Showing posts with label "অদ্বৈতবেদান্তে মায়া ও জগৎ". Show all posts
Showing posts with label "অদ্বৈতবেদান্তে মায়া ও জগৎ". Show all posts

Sunday, 15 December 2024

নিরালম্ব শ্রুতিপ্রমাণ ব্যতিরেকে ন্যায় অনুসারে জগৎ মিথ্যাত্বে প্রমাণ কি?

 


জাগতিক প্রপঞ্চের মিথ্যাত্বসাধনে প্রধানতঃ অনুমানই প্রমাণ। এই অনুমানের প্রয়োগ বাক্যটি কিরূপ, তা দেখাতে গিয়ে চিৎসুখাচার্য বলেছেন—

অয়ং পটঃ (পক্ষ), এতত্তন্তু নিষ্ঠাত্যন্তাভাবপ্রতিযোগী (সাধ্য), দৃশ্যত্বাৎ (হেতু), ঘটবৎ (দৃষ্টান্ত)।

এই পটের (বস্ত্রের) অবয়ব এই যে তন্তু বা সূতা, তাতে এই পটের অত্যন্তাভাব আছে, এবং এই পট সেই অত্যন্তাভাবের প্রতিযোগীও বটে, যেহেতু এটা দৃশ্য, যেমন ঘট। তন্তু বা সূতাগুলো তো আর পট বা বস্ত্র নয়। সূতায় বস্ত্রের অত্যন্তাভাব চিরকালই আছে এবং থাকবে। এইজন্যই আলোচ্য অনুমানে পট বা বস্ত্রকে সাধ্যের আধার অর্থাৎ পক্ষ করে বলা হয়েছে যে, এই পটের উপাদান তন্তুতে এই পটের অত্যন্তাভাব আছে, যেহেতু এই পট দৃশ্য পদার্থ। দৃশ্য পদার্থমাত্রেরই সূক্ষ্ম উপাদানে ঐ সকল স্থূল দৃশ্যবস্তুর অত্যন্তাভাব দেখতে পাওয়া যায়। ঘটের উপাদান মাটিতে ঘটের অভাব, কাঞ্চনময় কণ্ঠহারের উপাদান কাঞ্চনে কণ্ঠহারের অভাব, লৌহকুঠারের উপাদান লোহায় কুঠারের অভাব কে না প্রত্যক্ষ করেন? পটে দৃশ্যত্ব থাকায়, দৃশ্যত্ব হেতুর পক্ষ পটে অবস্থিতি (হেতুর পক্ষবৃত্তিত্ব) বুঝা গেল। ঘটেও দৃশ্যত্ব (হেতু) আছে এবং পটের অবয়ব তন্তুতে পটের অত্যন্তাভাবও (উক্ত অনুমানের সাধ্যও) আছে। ঘটেও এইরূপ নিশ্চিত সাধ্য থাকায়, আলোচ্য অনুমানে ঘটকে দৃষ্টান্তরূপে উপন্যাস করা হয়েছে বুঝতে হবে।.......

তথ্যসূত্রঃ- "বেদান্তদর্শন—অদ্বৈতবাদ", তৃতীয়খণ্ড, আশুতোষ শাস্ত্রী, কাব্য-ব্যাকরণ-সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ, বিদ্যাবাচস্পতি।

শ্রীশুভ চৌধুরী

নভেম্বর ২৪, ২০২৪ খৃষ্টাব্দ।

Friday, 22 November 2024

এই দৃশ্যমান জগৎ ব্রহ্ম ব্যতীত আর কিছুই নয়—

 


যোগবাশিষ্ঠে বর্ণিত আছে—

সর্বমেকমিদং শান্তমাদিমধ্যান্তবর্জিতম্।

ভাবাভাববিনির্মুক্তমিতি জ্ঞাত্বা সুখী ভব।

—দৃশ্যমান এই জগৎ আদি-মধ্য-অন্ত-রহিত, ভাব-অভাব অতীত, শান্ত, অদ্বিতীয় ব্রহ্ম ব্যতীত আর কিছুই নয়—এরূপ জেনে সুখী হও।

