Showing posts with label বেদান্তের পরিচয়. Show all posts
Showing posts with label বেদান্তের পরিচয়. Show all posts

Saturday, 11 April 2026

ব্রহ্মসূত্রকে কেন "শারীরকমীমাংসা" বলা হয়?

 


ভগবান্ ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য অধ্যাসভাষ্যে বলছেন

এবম্ অয়ম্ অনাদিঃ অনন্তঃ নৈসর্গিকঃ অধ্যাসঃ মিথ্যাপ্রত্যয়রূপঃ কর্তৃত্বভোক্তৃত্বপ্রবর্তকঃ সর্বলোকপ্রত্যক্ষঃ৷ অস্যানর্থহেতোঃ প্রহাণায় আত্মৈকত্ববিদ্যাপ্রতিপত্তয়ে সর্বে বেদান্তা আরভ্যন্তে যথা অয়মর্থঃ সর্বেষাং বেদান্তানাম্, তথা বয়মস্যাং শারীরকমীমাংসায়াং প্রদর্শয়িষ্যামঃ৷

এইপ্রকারে এই অনাদি, অনন্ত এবং নৈসর্গিক অধ্যাস মিথ্যাজ্ঞানরূপ, কর্তৃত্ব ভোক্তৃত্বের প্রবর্ত্তক, এটা সকল লোকের প্রত্যক্ষ। (জন্মমরণরূপ-) অনর্থের হেতুস্বরূপ এটার আত্যন্তিক নাশের জন্য এবং আত্মৈকত্ববিদ্যালাভের জন্য সমস্ত বেদান্তশাস্ত্র আরম্ভ করা হচ্ছে। আর যে প্রকারে বেদান্ত সকলের (জীব ব্রহ্মের একত্বজ্ঞানরূপ) এই অর্থ (সিদ্ধ) হয়, তা আমরা এই শারীরকমীমাংসাতে প্রদর্শন করব।

শারীরকমীমাংসাশব্দটার অর্থ এইশরীর কুৎসিত হওয়ায়শরীরশব্দের উত্তর কুৎসিতার্থেকন্প্রত্যয় করেশরীরকশব্দটা নিষ্পন্ন হয়। এটার অর্থকুৎসিত শরীর সেই কুৎসিত শরীরে জীব অবস্থান করে বলেসঃ অস্য নিবাসঃএই অর্থেশরীরকশব্দের উত্তরষ্ণপ্রতায় করে যেশারীরকশব্দটা নিষ্পন্ন হয়, তার অর্থজীব। সেই জীবের ব্রহ্মত্ব প্রতিপাদন করার জন্য বেদান্তদর্শন (ব্রহ্মসূত্র) গ্রন্থে মীমাংসা (–বিচার) করা হচ্ছে বলে এই শাস্ত্রটাকেশারীরকমীমাংসাশাস্ত্র' বলা হয়। যদিও উপনিষদে এবং তদনুসরণকারি এই মীমাংসাশাস্ত্রে প্রাণাদি উপাসনা বর্ণিত হয়েছে, তথাপি তাতে এদের মুখ্য তাৎপৰ্য্য নেই, কারণ উপাসনার দ্বারা চিত্তের একাগ্রতা হলেই, 'তত্ত্বমসি' শ্রবণানন্তর জীব ব্রহ্মের অভেদজ্ঞানের স্ফুরণ হয় বলে উপনিষদে তারা বর্ণিত এই শাস্ত্রে বিচারিত হয়েছে।.......

