Showing posts with label ব্রহ্মসূত্র শাঙ্করভাষ্য. Show all posts
Showing posts with label ব্রহ্মসূত্র শাঙ্করভাষ্য. Show all posts

Monday, 9 May 2022

লিঙ্গোপাধি জীবের দেহান্তরপ্রাপ্তিকালে মুখ্যপ্রাণ ও ইন্দ্রিয়সকলের গতি শ্রবণঃ-

 


প্রথমে বলে রাখি, সুক্ষ্মশরীররূপ উপাধির সহিত সম্বন্ধবশতঃই আত্মার জন্ম, মরণ, গমন ও আগমন প্রভৃতি বিকারাত্মক সর্বপ্রকার সাংসারিক ব্যবহার হইয়া থাকে। এবার আসি প্রস্তাবিত প্রকরণে, বেদান্ত মীমাংসা শাস্ত্রের রংহত্যধিকরণে ভগবান সূত্রকার বাদরায়ণ বলিতেছেন-

"প্রাণগতেশ্চ৷৷"-(ব্রহ্মসূত্র-৩.১.৩)

ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য ভাষ্যে বলিতেছেন—

'তমুত্ক্রামন্তং প্রাণোনূত্ক্রামতি প্রাণমনূত্ক্রামন্তং সর্বে প্রাণা অনূত্ক্রামন্তি'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪/৪/২)

অর্থাৎ "সে (লিঙ্গোপাধি জীব) উৎক্রমণ করিলে তাহাকে অনুসরণকরতঃ মুখ্যপ্রাণ উৎক্রমণ করে, মুখ্যপ্রাণ উৎক্রমণ করিলে তাহাকে অনুসরণকরতঃ সকল ইন্দ্রিয় উৎক্রমণ করে", ইত্যাদি শ্রুতিসকলের দ্বারা দেহান্তরপ্রাপ্তিকালে প্রাণসকলের গতি শ্রাবিত হইতেছে।

প্রাণ ও ইন্দ্রিয়সকল পর পর উৎক্রান্ত হয় এরূপ অর্থ নহে। জীবাদির প্রাধান্যের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া বর্ণনামধ্যে পারম্পর্য স্বীকৃত হইয়াছে। বস্তুতঃ ইন্দ্রিয়াদিবিশিষ্ট লিঙ্গশরীরের উৎক্রমণই জীবের উৎক্রমণ। আথর্ব্বণ উপনিষদেও এইরূপ কথা আছে, "কে উৎক্রমণ করিলে অর্থাৎ দেহত্যাগ করিলে, আমি উৎক্রমণ করিব, এবং কে দেহে প্রতিষ্ঠিত থাকিলে আমি প্রতিষ্ঠিত থাকিব; এই ব্যবস্থার জন্য তিনি প্রাণ সৃষ্টি করিলেন..."-(প্রশ্ন উপনিষৎ-৬/৩)

ছবিটি সংগৃহীত, চিত্রাঙ্কনে Sirsho Acharya

 

Wednesday, 20 April 2022

ভূতসূক্ষ্ম পরিবেষ্টিত জীবের পরলোকগমনঃ-

 


বেদান্ত মীমাংসা শাস্ত্রের রংহত্যধিকরণের প্রতিপাদ্য বিষয় জীবের পরলোকে গমনাগমন বিচার। ইতোমধ্যে জীবের ভোগসাধনভূত লিঙ্গশরীর নিরূপিত হইয়াছে। এক্ষণে সেই লিঙ্গশরীরকে অবলম্বন করতঃ তদুপাধিযুক্ত জীবের পরলোকে গত্যাগতি সম্বন্ধে বিচার করা হইতেছে।

ভগবান ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য শারীরক মীমাংসা ভাষ্যে বলিতেছেন— জীব কি দেহের বীজভূত ভূতসূক্ষ্মসকলের দ্বারা পরিবেষ্টিত না হইয়া লোকান্তরে গমন করে, অথবা পরিবেষ্টিত হইয়া গমন করে? তদুত্তরে আচার্য ভগবান বাদরায়ন বলিতেছেন—"তদন্তরপ্রতিপত্তৌ রংহতি..…"-(ব্রহ্মসূত্র-৩.১.১)

'তদন্তরপ্রতিপত্তৌ'—দেহান্তর প্রাপ্তিতে দেহের বীজভূত ভূতসূক্ষ্মসকলের দ্বারা পরিবেষ্টিত হইয়া জীব 'রংহতি' অর্থাৎ গমন করে।

শ্রীভারতী তীর্থ বৈয়াসিক ন্যায়মালায় বিষয়টা আরও স্পষ্ট করিতেছেন—কেবল ভূত সুলভ হইলেও দেহের বীজসকল দুর্লভ হওয়ায় জীবদ্দশাতে ভূতরূপ আধার ব্যতিরেকে জীবের উপাধিভূত ইন্দ্রিয়সকলের গমন পরিদৃষ্ট হয় না, সেইহেতু নিরাধার ইন্দ্রিয়গণের গমন সম্ভব না হওয়ায় এবং

'ইতি তু পঞ্চম্যামাহুতাবাপঃ পুরুষবচসো ভবন্তি'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৫/৯/১)

"পঞ্চম আহুতিতে জল পুরুষ সংজ্ঞা লাভ করে", এই শ্রুতিবোধিত পঞ্চম আহুতিযুক্ত হওয়ায় জীব সেই ভূতসূক্ষ্মসকলের দ্বারা বেষ্টিত হইয়া পরলোক গমন করে।

ছান্দোগ্য শ্রুতির এইস্থলে ব্রহ্মলোক প্রাপ্তির সাধনভূত পঞ্চাগ্নিবিদ্যার কথা বলা হইতেছে। সেই স্থলে ভূতসূক্ষ্মদ্বারা পরিবেষ্টিত ইষ্টাপূর্ত্তকর্ম্মানুষ্ঠানকারী মনুষ্যের চন্দ্রলোকে ভোগোপযোগী শরীরলাভ এবং কর্ম্মক্ষয়ে তথা হইতে বিভিন্ন অবস্থান্তর প্রাপ্তিদ্বারা পুনঃ মনুষ্যাদি জন্মলাভ পর্যন্ত অবস্থা সকলকে পাঁচটী আহুতিরূপে চিন্তার দ্বারা উপাসনার বিধান আছে।

Sunday, 20 March 2022

মুখ্য প্রাণের স্বরূপ নির্ণয়ঃ-

 


বেদান্তমীমাংসা শাস্ত্রের বায়ুক্রিয়াধিকরণের প্রতিপাদ্য বিষয় মুখ্য প্রাণের স্বরূপ নির্ণয়। মুখ্য প্রাণ কি বায়ু মাত্র? অথবা ইন্দ্রিয়গণের ক্রিয়া? অথবা অন্য কিছু? ভগবান সূত্রকার বাদরায়ণ বলিতেছেন-

ন বায়ুক্রিয়ে পৃথগুপদেশাত্৷৷- (ব্রহ্মসূত্র-২/৪/৯)

আচার্য শঙ্কর সূত্রভাষ্যে সিদ্ধান্ত করিতেছেন—"মুখ্য প্রাণ বায়ু নহে এবং ইন্দ্রিয় সকলের ব্যাপারও নহে। কেন নহে? যেহেতু পৃথগ্ভাবে উপদিষ্ট হইয়াছে। বায়ু হইতে মুখ্যপ্রাণের পৃথগ্ভাবে উপদেশ আছে। যথা-

প্রাণ এব ব্রহ্মণশ্চতুর্থঃ পাদঃ স বাযুনা জ্যোতিষা ভাতি চ তপতি চ'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৩/১৮/৪)

'মুখ্যপ্রাণই ব্রহ্মের চতুর্থ পাদ, তাহা বায়ুরূপ জ্যোতির দ্বারা প্রকাশিত হয় ও কার্য্যক্ষম হয়।' মুখ্যপ্রাণ বায়ু হইলে নিশ্চয়ই বায়ু হইতে পৃথগ্ভাবে উপদিষ্ট হইত না। এইপ্রকারে ইন্দ্রিয় সকলের বৃত্তি হইতেও মুখ্যপ্রাণের পৃথগ্ভাবে উপদেশ আছে। যথা- "এই পুরুষ হইতে প্রাণ জাত হয় এবং মন সর্বেন্দ্রিয়..."-(মুণ্ডক উপনিষৎ-২/১/৩) সুতরাং বৃত্তি ও বৃত্তি মানের অভিন্নতাবশতঃ মুখ্যপ্রাণ ইন্দ্রিয়সকলের সাধারণ বৃত্তি হইয়াই ইন্দ্রিয়সকল হইতে নিশ্চয়ই পৃথগ্ভাবে উপদিষ্ট হইত না।..."

