Showing posts with label "অদ্বৈতবেদান্তে সৃষ্টিক্রম". Show all posts
Showing posts with label "অদ্বৈতবেদান্তে সৃষ্টিক্রম". Show all posts

Tuesday, 19 November 2024

অদ্বৈতবেদান্তে সৃষ্টির স্বরূপঃ-

 


সৃষ্টির্নাম ব্রহ্মরূপে সচ্চিদানন্দবস্তুনি।

অব্ধৌ ফেনাদিবৎ সর্বনামরূপপ্রসারণা।।

-(দৃগ্দৃশ্যবিবেক-১৪)

সমুদ্রে ফেনাদিবিস্তারের ন্যায় ব্রহ্মস্বরূপ সচ্চিদানন্দ বস্তুতে যাবতীয় নামরূপ বিস্তারের নাম সৃষ্টি। ভাবার্থ এই যেব্রহ্মে যে বিক্ষেপাত্মিকা মায়া রয়েছে, সেই ব্রহ্মেই সেই মায়ার যে সমস্ত নাম রূপাকারে বিবর্তন তাকেই সৃষ্টি বলে। এই বিষয়ে আচার্য দৃষ্টান্ত দিচ্ছেনএই সমস্তকেই (দৃশ্যমান প্রপঞ্চকেই) জলে ফেনার ন্যায় দেখতে হবে। জলে যে ফেনাদি দেখা যায় তা জল হতে ভিন্ন নয়। কেননা, জলকে ছেড়ে নিরূপিত হতে পারে, এরূপ স্বরূপ তার নেই, পক্ষান্তরে সেই ফেনাদি জল হতে অভিন্নও নয়, কেননা তাদেরকে পৃথকভাবে দেখা যায়। আবার তারা জল হতে ভিন্নাভিন্ন নয়; কেননা, তদুভয়ের স্বরূপ পরস্পরবিরুদ্ধ। এরূপে জগৎ- চিদাত্মা হতে ভিন্ন নয়, কেননা চিদ্রূপের বাইরে তার স্বতন্ত্রভাবে নিরূপণ হয় না। আবার তা হতে অভিন্নও নয়, কেননা চিদাত্মা হতে জগৎ পৃথকভাবে প্রতীত হয় এবং তা ইন্দ্রিয়গোচর, জড়, স্থূল বিবিধপ্রকার। সেহেতু এই জগৎ অধিষ্ঠানভূত ব্রহ্ম হতে পৃথক অপৃথক বলে অনির্বচনীয়ই, এটা পরমার্থ নয়।

যেহেতু সৃষ্টি মায়াময়, এই হেতু অধিষ্ঠানরূপে রজ্জু সর্পাকারে বিবর্তিত হলে, রজ্জুকে যেমন সর্পের কারণ বলা হয়, সেইরূপ ব্রহ্মও রজ্জুর ন্যায় কূটস্থ (নির্বিকার) থেকে, মায়াকে সত্তা প্রকাশ দিয়ে, মায়ার অনুগমনমাত্র করে বলে ব্রহ্মকে কারণ বলা হয়ে থাকে। পারমার্থিকভাবে ব্রহ্মকে কারণ বলা হয় না।

তথ্যসূত্রঃ- ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য (মতান্তরে ভারতী তীর্থ) বিরচিত "দৃগ্দৃশ্যবিবেকঃ", আনন্দ গিরি ব্রহ্মানন্দ ভারতীর টীকা সমেত।

শ্রীশুভ চৌধুরী

নভেম্বর , সোমবার, ২০২৪ খৃষ্টাব্দ।

Thursday, 31 March 2022

মুণ্ডক শ্রুতিতে সৃষ্টিক্রমঃ-



অথর্ববেদীয় মুণ্ডকোপনিষদের প্রথম মুণ্ডকের প্রথম খণ্ডে বর্ণিত আছে—

তপসা চীয়তে ব্রহ্ম ততোঽন্নমভিজায়তে ।

অন্নাৎ প্রাণো মনঃ সত্যং লোকাঃ কর্মসু চামৃতম্ ॥ -(মুণ্ডক উপনিষৎ- ১/১/ ৮)

আচার্য শঙ্কর এই শ্রুতির ভাষ্যে বলিতেছেন–"সৃষ্টির উৎপত্তি ক্রম জানেন বলিয়া প্রাণীদের উৎপত্তির কারণ অবিনাশী ব্রহ্ম তপসা অর্থাৎ ওই জ্ঞানের (সঙ্কল্পের) দ্বারা (সৃষ্ট্যুন্মুখ) হন অর্থাৎ অঙ্কুরসদৃশ এই জগৎ উৎপন্ন করিতে ইচ্ছা করিয়া বীজসদৃশ নিজে স্ফীত হন যেভাবে পুত্র সমুৎপাদনার্থ পিতা আনন্দে উল্লসিত হন।

সর্বজ্ঞতানিবন্ধন সৃষ্টি, স্থিতি ও সংহারশক্তির এইরূপ জ্ঞানবশতঃ স্ফীত হওয়ার ফলে তন্নিমিত্ত অর্থাৎ ব্রহ্মের নিমিত্ত অন্ন— অদন অর্থাৎ ভোগ করা যায় বলিয়া অন্ন (ভোগ্য) অর্থাৎ অব্যক্ত যাহা সকল সংসারী জীবের সাধারণ কারণ (কেননা যেহেতু অব্যক্ত হইতে সকল প্রাণীর ভোগ্যশরীর সৃষ্ট হয়), সেই অব্যক্ত অভিব্যক্তেচ্ছু অবস্থারূপে উৎপন্ন হয়। তদনন্তর অভিব্যক্তেচ্ছু অবস্থা বিশিষ্ট ভোগ্য অব্যক্ত হইতে প্রাণ অর্থাৎ হিরণ্যগর্ভ যিনি কার্যব্রহ্মের (জগতের) জ্ঞানশক্তি ও ক্রিয়াশক্তিবিশিষ্ট, জগৎজীবের সমষ্টিস্বরূপ, প্রেয়ঃ কামনা ও কামনা জনিত কর্মফলের সমষ্টিরূপ বীজের অঙ্কুরসদৃশ, স্থূলজগতের, সূক্ষ্মস্বরূপ তিনি 'উৎপন্ন হন'।

আমার সেই প্রাণ (হিরণ্যগর্ভ) হইতে মন অর্থাৎ সঙ্কল্প, বিকল্প, সংশয় ও নিশ্চয়াদি স্বভাববিশিষ্ট মনসংজ্ঞক (সমষ্টি অন্তঃকরণ) উৎপন্ন হয়। তাহার পর আবার সঙ্কল্পাদ্যাত্মক (সমষ্টি) মন হইতে সত্য অর্থাৎ সত্যসংজ্ঞক আকাশাদি সূক্ষ্ম ভূতপঞ্চক সৃষ্ট হয়। এবং সত্যনামক সেই ভূতপঞ্চক হইতে ব্রহ্মাণ্ড ও তারপর ভূর্লোক প্রভৃতি সপ্তলোক উৎপন্ন হয়। আর সেই সকল লোকেতে (শরীরে) মনুষ্যাদি প্রাণিবর্গের বর্ণ ও আশ্রম অনুযায়ী নানাবিধ কর্ম এবং নিমিত্তস্বরূপ ঐ কর্মসকলেতে অমৃত অর্থাৎ ঐ কর্ম জনিত ফল উৎপন্ন হয়। শতকোটি কল্প অতিক্রম হইলেও যাবৎকাল পর্যন্ত (জ্ঞানোদয়ে)কর্মসমূহ বিনষ্ট না হয় তাবৎকাল পর্যন্ত (কর্মের সহিত) তৎফলও অক্ষুণ্ণ থাকিতেছে বলিয়া কর্মফলকে অমৃত বলা হইতেছে।

Saturday, 12 March 2022

বেদের নাসদীয় সূক্তে মুখ্য প্রাণের অনাদিত্ব প্রতিপাদ্য নহেঃ-



আজকের আলোচনায় মুখ্যপ্রাণোৎপত্তি বিচার্য বিষয়। "ব্রহ্ম হইতে মুখ্যপ্রাণ উৎপন্ন হয়" এই মুণ্ডক শ্রুতির সহিত ঋগ্বেদ্ সংহিতার নাসদীয় সূক্তে "সৃষ্টির পূর্বে মুখ্যপ্রাণের অস্তিত্ব প্রতিভাত হয়" এই শ্রুতির বিরোধ মনে হয়। আর শ্রুতিদ্বয়ের বিরোধবশতঃ সংশয় হয়—মুখ্যপ্রাণ কি অনাদি অথবা উৎপন্ন হয়?

ভগবান ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য বেদান্তমীমাংসা শাস্ত্রের প্রাণশ্রৈষ্ঠ্যাধিকরণের ভাষ্যে এই সংশয়ের নিরাকরণ করিতেছেন—

মুখ্যপ্রাণ অন্যান্য প্রাণ (–ইন্দ্রিয়) সকলের ন্যায় ব্রহ্মের কার্য্য, ইহা ভগবান সূত্রকার বাদরায়ণ অতিদেশ করিতেছেন। আর অবিশেষভাবে (মুখ্য ও অমুখ্য) সকল প্রাণেরই সেই ব্রহ্মবিকারতা (—তাহারা ব্রহ্ম হইতে উৎপন্ন, ইহা ২/৪/১ অধিকরণে) বর্ণিত হইয়াছে। যেহেতু-

'এতস্মাজ্জায়তে প্রাণো মনঃ সর্বেন্দ্রিয়াণি চ'-(মুণ্ডক উপনিষৎ- ২/১/৩)

"ইঁহা (–ব্রহ্ম) হইতে মুখ্য প্রাণ মন ও ইন্দ্রিয়সকল উৎপন্ন হয়", এই প্রকারে ইন্দ্রিয়ের সহিত মন হইতে ভিন্নভাবে মুখ্যপ্রাণের উৎপত্তি শ্রুত হইতেছে। আর যেহেতু-

'স প্রাণমসৃজত'-(প্রশ্ন উপনিষৎ-৬/৪)

"তিনি প্রাণকে সৃষ্টি করিলেন" ইত্যাদি শ্রুতিসকলও আছে।

আচ্ছা তাহলে কোন প্রয়োজনে অতিদেশ হইতেছে? অধিক আশঙ্কাকে নিরাকরণ করিবার জন্য। নাসদীয় নামক ব্রহ্মপ্রধান সূক্তে এইপ্রকার মন্ত্রবর্ণ আছে–

'ন মৃত্যুরাসীদমৃতং ন তর্হি ন রাত্র্যা অহ্ন আসীত্প্রকেতঃ৷ আনীদবাতং স্বধয়া তদেকং তস্মাদ্ধান্যন্নপরঃ কিংচনাস'।।-(ঋগ্বেদ্ সংহিতা-১০/১২৯/২)

"তখন (–মহাপ্রলয়কালে) মৃত্যু (–বিনাশশীল কার্য্য বস্তু) ছিল না, অমৃত ছিল না, রাত্রি ও দিনের প্রকেত (–চিহ্ন, অর্থাৎ চন্দ্র ও সূর্য) ছিল না, স্বধার (–স্বকর্ত্তৃক ধৃতা মায়ার) সহিত অবাত (–প্রাণবায়ুবর্জিত, অবিক্রিয়) সেই এক ব্রহ্ম আনীৎ (–বর্ত্তমান) ছিলেন, তাঁহা হইতে শ্রেষ্ঠ কিছুই ছিল না", ইত্যাদি।

"আনীৎ" এই প্রকারে মুখ্যপ্রাণের কর্ম্ম গৃহীত হওয়ায় এই শ্রুতিবাক্য জগতের উৎপত্তির পূর্ব্বে প্রাণের অস্তিত্ব বর্তমান আছে অর্থাৎ প্রাণ অজ (–জন্মরহিত) এই প্রকার বুদ্ধি কাহারও কাহারও উৎপন্ন হয়। ভগবান সূত্রকার তাদৃশ বুদ্ধিকে অতিদেশের দ্বারা অপনোদন করিতেছেন। যথা—

আনীৎ শব্দটিও উৎপত্তির পূর্বে মুখ্যপ্রানের অস্তিত্ব সূচনা করিতেছে না; যেহেতু অবাত (–প্রাণবায়ুরহিত), এইপ্রকার বিশেষণ আছে। আর

'অপ্রাণো হ্যমনাঃ শুভ্রঃ'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-২/১/২)

"সেই অক্ষর পুরুষ প্রাণরহিত মনোবিহীন এবং শুদ্ধ", এইপ্রকারে মূলপ্রকৃতির (–জগতের মূলকারণ ব্রহ্মের) প্রাণাদি সমস্ত বিশেষরাহিত্য প্রদর্শিত হওয়ায় মহাপ্রলয়ে মুখ্যপ্রাণের সত্তা সিদ্ধ হয় না। সেইহেতু নাসদীয় সূক্তের এই "আনীৎ" শব্দটি মহাপ্রলয়ে ব্রহ্মরূপ কারণের অস্তিত্ব প্রদর্শনের জন্য, ইহা অবগত হইতে হইবে।

 

Monday, 27 December 2021

মুখ্য প্রাণ ও ইন্দ্রিয়ের উৎপত্তিঃ-

 

সদানন্দযোগীন্দ্র সরস্বতী বেদান্তসারে বলিতেছেন-"পণ্ডিতেরা সেই প্রথমোৎপন্ন আকাশাদি পঞ্চভূতকে সূক্ষ্মভূত, তন্মাত্রা ও অপঞ্চীকৃত মহাভূত বলিয়া থাকেন।"-(বেদান্তসারঃ, ৫৯)

অপঞ্চীকৃত পঞ্চ সূক্ষ্মভূতকে পণ্ডিতেরা তন্মাত্র বলেন কেন?

