Showing posts with label 'অদ্বৈতবেদান্তে সাধন'. Show all posts
Showing posts with label 'অদ্বৈতবেদান্তে সাধন'. Show all posts

Saturday, 1 August 2026

জ্ঞানী ভোগ্যবিষয়ে মনের কঠিনতা আর ভগবদ্বিষয়ে মনের কোমলতা সম্পাদন করে—

 


আচার্য মধুসূদন সরস্বতী ভক্তিরসায়নে বলছেন

কাঠিন্যং বিষয়ে কুর্যাদ্ দ্রবত্বং ভগবৎপদে।

উপায়ৈঃ শাস্ত্রনির্দিষ্টৈরনুক্ষণমতো বুধাঃ।।

-(ভক্তিরসায়নম্, প্রথম উল্লাস, ৩১)

বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন পুরুষ শাস্ত্রনির্দিষ্ট উপায়ে নিরন্তর ভোগ্যবিষয়ে চিত্তের কঠিনতা ভগবদ্বিষয়ে চিত্তের কোমলতা সম্পাদন করবে অর্থাৎ ভোগ্যবস্তুতে মনের আসক্তি রহিত করে ভগবৎপদে মনের অনুরাগ বর্ধিত করবে।

চিত্তের যে বিষয়াকারে পরিণতি, তা চিত্তের স্বাভাবিক ধর্ম নয়; ওটা আগন্তুক বা সাময়িক কারণ হতে উৎপন্ন হয়। দেখ, জাগরণ অবস্থায় চিত্তের যে স্থূল বিষয়াকারতা, ইন্দ্রিয়ের সাথে বাহ্যবিষয়ের সন্নিকর্ষ বা নিকটসম্বন্ধ প্রভৃতিই তার কারণ। স্বপ্নাবস্থায় যে চিত্তের সূক্ষ্ম বিষয়াকারতা, তার কারণ মনের বাসনা; আর সুষুপ্তিদশার ন্যায় উক্ত উভয়প্রকার কারণের অনুপস্থিতিতে চিত্ত নির্বিষয় হয়, অর্থাৎ তখন চিত্তে কোন প্রকার বিষয়াকারই থাকে না।

চিত্তের যে ভগবদাকারতা অর্থাৎ ভগবদাকারে পরিণতি, তা কিন্তু চিত্তের স্বভাবসিদ্ধ ধর্ম, আগন্তুক নয়; কারণ চিত্তের কারণীভূত যে সূক্ষ্মভূত, সেগুলোরও কারণ যে অনেকবিধ বিচিত্র শক্তিযুক্ত অনির্বচনীয় মায়া, তারও আশ্রয়ভূত সর্বান্তর্যামী সর্বব্যাপী ভগবান সকল বস্তুতেই অনুস্যূত রয়েছেন।

এখন প্রশ্ন, চিত্তের ভগবদাকারতা স্বভাবসিদ্ধ বলে যদি তার জন্য আর সাধনের অপেক্ষা না থাকে, তাহলে সাধনশাস্ত্রের উপযোগিতা কোথায়? হ্যাঁ, চিত্তের অন্যবিষয়াকারতার বিরোধী ভগবদাকারতা সম্পাদনেই সাধনের সার্থকতা জানবে। চিত্তের যে স্বভাবসিদ্ধ ভগবদাকারতা, তা বিষয়াকারতার সহচর অর্থাৎ সঙ্গে সঙ্গে থাকে বলে এবং বিষয়াকার সমুৎপাদনে সহায়তা করে বলে প্রকৃতপক্ষে বিষয়াকারতার বিরোধী নয়, কিন্তু শাস্ত্রজনিত অর্থাৎ শাস্ত্রোক্ত সাধন অনুষ্ঠান ক্রমে সমুৎপন্ন যে ভগবদাকারতা, ওটা প্রথমত সাধন অভ্যাস সময়ে পরোক্ষরূপে প্রকাশ পায় এবং অল্প অল্প করে বিষয়াকারতা ক্ষয় করতে থাকে; শেষে সাধনার পরিপক্কদশায় অপরোক্ষভাব প্রাপ্ত হয়ে সেই বিষয়াকারতাকে সমূলে বিনষ্ট করে দেয়। এইজন্যই ভাগবতে উদ্ধবের প্রতি স্বয়ং ভগবান বলছেন

