ভগবান্ শঙ্করাচার্য বলেছেন—"দৃশ্যং সর্বমনাত্মা স্যাদ্দৃগেবাত্মা বিবেকিনঃ", অর্থাৎ সকল দৃশ্য প্রপঞ্চই অনাত্মা, দ্রষ্টাই বিবেকীর আত্মা। এই আত্মানাত্মবিবেক বহুশাস্ত্রে কথিত হয়েছে। আত্মা ও অনাত্মার পার্থক্য বিষয়ে আচার্য বলছেন—
প্রশ্ন-আত্মার দুঃখ কি নিমিত্ত
হয়?
উত্তর-
শরীর ধারণ নিমিত্ত হয়।
এই বিষয়ে শ্রুতি রয়েছে, যথা—
'মঘবন্মর্ত্যং বা
ইদং শরীরমাত্তং মৃত্যুনা
তদস্যামৃতস্যাশরীরস্যাত্মনোঽধিষ্ঠানমাত্তো
বৈ
সশরীরঃ
প্রিয়াপ্রিয়াভ্যাং ন বৈ সশরীরস্য
সতঃ
প্রিয়াপ্রিয়যোরপহতিরস্ত্যশরীরং
বাব সন্তং ন
প্রিয়াপ্রিয়ে
স্পৃশতঃ॥'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৮।১২।১)
অর্থাৎ
এই শরীর মরণশীল, এটা
মৃত্যুকবলিত; এটা অমর ও
অশরীর আত্মার অধিষ্ঠান। যিনি সশরীর (দেহাভিমানী)
তিনি সুখদুঃখগ্রস্ত হন; তাঁর সুখদুঃখের
বিরাম নেই। যিনি অশরীর
(দেহাভিমানরহিত) তাঁকে সুখ বা দুঃখ
স্পর্শ করে না।
প্রশ্ন—শরীর ধারণ কি
কারণে হয়?
উত্তর-কর্ম্মদ্বারা।
প্রশ্ন—কর্মই বা কি কারণে
হয়?
উত্তর—(আসক্তি) রাগদ্বেষাদি কারণে হয়।
প্রশ্ন—রাগদ্বেষাদি কি কারণে হয়?
উত্তর—অভিমানবশতঃ।
প্রশ্ন—অভিমান কি কারণে হয়?
উত্তর—অবিবেকহেতু।
প্রশ্ন—যদি বলি অবিবেক
কি কারণে হয়?
উত্তর—অজ্ঞানবশতঃ।
প্রশ্ন—যদি বলি অজ্ঞান
কি হেতু হয়?
উত্তর—অজ্ঞান কোন কারণ থেকে
হয় না। অজ্ঞান অনাদি
ও অনির্বচনীয়। অজ্ঞান থেকে অবিবেক উৎপন্ন
হয়। অবিবেক থেকে অভিমান হয়।
অভিমান থেকে আসক্তি প্রভৃতি
উৎপন্ন হয়। পাপ ও
পুণ্যকর্মসমূহ থেকে শরীর ধারণ
হয়। শরীর ধারণই দুঃখের
কারণ। সর্বতোভাবে শরীর পরিগ্রহ বিনষ্ট
হলে দুঃখের নিবৃত্তি হয়।
প্রশ্ন—
শরীর পরিগ্রহের নিবৃত্তি কখন হয়?
উত্তর—
সর্বতোভাবে কর্মনিবৃত্তি হলে শরীর পরিগ্রহের
নিবৃত্তি হয় অর্থাৎ আর
শরীর ধারণ হয় না।
প্রশ্ন—
কর্মনিবৃত্তি কখন হয়?
উত্তর—
সর্বতোভাবে আসক্তি প্রভৃতির নিবৃত্তি হলে কর্মনিবৃত্তি হয়।
প্রশ্ন—
আসক্তি প্রভৃতির নিবৃত্তি কখন হয়?
উত্তর—
সর্বতোভাবে অভিমাননিবৃত্তি হলে আসক্তি প্রভৃতির
নিবৃত্তি হয়।
প্রশ্ন—
কখন অভিমাননিবৃত্তি হয়?
উত্তর—
সর্বতোভাবে অবিবেকনিবৃত্তি হলে অভিমাননিবৃত্তি হয়।
প্রশ্ন—
অবিবেকনিবৃত্তি কখন হয়?
উত্তর—
সর্বতোভাবে অজ্ঞাননিবৃত্তি হলে অবিবেকনিবৃত্তি হয়।
প্রশ্ন—
অজ্ঞাননিবৃত্তি কখন হয়?