ভগবান শঙ্করাচার্যের "অহংকারাৎ পঞ্চতন্মাত্রাণি" এই পঞ্চীকরণ সূত্রের বার্ত্তিকাভরণম্ এ অভিনবনারায়ণেন্দ্র সরস্বতী বলছেন-

বিষ্ণুপুরাণেও এইরূপ উক্ত হয়েছে- 'শব্দ স্পর্শাদি বিশেষ বিশেষ ধর্ম আকাশাদি পৃথক্ পৃথক্ ভূত সকলে তাদাত্ম্য সম্বন্ধেই থাকে, অন্যত্র থাকে না। অর্থাৎ শব্দ আকাশেই থাকে, স্পর্শ বায়ুতেই থাকে ইত্যাদি। এইজন্য স্মৃতি শাস্ত্রে উহাদের নাম তন্মাত্র বলা হয়েছে।'

সূক্ষ্মশরীর কি?

সদানন্দযোগীন্দ্র সরস্বতী বেদান্তসারে বলিতেছেন- "আকাশাদি এইসকল পাঁচটি সূক্ষ্মভূত থেকে সূক্ষ্মশরীর সকল উৎপন্ন হয়। সতেরটি অবয়ব বিশিষ্ট লিঙ্গশরীরকে সূক্ষ্মশরীর বলে। পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়, পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয়, পাঁচটি বায়ু, মন ও বুদ্ধি- এই সতেরোটি অবয়ব নিয়ে সূক্ষ্মশরীর গঠিত।"-(বেদান্তসার,৬০-৬২)

লিঙ্গশরীর কেন বলা হয়?

তদুত্তরে বলিব, ইহার দ্বারা আত্মা জ্ঞাপিত হয় বলিয়া ইহাকে বলা হয় 'লিঙ্গ'।

আনন্দ গিরি পঞ্চীকরণ বিবরণে তাহাই বলিতেছেন- "এই লিঙ্গ কোন প্রকারে প্রত্যাগাত্মার জ্ঞাপক- এইকারণে‌ ইহাকে 'লিঙ্গ' এইরূপে ব্যাখ্যা করা হয়। এই লিঙ্গের কার্য্যত্ব বলিয়া ফলতঃ ভৌতিকত্ব বলায় লিঙ্গে অহম্ অভিমান অর্থাৎ 'লিঙ্গই আমি' এইরূপ অভিমান অপ্রামাণিক- ইহাই মনে করিতেছেন। অতএব এই অপঞ্চীকৃত ভূতপঞ্চক্বই লিঙ্গ। এই পূর্বোক্ত সপ্তদশ অবয়বযুক্ত লিঙ্গ ভূতকার্য বলিয়া ভৌতিক।"-(পঞ্চীকরণ বিবরণ-১৩)

বেদান্ত মীমাংসা শাস্ত্রের প্রাণোৎপত্ত্যধিকরণের প্রতিপাদ্য বিষয় পরমেশ্বর হইতে আকাশাদির ন্যায় ইন্দ্রিয়াদিও উৎপন্ন হইয়াছে। এক্ষণে সেই আকাশাদি মহাভূত হইতে লিঙ্গশরীরের উৎপত্তি বিষয়ক আলোচনার সূচনা হইবে। ইন্দ্রিয়সকল কি অনাদি অথবা পরমেশ্বর কর্তৃক সৃষ্ট হয়? এই প্রশ্নের উত্তরে ভগবান সূত্রকার বাদরায়ণ বলিতেছেন-

তথা প্রাণাঃ ৷৷ ব্রহ্মসূত্র ২.৪.১৷৷

ভগবান ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য শারীরক মীমাংসা ভাষ্যে বলিতেছেন- এই স্থলে প্রাণ সকলের (-মুখ্য প্রাণ ও ইন্দ্রিয়সকলের) উৎপত্তিবোধক শ্রুতি বাক্যসকলই উদাহরণ, যথা-

'এতস্মাদাত্মনঃ সর্বে প্রাণাঃ সর্বে লোকাঃ সর্বে দেবাঃ সর্বাণি ভূতানি ব্যুচ্চরন্তি'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-২।১।১০)

"এই আত্মা হইতে সকল প্রাণ, সকল লোক, সকল দেবতা এবং সকল প্রাণী নানাভাবে উদ্গত হয়।"

উক্ত শ্রুতিবাক্যে যেমন লোক প্রভৃতি পরব্রহ্ম হইতে উৎপন্ন হয়, 'তথা'(-তদ্রূপ) প্রাণসকলও উৎপন্ন হয়, ইহাই অর্থ।

এইপ্রকারে 'এতস্মাজ্জায়তে প্রাণো মনঃ সর্বেন্দ্রিয়াণি চ৷ খং বায়ুর্জ্যোতিরাপঃ পৃথিবী বিশ্বস্য ধারিণী'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-২।১।৩)

"ইঁহা হইতে প্রাণ, মন, ইন্দ্রিয়সকল, আকাশ, বায়ু, বহ্নি, জল এবং সকলের আধারভূতা পৃথিবী উৎপন্ন হয়।"

ইত্যাদি এইসকল শ্রুতিবাক্যেও আকাশাদির ন্যায় প্রাণ সকলের উৎপত্তি শ্রুত হয়। সুতরাং প্রাণসকল যে বিকার (-কার্য্য বস্তু) শ্রুতিপ্রমাণ হেতু তাহা সিদ্ধ হইল।

আবার ছান্দোগ্য শ্রুতিতে স্পষ্টতই বুঝাইতেছে যে, যে-ভূতবর্গ স্বয়ং ব্রহ্ম হইতে জাত সেই ভূতবর্গ হইতেই ইন্দ্রিয়াদি উৎপন্ন হইয়াছে। ছান্দোগ্যের এই প্রকরণেই বাগিন্দ্রিয়, প্রাণ ও মনের যথাক্রমে তেজঃ, জল ও ক্ষিতি হইতে উৎপত্তি পঠিত হইতেছে, যথা-

'অন্নময়ং হি সোম্য মন আপোময়ঃ প্রাণস্তেজোময়ী বাক্'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।৫।৪)

"হে সৌম্য, মন অন্নের বিকার (-কার্য্য), প্রাণ জলের বিকার এবং বাগেন্দ্রিয় তেজের বিকার" ইত্যাদি। এইস্থলে ক্ষিত্যাদি পরম্পরাতে প্রাণসকলের (-মুখ্য প্রাণ ও ইন্দ্রিয়সকলের) ব্রহ্মকার্য্যতাই সিদ্ধ হয়।........

Thursday, 9 December 2021

প্রলয়কালে সৃষ্টির বিপরীতক্রমে ভূতসকলের লয়ঃ-


অদ্বৈতবেদান্তে সৃষ্টিক্রম বিষয়ক ধারাবাহিক আলোচনায় আজকের আলোচ্য বিষয় প্রলয়ে উৎপত্তিক্রমের বৈপরীত্য। বেদান্ত মীমাংসা শাস্ত্রের বিপর্যয়াধিকরণম্ এর প্রতিপাদ্য বিষয় প্রলয়কালে সৃষ্টির বিপরীতক্রমে ভূতবর্গ লয় প্রাপ্ত হয়। এখন প্রশ্ন হইতেছে- বিশ্বের প্রলয়ের সময় পদার্থসমূহ যে ব্রহ্মে লীন হয় তাহা কি সৃষ্টিকালীন ক্রমানুসারে না বিপরীতক্রমে? ভগবান সূত্রকার বাদরায়ণ সিদ্ধান্ত করিতেছেন-

বিপর্যয়েণ তু ক্রমোত উপপদ্যতে চ৷৷ ব্রহ্মসূত্র-২.৩.১৪

ভগবান ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য এই সূত্রের ভাষ্যে সিদ্ধান্ত করিতেছেন- সেহেতু আমরা বলিতেছি- প্রলয়ের ক্রম এই উৎপত্তিক্রম হইতে বিপরীতভাবেই হওয়া উচিত। যেহেতু লোকমধ্যে সেইপ্রকারই পরিদৃষ্ট হইতেছে, যে ক্রমে সোপানে আরূঢ় হয়, তাহার বিপরীতক্রমে অবরোহন করে। আর দেখাও যাইতেছে- মৃত্তিকা হইতে উৎপন্ন ঘট ও শরা প্রভৃতি বিলয়কালে মৃত্তিকাভাবই প্রাপ্ত হয়, আবার জল হইতে উৎপন্ন হিমশিলা প্রভৃতি বিলয়কালে মৃত্তিকাভাবই প্রাপ্ত হয়, ইত্যাদি। এইহেতু ইহা সঙ্গত যে, পৃথিবী জল হইতে উৎপন্ন হইয়া স্থিতিকাল অতীত হইলে জলে লয় প্রাপ্ত হইবে, আর জলও তেজঃ হইতে উৎপন্ন হইয়া তেজে লয় প্রাপ্ত হইবে। এই প্রকারে ক্রমশঃ সূক্ষ্ম ও সূক্ষ্মতর অনন্তর অনন্তর কারণে লয় প্রাপ্ত হইয়া সমস্ত কার্য্য-প্রপঞ্চ পরমকারণ ও পরমসূক্ষ্ম ব্রহ্মে বিলীন হয়, এইপ্রকার অবগত হইতে হইবে। যেহেতু নিজের কারণকে অতিক্রম দ্বারা কারণ এর কারণে কার্য্যের বিলয় ন্যায্য নহে। স্মৃতিতেও তত্তৎস্থলে-

জগত্প্রতিষ্ঠা দেবর্ষে পৃথিব্যপ্সু প্রলীয়তে৷ জ্যোতিষ্যাপঃ প্রলীৎন্তে জ্যোতির্বায়ৌ প্রলীয়তে'-(মহাভারত, শান্তিপর্ব-৩৩৯।২৯)

"হে দেবর্ষি, জগতের প্রতিষ্ঠা (উপাদান) পৃথিবী জলে প্রলীন হয়, জল তেজে প্রলীন হয়, তেজঃ বায়ুতে প্রলীন হয়", ইত্যাদি এইসকল স্থলে উৎপত্তিক্রমের বিপরীতভাবেই প্রলয়ের ক্রম প্রদর্শিত হইয়াছে।

উৎপত্তিক্রম কিন্তু ভুতসকলের উৎপত্তিতেই শ্রুত হইয়াছে বলিয়া প্রলয়েও গৃহীত হইতে পারে না। আর তাহা (—সেই শ্রৌত উৎপত্তিক্রম) অযোগ্য হওয়ায় প্রলয়কর্ত্তৃক আকাঙ্ক্ষিত হয় না, কার্য্য ধ্রিয়মাণ (—কারণাবলম্বনে বর্ত্তমান) থাকিলে কারণের প্রলয় নিশ্চয়ই সঙ্গত নহে, যেহেতু কারণের নাশ হইলে কার্য্যের অবস্থান যুক্তিসঙ্গত নহে। কিন্তু কার্য্যের বিনাশ হইলে কারণের অবস্থান যুক্তিসঙ্গত, যেহেতু মৃত্তিকা প্রভৃতিতে এইপ্রকার পরিদৃষ্ট হয়।

Wednesday, 24 November 2021

পূর্ব্ব কার্য্যোপাধিক ব্রহ্ম উত্তর কার্য্যের কারণঃ-

অদ্বৈতবেদান্তের সৃষ্টিক্রম বিষয়ক ধারাবাহিক আলোচনায় আজকের আলোচ্য বিষয় হইল-পরমেশ্বরের ধ্যানের দ্বারাই সৃষ্টি-ক্রমের ধারা চলিতেছে। ব্রহ্মই আকাশাদির অন্তরাত্মারূপে বর্ত্তমান থাকিয়া পর পর সৃষ্টি রচনা করেন। ব্রহ্মেরই একমাত্র সৃষ্টিকর্ত্তার লক্ষণ আছে, আকাশাদির নাই। আকাশাদির স্রষ্টৃত্ব মূলত ব্রহ্মেরই কর্ত্তৃত্ব। বেদান্তমীমাংসা শাস্ত্রের তদভিধ্যানাধিকরণের প্রতিপাদ্য বিষয় পূর্ব্বকার্য্যরূপ উপাধিযুক্ত ব্রহ্ম হইতে উত্তরকার্য্যোৎপত্তি।