যর্হ্যব্জনাভচরণৈষণয়োরুভক্ত্যা

চেতোমলানি বিধমেদ্গুণকর্মজানি

তস্মিন্ বিশুদ্ধ উপলভ্যত আত্মতত্ত্বং

সাক্ষাদ্ যথাঽমলদৃশোঃ সবিতৃপ্রকাশঃ

-(শ্রীমদ্ভাগবত, ১১//৪০)

যখন পদ্মনাভ শ্রীহরির চরণলাভের ইচ্ছায় প্রবল ভক্তিপ্রভাবে সত্ত্বাদিগুণানুগত কর্মজাত রাগদ্বেষাদি চিত্তমলসকল বিনষ্ট হয়, তখন সেই বিশুদ্ধ চিত্তেনির্মল নয়নে সূর্যালোকের ন্যায় আত্মতত্ত্ব সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষ হয়।

ভগবান্ পরবর্তীতে আরও বলছেন

যথাগ্নিনা হেম মলং জহাতি

ধ্মাতং পুনঃ স্বং ভজতে রূপম্

আত্মা কর্মানুশয়ং বিধূয়

মদ্ভক্তিযোগেন ভজত্যথো মাম্

যথা যথাত্মা পরিমৃজ্যতেঽসৌ

মৎপুণ্যগাথাশ্রবণাভিধানৈঃ

তথা তথা পশ্যতি বস্তু সূক্ষ্মং

চক্ষুর্যথৈবাঞ্জনসম্প্রয়ুক্তম্

বিষয়ান্ ধ্যায়তশ্চিত্তং বিষয়েষু বিষজ্জতে

মামনুস্মরতশ্চিত্তং ময়্যেব প্রবিলীয়তে

তস্মাদসদভিধ্যানং যথা স্বপ্নমনোরথম্

হিত্বা ময়ি সমাধৎস্ব মনো মদ্ভাবভাবিতম্

-(শ্রীমদ্ভাগবত, ১১/১৪/২৫-২৮)

স্বর্ণ যেমন অগ্নিসংযোগে উত্তপ্ত হয়ে মলরাশি ত্যাগ করে এবং নিজের স্বাভাবিক রূপ প্রাপ্ত হয়, আত্মাও তেমনই মদীয় ভক্তিযোগ লাভ করে বাসনারাশি পরিত্যাগ করে আমাকে প্রাপ্ত হয়। আমার পুণ্যকথার  শ্রবণ কীর্তনাদি দ্বারা আত্মা যেমন যেমন পরিমার্জিত (বিশুদ্ধ) হয়, অঞ্জনযুক্ত চোখের ন্যায় আত্মাও সেই পরিমাণেই সূক্ষ্মবস্তু (পরমাত্মা) দর্শন করতে সমর্থ হয়। যে লোক বিষয়চিন্তা করে, তার চিত্ত বিষয়েই আসক্ত হয়, আর যে লোক কেবল আমাকেই স্মরণ করে, তার চিত্ত আমাতেই বিলীন হয়। অতএব স্বপ্নদৃশ্যের ন্যায় অসৎ বিষয়ের অনুধ্যান পরিত্যাগ করে মনকে আমার ভাবে ভাবিত করে আমাতেই সমাহিত কর।.....

