Showing posts with label "অদ্বৈতবেদান্তে ব্রহ্ম". Show all posts
Showing posts with label "অদ্বৈতবেদান্তে ব্রহ্ম". Show all posts

Sunday, 12 October 2025

তুরীয় ব্রহ্মের স্বরূপঃ-

 


মাণ্ডুক্য উপনিষদে তুরীয় ব্রহ্মতত্ত্বের উপদেশ রয়েছে। দুর্জ্ঞেয় তুরীয় তত্ত্ব বুঝানোর জন্য ওঁকার বা প্রণবকে ব্রহ্মের প্রতীকরূপে কল্পনা করা হয়েছে। ওঁকারের যেমন , , এবং নাদবিন্দু () এই চারটি মাত্রা আছে, সেরূপ ঈশান তুরীয় ব্রহ্মকেও শ্রুতি চতুষ্পাদ বা চতুষ্কল বলে বর্ণনা করেছেন। বিশ্ব, তৈজস প্রাজ্ঞ, এটাই সর্বব্যাপী ব্রহ্মের পাদত্রয়, আর, এই পাদত্রয়ের অতীত ঈশান বা নির্বিশেষ ব্রহ্মই তুরীয়পাদ। প্রণবের দৃষ্টান্তে নাদবিন্দু তুরীয়পাদ। নাদবিন্দু যেমন পৃথগ্ভাবে উচ্চারিত বা ব্যক্ত হতে পারে না, সেরূপ ব্রহ্মের তুরীয়পাদও অবাঙ্মনস্-গোচর, ভাষার সাহায্যে বা মনে মনেও তুরীয় ব্রহ্মের স্বরূপ নিরূপণ করা যায় না। কেবল নিষেধ মুখে 'নেতি নেতি' বলে তুরীয় তত্ত্বের উপদেশ সম্ভব হয়। এইজন্যই শ্রুতি 'নান্তঃপ্রজ্ঞং বহিঃপ্রজ্ঞং' ইত্যাদি বলে তুরীয় তত্ত্বকে বুঝানোর জন্য '' এর বহুল প্রয়োগ করেছেন। অর্থাৎ তুরীয় ঈশান তত্ত্ব বিশ্বও নন, তৈজসও নন, প্রজ্ঞ বা জ্ঞাতাও নন, অপ্রজ্ঞ বা অজ্ঞাতাও নন। তুরীয় অব্যক্ত, অচিন্ত্য, অজ্ঞেয়, অনির্দেশ্য, শান্ত, শিব, অদ্বিতীয়, আত্মা।

অথর্ববেদীয়া মাণ্ডুক্য উপনিষদে বর্ণিত হয়েছে

নান্তঃপ্রজ্ঞং বহিঃপ্রজ্ঞং নোভয়তঃপ্রজ্ঞং প্রজ্ঞানঘনং প্রজ্ঞং নাপ্রজ্ঞম্ অদৃষ্টমব্যবহার্যমগ্রাহ্যমলক্ষণং অচিন্ত্যমব্যপদেশ্যমেকাত্মপ্রত্যয়সারং প্রপঞ্চোপশমং শান্তং শিবমদ্বৈতং চতুর্থং মন্যন্তে আত্মা বিজ্ঞেয়ঃ।।৭।।

বিবেকিগণ চতুর্থকে (তুরীয়কে) মনে করেন যে, তিনি অন্তঃপ্রজ্ঞ তৈজস নন; বহিঃপ্রজ্ঞ বিশ্ব নন; জাগ্রৎ স্বপ্নের মধ্যবর্তী জ্ঞানসম্পন্ন নন; প্রজ্ঞানঘন প্রাজ্ঞ নন; জ্ঞাতা নন; অচেতন নন; পরন্তু চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়ের অবিষয়, ‘এটা অমুকইত্যাকার ব্যবহারের অযোগ্য, কর্ম্মেন্দ্রিয়ের অগ্রাহ্য, অনুমানযোগ্য কোনরূপ চিহ্নরহিত, মানস-চিন্তার অবিষয়, শব্দ দ্বারা নির্দ্দেশের অযোগ্য; কেবলআত্মাইত্যাকার প্রতীতিগম্য, জাগ্রদাদি প্রপঞ্চের উপশম (অর্থাৎ আত্মাতে জাগ্রৎ-স্বপ্নাদি স্থানধর্ম্মেরও অভাব বা প্রতিষেধ) কথিত হচ্ছে, শান্ত (নির্বিকার); মঙ্গলময়, অদ্বৈত অর্থাৎ ভেদ-কল্পনারহিত। তিনিই আত্মা; এবং তিনিই একমাত্র জ্ঞাতব্য পদার্থ।

