Showing posts with label খণ্ডন পর্ব. Show all posts
Showing posts with label খণ্ডন পর্ব. Show all posts

Saturday, 6 September 2025

'শঙ্করাচার্যের অনির্বাচ্যবাদ বৌদ্ধের নিকট ধার করা'—এই অপবাদের নিরসনঃ-

 


অনেকে মনে করেন ভগবান্ শঙ্করাচার্যের অনির্বাচ্যবাদ্ বৌদ্ধোক্ত মায়াবাদ বা চতুষ্কোটি বিনির্মুক্ত শূন্যবাদ হতে গৃহীত হয়েছে। 'লঙ্কাবতারসূত্র', 'প্রজ্ঞাপারমিতা' প্রভৃতি গ্রন্থে অনির্বাচ্য মায়াবাদের বিবরণ দেখতে পাওয়া যায়। এই সকল প্রাচীন বৌদ্ধগ্রন্থ হতেই আচার্য শঙ্কর অনির্বাচ্যবাদ এবং জগন্মিথ্যাত্ববাদ্ গ্রহণ করে, তাঁর অদ্বৈতবেদান্ত মত প্রচার করেছেন বলে ধারণা এদের। অদ্বৈতদর্শনের ব্যাখ্যায় শঙ্করের নিজস্ব কোন দান নেই বলে দাবি করেন এরা।

এই অপবাদের নিরসনে বলব—ভারতীয় দর্শন চিন্তায় ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্যের অবদান কতখানি তা নিশ্চয়ই সুধীপাঠকের অজানা নয়। স্বীকারই করলাম যে অনির্বাচ্যবাদ শঙ্করের উদ্ভাবিত নয়, কিন্তু তার জন্য বৌদ্ধের নিকট ধার করতে হবে কেন? ঋগ্বেদীয় প্রসিদ্ধ 'নাসদীয় সূক্তে'ই অনির্বাচ্যবাদের মূলসূত্র নিহিত আছে।

নাসদাসীন্নোসদাসীত্তদানীম্।। আনীদবাতং স্বধয়া তদেকং তস্মাদ্ধান্যন্নপরং কিঞ্চনাস। ঋগ্বেদ্ ১০ম মণ্ডল, ১৩৯ সূক্ত, ১ম ও ২য় মন্ত্র।

উল্লেখিত মন্ত্রের ব্যাখ্যায় সায়নাচার্য স্পষ্টই বলেছেন যে, সৃষ্টির ঊষায় জাগতিক বস্তুসকল সত্যরূপেও নির্ধারণের যোগ্য ছিল না, আবার আকাশ কুসুমের ন্যায় অসৎও ছিল না। সমস্ত বস্তুরাজিই তখন অনির্বাচ্য ছিল—"উভয়বিলক্ষণমনির্বাচ্যমাসীৎ' সায়নভাষ্য। আলোচ্য শ্রুতিতেই অনির্বাচ্যবাদের স্পষ্ট নির্দেশ আছে। আচার্য মধুসূদন সরস্বতী উল্লেখিত শ্রুতিদ্বয়কেই অনির্বাচ্যের শ্রৌত প্রমাণরূপে  'অদ্বৈতসিদ্ধিতে' উল্লেখ করেছেন।......

তথ্যসূত্রঃ- বেদান্তদর্শন—অদ্বৈতবাদ, তৃতীয় খণ্ড, আশুতোষ শাস্ত্রী বিদ্যাবাচস্পতি।

শ্রীশুভ চৌধুরী

আগস্ট ২২, শুক্রবার, ২০২৫ খৃষ্টাব্দ।

'ব্রহ্ম অনন্ত-গুণময়, তিনি কোনমতেই নির্গুণ নির্বিশেষ হতে পারেন না'—এই আপত্তির খণ্ডনঃ-

বৈষ্ণববেদান্তী রামানুজাচার্য, মধ্বাচার্য প্রভৃতির মতে ব্রহ্ম অনন্ত-গুণময়, তিনি কোন মতেই নির্গুণ নির্বিশেষ হতে পারে না। 'নির্গুণং নিষ্ক্রিয়ং শান্তং নিরবদ্যং নিরঞ্জনম্' প্রভৃতি শ্রুতি ব্রহ্মের গুণশূন্যতা বুঝায় না। ব্রহ্মে কোনরূপ নিকৃষ্ট গুণ বা নীচ ক্রিয়া নেই, ব্রহ্মে নিরতিশয় অসংখ্য কল্যাণগুণেরই সমাবেশ আছে, এটাই বোঝায়। 'নির্' শব্দের স্বাভাবিক 'নিষেধ' অর্থ পরিত্যাগ করে 'নিকৃষ্ট' অর্থ গ্রহণ করায়, রামানুজ প্রভৃতি আচার্যরা যে শব্দার্থের সহজবোধ্য রীতি পরিত্যাগ করে কষ্ট কল্পনার আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন, তা সুধী পাঠক অবশ্য লক্ষ্য করবেন।