ভগবান্ শঙ্করাচার্য অপরোক্ষানুভূতিতে এই তত্ত্বটিকে খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। আচার্য বলেছেন— জগৎপ্রপঞ্চের উপাদান ব্রহ্ম ভিন্ন অন্য কিছু নয়, সুতরাং এই প্রপঞ্চসমূহে ব্রহ্মই আছেন অন্য কিছুই নেই। যেরূপ পৃথিবী ঘট নামে, তন্তুসকল পট (বস্ত্র) নামে প্রতীত হয়, সেরূপ চৈতন্যও জগৎ নামে আভাসিত হয়। ঘট ও পট নামের তিরোধান হলে মৃত্তিকা ও তন্তুকে জানা যায়। যেরূপ রজ্জুতে সর্প, আকাশে নীলবর্ণ, মরুমরীচিকায় জল দর্শন ভ্রমবশতঃ হয়ে থাকে, সেরূপ চৈতন্যসত্তায় জগৎপ্রপঞ্চের ভ্রমদর্শন ঘটে। নামরূপ মিথ্যা। ঘট, পট, কুণ্ডল—নামরূপের সত্যতা নেই। মৃত্তিকা, তন্তু, সুবর্ণই সত্য। ছান্দোগ্য শ্রুতি বলছে—"বাচারম্ভনং বিকারো নামধেয়ম্ মৃত্তিকেত্যেব সত্যম্।" ঘট ও মৃত্তিকায় যে কার্য-কারণ সম্পর্ক, প্রপঞ্চ ও ব্রহ্মেও তা বিদ্যমান; কিন্তু এখানে কার্যকে কারণ হতে ভিন্ন করা যায় না। কারণ জগৎ প্রপঞ্চের উপাদান ও নিমিত্ত কারণ ব্রহ্মই। "স য এষোঽণিমৈতদাত্ম্যমিদং সর্বং"।-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬/৮/৭); "সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম"।-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৩/১৪/১)

বিচার করলে ঘটের নাম ও রূপ তিরোহিত হয়ে এক মৃত্তিকাই দৃঢ়ভাবে উপস্থিত হয়, তদ্রূপ বিচার করলে জগৎও স্বয়ংপ্রকাশ ব্রহ্মরূপেই অবশিষ্ট থাকে। জীবের সকল ব্যবহার ব্রহ্মের মধ্য দিয়েই হয়ে থাকে, কিন্তু অজ্ঞানবশে যেরূপ ঘট প্রভৃতি স্বরূপতঃ যে মৃত্তিকাই তা যেমন জানতে পারে না, তদ্রূপ সে তা জানতে পারে না। এখন প্রশ্ন হল, সবই যদি ব্রহ্মস্বরূপ হয়, তবে আত্মা ও অনাত্মা এরূপ বিভাগ কেন করা হয়? তদুত্তরে আচার্য শ্রীশঙ্কর বলেছেন— যেরূপ ঘট মৃত্তিকা নির্মিত সেরূপ দেহও চৈতন্যময়। অজ্ঞান কর্তৃক আত্মা ও অনাত্মার বিভাগ বৃথাই কৃত হয়।...

তথ্যসূত্রঃ-

১. "যোগবাশিষ্ঠসারঃ", স্বামী ধীরেশানন্দ।

২. ভগবান্ শঙ্করাচার্যের "অপরোক্ষানুভূতি"।

শ্রীশুভ চৌধুরী

নভেম্বর ২২, শুক্রবার, ২০২৪ খৃষ্টাব্দ।

Tuesday, 19 November 2024

এই দৃশ্যমান চরাচর দ্বৈতজগৎ মনোমাত্র—


রজ্জুতে কল্পিত সর্পের ন্যায় চৈতন্যস্বরূপ আত্মাতে মায়া দ্বারা বিকল্পিত মনই দ্বৈতরূপে অবভাত হচ্ছে।

মনোদৃশ্যমিদং দ্বৈতং যৎকিঞ্চিৎসচরাচরম্ ।

মনসো হ্যমনীভাবে দ্বৈতং নৈবোপলভ্যতে ॥

-(মাণ্ডুক্যকারিকা, ৩/৩১)

— এই যা কিছু স্থাবরজঙ্গমাত্মক দ্বৈতজগৎ পরিদৃষ্ট হচ্ছে, তৎসমস্তই মনোমাত্র; কারণ যতক্ষণ মন আছে ততক্ষণ জগৎ আছে। যেহেতু মনের সত্তায় দ্বৈতের সত্তা, মনের অভাবে দ্বৈতেরও অভাব হয়ে থাকে। বিবেকের অভ্যাস এবং বিবেকজ বৈরাগ্যের দ্বারা মনের অমনীভাব হলে অর্থাৎ রজ্জুতে সর্পের ন্যায় মন যখন নিরোধ সমাধিতে বা সুষুপ্তিতে লয়প্রাপ্ত হয়, তখন দ্বৈতের উপলব্ধি হয় না।

এখন প্রশ্ন, মন কি প্রকারে অমনীভাব প্রাপ্ত হয়?