তদভিধ্যানাদেব তু তল্লিঙ্গাত্সঃ ৷৷ ব্রহ্মসূত্র ২.৩.১৩ ৷৷

ভগবান্ ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য্য ভাষ্যে বলিতেছেন- এই আকাশাদি ভূতসকল কি নিজেই নিজের কার্য্যসকলকে সৃজন করে, অথবা পরমেশ্বরই সেই সেই স্বরূপে অবস্থানকরতঃ অভিধ্যান করিয়া সেই সেই কার্য্যকে সৃজন করেন, এইপ্রকার সন্দেহ হইলে, একপক্ষ বলেন-আকাশাদি ভূতসকল নিজেই নিজ নিজ কার্য্যকে সৃজন করে, কিভাবে?- যেহেতু 'আকাশ হইতে বায়ু উৎপন্ন হইল', 'বায়ু হইতে অগ্নি উৎপন্ন হইল'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২।১), ইত্যাদিরূপে স্বাতন্ত্র্য শ্রুত হইতেছে। কিন্তু স্বতন্ত্র অচেতন ভূতসকলের প্রবৃত্তি প্রতিষিদ্ধ হইয়াছে, তদুত্তরে তাহারা বলিতেছেন-ইহা দোষ নহে, যেহেতু 'সেই তেজঃ ঈক্ষণ করিলেন', 'সেই জল ঈক্ষণ করিলেন'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।২।৩,৪)-এই প্রকারে ভূতসকলের চৈতন্য শ্রুত হইতেছে।

এইপ্রকার অপসিদ্ধান্ত প্রাপ্ত হইলে কথিত হইতেছে, সেই পরমেশ্বরই সেই সেই স্বরূপে (-তত্তৎ ভূতরূপ উপাধিযুক্তরূপে) অবস্থান করিয়া অভিধ্যান (-ঈক্ষণ) করতঃ সেই সেই পরবর্ত্তী কার্য্যকে সৃষ্টি করেন। কোন প্রমাণ বলে? যেহেতু তদ্বোধক লিঙ্গপ্রমাণ আছে। সেই বিষয়ে শাস্ত্র এই-

'যঃ পৃথিব্যাং তিষ্ঠন্যঃ পৃথিব্যা অন্তরো যং পৃথিবী ন বেদ যস্য পৃথিবী শরীরং যঃ পৃথিবীমন্তরো যময়তি' -(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৩।৭।৩)

"যিনি পৃথিবীতে অবস্থান করেন, যিনি পৃথিবীর অভ্যন্তরবর্ত্তী, পৃথিবীদেবতা যাঁহাকে জানেন না, পৃথিবী যাঁহার শরীর, যিনি অভ্যন্তরে থাকিয়া পৃথিবীদেবতাকে নিয়মন করেন", ইত্যাদি এইজাতীয় শাস্ত্র অধ্যক্ষবিশিষ্ট ভূতসকলেরই প্রবৃত্তি প্রদর্শন করিতেছেন।

'সোকামযত বহু স্যাং প্রজাযেযেতি' ইতি প্রস্তুত্য, 'সচ্চ ত্যচ্চাভবৎ"-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২।৬)

এইরূপে "তিনি কামনা করিয়াছিলেন-বহু হইব, প্রকৃষ্টরূপ উৎপন্ন হইব", এইরূপ আরম্ভ করিয়া "তিনি সৎ (-স্থুল) এবং ত্যৎ (-সূক্ষ্ম) হইলেন।' এবং

'তদাত্মানং স্বয়মকুরুত'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২।৭)

"তিনি নিজেই নিজেকে এইরূপ করিয়াছিলেন", ইত্যাদি শ্রুতিসকল তাঁহারই সর্ব্বাত্মভাব প্রদর্শন করিতেছেন।

আর জল ও তেজের যে ঈক্ষণের কথা শ্রুতিতে বর্ণিত হইয়াছে, তাহাকে পরমেশ্বরের আবেশ (-অন্তর্যামিরূপে সম্বন্ধ) বশতঃই অবগত হইতে হইবে, যেহেতু-

'নান্যোতোস্তি দ্রষ্টা'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৩।৭।২৩)

"ইঁহা হইতে ভিন্ন দ্রষ্টা কেহ নাই", এই প্রকারে অন্য ঈক্ষণকর্ত্তারও প্রতিষেধ হইয়াছে। আর যেহেতু-

'তদৈক্ষত বহু স্যাং প্রজায়েয়েতি'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।২।৩)

'"তিনি (-সেই সদ্রূপ পরমেশ্বর) ঈক্ষণ করিলেন-বহু হইব প্রকৃষ্টরূপে উৎপন্ন হইব", ইত্যাদি এইস্থলে সৎস্বরূপ ঈক্ষণকর্ত্তা (-পরমেশ্বর) প্রস্তাবিত হইয়াছেন।

 

Saturday, 6 November 2021

জলোপাধিক ব্রহ্ম হইতে পৃথিবীর উৎপত্তিঃ-

 


অদ্বৈতবেদান্তে সৃষ্টিক্রম বিষয়ক ধারাবাহিক আলোচনায় আজকের আলোচ্যবিষয় পৃথিবীর উৎপত্তি। ভগবান্ বাদরায়ণের বেদান্তমীমাংসা শাস্ত্রের 'পৃথিব্যধিকরণম্' এর প্রতিপাদ্য বিষয় জলভাবাপন্ন ব্রহ্ম হইতে পৃথিবীর উৎপত্তি হয়।

পৃথিব্যধিকাররূপশব্দান্তরেভ্যঃ ৷৷ ব্রহ্মসূত্র-২।৩।১২৷৷

এই সূত্রে ভগবান ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য্যের ভাষ্য হইল-'তা আপ ঐক্ষন্ত বহ্ব্যঃ স্যাম প্রজাযেমহীতি তা অন্নমসৃজন্ত'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।২।৪) "তাহা (-সেই জল) ঈক্ষণ করিল 'বহু হইব, প্রকৃষ্টরূপে উৎপন্ন হইব', তাহা অন্নকে সৃষ্টি করিল", এইপ্রকার শ্রুত হইতেছে। সেই স্থলে সংশয় হয়-এই 'অন্ন' শব্দের দ্বারা কি ধান্য ও যবাদি এবং ভক্ষণযোগ্য ভোজ্যবস্তু প্রভৃতি কথিত হইতেছে, অথবা পৃথিবী কথিত হইতেছে?

পূর্বপক্ষীয়গণ (ভিন্ন মতাবলম্বী) বলেন যে সেই স্থলে ধান্য যবাদি ও ভোগ্যবস্তু প্রভৃতিকে গ্রহণ করিতে হইবে, যেহেতু লোকমধ্যে তাহাতে 'অন্ন' শব্দের প্রসিদ্ধি আছে। আর এই শ্রুতিবাক্যশেষও এই অর্থকে পুষ্ট করিতেছে, যথা-'তস্মাদ্যত্র ক্বচন বর্ষতি তদেব ভূযিষ্ঠমন্নং ভবতি'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।২।৪) "সেইহেতু যেখানেই বর্ষণ হয়, সেখানেই প্রচুর অন্ন উৎপন্ন হয়", ইত্যাদি। দেখ, বর্ষণ হইলে ধান্য ও যবাদিই প্রচুর হয়, পৃথিবী নহে।

এইপ্রকার পূর্বপক্ষ প্রাপ্ত হইলে বলিতেছি- জল হইতে উৎপদ্যমানরূপে এই পৃথিবীই অন্ন শব্দের দ্বারা বিবক্ষিত হইতেছে। কোন হেতুবলে বলিতেছ? যেহেতু অধিকার (-প্রকরণপ্রমাণ) আছে, রূপ (-লিঙ্গপ্রমাণ) আছে এবং অন্য শ্রুতিবাক্যও আছে।

'তত্তেজোসৃজত' 'তদপোসৃজত'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।২।৩)

"তিনি তেজকে সৃষ্টি করিলেন", "তিনি জলকে সৃষ্টি করিলেন", এইপ্রকার মহাভূতবিষয়ক তদুৎপত্তিপ্রতিপাদক প্রকরণপ্রমাণ বর্ত্তমান আছে। সেইস্থলে ক্রমপ্রাপ্ত পৃথিবীরূপ মহাভূতকে লঙ্ঘন করিয়া অকস্মাৎ ধান্য প্রভৃতির গ্রহণ ন্যায্য নহে।

আবার এইরূপে বাক্যশেষে পৃথিবীর অনুগুণ (অনুকূল) রূপও পরিদৃষ্ট হইতেছে-

'যত্কৃষ্ণং তদন্নস্য'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।৪।১) "যাহা কৃষ্ণবর্ণ তাহা অন্নের", ইত্যাদি। ভক্ষণযোগ্য অন্ন প্রভৃতির কৃষ্ণত্বনিয়ম অর্থাৎ তাহাদের বর্ণ কৃষ্ণই হইবে এইপ্রকার নিয়ম নিশ্চয় নাই, আর ধান্য প্রভৃতিরও তাহা নাই। কিন্তু পৃথিবীরও কৃষ্ণত্বনিয়ম নিশ্চয়ই নাই, যেহেতু দুগ্ধের ন্যায় শ্বেতবর্ণ ও অঙ্গারের ন্যায় লোহিতবর্ণ ক্ষেত্রপরিদৃষ্ট হয়। তদুত্তরে বলিব, ইহা দোষ নহে, যেহেতু বাহুল্যকে অপেক্ষা করে। যেহেতু পৃথিবীরই কৃষ্ণবর্ণের প্রাচুর্য্য আছে, শ্বেত ও লোহিতবর্ণের তাদৃশ প্রাচুর্য্য নাই। পৌরাণিকগণও পৃথিবীর ছায়াকে শর্বরীরূপে (রাত্রিরূপে) উপদেশ করেন; আর তাহা কৃষ্ণবর্ণা এইহেতু পৃথিবীর বর্ণ কৃষ্ণ, ইহা যুক্তিসঙ্গত।

আবার মহাভূতের উৎপত্তিবিষয়ক সমান প্রকরণে পঠিত অন্য শ্রুতিও আছে, যথা-

'অদ্ভ্যঃ পৃথিবী'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২।১)

"জল হইতে পৃথিবী উৎপন্ন হইল" এবং

'তদ্যদপাং শর আসীত্তত্সমহন্যত সা পৃথিব্যভবত্'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-১।২।২)

"সেইস্থলে জলের উপর শরের ন্যায় যাহা ছিল, তাহা গাঢ়তা প্রাপ্ত হইল, তাহাই হইল পৃথিবী", ইত্যাদি।

কিন্তু পৃথিবী হইতে ধান্য প্রভৃতির উৎপত্তি শ্রুতি প্রদর্শন করিতেছেন-

'পৃথিব্যাঃ ওষধয়ঃ ওষধীভ্যোন্নম্'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২।১)

"পৃথিবী হইতে ওষধিসকল এবং ওষধিসকল হইতে অন্ন উৎপন্ন হইল।"

এইপ্রকারে পৃথিবীর প্রতিপাদক প্রকরণ, লিঙ্গ ও অন্যশ্রুতিপ্রমাণ বর্ত্তমান থাকায় ছান্দোগ্যপঠিত 'অন্ন' শব্দ হইতে ব্রীহি প্রভৃতির জ্ঞান কি প্রকারে হইবে? লৌকিক প্রসিদ্ধিও উক্তপ্রকরণ প্রমাণাদির দ্বারা বাধিত হইতেছে। আর ঐ ছান্দোগ্য শ্রুতির বাক্যশেষও ভক্ষণীয় অন্ন পৃথিবী হইতে উৎপন্ন হওয়ায় তাহাকে দ্বার করিয়া পৃথিবীরই জল হইতে উৎপত্তি সূচনা করিতেছে, এইপ্রকার বুঝিতে হইবে। সেইহেতু এই পৃথিবীই অন্ন শব্দবাচ্য।

Saturday, 25 September 2021

তেজোপাধিক (-তেজোভাবাপন্ন) ব্রহ্ম হইতে জলোৎপত্তিঃ-

 


অদ্বৈতবেদান্তে সৃষ্টিক্রম বিষয়ক ধারাবাহিক আলোচনায় আজকের বিচার্য বিষয় জলোৎপত্তি। পূর্বাধিকরণে তেজের বায়ু হইতে উৎপত্তি কথিত হইয়াছে। এক্ষণে বেদান্তমীমাংসা শাাস্ত্রের অবধিকরণম্ এ ভগবান্ সূত্রকার বাদরায়ণ বলিতেছেন-

আপঃ ৷৷ ব্রহ্মসূত্র ২.৩.১১৷৷

ভগবান ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য্য ভাষ্য করিতেছেন-জল তেজঃ হইতে উৎপন্ন হয়। কিন্তু বহ্নি ও জলের বিরোধ থাকায় কোন হেতুবলে বলিতেছ? উত্তর-যেহেতু

'তদপোসৃজত'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।২।৩)

"তিনি (-সেই তেজোপাধিক সৎ) জলকে সৃষ্টি করিলেন"

'অগ্নেঃ আপঃ'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২।১)

"অগ্নি হইতে জল উৎপন্ন হইল", ইত্যাদি শ্রুতি সেইপ্রকার বলিতেছেন। এইরূপ বচন থাকায় সংশয় হয় না; তেজের সৃষ্টিকে ব্যাখ্যা করিয়া পৃথিবীর ব্যাখ্যা করিতে প্রবৃত্ত ভগবান্ সূত্রকার জলকে মধ্যবর্ত্তী (-তেজঃ ও ক্ষিতির উৎপত্তির মধ্যে জলোৎপত্তিকে নিবিষ্ট) করিতেছি এইপ্রকার 'চিন্তা করিয়া' "আপঃ", এইসূত্রটী রচনা করিয়াছেন।......