উপনিষদে ব্রহ্মের সগুণ ও নির্গুণ এই দ্বিবিধভাবেরই পরিচয় পাওয়া যায়। এই দুটি বিভাব আলোক অন্ধকারের মত পরস্পর বিরোধী। দুইটি কখনই সমানভাবে সত্য হতে পারে না। নির্গুণ নির্বিশেষ ব্রহ্মই পারমার্থিক সত্য; ব্রহ্মের সগুণভাব মায়িক। স্থূলদর্শী সাধকের উপাসনার সুবিধার জন্য ব্রহ্মের সগুণ ভাবের কল্পনা করা হয়ে থাকে। এই বিষয়ে শাস্ত্রপ্রমাণ —

প্রত্যস্তমিতভেদং যৎ সত্তামাত্রমগোচরম্।

বচসামাত্মসংবেদ্যং তজ্জ্ঞানং ব্রহ্ম সংজ্ঞিতম্।।

তচ্চ বিষ্ণোঃ পরং রূপমরূপস্যাজমক্ষরং।

বিশ্বরূপাচ্চ বৈরূপ্যলক্ষণং পরমাত্মনঃ।।

ন তদ্‌যোগযুজা শক্যং নৃপ চিন্তয়িতুং যতঃ।

ততঃ স্থূলং হরে রূপং চিন্তয়েদ্ বিশ্বগোচরম্।

-(বিষ্ণুপুরাণ-৬/৭/৫৩-৫৫)

—যা সর্বপ্রকার ভেদ—সম্পর্করহিত, কেবল সৎস্বরূপ, বাক্যের অগোচর এবং আত্মপ্রত্যয়-বেদ্য, সেই জ্ঞানই ব্রহ্ম নামে পরিচিত। রূপহীন বিষ্ণুর এটাই নিত্য ও পরমরূপ এবং তা সমস্ত বিশ্বরূপ হতে বিলক্ষণ। প্রথমতঃ যোগী ব্যক্তি সেই পরমরূপ চিন্তা করতে সমর্থ হন না বলেই পরমাত্মা শ্রীহরির স্থূলরূপই চিন্তা করবেন।

তর্কের ভিত্তিতে বিচার করলে দেখা যায় যে, নির্গুণকে বুঝতে গেলেই সগুণকে জানা প্রয়োজন হয়। যিনি ঘট জানেন না, এরূপ ব্যক্তি ঘটের অভাব বুঝতে পারেন না। অভাবের জ্ঞান তার প্রতিযোগীর জ্ঞানকে অপেক্ষা করে। যার অভাব বুঝা যায়, তাকে অভাবের প্রতিযোগী বলে। নির্গুণ বাক্য দ্বারা উপনিষদে ব্রহ্মে সর্ববিধ গুণের নিষেধ করা হয়েছে। নিষেধের কোন বিষয় না থাকলে, কার নিষেধ তা না বুঝালে, নিষেধের সেক্ষেত্রে কোনই অর্থ হয় না। সগুণ বাক্যের দ্বারা ব্রহ্মের যে সকল গুণরাজি বর্ণিত হয়েছে, নির্গুণ বাক্যে সেই সমুদয় গুণেরই নিষেধ সূচিত হয়েছে। সগুণ বাক্য না থাকলে, নির্গুণ বাক্যের অবতারণাই অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়।

ব্রহ্মের গুণ-সম্পর্ক কল্পিত না হলে, সত্য স্বাভাবিক গুণের নিষেধ কোন মতেই সম্ভবপর হয় না। সে অবস্থায় গুণের নিষেধে গুণীরও নিষেধ হয়ে যায়। আবার সগুণবাক্যের প্রাধান্য দিলে, উপনিষদে যে অসংখ্য নির্গুণবাক্য দেখতে পাওয়া যায়, তা নির্বিষয় এবং অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। এমতাবস্থায় অদ্বৈতবাদীর দৃষ্টিতে নির্গুণ বাক্যের প্রাধান্য স্বীকার করলে, উপাসনা জগতে সগুণ ব্রহ্মবোধক বাক্যেরও নির্দিষ্ট স্থান পাওয়া যায়। সগুণ এবং নির্গুণ কোনরূপ উপনিষদের উক্তিই মিথ্যা এবং অপ্রমাণ হয় না। আচার্য মধুসূদন সরস্বতী বলেছেন— "সগুণবাক্যানাম্ ঔপাধিকগুণবিষয়েত্বেন স্বাভাবিকনির্ধর্মকত্বশ্রুতের্নবিরোধঃ। (অদ্বৈতসিদ্ধি)

এই অবস্থায় প্রথমতঃ সগুণ ব্রহ্মবাদ স্বীকার করে নিয়ে, চরমভূমিতে নির্গুণ নির্বিশেষ ব্রহ্মবোধক বাক্যকেই প্রমাণ বলে গ্রহণ করা সমধিক যুক্তিসঙ্গত নয় কি? ব্রহ্মের সগুণভাবই সত্য, নির্গুণভাব মিথ্যা, এইরূপ কল্পনা নিতান্তই অসঙ্গত।