আত্মসত্যানুবোধেন ন সঙ্কল্পয়তে যদা ।

অমনস্তাং তদা যাতি গ্রাহ্যাভাবে তদগ্রহম্ ।।

-(মাণ্ডুক্যকারিকা-৩/৩২)

— আত্মার সত্যত্ব সাক্ষাৎ উপলব্ধিহেতু "বাচারম্ভণং বিকারো নামধেয়ং মৃত্তিকেত্যেব সত্যম্" অর্থাৎ মৃণ্ময় কলসী প্রভৃতি কার্যবস্তু বাক্যারব্ধ নামমাত্র, কারণরূপী মৃত্তিকাই একমাত্র সত্য; ছান্দোগ্য শ্রুতির এই বাক্যানুসারে মৃত্তিকার ন্যায় আত্মাই একমাত্র সত্যবস্তু। শাস্ত্র এবং আচার্যের উপদেশের পশ্চাৎ সেই সত্যবস্তু আত্মার সাক্ষাৎ উপলব্ধি দ্বারা গ্রাহ্যপদার্থের অভাবহেতু সেই মন আর সঙ্কল্প করে না। দাহ্য পদার্থের অভাবে অগ্নি যেরূপ জ্বলন-ক্রিয়া করে না, সেইরূপ মন অগ্রহ অর্থাৎ গ্রহণ-বিষয়ক সঙ্কল্পরহিত হয়ে অমনীভাব প্রাপ্ত হয়।.......

তথ্যসূত্রঃ- আচার্য গৌড়পাদ বিরচিত মাণ্ডুক্যকারিকা, ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্যের ভাষ্য সমেত।

শ্রীশুভ চৌধুরী

নভেম্বর ১৯, ২০২৪ খৃষ্টাব্দ।

Saturday, 29 June 2024

ব্রহ্মচৈতন্যই জগতের প্রকাশকঃ-

 


ব্রহ্মসূত্রের অনুকৃত্যধিকরণের প্রতিপাদ্য বিষয় ব্রহ্মচৈতন্যই জগতের প্রকাশক। "ন তত্র সূর্যো ভাতি ন চন্দ্রতারকং নেমা বিদ্যুতো ভান্তি কুতোঽয়মগ্নিঃ৷ তমেব ভান্তমনুভাতি সর্বং তস্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি।"-(মুণ্ডক উপনিষৎ-২।২।১০) অর্থাৎ সেই স্থলে সূর্য প্রকাশিত হয় না, চন্দ্রমা এবং তারকা প্রকাশিত হয় না, এই বিদ্যুৎ সকল প্রকাশিত হয় না, এই অগ্নি আর কি প্রকারে প্রকাশিত হবে? প্রকাশমান্ তাঁকেই অনুকরণকরতঃ সমস্ত পদার্থ (জগৎ) প্রকাশিত হচ্ছে, তাঁর দীপ্তির দ্বারা এই সমস্ত বস্তু বিবিধরূপে প্রকাশ প্রাপ্ত হচ্ছে, মুণ্ডকাধ্যায়িগণ এইপ্রকার পাঠ করেন। উক্ত শ্রুতিবাক্যে প্রকাশমান্ যাঁকে অনুসরণকরতঃ সমস্ত বস্তু প্রকাশিত হচ্ছে এবং যাঁর দীপ্তির দ্বারা এই সমস্ত বিবিধরূপে প্রকাশপ্রাপ্ত হচ্ছে, তিনি কি কোন প্রকার জ্যোতির্ময় জড় পদার্থ অথবা প্রাজ্ঞ আত্মা (—জ্ঞানস্বরূপ পরমাত্মা)? এই প্রকার সন্দেহ হলে ভগবান সূত্রকার সিদ্ধান্ত করছেন—

অনুকৃতেস্তস্য চ৷৷ -(ব্রহ্মসূত্র-১.৩.২২)