 

Friday, 3 September 2021

বায়ুভাবাপন্ন ব্রহ্ম হইতে তেজোৎপত্তিঃ-

 


অদ্বৈতবেদান্তে সৃষ্টিক্রম বিষয়ক আলোচনায় তেজোৎপত্তি বিষয়ক বাক্যসকল আজকের বিচার্য্য বিষয়। ছান্দোগ্যে (৬.২.৩) সৎস্বরূপ ব্রহ্ম হইতে তেজের উৎপত্তি শ্রাবিত হইয়াছে, তৈত্তিরীয়কে (২.১) কিন্তু বায়ু হইতে তেজের উৎপত্তি শ্রাবিত হইয়াছে। এইস্থলে একবাক্যতার সম্ভাবনা বা অসম্ভাবনাবশতঃ সংশয় হয়-বহ্নি ব্রহ্ম হইতে উৎপন্ন হয়, অথবা ব্রহ্মসংযুক্ত বায়ু হইতে?

ভগবান্ সূত্রকার বাদরায়ণ সিদ্ধান্ত করিতেছেন-

তেজোতস্তথাহ্যাহ ৷৷ ব্রহ্মসূত্র ২.৩.১০৷৷

ভগবান্ ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য্য ভাষ্য করিতেছেন-এইপ্রকার শঙ্কা প্রাপ্ত হইলে কথিত হইতেছে-তেজঃ ইহা হইতে, অর্থাৎ বায়ু হইতে উৎপন্ন হয়। তাহাতে প্রমাণ কি? যেহেতু শ্রুতি সেইপ্রকারই বলেন, যথা-

'বায়োরগ্নিঃ'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২।১)

'বায়ু হইতে অগ্নি উৎপন্ন হইল', ইত্যাদি।

তেজঃ অব্যবহিত ব্রহ্মজ (-সাক্ষাৎভাবে ব্রহ্ম হইতে উৎপন্ন) হইলে, বায়ু হইতে উৎপন্ন না হইলে এই শ্রুতি কদর্থিতা হইয়া পড়িবে। ....

এখন যদি বলা হয়, অন্য শ্রুতিও তেজের ব্রহ্ম হইতে উৎপত্তি বোধ করাইতেছে, যথা-

'তত্তেজোসৃজত'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬.২.৩)

'তিনি তেজকে সৃষ্টি করিলেন।'

তাহা হইলে তো শ্রুতি বিরোধ হইয়া পড়িবে। তদুত্তরে সিদ্ধান্তী বলিতেছেন-না তাহা হয় না, যেহেতু পারম্পর্য্য (-পরম্পরাভাবে ব্রহ্ম হইতে উৎপন্ন) হইলেও এইশ্রুতির বিরোধ হয় না। যেহেতু যখন 'আকাশ ও বায়ু সৃষ্টি করিয়া বায়ুভাবাপন্ন (-বায়ুরূপ উপাধিযুক্ত) ব্রহ্ম তেজকে সৃষ্টি করিলেন', এইপ্রকার কল্পনা করা হয়, তখনও তেজের ব্রহ্ম হইতে উৎপত্তি বিরোধগ্রস্ত হয় না। যেমন উষ্ণ দুগ্ধ গাভীর সাক্ষাৎ কার্য্য, দধি তাহার পরম্পরাপ্রাপ্ত কার্য্য, ছানা তাহার আরও ব্যবহিত কার্য্য, ইত্যাদি সকল স্থলে গাভীকেই কারণরূপে অঙ্গীকার করা হয়। আর ব্রহ্ম আকাশাদি কার্য্যরূপেও অবস্থান করেন, ইহা-

'তদাত্মানম্ স্বয়ম্ অকুরুত'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২।৭)

'তিনি নিজেই নিজেকে নাম ও রূপের দ্বারা অভিব্যক্ত করিয়াছিলেন' ইত্যাদি শ্রুতি প্রদর্শন করিতেছেন।

আর সেইপ্রকার ঈশ্বরস্মরণও (ঈশ্বর শ্রীকৃষ্ণের উক্তিরূপা স্মৃতিও) আছে, যথা-

বুদ্ধির্জ্ঞানমসংমোহঃ ক্ষমা সত্যং দমঃ শমঃ ৷

সুখং দুঃখং ভবোভাবো ভযং চাভযমেব চ ৷৷

অহিংসা সমতা তুষ্টিস্তপো দানং যশোযশঃ৷

ভবন্তি ভাবা ভূতানাং মত্ত এব পৃথগ্বিধাঃ৷৷-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, বিভূতিযোগ-৪,৫)

'অন্তঃকরণের সুক্ষ্মবিষয়ে বোধসামর্থ, আত্মাদি পদার্থের জ্ঞান, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, ক্ষমা, সত্য, বাহ্যেন্দ্রিয় ও অন্তরিন্দ্রিয়ের সংযম, সুখ, দুঃখ, জন্ম, মৃত্যু, ভয়, অভয়, অহিংসা, সমচিত্ততা, সন্তোষ, তপস্যা, দান, ধর্মনিমিত্ত কীর্তি ও অধর্মর্নিমিত্ত অকীর্তি - এইসকল ভিন্ন ভিন্ন ভাব প্রাণীগণের স্ব স্ব কর্মানুসারে আমা হইতেই উৎপন্ন হয়।'

যদিও বুদ্ধি প্রভৃতিকে স্ব স্ব কারণ হইতে উৎপন্ন হইতে প্রত্যক্ষভাবে দেখা যাইতেছে, তাহা হইলেও সকল ভাব পদার্থ সাক্ষাৎ, অথবা পরম্পরাভাবে ঈশ্বরের বংশে জাত হওয়ায় 'আমা হইতে উৎপন্ন' এইপ্রকার উক্তি কখনও অসঙ্গত নহে।

এইভাবে ব্রহ্ম হইতে সাক্ষাৎ অথবা পরম্পরাভাবে উৎপত্তি অঙ্গীকারের দ্বারা যেসকল শ্রুতিতে সৃষ্টির ক্রম বর্ণিত হয় নাই, তাহারা ব্যাখ্যাত হইলে তাহাদের সকলপ্রকার যুক্তিযুক্ততা সিদ্ধ হয়। কিন্তু যেসকল শ্রুতিতে ক্রমবিশিষ্ট সৃষ্টি বর্ণিত হইয়াছে, তাহাদের অন্যপ্রকারে (-পারম্পর্য্য অঙ্গীকার না করিয়া) উপপত্তি হয় না বলিয়া 'উক্তপ্রকারে ব্যাখ্যা করা যায় না'। 'একবিজ্ঞানে সর্ববিজ্ঞান' বিষয়ক প্রতিজ্ঞাও সৎস্বরূপ ব্রহ্মের বংশে উৎপত্তিমাত্রকে অপেক্ষা করে, কিন্তু ব্রহ্ম হইতে অব্যবহিতভাবে উৎপত্তিকে অপেক্ষা করে না, অতএব শ্রুতিবাক্যসকলের মধ্যে বিরোধ নাই।....

 

Friday, 13 August 2021

ব্রহ্মের জন্মরাহিত্যঃ-


অদ্বৈতবেদান্তে সৃষ্টিক্রম বিষয়ক ধারাবাহিক আলোচনায় ব্রহ্ম হইতে পর্যায়ক্রমে আকাশ ও বায়ুর উৎপত্তি সিদ্ধ হইয়াছে। এইরূপ তাহাদের উৎপত্তি শ্রবণ করিয়া 'ব্রহ্মেরও কোন কিছু হইতে উৎপত্তি হইতে পারে' ইহা কাহারও মনে হইতে পারে। অতএব এখন প্রশ্ন হইতেছে ব্রহ্মও কি আকাশ ইত্যাদির ন্যায় একটী কার্য? ব্রহ্মসূত্রের অসংভবাধিকরণম্ এ ভগবান্ সূত্রকার বাদরায়ণ তাহাই সমাধান করিতেছেন-

অসম্ভবস্তু সতোনুপপত্তেঃ ৷৷- (ব্রহ্মসূত্র-২.৩.৯)

শাঙ্করভাষ্যে ভগবান্ ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য বলিতেছেন-সেই আশঙ্কাকে অপনোদন করিবার জন্য 'অসম্ভবস্তু' এই সূত্র আরব্ধ হইয়াছে। সৎস্বরূপ ব্রহ্মের অন্য কোন কিছু হইতে সম্ভব, অর্থাৎ উৎপত্তি নিশ্চয়ই আশঙ্কা করা উচিত নহে। কেন নহে? যেহেতু যুক্তিসঙ্গত নহে। যেহেতু ব্রহ্ম সৎস্বরূপ মাত্র। সৎস্বরূপমাত্র হইতেই তাঁহার উৎপত্তি সম্ভব নহে, যেহেতু মৃত্তিকা হইতে ঘটের ন্যায় অতিশয় (-বৈলক্ষণ্য) না থাকিলে কার্য্যকারণভাব সঙ্গত নহে। আর সৎ বিশেষ হইতেও সৎসামান্যস্বরূপ ব্রহ্মের উৎপত্তি সম্ভব নহে, কারণ দৃষ্ট-বিপর্য্যয় অর্থা লোকমধ্যে যে পরিদৃষ্ট হয়, তাহার বিরোধ হইয়া পড়িবে। কারণ সামান্য হইতেই বিশেষসকলকে উৎপন্ন হইতে দেখা যাইতেছে, যেমন মৃত্তিকা প্রভৃতি হইতে ঘট প্রভৃতি; কিন্তু ঘটাদি বিশেষসকল হইতে মৃদাদি সামান্য উৎপন্ন হয় না। আবার অসৎ হইতেও সৎস্বরূপ ব্রহ্মের উৎপত্তি সম্ভব নহে, যেহেতু অসৎ নিরাত্মক অর্থাৎ সত্তাশূন্য এবং যেহেতু 'অসৎ হইতে সৎ কি প্রকারে উৎপন্ন হইবে?' এই প্রকার আক্ষেপ শ্রুত হইতেছে। যথা-

'কথমসতঃ সজ্জায়েত' -(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।২।২)

অর্থাৎ 'অসৎ হইতে সৎ কি প্রকারে উৎপন্ন হইবে?'

'স কারণং করণাধিপাধিপো ন চাস্য কশ্চিজ্জনিতা ন চাধিপঃ'-(শ্বেতাশ্বতর উপনিষৎ-৬।৯)

' তিনি সমস্ত পদার্থের কারণ, করণ (-ইন্দ্রিয়) সকলের অধিপতি জীবেরও অধিপতি, ইঁহার কোন জনক নাই, কোন অধিপতিও নাই।' এই শ্রুতিও ব্রহ্মের জনয়িতাকে নিষেধ করিতেছে।

আর বিভক্ত হওয়ায় আকাশ ও বায়ুর উৎপত্তি কিন্তু প্রদর্শিত হইয়াছে, পরন্তু ব্রহ্মের উৎপত্তি নাই, যেহেতু বিভক্ত অর্থাৎ পরিচ্ছিন্ন হইলে ব্রহ্মত্বই (-নিরতিশয় ব্যাপিত্বই) ব্যাহত হইয়া পড়িবে, এইপ্রকার বৈষম্য আছে। আর কার্য্যবস্তু হইতে কার্য্যবস্তুর উৎপত্তি পরিদৃষ্ট হয় বলিয়া জগৎকারণ ব্রহ্মও কার্য্যবস্তু হইবেন, ইহা সঙ্গত নহে; যেহেতু মূলপ্রকৃতি (-মূলকারণ) অঙ্গীকার না করিলে অনবস্থা হইয়া পড়িবে। যাহা মূলপ্রকৃতিরূপে অঙ্গীকৃত হইতেছে, তাহাই আমাদের ব্রহ্ম, এইহেতুু উপনিষদ্বাক্যসকলের ব্রহ্মে সমন্বয়ে কোন বিরোধ নাই।.....