তথ্যসূত্রঃ- মধূসুদন সরস্বতী বিরচিত, ভক্তিরসায়নম্, মহামহোপাধ্যায় দুর্গাচরণ সাংখ্যবেদান্ততীর্থ অনূদিত সম্পাদিত, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।

শ্রীশুভ চৌধুরী

জুলাই ২১, ২০২৬ খৃষ্টাব্দ।

Saturday, 21 February 2026

শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন—

 


"আত্মা বা অরে দ্রষ্টব্যঃ শ্রোতব্যো মন্তব্যো নিদিধ্যাসিতব্যো"-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-//) ভগবান্ শঙ্করাচার্য এই শ্রুতির ভাষ্যে বলছেন—"অতএব আত্মাই দ্রষ্টব্যসাক্ষাৎকারের উপযুক্ত, অর্থাৎ আত্মবিষয়ক দর্শন সম্পাদন করা আবশ্যক। সেই জন্য শ্রোতব্যপ্রথমে শাস্ত্র আচার্য হতে জ্ঞাতব্য; পশ্চাৎ মন্তব্য, অর্থাৎ অনুকূল তর্ক দ্বারা তা সমর্থন করতে হবে; তারপর নিদিধ্যাসিতব্য অর্থাৎ নিসংশয়ঃরূপে তাকে ধ্যান করতে হবে। এইরূপে শ্রবণ, মনন নিদিধ্যাসনের সাহায্যে পরিশোধিত হলে পর, আত্মা প্রত্যক্ষগোচর হয়ে থাকে। যখন উক্ত সাধনগুলো একই আত্মবিষয়ে অনুগতভাবে প্রযুক্ত হয়, তখনই ব্রহ্মৈকত্ব-বিষয়ে সম্যক্ দর্শন উপস্থিত হয়, নচেৎ কেবল শ্রবণমাত্রে হয় না।"

এইপ্রকার পাঠের পর শ্রুতিতে পঠিত হচ্ছে—"মৈত্রেয্যাত্মনে বা অরে দর্শনেন শ্রবণেন মত্যা বিজ্ঞানেন ইদং সর্বং বিদিতম্" অরে মৈত্রেয়ী! আত্মবিষয়ে দর্শন, শ্রবণ, মনন বিজ্ঞান হলেই এই দৃশ্যমান জগৎ বিজ্ঞাত হয়ে যায়।

এখন প্রশ্ন হল শ্রবণ, মনন নিদিধ্যাসন কি? এই বিষয়ে আচার্য বিদ্যারণ্য মুনীশ্বর বলেছেন

ইত্থং বাক্যৈস্ তদ্ অর্থানুসন্ধানং শ্রবণং ভবেৎ

যুক্ত্যা সম্ভাবিতত্বানুসন্ধানং মননং তু তৎ ।।

তাভ্যাং নির্বিচিকিৎসেঽর্থে চেতসঃ স্থাপিতস্য যৎ।

একতানত্বম্ এতদ্দ্ হি নিদিধ্যাসনম্ উচ্যতে ।।

-(পঞ্চদশী, প্রথম অধ্যায়, ৫৩,৫৪)

এইরূপে তত্ত্বমসি প্রভৃতি মহাবাক্য চতুষ্টয়ের দ্বারা তাদের তাৎপর্যরূপ জীব ব্রহ্মের যে একত্ব (অভেদ), ওটার অনুসন্ধানকে শ্রবণ; আর যুক্তিদ্বারা, এই একত্ব সম্ভবপর বলে যে জ্ঞান হয়, তাকে মনন বলে। সেই শ্রবণ-মনন দ্বারা নিঃসন্দেহে প্রতিষ্ঠিত জীব-ব্রহ্মের একত্বরূপ অর্থে ধারণাবিশিষ্ট চিত্তে যে একাকার বৃত্তিপ্রবাহ, তা নিদিধ্যাসন বলে উক্ত হয়।

পতঞ্জলির যোগশাস্ত্রে বর্ণিত ধ্যান, ধারণা সমাধি এই নিদিধ্যাসনেরই অন্তর্গত। শ্রীগীতার টীকার প্রারম্ভে পূজ্যপাদ মধুসূদন সরস্বতী বলেছেন"ততস্তৎপরিপাকেন নিদিধ্যাসননিষ্ঠতা। যোগশাস্ত্রস্তু সম্পূর্ণমুপক্ষীণং ভবেদিহ"(১৭ শ্লোক)