প্রাজ্ঞ আত্মাই উক্তরূপে প্রতীয়মান বস্তু হওয়া উচিত। তাতে হেতু কি? যেহেতু অনুকরণ করে, অনুকৃতি শব্দের অর্থ অনুকরণ। 'তমেব ভান্তমনুভাতি সর্বম্' অর্থাৎ প্রকাশমান্ তাঁকেই অনুসরণকরতঃ সমস্ত পদার্থ প্রকাশিত হয়, উক্ত মুণ্ডক শ্রুত্যোক্ত এই যে অনুভান, এটাই অনুকরণ; তা স্বপ্রকাশ পরমাত্মা গৃহীত হলে সঙ্গত হয়। যেহেতু "ভারূপঃ সত্যসংকল্পঃ"-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৩.১৪.২) চৈতন্যরূপ দীপ্তিই যাঁর রূপ, যাঁর সঙ্কল্পসকল অমোঘ—এইপ্রকারে শ্রুতি স্বপ্রকাশ পরমাত্মাকে পাঠ করছেন। অন্য সমস্ত পদার্থ এই পরমাত্মার দীপ্তি অবলম্বনেই প্রকাশিত হয়, এটাই ভাব। কিন্তু সূর্য প্রভৃতি অন্য কোন উৎকৃষ্টতর জড় জ্যোতির্ময় বস্তুর দীপ্তিকে অবলম্বন করে স্বয়ং প্রকাশিত হয়, এটা প্রসিদ্ধ নয়। ভগবান ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য বলছেন—"যদুপলভ্যতে তৎসর্বং ব্রহ্মণৈব জ্যোতিষোপলভ্যতে; ব্রহ্ম তু নান্যেন জ্যোতিষোপলভ্যতে, স্বয়ং জ্যোতিঃস্বরূপত্বাৎ" অর্থাৎ এই সংসারমণ্ডলে যা কিছু উপলব্ধ হয়, সেই সমস্তই ব্রহ্মরূপ জ্যোতির দ্বারাই উপলব্ধ হয়। স্বয়ংজ্যোতিঃস্বরূপ হন বলে ব্রহ্ম কিন্তু অন্য জ্যোতির দ্বারা উপলব্ধ (প্রকাশিত) হন না। "আত্মনৈবায়ং জ্যোতিষাস্তে"-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪।৩।৬) অর্থাৎ ইনি (—এই পুরুষ) আত্মরূপ জ্যোতির দ্বারাই উপবেশন করেন, ইত্যাদি শ্রুতিসকল হতে এটা অবগত হওয়া যায়।

আর ভগবদ্গীতাতেও প্রাজ্ঞ আত্মারই এতাদৃশ স্বরূপ স্মৃত হয়েছে। যথা—"ন তদ্ভাসয়তে সূর্যো ন শশাঙ্কো ন পাবকঃ৷ যদ্গত্বা ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম"-(শ্রীগীতা-১৫।৬) অর্থাৎ যাঁকে লাভ করলে সংসারে আর পুনর্জন্ম হয় না, যা চন্দ্র, সূর্য ও অগ্নি প্রকাশ করতে পারে না, তাই আমার পরমধাম (—স্বরূপ)। "যদাদিত্যগতং তেজো জগদ্ভাসয়তেঽখিলম্৷ যচ্চন্দ্রমসি যচ্চাগ্নৌ তত্তেজো বিদ্ধি মামকম্৷"-(শ্রীগীতা-১৫।১২) অর্থাৎ যে জ্যোতিঃ সূর্যে, চন্দ্রে ও অগ্নিতে আছে এবং যা সমগ্র জগৎকে প্রকাশ করে, সেই জ্যোতিঃ আমার জানবে।  অতএব এটা সিদ্ধ হল যে পরমাত্মা অন্য কর্তৃক প্রকাশিত হন না, কিন্তু স্বয়ং সমস্ত বিশ্বের প্রকাশক।.....

তথ্যসূত্রঃ-

১. ভগবান শঙ্করাচার্য বিরচিত "শারীরকমীমাংসাভাষ্য"।

২. শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা "শাঙ্করভাষ্য"।

শ্রীশুভ চৌধুরী

জুন ২৩, রবিবার, ২০২৪ খৃষ্টাব্দ।

Friday, 28 June 2024

অধ্যাস ও অধ্যাসের লক্ষণঃ-

 


আত্ম-মীমাংসা বা ব্ৰহ্ম-মীমাংসাই বেদান্তদর্শনের প্রাণ। আত্মার অস্তিত্ব স্বতঃসিদ্ধ, আত্মার অস্তিত্ব সম্বন্ধে কাহারও কোন বিবাদ নাই। আত্মাই ব্রহ্ম, সুতরাং ব্রহ্মের অস্তিত্বও সর্ববাদিসিদ্ধ। 'সর্বস্যাত্মত্বাচ্চ ব্রহ্মাস্তিত্বপ্রসিদ্ধিঃ৷'-(ব্রহ্মসূত্র শঙ্করভাষ্য ১।১।১)। এই স্বতঃসিদ্ধ আত্মা বা ব্রহ্মই একমাত্র সত্য, তদ্ব্যতীত সমস্তই অসত্য। আত্মা সচ্চিদানন্দস্বরূপ, এইরূপ আত্মজ্ঞানই প্রকৃত জ্ঞান, তদ্ভিন্ন সমস্তই অজ্ঞান। ইহাই অদ্বৈতবেদান্তের মর্মকথা। আত্মা-জিজ্ঞাসা বা ব্রহ্ম-জিজ্ঞাসাই সকল জিজ্ঞাসার পার বলিয়া বেদান্তে তাহাই সর্বপ্রথমে উপদিষ্ট হইয়াছে—‘অথাতো ব্ৰহ্মজিজ্ঞাসা।' (ব্রহ্মসূত্র ১।১।১)।