তথ্যসূত্রঃ- বেদান্তদর্শনম্, প্রথম খণ্ড, ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্যের 'শাঙ্করভাষ্য' স্বামী বিশ্বরূপানন্দের ভাবদীপিকা, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।

শ্রীশুভ চৌধুরী

মার্চ , ২০২৬ খৃষ্টাব্দ।

Photo editing credit Thākur Vishāl

শব্দব্রহ্মবাদ বা শব্দাদ্বৈতবাদ—

 


শব্দব্রহ্মবাদী বৈয়াকরণদিগের মতে শব্দ চার প্রকার () পরা, () পশ্যন্তী, () মধ্যমা, () বৈখরী। 'পরা' বাক্ স্থিরবিন্দুরূপে মূলাধারে অবস্থান করেন। 'পশ্যন্তী' দেহ মধ্যস্থ বায়ুদ্বারা চালিত হয়ে মূলাধার হতে নাভিদেশ পর্যন্ত গমন করে তথায় অবস্থান করে। পরা এবং পশ্যন্তী, এই দ্বিবিধ বাক্ই ব্রহ্মরূপ সরস্বতী। এটা অব্যক্ত নাদ্, অনাহতধ্বনি বা শব্দব্রহ্ম বলে পরিচিত। এটা আমাদের অবাঙ্মনসগোচর, ঋষির জ্ঞাননেত্রে, যোগীর যোগদৃষ্টিতে শব্দব্রহ্মের এই অব্যক্ত সূক্ষ্মরূপ ব্যক্ত বা প্রকাশিত হয়ে থাকে। যে বাক্ আমাদের হৃদয় দেশে অবস্থান করে তার নাম 'মধ্যমা'; কান বন্ধ করলে দেহের মধ্যে যে শব্দ শোনা যায়, তাই 'মধ্যমা' বাক্ বলে অভিহিত করা হয়। বাগিন্দ্রিয়ের সাহায্যে যে বাক্য উচ্চারিত হয়ে আমাদের শ্রুতিগোচর হয় তাকে 'বৈখরী' বাক্ বলা হয়ে থাকে। বিখর শব্দে ইন্দ্রিয় বা দেহ ইন্দ্রিয়ের সংঘাতকে বোঝায়। এজন্য দেহেন্দ্রিয় সংঘাতের ফলে উৎপন্ন কণ্ঠদেশে অবস্থিত বাক্যের নাম 'বৈখরী'

মধ্যমা বাক্ হৃদয়ে অবস্থান করে, আমাদের হৃদয়স্থ ভাব প্রকাশে সাহায্য করে বলে বৈয়াকরণগণ এই মধ্যমা বাক্ কে আখ্যা দিয়েছেন 'স্ফোট' এই স্ফোটরূপ শব্দই নিত্য ব্রহ্মবোধক শব্দ। 'বর্ণাতিরিক্ত বর্ণাভিব্যঙ্গঃ অর্থপ্রত্যায়কঃ নিত্যঃ শব্দঃ স্ফোটঃ' (সর্বদর্শনসংগ্রহ) 'বর্ণ হতে ভিন্ন, অথচ বর্ণের দ্বারা অভিব্যক্ত, অর্থের বোধ উৎপাদক যে নিত্য শব্দ, তাই 'স্ফোট' এটা স্বপ্রকাশ এবং জ্ঞানস্বরূপ। অর্থকে প্রস্ফুটিত করে বলেই এটাকে স্ফোট বলা হয়। শব্দব্রহ্মবাদী উপনিষদ্ সম্প্রদায়ের আচার্য ভর্তৃহরি তাঁর বাক্যপদীয় গ্রন্থের প্রারম্ভ শ্লোকেই শব্দব্রহ্মের পরিচয় প্রদান করতে গিয়ে বলেছেন

'অনাদিনিধনং ব্রহ্ম শব্দতত্ত্বং যদক্ষরম্।

বিবর্ত্ততেঽর্থভাবেন প্রক্রিয়া জগতো যতঃ।।

শব্দের যা প্রকৃত তত্ত্ব তা অনাদি নিধন ব্রহ্মবস্তু। শব্দব্রহ্মের কোনরূপ ক্ষয়-ব্যয় নেই, এজন্য তাকে অক্ষর বলা হয়ে থাকে। বিভিন্ন অর্থ প্রকাশ করবার জন্য শব্দব্রহ্মের বিবিধপ্রকার বিবর্তরূপের উদ্ভব হয়ে থাকে এবং তার ফলে নিখিল বাঙ্ময় জগতের অভিব্যক্তি হয়।