 'সর্বকর্মা সর্বকামঃ সর্বগন্ধঃ সর্বরসঃ'-(ছান্দোগ্য উপনিষদ্-৩।১৪।২) প্রভৃতি শ্রুতি ব্রহ্মের সগুণভাব প্রকাশ করছে। "নিষ্কলং নিষ্ক্রিয়ং শান্তং নিরবদ্যং নিরঞ্জনম্"-( শ্বেতাশ্বতর উপনিষৎ-৬।১৯) ইত্যাদি শ্রুতি দ্বারা ব্রহ্মের নির্বিশেষ ভাব প্রতিপাদিত হয়েছে। এই অবস্থায় কোন শ্রুতিবাক্য দুর্বল, কোনটি প্রবল? তা বিচার করতে গেলে দেখা যায় যে, প্রথমতঃ ব্রহ্মের গুণ বর্ণনা না করলে, নির্গুণ বাক্যে গুণের যে নিষেধ করা হয়েছে, তার তো কোন অর্থ হয় না। সুতরাং গুণ থাকলে তবেই তো ওটার নিষেধ হবে? গুণ না থাকলে নিষেধ হবে কার? নির্গুণ সুতরাং সগুণকে অপেক্ষা করে। এই অবস্থায় "অপচ্ছেদ" ন্যায় অনুসারে গুণসাপেক্ষ নির্গুণ বাক্য যে সগুণ বাক্য অপেক্ষা প্রবল, তাতে সন্দেহ কি? সেই প্রবল নির্গুণ বাক্যের দ্বারা সগুণ বাক্যের বাধ হবে, এটাই তো স্বাভাবিক। ননু নির্গুণবাক্যং সগুণবাক্যং বাধতে, ন তু সগুণবাক্যং তদিতি কিমত্র নিয়ামকম্? ন চ নিষেধকতয়া নির্গুণবাক্যং প্রবলম্, 'অসদ্বা' ইত্যাদিবাক্যস্য সদেব ইত্যাদিবাক্যাৎ প্রাবল্যাপত্তেরিতি চেন্ন, অপচ্ছেদন্যায়েন প্রাবলস্য প্রাগেবোক্তেঃ। (অদ্বৈতসিদ্ধি)

"অপচ্ছেদ" ন্যায়টি মীমাংসা দর্শনের একটি ন্যায়। অপচ্ছেদ শব্দের অর্থ বিরোধ বা ব্যাঘাত। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উক্তির মধ্যে অপচ্ছেদ ঘটলে, পূর্বটি দুর্বল এবং পরবর্তী উক্তিটি সবল হয়ে থাকে। উপরিউক্ত ছান্দোগ্য শ্রুতির ব্রহ্মের সবিশেষতা সম্পাদক গন্ধ ও রূপরসাদি উপাধিসকল অবিদ্যা কর্তৃক প্রত্যুপস্থাপিত। সুতরাং নির্বিশেষ ব্রহ্মই বেদান্ত প্রতিপাদ্য, সবিশেষতা উপাসনার সৌকর্যের জন্য। যেহেতু সকল স্থলেই অর্থাৎ উপনিষদ্ সকলে ব্রহ্মস্বরূপ প্রতিপাদনপর 'অশব্দমস্পর্শমরূপমব্যয়ম্'-(কঠ উপনিষৎ-১।৩।১৫) অর্থাৎ 'শব্দরহিত, স্পর্শরহিত, রূপবিহীন, ক্ষয়রহিত' ইত্যাদি এই বাক্যসকলে যা হতে সমস্ত বিশেষ নিরাকৃত হয়েছে, সেই ব্রহ্মই উপদিষ্ট হচ্ছেন। কিন্তু সাকার অর্থাৎ সপ্রপঞ্চ সবিশেষ ব্রহ্মবিষয়ক অন্যান্য বাক্যসকল তৎপ্রধান নয় অর্থাৎ প্রধানভাবে সবিশেষতা প্রতিপাদন করে না, যেহেতু তারা প্রধানভাবে উপাসনাবিধি প্রতিপাদন করে অর্থাৎ বিধিবোধিত উপাসনার অঙ্গরূপে ব্রহ্মকে সমর্পন করে।

আরেকটি বিষয় এই যে, সগুণ ও নির্গুণ ব্রহ্ম ভিন্ন তত্ত্ব নয়। যিনি স্বতঃ নির্গুণ নির্বিশেষ, তিনিই মায়া উপাধি গ্রহণ করে সগুণ সবিশেষ হন। এই সগুণভাব তাঁর লীলা মাত্র। লীলাময়, সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান পরমেশ্বরই প্রাণিগণের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে স্বেচ্ছানুরূপ মায়িক দেহ ধারণ করে জগতের রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ হন, 'স্যাৎ পরমেশ্বরস্য অপি ইচ্ছাবশাৎ মায়াময়ং রূপং সাধকানুগ্রহার্থম্'-(ব্রহ্মসূত্র শাঙ্করভাষ্য-১.১.২০) অর্থাৎ সাধকদের অনুগ্রহ করবার জন্য পরমেশ্বরেরও মায়াময়রূপ সম্ভব হয়। ত্রিগুণময়ী জগজ্জননী মায়াকে বশীভূত করে জগতের সৃষ্টিলীলায় প্রবৃত্ত হন। স্বয়ং ভগবান্ বলেছেন—