আমরা আমাদের জাগ্রৎ, স্বপ্ন সুষুপ্তি এই তিন অবস্থায়ই আত্মাকে প্রত্যক্ষ করি। জাগরিত অবস্থায় আমরা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য স্থূল জগৎকে প্রত্যক্ষ করি এবং প্রত্যক্ষের অন্তরালবর্তী বিষয়দ্রষ্টা আত্মাকেও অনুভব করি। এই বিষয়দ্রষ্টা আত্মাই 'স্থূলভুক্' বিশ্ব আত্মা। স্থূল বিষয়সমূহ ভোগ করেন বলে তাকে স্থূলভুক্ বলা হয়। স্বপ্ন অবস্থায় আমাদের ইন্দ্রিয় সকল বাহ্য বিষয় হতে বিরত হয়, তখন কেবল মন ক্রিয়াশীল থাকে। মন যা আমাদের কাছে উপস্থিত করে তাই তখন আমরা প্রত্যক্ষ করে থাকি। এইজন্য স্বপ্নদৃক্ এই আত্মাকে বলা হয়েছে 'প্রবিবিক্তভুক্', প্রবিবিক্ত শব্দের অর্থ স্থূল দৃশ্য বিষয় হতে নিবৃত্ত, কেবল মানস-সঙ্কল্প-জাত; স্বপ্নাবস্থায় মনে যেরূপ সঙ্কল্প বা বাসনার উদয় হবে, আত্মা তদনুরূপই বিষয় ভোগ করবে। এই আত্মা শ্রুতির ভাষায় তৈজস আত্মা অর্থাৎ এই অবস্থায় আত্মা স্থূল শব্দাদি বিষয়কে পরিত্যাগ করে কেবলমাত্র তেজোময় অন্তঃকরণকে দর্শন করে বলে, তাকে তৈজস বলা হয়ে থাকে। সুষুপ্তি অবস্থায় মনও নিষ্ক্রিয় হয়ে বিলীন হয়ে যায়। এখানে আত্মার স্থূল বা সূক্ষ্ম কোনরূপ বিষয় ভোগ্য থাকে না, একমাত্র নিদ্রার আনন্দই সে ভোগ করে। সেজন্য সুষুপ্ত আত্মাকে 'আনন্দভুক্' প্রাজ্ঞ আত্মা বলা হয়। সুষুপ্তি অবস্থায় এই প্রাজ্ঞ আত্মা সচ্চিদানন্দ পরম ব্রহ্মে বিলীন হয়ে তাঁর সাথে সম্পূর্ণ অভিন্ন হয়ে যায়। আনন্দঘন প্রাজ্ঞ আত্মার তখন কোন দ্বৈত বস্তুর জ্ঞান থাকে না। তুরীয় আত্মারও কোন দ্বৈত জ্ঞান নেই। এই বিষয়ে প্রাজ্ঞ তুরীয় উভয় আত্মাই তুল্য, পার্থক্য এই যে, সুষুপ্ত প্রাজ্ঞ আত্মার তমঃ বা নিদ্রারূপ অবিদ্যা-বীজ বর্তমান থাকে, সুতরাং সুষুপ্তি অবস্থা ভেঙ্গে গেলে তাকে আবার মন ইন্দ্রিয়ের বন্ধনে বদ্ধ হয়ে মায়ার চক্রে ঘুরতে হয়।

কিন্তু তুরীয় আত্মা নিত্য প্রকাশ-স্বরূপ। তাঁর কোনরূপ তমঃ বা অজ্ঞান নেই। আত্মার বিশ্ব, তৈজস প্রাজ্ঞ এই পাদত্রয় অজ্ঞান-কল্পিত, একমাত্র তুরীয় ঈশানই অজ্ঞানাতীত এবং নিত্য বোধ স্বরূপ। অনাদি মায়ার ক্রোড়ে সুপ্ত জীব এই তুরীয় নিত্য, জ্ঞানময়, আনন্দঘন আত্মার স্বরূপ বুঝতে পারে না, কিন্তু যখন শাস্ত্র আচার্য উপদেশে তাঁর অজ্ঞান বিদূরিত হয়, বিবেকচক্ষু উন্মীলিত হয় তখনই সে আনন্দময় আত্মাকে উপলব্ধি করে। অবিদ্যাবশতঃই আত্মার বিশ্ব, তৈজস প্রাজ্ঞ প্রভৃতি স্থূল, সূক্ষ্ম বিভাব উৎপন্ন হয়ে থাকে। ব্যষ্টিরূপে যা বিশ্ব, তৈজস প্রাজ্ঞ, সমষ্টিরূপে তাই বৈশ্বানর, হিরণ্যগর্ভ, সূত্রাত্মা, ঈশ্বর অন্তর্যামী বলে প্রসিদ্ধ। বস্তুতঃ সমস্তেরই মূলে রয়েছে সেই অনাদি মায়া। কি ব্যষ্টি, কি সমষ্টি, সমস্ত বিভেদই মায়াকল্পিত। আত্মার যে পাদত্রয়ের কথা বলা হয়েছে তার মধ্যেও বস্তুতঃ কোন ভেদ নেই, এক আত্মাই তিন অবস্থাতে অবস্থাত্রয়ের সাক্ষি-রূপে প্রতিভাত হয়ে থাকেন। যে আমি জেগে থাকি, সেই আমিই স্বপ্ন দেখি এবং সুষুপ্তির আনন্দ অনুভব করি। একই আমি ত্রিবিধ অবস্থার অন্তরালে অবস্থিত আছি। অবস্থাত্রয়ের (জাগ্রৎ, স্বপ্ন সুষুপ্তি) মধ্যবর্তী হয়েও আমি নির্মল, সঙ্গী হয়েও অসঙ্গ, ভোক্তা জীব ভোগ্য জগতের অন্তরে নিত্য বিরাজমান থেকেও প্রপঞ্চাতীত, শুদ্ধ, চিন্ময় এবং আনন্দঘন।