শ্রবণ, মনন নিদিধ্যাসন আত্মসাক্ষাৎকারের হেতু। শ্রুতিবাক্য হতে আত্মশ্রবণ করবে, যুক্তিসমূহের দ্বারা তার মনন করবে, এরূপ মনন করে পরে সর্বদা সেই আত্মার ধ্যান করবে। পুরাণসমূহেই এই বিষয়ের তাৎপর্য স্পষ্টরূপে বর্ণিত আছে

সর্ববেদান্তবাক্যানামাচার্যমুখতঃ প্রিয়াৎ।

বাক্যানুগ্রাহকন্যায়শীলনং মননং ভবেৎ।।

নিদিধ্যাসনমৈকাগ্র্যং শ্রবণে মননেঽপি চ।

নিদিধ্যাসনসংজ্ঞং মননং দ্বয়ং বুধাঃ।।

ফলোপকারকাঙ্গং স্যাত্তেনাসম্ভাবনা তথা।

বিপরীতা নির্মূলং প্রবিনশ্যতি সত্তমাঃ।।

(মানব উপপুরাণ অধ্যায়)

প্রিয় আচার্যের মুখ হতে, সকল বেদান্তবাক্যের ব্রহ্মবিষয়ে তাৎপর্যজ্ঞানের অনুকূল যে সকল ন্যায় বা যুক্তি আছে, তা শ্রবন করে, সেই সকল যুক্তির বারংবার যে অনুশীলন, তাই মনন হয়ে থাকে। বেদান্তবাক্যের শ্রবণে এবং তার অর্থ-মননে চিত্তের যে একাগ্রতা, তাই নিদিধ্যাসন। নিদিধ্যাসন মনন এই দুইটি হে পণ্ডিতগণ! ফলের উপকারক অঙ্গ হয়ে থাকে। হে সাধুশ্রেষ্ঠগণ! সেই মনন নিদিধ্যাসনের দ্বারা, ব্রহ্মতত্ত্ব বিষয়ে যে অসম্ভাবনা বিপরীত জ্ঞান, তা মূলের সহিত উচ্ছিন্ন হয়ে থাকে।

এর তাৎপর্য এই যে, ধ্যান মনন এই দুইটি সাধন দ্বারা শ্রবণ দৃঢ়ীকৃত হয়, এই কারণে এই দুইটিকে ফলোপকারক অঙ্গ বলা হয়। এদের মধ্যে প্রথম অর্থাৎ মননের দ্বারা ব্রহ্মবিষয়ে যে অসম্ভাবনা, অর্থাৎ ব্রহ্ম প্রমাণের দ্বারা সিদ্ধ হয় না বলে তার অস্তিত্বেরই সম্ভাবনা নেই, এই প্রকার যে জ্ঞান, তা দূর হয়ে থাকে। নিদিধ্যাসন বা ধ্যানরূপ দ্বিতীয় উপায়টি দ্বারা, যে সকল ভ্রান্ত ধারণা বা বিপরীত প্রতীতি আছে, তাও নষ্ট হয়। এইরূপে অসম্ভাবনা বিপরীত প্রত্যয়রূপ দ্বিবিধ প্রতিবন্ধক নষ্ট করে, মনন নিদিধ্যাসন, শ্রবণের সাহায্য করে বলে, এই দুইটি হেতুকেই শ্রবণের সহকারী অর্থাৎ ফলোপকারক অঙ্গ বলে নির্দেশ করা হয়েছে।

সুতরাং শ্রবণ, মনন, নিদিধ্যাসন অসম্ভাবনা বিপরীতভাবনার নিবর্তক। এই যে ভেদজ্ঞানের প্রাবল্য, এটাই বিপরীতভাবনা। বস্তুতঃ দেহাদি পদার্থ সকল সত্য, তাতে আত্মবুদ্ধি, জীব ব্রহ্মের ভেদ সত্য, ইত্যাদি এইপ্রকার যে বিপরীত বুদ্ধি, তাই 'বিপরীতভাবনা' নিদিধ্যাসনের বলে এটা নিরাকৃত হয় এবং চিত্তের একাগ্রতা সুক্ষ্মবিষয়গ্রহণযোগ্যতা সম্পাদিত হয়।