 

Saturday, 31 July 2021

আকাশভাবাপন্ন ব্রহ্ম হইতে বায়ুর উৎপত্তিঃ-


আমরা অদ্বৈতবেদান্তের সৃষ্টিক্রম বিষয়ে ধারাবাহিক আলোচনা করছিলাম। পূর্বের আলোচনায় ইহা সিদ্ধ হয়েছে যে আকাশ উৎপত্তিশীল অনিত্য পদার্থ। যে যুক্তি বলে আকাশের উৎপত্তি সিদ্ধ হল, বায়ু সম্পর্কেও সেই যুক্তি প্রযোজ্য। বেদান্ত মীমাংসা শাস্ত্রের মাতরিশ্বাধিকরণের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো আকাশভাবাপন্ন ব্রহ্ম হইতে বায়ুর উৎপত্তি হয়।

এতেন মাতরিশ্বা ব্যাখ্যাতঃ ।।-(ব্রহ্মসূত্র-২/৩/৮)

শঙ্করাচার্য ভাষ্যে বলছেন- ইহা অতিদেশ (-এই সূত্রের ব্যাখ্যাতেও আকাশের উৎপত্তিপ্রতিপাদক যুক্তিসকলের প্রয়োগ করিতে হইবে)। "ইহার দ্বারা", অর্থাৎ আকাশবিষয়ক ব্যাখ্যার দ্বারা মাতরিশ্বাও, অর্থাৎ আকাশাশ্রিত বায়ুও ব্যাখ্যাত হইল। এইস্থলেও পূর্বের পক্ষ সকল আলোকপাত করা হইতেছে।

একপক্ষ মনে করেন, ছন্দোগশাখাধ্যায়িগণের উৎপত্তিপ্রকরণে (ছান্দোগ্য উপনিষৎ- ৬/২/৩) পঠিত হয় নাই বলিয়া বায়ু উৎপন্ন হয় না। কিন্তু তৈত্তিরীয়শাখাধ্যায়িগণের উৎপত্তিপ্রকরণে "আকাশাৎ বায়ুঃ"- (তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২/১) অর্থাৎ 'আকাশ হইতে বায়ু উৎপন্ন হইল' এইপ্রকার পাঠ আছে, সুতরাং বিরোধবশত শ্রুতি প্রমাণ নহে, এইরূপ অন্য পক্ষ মনে করেন। আর সেইহেতু শ্রুতিদ্বয়ের বিরোধ হইলে বায়ুর উৎপত্তি প্রতিপাদনকারিণী শ্রুতি গৌণী হবে, যেহেতু বায়ুর উৎপত্তি সম্ভব নহে, ইহা অপর এক পক্ষের অভিপ্রায়। আর সেই বায়ুর উৎপত্তি কেন সম্ভব নহে কারণ-"সা এষা অনস্তমিতা দেবতা যদ্ বায়ুঃ"-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-১/৫/২২) 'সেই এই অবিনাশী দেবতা যাহা বায়ু', এইপ্রকার নাশের প্রতিষেধ আছে এবং যেহেতু "বায়ুশ্চ অন্তরিক্ষং চ এতদ্ অমৃতম্"-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ- ২/৩/৩) এই প্রকারে অমৃতত্ব প্রভৃতি শ্রুত হয়।

এইসব পূর্বপক্ষ প্রাপ্ত হইলে সিদ্ধান্ত এই যে- একবিজ্ঞানে সর্ববিজ্ঞান প্রতিজ্ঞার বাধ হয় না বলিয়া এবং যাহা কিছু কার্য্য বস্তু তাহাদের পরস্পরের বিভাগ অঙ্গীকৃত হয় বলিয়া বায়ু উৎপন্ন হয়, ইহা সিদ্ধান্ত। বৃহদারণ্যকে বায়ুর বিনাশের যে প্রতিষেধ, তাহা অপরবিদ্যাবিষয়ক (উপাসনাতে উপাস্যের স্তুতি প্রতিপাদক, এইহেতু তাহা) আপেক্ষিক, যেহেতু অগ্নি প্রভৃতির ন্যায় বায়ুর স্বকর্ম হইতে বিরাম হয় না। আর বায়ুবিষয়ক যে অমৃতত্বাদির শ্রবণ তাহার প্রতিবিধান করা হইয়াছে অর্থাৎ উপাস্যের স্তুতির জন্য আপেক্ষিক, ইহা বলা হইয়াছে।

 

Saturday, 17 July 2021

আকাশ উৎপত্তিশীল অনিত্য পদার্থঃ-

 


ইতোমধ্যে অদ্বৈতবেদান্তে সৃষ্টিক্রম বিষয়ে তৈত্তিরীয় শ্রুতি অবলম্বনে একটী সংক্ষিপ্ত আলোচনা করিয়াছি। বেদান্ত বা উপনিষৎসকলের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন স্থলে বিভিন্ন প্রকার উৎপত্তিপ্রতিপাদিকা শ্রুতিসকল উপলব্ধ হইতেছে। কেহ কেহ আকাশের উৎপত্তি পাঠ করেন, কেহ কেহ তাহা করেন না। এই প্রকারে কেহ কেহ বায়ুর উৎপত্তি পাঠ করেন, কেহ তাহা করেন না। ছান্দোগ্য শ্রুতিতে বর্ণিত হইতেছে-

'সদেব সোম্যেদমগ্র আসীদেকমেবাদ্বিতীয়ম্'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।২।১) অর্থাৎ "হে প্রিয়দর্শন, ইহা (-এই জগৎ) অগ্রে (-সৃষ্টির পূর্ব্বে) এক অদ্বিতীয় সদ্রূপেই বিদ্যমান ছিল", এই প্রকারে সৎ-শব্দবাচ্য ব্রহ্মের প্রস্তাব করিয়া 'তদৈক্ষত' 'তত্তেজোসৃজত'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।২।৩) "তিনি ঈক্ষণ করিলেন", এবং "তেজকে সৃষ্টি করিলেন", এই প্রকারে পঞ্চমহাভূতের মধ্যে মধ্যম (-তৃতীয় স্থানবর্ত্তী) তেজকে আদি করিয়া তেজঃ জল ও অন্ন (-ক্ষিতি) এই তিনটীর উৎপত্তি শ্রবণ করাইতেছেন। ছান্দোগ্য শ্রুতিতে আকাশের উৎপত্তি নাই। কিন্তু পূর্ব আলোচনায় তৈত্তিরীয় শ্রুতিতে (২।১) "সেই এই আত্মস্বরূপ ব্রহ্মের নিমিত্ত আকাশ উৎপন্ন হইল, আকাশ হইতে বায়ু, বায়ু হইতে অগ্নি, অগ্নি হইতে জল, জল হইতে ক্ষিতি, ক্ষিতি হইতে ওষধিসকল, ওষধিসকল হইতে অন্ন এবং অন্ন হইতে দেহ" এইরূপ বর্ণিত আছে।

আর এই হেতু কোনস্থলে তেজঃপ্রমুখা সৃষ্টি এবং কোন স্থলে আকাশপ্রমুখা সৃষ্টি বর্ণিত হওয়ায় শ্রুতিদ্বয়ের বিরোধ হইতেছে এইরূপ শঙ্কা উৎপন্ন হয়। কেহ কেহ ছান্দোগ্য সৃষ্টিপ্রকরণে পঠিত না হওয়ায় আকাশকে নিত্য পদার্থ জ্ঞান করেন। বৈশেষিক দর্শনকার কণাদের অভিপ্রায় অনুসরণকারীগণ মনে করেন জীবিত থাকিতে আকাশের উৎপত্তির সম্ভাবনা করিতে পারা যায় না। বিরুদ্ধবাদীরা মনে করেন, আকাশের উৎপত্তি অসম্ভব, অতএব আকাশের উৎপত্তিবোধিকা তৈত্তিরীয় শ্রুতিকে গৌণ অর্থে গ্রহণ করা উচিত। অমৃত এবং অনন্ত বলিয়া আকাশের কোন আরম্ভ থাকিতে পারে না। এইসকল শঙ্কার প্রত্যুত্তরে আচার্য বাদরায়ণ বেদান্তমীমাংসা শাস্ত্রে সিদ্ধান্ত করিতেছেন-এক বিজ্ঞানে সর্ব্ববিজ্ঞান সিদ্ধির জন্য আকাশের উৎপত্তি স্বীকার্য। বিজ্ঞেয় ব্রহ্ম হইতে সমগ্র বস্তুজাত অভিন্ন হত্তয়ায়, আত্মবিজ্ঞান হইতে সর্ববিজ্ঞানবিষয়ক যে শ্রুতি প্রতিজ্ঞা তাহার হানি হয় না। ব্রহ্ম হইতে ভিন্ন সত্তাবিশিষ্ট নিত্য আকাশ অঙ্গীকার করিলে সেই প্রতিজ্ঞা পরিত্যক্ত হইয়া পড়িবে। প্রবল তৈত্তিরীয় শ্রুতি বাক্যের সহিত দুর্ব্বল ছান্দোগ্য বাক্যের একবাক্যতা দ্বারা আকাশের উৎপত্তি সমর্থন করা হইতেছে এই সূত্রে-

প্রতিজ্ঞাহানিরব্যতিরেকাচ্ছব্দেভ্যঃ ৷৷-(ব্রহ্মসূত্র-২।৩।৬)

'শাঙ্করভাষ্য' অনুসারে ভাবার্থঃ-আচার্য শঙ্কর ভাষ্য করিতেছেন-

'যেনা অশ্রুতং শ্রুতিং ভবত্যমতং মতমবিজ্ঞাতং বিজ্ঞাতম্'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।১।৩)

"যাঁহার (-যদ্বিষয়ক জ্ঞানের) দ্বারা অশ্রুত বিষয় শ্রুত হয়, অবিজ্ঞাত বিষয় বিজ্ঞাত হয়" ইত্যাদি

'আত্মনি খল্বরে দৃষ্টে শ্রুতে মতে বিজ্ঞাতে ইদং সর্বং বিদিতম্'- (বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪।৫।৬)

"প্রিয়ে, আত্মা দৃষ্ট হইলে, শ্রুত হইলে, বিচারিত হইলে এবং বিজ্ঞাত হইলে এই সমস্তই বিজ্ঞাত হয়" ইত্যাদি;

'কস্মিন্নু ভগবো বিজ্ঞাতে সর্বমিদং বিজ্ঞাতং ভবতি'- (মুণ্ডক উপনিষৎ-১।১।৩)

"হে ভগবন্, কোন্ বস্তুটী বিজ্ঞাত হইলে এই সমস্তই বিজ্ঞাত হয়।" ইত্যাদি এবং " আমার বাহিরে (—আমাকে বিষয় করে না, এতাদৃশ) কোন প্রকার বিদ্যা নাই, আত্মভিন্ন জ্ঞেয় কিছুই নাই", ইত্যাদি এই প্রকার প্রতিজ্ঞা বেদচতুষ্টয়ান্তর্গত প্রত্যেক উপনিষদে অবগত হওয়া যাইতেছে।

সেই প্রতিজ্ঞার এইপ্রকারে অহানি অর্থাৎ বাধাভাব (—অপরিত্যাগ ) হয়, যদি সমগ্র বস্তুজাত বিজ্ঞেয় ব্রহ্ম হইতে অভিন্ন হয়। যেহেতু বস্তু সকল ব্রহ্ম হইতে ভিন্ন হইলে 'একবিষয়ক জ্ঞানের দ্বারা সকল বস্তু বিজ্ঞাত হয়', ইত্যাদি এই প্রতিজ্ঞা ত্যক্ত হইয়া পড়িবে। আর ব্রহ্মের সহিত বস্তু সকলের সেই অভিন্নতা এই প্রকারে যুক্তিসঙ্গত হয়, যদি সমগ্র বস্তুজাত এক ব্রহ্ম হইতে উৎপন্ন হয়।

কিন্তু জীবাদির ন্যায় আকাশ উৎপন্ন না হইলেও যদি ব্রহ্মরূপ অধিষ্ঠানে কল্পিতরূপে অঙ্গীকৃত হয়, তাহা হইলেও উক্ত প্রতিজ্ঞা সিদ্ধ হতে পারে। তদুত্তরে বলিতেছেন —

'প্রকৃতি (—উপাদানকারন) ও বিকার (—তাহার কার্য্য ) অভিন্ন', এই যুক্তির দ্বারাই 'একবিজ্ঞানে সর্ব্ববিজ্ঞানরূপ' প্রতিজ্ঞার সিদ্ধি শব্দ-সকল (শ্রুতিসকল) হইতে অবগত হওয়া যাইতেছে। কি সেই শ্রুতি, তাহা প্রদর্শন করিতেছেন— যেমন দেখ, "যাহার দ্বারা অশ্রুত বিষয় শ্রুত হয় " ইহা প্রতিজ্ঞা করিয়া কার্য্য ও কারণের অভিন্নতা প্রতিপাদনপর মৃত্তিকাদি দৃষ্টান্তসকলের দ্বারা একবিজ্ঞানে সর্ব্ববিজ্ঞানরূপ এই প্রতিজ্ঞা সমর্থিত হইতেছে।

আর তাহা সাধন করিবার জন্যই পরবর্ত্তী শব্দসকল (— শ্রুতিবাক্যসকল )

"হে সোম্য, উৎপত্তির পূর্ব্বে ইহা (—জগৎ ) এক ও অদ্বিতীয় সদ্রূপেই বিদ্যমান ছিল"-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।২।১), "তিনি ঈক্ষণ করিলেন", "তিনি তেজকে সৃষ্টি করিলেন"-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।২।৩), ইত্যাদি এই প্রকারে ব্রহ্মের কার্য্য সকলকে প্রদর্শন করিয়া "এই সকলেই এতদাত্মক অর্থাৎ এই সদাখ্য আত্মার দ্বারা আত্মবান"-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।৮।৭) এইপ্রকারে আরম্ভকরতঃ ছান্দোগ্যের ষষ্ঠ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি পর্য্যন্ত কারণের সহিত কার্যসকলের অভিন্নতা প্রদর্শন করিতেছে।

