Showing posts with label জীবনী ও অবদান. Show all posts
Showing posts with label জীবনী ও অবদান. Show all posts

Saturday, 4 July 2026

সুরেশ্বরাচার্য


সুরেশ্বরাচার্য ছিলেন ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্যের শিষ্য। তিনি নর্মদা নদীর তীরবর্তী মহিষ্মতীর অধিবাসী ছিলেন। সুরেশ্বরাচার্যের গৃহস্থাশ্রমের নাম ছিল মণ্ডন মিশ্র। তাঁর পিতা হিম মিত্র কাশ্মীরের রাজদরবারে একজন সম্মানিত পণ্ডিত ছিলেন। তিনি কান্যকুব্জ গৌড় ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বিদ্যারণ্যকৃত শঙ্কর দিগ্বিজয়ে দেখা যায় যে, মণ্ডনমিশ্র উম্বেক এবং বিশ্বরূপ নামেও পরিচিত ছিলেন। শঙ্কর দিগ্বিজয় অনুসারে, পূর্বাশ্রমে তিনি একজন কট্টর মীমাংসক আচার্য ছিলেন। মণ্ডনমিশ্র মীমাংসক শিরোমণি কুমারিল ভট্টের নিকট মীমাংসা শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। কুমারিল ভট্টপাদ্ মণ্ডনমিশ্রের প্রতিভায় এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, ভগবান্ শঙ্করাচার্য যখন কর্মমীমাংসার বিরুদ্ধে তর্কযুদ্ধ ঘোষণা করে কুমারিল ভট্টের নিকট বিচারার্থ গমন করেন, তখন কুমারিল ভট্ট তাঁকে মণ্ডনমিশ্রের সাথে বিচার করতে অনুরোধ করেন। এটা হতে মণ্ডনমিশ্র যে অসাধারণ পণ্ডিত ছিলেন, তা বেশ বোঝা যায়।

সাধারণত শিষ্যই গুরুর কৃপা লাভের আশায় ভক্তি, নিষ্ঠা ও সেবার মাধ্যমে গুরুর সান্নিধ্য ও অনুগ্রহ প্রার্থনা করে থাকেন; কিন্তু এক্ষেত্রে শ্রীশঙ্কর ভগবৎপাদ্ নিজেই শিষ্যের সন্ধানে মহিষ্মতীপুরে গমন করেছিলেন। সেই যুগে পাটলিপুত্রকে রাজধানী করে মগধ সাম্রাজ্য সুদূর বিস্তৃত ছিল। বিশাল মগধ সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি নগরী ছিল মহিষ্মতীপুর। তিনি মহিষ্মতীপুরে একজন বৈদিক কর্মকাণ্ডী গৃহস্থাশ্রমী হিসেবে তাঁর স্ত্রী উভয় ভারতীর সাথে বসবাস করতেন। উভয় ভারতী ছিলেন শোণভদ্র নদের তীরে বসবাসকারী বিদ্বান ও ধার্মিক ব্যক্তি বিষ্ণু মিত্রের কন্যা।

মণ্ডন মিশ্র ও উভয় ভারতী ছিলেন এক আদর্শ দম্পতি; বিদ্যাচর্চা, নৈতিক চরিত্র এবং বৈদিক অনুশাসন পালনের কঠোর নিষ্ঠায় তাঁরা একে অপরের সমকক্ষ ছিলেন। মণ্ডন মিশ্রকে যেমন ব্রহ্মার অবতার বলে মনে করা হতো, তেমনই উভয় ভারতীকে জ্ঞান ও বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীর অবতার বলে গণ্য করা হতো। তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ও সর্বজনীন শ্রদ্ধার কারণে তিনি ‘মণ্ডন মিশ্র’ উপাধিতে ভূষিত হন; তাঁর প্রকৃত নাম ছিল বিশ্বরূপ।

শ্রীভগবৎপাদ্ তাঁর শিষ্যবর্গ ও অনুগামীদের নিয়ে মহিষ্মতীপুর নগরে পৌঁছলেন। শঙ্করাচার্য স্পষ্ট বাক্যে মণ্ডনকে বললেন— তিনি এখানে ভিক্ষা গ্রহণের জন্য আসেননি, বরং এসেছেন শাস্ত্রীয় তর্কে অবতীর্ণ হতে। পাণ্ডিত্যের ক্ষেত্রে এর আগে কখনও সমকক্ষ কাউকে না পাওয়া মণ্ডন মিশ্র তর্কমূলক এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রস্তুত ছিলেন এবং তিনি সানন্দে তা গ্রহণ করলেন। তর্কের জন্য পরদিন সময় নির্ধারিত হলো।