“অহম্‌” বলিয়া লোকে যে প্রত্যক্ষ করে, সেখানে বিচার করিলে দেখা যায় যে, দেহী তাঁহার শরীরের মধ্যে বিরাজমান শবীরাভিমানী চৈতন্যকেই “অহম্‌” বলিয়া উপলব্ধি করে। শরীর ও ইন্দ্রিয়াদির আবেষ্টনীর মধ্যে অবস্থিত চৈতন্যের সঙ্গে জড় শরীরের যে মৌলিক বিভেদ আছে, তাহাও সে ভুলিয়া যায়। শরীর, ইন্দ্রিয় ও অন্তঃকরণের ধর্মকে আত্মার ধর্ম বলিয়া ভ্রম করে। আমি স্থূল, আমি কৃশ, আমি অন্ধ, আমি বধির, আমি সুখী, আমি দুঃখী, এইরূপেই সাধারণতঃ লোকের “আমিত্বের” প্রত্যক্ষ হইয়া থাকে। আত্মা কি কখনও স্থূল বা কৃশ হয়? অন্ধ ও বধির হয়? স্থূল বা কৃশ হয় শরীর, অন্ধ বা বধির হয় ইন্দ্রিয়। সেই ইন্দ্রিয় ও শরীরের ধর্ম লোকে ভ্রমবশতঃ আত্মায় আরোপ করিয়া থাকে। ফলে, আত্মার যথার্থ সচ্চিদানন্দরূপটি সাধারণের দৃষ্টিতে প্রকাশ পায় না, আত্মার কল্পিত ভ্রান্তরূপই প্রত্যক্ষগোচর হইয়া থাকে।

আত্মার স্বরূপ সম্বন্ধে অনাদিকাল হইতেই এইরূপ ভ্রান্ত দৃষ্টি চলিয়া আসিতেছে। অধ্যাসই এই ভ্রান্ত দৃষ্টির মূল। অধ্যাস কাহাকে বলে? ভগবান্ শঙ্করাচার্য অধ্যাসভাষ্যে বলিতেছেন—"অধ্যাসঃ নাম অতস্মিন্ তদ্বুদ্ধিঃ ইতি অবোচাম।" অর্থাৎ যে বস্তু বাস্তবিক যাহা নহে, সেইরূপে ঐ বস্তুকে জানার নামই অধ্যাস বা মিথ্যাজ্ঞান। রজ্জু বাস্তবিক সৰ্প নহে, রজ্জুকে সর্প রূপে জানার নামই রজ্জুতে সর্পের অধ্যাস। এইরূপ আত্মা বাস্তবিক স্থূল বা কৃশ নহে, আত্মাকে স্থূল বা কৃশরূপে বোঝাই আত্মাতে দেহধর্মের অধ্যাস। আমি অন্ধ, আমি বধির, আমি সুখী, আমি দুঃখী এইরূপ আত্মজ্ঞান আত্মায় ইন্দ্রিয় ও অন্তঃকরণ-ধর্মের অধ্যাসবশতঃ উৎপন্ন হইয়া থাকে। আলোক উপস্থিত হইলে যেমন অন্ধকার বিদূরিত হয়, সেইরূপ যথার্থ আত্মজ্ঞানের উদয় হইলে, জীবের ঐরূপ (অধ্যাস) অজ্ঞান বা মিথ্যা বুদ্ধি বিদূরিত হয়। জীব শাশ্বতশান্তি লাভ করে। ‘অবিদ্যাধ্বান্তং বিদ্যাপ্রদীপেন বিধূয় আত্মৈব কেবলো নির্বৃত্তঃ সুখী ভবতি৷'-(ব্রহ্মসূত্র, শঙ্করভাষ্য-২।৩।৪০)