সেই হেতু আকাশ যদি ব্রহ্মের কার্য্য না হয়, তাহা হইলে ব্রহ্ম বিজ্ঞাত হইলে আকাশ বিজ্ঞাত হইবে না; আর তাহা হইলে 'একবিজ্ঞানে সর্ব্ববিজ্ঞান' প্রতিজ্ঞার পরিত্যাগ হইয়া পড়িবে। প্রতিজ্ঞার পরিত্যাগের দ্বারা কিন্তু বেদের অপ্রমাণ্য সাধন করা যুক্তিসঙ্গত নহে।

যেহেতু দেখ, প্রত্যেক উপনিষদে সেই সেই শ্রুতিসকল প্রতিজ্ঞাটীকেই স্থাপন করিতেছেন, যথা —

'ইদং সর্বং যদয়মাত্মা '-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-২।৪।৬)

"এই সমস্তই 'তাহা', যাহা এই আত্মা",

'ব্রহ্মৈবেদমমৃতং পুরস্তাৎ'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-২।২।১১)

"এই অমৃতস্বরূপ ব্রহ্মই পুরোভাগে অবস্থিত", ইত্যাদি এই সকল।

সেইহেতু (—শ্রৌত প্রতিজ্ঞা এই প্রকারেই সিদ্ধ হয় বলিয়া ) বহ্নি প্রভৃতির ন্যায়ই আকাশই উৎপন্ন হয়, ইহা অঙ্গীকার করিতে হইবে ; স্বকপোলকল্পিত ব্যাখ্যার দ্বারা তাহার অন্যথা করা উচিত নহে।

আর যে বলা হয়েছে 'শ্রুতিতে পঠিত হয় নাই, বলিয়া আকাশ উৎপন্ন হয় না' তাহা যুক্তিসঙ্গত নহে, যেহেতু আকাশের উৎপত্তি-বিষয়ক অন্য শ্রুতি প্রদর্শিত হইয়াছে। যথা— "সেই এই হইতে আকাশ উৎপন্ন হইল"-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২।১) ইত্যাদি। হ্যাঁ সত্য, তাহা প্রদর্শিত হইয়াছে, কিন্তু তাহা "তিনি তেজকে সৃষ্টি করিলেন"-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।২।৩), এই অন্য শ্রুতির সহিত বিরুদ্ধ মনে হয়। না, তাহা বলিতে পারি না, যেহেতু সকল শ্রুতির জন্য একবাক্যতা হইয়া থাকে( —সকল শ্রুতি একই অর্থ প্রতিপাদন করেন )।

আবার শঙ্কা হইল যে- অবিরুদ্ধ শ্রুতিসকলের একবাক্যতা হউক, এখানে কিন্তু তাহাদের মধ্যে বিরোধ কথিত হইয়াছে; যেহেতু একবার মাত্র শ্রুত স্রষ্টার সহিত স্রষ্টব্য পদার্থদ্বয়ের যুগপৎ বা ক্রমশঃ সম্বন্ধ সম্ভব নহেঃ যেহেতু তেজঃ ও আকাশ দুইটীরই যুগপৎ প্রথমে উৎপত্তি ( সমুচ্চয়—) সম্ভব নহে এবং যেহেতু শাখাভেদে তাহাদের উৎপত্তির প্রাথম্য প্রতিপাদনরূপ বিকল্প ও সম্ভব নহে।

উত্তরে সিদ্ধান্তী বলেন— ইহা দোষ নহে, তৈত্তিরীয় তেজের সৃষ্টির তৃতীয়ত্ব অর্থাৎ তৃতীয় স্থলে বর্ণণা শ্রুত হইয়াছে, যথা— সেই এই আত্মা হইতে আকাশ উৎপন্ন হইল, আকাশ হইতে বায়ু, এবং বায়ু হইতে অগ্নি উৎপন্ন হইল ইত্যাদি"। এই শ্রুতিকে কদাপি অন্য প্রকারে পরিণত (—ব্যাখ্যা ) করিতে পারা যায় না। ছান্দ্যোগ্যশ্রুতিকে কিন্তু অন্যপ্রকারে পরিণত করতে পাওয়া যায়, যথা— 'তিনি আকাশ ও বায়ুকে সৃষ্টি করিয়া "তিনি তেজকে সৃষ্টি করিলেন", ইত্যাদি। এই ছান্দ্যোগ্য শ্রুতি প্রধানভাবে তেজের উৎপত্তি প্রতিপাদিকা হইয়া অন্য শ্রুতিতে প্রসিদ্ধ আকাশের উৎপত্তিকে নিশ্চয়ই বারণ করিতে সমর্থ নহে। যেহেতু আকাশকে উৎপত্তি অঙ্গীকৃত হইলে ছান্দ্যোগ্যশ্রুতির সহিত বিরোধ হয় না, ইহা উপরে প্রদর্শিত হইয়াছে। একই ছান্দ্যোগ্য বাক্যের দুইটী ব্যাপার অর্থাৎ উভয়প্রকার অর্থ সম্ভব নহে। কারণ তাহাতে বাক্যভেদদোষ ও অন্যশ্রুতির সহিত বিরোধ হইবে। অতএব ছান্দ্যোগ্যশ্রুতি আকাশের উৎপত্তি নিরাকরণ করিতে পারে না, ইহা সিদ্ধ হইল।

আচ্ছা, একই স্রষ্টার অনেক স্রষ্টব্যের সহিত সম্বন্ধের ন্যায় একই বাক্যের অনেক অর্থ হইবে না কেন? তদুত্তরে সিদ্ধান্তী বলিতেছেন — স্রষ্টা কিন্তু এক হইলেও ক্রমশঃ অনেক স্রষ্টব্যকে সৃষ্টি করিতে পারেন। শ্রুতিবাক্যের অর্থবোধকালে কিন্তু তাহা সম্ভব নহে , এইহেতু একবাক্যতা কল্পনা করা সম্ভব হইলে বিরুদ্ধ অর্থ প্রতিপাদিকারূপে শ্রুতিকে ত্যাগ করা উচিত নহে।

আমরা কিন্তু একবারমাত্র শ্রুত স্রষ্টার সহিত দুইটী স্রষ্টব্য বস্তুর সম্বন্ধ অভিপ্রায় (—স্বীকার ) করিতেছি না, যেহেতু অন্য শ্রুতির (তৈত্তিরীয় শ্রুতির) বলে আকাশাদি অন্য স্রষ্টব্য বস্তু সংগৃহীত হইয়া থাকে।

আর যেমন -'সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম তজ্জলান্'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৩।১৪।১)

"এই সমস্তই ব্রহ্মস্বরূপ, যেহেতু তাঁহা হইতে উৎপন্ন হয়, তাঁহাতেই বিলীন হয় এবং তাঁহাতেই প্রাণনক্রিয়া করে (—স্থিতিকালে তদাশ্রয়েই বর্ত্তমান থাকে" ), এই স্থলে সকল বস্তুর সাক্ষাদ্ভাবেই ব্রহ্ম হইতে যে উৎপত্তি শ্রুত হয়, তাহা যেমন শ্রুতির প্রদেশান্তরে বিহিত তেজঃপ্রমুখ সৃষ্টিক্রমকে বারণ করেন না এইরূপে তেজেরও যে ব্রহ্ম হইতে উৎপত্তি শ্রুত হয় , তাহা অন্য শ্রুতিতে বিহিত আকাশপ্রমুখ সৃষ্টিক্রমকে বারণ করিতে সমর্থ নহে।

এখন আবার শঙ্কা হইল- কিন্তু "সর্ব্বং খলু" ইত্যাদি এই বাক্যটী শম (রাগদ্বেষাদিরাহিত্য) বিধানের জন্য, যেহেতু "তাঁহা হিতে উৎপন্ন হয় এবং তাঁহাতে বিলীন হয় এবং তদাশ্রয়েই প্রাণনক্রিয়া করে, অতএব শান্ত হয়ে উপাসনা করিবে", এইপ্রকার শ্রুত হইতেছে। সুতরাং ইহা সৃষ্টি প্রতিপাদক বাক্যই নহে। সেইহেতু শ্রুতির অন্যস্থলে বিহিত সৃষ্টির ক্রমকে ইহা নিবারণ করিবে, ইহা সঙ্গত নহে। কিন্তু " তৎ তেজোহসৃজত" ইত্যাদি ইহা সৃষ্টিপ্রতিপাদক বাক্য, সেইহেতু শ্রুতিতে যেইপ্রকার বর্ণিত হইয়াছে, সেইপ্রকার ক্রমকেই গ্রহন করা উচিত, ইত্যাদি।

তদুত্তরে কথিত হইতেছে—না, এইপ্রকার বলিতে পার না, যেহেতু তেজের (—তেজঃসৃষ্টির ) প্রাথম্যের অনুরোধে অন্য শ্রুতিতে প্রসিদ্ধ আকাশপদার্থকে পরিত্যাগ করা উচিত নহে, যেহেতু ক্রম পদার্থের (দ্রব্যের) ধর্ম্ম। আর দেখ,

"তিনি তেজকে সৃষ্টি করিলেন", এই স্থলে ক্রমের বাচক কোন শব্দ নাই কিন্তু অর্থ হইতে (—তদপূর্ব্বে অন্য পদার্থের উৎপত্তি শ্রুত না হওয়ায়) ক্রম অবগত হওয়া যাইতেছে (—অনুমতি হইতেছে )।

তাহা (—অনুমতি সেই অশ্রৌত ক্রম ) কিন্তু "বায়ু হইতে অগ্নি উৎপন্ন হইল", শ্রুত্যন্তরে প্রসিদ্ধ তৃতীয় স্থানাপন্ন হওয়ারূপ শ্রৌত ক্রমের দ্বারা নিবারিত হইতেছে; কারণ এতাদৃশ অশ্রৌত ক্রমাপেক্ষা শ্রৌত ক্রম বলবান।

আর আকাশ ও তেজের যুগপৎ প্রথমে উৎপত্তিবিষয়ক যে বিকল্প এবং সমুচ্চয়, তাহারা অসম্ভাবনা ও অস্বীকৃতির দ্বারা নিবারিত হইয়াছে। অতএব তৈত্তিরীয় ও ছান্দোগ্য, এই শ্রুতিদ্বয়ের মধ্যে বিরোধ নাই; সুতরাং তাহারা অপ্রমান নহে।

 

Monday, 21 June 2021

অদ্বৈতবেদান্তে সৃষ্টিক্রমঃ-

 

মায়াবশেই নির্বিকার ব্রহ্মে জগৎ প্রতীতি হইয়া থাকে। ব্রহ্মবিবর্ত জগৎ ব্রহ্মভিন্ন নহে। অতএব এক ব্রহ্মই সদা বিরাজমান রহিয়াছেন। বিবর্তবাদে কার্য একটি মিথ্যা প্রতীত মাত্র; কার্য বস্তুতঃ কোন কালে হয়ই নাই। সৃষ্টির পূর্বে নিত্যমুক্ত অবিক্রিয় এক পরংব্রহ্মই বর্তমান ছিলেন। অর্থাৎ ব্রহ্ম দেশকালরূপ বস্তুপরিচ্ছেদশূন্য, অতএব সৃষ্টিরপূর্বে এক সজাতীয় বিজাতীয়-স্বগতভেদশূন্য পরম অর্থাৎ পরমানন্দস্বরূপ, নিত্যমূক্ত, ত্রিকালেই সর্ব অনর্থরূপ প্রপঞ্চসম্বন্ধশূন্য সচ্চিদানন্দত্মক পরংব্রহ্মই বর্তমান ছিলেন।

শ্রুতিও তাই বলিতেছেন -'সদেব সোম্যেদমগ্র আসীদেকমেবাদ্বিতীয়ম্'- (ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬/২/১)।

‘হে প্রিয়দর্শন, এই জগৎ উৎপত্তির পূর্ব্বে এক অদ্বিতীয় সৎ রূপেই বিদ্যমান ছিল।

এইরূপ অন্যস্থলেও শ্রুতি বলিতেছে-

'আত্মা বা ইদমেক এবাগ্র আসীত্৷ নান্যৎ কিঞ্চন মিষত্৷-(ঐতরেয় উপনিষৎ-১/১/১)

ইহা অর্থাৎ এই জগৎ উৎপত্তির পূর্ব্বে একমাত্র আত্মস্বরূপেই বিদ্যমান ছিল, ব্যাপারবান্ অন্য কিছুই ছিল না।

এইরূপ আরম্ভ করিয়া 'তদৈক্ষত বহু স্যাং প্রজায়েয়েতি তত্তেজোসৃজত'।-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬/২/৩)

'তিনি ইক্ষণ করিলেন, আমি বহু হইব, প্রকৃষ্টরূপে উৎপন্ন হইব, তিনি তেজকে সৃষ্টি করিলেন' ইত্যাদি।

