতরাষ্ট্রের মৌনবিষয়ক প্রশ্নের উত্তরে ভগবান শ্রীসনৎ সুজাত বলিতেছেন-
'যতো ন বেদা মনসা সহৈন-মনুপ্রবিশন্তি ততঃ স মৌনম্।
যত্রোথ্থিতো বেদশব্দ স্তথায়ং স তন্ময়ত্বেন বিভাতি রাজন্।।'
(শ্রীমহাভারত, উদ্যোগপর্ব, ৪৩তম অধ্যায়, সনৎ-সুজাতীয় সম্বাদ-২)

ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- সেই পরমাত্মাই যথার্থ মৌন, কারণ মন সহ সর্ববেদও তাঁহাকে প্রকাশ করিতে পারে না। কারণ শ্রুতি বলিতেছে- 'শব্দের অগম্য, তাই তিনি মৌন।'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ ২।৪)
'বিদজ্ঞানে' জ্ঞানার্থক বেদশব্দ কেবল বাচকরূপেই তাঁহাতে প্রযুক্ত হয় মাত্র। কারণ বেদরাশিও সেই পরমাত্মা হইতেই উদ্ভূত, তাই তিনি বেদশাস্ত্রেরও যোনি বা কারণ। পুরুষ নিঃশাসবৎ (বৃহদারণ্যক উপনিষৎ- ২।৪।১০) অপ্রযত্নে পরমাত্মা হইতে বেদাদি শাস্ত্র নির্গত হইয়াছে।
বস্তুতঃ জ্ঞানস্বরূপ পরমাত্মা বাক্য ও মনের অগোচর। সেই বেদশব্দ প্রতিপাদ্য সংবিদ্ই পরমাত্মা। তিনি জ্যোতির্ময়-রূপেই আমাদের অনুভবগম্য। কারণ শ্রুতি স্মৃতি ইতিহাস পুরাণাদিতে তিনি জ্যোতির্ময় রূপে কীর্তিত। যথা-'ব্রহ্ম আদিত্যাদি জ্যোতিসমূহেরও জ্যোতিঃ এবং অজ্ঞানরূপ অন্ধকারের দ্বারা অসংস্পৃষ্ট।'-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা- ১৩।১৮)

Saturday, 25 January 2020

সনৎ-সুজাতীয় সম্বাদে মান ও মৌনের বিষয়ে পার্থক্যঃ-


শ্রীমহাভারতের উদ্যোগপর্বের দ্বি-চত্বারিংশোহধ্যায়ের সনৎ-সুজাতীয় সম্বাদে পরমপ্রাচীন সনাতন ঋষি ভগবান সনৎ-সুজাত বলিতেছেন-
ন বৈ মানং চ মৌনং চ সহিতৌ বসতঃ সদা। 
অয়ং হি লোকো মানস্য হ্যসৌ মৌনস্য তদ্বিদুঃ।।৪১
ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ-মান ও মৌন সর্বদা সহাবস্থান করে না অর্থাৎ মান আর মৌন সহচারী নহে। যেহেতু এই প্রত্যক্ষগোচর জগৎ প্রপঞ্চ মানের বিষয় এবং মৌনের বিষয় হইল পরলোক যাহা 'তৎ' বা ব্রহ্মনামে নিশ্চিতরূপে বিদ্বানগণের অনুভব প্রসিদ্ধ। 'তৎ' শব্দবাচ্য ব্রহ্মই মৌনের বিষয়। 'তত্সদিতি নির্দেশো ব্রহ্মণস্ত্রিবিধঃ স্মৃতঃ৷-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৭।২৩) অর্থাৎ 'ॐ তৎ সৎ' এই তিনটি শব্দ ব্রহ্মের নির্দ্দেশ সূচক নাম স্বীকৃত হইয়া থাকে।
মান দ্বারা সংসার প্রাপ্তি ও মৌনদ্বারা ব্রহ্মভাব প্রাপ্তিই এখানে সূচিত হইল। হিরণ্যগর্ভ সংহিতাতেও বলা হইয়াছে-'অন্ন,অঙ্গনাদি ভোগ্যপদার্থে মনের প্রবৃত্তিই মান নামে কথিত হইয়া থাকে, আর মৌন ব্রহ্মানন্দ সুখ প্রাপ্তির হেতুরূপে প্রসিদ্ধ।' বস্তুত মান লোকানুরঞ্জনের সাধন। মৌনধারণ আত্মচিন্তনের সহায়ক বলিয়া উহা পরমার্থ বা ব্রহ্মানন্দ প্রাপ্তির সাধন। এইজন্য মানের বিষয় ইহলোক ও মৌনের বিষয় পরলোক-এইরূপে কথিত হইয়াছে।