শব্দব্রহ্মের বিবর্ত সমগ্র বাঙ্ময় জগৎই কার্য অনিত্য। বর্ণ, পদ, প্রভৃতি কার্য শব্দেরই বিভিন্ন অভিব্যক্তি। কার্য বা অনিত্য শব্দের মধ্য দিয়ে নিত্য শব্দব্রহ্মের ভাতি বা প্রকাশ হয়ে থাকে। বিবর্তবাদী বৈদান্তিকের অখণ্ড জ্ঞান যেমন ঘটাদি জ্ঞেয় বস্তুর আকারে আকার প্রাপ্ত হয়ে সসীম, সখণ্ড হয়ে প্রকাশিত হয়, সেরুপ নিত্য শব্দব্রহ্ম অনিত্য বর্ণ, পদ, বাক্য প্রভৃতির আকারে আকার প্রাপ্ত হয়ে পদস্ফোট, বাক্যস্ফোট প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন রূপে অভিব্যক্ত হয়ে থাকে। এটা শব্দব্রহ্মের সোপাধিকরূপ, সুতরাং মিথ্যা। স্ফোটরূপ নিত্য, চিন্ময় অখণ্ড শব্দব্রহ্মই সত্য।

প্রসিদ্ধ দার্শনিক মণ্ডন মিশ্র তাঁর 'ব্রহ্মসিদ্ধি' গ্রন্থে শব্দাদ্বৈতবাদ বা শব্দব্রহ্মবাদ সমর্থন করেছেন। ব্রহ্মসিদ্ধির প্রথম শ্লোকে 'অক্ষরম্' এই পদটির মণ্ডনোক্ত ব্যাখ্যার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে, মণ্ডন যে তাঁর গ্রন্থে শব্দব্রহ্মবাদ প্রতিপাদন করেছেন তা নিঃসন্দেহে বোঝা যায়। 'ওমিতি ব্রহ্ম, ওমিতীদং সর্বম্'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ ১।৮।১), 'ওঁকার এবেদং সর্বং'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-২।২৩।৩), 'ওঁকার এব সর্বা বাক্, পরঞ্চাপরঞ্চ ব্রহ্ম যদ্ ওঙ্কারঃ'-(প্রশ্ন উপনিষৎ-৫।২), এই সকল শ্রুতিবাক্যের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে মণ্ডন মিশ্র প্রণব বা ওঁকারই যে সমস্ত বাঙ্ময় জগতের আদি প্রস্রবণ, ওঁকারই ব্রহ্ম, এই শব্দব্রহ্মবাদ অতি স্পষ্ট ভাষায় বিবৃত করেছেন। শব্দব্রহ্মবাদীর মতে প্রণব হতে গায়ত্রী, গায়ত্রী হতে বেদবাণীর বিকাশ হয়েছে এবং বেদ হতে ক্রমে সমস্ত বাঙ্ময় জগতের অভ্যুদয় হয়েছে। সূতসংহিতায় বর্ণিত আছেপ্রণবের দুটি রূপ আছে, একটি তার পর বা উৎকৃষ্ট ব্রহ্মরূপ, অপরটি স্থূল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য শব্দরূপ। স্থূল শব্দরূপকে বাদ দিয়ে ওঁকারের পরব্রহ্মরূপ উপলব্ধিই সর্বপ্রকার জ্ঞানের পরাকাষ্ঠা। ভগবান্ শঙ্করাচার্য তদীয় অদ্বৈতবেদান্তে শব্দব্রহ্মবাদ সমর্থন করেন নি। তিনি ভর্তৃহরির অঙ্গীকৃত স্ফোটবাদ ব্রহ্মসূত্রভাষ্যে ( ব্রহ্মসূত্র ১।৩।২৮ শঙ্করভাষ্যে) দৃঢ়তার সাথে খণ্ডনকরেছেন। মণ্ডন মিশ্র শঙ্করাচার্যের নিকট সন্ন্যাস গ্রহণ করার পর, সুরেশ্বরাচার্য নামে পরিচিত হয়ে যে সকল গ্রন্থরাজি রচনা করেছেন, তাতে কোথাও তিনি এই স্ফোটবাদ বা শব্দাদ্বৈতবাদ অনুমোদন করেন নি। শঙ্কর-সম্মত ব্রহ্মাদ্বৈতবাদই প্রতিপাদন করেছেন। আচার্য বিমুক্তাত্ম-ভগবান্ তদীয় ইষ্টসিদ্ধি গ্রন্থে বলেছেন যে—'তস্মাদাত্মাদ্বৈতমেব সিধ্যতি, শব্দাদ্বৈতং  ঘটাদ্বৈতং বা।' অর্থাৎ আত্মা বা ব্রহ্মাদ্বৈতবাদই প্রকৃত অদ্বৈতবাদ্, শব্দাদ্বৈতবাদ বস্তুতঃ অদ্বৈতবাদ নয়, ওটা ঘটাদ্বৈতবাদের ন্যায় অদ্বৈতবাদের এক বিকৃত রূপ।.....