উক্ত শ্রুতিবাক্যে ইদম্ শব্দবাচ্য এবং নাম ও রূপের দ্বারা অভিব্যক্ত এই জগৎকে উৎপত্তির পূর্ব্বে সৎস্বরূপ আত্মরূপে অবধারণ করিয়া সেই প্রস্তাবিত সৎশব্দবাচ্য ব্রহ্মের ইক্ষণপূর্ব্বক তেজঃ প্রভৃতির স্রষ্টৃত্ব প্রদর্শন করিতেছেন। এইরূপ অন্যস্থলেও শ্রুতি বলিতেছে-

'সঃ ঈক্ষত লোকান্নু সৃজা ইতি৷ স ইমা্লোকানসৃজত।'-(ঐতরেয় উপনিষৎ-১/১/২)

সেই আত্মা ঈক্ষণ করিলেন, আমি লোকসমূহকে সৃজন করিব, তিনি এইলোক সকলকে সৃজন করিলেন।' এইপ্রকারে ঈক্ষণপূর্বক সৃষ্টির কথাই শ্রুতি বলিতেছেন।

আবার কোনস্থলে ষোড়শকলাযুক্ত পুরুষের প্রস্তাব করিয়া শ্রুতি বলিতেছেন-'স ঈক্ষাংচক্রে, স প্রাণমসৃজত'।-(প্রশ্ন উপনিষৎ-৬।৩-৪) 'তিনি ঈক্ষণ করিয়াছিলেন'।'তিনি প্রাণকে সৃষ্টি করিয়াছিলেন।'

যঃ সর্বজ্ঞঃ সর্ববিদ্যস্য জ্ঞানময়ং তপঃ৷ তস্মাদেতব্রহ্ম নাম রূপমন্নং চ জায়তে'।(মুণ্ডক উপনিষৎ-১।১।৯)

'যিনি সর্ব্বজ্ঞ এবং সর্ব্ববিৎ, যাহাঁর তপস্যা জ্ঞানময় অর্থাৎ জ্ঞানাত্মক ঈক্ষণক্রিয়াই যাহাঁর তপস্যা, তাঁহা হইতেই এই হিরণ্যগর্ভ, নামরূপ এবং অন্ন উৎপন্ন হয়।'

সেই ব্রহ্মতে শক্তিভূতা এবং নিজেতেই (ব্রহ্মতেই) অধ্যস্তা যে মায়া, মায়াশক্তিবিশিষ্ট সেই আবৃত, সুতরাং অজ্ঞাত ব্রহ্মেই জগৎ প্রপঞ্চ বিক্ষিপ্ত (-সৃষ্ট) হয়। পরমেশ্বরের অধীন এই মায়া ব্যতিরেকে পরমেশ্বরের জগৎস্রষ্টৃত্ব সম্ভব নহে। কারণ যিনি শক্তিরহিত, তাহার (সৃষ্ট্যাদিকর্ম্মে) প্রবৃত্তি যুক্তি সঙ্গত নহে। সেই প্রসিদ্ধা মায়াই অব্যক্ত যা ব্যক্ত নয় তাই অব্যক্ত বা অব্যাকৃত অর্থাৎ ঈশ্বর-শক্তি, যাহা সম্পূর্ণ জগতের বীজভূত অর্থাৎ উপাদান কারণ স্বরূপ।

সদানন্দযোগীন্দ্র সরস্বতী বেদান্তসারে বলিতেছেন—"যেমন রজ্জুর অজ্ঞান রজ্জুকে আবৃত করে রজ্জুতে নিজশক্তির দ্বারা সর্প প্রভৃতি কল্পনা করে, সেরূপ (আত্মাশ্রিত) অজ্ঞান আত্মাকে আবৃত করে আত্মাকে নিজশক্তি বলে আকাশাদি জগৎ সৃষ্টি করে। (এভাবে কল্পনা-বলে) সৃষ্টি করার এই সামর্থ্যকে বিক্ষেপশক্তি বলে। এই সম্পর্কে বাক্যসুধায় শঙ্করাচার্য বলিতেছেন—'বিক্ষেপশক্তি সূক্ষ্মশরীর থেকে আরম্ভ করে ব্রহ্মাণ্ড পর্যন্ত জগৎ সৃষ্টি করে।'-(বাক্যসুধা-১৩)"

মায়াশক্তি বিশিষ্ট ব্রহ্ম হইতে আকাশ, আকাশভাবাপন্ন ব্রহ্ম হইতে বায়ু, ইত্যাদি এই ক্রমে ব্রহ্ম হইতে পঞ্চ অপঞ্চীকৃত ভূতের (তন্মাত্রার) উৎপত্তি হয়। অনন্তর মুখ্যপ্রাণ মন ও ইন্দ্রিয় সকলের উৎপত্তি পরমেশ্বরাধিষ্ঠিত এই ভূতসকল হইতেই হইয়া থাকে। অনন্তর পরমেশ্বর কর্ত্তৃক পঞ্চীকরণ ও স্থুল ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্ট হয়। ইহাই অদ্বৈত বেদান্তে সৃষ্টিক্রম।

প্রথমত সেই ব্রহ্মের ব্যাকৃত সত্তা হইতে আকাশ, আকাশ হইতে বায়ু, বায়ু হইতে অগ্নি, অগ্নি হইতে জল, জল হইতে ক্ষিতি, ক্ষিতি হইতে ওষধিসকল, ওষধিসকল হইতে অন্ন এবং অন্ন হইতে দেহ- এই যে ক্রম, কৃষ্ণ যজুর্বেদীয় তৈত্তিরীয় উপনিষদের দ্বিতীয়া ব্রহ্মানন্দবল্লীতে এর একটী স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়-

তস্মাদ্বা এতস্মাদাত্মন আকাশঃ সম্ভূতঃ । আকাশাদ্বায়ুঃ ।

বায়োরগ্নিঃ । অগ্নেরাপঃ । অদ্ভ্যঃ পৃথিবী ।

পৃথিব্যা ওষধয়ঃ । ওষধীভ্যোন্নম্ । অন্নাৎপুরুষঃ ।

স বা এষ পুরুষোঽন্নরসময়ঃ......॥ ১॥ ইতি প্রথমোঽনুবাকঃ ॥

শঙ্করাচার্য এই শ্রুতির ভাষ্যে বলিতেছেন- সেই এই আত্মস্বরূপ ব্রহ্মের নিমিত্ত আকাশ উৎপন্ন হইল। এখন শব্দগুণসম্পন্ন আকাশ হইতেছে আকারবিশিষ্ট দ্রব্যসকলের স্থানদাতা। আর সেই আকাশ হইতে স্বীয় গুণ 'স্পর্শ' ও পূর্ববর্তী আকাশের শব্দগুণের সহযোগে দুইগুণবিশিষ্ট বায়ু সম্ভূত (উৎপন্ন) হইল। এবং স্বীয় গুণ 'রূপ' ও পূর্ববর্তী (শব্দস্পর্শ) গুণদ্বয়ের সহযোগে বায়ু হইতে ত্রিগুণবিশিষ্ট অগ্নি উৎপন্ন হইল। আর স্বীয় গুণ রস ও পূর্ববর্ত্তী (শব্দস্পর্শরূপ) গুণত্রয়ের সহযোগে অগ্নি হইতে চতুর্গুণবিশিষ্ট জল উৎপন্ন হইল এবং স্বীয় গুণ গন্ধ ও পূর্ববর্তী (শব্দস্পর্শরূপরস) গুণ চতুষ্টয়ের সহযোগে জল হইতে পঞ্চগুণবিশিষ্ট পৃথিবী উৎপন্ন হইল। আর পৃথিবী হইতে ওষধিসমূহ, ওষধিসমূহ হইতে অন্ন। আর রেতোরূপে পরিণত অন্ন হইতে শিরঃ হস্তাদি আকৃতিবিশিষ্ট পুরুষ (মানবদেহ) সমুৎপন্ন হইল।

এই সেই প্রসিদ্ধ পুরুষ (মানবদেহ) অন্নরসময়-অন্নরসের বিকার অর্থাৎ সমস্ত অঙ্গাদি হইতে তেজসম্ভূত পুরুষাকৃতিপ্রাপ্ত রেতোরূপ বীজ হয়। আর সেই বীজ হইতে যে শরীর জন্মে তাহাও সেইরূপ পুরুষাকৃতি বিশিষ্টই হইয়া থাকে, কেননা সকল জাতিতে জায়মানগণের মধ্যে জনকের আকৃতি প্রাপ্তির নিয়ম দেখা যায়।..................

Friday, 31 July 2020

অনাদি সৃষ্টিতে পূর্ব্ব পূর্ব্ব কর্ম্মই উত্তরোত্তর সৃষ্টিবৈচিত্রের হেতু, ঈশ্বর নহেনঃ-


ইতোমধ্যে আলোচনা করিয়াছি জাগতিক বৈষম্য বা ক্রূরতার জন্য ঈশ্বরের প্রতি দোষারোপ করা অনুচিত,কারণ যে প্রাণিগণ সৃষ্ট হয়, তাহাদের ধর্ম্ম ও অধর্ম্মকে অপেক্ষা করিয়া বিষম সৃষ্টি হইয়া থাকে। এখন পুনরায় সূত্রকার শ্রীমৎমহর্ষি বাদরায়ণ ভগবৎ আপত্তি উপস্থাপন পূর্ব্বক সিদ্ধান্ত করিতেছেন এইভাবে-

ন কর্মাবিভাগাদিতি চেৎ, ন, অনাদিত্বাৎ’।। (ব্রহ্মসূত্র-২/১/৩৫)।।

শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- পরমহংসপরিব্রাজক ভগবৎপূজ্যপাদ্ শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য্য শারীরকমীমাংসা ভাষ্যে বলিতেছেন-

'সদেব সোম্যেদমগ্র আসীদেকমেবাদ্বিতীয়ম্'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ ৬।২।১)
অর্থাৎ হে সোম্য, সৃষ্টির পূর্ব্বে এই জগৎ এক ও অদ্বিতীয় ব্রহ্মরূপে বর্তমান ছিল।"

-এইপ্রকার শ্রুতিবলে সৃষ্টির পূর্ব্বে ব্রহ্ম ও জগতের অবিভাগ নিশ্চিত হয় বলিয়া প্রথম সৃষ্টির পূর্ব্বে কর্ম্ম থাকে না, যাহাকে অপেক্ষা করিয়া পরবর্তী বিষমসৃষ্টি হইবে। সৃষ্টির পরবর্তীকালেই শরীরাদিরূপ বিভাগকে অপেক্ষা করিয়া কর্ম্ম অনুষ্ঠিত হয় এবং কর্ম্মকে অপেক্ষা করিয়া হয় শরীরাদিরূপ বিভাগ, এইপ্রকার ইতরেতরাশ্রয়দোষ হইয়া পড়ে। সেইহেতু বিভাগের পরবর্ত্তিকালে কর্ম্মকে অপেক্ষা করিয়া ঈশ্বর যদি প্রবৃত্ত হন, তাহা হউন; কিন্তু শরীরাদিরূপে বিভাগের পূর্ব্বে সৃষ্টির বিচিত্রতার হেতুভূত কর্ম্মের অভাববশতঃ প্রথম সৃষ্টিতুল্য উচ্চাবচ দেবতির্য্যগাদি ভেদবিহীন হইয়া পড়িতেছে, এইপ্রকার যদি আপত্তি করা হয় তদুত্তরে সিদ্ধান্ত হইল-

ইহা দোষ নহে, যেহেতু জগৎ সংসার অনাদি। এই দোষ হইতে পাড়িত যদি সংসার সাদি হইত। কিন্তু অনাদি সংসারে বীজ ও অঙ্কুরের ন্যায় হেতু ও হেতুমদ্ভাবে অর্থাৎ কারণ ও কার্য্যভাবে কর্ম্মের ও সৃষ্টিবৈষম্যের যে প্রবৃত্তি, তাহার বিরোধ হয় না।

আচ্ছা, কি প্রকারে অবগত হওয়া যায় যে, এই জগৎ সংসার অনাদি? এই হেতু ভগবান্ সূত্রকার পূনরায় বলিতেছেন-

‘উপপদ্যতে চাপ্যুপলভ্যতে চ’।। (ব্রহ্মসূত্র-২/১/৩৬)।।

শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- আচার্য্য শঙ্কর ভগবতের ভাষ্য হইল-জগৎ সংসারের অনাদিত্ব যুক্তিসঙ্গত। যেহেতু সংসার সাদি হইলে অকস্মাৎ অর্থাৎ বিনাকারণে তাহার উৎপত্তি হওয়ায় (তৎপরর্বর্তী সৃষ্টিও বিনা কারণে সম্ভব হইতে পারে বলিয়া পূর্ব্বসৃষ্টিতে) মুক্তপুরুষগণের (সংসারের হেতুভূত অবিদ্যাদি না থাকিলেও) পুনরায় সংসারে উদ্ভূতি অর্থাৎ জন্ম হইয়া পড়িবে। (তাহাতে বেদের জ্ঞানকাণ্ড মোক্ষশাস্ত্র ব্যর্থ হইয়া পড়ে)।