তাহলে মুখ্যপ্রাণ কি? মুখ্য প্রাণ বায়ুরূপ মহাভূতের কার্য্য, বায়ুমাত্র নহে, তদ্ভিন্নও নহে। আচার্য শঙ্কর ভাষ্যে তাহাই সিদ্ধান্ত করিতেছেন—"এই বায়ুই অধ্যাত্মভাবকে প্রাপ্ত হইয়া প্রাণ ও অপান প্রভৃতি পাঁচ প্রকার ব্যূহরূপ বিশেষস্বরূপে অবস্থানকরতঃ মুখ্যপ্রাণ নামে কথিত হয়। তাহা বায়ু হইতে তত্ত্বান্তর (সম্পূর্ণ ভিন্ন বস্তু) নহে, অথবা বায়ুমাত্রও নহে।"

মনের ন্যায় ইহারও পাঁচটি বৃত্তি আছে বলিয়া শাস্ত্রে উপদেশ করা হইয়াছে। 'পঞ্চবৃত্তির্মনোবদ্ব্যপদিশ্যতে'-(ব্রহ্মসূত্র-২/৪/১২)

আচার্য শঙ্কর ভাষ্যে বলিতেছেন— "আর এই হেতুবশতঃ মুখ্যপ্রাণের বিশেষ কার্য্য বর্তমান আছে, যেহেতু শ্রুতিসকলে ইহা পঞ্চবৃত্তিযুক্তরূপে (—ক্রিয়াভেদে পাঁচ প্রকার অবস্থাযুক্তরূপে) বর্ণিত হইতেছে, যথা—"প্রাণ, অপান, ব্যান, উদান ও সমান", ইত্যাদি। আর এই বৃত্তি ভেদ‌ কার্য্যভেদকে অপেক্ষা করে। সেই কার্য্য প্রদর্শন করিতেছেন—সম্মুখভাগে যাহার বৃত্তি এবং উচ্ছ্বাস (–প্রশ্বাস এবং দেহধারণ) প্রভৃতি যাহার কর্ম্ম, তাহা প্রাণ। অধোভাগে যাহার বৃত্তি এবং নিঃশ্বাসাদি (—শ্বাসগ্রহণ ও অধোবায়ুত্যাগ) যাহার কর্ম্ম, তাহা অপান। সেই দুইটীর (—প্রাণ ও অপানের) সন্ধি স্থলে (—নাভিতে) বর্ত্তমান যাহা অগ্নিমন্থনাদি বলসাধ্য কর্ম্মের হেতু, তাহা ব্যান। ঊর্ধ্ব দিকে যাহার বৃত্তি এবং উৎক্রমণ গত্যাগতি ও উদগার প্রভৃতির যাহা হেতু, তাহা উদান। অন্নরসকে যাহা সকল অঙ্গে সমানভাবে লইয়া যায়, তাহা সমান।

এই প্রকারে মুখ্যপ্রাণ মনের ন্যায় পঞ্চবৃত্তিযুক্ত, অর্থাৎ মনের যেমন পাঁচপ্রকার বৃত্তি, মুখ্যপ্রাণেরও এইপ্রকার।

 

Thursday, 17 March 2022

হিরণ্যগর্ভ কি?

 


কঠশ্রুতির (১/৩/১০) শাঙ্করভাষ্যে উল্লেখ রহিয়াছে-"অব্যক্ত হইতে প্রথম উৎপন্ন হিরণ্যগর্ভতত্ত্ব যাহা জ্ঞানশক্তি ও ক্রিয়াশক্তিস্বরূপ, সেই মহান আত্মা (–সমষ্টিবুদ্ধি হিরণ্যগর্ভ) ঐ বুদ্ধি-উৎপাদক ভূতসূক্ষ্ম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।"

ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞের সংযোগই যে ভূতকারণ সেই বিষয়ে শ্রীভগবান বলিতেছেন- "সর্বকার্য (উৎপত্তিশীল বস্তু) হইতে মহত্ত্বহেতু এবং আত্মবিকারস্বরূপ সর্বকার্যের ভরণকারী 'মহৎ' নামে প্রসিদ্ধ ব্রহ্ম, আমার স্বভূতা মদীয়া মায়া ত্রিগুণাত্মিকা প্রকৃতি— যিনি স্বীয় বিকারজাত সর্বভূতের যোনি অর্থাৎ উৎপত্তির কারণ। সেই মহদ্ব্রহ্মরূপ যোনিতে আমি (ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ প্রকৃতিদ্বয় দ্বারা শক্তিমান ঈশ্বর) গর্ভাধান (হিরণ্যগর্ভ জন্মের বীজ অর্থাৎ সর্বভূত জন্মকারণের বীজ নিক্ষেপ) করি অর্থাৎ অবিদ্যা, কাম ও কর্ম-রূপ উপাধি অনুবিধায়ী ক্ষেত্রজ্ঞকে ক্ষেত্রের সহিত সংযোজন করি। সেই গর্ভাধান হইতে হিরণ্যগর্ভের উৎপত্তিদ্বারা সর্বভূতের উৎপত্তি হইয়া থাকে।"-(শাঙ্করভাষ্য, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৪/৩)

সৃষ্টির আরম্ভে প্রকৃতির এই প্রথম পরিণামকে মহত্তত্ত্বও বলা হয়। আধুনিক সাংখ্যকারগণ উহাকেই বুদ্ধিতত্ত্ব বলেন। শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণে প্রকৃতি থেকে চিত্তের উৎপত্তিপূর্বক তাহার লক্ষণ বর্ণিত আছে-"সেই পরমপুরুষ দৈববশত (জীবের অদৃষ্টবশত) ক্ষুভিতধর্মিণী স্বীয়া প্রকৃতিতে বীর্য (চিদরূপা শক্তি) আধান করেন। তখন সেই প্রকৃতি হিরণ্ময় অর্থাৎ প্রকাশবহুল মহৎতত্ত্বকে সৃষ্টি করেন।"-(শ্রীধর স্বামী টীকা, শ্রীমদ্ভাগবতম্-৩/২৬/১৯)

 

Monday, 31 January 2022

ইন্দ্রিয়সকল অণু পরিমাণঃ-

 


ইন্দ্রিয়সকল ব্যাপী, অথবা অণুপরিমাণ? এই সংশয়ের সমাধান রহিয়াছে বেদান্তমীমাংসা শাস্ত্রের প্রাণাণুত্বাধিকরণে। অধিকরণ প্রতিপাদ্য বিষয় হইল ইন্দ্রিয়সকলের পরিচ্ছিন্ন পরিমাণতা। ভগবান সূত্রকার সিদ্ধান্ত করিতেছেন-