তথ্যসূত্রঃ-

. আচার্য ভর্তৃহরির 'বাক্যপদীয়' হেলারাজ-কৃত টীকা সমেত।

.বেদান্তদর্শনঅদ্বৈতবাদ, প্রথম খণ্ড, আশুতোষ ভট্টাচার্য শাস্ত্রী।

. বেদান্তদর্শন, প্রথম খণ্ড, স্বামী বিশ্বরূপানন্দের ভাবদীপিকা, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।

শ্রীশুভ চৌধুরী

এপ্রিল , ২০২৬ খৃষ্টাব্দ।

Wednesday, 20 December 2023

বেদান্ত কাকে বলে?

 


এই প্রশ্নের উত্তরে আচার্য সদানন্দ যোগী তৎকৃত বেদান্তসারে বলেছেন যে"বেদান্তো নাম উপনিষৎপ্রমাণং তদুপকারীণি শারীরকসূত্রাদীনি চ।" উপনিষৎ প্রমাণম্ এই কথাটির দুইপ্রকার অর্থ বোঝা যায়। প্রথম অর্থে উপনিষদের যা প্রমাণ তাই বেদান্ত, বেদান্তের অপর নাম উত্তরমীমাংসা, তর্কের আলোক সম্পাতে যে শাস্ত্রের সাহায্যে উপনিষদের অর্থবোধ সুগম হয়ে থাকে তাই উত্তরমীমাংসা বা বেদান্ত; পক্ষান্তরে যে মীমাংসার মূলে উপনিষৎ প্রমাণরূপে বিদ্যমান রয়েছে তারই নাম বেদান্ত। এইরূপে বিচার করলে দেখা যায় যে উপনিষৎই বেদান্ত শব্দের মুখ্য অর্থ, উপনিষদের অর্থবোধের সহায় হয় বলে শারীরকসূত্র (ব্রহ্মসূত্র) বা শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা প্রভৃতি বেদান্ত শব্দের গৌণ অর্থ।

ব্রহ্মবিদ্যাই উপনিষৎ শব্দের মুখ্য অর্থ। এই ব্রহ্মতত্ত্ব উপনিষদে প্রতিপাদিত হয়েছে এই জন্যই উপনিষদের অপর নাম ব্রহ্মবিদ্যা বা বেদান্ত। ভগবান্ শঙ্করাচার্য বৃহদারণ্যক উপনিষদের ভাষ্যভূমিকায় বলেছেন"সেয়ং ব্রহ্মবিদ্যা উপনিষচ্ছব্দবাচ্যা" যারা গুরুর সমীপবর্তী হয়ে শ্রদ্ধাপূর্বক এই ব্রহ্মবিদ্যাকে অবলম্বন করেন তাদের জন্ম, মৃত্যু, জরা, ব্যাধি প্রভৃতি সাংসারিক অনর্থসমূহের বিনাশ হয়। সংসার-কারণ অবিদ্যার সমূলে উচ্ছেদ সাধিত হয় এবং পরব্রহ্মপদ লাভ হয়। এইজন্যই ব্রহ্মবিদ্যার অপর নাম উপনিষৎ।