অনাদিকাল-সঞ্চিত মিথ্যাজ্ঞানের ফলে অসঙ্গ চৈতন্যময় নির্বিশেষ আত্মায় নানা কল্পিত সম্বন্ধের সৃষ্টি হইয়া থাকে এবং ঐ কল্পিত সম্বন্ধ দ্বারা আত্মার যথার্থ রূপটি আবৃত হইয়া পড়ে। ইহাই অজ্ঞানের কার্য বা অধ্যাসের ফল। আত্মা প্রকাশক, জড় প্রকাশ্য। যাহা প্রকাশ্য, তাহা প্রকাশক নহে, যেমন আলোকপ্রকাশ্য ঘট, আলোক নহে। অতএব আত্মা কখনও জড় হইতে পারে না, বা জড়ের সহিত তাহার কোন যথার্থ সম্বন্ধও থাকিতে পারে না। আত্মা চৈতন্যময়। আত্মা ব্যতীত সমস্তই অনাত্মা এবং জড়। 'অহম্' শব্দে স্বপ্রকাশ চিদানন্দঘন আত্মাকে বুঝায়, 'ইদম্' শব্দে অনাত্মা বা জড়বস্তুকে বুঝায়। আত্মা ও অনাত্মা, অহং এবং ইদম্, আলোক-অন্ধকারের মত পরস্পর বিরুদ্ধ। ইহাদের (চৈতন্য ও জড়বস্তুর) অভেদ কখনও সম্ভব নহে। অধ্যাস বা অবিদ্যার ফলে আত্মা ও অনাত্মার মধ্যে কল্পিত সম্বন্ধের সৃষ্টি হয় এবং 'আমি ইহা' 'আমার ইহা' এইরূপ ভ্রান্তবোধ উৎপন্ন হইয়া থাকে। দেহ ও ইন্দ্রিয়াদির বন্ধনে আবদ্ধ আত্মাকে দেহাদি হইতে অভিন্ন বলিয়া মনে হইয়া থাকে। বেদান্তের পরিভাষায় ইহাই ‘চিদচিদগ্ৰন্থি'। এই চিদচিদ্‌গ্ৰন্থি-রহস্য আচার্য শঙ্কর ব্রহ্মসূত্রের অধ্যাস-ভাষ্যে প্রাণস্পর্শী ভাষায় বিবৃত করিয়াছেন। আচার্য বলেন যে, চিদানন্দস্বভাব আত্মা অপরিবর্তনীয়, সুতরাং সত্য, আর জড় স্বভাব দৃশ্যবস্তু নিয়ত পরিবর্তনশীল, সুতরাং মিথ্যা। এই সত্য ও মিথ্যার অধ্যাস বা মিলনের ফলেই জীবের সংসারজীবন চলিতেছে এবং উহা সত্য স্বাভাবিক বলিয়া মনে হইতেছে। 

ভাষ্যকার অধ্যাসকে 'সত্যানৃতের মিথুন' বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। ভাষ্যকারের উক্তির মর্ম এই যে, অনাদি মিথ্যা অজ্ঞানের ফলে চিদাত্মা এবং জড়দেহাদির মধ্যে যে মৌলিক বিভেদ আছে, তাহা ভ্রান্তদর্শী ভুলিয়া যায়, এবং সত্য চিদবস্তু ও মিথ্যা জড়বস্তু, এই দুইকে মিশাইয়া ফেলে। কেন মিশাইয়া ফেলে? এই প্রশ্নের উত্তরে ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য বলিতেছেন যে, "ইতরেতরাবিবেকেন"  চিৎ ও জড়বস্তুর প্রকৃত রূপ যে কি, তাহা জানে না বলিয়াই লোকে চিৎ ও জড়কে অভিন্ন করিয়া ধরিয়া নেয়; চৈতন্যের ধর্মকে জড়ের ধর্ম, এবং জড়ের ধর্মকে চৈতন্যের ধর্ম মনে করিয়া ভুল করে। সত্য ও মিথ্যাকে এক করিয়া লয়, ইহাই সত্যানৃতের মিথুন, চিদচিদগ্রন্থি বা অধ্যাস বলিয়া বেদান্তে অভিহিত হইয়াছে। ভাষ্যকারের উক্তির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করিতে গিয়া বাচস্পতি বলিয়াছেন যে, মিথ্যা অজ্ঞানবশতঃ যে সকল জাগতিক ব্যবহার চলিতেছে এবং লোকে ঐ ব্যবহারকে সত্য এবং স্বাভাবিক বলিয়া মনে করিতেছে, অধ্যাসই তাহার মূল বলিয়া জানিবে, অধ্যাস বা সত্য ও মিথ্যার মিলন যতক্ষণ আছে, ঐ সকল মিথ্যা ব্যবহারও ততক্ষণ আছে।

এই অধ্যাসকে ভাষ্যকার মিথ্যা অজ্ঞানমূলক (চিদচিদ্গ্রন্থি) বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। ভাষ্যকারের উক্তির ব্যাখ্যায় আচার্য পদ্মপাদ্ বলিয়াছেন যে, এখানে মিথ্যা শব্দের অর্থ অনির্বচনীয়, আর অজ্ঞান শব্দের অর্থ জড় অবিদ্যাশক্তি। ফলে, অনির্বচনীয় অবিদ্যাশক্তিই অধ্যাসের উপাদান ইহাই বুঝা গেল। অধ্যাস অজ্ঞানমূলক হইলেও ইহাকে নৈসর্গিক বা স্বাভাবিক বলিয়াই মনে হয়। ইহাই অধ্যাসের বৈচিত্র্য।