অণবশ্চ।। -(ব্রহ্মসূত্র ২/৪/৭)

ভগবান ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য ভাষ্যে বলিতেছেন- এক্ষণে সেই ইন্দ্রিয়সকলেরই পরিমাণরূপ অন্য স্বভাবকে ভগবান সূত্রকার সংগ্রহ করিতেছেন। প্রস্তাবিত এই ইন্দ্রিয়সকলকে অণুপরিমাণ বুঝিতে হইবে। সূক্ষ্মতা ও পরিচ্ছিন্নতাই (-মধ্যমপরিমাণতাই) ইহাদের অণুতা, কিন্তু পরমাণুতুল্যতা নহে, যেহেতু তাহা হইলে সমগ্রদেহব্যাপী কার্য্য অসঙ্গত হইয়া পড়িবে। এই ইন্দ্রিয়সকল সূক্ষ্ম, যদি স্থূল হইত, মরণকালে শরীর হইতে নির্গমনকারী ইহারা ম্রিয়মাণ ব্যক্তির পার্শ্বস্থ পুরুষগণকর্ত্তৃক গর্ত্ত হইতে নির্গত সর্পের ন্যায় উপলব্ধ হইত। আর এই ইন্দ্রিয়সকল পরিচ্ছিন্ন; যদি সর্ব্বগত হইত, উৎক্রমণ, পরলোক গমন এবং তথা হইতে আগমন প্রতিপাদিকা শ্রুতির বিরোধ হইয়া পড়িত। (কারণ স্বরূপতঃ বিভু জীবের বুদ্ধ্যাদি উপাধিও বিভু হইলে তাহার উৎক্রান্তি প্রভৃতি সম্ভব হইবে না।).......

 

Saturday, 8 January 2022

ইন্দ্রিয়ের সংখ্যা নিরূপণঃ-


পূর্ব আলোচনায় মুখ্যপ্রাণ ও ইন্দ্রিয়সকলের উৎপত্তি নিরূপণ করিয়া সেই সকল হইতে জীবস্বরূপের বিবেকের জন্য এক্ষণে সেই ইতর (-মুখ্যপ্রাণ হইতে ভিন্ন) ইন্দ্রিয়সকলের সংখ্যা নিরূপিত হইতেছে। মুখ্যপ্রাণ ও তদ্বিষয়ে জ্ঞাতব্যসকল পরবর্তীতে আলোচিত হইবে। বেদান্তমীমাংসা শাস্ত্রের সপ্তগত্যধিকরণম্ এর প্রতিপাদ্য বিষয় এইসকল ইন্দ্রিয়ের সংখ্যা নিরূপণ।

আচার্য শঙ্কর ব্রহ্মসূত্রের (২/৪/৫) ভাষ্যে এই বিষয়ে বিভিন্ন শ্রুতির উল্লেখ করিতেছেন-কোন কোন স্থলে সাতটি ইন্দ্রিয় বর্ণিত হইতেছে-

'সপ্ত প্রাণাঃ প্রভবন্তি তস্মাৎ'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-২/১/৮)

"ব্রহ্ম হইতে সাতটি ইন্দ্রিয় (-পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়, বাক্ ও মন) উৎপন্ন হয়।"

আবার কোন কোন স্থলে উক্ত সাতটি ও হস্ত নিয়ে আটটি ইন্দ্রিয় গ্রহত্বরূপ গুণের দ্বারা বর্ণিত হইতেছে-

'অষ্টৌ গ্রহা অষ্টাবতিগ্রহাঃ'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৩/২/১)

"আটটি গ্রহ ও আটটি অতিগ্রহ" ইত্যাদি।

কোন কোন স্থলে নয়টি ইন্দ্রিয় বর্ণিত হইতেছে-

'সপ্ত বৈ শীর্ষণ্যাঃ প্রাণা দ্বাববাঞ্চৌ'-(তৈত্তিরীয় সংহিতা ৫/১/৭/১)

"মস্তকস্থ ইন্দ্রিয় নিশ্চয় সাতটি (চক্ষুর্দ্বয়, কর্ণদ্বয়, নাসাছিদ্রদ্বয় ও বাক্) এবং (পায়ু ও উপস্থ) এই দুইটি নিম্নে অবস্থিত।"

কোথাও দশটি বর্ণিত হইতেছে-'নব বৈ পুরুষে প্রাণা নাভির্দশমী'-(তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ-২/১/৭)

"পুরুষে (-পুরুষাকার দেহে উপরোক্ত) নয়টি অবশ্যই আছে, নাভি দশম।"

কোথাও এগারটি বর্ণিত হইতেছে-'দশেমে পুরুষে প্রাণা আত্মৈকাদশঃ'-(বৃহদারণ্যক উপনিষদ-৩/৯/৪)

"পুরুষে (-পুরুষোপাধি দেহে, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়) এই দশটি ইন্দ্রিয় বর্তমান আছে, মন একাদশ‌।"

তাছাড়া কোন কোন স্থলে দ্বাদশটি বর্ণিত হইতেছে, যেমন- 'সর্বেষাং স্পর্শানাং ত্বগেকায়নম্'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-২/৪/১১)

"ত্বগিন্দ্রিয়ই সকলপ্রকার স্পর্শের একমাত্র আশ্রয়", ইত্যাদি।

আবার কোথাও ত্রয়োদশটিও বর্ণিত হইয়াছে-'চক্ষুশ্চ দ্রষ্টব্যং চ'-(প্রশ্ন উপনিষৎ-৪/৮)

"চক্ষু এবং দ্রষ্টব্য বিষয়" ইত্যাদি এইস্থলে।

এই প্রকারে ইন্দ্রিয়সকলের সংখ্যা নির্দ্ধারণের প্রতি শ্রুতি সকল বিরোধগ্রস্ত হইতেছে। একপক্ষের মতে ইন্দ্রিয়ের সংখ্যা সাতটিই। যেহেতু উপরোক্ত মুণ্ডক ও তৈত্তিরীয় শ্রুতিতে ইহারা বিশেষিত হইয়াছে। আর যে একাদশাদি সংখ্যান্তরের শ্রবণ তাহা ইন্দ্রিয়ের বিভিন্ন বৃত্তিকে অপেক্ষা করে। এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত সূত্র হইল-

হস্তাদয়স্তু স্থিতেতো নৈবম্৷৷ ব্রহ্মসূত্র-২.৪.৬৷৷

অর্থাৎ 'তু' এই শব্দটি পূর্বসূত্রের একপক্ষীয় মতকে নিরাকরণ করিতেছে। হস্তদ্বয় ইত্যাদিকেও শ্রুতিতে ইন্দ্রিয় হিসেবেই গ্রহণ করা হইয়াছে। ইহা যেহেতু অবধারিত বিষয়, সেইহেতু ইন্দ্রিয়সমূহ সপ্তসংখ্যক মাত্র নহে।

আচার্য শঙ্কর ভাষ্যে সিদ্ধান্ত করিতেছেন- 'হস্তো বৈ গ্রহঃ স কর্মণাতিগ্রহেণ গৃহীতো হস্তাভ্যাং হি কর্ম করোতি'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৩/২/৮)

"হস্তদ্বয়ই গ্রহ, তাহা কর্ম্মরূপ (-গ্রহণকরারূপ) অতিগ্রহের দ্বারা গৃহীত (-আবদ্ধ), যেহেতু হস্তদ্বারায় কর্ম্মানুষ্ঠান করে", ইত্যাদি এইসকল শ্রুতিতে সাতটি হইতে অতিরিক্ত হস্ত প্রভৃতি অপর ইন্দ্রিয়সকল পঠিত হইতেছে।