পরদিন নিজ নিজ আশ্রমের প্রাত্যহিক ক্রিয়াকর্ম ও স্নান-আহ্নিক সেরে তাঁরা বিচারার্থে মিলিত হলেন। মণ্ডন মিশ্রের স্ত্রী উভয় ভারতী বিচারকের ভূমিকা পালনে সম্মত হলেন; কারণ তাঁরা উভয়েই তাঁর নিরপেক্ষতার ওপর আস্থা রেখে এবং তাঁর প্রজ্ঞা ও পাণ্ডিত্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর সহায়তা চেয়েছিলেন। তিনিই ছিলেন একমাত্র বিদুষী নারী যিনি তর্কের খাতিরে তাঁদের চিন্তাধারাকে সেই উচ্চমার্গীয় স্তরে অনুসরণ করতে সক্ষম ছিলেন।

গৃহবধূ হিসেবে উভয় ভারতীকে দৈনন্দিন গৃহস্থালির কাজও করতে হয়, যার মধ্যে ছিল তর্কে লিপ্ত ব্যক্তিদের জন্য প্রতিদিনের আহার প্রস্তুত করা, অতিথিদের সেবা শুশ্রূষা করা ইত্যাদি; তাই তিনি তাঁদের দুইজনকে একটি করে ফুলের মালা দিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন যে, যার গলার মালাটি সবার আগে শুকিয়ে বা ম্লান হয়ে যাবে, তিনিই পরাজিত বলে গণ্য হবেন। তর্কযুদ্ধকে আরও অর্থবহ করে তুলতে তাঁরা একটি পণ বা শর্তও স্থির করলেন। ঠিক হলো, বিতর্কে যিনি পরাজিত হবেন, তিনি বিজয়ীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করবেন এবং বিজয়ীর আশ্রম বা জীবনধারাকেই আপন করে নেবেন। তাঁরা উভয়েই ছিলেন অসামান্য পাণ্ডিত্যের অধিকারী এবং বেদজ্ঞানে শ্রেষ্ঠ। তাঁদের প্রাত্যহিক আচার-অনুষ্ঠান, বিশ্রাম ও অন্যান্য আবশ্যিক কাজকর্মে কোনো ব্যাঘাত না ঘটিয়েই এই আলোচনা প্রতিদিন চলতে লাগল।

দিন যতই গড়াতে লাগল, শ্রীভগবৎপাদের যুক্তির মাঝে মণ্ডন মিশ্র এক নতুন আলোর সন্ধান পেলেন। নিজের পূর্ববর্তী মতবাদের ওপর তাঁর আস্থা ক্রমশ টলমল হয়ে পড়ছিল, আর অন্যদিকে শ্রীভগবৎপাদের প্রতি তাঁর বিশ্বাস এক গভীর ও উদ্দীপক উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছিল। তর্কের অষ্টম ও শেষ দিনে মণ্ডন মিশ্র শ্রীভগবৎপাদের মতবাদের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হলেন। শ্রীভগবৎপাদ্ যেমন বলেছিলেন, ‘একবার সেই আবরণ শক্তি বা অবিদ্যা দূর হয়ে গেলেই সেই অদ্বৈত ব্রহ্মাত্ম জ্ঞানের উদয় হয়।’ নিজের মতবাদের সীমাবদ্ধতা এবং শ্রীভগবৎপাদের মতের সত্যতা উপলব্ধি করার মুহূর্তে তিনি দেখলেন যে, তাঁর গলার ফুলের মালাটি ম্লান হয়ে গেছে। তিনি শ্রীভগবৎপাদের সামনে সাষ্টাঙ্গে প্রণত হলেন, তাঁর চরণ স্পর্শ করলেন এবং কম্পিত কণ্ঠে বললেন, ‘হে জগদ্গুরু শঙ্কর, আমাকে ও আমার ধৃষ্টতাকে ক্ষমা করুন। এই আট দিন ধরে আমি আপনার প্রতি অপরাধ করেছি। আপনার ক্রোধ সংবরণ করুন এবং এই দীন দাসের ওপর কৃপা বর্ষণ করুন ও আমাকে শিষ্য পদে বরণ করুন।’ তারপর শ্রীভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য তাঁকে শিষ্যপদে বরণ করে সন্ন্যাস প্রদানপূর্বক ‘শ্রীসুরেশ্বরাচার্য’ নাম প্রদান করলেন এবং দক্ষিণাম্নায় শৃঙ্গেরি শারদাপীঠের প্রথম পীঠাধীশ‌ পদে অভিষিক্ত করলেন।