এখন প্রশ্ন, অধ্যাসের লক্ষণ কি? তদুত্তরে ভগবান ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য ব্রহ্মসূত্রের অধ্যাসভাষ্যে বলিতেছেন—"স্মৃতিরূপঃ পরত্র পুর্ব্বদৃষ্টাবভাসঃ।"-(ব্রহ্মসূত্র অধ্যাসভাষ্য) অর্থাৎ

পরত্র বা অন্য কোন অপেক্ষাকৃত সত্যবস্তুতে পূর্বে দৃষ্ট কোন বস্তু বা জ্ঞানের সংস্কারমূলে যে ভাতি বা প্রকাশ তাহারই নাম অধ্যাস। রজ্জু প্রভৃতিতে ব্যবহারিক সর্প প্রভৃতির স্মৃতিজ্ঞানের সদৃশ যে জ্ঞান পূর্বদর্শনপ্রযুক্ত উৎপন্ন হয়, অর্থাৎ সর্পাদির পূর্বানুভবজন্য সংস্কার প্রভৃতি হইতে উৎপন্ন হয়, তাহাই অধ্যাস বা অধ্যস্ত জ্ঞান।

এই অধ্যাস পদ্মপাদাচার্যের মতে স্মৃতি নহে, তবে স্মৃতির মত অর্থাৎ স্মৃতি যেমন সংস্কারজন্য, মিথ্যা জ্ঞানও সেইরূপ পূর্বসংস্কারজন্য, বিশেষ এই যে, স্মৃতির যাহা বিষয় অর্থাৎ যে বিষয়ে স্মৃতি উৎপন্ন হয়, তাহা স্মরণকর্তার সম্মুখে উপস্থিত থাকে না, কিন্তু ভ্রমের বিষয় রজতাদি বস্তু ভ্রান্ত ব্যক্তির সম্মুখে উপস্থিত থাকে। এইজন্যই ভ্রমজ্ঞান, প্রত্যক্ষজ্ঞান স্মৃতি নহে। রজ্জুরূপ অধিষ্ঠান বা আশ্রয়ে সাপের ভ্রমজ্ঞানের উদয় হয়। সচ্চিদানন্দ পরব্রহ্মই অনাদি অনির্বচনীয় অবিদ্যাবিভ্রমের অধিষ্ঠান বা আশ্রয়। অনাদিবিভ্রমবশতঃ এক ব্রহ্ম নানারূপে, জীব ও জগৎরূপে প্রতিভাত হইয়া থাকেন। তাঁহার মতে কোনরূপ অধিষ্ঠানকে অবলম্বন করিয়াই ভ্রমজ্ঞান উৎপন্ন হইয়া থাকে। অধ্যাসবাদ শূন্যবাদ নহে ইহা বুঝাইবার জন্য লক্ষণে "পরত্র" পদের অবতারণা করা হইয়াছে। এই বিষয়ে পঞ্চপাদিকা দ্রষ্টব্য।