তথ্যসূত্রঃ-

. মাণ্ডুক্য উপনিষৎ, গৌড়পাদীয় কারিকা, ভগবান্ শঙ্করাচার্যের ভাষ্য সমেত, মহামহোপাধ্যায় দুর্গাচরণ সাংখ্যবেদান্ততীর্থ অনূদিত।

. বেদান্তদর্শনঅদ্বৈতবাদ্, প্রথম খণ্ড, কাব্য-ব্যাকরণ-সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ, বিদ্যাবাচস্পতি শ্রীআশুতোষ ভট্টাচার্য শাস্ত্রী।

শ্রীশুভ চৌধুরী

অক্টোবর ১০, শুক্রবার, ২০২৫ খৃষ্টাব্দ।

Wednesday, 13 August 2025

কেন শাস্ত্রে একই ব্রহ্মের সগুণ ও নির্গুণ এই দুই পরস্পর বিরোধী ভাবের পরিচয় দেয়া হয়েছে?

 


উপনিষদে ব্রহ্মের সগুণ নির্গুণ এই দ্বিবিধভাবেরই পরিচয় পাওয়া যায়। এই দুটি বিভাব আলোক অন্ধকারের মত পরস্পর বিরোধী। অদ্বৈতবেদান্তের মতে নির্গুণ নির্বিশেষ ব্রহ্মই সত্য; ব্রহ্মের সগুণভাব মায়িক। স্থূলদর্শী সাধকের উপাসনার সুবিধার জন্য ব্রহ্মের সগুণ ভাবের কল্পনা করা হয়ে থাকে। বিষ্ণুপুরাণে এর স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে

প্রত্যস্তমিতভেদং যৎ সত্তামাত্রমগোচরম্।

বচসামাত্মসংবেদ্যং তজ্জ্ঞানং ব্রহ্ম সংজ্ঞিতম্।।

তচ্চ বিষ্ণোঃ পরং রূপমরূপস্যাজমক্ষরং।

বিশ্বরূপাচ্চ বৈরূপ্যলক্ষণং পরমাত্মনঃ।।

তদ্যোগযুজা শক্যং নৃপ চিন্তয়িতুং যতঃ।

ততঃ স্থূলং হরে রূপং চিন্তয়েদ্ বিশ্বগোচরম্।

-(বিষ্ণুপুরাণ-//৫৩-৫৫)

যা সর্বপ্রকার ভেদসম্পর্করহিত, কেবল সৎস্বরূপ, বাক্যের অগোচর এবং আত্মপ্রত্যয়-বেদ্য, সেই জ্ঞানই ব্রহ্ম নামে পরিচিত। রূপহীন বিষ্ণুর এটাই নিত্য পরমরূপ এবং তা সমস্ত বিশ্বরূপ হতে বিলক্ষণ। প্রথমতঃ যোগী ব্যক্তি সেই পরমরূপ চিন্তা করতে সমর্থ হন না বলেই পরমাত্মা শ্রীহরির স্থূলরূপই চিন্তা করবেন।