Wednesday, 11 December 2019

ব্রাহ্মীশ্রী প্রাপ্তির ছয়টি উপায়ঃ-



মানসম্বন্ধী বিষয়ে সর্বদা রত থাকিলে লৌকিক ঐশ্বর্যশ্রী প্রাপ্তি হয় বটে, কিন্তু সর্ব্বগুণ ও রূপবিহীন নিত্য চিদ্ঘন আনন্দস্বরূপ পরমশুদ্ধা ব্রাহ্মীশ্রী প্রাপ্তির উপায় বিষয়ে শ্রীমহাভারতের উদ্যোগপর্বের দ্বি-চত্বারিংশোহধ্যায়ের সনৎ-সুজাতীয় সম্বাদে পরমপ্রাচীন সনাতন ঋষি ভগবান সনৎ-সুজাত বলিতেছেন-
'দ্বারাণি সম্যক্ প্রবদন্তি সন্তো বহুপ্রকারাণি দুরাচরাণি।
সত্যার্জবে হ্রীর্দম শৌচ বিদ্যাঃ ষন্মান মোহ প্রতিবন্ধকানি।।৪৩।।

ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- মান ও মোহের প্রতিবন্ধক অর্থাৎ বিনাশক সত্য তথা যথার্থ ভাষণ, আর্জব অর্থাৎ অকুটিলতা, হ্রী অর্থাৎ অন্যায় কার্য্য প্রবৃত্তিতে লজ্জা, দম অর্থাৎ অন্তরিন্দ্রিয় ও বহিরিন্দ্রিয় নিগ্রহ, শৌচ অর্থাৎ মলিনতা মার্জ্জন তথা বাহ্য মলিনতা মৃজ্জলাদি সহায়ে ও আন্তরমালিন্য চিত্তশুদ্ধির সাধনাভ্যাস দ্বারা ও ব্রহ্মবিদ্যা- বহুপ্রকার কষ্টসাধ্য সাধনের মধ্যে এই ছয়টিকে তত্ত্ববিদ্ সজ্জনগণ ব্রাহ্মীশ্রী অর্থাৎ মোক্ষস্বরূপের প্রবেশদ্বার রূপে বর্ণন করিয়া থাকেন। ৪৩

Thursday, 24 October 2019

প্রমাদরূপী মৃত্যুনাশের উপায়ঃ-


পরমপ্রাচীন সনাতন ঋষি সনৎ-সুজাত বলিতেছেন-
এবং মৃত্যুং জায়মানং বিদিত্বা জ্ঞানেন তিষ্ঠন্ন বিভেতি মৃত্যোঃ। বিনশ্যতে বিষয়ে তস্য মৃত্যুঃ মৃত্যোর্ষথা বিষয়ং প্রাপ্য মর্ত্যঃ।।-(শ্রীমহাভারত, উদ্যোগপর্ব, দ্বি-চত্বারিংশোহধ্যায়, সনৎ-সুজাতীয় সম্বাদ-১৬)
ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- এইরূপে কামক্রোধাদি হইতে উৎপন্ন প্রমাদাখ্য মৃত্যুই সর্বানর্থের বীজ, ইহা জানিয়া ঐ কামক্রোধাদি পরিহারপূর্বক অক্রোধাদি গুণসম্পাদন সহায়ে অদ্বিতীয় ব্রহ্মত্মস্বরূপে স্থিতিলাভবশতঃ জ্ঞানী আর মৃত্যু হইতে ভয় পান না। পরমাত্মসাক্ষাৎকারবশতঃ সেই জ্ঞানীর প্রমাদরূপী মৃত্যু বিনাশ প্রাপ্ত হয়। মরণশীল জীব যে প্রকারে মৃত্যুর বিষয়সংসার অর্থাৎ কামাদি দ্বারা কবলিত হইয়া বিনষ্ট হয় জ্ঞানীরও সেইরূপ প্রমাদরূপী মৃত্যুর বিনাশ ঘটিয়া থাকে। অর্থাৎ আত্মসাক্ষাৎকার হইলে শরীরাধ্যাস বা অজ্ঞানরূপ মৃত্যু স্বতই বিনষ্ট হইয়া থাকে- ইহাই ভাবার্থ।

Friday, 27 September 2019

মহামোহ কি?


শ্রীমহাভারতের উদ্যোগপর্বের দ্বি-চত্বারিংশোহধ্যায়ের সনৎ-সুজাতীয় সম্বাদে ব্রহ্মার মানসপুত্র চিরকুমার পরমপ্রাচীন সনাতন ঋষি সনৎ-সুজাত ধৃতরাষ্ট্রের বিবিধ প্রশ্নোত্তরে বলিতেছেন-

তদ্বৈ মহামোহনমিন্দ্রিয়াণাং মিথ্যার্থযোগেহস্য গতিহির্নিত্যা।

মিথ্যার্থযোগাভিহতান্তরাত্মা স্মরন্নুপাস্তে বিষয়ান্ সমস্তাৎ।।১০।।

ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- ভোগ্য বিষয়ে ইন্দ্রিয়সমূহের যে প্রবৃত্তি তাহাই মহামোহ। বিষয়ে সত্যত্ববুদ্ধি থাকিলেই উহা লাভের প্রবৃত্তি হয়। বিষয়ে প্রবৃত্তি না হইয়া আত্মাতেই যাহার প্রবৃত্তি তাহারই মোহ নিবৃত্তি হইয়া থাকে। মিথ্যাবিষয়ানুরাগী পুরুষের নিয়ত সংসারগতিই হইয়া থাকে। কারণ ঐ বিষয়ানুরক্তি জীবকে স্বীয় ব্রহ্মভাব হইতে বিচ্যুত করিয়া থাকে এবং জীব তখন সর্বতোভাবে বিষয়সমূহ স্মরণ করিতে করিতে বিষয়-চিন্তাতেই সদা মগ্ন হয়।