"অজোঽপি সন্নব্যয়াত্মা ভূতানামীশ্বরোঽপি সন্। প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া"-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৪/৬)

অর্থাৎ 'আমি অজ অর্থাৎ জন্মরহিত হয়েও; অব্যয়াত্মা অর্থাৎ যাঁর জ্ঞানশক্তির ক্ষয় নেই এইরূপ অক্ষীণ জ্ঞানশক্তি স্বভাব হয়েও; ব্রহ্মাদি থেকে তৃণ পর্য্যন্ত সর্ব্বভূতের ঈশ্বর হয়েও; আমার যে স্বপ্রকৃতি, অর্থাৎ ত্রিগুণাত্মিকা বৈষ্ণবী মায়া, সমস্ত জগৎ যার বশে বর্তমান, যদ্দ্বারা মোহিত হয়ে লোকে নিজের আত্মা বাসুদেবকে জানতে পারে না, সেই নিজ প্রকৃতিতে অধিষ্ঠিত হয়ে অর্থাৎ তাঁকে বশীভূত করে আমি সম্ভাবিত হই অর্থাৎ আত্মমায়ার দ্বারা যেন লোকবৎ দেহধারণ করে জন্মগ্রহণ করি; কিন্তু পরমার্থতঃ নয়।'

তিনি দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন ও ধর্মের গ্লানি দূর করবার জন্য জগতের বক্ষে আবির্ভূত হন। "ধর্ম্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে"-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৪/৮) অর্থাৎ 'ধর্ম্মের সম্যক্ স্থাপনের জন্য প্রতিযুগে আমি সম্ভাবিত হই অর্থাৎ অবতীর্ণ হই।'

তিনি মায়াধীশ তাঁর উপর মায়ার কোন প্রভাব নেই। তিনি মায়ার সাক্ষী মাত্র। এইজন্য ব্রহ্মের এই সগুণলীলা দ্বারা তাঁর নিত্য-শুদ্ধ-বুদ্ধ-মুক্তস্বভাবের কোন বিচ্যুতি হয় না।

যেহেতু 'মায়া হ্যেষা ময়া সৃষ্টা যন্মাং পশ্যসি নারদ৷ সর্বভূতগুণৈর্যুক্তং মৈবং মাং জ্ঞাতুমর্হসি'-(মহাভারত শান্তিপর্ব-৩৩৯/৪৫-৪৬)

অর্থাৎ "হে নারদ! সর্বভূতের গুণসকলের দ্বারা যুক্তরূপে তুমি যে আমাকে দেখছ, এটা মৎকর্তৃক সৃষ্টা মায়ামাত্র, এপ্রকারে তুমি আমাকে সম্যগ্ রূপে জানতে পারবে না, (কারণ তত্ত্বতঃ আমি মায়াতীত নির্গুণস্বরূপ)," এইপ্রকার স্মৃতিবাক্য আছে।.......

তথ্যসূত্রঃ-

১. ভগবান্ শঙ্করাচার্যের ব্রহ্মসূত্র ও শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ভাষ্য।

২. আচার্য মধুসূদন সরস্বতীর "অদ্বৈতসিদ্ধি"।

৩. বেদান্তদর্শন—অদ্বৈতবাদ, তৃতীয় খণ্ড, কাব্য-ব্যাকরণ-সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ বিদ্যাবাচস্পতি আশুতোষ ভট্টাচার্য শাস্ত্রী।

৪. বিষ্ণু পুরাণ, পণ্ডিতপ্রবর পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত।

শ্রীশুভ চৌধুরী

আগস্ট ২৯, শুক্রবার,  ২০২৫ খৃষ্টাব্দ।

Tuesday, 19 November 2024

অদ্বৈতবেদান্ত দর্শন বৌদ্ধ দর্শনেরই একটি প্রচ্ছন্ন রূপ—এই আপত্তির নিরসনঃ-

 


শুরুতেই বলে রাখি, রামানুজাচার্য, মধ্বাচার্য প্রভৃতি প্রতিবাদী দার্শনিকগণ বৌদ্ধদর্শন ও অদ্বৈতদর্শনের কেবলমাত্র একটি দিক্ দেখেই এইরূপ একটি অনভিপ্রেত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। সেই দিক্টি হল 'নেতিবাচক' দিক্। মাধ্যমিক, যোগাচার ও অদ্বৈতবেদান্তে পরিদৃশ্যমান বিশ্বের বাস্তব সত্যতা স্বীকৃত হয় নি, এটা সত্য বটে। কিন্তু এই নিষেধাত্মক দিক্টিতে মহাযান বৌদ্ধমত ও অদ্বৈতবেদান্ত মতের অংশতঃ মিল দেখেই, বিভিন্ন খাতে প্রবাহিত দুইটি দার্শনিক চিন্তাধারাকে এক ও অভিন্ন বলে সিদ্ধান্ত করা বিভ্রান্তির পরিচায়ক সন্দেহ নেই। নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে তত্ত্ব বিচার করতে গেলে, দুইটি বিশিষ্ট দার্শনিক মত কোন তত্ত্ব অস্বীকার করল, শুধু তা দেখলেই চলবে না; কোন তত্ত্ব স্বীকার করল তাও আলোচনা করতে হবে।