উত্তর—
জীবব্রহ্মের ঐক্যবোধ হ'লে সর্বতোভাবে
অজ্ঞাননিবৃত্তি হয়।
আচ্ছা,
নিত্যকর্মসমূহের (অনুষ্ঠান শাস্ত্রে) বিধান থাকায় নিত্যকর্মসমূহের (অনুষ্ঠান) থেকেও অবিদ্যানিবৃত্তি হয়৷ জ্ঞানের কি
প্রয়োজন—এরূপ আশঙ্কা হলে
তদুত্তরে বলা হয়—কর্মাদি
ব্যতীতই অবিদ্যানিবৃত্তি হয়। তাহা কিরূপে
হয়, এরূপ যদি বল,
তাহলে বলি—কর্ম ও
অজ্ঞানের মধ্যে বিরোধ হয় না। জ্ঞান
ও অজ্ঞানের মধ্যে বিরূদ্ধভাব হয়। অতএব জ্ঞানের
দ্বারাই অজ্ঞানের নিবৃত্তি হয়।
প্রশ্ন—
সেই জ্ঞান কিরূপে হয়?
উত্তর—
বিচার থেকেই হয়। আত্মা ও
অনাত্মার বিবেক বিষয়ক বিচার থেকেই ঐ জ্ঞান হয়।
সুতরাং
আত্মা ও অনাত্মা অর্থাৎ
আত্মা ভিন্ন দেহের পৃথকত্বের বিবেকবোধই আত্মানাত্মবিবেক। দেহকেই আমরা 'আমি' ভেবে থাকি।
'আমি'র আসল সত্তা
আত্মার জ্ঞান না থাকায় অজ্ঞ
জীব দেহকেই আত্মবোধে পোষণাদি করে বিপর্যস্ত হয়
ও সর্বদা দুঃখ ভোগ করতে
থাকে। এই 'চিজ্জড়গ্রন্থি' ছিন্ন
করতে পারলেই জীবের স্বরূপ প্রাপ্তি ঘটে। নিত্যানিত্য বস্তুর
বিবেক জ্ঞানেই অনিত্য দেহাদির প্রতি আসক্তি চলে যায়। এই
আত্মানাত্মবিবেক বর্ণনা করতে গিয়ে ভগবৎপাদ্
শঙ্করাচার্য 'অপরোক্ষানুভূতিতে' বলেছেন—
আত্মা
বিনিষ্কলো হ্যেকো দেহো বহুভিরাবৃতঃ ।
তয়োরৈক্যং
প্রপশ্যন্তি কিমজ্ঞানমতঃ পরম্ ॥
আত্মা
নিয়ামকশ্চান্তর্দেহো বাহ্যো নিয়ম্যকঃ ।
তয়োরৈক্যং
প্রপশ্যন্তি কিমজ্ঞানমতঃ পরম্ ॥
আত্মা
জ্ঞানময়ঃ পুণ্যো দেহো মাংসময়োঽশুচিঃ ।
তয়োরৈক্যং
প্রপশ্যন্তি কিমজ্ঞানমতঃ পরম্ ॥
আত্মা
প্রকাশকঃ স্বচ্ছো দেহস্তামস উচ্যতে ।
তয়োরৈক্যং
প্রপশ্যন্তি কিমজ্ঞানমতঃ পরম্ ॥
আত্মা
নিত্যো হি সদ্রূপো দেহোঽনিত্যো
হ্যসন্ময়ঃ ।
তয়োরৈক্যং
প্রপশ্যন্তি কিমজ্ঞানমতঃ পরম্ ॥
— আত্মা নিরবয়ব
একস্বরূপ কিন্তু দেহ বহুতত্ত্বাদির দ্বারা
গঠিত অর্থাৎ অবয়বযুক্ত। সুতরাং এদের একত্ব যে
দেখে তদপেক্ষা অজ্ঞান আর কি আছে!
আত্মা সকল বস্তুর নিয়ামক
ও অন্তর্বর্তী কিন্তু দেহ বাহ্য ও
নিয়ম্য। সুতরাং এদের একত্ব দর্শন
অপেক্ষা অজ্ঞান আর কি আছে!
আত্মা জ্ঞানময় ও পবিত্র কিন্তু
দেহ মাংসময় ও অপবিত্র। এদের
একতাজ্ঞান অপেক্ষা অজ্ঞান আর কি আছে!
আত্মা নির্মল ও সর্ববস্তুর প্রকাশক
কিন্তু দেহ তামস বলে
কথিত হয়েছে। এদের একতা দর্শন
অপেক্ষা অজ্ঞান আর কি আছে!
আত্মা নিত্য, সৎস্বরূপ কিন্তু দেহ অনিত্য অসৎস্বরূপ,
এদের একতা দর্শন অপেক্ষা
অজ্ঞান আর কি আছে!.....
তথ্যসূত্রঃ-
১.
ভগবান্ শঙ্করাচার্য বিরচিত 'আত্মানাত্মবিবেক' ও 'অপরোক্ষানুভূতি', উদ্বোধন
কার্যালয়, কলকাতা।
২.
উপনিষদ গ্রন্থাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, ছান্দোগ্য উপনিষদ্, স্বামী গম্ভীরানন্দ সম্পাদিত, উদ্বোধন কার্যালয় কলকাতা।
শ্রীশুভ
চৌধুরী
মার্চ
১০, ২০২৬ খৃষ্টাব্দ।
.jpg)