বৃহদারণ্যক শ্রুতিতে বর্ণিত আছে

তমেব ধীরো বিজ্ঞায় প্রজ্ঞাং কুর্বীত ব্রাহ্মণঃ। নানুধ্যায়াদ্বহূঞ্ছব্দান্ বাচো বিগ্লাপন হি তৎ।

-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-//২১)

"ধীর ব্রহ্মনিষ্ঠ পুরুষ সেই আত্মাকেই নিঃসংশয়রূপে অবগত হয়ে প্রজ্ঞালাভ করবেন অর্থাৎ অপরোক্ষ জ্ঞান লাভ করবেন। বহুশব্দের চিন্তা করবেন না, কারণ তাতে বাগিন্দ্রিয়ের অবসাদ জন্মে থাকে।"

অনন্যাশ্চিন্তয়ন্তো মাং যে জনাঃ পর্যুপাসতে

তেষাং নিত্যাভিযুক্তানাং যোগক্ষেমং বহাম্যহম্ ৷৷

-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা -/২২)

"আমাকেই আত্মভাবে চিন্তাপূর্বক যে সর্বত্যাগীগণ আমার ধ্যান করেন, সেই নিত্য-সমাহিত মুমুক্ষুগণের যোগ ক্ষেম আমি বহন করি।"

এইরূপ  শ্রুতিবচন স্মৃতিবচন বিপরীতভাবনার নিবৃত্তির জন্যই আত্মাতে সর্বদা বুদ্ধির একাগ্রতার বিধান করছেন।

তথ্যসূত্রঃ-

. ভগবান শঙ্করাচার্যের বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ ভাষ্য।

. আচার্য বিদ্যারণ্য মুনীশ্বর প্রণীত 'পঞ্চদশী'

. আচার্য বিদ্যারণ্য মুনীশ্বর বিরচিত "বিবরণ-প্রমেয়-সংগ্রহ"

শ্রীশুভ চৌধুরী

ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬ খৃষ্টাব্দ।

 Photo editing credit Thākur Vishāl

Thursday, 24 July 2025

আত্মানাত্মবিবেকঃ-

 


ভগবান্ শঙ্করাচার্য বলেছেন"দৃশ্যং সর্বমনাত্মা স্যাদ্দৃগেবাত্মা বিবেকিনঃ", অর্থাৎ সকল দৃশ্য প্রপঞ্চই অনাত্মা, দ্রষ্টাই বিবেকীর আত্মা। এই আত্মানাত্মবিবেক বহুশাস্ত্রে কথিত হয়েছে। আত্মা অনাত্মার পার্থক্য বিষয়ে আচার্য বলছেন

প্রশ্ন-আত্মার দুঃখ কি নিমিত্ত হয়?

উত্তর- শরীর ধারণ নিমিত্ত হয়। এই বিষয়ে শ্রুতি রয়েছে, যথা

'মঘবন্মর্ত্যং বা ইদং শরীরমাত্তং মৃত্যুনা

তদস্যামৃতস্যাশরীরস্যাত্মনোঽধিষ্ঠানমাত্তো বৈ

সশরীরঃ প্রিয়াপ্রিয়াভ্যাং বৈ সশরীরস্য সতঃ

প্রিয়াপ্রিয়যোরপহতিরস্ত্যশরীরং বাব সন্তং

প্রিয়াপ্রিয়ে স্পৃশতঃ॥'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৮।১২।১)

অর্থাৎ এই শরীর মরণশীল, এটা মৃত্যুকবলিত; এটা অমর অশরীর আত্মার অধিষ্ঠান। যিনি সশরীর (দেহাভিমানী) তিনি সুখদুঃখগ্রস্ত হন; তাঁর সুখদুঃখের বিরাম নেই। যিনি অশরীর (দেহাভিমানরহিত) তাঁকে সুখ বা দুঃখ স্পর্শ করে না।

প্রশ্নশরীর ধারণ কি কারণে হয়?