মণ্ডনমিশ্র সন্ন্যাস গ্রহণের পূর্বে মীমাংসা দর্শনে মীমাংসানুক্রমণিকা, ভাবনাবিবেক ও বিধিবিবেক, এই তিনখানা গ্রন্থ রচনা করেন। তন্মধ্যে বিধিবিবেক আয়তনে বৃহৎ ও বিচারবহুল। এই গ্রন্থে বৈদিক বিধির স্বরূপ আলোচনা করা হয়েছে। এটা গদ্যে ও পদ্যে লিখিত। এটার উপর বাচস্পতি মিশ্রের ন্যায়কণিকা নামে টীকা আছে। তাছাড়া তিনি ভর্তৃহরির ও অপরাপর বৈয়াকরণ আচার্যগণের অঙ্গীকৃত স্ফোটবাদের সমর্থনে স্ফোটসিদ্ধি গ্রন্থ, ভ্রমজ্ঞানের স্বরূপ আলোচনায় বিভ্রমবিবেক ও অদ্বৈতবেদান্তের ব্যাখ্যায় ব্রহ্মসিদ্ধি ও নৈষ্কর্মসিদ্ধি নামক প্রসিদ্ধ গ্রন্থদ্বয় রচনা করেন। তবে ব্রহ্মসিদ্ধির দার্শনিক মত শঙ্করবেদান্ত সিদ্ধান্তের অনুরূপ নয়। তাই এটি তাঁর পূর্বাশ্রমের রচনা হিসেবে গণ্য করা হয়। অর্থাৎ এটি শঙ্কর পূর্ববর্তী বেদান্তের গ্রন্থ। মণ্ডনমিশ্রের ব্রহ্মসিদ্ধি (১) ব্রহ্ম কাণ্ড, (২) তর্ক কাণ্ড, (৩) নিয়োগ কাণ্ড এবং (৪) সিদ্ধি কাণ্ড—এই চার কাণ্ড বা পরিচ্ছেদে বিভক্ত। প্রত্যেক কাণ্ডই পদ্যে ও গদ্যে লিখিত। ব্রহ্মসিদ্ধির উপর বাচস্পতি মিশ্রের তত্ত্বসমীক্ষা টীকা রয়েছে। তত্ত্বসমীক্ষা ব্রহ্মসিদ্ধির প্রাচীন ও প্রামাণিক টীকা। তত্ত্বসমীক্ষা ব্যতীত ব্রহ্মসিদ্ধির উপর নিত্যবোধঘনাচার্যের টীকা, আনন্দপূর্ণের ভাবশুদ্ধি টীকা, চিৎসুখাচার্যের অভিপ্রায়প্রকাশিকা টীকা ও আচার্য শঙ্খপাণির টীকার পরিচয় পাওয়া যায়।

সুরেশ্বরাচার্যের নৈষ্কর্মসিদ্ধি শঙ্করবেদান্তের অতি উপাদেয় ও প্রামানিক গ্রন্থ। এটিও গদ্যে ও পদ্যে লিখিত। এটিও চার অধ্যায়ে সমাপ্ত। নৈষ্কর্মসিদ্ধির উপর আচার্য জ্ঞানোত্তম মিশ্রের চন্দ্রিকা টীকা ও চিৎসুখাচার্যের ভাবতত্ত্বপ্রকাশিকা নামে টীকা আছে। তবে চন্দ্রিকা টীকায় প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ টীকা। এই টীকাদ্বয় ব্যতীত নৈষ্কর্মসিদ্ধির উপর জ্ঞানামৃতের বিদ্যাসুরভি, অখিলাত্মনের নৈষ্কর্মসিদ্ধি-বিবরণ ও রামদত্তের সারার্থ নামক টীকাও রচিত হয়েছিল বলে জানা যায়।