ভামতীকার বাচস্পতি মিশ্র বলেন— "অবভাসঃ" এই পদটীই অধ্যাসের সংক্ষিপ্ত লক্ষণ। "স্মৃতিরূপঃ" এবং "পূর্বদৃষ্টঃ" ইত্যাদি পদগুলি তাহার উপব্যাখ্যান মাত্র। সুতরাং অধ্যাস একপ্রকার 'অবভাস' অর্থাৎ পূর্বদৃষ্ট কোন বস্তুর অপরবস্তুতে প্রতীতিরূপ মিথ্যা প্রত্যয় মাত্র এবং উহা স্মৃতিজ্ঞানের মত পূর্বপ্রতীতি অনুসারে উৎপন্ন হয়। ইহা একটি আপাত প্রতীতি অর্থাৎ আপাত সত্য, যাহা পরবর্তী সময়ে মিথ্যা বলিয়া প্রমাণিত হয়। অন্যভাবে বলা যায় ইহা একটি মিথ্যা জ্ঞান। সত্যের (সত্য অধিষ্ঠানের) সহিত অনৃতের বা মিথ্যার মিলন হইলেই অধ্যাস হইবে। আরোপ্য বস্তুটি যে মিথ্যা, তাহা লক্ষণস্থ "পূর্ব-দৃষ্ট" কথাটির দ্বারাই সূচিত হইয়াছে। বাচস্পতি মিশ্র লক্ষণস্থ পূর্ব-দৃষ্ট কথাটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করিয়া আরোপ্য বস্তুটিকে অনৃত বা মিথ্যা বলিয়াছেন এবং পরত্র পদটির দ্বারা অধিষ্ঠানের আপেক্ষিক সত্যতার ইঙ্গিত করিয়াছেন। "স্মৃতিরূপ" পদটির দ্বারা অধ্যাসকে স্মৃতির তুল্য বলা হইয়াছে। স্মৃতিজ্ঞানের বিষয়বস্তু স্মরণকর্তার সম্মুখে উপস্থিত না থাকিলেও যেমন স্মৃতি হইতে কোন বাধা নাই, অনুপস্থিত বিষয় সম্পর্কেই স্মৃতিজ্ঞান উৎপন্ন হয়, ভ্রমের বিষয় মিথ্যা-রজত প্রভৃতিও সেইরূপ ভ্রান্তদর্শীর সম্মুখে অনুপস্থিত থাকিয়াই ভ্রম উৎপাদন করে। এই দৃষ্টিতেই বাচস্পতি মিশ্র ভ্রমকে স্মৃতির তুল্য বলিয়াছেন। আলোচ্য অধ্যাস লক্ষণের "স্মৃতিরূপ" কথাটির দ্বারা বাচস্পতির মতে আরোপ্য রজতাদির অধিষ্ঠানে অনুপস্থিতিই সূচনা করা হইয়াছে। ফলে, অদ্বৈতবাদীর ভ্রমবাদ যে সৎখ্যাতিবাদ থেকে স্বতন্ত্র, ইহা বুঝা গেল, আর "অবভাস" কথাটি দ্বারা অনুপস্থিত আরোপ্য বস্তুরও সত্য বস্তুর ন্যায় সাময়িক ভাতি বা প্রকাশ অঙ্গীকার করায়, অধ্যাসবাদ যে শূন্যবাদ বা অসৎখ্যাতি নহে, ইহাও প্রদর্শিত হইল।

আলোচ্য অধ্যাস লক্ষণ অনির্বচনীয়খ্যাতিবাদের কথাই বলিতেছে। সমস্ত পদার্থই চৈতন্যে অধ্যস্ত। রজ্জু চৈতন্যেই অধ্যস্ত, আর এই রজ্জু-অবিচ্ছিন্ন-চৈতন্যের উপরই অনির্বচনীয় সর্পের অধ্যাস হয়। অনির্বচনীয় শব্দের অর্থ মিথ্যা। "যাহা সৎ নহে, অসৎ নহে এবং সদসদ্ও নহে", অর্থাৎ যাহাকে 'আছে' বলা যায় না, 'নাই' বলা যায় এবং 'আছে ও নাই' উভয়ও বলা যায় না, তাহাকে মিথ্যা বা অনির্বচনীয় বলে। এই অর্থে এই শব্দটী পারিভাষিক। রজ্জু-অবিচ্ছিন্ন-চৈতন্যে অধ্যস্ত সর্প যদি সৎ হইত, তবে রজ্জুর জ্ঞানে তাহার বাধ হইত না। যদি অসৎ হইত, তবে বন্ধ্যাপুত্রের ন্যায় উক্ত সর্প কদাপি দৃষ্টিগোচর হইত না। আবার উক্ত সর্পকে সদসদ্ও বলা যায় না, কারণ একই বস্তু একই কালে সৎ ও অসৎ, এই উভয়প্রকার বিরুদ্ধধর্ম্মবিশিষ্ট হইতে পারে না; আর তাদৃশ্য বস্তু কাহারও বুদ্ধিগ্রাহ্যও হইতে পারে না।

তথ্যসূত্রঃ-

১. ভগবান শঙ্করাচার্য বিরচিত শারীরক মীমাংসা "অধ্যাসভাষ্য"।

২. পদ্মপাদাচার্যের পঞ্চপাদিকা ও বাচস্পতি মিশ্রের ভামতী।

৩. বেদান্তদর্শন—অদ্বৈতবাদ, আশুতোষ শাস্ত্রী কাব্য-ব্যাকরণ-সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ বিদ্যাবাচস্পতি।

শ্রীশুভ চৌধুরী

জুন ১৪, শুক্রবার, ২০২৪ খৃষ্টাব্দ।

নিত্যকর্মসমূহ কিরূপে মোক্ষের হেতু হয়?

  সুরেশ্বরাচার্য তদীয় নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধিতে বলছেন — কদাচিৎ কোন প্রকারে পুণ্য অনুশীলন দ্বারা এবং নিত্যকর্মানুষ্ঠান দ্বারা বুদ্ধি ব...