অস্বীকারের ক্ষেত্রে মিল থাকলেও, স্বীকারের ক্ষেত্রে যদি গুরুতর পার্থক্য দেখা দেয়, তবে দুইটি ভিন্ন পথগামী দর্শনকে মূলতঃ এক বলে অভিযোগ উত্থাপন করা নিতান্তই অসমীচীন। 'নেতিবাচক'ও 'ইতিবাচক' দুইটি দিক্ সমানভাবে বিচার করেই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হবে। অদ্বৈতবেদান্ত সিদ্ধান্তে বিজ্ঞানাতিরিক্ত বিজ্ঞেয় জগতের কোনরূপ বাস্তব সত্তা নেই; কিন্তু এই বিজ্ঞান এক অদ্বিতীয় শাশ্বত ও ধ্রুব। এই বিজ্ঞান বিশেষ্য-বিশেষণ, জ্ঞান-জ্ঞাতা-জ্ঞেয় প্রভৃতি সর্বপ্রকার সম্বন্ধের অতীত, কূটস্থ ব্রহ্মস্বরূপ। বিজ্ঞানবাদী বৌদ্ধমতে বিজ্ঞানই একমাত্র সৎ হলেও, এই বিজ্ঞান ক্ষণিক। 'উৎপদ্য বিনশ্যতি', এটাই বৌদ্ধক্ত বিজ্ঞানের স্বভাব। বৌদ্ধ সিদ্ধান্তে সৎ বা সত্তামাত্রই ক্ষণিক, এবং ক্ষণিক অর্থই অনিত্য; সুতরাং সৎ বা অস্তিত্বের অর্থই দাঁড়াচ্ছে অনিত্য। নিত্যবস্তুর এইমতে কোনরূপ অস্তিত্বই নেই। এই বিষয়ে সর্বদর্শনসংগ্রহে মাধবাচার্য (বিদ্যারণ্য স্বামী) কর্তৃক উদ্ধৃত বৌদ্ধাচার্য জ্ঞানশ্রীর কারিকা দ্রষ্টব্য। অদ্বৈতমত এটার সম্পূর্ণ বিপরীত। অদ্বৈত সিদ্ধান্তে অস্তিত্ব অর্থই নিত্য। অনিত্য বস্তুর কোনপ্রকার বাস্তব অস্তিত্ব থাকতেই পারে না। যা বাস্তবিকই সৎ, তার বিলোপ, বিকার বা বিবর্তন ঘটতে পারে না। এই অবস্থায় দৃশ্যমান বিশ্বপ্রপঞ্চের তাত্ত্বিক অস্তিত্ব অস্বীকার করায় এবং একমাত্র ভূমা বিজ্ঞানেরই সত্যতা স্বীকার করায় যদি অদ্বৈতবাদীকে বিজ্ঞানবাদী বলে ধরে নি, তথাপি একথা মানতে হবে যে, বিজ্ঞানবাদী বৌদ্ধ অদ্বৈতবাদী নন, তাঁরা বহুত্ববাদী। অপরপক্ষে, অদ্বৈতবাদীরাই কেবল অবিমিশ্র একত্ববাদী— যা বৌদ্ধসম্মত বহুত্ববাদের সম্পূর্ণ বিপরীত।

ভগবান্ ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য এই কথা বিচার করেই বললেন—প্রদীপ যেমন অন্য জ্ঞাতার জ্ঞানে ভাসে এবং প্রকাশিত হয়, বৌদ্ধোক্ত ক্ষণিক বিজ্ঞানও সেইরূপ অপরের জ্ঞানে ভাসবে এবং প্রকাশিত হবে। এইরূপ বিজ্ঞান স্বপ্রকাশ নয়, পরপ্রকাশ; জ্ঞানস্বরূপ নয়, জ্ঞেয়। এইরূপ বিজ্ঞান অদ্বৈতবেদান্তীর ব্রহ্মবিজ্ঞানের মর্যাদা লাভ করতে পারে কি করে?