তাছাড়া তিনি অদ্বৈতবেদান্তের বার্তিককার নামেও প্রসিদ্ধ। ভগবান্ ভাষ্যকার শঙ্করাচার্যের ভাষ্যের উপর বৃহদারণ্যক ভাষ্য বার্তিক, তৈত্তিরীয় ভাষ্য বার্তিক, পঞ্চীকরণ বার্তিক, কাশীমোক্ষনির্ণয়, দক্ষিণামূর্তি স্তোত্রের উপর মানসোল্লাস বার্তিক ও যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতির উপর বালক্রীড়া নামক টীকা রচনা করেছেন।

তিনি শৃঙ্গেরির পাশাপাশি মূলাম্নায় কাঞ্চী কামকোটি পীঠের রক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। জ্যৈষ্ঠ শুক্ল দ্বাদশী তিথিতে (৮৩৪ খৃষ্টাব্দ মতান্তরে ৪০৭ খৃষ্টপূর্বাব্দ) রাত্রিকালে তিনি সিদ্ধি লাভ করেন। কথিত আছে যে, কাঞ্চীপুরমের ‘পুণ্যরস’ নামক এক অত্যন্ত পবিত্র স্থানে তিনি লয়যোগের এক উচ্চস্তরে প্রবেশ করেন এবং নিজের শরীরকে শিবলিঙ্গে রূপান্তরিত করে ইহলীলা সংবরণ করেছিলেন। সেই সিদ্ধিস্থানটি পরবর্তীকালে তাঁর পূর্বাশ্রমের নামানুসারে ‘মণ্ডনমিশ্র অগ্রহার’ নামে পরিচিত হয়।

তিনি ছিলেন এক মহান যোগীশ্বর। ভগবৎপাদ্ শ্রীশঙ্করের পরম্পরাভুক্ত পরবর্তী অনেক আচার্যের গুরু ছিলেন তিনি। সংক্ষেপ শারীরককার আচার্য সর্বজ্ঞাত্ম মুনি তাঁরই শিষ্য ছিলেন। তাঁর অসাধারণ প্রশাসনিক দক্ষতা ও জ্ঞানের কারণে শ্রীশঙ্কর তাঁকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমস্ত পীঠের কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বভারও অর্পণ করেছিলেন।

তথ্যসূত্রঃ-

১. বেদান্তদর্শন— অদ্বৈতবাদ, প্রথম খণ্ড, আশুতোষ ভট্টাচার্য শাস্ত্রী।

২.https://www.srisharadapeetham.com/.../sri-sureshwaracharya

শ্রীশুভ চৌধুরী

জানুয়ারি ২৯, ২০২৬ খৃষ্টাব্দ।

Photo editing credit Thākur Vishāl See less

Sunday, 11 January 2026

আচার্য জ্ঞানোত্তম—

 


জগদ্গুরু শ্রী শ্রী জ্ঞানোত্তমাচার্য শৃঙ্গেরি শারদাপীঠের মঠাধীশ (৯১০-৯৫৪ খৃষ্টাব্দ) ছিলেন। প্রাচীন কুম্ভকোণম্ (কাঞ্চী) মঠের গুরু পরম্পরাতেও আচার্যের নাম পাওয়া যায়। তৎকালীন ভারতের চোল প্রদেশের মঙ্গল নামক গ্রামে আচার্য আবির্ভূত হন। তাঁর পিতার নাম নাগেশ। জ্ঞানোত্তমাচার্য একজন মহান দার্শনিক ও তার্কিক ছিলেন। তিনি তৎকালীন অদ্বৈত বিরোধী অসংখ্য দার্শনিক মতকে খণ্ডন করে অদ্বৈতবেদান্তের শ্রীবৃদ্ধি সম্পাদন করেন। শ্রী সুরেশ্বরাচার্যের নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধির উপর 'চন্দ্রিকা' নামে একটি অপূর্ব টীকা রচনা করে তিনি পণ্ডিত সমাজে সমাদৃত হন। তিনি তাঁর চন্দ্রিকা টীকাতে তাঁর গুরু শ্রী সত্যবোধ এবং পরমগুরু শ্রী সর্বজ্ঞাত্ম মুনির কথা বলেছেন। তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ রচনা "বিদ্যা শ্রী" ভগবান্ শঙ্করাচার্যের ব্রহ্মসূত্র ভাষ্যের অতি উপাদেয় টীকা হিসেবে পরিচিত। তাছাড়া তিনি ব্রহ্মসিদ্ধির উপর "বেদান্তন্যায়সুধা" টীকা ও "জ্ঞানসিদ্ধি" নামক গ্রন্থ রচনা করে অদ্বৈতবেদান্তের বিশেষ পুষ্টি সাধন করেন।