সুতরাং বেদের অন্তে কথিত সেই ব্রহ্মবিদ্যা অর্থাৎ উপনিষদ্ভাগই বেদান্ত; এবং তার অর্থবোধের সহায়ক বা উপকারী বলে ব্রহ্মসূত্র, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা প্রভৃতি অন্যান্য গ্রন্থও বেদান্ত নামের যোগ্য। বেদান্তশাস্ত্র প্রস্থানত্রয়ে বিভক্ত। প্রস্থান শব্দের অর্থ আকর গ্রন্থ। 'প্রস্থান' শব্দটি প্র+স্থা ধাতু, প্র তিষ্ঠতি অত্র এই অর্থে অনট্ প্রত্যয় করে নিষ্পন্ন হয়েছে। প্র উপসর্গটি প্রকৃষ্টার্থের সূচনা করে সুতরাং যেখানে প্রকৃষ্ট ভাবে অর্থাৎ বিশেষভাবে বেদান্ত দর্শনের প্রতিপাদ্য বিষয়বস্তু নিহিত আছে এবং আলোচিত ব্যাখ্যাত হয়েছে বেদান্তের সেই সকল আকর গ্রন্থকেই 'প্রস্থান' বলা হয়ে থাকে। উপনিষৎ বেদান্তের শ্রুতিপ্রস্থান, ব্রহ্মসূত্র তর্ক প্রস্থান এবং শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা স্মৃতি প্রস্থান বলে প্রসিদ্ধ। এই হল প্রস্থানত্রয়।

তথ্যসূত্রঃ-

. সদানন্দ যোগীন্দ্র বিরচিত বেদান্ত-সারঃ, নৃসিংহ সরস্বতীকৃত টীকা

. ভগবান শঙ্করাচার্যের বৃহদারণ্যক উপনিষৎ ভাষ্য।

শ্রীশুভ চৌধুরী

ডিসেম্বর ১৯, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।

বেদান্তে অনুবন্ধ কি?

 


উত্তর হল নিমিত্ত। অনুবন্ধ আর নিমিত্ত একই কথা। আচার্য সদানন্দ যোগী তৎকৃত বেদান্তসারে বলেছেন"অত্রানুবন্ধো নাম অধিকারিবিষয়সম্বন্ধপ্রয়োজনানি। অর্থাৎ অধিকারী, বিষয়, সম্বন্ধ প্রয়োজনএই চার প্রকার অনুবন্ধ বা নিমিত্ত প্রত্যেক শাস্ত্রেই থাকে। অভিপ্রায় এই যে, অধিকারী অর্থাৎ বুঝতে করতে সক্ষম, এরূপ ব্যক্তি যদি না থাকে, তবে বলা না বলা তুল্য। অতএব বক্তব্য শাস্ত্রের অধিকারী কেউ আছে কিনা, দেখা আবশ্যক। অধিকারীর ন্যায় শাস্ত্রের বিষয় থাকাও আবশ্যক, তা না থাকলে আত্মহিতেচ্ছু লোকের তাতে প্রবৃত্তি হবে কেন? এবং সেই প্রতিপাদ্য বিষয় আর শাস্ত্র, এই উভয়ের পরস্পর প্রতিপাদ্য প্রতিপাদকরূপ সম্বন্ধ থাকাও আবশ্যক; নচেৎ সেই অসম্বন্ধ প্রলাপে কি ফল? শুধু অধিকারী, বিষয় সম্বন্ধ থাকলে হবে না, প্রয়োজন থাকাও আবশ্যক। কারণ বিনা প্রয়োজনে কেউই কোন কার্যে প্রবৃত্ত হয় না। এই জন্য প্রত্যেকে শাস্ত্রেই উল্লেখিত চারপ্রকার অনুবন্ধ থাকে, বেদান্তশাস্ত্রেও এই অনুবন্ধ চতুষ্ঠয় রয়েছে।