উত্তর-কর্ম্মদ্বারা।

প্রশ্নকর্মই বা কি কারণে হয়?

উত্তর—(আসক্তি) রাগদ্বেষাদি কারণে হয়।

প্রশ্নরাগদ্বেষাদি কি কারণে হয়?

উত্তরঅভিমানবশতঃ।

প্রশ্নঅভিমান কি কারণে হয়?

উত্তরঅবিবেকহেতু।

প্রশ্নযদি বলি অবিবেক কি কারণে হয়?

উত্তরঅজ্ঞানবশতঃ।

প্রশ্নযদি বলি অজ্ঞান কি হেতু হয়?

উত্তরঅজ্ঞান কোন কারণ থেকে হয় না। অজ্ঞান অনাদি অনির্বচনীয়। অজ্ঞান থেকে অবিবেক উৎপন্ন হয়। অবিবেক থেকে অভিমান হয়। অভিমান থেকে আসক্তি প্রভৃতি উৎপন্ন হয়। পাপ পুণ্যকর্মসমূহ থেকে শরীর ধারণ হয়। শরীর ধারণই দুঃখের কারণ। সর্বতোভাবে শরীর পরিগ্রহ বিনষ্ট হলে দুঃখের নিবৃত্তি হয়।

প্রশ্নশরীর পরিগ্রহের নিবৃত্তি কখন হয়?

উত্তরসর্বতোভাবে কর্মনিবৃত্তি হলে শরীর পরিগ্রহের নিবৃত্তি হয় অর্থাৎ আর শরীর ধারণ হয় না।

প্রশ্নকর্মনিবৃত্তি কখন হয়?

উত্তরসর্বতোভাবে আসক্তি প্রভৃতির নিবৃত্তি হলে কর্মনিবৃত্তি হয়।

প্রশ্নআসক্তি প্রভৃতির নিবৃত্তি কখন হয়?

উত্তরসর্বতোভাবে অভিমাননিবৃত্তি হলে আসক্তি প্রভৃতির নিবৃত্তি হয়।

প্রশ্নকখন অভিমাননিবৃত্তি হয়?

উত্তরসর্বতোভাবে অবিবেকনিবৃত্তি হলে অভিমাননিবৃত্তি হয়।

প্রশ্নঅবিবেকনিবৃত্তি কখন হয়?

উত্তরসর্বতোভাবে অজ্ঞাননিবৃত্তি হলে অবিবেকনিবৃত্তি হয়।

প্রশ্নঅজ্ঞাননিবৃত্তি কখন হয়?

উত্তরজীবব্রহ্মের ঐক্যবোধ 'লে সর্বতোভাবে অজ্ঞাননিবৃত্তি হয়।

আচ্ছা, নিত্যকর্মসমূহের (অনুষ্ঠান শাস্ত্রে) বিধান থাকায় নিত্যকর্মসমূহের (অনুষ্ঠান) থেকেও অবিদ্যানিবৃত্তি হয়৷ জ্ঞানের কি প্রয়োজনএরূপ আশঙ্কা হলে তদুত্তরে বলা হয়কর্মাদি ব্যতীতই অবিদ্যানিবৃত্তি হয়। তাহা কিরূপে হয়, এরূপ যদি বল, তাহলে বলিকর্ম অজ্ঞানের মধ্যে বিরোধ হয় না। জ্ঞান অজ্ঞানের মধ্যে বিরূদ্ধভাব হয়। অতএব জ্ঞানের দ্বারাই অজ্ঞানের নিবৃত্তি হয়।

প্রশ্নসেই জ্ঞান কিরূপে হয়?