তাহা হইলে ইন্দ্রিয়ের সংখ্যা কত? ভাষ্যকার সিদ্ধান্ত করিতেছেন একাদশটি। সেই বিষয়ে শ্রুতি উদাহৃতা হইয়াছে-'দশেমে পুরুষে প্রাণা আত্মৈকাদশঃ'-(বৃহদারণ্যক উপনিষদ-৩/৯/৪)

"পুরুষে (-পুরুষোপাধি দেহে, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়) এই দশটি ইন্দ্রিয় বর্তমান আছে, আত্মা (-মন) একাদশ‌স্থানীয়।" আত্মশব্দে কিন্তু অন্তঃকরণ পরিগৃহীত হইতেছে, যেহেতু ইহা করণের (-বিষয়গ্রাহক ইন্দ্রিয়ের প্রকরণ।

কিন্তু একাদশ হইতেও অধিক দ্বাদশ এবং ত্রয়োদশ সংখ্যা উদাহৃত হইয়াছে। হ্যাঁ সত্য, উদাহৃত হইয়াছে; কিন্তু একাদশটি কার্য (—ইন্দ্রিয়ের বিষয়) হইতে অধিক কার্য্য বিদ্যমান নাই, তাহার জন্য অধিক করণ কল্পনা করিতে হইবে। শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধবিষয়ক পাঁচপ্রকার বিভিন্ন বুদ্ধি (—জ্ঞান), তাহাদিগের জন্য পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় আবশ্যক।

আর বচন (—বাগ্ ব্যবহার), আদান (—গ্রহণ), বিহরণ (—চলন), উৎসর্গ (—মলত্যাগ) ও আনন্দ , এই পাঁচপ্রকার বিভিন্ন কর্ম্ম, তাহাদিগের জন্য পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয় আবশ্যক। সকল পদার্থই যাহার বিষয় এবং কালত্রয়েই যাহার বৃত্তি (—ক্রিয়া) হয়, সেই মন কিন্তু এক ও অনেক বৃত্তিযুক্ত। কোন কোন স্থলে বৃত্তির বিভিন্নতাবশতঃ তাহাই বিভিন্নের ন্যায় কথিত হয়, যথা—মন বুদ্ধি অহঙ্কার ও চিত্ত, এইপ্রকার। আর দেখ শ্রুতি কাম প্রভৃতি নানাবিধ বৃত্তিসকলকে উল্লেখ করিয়া বলিতেছেন-

'এতত্সর্বং মন এব'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-১/৫/৩) "এইসমস্ত মনই", ইত্যাদি।

অতএব কার্য্যলিঙ্গক অনুমানপুষ্ট আগমপ্রমাণবলে ইন্দ্রিয়ের একাদশত্ব সংখ্যা নিরূপিত হইল।.......

প্রকারান্তরে ইন্দ্রিয়ের সংখ্যা নিরূপণঃ-

ইতোমধ্যে বেদান্তমীমাংসা শাস্ত্রাবলম্বনে আলোচনা করিয়াছি ইতর ইন্দ্রিয়ের সংখ্যা একাদশটী। এক্ষণে সেই সিদ্ধান্তই আর পুষ্ট করা হইবে। ব্রহ্মসূত্রের সপ্তগত্যধিকরণের দ্বিতীয় বর্ণকে ইন্দ্রিয় সকলই বিষয়। জীবের সহিত কতগুলি প্রাণ উৎক্রমণ করে, ইহা এখানে বিচারিত হইয়াছে।

ভগবান শঙ্করাচার্য সিদ্ধান্ত সূত্রের (২/৪/৬) ভাষ্যে বলিতেছেন-"হস্তদ্বয় নিশ্চয় গ্রহ"-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৩/২/৮), ইত্যাদি শ্রুতি বাক্যসকলে কিন্তু সাতটী হইতে অতিরিক্ত হস্ত প্রভৃতি অপর ইন্দ্রিয়সকল প্রতীত হইতেছে। আর গ্রহত্ব বলিতে বন্ধনভাব অবগত হওয়া যাইতেছে, যেহেতু ক্ষেত্রজ্ঞ (-জীব) এই গ্রহ নামক বন্ধনের দ্বারা বদ্ধ হয়। আর এই ক্ষেত্রজ্ঞ একটী মাত্র শরীরেই বদ্ধ হয় না, যেহেতু অন্য শরীরসকলেও তাহার বন্ধন সমানই হইয়া থাকে। সেইহেতু এই গ্রহনামক বন্ধন অন্য শরীরেও সঞ্চরণ করে, ইহা অর্থবলে কথিত হইতেছে। যেমন দেখ, "প্রাণ যাহার আদি, সেই পূর্য্যষ্টকাত্মক লিঙ্গের দ্বারা জীব বদ্ধ হন। তাহার দ্বারা যিনি বদ্ধ, তাঁহারই বন্ধন এবং তাহা হইতে যিনি মুক্ত তাঁহারই মুক্তি।" ব্রহ্মপুরাণোক্ত ইত্যাদি স্মৃতি মোক্ষের পূর্ব্ব পর্য্যন্ত এই গ্রহসংজ্ঞক বন্ধনের সহিত অবিয়োগ প্রদর্শন করিতেছেন।......

এখন প্রশ্ন পূর্য্যষ্টক কি? অর্থাৎ দেহরাজ জীবের আটটী পুরী। সুরেশ্বরাচার্য্য 'পঞ্চীকরণ' সূত্রের বার্ত্তিকে স্পষ্ট করিতেছেন-

"১.আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল ও পৃথিবী- এই পাঁচটী অপঞ্চীকৃত ভূতসূক্ষ্ম একটী পুরী; ২. অবিদ্যা একটী পুরী; ৩. কাম একটী পুরী; ৪. কর্ম্ম একটী পুরী; লিঙ্গশরীর অর্থাৎ ৫. পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় একটী পুরী; ৬. পঞ্চ কর্ম্মেন্দ্রিয় একটী পুরী; ৭. পঞ্চ প্রাণ একটী পুরী; ৮. মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার এবং চিত্তরূপ অন্তঃকরণ একটী পুরী- দেহরাজ জীবের এই অষ্টপুর বলিয়া জানিবে।"-(পঞ্চীকরণ বার্ত্তিক- ৩৬)

ভগবান ভাষ্যকার উক্ত সূত্রের ভাষ্যে আরও একটী শ্রুতিপ্রমাণ প্রদর্শন করিয়া ইহা সিদ্ধ করিলেন যে ইন্দ্রিয়ের সংখ্যা একাদশটী। যথা-

'দশেমে পুরুষে প্রাণা আত্মৈকাদশস্তে যদাস্মাচ্ছরীরান্মর্ত্যাদুত্ক্রামন্ত্যথ রোদয়ন্তি'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৩/৯/৪)

"পুরুষে (-তদাকার দেহে) এই দশটী ইন্দ্রিয়, আত্মা(-মন) একাদশ, তাহারা যখন এই মরণশীল শরীর হইতে উৎক্রমণ করে, তখন (-কুটুম্বগণকে) রোদন করায়", এইপ্রকারে শ্রুতি একাদশটী ইন্দ্রিয়ের উৎক্রান্তি প্রদর্শন করিতেছেন।

 

 