এখন জিজ্ঞাস্য এই যে বেদান্ত বিদ্যা-লাভের অধিকারী কে? এটার উত্তরে ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য বলেছেন.নিত্যানিত্যবস্তুবিবেক, .ইহামুত্রফলভোগবিরাগ, .শমদমাদি সাধনসম্পৎ এবং .মুমুক্ষুত্ব। এই চতুর্বিধ সাধন যিনি আয়ত্ত করতে সমর্থ হন তিনিই বেদান্ত শ্রবণের যথার্থ অধিকারী।

. নিত্যানিত্যবস্তু-বিবেকঃ-একমাত্র ব্রহ্মই নিত্য সত্য এবং জগৎপ্রপঞ্চ অনিত্য মিথ্যা এই ধারণায় দৃঢ় প্রত্যয় হওয়াকেই নিত্য-অনিত্য-বস্তু-বিবেক বলে।

. ইহামুত্রফলভোগবিরাগঃ-নিজের দেহ থেকে আরম্ভ করে ব্রহ্মার দেহ-পর্যন্ত সমস্ত অনিত্য ভোগের সামগ্রীর দোষ-দর্শন সেসবের দোষের কথা শোনার ফলে ভোগ্যবস্তুতে যে অনীহা জাগে সে সমস্ত ত্যাগ করার ইচ্ছা জন্মায় তাকেই বৈরাগ্য বলা হয়।

. সাধনসম্পত্তিঃ- ‘সাধনসম্পত্তিবলতে বোঝায় শম্, দম্, উপরতি, তিতিক্ষা, সমাধান শ্রদ্ধা। প্রতি মুহূর্তে বিষয়সমূহে দোষ দেখতে পাওয়ার ফলে বিষয়ে যে বৈরাগ্য আসে তা থেকে মনের নিজ লক্ষ্যস্থল ব্রহ্মে নিশ্চল স্থিতি লাভ হয়, একে শম বলা হয়। উভয় প্রকারের ইন্দ্রিয়গুলিকে (অর্থাৎ কর্মেন্দ্রিয় জ্ঞানেন্দ্রিয়কে) সমস্ত বিষয় থেকে বিমুখ করে তাদের নিজের নিজের জায়গায় নিশ্চল ভাবে ধরে রাখাকেই দম বলে। চিত্তবৃত্তিকে বাহ্যবিষয় অবলম্বন না করতে দেওয়াই শ্রেষ্ঠ উপরতি। কোন রকম চিন্তাভাবনা বা বিলাপ না করে সব রকমের দুঃখকেই গ্রহণ করে নেওয়া এবং বিনা প্রতিকারে তাদের সহ্য করে যাওয়াকে বলে তিতিক্ষা। শাস্ত্র গুরুবাক্যের সত্যতায় দৃঢ় বিশ্বাস রাখা অন্তরে সেই বিশ্বাসকে দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করাকে জ্ঞানীরা শ্রদ্ধা বলেন। এই শ্রদ্ধার সাহায্যে আত্মবস্তু লাভ হয়। সবসময়, সবরকম ভাবে বুদ্ধিকে শুদ্ধব্রহ্মে লগ্ন করে রাখাকে সমাধান বলে। কিন্তু বেদান্ততত্ত্ব আলোচনা করে চিত্তের যে প্রসন্নতা হয়, তা সমাধান নয়।

. মুমুক্ষুত্বঃ- অহঙ্কার থেকে আরম্ভ করে স্থূল দেহ পর্যন্ত যেসব বন্ধন সেগুলো অজ্ঞান কল্পিত। নিজের স্বরূপজ্ঞানের দ্বারা সেইসব বন্ধন থেকে মুক্তি লাভের ইচ্ছাই মুমুক্ষুতা।

অধিকারী নির্ণয় হল, এখন এই শাস্ত্রের বিষয় কি? "জীব-ব্রহ্মৈক্যং শুদ্ধচৈতন্যং প্রমেয়ং',এই শাস্ত্রের বিষয় অর্থাৎ প্রধান প্রতিপাদ্য, জীব ব্রহ্মের ঐক্য। মানুষ ভ্রান্তিক্রমেই নিজেকে ব্রহ্মনামক সর্বগুণাতীত বিশুদ্ধ চৈতন্য আত্মা হতে পৃথক বলে জানে; তাদের সেই ভ্রান্তিজ্ঞান বিদূরিত হলে যে জ্ঞানময় চৈতন্যময় প্রমেয় পদার্থ অবশিষ্ট থাকে, সেই প্রমেয় (অভ্রান্তজ্ঞানের বিষয়;— জীবব্রহ্মের ঐক্য) পদার্থ বেদান্তের বিষয়। যেহেতু তাতেই বেদান্তশাস্ত্রের তাৎপর্য।