সাক্ষিণোবগন্তুঃ স্বয়ংসিদ্ধতামুপক্ষিপতা, স্বয়ং প্রথতে বিজ্ঞানম্ ইত্যেষ এব মম পক্ষস্ত্বয়া বাচোযুক্ত্যন্তরেণাশ্রিত ইতি চেৎ, ন; বিজ্ঞানস্যোৎপত্তিপ্রধ্বংসানেকত্বাদিবিশেষবত্ত্বাভ্যুপগমাৎ; অতঃ প্রদীপবদ্বিজ্ঞানস্যাপি ব্যতিরিক্তাবগম্যত্বমস্মাভিঃ প্রসাধিতম্ ৷৷ -(ব্রহ্মসূত্র-২/২/২৮, শাঙ্করভাষ্য দ্রষ্টব্য)

অর্থাৎ বৌদ্ধ যদি বলেন বেদান্তী ভঙ্গীক্রমে বিজ্ঞানবাদই স্বীকার করছেন, ফলতঃ তা নয়। কারণ এই যে, বৌদ্ধরা বিজ্ঞানের উৎপত্তি বিনাশ ও নানাত্ব স্বীকার করে থাকেন। আমরা বেদান্তী, আমরা সর্ব-জ্ঞাতা সাক্ষীর উৎপত্ত্যাদি স্বীকার করি না। সাক্ষী ও বিজ্ঞানের মধ্যে প্রভেদ থাকায় প্রদীপের ন্যায় বিজ্ঞানও স্বভিন্ন বস্তুকর্তৃক বিজ্ঞাত হয়, এটা আমরা প্রকৃষ্টরূপে প্রতিপাদন করলাম।

ভাষ্যের নিগূঢ় উক্তির ব্যাখ্যায় ভামতীকার বাচস্পতি মিশ্র বলছেন—"বিজ্ঞানবাদীরা বিজ্ঞানের উৎপত্তি ও বিনাশরূপ ধর্ম স্বীকার করেন। তাহলে বিজ্ঞান ফল বা কার্য হয়ে দাঁড়ায়। যে নিজেই ফলস্বরূপ, তার জ্ঞাতৃত্ব থাকতে পারে না; অর্থাৎ ক্ষণিক বিজ্ঞান কোনমতেই জ্ঞাতা হতে পারে না, ওটা স্বপ্রকাশ এবং স্বয়ংসিদ্ধও হতে পারে না। "

অতএব বিজ্ঞানবাদীদের বিজ্ঞান উৎপত্তিবিনাশশীল, সুতরাং কার্যবস্তু, সেহেতু জড়পদার্থ। যা জড়, তা অবশ্যই অন্যকর্তৃক প্রকাশিত হয়, যেমন প্রদীপ। অদ্বৈতবেদান্তে সাক্ষী কিন্তু স্বয়ংপ্রকাশ চৈতন্যস্বরূপ, উৎপত্তিনাশরহিত, সুতরাং কূটস্থ। তাঁর আর অন্য প্রকাশকের অপেক্ষা নেই।

প্রতিবাদীগণের আরেকটি আপত্তি হল, পরমগুরু গৌড়পাচার্যের অজাতিবাদ একটি বৌদ্ধ দার্শনিক সিদ্ধান্ত। তদুত্তরে বলব—তিনি অজাতিবাদ গ্রহণ করলেও, বৈদান্তিকের দৃষ্টিতেই তা গ্রহণ করেছেন, শূন্যবাদীর দৃষ্টিতে নয়। সতের মায়িক জন্ম সম্ভব, অসতের মায়িক জন্মও সম্ভব নয়, মাণ্ডুক্য কারিকাতে (৩।২৭,২৮) এটা বলে গৌড়পাদাচার্য অসৎবাদী বা বৌদ্ধ শূন্যবাদী মত খণ্ডন করে বেদান্তসিদ্ধান্তই প্রতিপাদন করেছেন। নিখিল পদার্থই অবিদ্যাবশে জন্মলাভ করে থাকে, সুতরাং কোন বস্তুই শাশ্বত বা নিত্য নয়, তবে সমস্তই ব্রহ্মময়, এরূপ সর্বত্র ব্রহ্মবুদ্ধির উদয় হলে পরমাত্মা বা পরব্রহ্মরূপে সমস্ত বস্তুকেই অজ বলা যায় (মাঃ কাঃ ৪।৫৭)। অজ অবিনাশী অদ্বয় চৈতন্যই সত্য, তদ্ব্যতীত সমস্তই মিথ্যা। এই অদ্বয় চৈতন্যে যাদের চিত্ত নিশ্চলভাবে স্থিতি লাভ করে, তাঁরাই যথার্থ তত্ত্বদর্শী (মাঃ কাঃ ৪।৮০)। আচার্য গৌড়পাদের এই উক্তি বেদান্তবিরুদ্ধ মত প্রতিপাদন করে না। শুক্ল যজুর্বেদীয় নিরালম্বোপনিষদে বর্ণিত আছে— "তপ ইতি চ ব্রহ্ম সত্যং জগন্মিথ্যেতি"-(নিরালম্ব উপনিষৎ-৩৫)

চৈতন্যই একমাত্র তত্ত্ব, এটা আকাশের ন্যায় ভূমা ও অখণ্ড, এটাতো বেদান্তেরই সিদ্ধান্ত। সেই অজ, নিত্য চৈতন্যের ভেদ মায়িক। মাণ্ডুক্যকারিকার বৈতথ্যপ্রকরণে 'ইতি বেদান্তনিশ্চয়ঃ', 'বেদান্তেষু বিচক্ষণৈঃ', 'বেদপারগৈঃ'—এ সকল উক্তি দ্বারা আচার্য গৌড়পাদের সিদ্ধান্ত যে বেদান্তরই সিদ্ধান্ত, বৌদ্ধ সিদ্ধান্ত নয়, তা বারবার নানা ভাষায় তিনি প্রতিপাদন করার চেষ্টা করেছেন।