Friday, 18 September 2020

স্বপ্নকালীন ও জাগ্রৎকালীন জ্ঞানদ্বয়ের বৈধর্ম্য আছেঃ-



জাগ্রৎ এবং স্বপ্নাবস্থার চেতনার মধ্যে পার্থক্য আছে বলিয়া, জাগ্রৎ অবস্থার অভিজ্ঞা স্বপ্নাবস্থার অভিজ্ঞার অনুরূপ নহে। শ্রীমণ্মহর্ষি বাদরায়ণ ভগবৎ প্রণীত বেদান্ত মীমাংসা শাস্ত্রে বর্ণিত আছে-

বৈধর্ম্যাচ্চ ন স্বপ্নাদিবৎ৷৷ -(ব্রহ্মসূত্র ২।২।২৯)
শারীরকভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্য স্বীয়ভাষ্যে বিজ্ঞানবাদী বৌদ্ধ মত খণ্ডন করিয়াছেন। ভগবান্ ভাষ্যকার শঙ্কর ভাষ্যে বলিতেছেন-
বাহ্য পদার্থ অস্বীকারকারী (বিজ্ঞানবাদী বৌদ্ধ) কর্ত্তৃক যে কথিত হইয়াছে-স্বপ্নকালীন জ্ঞানের ন্যায় জাগ্রৎকালীন স্তম্ভাদি বিষয়ক জ্ঞানসকলও বাহ্য পদার্থ ব্যতিরেকেই হইবে, যেহেতু তাহারা অবিশেষভাবে জ্ঞানই,..ইত্যাদি। তাহাকে প্রত্যাখ্যান করিতে হইবে। এই বিষয়ে বলা হইতেছে-জাগ্রৎকালীন জ্ঞানসকল স্বপ্নাদিকালীন জ্ঞানের ন্যায় হইতে পারে না। তাহাতে হেতু কি? উত্তর হইল- যেহেতু স্বপ্নকালীন ও জাগ্রৎকালীন জ্ঞানদ্বয়ের বৈধর্ম্য (বিভিন্নধর্ম্মযুক্ততারূপ পার্থক্য) আছে। আচ্ছা বৈধর্ম্মটী কি?
উত্তর হইল- বাধিত হওয়া এবং অবাধিত হওয়াই সেই বৈধর্ম্য, ইহা বলিতেছি। যেহেতু প্রতিবুদ্ধ (জাগরিত) ব্যক্তির স্বপ্নকালে উপলব্ধ বস্তু বাধিত হয়, (তিনি বলেন-'স্বপ্নকালে) মৎকর্ত্তৃক উপলব্ধ মহাত্মা ব্যক্তিগণের সমাগম মিথ্যা, কারণ আমার নিকট মহাত্মা ব্যক্তিগণের সমাগম হয় নাই; কিন্তু আমার মন নিদ্রারূপ গ্লানিযুক্ত ছিল, সেইহেতু এই ভ্রান্তি উপলব্ধ হইয়াছিল', ইত্যাদি। এইপ্রকারে মায়া (-ইন্দ্রজাল) প্রভৃতি স্থলেও যথাযোগ্য বাধ হইবে। জাগরিতকালে উপলব্ধ স্তম্ভ প্রভৃতি বস্তু কিন্তু কোন অবস্থাতেও (মায়া প্রভৃতির ন্যায়) এইপ্রকারে বাধিত হয় না।
আর এক কথা, এই যে স্বপ্নদর্শন, ইহা স্মৃতি। জাগ্রতকালীন দর্শন(-জ্ঞান) কিন্তু উপলব্ধি। আর বিষয়ের বিপ্রয়োগ এবং সম্প্রয়োগাত্মক (-অবিদ্যমানতা এবং বিদ্যমানতারূপ) যে স্মৃতি ও উপলব্ধির প্রত্যক্ষ অন্তর (-ভেদ), তাহা স্বয়ম্ অনুভূত হয়, যথা 'প্রিয় পুত্রকে স্মরণ করিতেছি', তাহাকে উপলব্ধি করিতেছি না', ' তাহাকে উপলব্ধি করিতে ইচ্ছা করিতেছি', ইত্যাদি।
সেইস্থলে এইপ্রকার হইলে উভয়ের বিভিন্নতা যিনি স্বয়ং অনুভব করেন, তৎকর্ত্তৃক ইহা কথিত হইতে পারে না যে,"জাগ্রৎকালীন উপলব্ধি মিথ্যা (-আলম্বনহীন), যেহেতু তাহা উপলব্ধি, যেমন স্বপ্নোলব্ধি" ইত্যাদি। যেহেতু যাঁহারা নিজদিগকে প্রাজ্ঞ মনে করেন, তাঁহাদিগকর্ত্তূক নিজের অনুভবের অপলোপ করা যুক্তিসঙ্গত নহে।
আবার অনুভবের বিরোধ হইয়া পড়ে বলিয়া "জাগ্রৎকালীন জ্ঞানসকল স্বভাবতঃই অবলম্বনহীন", ইহা বলিতে যে বিজ্ঞানবাদী বৌদ্ধ অসমর্থ, তিনি স্বপ্নকালীন জ্ঞানের সাধর্ম্ম্যবশতঃ (-আলম্বনহীনতারূপ সমানধর্ম্মযুক্তাবশতঃ, জাগ্রৎকালীন জ্ঞানসকলের নিরালম্বনতা) বলিতে ইচ্ছা করিতেছেন। কিন্তু যাহা যাহার স্বাভাবিক ধর্ম্ম নহে, তাহা অন্যের স্বাধর্ম্ম্যবশতঃ তাহার নিজের ধর্ম্ম হইবে, ইহা সম্ভব নহে। দেখ, যে অগ্নি উষ্ণরূপে অনুভূত হয়, জলের শৈত্যরূপ সাধর্ম্ম্যবশতঃ তাহা নিশচয়ই শীতল হইয়া পড়িবে না। স্বপ্ন ও জাগ্রদবস্থার বৈধর্ম্ম্য কিন্তু ইতোপূর্ব্বে প্রদর্শিত হইয়াছে।.............

Thursday, 26 March 2020

জ্ঞানের পাপবীজ নাশঃ-



জ্ঞানের পাপবীজনাশত্ব বিষয়ে ব্রহ্মসূত্রে সূত্রকার মহর্ষি বাদরায়ণ ভগবৎ দ্বারা বিচারিত হইয়াছে-
'তদধিগম্ উত্তরপূর্বাঘযোরশ্লেষবিনাশৌ তদ্ব্যপদেশাৎ ৷৷'-ব্রহ্মসূত্র ৪.১.১৩৷৷
সূত্রের ভাষ্যে আচার্য্য শঙ্কর ভগবৎপাদ্ বলিতেছেন- ব্রহ্মবিদ্যা পাপনাশক নহে এইরূপ বিরুদ্ধমত প্রাপ্ত হইলে বলিতেছি-'তদধিগমে' অর্থাৎ ব্রহ্ম বিজ্ঞাত হইলে পরবর্ত্তী ও পূর্ববর্ত্তী অর্থাৎ ক্রিয়মান্ ও সঞ্চিত পাপের অসংস্পর্শ ও বিনাশ হয়। কোন হেতুবলে তাহা বলা যায়? উত্তর যেহেতু শাস্ত্রে তাহাদের কথন আছে। যেমন দেখ, ব্রহ্মবিদ্যার প্রক্রিয়াতে যাহার সহিত সম্বন্ধ সম্ভব, সেই আগামী পাপের সহিত ব্রহ্মবিদের সম্বন্ধহীনতা শ্রুতি উপদেশ করিতেছেন, যথা-
'যথা পুষ্করপলাশ আপো ন শ্লিষ্যন্ত এবমেবংবিদি পাপং কর্ম ন শ্লিষ্যতে'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৪।১৪।৩)
অর্থাৎ পদ্মপত্রে জল যেমন সংশ্লিষ্ট হয় না, এইরূপ ব্রহ্মকে যিনি এই প্রকারে জানেন, তাঁহাতে পাপকর্ম্ম সংশ্লিষ্ট হয় না। ইত্যাদি শ্রুতি।