আবার অকৃতাভ্যাগমও (অর্থাৎ যে ব্যক্তি যে কর্ম্মের অনুষ্ঠান করে নাই, তৎকর্তৃক সেই কর্ম্মের ফলভোগও) হইয়া পড়িবে, যেহেতু সুখ ও দুঃখ প্রভৃতির যে বৈষম্য, তাহার কোন হেতু নাই।(তাহাতে শুভকর্ম্মের বিধায়ক এবং অশুভকর্ম্মের নিবর্ত্তক যে বিধিনিষেধ শাস্ত্র অর্থাৎ বেদের কর্ম্মকাণ্ড ব্যর্থ হইয়া পড়ে।)

আর ঈশ্বর যে বৈষম্যের হেতু নহেন তাহা পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। কেবল অর্থাৎ অন্য সহায়বিহীন মূলা অবিদ্যাও বৈষম্যের কারণ নহে, যেহেতু তাহা একরূপ। কিন্তু রাগাদি ক্লেশবাসনার দ্বারা আক্ষিপ্ত অর্থাৎ প্রবর্ত্তিত কর্ম্মকে অপেক্ষা করিয়াই অবিদ্যা হয় বৈষম্যকারী। কিন্তু কর্ম্ম ব্যতিরেকে শরীর সম্ভব নহে এবং শরীর ব্যতিরেকে কর্ম্ম সম্ভব নহে, এই প্রকারে ইতরেতরাশ্রয় দোষ হইয়া পড়ে। অনাদি হইলেই কিন্তু বীজাঙ্কুরের ন্যায় কার্য্যকারণ ভাব উপপন্ন হওয়ায় কোন দোষ হয় না।(অগ্রে বীজ উৎপন্ন হয়, পরে তাহা হইতে অঙ্কুর উৎপন্ন হয়, অথবা অগ্রে অঙ্কুর উৎপন্ন হয়, পরে তাহা হইতে বীজ উৎপন্ন হয়; ইহা নিরূপণ করা যায় না বলিয়া এই বীজাঙ্কুর প্রবাহকে অনাদিরূপে অঙ্গীকার করা হয়।)

আর শ্রুতি এবং স্মৃতি উভয়েই এই জগৎ সংসারের অনাদিত্ব উপলব্ধ হয়। শ্রুতি এইপ্রকার আছে-'অনেন জীবেনাত্মনা'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ ৬।৩।২) অর্থাৎ "এই জীবাত্মারূপে", এইরূপ সৃষ্টির নব কল্পারম্ভের প্রারম্ভে শরীরসম্বন্ধী আত্মাকে প্রাণধারণের নিমিত্তক জীবশব্দের দ্বারা অভিহিত করিয়া সংসার যে অনাদি, ইহা শ্রুতি প্রদর্শন করিতেছেন। কিন্তু সংসার সাদি হইলে পূর্ব্বে প্রাণধারণ না করিয়া প্রাণধারণরূপ নিমিত্তবশতঃ যে জীবশব্দের প্রয়োগ হয়, তাহার দ্বারা সৃষ্টির প্রারম্ভে পরমাত্মা কি প্রকারে অভিহিত হইবেন? আর প্রাণকে ধারণ করিবেন, এই হেতু পরমাত্মা জীব শব্দে অভিহিত হইবেন, ইহা বলা যায় না, যেহেতু অনাগত সম্বন্ধ অপেক্ষা অতীত সম্বন্ধ বলবান, কারণ তাহা সম্পাদিত হইয়া গিয়াছে। আর শাস্ত্রেও জগৎ যে সৃষ্টির পূর্ব-কল্পেও বর্তমান ছিলো তা এ-জাতীয় শ্রুতিতেই আছে-

‘সূর্যাচন্দ্রমসৌ ধাতা যথাপূর্বমকল্পয়ৎ।
দিবং চ পৃথিবীং চান্তরিক্ষমথো স্বঃ’।। (ঋগ্বেদ-১০/১৯০/৩)।।
অর্থাৎ বিধাতা পূর্ববৎ-ই অর্থাৎ পূর্ব্বকল্পানুযায়ী সূর্য ও চন্দ্রকে সংস্থাপিত করিলেন এবং স্বর্গ, পৃথিবী ও আকাশ সৃষ্টি করিলেন।

স্মৃতিতেও সংসারের অনাদিত্ব উপলব্ধ হইতেছে- 'ন রূপমস্যেহ তথোপলভ্যতে নান্তো ন চাদির্ন চ সংপ্রতিষ্ঠা'-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১৫।৩)

'ইহলোকে এই সংসাররূপ অশ্বত্থের উক্তপ্রকার রূপ উপলব্ধ হয় না, কারণ স্বপ্ন-মরীচিকার ন্যায় ইহা দৃষ্ট-নষ্ট-স্বরূপ । এই সংসারের আরম্ভ নাই, কারণ ইহা অনাদি।'

আর পুরাণে অতীত ও ভবিষ্যৎ কল্পসকলের পরিমাণ নাই, ইহা স্থাপিত হইয়াছে। অতএব অনাদি ক্লেশকর্ম্মাদিই জগৎ বৈষম্যের হেতু হওয়ায় পরমেশ্বরে পক্ষপাতিতা ও নির্দ্দয়তাদোষ প্রসক্ত হয় না বলিয়া নিরবদ্য, নিরঞ্জন ব্রহ্মই জগৎকারণ, ইহা সিদ্ধ হইল

Friday, 17 July 2020

ঈশ্বরে পক্ষপাতিত্ব এবং নিষ্ঠুরতারূপ দোষের অভাবঃ-


ইতোমধ্যে আলোচনা করিয়াছি মায়ারূপ অপরিমিত শক্তিযুক্ত পরমেশ্বর কোন প্রয়োজন ব্যতিরেকেই লীলাচ্ছলেই সৃষ্টিকর্ম করেন। কিন্তু এখন আপত্তি হইল, এই সৃষ্টির মধ্যে যে জাগতিক বৈষম্য বা নিষ্ঠুরতা দেখা যায়, যেমন দেবতা প্রভৃতি কাহাকেও কাহাকেও নিরতিশয় সুখভাগী করেন আবার পশু প্রভৃতি কাহাকেও কাহাকেও অত্যন্ত দুঃখভাগী করেন, এবং মনুষ্য প্রভৃতিকে কাহাকেও কাহাকেও মধ্যম (সুখদুঃখমিশ্রিত) ভোগভাগী করেন ইত্যাদি এইপ্রকারে বিষমা সৃষ্টি যিনি নির্ম্মাণ করেন, সেই ঈশ্বরের দুর্বৃত্ত ব্যক্তির ন্যায় আসক্তি ও দ্বেষ যুক্তিযুক্ত হওয়ায় শ্বেতাশ্বতর(৬।১৯) শ্রুতিতে যে 'নিরবদ্যং অর্থাৎ অনিন্দনীয়, নিরঞ্জনম্ অর্থাৎ নির্লেপ' এবং শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাতে(৯।২৯) যে 'আমার প্রিয় ও অপ্রিয় নাই', এইরূপ অবধারিত স্বচ্ছতা (কূটস্থতা) প্রভৃতিরূপ ঈশ্বরের স্বভাব, তাহার বিলোপ হইয়া পড়িবে। এই আপত্তির উত্তরে ভগবান সূত্রকার বাদরায়ণ বলেন-
বৈষম্যনৈর্ঘৃণ্যে ন, সাপেক্ষত্বাৎ, তথা হি দর্শয়তি’।। (ব্রহ্মসূত্র-২/১/৩৪)।।
শাঙ্করভাষ্য অনুবাদঃ- আচার্য্য শঙ্করের ভাষ্য হইল- এইরূপ আপত্তির উত্তরে আমরা বলিতেছি-ঈশ্বরের পক্ষপাতিতা ও নিষ্ঠুরতা হইয়া পড়ে না। কোন হেতু বলে? যেহেতু সাপেক্ষতা আছে। যেহেতু যদি নিরপেক্ষ, অর্থাৎ কেবল অন্য নিমিত্তনিরপেক্ষ ঈশ্বর বিষম সৃষ্টি নির্ম্মাণ করিতেন, তাহা হইলে বৈষম্য ও অতিক্রূরত্ব, এই দোষ হইতে পারিত। কিন্তু নিরপেক্ষের নির্ম্মাতৃত্ব নাই। কারণ সাপেক্ষ ঈশ্বর বিষম (উচ্চাবচ ভেদবিশিষ্ট) সৃষ্টি নির্ম্মাণ করেন। আচ্ছা, তিনি কাহাকে অপেক্ষা করেন? তাহার উত্তরে আমরা বলিতেছি-ধর্ম্ম ও অধর্ম্মকে অপেক্ষা করেন। অতএব যে প্রাণিগণ সৃষ্ট হয়, তাহাদের ধর্ম্ম ও অধর্ম্মকে অপেক্ষা করিয়া বিষম সৃষ্টি হইয়া থাকে, এইহেতু ইহা ঈশ্বরের অপরাধ নহে।
ঈশ্বরকে কিন্তু পর্জ্জন্যের (মেঘের) ন্যায় অবগত হইতে হইবে। দেখ, যেমন ধান্য ও যবাদির উৎপত্তিতে মেঘ সাধারণ কারণ, কিন্তু এইটী ধান্য, এইটী যব, এইপ্রকারে ধান্য ও যবাদিগত বিভিন্নতাতে তত্তৎ বীজগত অসাধারণ শক্তি সকলই কারণ হইয়া থাকে; এইপ্রকারে দেবতা ও মনুষ্য প্রভৃতির সৃষ্টিতে ঈশ্বর হন সাধারণ কারণ। দেবতা ও মনুষ্যাদির বিভিন্নতাতে কিন্তু তত্তৎ জীবগত অসাধারণ কর্ম্মসকলই কারণ। এইপ্রকারে সাপেক্ষ হন বলিয়া অর্থাৎ প্রাণিগণের কর্ম্মকে অপেক্ষা করেন বলিয়া পক্ষপাতিতা ও নিষ্ঠুরতার দ্বারা ঈশ্বর দূষিত হন না।
আচ্ছা, কি প্রকারে ইহা অবগত হওয়া যায় যে, ধর্ম্ম অধর্ম্ম সাপেক্ষ ঈশ্বর (পশ্বাদি, মনুষ্য ও দেবাদিরূপ) অধম, মধ্যম ও উত্তম সংসার নির্ম্মাণ করেন? শ্রুতি সেইপ্রকারই প্রদর্শন করিতেছে-
'এষ হ্যেব সাধু কর্ম কারযতি তং যমেভ্যো লোকেভ্য উন্নিনীষত এষ উ এবাসাধু কর্ম কারযতি তং যমধো নিনীষতে'।-(কৌষিতকি ব্রাহ্মণ ৩।৮)
অর্থাৎ 'ইনিই (পূর্ব্বানুষ্ঠিত কর্ম্মের সংস্কারানুযায়ী) তাহাকে অর্থাৎ সেই মনুষ্যকে সাধু কর্ম্ম করান, যাহাকে এই লোক হইতে উর্ধ্বে অর্থাৎ স্বর্গে লইয়া যাইতে ইচ্ছা করেন, ইনিই (পূর্ব্বানুষ্ঠিত কর্ম্মের সংস্কারানুযায়ী) তাহাকে অসাধু কর্ম্ম করান, যাহাকে নিম্নে অর্থাৎ পশ্বাদি যোনিতে লইয়া যাইতে ইচ্ছা করেন।'
আবার শ্রুতিতে অন্যত্র বর্ণিত আছে-'পুণ্যো বৈ পুণ্যেন কর্মণা ভবতি পাপঃ পাপেন'।-(বৃহদারণ্যক উপনষৎ-৩।২।১৩)
অর্থাৎ পুণ্য কর্ম্মের দ্বারা পুণ্যবান্ ও পাপ কর্ম্মের দ্বারা পাপী হয়।'

আবার 'যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্' -(শ্রীদ্ভগবদ্গীতা-৪।১১) অর্থাৎ 'যে, যে প্রকারে, যে প্রয়োজনে, যে ফলের অর্থী হইয়া আমাকে উপাসনা করে, তাহাকে আমি সেই ফলদানের দ্বারা অনুগৃহীত করি।'
ইত্যাদি এইজাতীয় স্মৃতিও ঈশ্বরের অনুগ্রহকারিতা ও নিগ্রহকারিতা প্রাণিগণের কর্ম্মবিশেষকে অপেক্ষা করিয়াই হইয়া থাকে, ইহা প্রদর্শন করিতেছে।

জ্ঞানী ভোগ্যবিষয়ে মনের কঠিনতা আর ভগবদ্বিষয়ে মনের কোমলতা সম্পাদন করে—

  আচার্য মধুসূদন সরস্বতী ভক্তিরসায়নে বলছেন — কাঠিন্যং বিষয়ে কুর্যাদ্ দ্রবত্বং ভগবৎপদে। উপায়ৈঃ শাস্ত্রনির্দিষ্টৈরনুক্ষণমতো ব...