আচার্য সর্বদা চন্দ্রমৌলীশ্বরের ধ্যান করতেন। ভগবান্ শিবের ধ্যানে তন্ময় হয়ে থাকতেন তিনি। অনেকের মতে তিনি মূলতঃ গৌড় (বাংলা) থেকে এসেছিলেন এবং পরবর্তীকালে তাঁর পূর্বাশ্রমের সময় দক্ষিণ ভারতে বসতি স্থাপন করেছিলেন, তাই তিনি শ্রী গৌড়েশ্বরাচার্য নামেও পরিচিত। জ্ঞানোত্তমাচার্যের বিশিষ্ট শিষ্যদের মধ্যে দুইজন বিখ্যাত ছিলেন, একজন বিজ্ঞানাশ্রম নামে বিশ্রুত, আরেকজন প্রখ্যাত দার্শনিক চিৎসুখাচার্য, যিনি তাঁর প্রসিদ্ধ অদ্বৈত গ্রন্থ "তত্ত্ব-প্রদীপিকা" (চিৎসুখী) এর জন্য বিখ্যাত। এই গ্রন্থে, চিৎসুখ শ্রদ্ধার সাথে তাঁর গুরু জ্ঞানোত্তমকে ভগবান্ দক্ষিণামূর্তি, ব্যাস এবং শঙ্করের উজ্জ্বল মূর্ত প্রকাশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

জ্ঞানানাম্ উত্তমং জ্ঞানং জ্ঞানিনাম্ উত্তমঃ যতঃ। 

জ্ঞানোত্তম ইতি খ্যাতং গুরুম্ তম্ অহম্ আশ্রয়ে।।

—সকল জ্ঞানের মধ্যে যে জ্ঞান সর্বোত্তম, এবং জ্ঞানীদের মধ্যে যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ—যিনি ‘জ্ঞানোত্তম’ নামে খ্যাত, সেই গুরুকেই আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি।......

তথ্যসূত্রঃ-

১. "অদ্বৈতসিদ্ধি মধুসূদন সরস্বতী", শ্রী ব্যোমকেশ ভট্টাচার্য, ভাগবতরত্ন।

২. অদ্বৈতসিদ্ধিঃ, প্রথমভাগ, যোগেন্দ্রনাথ তর্কসাংখ্যবেদান্ততীর্থ পরিশোধিতা, তৎকৃতটীকা, বঙ্গানুবাদ, তাৎপর্যসমেতা।

৩.https://www.sringeri.net/jagadgurus/the-early-acharyas

৪. https://www.kamakoti.org/peeth/origin.html

শ্রীশুভ চৌধুরী

জানুয়ারি ২, ২০২৬ খৃষ্টাব্দ।

Photo editing credit Thākur Vishāl

আচার্য রঙ্গরাজাধ্বরি—

 


আচার্য রঙ্গরাজাধ্বরি অদ্বৈতবেদান্তের আরেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি প্রসিদ্ধ আচার্য অপ্পয় দীক্ষিতের পিতা ছিলেন। কাঞ্চী নগরী ছিল এই দুই রত্নের বাসভূমি। কাঞ্চী সর্বদা পণ্ডিতের আকর। কাঞ্চীর নিকটবর্তী 'অড়য়প্পন' নামক গ্রামে দীক্ষিত পরিবার বাস করতেন। রঙ্গরাজাধ্বরির পিতার নাম ছিল আচার্য দীক্ষিত বা বক্ষঃস্থলাচার্য। আচার্য দীক্ষিত নানারকম যজ্ঞ সম্পন্ন করেছিলেন বলে দীক্ষিত উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। রঙ্গরাজ বিজয়নগরের রাজা শ্রীকৃষ্ণদেবের সমসাময়িক ছিলেন। কৃষ্ণদেব ১৫০৯ খৃষ্টাব্দ থেকে ১৫৩০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত বিজয়নগরের রাজা ছিলেন; সুতরাং রঙ্গরাজের স্থিতিকাল খৃষ্টীয় ষোড়শ শতকের প্রথম ভাগ বলে নির্ণয় করা যায়।