উত্তরবিচার থেকেই হয়। আত্মা অনাত্মার বিবেক বিষয়ক বিচার থেকেই জ্ঞান হয়।

সুতরাং আত্মা অনাত্মা অর্থাৎ আত্মা ভিন্ন দেহের পৃথকত্বের বিবেকবোধই আত্মানাত্মবিবেক। দেহকেই আমরা 'আমি' ভেবে থাকি। 'আমি' আসল সত্তা আত্মার জ্ঞান না থাকায় অজ্ঞ জীব দেহকেই আত্মবোধে পোষণাদি করে বিপর্যস্ত হয় সর্বদা দুঃখ ভোগ করতে থাকে। এই 'চিজ্জড়গ্রন্থি' ছিন্ন করতে পারলেই জীবের স্বরূপ প্রাপ্তি ঘটে। নিত্যানিত্য বস্তুর বিবেক জ্ঞানেই অনিত্য দেহাদির প্রতি আসক্তি চলে যায়। এই আত্মানাত্মবিবেক বর্ণনা করতে গিয়ে ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য 'অপরোক্ষানুভূতিতে' বলেছেন

আত্মা বিনিষ্কলো হ্যেকো দেহো বহুভিরাবৃতঃ

তয়োরৈক্যং প্রপশ্যন্তি কিমজ্ঞানমতঃ পরম্

আত্মা নিয়ামকশ্চান্তর্দেহো বাহ্যো নিয়ম্যকঃ

তয়োরৈক্যং প্রপশ্যন্তি কিমজ্ঞানমতঃ পরম্

আত্মা জ্ঞানময়ঃ পুণ্যো দেহো মাংসময়োঽশুচিঃ

তয়োরৈক্যং প্রপশ্যন্তি কিমজ্ঞানমতঃ পরম্

আত্মা প্রকাশকঃ স্বচ্ছো দেহস্তামস উচ্যতে

তয়োরৈক্যং প্রপশ্যন্তি কিমজ্ঞানমতঃ পরম্

আত্মা নিত্যো হি সদ্রূপো দেহোঽনিত্যো হ্যসন্ময়ঃ

তয়োরৈক্যং প্রপশ্যন্তি কিমজ্ঞানমতঃ পরম্

আত্মা নিরবয়ব একস্বরূপ কিন্তু দেহ বহুতত্ত্বাদির দ্বারা গঠিত অর্থাৎ অবয়বযুক্ত। সুতরাং এদের একত্ব যে দেখে তদপেক্ষা অজ্ঞান আর কি আছে! আত্মা সকল বস্তুর নিয়ামক অন্তর্বর্তী কিন্তু দেহ বাহ্য নিয়ম্য। সুতরাং এদের একত্ব দর্শন অপেক্ষা অজ্ঞান আর কি আছে! আত্মা জ্ঞানময় পবিত্র কিন্তু দেহ মাংসময় অপবিত্র। এদের একতাজ্ঞান অপেক্ষা অজ্ঞান আর কি আছে! আত্মা নির্মল সর্ববস্তুর প্রকাশক কিন্তু দেহ তামস বলে কথিত হয়েছে। এদের একতা দর্শন অপেক্ষা অজ্ঞান আর কি আছে! আত্মা নিত্য, সৎস্বরূপ কিন্তু দেহ অনিত্য অসৎস্বরূপ, এদের একতা দর্শন অপেক্ষা অজ্ঞান আর কি আছে!.....

তথ্যসূত্রঃ-

. ভগবান্ শঙ্করাচার্য বিরচিত 'আত্মানাত্মবিবেক' 'অপরোক্ষানুভূতি', উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।

. উপনিষদ গ্রন্থাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, ছান্দোগ্য উপনিষদ্, স্বামী গম্ভীরানন্দ সম্পাদিত, উদ্বোধন কার্যালয় কলকাতা।

শ্রীশুভ চৌধুরী

মার্চ ১০, ২০২৬ খৃষ্টাব্দ।


জ্ঞানী ভোগ্যবিষয়ে মনের কঠিনতা আর ভগবদ্বিষয়ে মনের কোমলতা সম্পাদন করে—

  আচার্য মধুসূদন সরস্বতী ভক্তিরসায়নে বলছেন — কাঠিন্যং বিষয়ে কুর্যাদ্ দ্রবত্বং ভগবৎপদে। উপায়ৈঃ শাস্ত্রনির্দিষ্টৈরনুক্ষণমতো ব...