সম্বন্ধও আছে; যেহেতু শাস্ত্র অসম্বন্ধ কথা বলেন না। সম্বন্ধ, প্রতিপাদ্য-প্রতিপাদক বা বোধ্য-বোধক ভাব। "তদৈক্য প্রমেয়স্য তৎপ্রতিপাদক-উপনিষৎ-প্রমাণস্য বোধ্য-বোধকভাব-লক্ষণঃ।" জীব ব্রহ্মের ঐক্যরূপ প্রমেয় বোধ্য বিষয় এবং বেদান্ত বাক্যরাশি তার বোধকবিষয়ের সঙ্গে এরূপ ভাবলক্ষণ সম্বন্ধ। এই বোধ্য-বোধক সম্বন্ধকে প্রতিপাদ্য-প্রতিপাদক সম্বন্ধও বলা হয়। যেহেতু সেই ঐক্যরূপ প্রমেয়, উপনিষদাদি শাস্ত্রের প্রতিপাদ্য; সেহেতু শাস্ত্রও তার প্রতিপাদক।

শাশ্বতমুক্তিই বেদান্ত জিজ্ঞাসার একমাত্র প্রয়োজন। "তৎ ঐক্য প্রমেয়গত অজ্ঞান-নিবৃত্তিঃ স্বস্বরূপ-আনন্দ-অবাপ্তিঃ ", অর্থাৎ সেই জীব ব্রহ্মের ঐক্য না-জানারূপ অবিদ্যার সমূলে নিবৃত্তি আনন্দময় ব্রহ্মস্বরূপ প্রাপ্তিই বেদান্ত জিজ্ঞাসার প্রয়োজন। এই মুক্তি জীবব্রহ্মের একত্ব সাক্ষাৎকারের ফলে লাভ হয়ে থাকে। জীব ব্রহ্মের ঐক্য সাক্ষাৎকার হলেই জীব "অহং ব্রহ্মাস্মি" অর্থাৎ আমিই ব্রহ্ম এইরূপে বুঝে মুক্ত হয়ে থাকে, বেদান্ত-অনুশীলনের চরম প্রয়োজন সাধিত হয়। শ্রুতিতে বলা হয়েছে

"তরতি শোকম্ আত্মবিৎ"-(ছান্দোগ্যোপনিষৎ-..)

আত্মজ্ঞ ব্যক্তি শোককে অতিক্রম করেন।

"ব্রহ্ম বেদ ব্রহ্মৈব ভবতি"-(মুণ্ডক উপনিষৎ-..)

যিনি ব্রহ্মকে জানেন, তিনি ব্রহ্মই হয়ে যান।......

তথ্যসূত্রঃ-

. ভগবান শঙ্করাচার্যের শারীরক-মীমাংসা ভাষ্য বিবেকচূড়ামণি।

. সদানন্দ যোগীন্দ্র বিরচিত বেদান্ত-সারঃ, শ্রীকালীবর বেদান্তবাগীশ কৃত অনুবাদ।

শ্রীশুভ চৌধুরী

ডিসেম্বর ২০, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।


জ্ঞানী ভোগ্যবিষয়ে মনের কঠিনতা আর ভগবদ্বিষয়ে মনের কোমলতা সম্পাদন করে—

  আচার্য মধুসূদন সরস্বতী ভক্তিরসায়নে বলছেন — কাঠিন্যং বিষয়ে কুর্যাদ্ দ্রবত্বং ভগবৎপদে। উপায়ৈঃ শাস্ত্রনির্দিষ্টৈরনুক্ষণমতো ব...