বৌদ্ধ শূন্যবাদের সহিত অদ্বৈতবাদের বৈসাদৃশ্য আরও পরিস্ফুট। শূন্যবাদীর মতে বিজ্ঞান বা বিজ্ঞেয় কারও কোনরূপ বাস্তব সত্তা নেই। তত্ত্বের রাজ্যে মহাশূন্যতায় বিরাজ করে। এই শূন্যই একমাত্র তত্ত্ব। শূন্যবাদী বলেন যে, বিজ্ঞান বা বিজ্ঞেয় বিশ্বপ্রপঞ্চ কারও পারমার্থিক সত্যতা নিরূপণ করা যায় না। সুতরাং তত্ত্ব নিরূপণ দুরূহ। পারমার্থিক তত্ত্ব নেই, শূন্যবাদীর এই উক্তিও পরমার্থ কিনা; সকলই শূন্য এই মতবাদও শূন্য কিনা? বৌদ্ধতার্কিক নাগার্জুন তাঁর 'বিগ্রহব্যাবর্তনী' গ্রন্থে উল্লিখিত প্রশ্নের সুনিপুণ সমাধান করেছেন। শ্রীহর্ষ প্রমুখ অদ্বৈত আচার্যগণ নাগার্জুনের যুক্তি ও বিচারশৈলী হতে যথেষ্ট অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। কারণ, অদ্বৈতবাদের বিরুদ্ধেও অনুরূপ প্রশ্নই উঠেছে—'জগৎ মিথ্যা', এই উক্তিটিও মিথ্যা কিনা? এই উক্তি মিথ্যা হলে জগৎ সত্য হয়ে দাঁড়ায়। আচার্য শ্রীহর্ষ খণ্ডনখণ্ডখাদ্যে, আচার্য মধুসূদন সরস্বতী 'অদ্বৈতসিদ্ধিতে' আলোচ্য প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। বিশেষতঃ শ্রীহর্ষের খণ্ডনরীতি যে অনেকাংশে নাগার্জুনের খণ্ডনশৈলীরই অনুরূপ তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। অদ্বৈতবাদকে বৌদ্ধ মতবাদরূপে অভিযুক্ত করার পিছনে এটাও একটা কারণ বলে আমাদের মনে হয়।

শূন্যবাদের সিদ্ধান্তে বস্তুতত্ত্বের সত্যতা অসম্ভব পরিকল্পনা। অদ্বৈতবাদে পরমার্থ সত্যতা শুধু সম্ভব তাই নয়, এটা স্বয়ংভব, স্বয়ংজ্যোতিঃ, ধ্রুব, নিত্য এবং আনন্দঘন বিজ্ঞানস্বরূপ ব্রহ্ম। শূন্যবাদের খণ্ডন প্রসঙ্গে বাচস্পতি মিশ্র বলেছেন— শূন্যবাদীর দর্শনে ভ্রমের বা নিষেধের কোনও প্রকার নিশ্চিত ভিত্তি নেই। কিন্তু অদ্বৈতবেদান্তী ভ্রমের অধিষ্ঠানরূপে এক অদ্বিতীয় ভূমা বিজ্ঞানসত্তা স্বীকার করেছেন।

আচার্য শ্রীহর্ষ 'খণ্ডনখণ্ডখাদ্যম্' গ্রন্থে বলেছেন— এইভাবে প্রমাণাদি প্রপঞ্চের অসত্তা স্বীকার করলেও সৌগত (বৌদ্ধ) ও ব্রহ্মবাদীর (বেদান্তীর) মধ্যে পার্থক্য এই যে, শূন্যবাদী বৌদ্ধগণ জ্ঞান জ্ঞেয়াত্মক নিখিল প্রপঞ্চকেই অনির্বচনীয় (মিথ্যা) রূপে বর্ণনা করেন, যা বুদ্ধদেবের লঙ্কাবতার সূত্রে বর্ণিত আছে—'বুদ্ধি হতে বিবেচিত অর্থাৎ জ্ঞান হতে ভিন্নরূপে বিষয়ীভূত পদার্থসমূহের কোন স্বভাব অর্থাৎ স্বরূপ নির্ণয় করা যায় না, তেমনি বুদ্ধিও (জ্ঞানও) বিচারসহ নয়। অতএব তারা (জ্ঞান ও জ্ঞেয়) উভয়ই নিরভিলপ্য অর্থাৎ অনির্বচনীয় এবং নিঃস্বভাব (স্বরূপহীন)।'