রঙ্গরাজ বিভিন্ন শাস্ত্রে অসামান্য পাণ্ডিত্য লাভ করেছিলেন এবং ন্যায়, বৈশেষিক, সাংখ্য প্রভৃতি বিভিন্ন দার্শনিক মতের খণ্ডনে এবং অদ্বৈতসিদ্ধান্ত স্থাপনে অলোকসামান্য মনীষার পরিচয় প্রদান করেছেন। এইরূপ পাণ্ডিত্য বড়ই বিরল। রঙ্গরাজ "অদ্বৈতবিদ্যামুকুর" ও পঞ্চপাদিকা বিবরণের উপর "পঞ্চপাদিকা-বিবরণ-দর্পণ" নামের টীকা রচনা করে অদ্বৈতবেদান্তের শ্রীবৃদ্ধি সম্পাদন করেন। তাঁর অতিমানুষ প্রতিভা ও অসাধারণ বিদ্যাবত্তা স্বীয় পুত্র অপ্পয় দীক্ষিতের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করেছিল। অপ্পয় দীক্ষিত পিতার নিকটই শিক্ষা লাভ করে ব্যাকরণ, অলঙ্কার, ন্যায়, মীমাংসা প্রভৃতি শাস্ত্রে অসামান্য পাণ্ডিত্য অর্জন করেন এবং অদ্বৈতবেদান্তে দীক্ষা লাভ করেন। রঙ্গরাজই অপ্পয় দীক্ষিতের বিভিন্ন শাস্ত্রে সর্বাতিশায়ী পাণ্ডিত্যের মূল প্রস্রবণ। অপ্পয় দীক্ষিত ন্যায়রক্ষামণির প্রারম্ভে এবং বেদান্তকল্পতরু পরিমলের প্রথম পাদের সমাপ্তিতে উচ্ছ্বসিত ভাষায় তদীয় পিতৃদেবের বিভিন্ন শাস্ত্রে অলোকসামান্য বিদ্যাবত্তার ও সর্বতোমুখী প্রতিভার প্রশংসা করেছেন।

যং ব্রহ্ম নিশ্চিতধিয়ঃ প্রবদন্তি সাক্ষাৎ তদ্দর্শনাদখিলদর্শনপারভাজম্ । তং সর্ববেদসমশেষবুধাদিরাজং শ্রীরঙ্গরাজমখিলং গুরুমানতোঽস্মি।

— (ন্যায়রক্ষামণির প্রারম্ভ শ্লোক)

তাছাড়া অপ্পয় দীক্ষিত "সিদ্ধান্তলেশ-সংগ্রহে" অদ্বৈতবিদ্যাকার বলে তদীয় পিতৃদেবের অদ্বৈতবিদ্যামুকুরের বিষয় উল্লেখ করেছেন এবং সিদ্ধান্ত স্থাপনে স্বীয় পিতৃদেবের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। রঙ্গরাজের পৌত্র নীলকণ্ঠ দীক্ষিতও তদীয় "নলচরিতে" রঙ্গরাজের গ্রন্থের বিষয় উল্লেখ করেছেন।

তথ্যসূত্রঃ- "বেদান্তদর্শন—অদ্বৈতবাদ", প্রথম খণ্ড, আশুতোষ ভট্টাচার্য শাস্ত্রী।

শ্রীশুভ চৌধুরী

নভেম্বর ২৩, ২০২৫ খৃষ্টাব্দ।

Photo editing credit Thākur Vishāl

নিত্যকর্মসমূহ কিরূপে মোক্ষের হেতু হয়?

  সুরেশ্বরাচার্য তদীয় নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধিতে বলছেন — কদাচিৎ কোন প্রকারে পুণ্য অনুশীলন দ্বারা এবং নিত্যকর্মানুষ্ঠান দ্বারা বুদ্ধি ব...