Tuesday, 30 July 2019

কামাদি দ্বারা প্রমাদের বন্ধহেতুত্বঃ-


মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ ব্যাস প্রণীত শ্রীমহাভারতের উদ্যোগপর্বের দ্বি-চত্বারিংশোহধ্যায়ের সনৎ-সুজাতীয় সম্বাদে ব্রহ্মার মানসপুত্র চিরকুমার পরমপ্রাচীন সনাতন ঋষি সনৎ-সুজাত কর্তৃক ধৃতরাষ্ট্রের বিবিধ প্রশ্নোত্তরে বলিতেছেন-
আস্যাদেষ নিঃসরতে নরাণাং ক্রোধঃ প্রমাদো মোহরূপশ্চ মৃত্যুঃ।
অহংগতনৈব চরন্ বিমার্গান্ ন চাত্মনো যোগমুপৈতি কিঞ্চিৎ।।৭।।
ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- প্রমাদাখ্য মৃত্যু প্রথমতঃ সামান্য অহঙ্কারূপে মনুষ্য-চিত্তে প্রকটিত হইয়া থাকে। তৎপর উহাই বিশেষ অহঙ্কার রূপ ধারণ করে। ঐ অহঙ্কার হইতে কাম উৎপন্ন হয়, কাম প্রতিহত হইলেই ক্রোধরূপ ধারণ করে এবং তদ্ বশে মনুষ্য হিতাহিত জ্ঞানশুন্য হইয়া মহামূঢ় অবস্থা প্রাপ্ত হয়। অতঃপর অহঙ্কার-মমকাররূপ বৃত্তিতে অর্থাৎ অজ্ঞানবশত 'আমি,আমার'-এতাদৃশ বৃত্তিতে চিদাভাসরূপে প্রতিফলিত হইয়া ঐ জীব কুমার্গে অর্থাৎ বিষয়াভিমুখী বিপরীতমার্গে গমনপূর্বক আত্মযোগ হইতে বঞ্চিত হয়, অর্থাৎ পরমাত্মলাভে অসমর্থ হইয়া পুনঃ পুনঃ সংসারগতি লাভ করে।

Sunday, 28 July 2019

প্রমাদই মৃত্যু, অপ্রমাদই অমরত্বঃ-



মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ ব্যাস প্রণীত শ্রীমহাভারতের উদ্যোগপর্বের দ্বি-চত্বারিংশোহধ্যায়ের সনৎ-সুজাতীয় সম্বাদে ব্রহ্মার মানসপুত্র চিরকুমার পরমপ্রাচীন সনাতন ঋষি সনৎ-সুজাত কর্তৃক ধৃতরাষ্ট্রের বিবিধ প্রশ্নোত্তরে বলিতেছেন-
....মোহো মৃত্যুঃ সম্মতো যো কবীণাম্। প্রমাদং বৈ মৃত্যুমহং ব্রবীমি সদাহপ্রমাদমমৃতত্বং ব্রবীমি।।৪।।
শাঙ্করভাষ্য ও নীলকন্ঠের টীকানুসারে ভাবার্থঃ- কোন কোন বিদ্বানের মতে অনাত্মবস্তুতে আত্মাভিমানরূপ মিথ্যাজ্ঞানই মোহ, আর মোহই মৃত্যু। আমি কিন্তু প্রমাদকেই মৃত্যু বলিয়া অভিহিত করি। স্বাভাবিক ব্রহ্মভাব হইতে বিচ্যুতিই প্রমাদ। এই প্রমাদ, পূর্বোক্ত মিথ্যা-জ্ঞানেরও কারণ, আত্মবিষয়ক অজ্ঞান। অজ্ঞানরূপী প্রমাদই মৃত্যু অর্থাৎ জন্মমরণাদি সর্ব অনর্থের বীজ মূল অজ্ঞান। আবার অপ্রমাদকেই অমরত্ব বলিয়া থাকি। অপ্রমাদ অর্থাৎ সম্যক অবেক্ষণ বা জ্ঞান অমৃতত্বের হেতু।

জ্ঞানী ভোগ্যবিষয়ে মনের কঠিনতা আর ভগবদ্বিষয়ে মনের কোমলতা সম্পাদন করে—

  আচার্য মধুসূদন সরস্বতী ভক্তিরসায়নে বলছেন — কাঠিন্যং বিষয়ে কুর্যাদ্ দ্রবত্বং ভগবৎপদে। উপায়ৈঃ শাস্ত্রনির্দিষ্টৈরনুক্ষণমতো ব...