কিন্তু অদ্বৈতবাদীগণ বলেন যে, বিজ্ঞেয় মিথ্যা হলেও বিজ্ঞান সত্য, স্বয়ংজ্যোতিঃ এবং ধ্রুব। বিজ্ঞান ব্যতিরিক্ত এই বিশ্বপ্রপঞ্চ সদসদ্বিলক্ষণ অর্থাৎ অনির্বাচ্য (মিথ্যা)। যুক্তি এই যে, এই বিশ্ব সৎ হতে পারে না, যেহেতু বক্ষ্যমাণ বহুদোষ কলুষিত। শশশৃঙ্গাদির ন্যায় অসৎও হতে পারে না, কেননা তাহলে লৌকিক ও বিচারকগণের সমস্ত ব্যবহারের ব্যাঘাত ঘটে।

অদ্বৈত ও বৌদ্ধ দর্শনে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈসাদৃশ্য হল তত্ত্ব ও তর্কের মধ্যে সম্পর্ক বিষয়ে। মাধ্যমিক বৌদ্ধাচার্য নাগার্জুনও তত্ত্বের ব্যাখ্যায় বিচার ও বিশ্লেষণের গণ্ডীর বাইরে যেতে চান নি। তর্কের বাইরে তত্ত্ব নেই, এটা তাঁরও অভিমত। কিন্তু অদ্বৈতসিদ্ধান্তে তত্ত্ব তর্কের সীমার বাইরে। তর্কের পটভূমিতে সত্যের প্রতিষ্ঠা সম্ভবপর নয় বলেই, অদ্বৈতবেদান্তী দৃশ্যমান অনির্বচনীয় বিশ্বপ্রপঞ্চের আধাররূপেও এক অদ্বিতীয় স্বপ্রকাশ বিজ্ঞানময় তত্ত্ব স্বীকার করেছেন। ঐ বেদান্তবেদ্য তত্ত্ব তর্কের অগম্য।

সুতরাং দুইটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দার্শনিক প্রস্থানের মধ্যে কোন সিদ্ধান্তে আংশিক সাদৃশ্য থাকলেই যদি দুটি দর্শন এক হয়ে যেত, তবে পৃথিবীর সকল দার্শনিক মতবাদই মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত। দ্বৈতবাদীরাও স্বীকার করে থাকেন যে, বিজ্ঞানে বিজ্ঞেয় বিষয় প্রতিভাসিত হয়, যেটা বৌদ্ধ বিজ্ঞানবাদীরা স্বীকার করে। তাহলে তো দ্বৈতবাদীরাও বিজ্ঞানবাদী। বহির্জগতের বস্তুসত্ত্বা অস্বীকার করার জন্য যদি বিজ্ঞানবাদ ও অদ্বৈতবাদ এক হয়ে যায়, তবে পরিদৃশ্যমান বিশ্বের বাস্তব সত্তা স্বীকার করার জন্য চার্বাকদর্শন ও দ্বৈতদর্শন এক বা অভিন্ন হয়ে যায় না কেন? প্রভাকরের মতে অনুভূতিই প্রমাণ। বৌদ্ধ ও জৈন মতে জ্ঞানই প্রমাণ, তাহলে কি বৌদ্ধ ও জৈন দর্শন এক? জৈনগণ ভেদাভেদবাদী, কুমারিলও ভেদাভেদবাদী। চার্বাক সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বর মানে না, পূর্বমীমাংসকেরাও সর্বজ্ঞ ঈশ্বর মানে না। অতএব যেই যুক্তিতে অদ্বৈত ও বৌদ্ধ এক দর্শন, সেই একই যুক্তিতে প্রভাকর অর্ধেক চার্বাকপন্থী এবং অর্ধেক বৌদ্ধপন্থী। কুমারীল অর্ধেক জৈনপন্থী ও অর্ধেক চার্বাকপন্থী। এইরূপে প্রতিবাদীর যুক্তির অসারতা প্রদর্শন করে, যাঁরা অদ্বৈতবেদান্তকে প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধমত বলে উপহাস করেছেন, তাঁদেরকে আচার্য প্রকাশাত্মযতি তদীয় পঞ্চপাদিকা বিবরণে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করেছেন।.......

তথ্যসূত্রঃ-

১. ভগবান শঙ্করাচার্যের "শারীরকমীমাংসা ভাষ্য", আচার্য প্রকাশাত্ম যতির "পঞ্চপাদিকা বিবরণ" ও বাচস্পতি মিশ্রের "ভামতী"।

২. আচার্য শ্রীহর্ষের "খণ্ডনখণ্ডখাদ্যম্"।

৩. "বেদান্তদর্শন—অদ্বৈতবাদ", তৃতীয় খণ্ড, আশুতোষ শাস্ত্রী।

শ্রীশুভ চৌধুরী

নভেম্বর ১৪, ২০২৪ খৃষ্টাব্দ।

নিত্যকর্মসমূহ কিরূপে মোক্ষের হেতু হয়?

  সুরেশ্বরাচার্য তদীয় নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধিতে বলছেন — কদাচিৎ কোন প্রকারে পুণ্য অনুশীলন দ্বারা এবং নিত্যকর্মানুষ্ঠান দ্বারা বুদ্ধি ব...