এইপ্রকারে শ্রুতি পূর্ব্বসঞ্চিত পাপের বিনাশও উপদেশ করিতেছেন,যথা-
'তদ্যথেষীকাতূলমগ্নৌ প্রোতং প্রদূযেতৈবং হাস্য সর্বে পাপ্মানঃ প্রদূযন্তে' (ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৫।২৪।৩)
অর্থাৎ মুঞ্জাঘাষের তুলা অগ্নিতে প্রক্ষিপ্ত হইলে যমন নিঃশেষে ভষ্মীভূত হইয়া যায়. এইপ্রকারেই ইঁহার সকল পাপ নিঃশেষে দগ্ধ হইয়া যায়। ইত্যাদি শ্রুতি।

কর্ম্মক্ষয়বিষয়ক এই অপর উপদেশ আছে, যথা-
ভিদ্যতে হৃদযগ্রন্ধিশ্ছিদ্যন্তে সর্বসংশযাঃ৷ ক্ষীযন্তে চাস্য কর্মাণি তস্মিন্দৃষ্টে পরাবরে'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-২।২।৮)
অর্থাৎ পরাবর অর্থাৎ কারণ ও কার্য্যাত্মক সেই পরমাত্মা দৃষ্ট হইলে জ্ঞানীর অবিদ্যাবাসনারূপ হৃদয়গ্রন্থি বিনষ্ট হইয়া যায় এবং কর্ম্মসকল ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ইত্যাদি শ্রুতি।

Monday, 29 July 2019

উপাসকগণের জন্য অসীম পরমেশ্বর বিশেষ বিশেষরূপে অভিব্যক্ত হনঃ-


প্রশ্ন এই, পরমাত্মা ব্রহ্ম নির্গুণ, অরূপ, বিভু বিশ্বব্যাপক; কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ ঠিক এর বিপরীত; তিনি সগুণ, তাঁর শরীর দৃশ্য, মথুরা, গোকুল, বৃন্দাবনাদি স্থানের একাংশে তাঁর স্থিতি, প্রাকৃত ব্যক্তির ন্যায় তাঁর অনুরাগ ক্রোধ বর্তমান, তিনি পরমাত্মা হবেন কিরূপে?

তদুত্তরে ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য প্রবোধসুধাকরে বলেছেনঅপর সকল দৃশ্যপদার্থই এই চক্ষু দ্বারা দৃশ্য হয়ে থাকে, কিন্তু ভগবান্ এই চক্ষু দ্বারা দৃষ্ট হন না, তিনি জ্ঞাননেত্রে দৃশ্য। ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ বিশ্বরূপ প্রদর্শনকালে অর্জুনকে যে দিব্যচক্ষু প্রদান করেছিলেন, তা হতেই নরহরির অদৃশ্যতা সিদ্ধ হয়। কিন্তু তার প্রমাণ কোথায়? স্বয়ং ভগবান্ শ্রীগীতায় বলেছেন

তু মাং শক্যসে দ্রষ্টুমনেনৈব স্বচক্ষুষা৷

দিব্যং দদামি তে চক্ষুঃ পশ্য মে যোগমৈশ্বরম্৷৷

-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, ১১/)

তুমি নিজের প্রাকৃত স্থূল চক্ষু দ্বারা আমার বিশ্বরূপ দর্শন করতে সমর্থ হবে না। তোমাকে অপ্রাকৃত জ্ঞানচক্ষু দিচ্ছি। এই দিব্যচক্ষু দ্বারা আমার অঘটনঘটনসামর্থ্যরূপ যোগ-শক্তি দর্শন কর।

যেমন সূর্যমণ্ডল গগনের এক অংশে গোলাকারে দৃশ্যমান হন, কিন্তু সমগ্র বিশ্বকেই প্রকাশিত করেন এবং সকল লোক তাঁকে নানাস্থানে এককালে দর্শন করে থাকে, সেরূপ যদুনাথ যদ্যপি সাকার এবং একদেশে অবস্থিত বলে প্রতীয়মান হন, তথাপি তিনি সর্বব্যাপক সচ্চিদানন্দস্বরূপ সর্বাত্মা। ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ এক হলেও যুগপৎ অনেক গোপিকার সহিত যুগলরূপে ক্রীড়া করেছিলেন। একই সূর্য, বহুস্থানস্থিত বহুলোকের যেরূপ যুগপৎ দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকেন, সেরূপ শ্রীকৃষ্ণ এক হয়েও যুগপৎ বিভিন্ন স্থানস্থিত বিভিন্ন ব্যক্তির প্রত্যক্ষ হয়েছিলেন। রাসলীলায় প্রত্যেক গোপীই যে এক সময়ে শ্রীকৃষ্ণসঙ্গ সুখ লাভ করেছিলেন, এর প্রমাণ বিষ্ণুপুরাণ, শ্রীমদ্ভাগবতাদি গ্রন্থে রয়েছে। তাছাড়া বিদেহরাজ জনক এবং শ্রুতদেবনামক ব্রাহ্মণ নিজ নিজ গৃহে একই সময়ে তাঁর আতিথ্য সৎকার স্তব করে কৃতার্থ হয়েছিলেন। এই বিবরণ বিস্তৃতভাবে শ্রীমদ্ভাগবতের ১০ম স্কন্ধের ৮৬ অধ্যায়ে আছে।

পরমাত্মা অসীম হলেও উপাসকদিগের প্রতি কৃপা পরবশ হয়েই বিশেষ বিশেষরূপে প্রকাশিত হন। 'অতিমাত্রস্যাপি পরমেশ্বরস্য প্রাদেশমাত্রত্বমভিব্যক্তিনিমিত্তং স্যাত্৷ অভিব্যজ্যতে কিল প্রাদেশমাত্রপরিমাণঃ পরমেশ্বর উপাসকানাং কৃতে৷ প্রদেশবিশেষেষু বা হৃদযাদিষূপলব্ধিস্থানেষু বিশেষেণাভিব্যজ্যতে৷ অতঃ পরমেশ্বরেপি প্রাদেশমাত্রশ্রুতিরভিব্যক্তেরুপপদ্যত্।'-(ব্রহ্মসূত্র-..২৯,শাঙ্করভাষ্য) অর্থাৎ অতিমাত্র অসীমবিভু হলেও পরমেশ্বরের যে প্রাদেশমাত্রতা, তা অভিব্যক্তিরূপ নিমিত্তবশতঃ হবে। উপাসকগণের জন্য পরমেশ্বর প্রাদেশমাত্র পরিমাণযুক্তরূপে অভিব্যক্ত হন। অথবা হৃদয় প্রভৃতি উপলব্ধিস্থানভূত প্রদেশসকলে পরমেশ্বর বিশেষভাবে অভিব্যক্ত হন। অতএব অভিব্যক্ত হন বলে পরমেশ্বরেও প্রাদেশমাত্র শ্রুতি সঙ্গত।

ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ কুরুপাণ্ডবের সন্ধিস্থাপন-মানসে হস্তিনাপুরে গমন করলে, দূর্যোধন তাঁকে একাকী মনে করে কর্ণাদির মন্ত্রণানুসারে বন্ধন করবার আয়োজন করেন, তখন দুর্যোধন দেখলেনশ্রীকৃষ্ণের বিশাল দেহে যুধিষ্ঠিরাদি পাণ্ডবগণ, বলরাম, প্রদ্যুম্ন অস্ত্র-শস্ত্র-সমন্বিত সৈন্যসমেত যদুকুলের উপস্থিতি। এই বিবরণ মহাভারতের উদ্যোগপর্বের ১৩১ অধ্যায়ে রয়েছে। এইসব উদাহরণে দেখা যায়, একই শ্রীকৃষ্ণ যুগবৎ অনেকবৎ দৃষ্ট হয়েছেন, যা অপর কোন দৃশ্যমান পরিচ্ছিন্ন শরীরে নেই। শ্রীবৎস, যখন শ্রীকৃষ্ণকে বক্ষঃস্থলে আঘাত করেন, তখনও তিনি কি শ্রীকৃষ্ণের দ্বেষের পাত্র হয়েছিলেন? অসুর এবং অপর যারাই ভক্ত তাদের সমান ফল হয়ে থাকে। শ্রীকৃষ্ণের কেউই শত্রু নয়, কেউই মিত্র নয়। নরহরি যদুনাথ উত্তম-পথ-পার্শ্ববর্তী ফলবান্ বিটপীর তুল্য। তাই শত্রুমিত্রে সমান সদ্গতি দাতা শ্রীহরির অনুরাগ বিদ্বেষ কল্পনা করা অনুচিত। অতএব ভগবান্ শ্রীহরি কৃষ্ণ সাক্ষাৎ ঈশ্বর। সর্বভূতের অন্তর্য্যামী, সচ্চিদানন্দ, জ্ঞানস্বরূপ, প্রকৃতির অতীত বা তদপেক্ষা শ্রেষ্ঠ যে পরমাত্মা, তিনিই এই যদুকুলতিলক শ্রীকৃষ্ণ।

তথ্যসূত্রঃ-

১. ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য বিরচিত "প্রবোধসুধাকর"
২. ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য বিরচিত শারীরকমীমাংসা ভাষ্য।




Sunday, 28 July 2019

বেদান্তদর্শন শাস্ত্র ব্রহ্মসূত্র শাঙ্করভাষ্যে ওঙ্কার মাহাত্ম্যঃ-



মহর্ষি বাদরায়ণের উত্তরমীমাংসা বেদান্ত দর্শনের তৃতীয় অধ্যায়ের তৃতীয় পাদে বর্ণিত আছে-
'ব্যাপ্তেশ্চ সমঞ্জসম্'।-(ব্রহ্মসূত্র ৩।৩।৯)

শাঙ্করভাষ্য অনুযায়ী বঙ্গানুবাদঃ- এবং যেহেতু 'ওম্' সকল বেদেই পরিব্যাপ্ত হইয়া আছে, সেইহেতু উদ্গীথ বিদ্যার উপাসনায় 'ওম্'-কে বিশেষরূপে গ্রহণ করিলেই সামঞ্জস্য বিধান করা হইবে।

শাঙ্করভাষ্য অনুযায়ী ব্যাখ্যাঃ- যেহেতু 'ওম্' সকল বেদেই সাধারণভাবে পরিব্যাপ্ত হইয়া আছে, সেই জন্য আমাদিগকে বুঝিতে হইবে আমরা কোন্ বিশেষ 'ওম্'- এর উপসনা করিব। উদ্গীথের অংশবিশেষ সেই 'ওম্'-কে বিশেষভাবে লক্ষ্য করিয়া আমাদিগকে উদ্গীথ উপাসনা করিতে হইবে-আমরা এই 'ওম্' কে সামবেদের 'ওম্' বলিয়াই জানিয়া থাকি। সামবেদীয় ছান্দোগ্য শ্রুতিতেই আছে-
‘ওম ইত্যেদক্ষরম্ উদ্গীথম্ উপাসীতোমিতি.......।।অর্থাৎ পরমাত্মার সন্নিহিত অভিধান অর্থাৎ বাচক নাম 'ওম্' এই অক্ষরকে উদ্গীথরূপে উপাসনা করিবে। অতএব বর্ণাত্মক এই অক্ষরই (ওঙ্কারই) “উদ্গীথ’ ভক্তির অবয়ব বা অংশভূত; এই জন্য 'উদ্গীথ’ শব্দবাচ্য;অর্থাৎ উদ্গীথরূপে ইহার উপাসনা করিবে।-(ছান্দোগ্যোপষদ্-১।১।১)।।

ব্রহ্মসূত্র শাঙ্করভাষ্যে শাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তাঃ-



শাস্ত্রযোনিত্বাৎ ৷৷ ব্রহ্মসূত্র- ১।১।৩৷৷

শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- প্রদীপের ন্যায় সর্বার্থপ্রকাশক মহৎ যে ঋগ্বেদ বেদান্তাদি শাস্ত্র, যাহা বেদাঙ্গ, পুরাণ, স্মৃতি ধর্ম্মশাস্ত্র প্রভৃতি অনেক বিদ্যাস্থান দ্বারা পুষ্ট এবং যাহা সর্বজ্ঞকল্প অর্থাৎ সর্ব্বপ্রকার জ্ঞানের আকর হইলেও অচেতন হওয়াই যাহাকে প্রায় সর্বজ্ঞ বলা যায়, তাহার যোনি অর্থাৎ উপাদান এবং নিমিত্ত কারণ ব্রহ্ম। 'অস্য মহতো ভূতস্য নিঃশ্বসিতং যদেতদৃগ্বেদো যজুর্বেদঃ সামবেদঃ অর্থবাঙ্গিরসঃ।' অর্থাৎ এই যে ঋগ্বেদাদি চতুর্বেদ ইহারা এই মহৎভূতের নিঃশ্বসিত তথা নিঃশ্বাসের ন্যায় ব্রহ্মের বিনাপ্রযত্নে অভিব্যক্ত।- (বৃহদারণ্যক উপনিষদ ২.৪.১০)এই প্রকার শ্রুতি আছে বলিয়া ঋগ্বেদাদি শাস্ত্র সর্ব্ববিধ জ্ঞানের আকর স্বরূপ, তাহা বিনাপ্রযত্নে লীলান্যায়ে পুরুষের নিঃশ্বাসের ন্যায় মহৎ ভূত ব্রহ্মরূপ যোনি কারণ হইতে উৎপন্ন। শাস্ত্ররূপ প্রমাণ হইতেই জগতের জন্মাদির কারণরূপে ব্রহ্ম অধিগত হন, ইহাই অভিপ্রায়।

Saturday, 27 July 2019

ব্রহ্মসূত্রের শাঙ্করভাষ্যে বেদের নিত্যতা বিষয়ে শাস্ত্রপ্রমাণঃ-

মহর্ষি বাদরায়ণ উত্তরমীমাংসা বেদান্তদর্শনের ১ম অধ্যায়ের তৃতীয় পাদের ২৯ সূত্রে বেদের নিত্যতাকে দৃঢ় করিতেছেন-

'অতএব চ নিত্যত্বম্'।।-(ব্রহ্মসূত্র ১।৩।২৯)

ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের শাঙ্করভাষ্য অনুযায়ী ভাবার্থঃ-
সেই স্থিত-সিদ্ধ বেদনিত্যতাকেই সূত্রকার দৃঢ় করিতেছেন- অতএব, অর্থাৎ নিয়ত জাতিবিশিষ্ট যে দেবাদি জগৎ, তাহা বৈদিক শব্দ হইতে উৎপন্ন হয় বলিয়া বৈদিক শব্দের নিত্যতাও স্বীকার করিতে হইবে। যেমন ‘যজ্ঞেন বাচঃ পদবীয়মায়ন্তামন্ববিন্দন্নৃষিষু প্রবিষ্টাম্।'-(ঋগ্বেদসংহিতা-১০।৭১।৩) যজ্ঞের অর্থাৎ পূর্ব্বকৃত পূণ্যকর্ম্মের দ্বারা বাক্যের অর্থাৎ বেদের পদবীয়কে অর্থাৎ লাভযোগ্যতাকে প্রাপ্ত হইয়া বিশ্বামিত্রাদি যাজ্ঞিকগণ ঋষিগণের মধ্যে প্রবিষ্ট অর্থাৎ স্থিত তাহাকে অর্থাৎ- সেই বেদকে প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। ইত্যাদি বৈদিক মন্ত্রবর্ণ স্থিত ও অনুবিন্ন অর্থাৎ পূর্ব্ব হইতে অবস্থিত ও উপলব্ধ বেদকেই প্রদর্শন করিতেছে। শ্রীমহাভারতে বেদব্যাসও এইপ্রকার স্মরণ করিতেছেন, যথা-'যুগান্তেন্তর্হিতান্বেদান্সেতিহাসান্মহর্ষযঃ৷ লেভিরে তপসা পূর্বমনুজ্ঞাতাঃ স্বযংভুবা '-(মহাভারত শান্তিপর্ব-২১০।১৯) পূর্বকল্পে যাহারা বিদ্যমান ছিলেন যুগান্তে অন্তর্হিত ইতিহাসের সহিত সেই বেদসকলকে মহর্ষিগণ স্বয়ম্ভু ব্রহ্মাকর্তৃক অনুজ্ঞাত অর্থাৎ উপদিষ্ট হইয়া পূর্ব্বে কল্পাদিতে লাভ করিয়াছিলেন।

এতদ্বিষয়ে পূর্বের সূত্রে অর্থাৎ ব্রহ্মসূত্রের ১ম অধ্যায়ের তৃতীয় পাদের ২৮ সূত্রের শাঙ্করভাষ্যে আরও অনেক শাস্ত্রপ্রমাণ রহিয়াছে। যথাঃ- এইরূপ অন্যস্থলেও 'স মনসা বাচং মিথুনং সমভবত্'-(বৃহদারণ্যক উপনিষদ-১।২।৪)-তিনি মনের সহিত বাক্ কে অর্থাৎ বেদকে মিথুনীকৃত করিলেন অর্থাৎ মনের দ্বারা শ্রুতিপঠিত সৃষ্টিক্রম পর্য্যালোচনা করিলেন। ইত্যাদি শ্রুতি বাক্যের দ্বারা তত্তৎস্থলে শব্দপূর্ব্বিকা সৃষ্টি শ্রবণ করানো হইতেছে। স্মৃতিও শব্দপূর্ব্বিকা সৃষ্টির কথা বলিতেছেন-' 'অনাদিনিধনা নিত্যা বাগুত্সৃষ্টা স্বযংভুবা৷ আদৌ বেদমযী দিব্যা যতঃ সর্বাঃ প্রবৃত্তযঃ'।-(মহাভারত ১২।২৩১।৫৬-৫৭)- কল্পের আদিতে রূপসৃষ্টির পূর্বে স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মা কর্তৃক দিব্য, নিত্য এবং অনাদি নিধন অর্থাৎ আদিঅন্তবিহীন বেদময়ী বাণী উচ্চারিত হইয়াছিল, যাহা হইতে সকলপ্রকার প্রবৃত্তি হইয়াছে, ইত্যাদি। 'বেদময়ী বাণী উচ্চারিত হইয়াছিল'-ইহার দ্বারা বেদ পুরুষরচিত, এইপ্রকার আশঙ্কার উদয় হয়, তাহা নিবারণের জন্য বলিতেছেন-বাণীর এই উৎসর্গ অর্থাৎ বেদের এই উচ্চারণ সম্প্রদায় প্রবর্ত্তনাত্মক অর্থাৎ শিষ্যকে বেদপ্রদানাত্মক অধ্যয়নরূপ বুঝিতে হইবে। যেহেতু যাহা আদি ও অন্তহীন, তাহার অন্যপ্রকার উচ্চারণ অর্থাৎ কেহ যে স্বয়ং রচনা করিয়া অন্যকে শ্রবণ করাইতেছেন এমন সম্ভব নহে।
এইরূপে আবার ‘সর্বেষাং তু স নামানি কর্মাণি চ পৃথক্ পৃথক্।বেদশব্দেভ্য এবাদৌ পৃথক্-সংস্থাশ্চ নির্মমে’।। (মনুসংহিতা-১।২১)।। অর্থাৎ সৃষ্টির প্রারম্ভে হিরণ্যগর্ভরূপে অবস্থিত এই পরমাত্মা বেদ থেকে (পূর্ব-পূর্ব কল্পের যার যেমন নামাদি ছিলো তা) অবগত হইয়া সকলের নাম (যেমন, গোজাতির অন্তর্গত গো, অশ্ব-জাতির অশ্ব প্রভৃতি), কর্ম (যেমন ব্রাহ্মণের অধ্যয়নাদি, ক্ষত্রিয়ের প্রজারক্ষণাদি), এবং নানারকম লৌকিকী ক্রিয়া (যেমন, ব্রাহ্মণের যাজনাদি, কুলালের ঘটনির্মাণ, তন্তুবায়ের পটনির্মাণ প্রভৃতি) পৃথক পৃথক ভাবে (অর্থাৎ পূর্বকল্পের যাহার যেমন ছিলো সেইভাবে) নির্দেশ করিলেন। এই প্রকার স্মৃতিও আছে।

সৃষ্টির পূর্ব্বে স্রষ্টা প্রজাপতির মনে বৈদিক শব্দসকল প্রাদুর্ভূত হইয়াছিল (শ্বেতাশ্বতরোপনিষদ-৫।২, ৬।১৮), তদনন্তর তাহাতে অনুগত অর্থাৎ বর্ণিত বিষয়সকল তিনি সৃষ্টি করিয়াছিলেন, ইহা অবগত হওয়া যাইতেছে অর্থাৎ অনুমতি হইতেছে। এই প্রত্যক্ষ ও অনুমান সিদ্ধ বিষয়ে শ্রুতি বাক্যরূপ প্রমাণ প্রদর্শন করিতেছেন-
'স ভূরিতি ব্যাহরত্ স ভূমিমসৃজত'-(তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ-২।২।৪।২) তিনি 'ভূ' ইহা উচ্চারণ করতঃ ভূমিকে সৃষ্টি করিয়াছেন। ইত্যাদি শ্রুতি স্রষ্টা মনে প্রাদুর্ভূত ভূঃ প্রভৃতি শব্দ সকল হইতেই ভূরাদি লোকসকল সৃষ্ট হইয়াছে ইহা প্রদর্শন করিতেছেন।.................

ভগবৎপাদ্ মহাপ্রাজ্ঞ শঙ্করাচার্য্য স্বীয় ভাষ্যে মহর্ষি বাদরায়ণের বেদের এই নিত্যতা বিষয়ক সিদ্ধান্তকে আরও বহু শাস্ত্রীয় যুক্তি দ্বারা সিদ্ধ করিয়াছেন। এইখানে কিছু মূল অংশ তুলে ধরা হইয়াছে।


জ্ঞানী ভোগ্যবিষয়ে মনের কঠিনতা আর ভগবদ্বিষয়ে মনের কোমলতা সম্পাদন করে—

  আচার্য মধুসূদন সরস্বতী ভক্তিরসায়নে বলছেন — কাঠিন্যং বিষয়ে কুর্যাদ্ দ্রবত্বং ভগবৎপদে। উপায়ৈঃ শাস্ত্রনির্দিষ্টৈরনুক্ষণমতো ব...