আত্মতত্ত্ব অতিশয় দুর্জ্ঞেয়। দুর্জ্ঞেয় বলেই ক্রমে ক্রমে ধাপে ধাপে ভারতীয় দর্শনে স্থূল হতে সূক্ষ্ম, সূক্ষ্ম হতে সূক্ষ্মতর আত্মতত্ত্বের উপদেশ দেওয়া হয়েছে। তৈত্তিরীয় উপনিষদে অন্নময়, মনোময়, প্রাণময়, বিজ্ঞানময় এবং আনন্দময়, এই পাঁচটি আত্মার কোশ বা আবরণ কল্পিত হয়েছে এবং এই স্থূল আবরণগুলো ভেদ করে চরমে আনন্দময় আত্মতত্ত্বে পৌঁছবার উপদেশ করা হয়েছে। ছান্দোগ্য উপনিষদে 'নাম' হতে আরম্ভ করে 'বৈষয়িক সুখ' পর্যন্তকে আত্মরূপে উপদেশ করে, সর্বশেষ ভূমা আত্মার বিশদ বিবরণ প্রদত্ত হয়েছে। উপনিষদের এরূপ উপদেশের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভগবান্ শঙ্করাচার্য বলেছেন যে, এক একখানা করে সিঁড়ি ভেঙ্গে যেমন অভ্রভেদী সৌধের উপরে উঠতে হয়, সেরূপ স্থূল হতে আরম্ভ করলেই ক্রমে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর আত্মরহস্য বুঝতে সমর্থ হবে বিবেচনা করেই, নাম হতে আরম্ভ করে আত্মতত্ত্বের উপদেশ দেওয়া হয়েছে বুঝতে হবে।

ছান্দোগ্যের অষ্টম প্রপাঠকের ভাষ্যে আচার্য শঙ্কর বলেছেন, যাঁরা উত্তম অধিকারী বলে গণ্য হবার যোগ্য তাঁরাই কেবল নির্বিশেষ আত্মতত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন। ব্রহ্ম, এক অদ্বিতীয় পরমার্থ সৎ। নির্বিশেষ ব্রহ্ম অসত্য বস্তুশিষ্যদের এরূপ ভ্রম অপনোদনের জন্য গুণময় ব্রহ্ম উপাস্যরূপে বেদ উপনিষদে উপদিষ্ট হয়েছে। শ্রুতি কল্যাণময়ী জননীর ন্যায় মনে করেন যে, গুণ ধরেই এরা সত্যের পথে আসুক; সাধনার রাজ্যে প্রবেশ করুক। সবিশেষ ব্রহ্মের উপাসনা দ্বারা সৎ পথে আসলে, কর্মসন্ন্যাস বা বৈরাগ্য পরিপাকপ্রাপ্ত হলে, ক্রমে ক্রমে নির্বিশেষ ব্রহ্মের উপদেশ হৃদয়ঙ্গম করতে সমর্থ হবে। যাঁরা কর্মপ্রবণ, ভক্তহৃদয়, গুণে যাঁদের চিত্ত আসক্ত, তাঁদেরকে প্রথমেই নির্বিশেষ, নিষ্প্রপঞ্চ ব্রহ্মোপদেশ করবে না, করলেও তা এঁদের নিকট অসম্ভব বলে বোধ হবে। ঐরূপ নির্বিশেষ আত্মতত্ত্ব এঁরা ধারণায় আনতে পারবে না। বরংচ এঁদের কর্মনিষ্ঠা তা দ্বারা শিথিল হয়ে পড়বে। ফলে, ঐরূপ ব্রহ্মোপদেশের দ্বারা সুফল না হয়ে, কুফলই ফলবে বেশি। সেজন্যই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছেন —' বুদ্ধিভেদং জনয়েদজ্ঞানাং কর্ম্মসঙ্গিনাম্'।। গীতা, ৩।২৬

তথ্যসূত্রঃ-

. বিষ্ণুপুরাণ, পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত।

. ছান্দোগ্য উপনিষদ্ ৮ম প্রপাঠক, শাঙ্করভাষ্য আনন্দগিরি টীকা, দুর্গাচরণ সাংখ্যবেদান্ততীর্থ অনুদিত সম্পাদিত।

. বেদান্তদর্শনঅদ্বৈতবাদ, তৃতীয় খণ্ড, আশুতোষ ভট্টাচার্য শাস্ত্রী বিদ্যাবাচস্পতি।

শ্রীশুভ চৌধুরী

আগস্ট , ২০২৫ খৃষ্টাব্দ।

Tuesday, 11 March 2025

অন্তর্যামীর স্বরূপ—

 


শ্রুতিতে যাজ্ঞবল্ক্য বলছেন"যঃ পৃথিব্যাং তিষ্ঠন্পৃথিব্যা অন্তরো যং পৃথিবী বেদ যস্য পৃথিবী শরীরং যঃ পৃথিবীমন্তরো যময়ত্যেষ আত্মাঽন্তর্যাম্যমৃতঃ॥" -(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-..)

যিনি পৃথিবীতে অবস্থিত পৃথিবীর অভ্যন্তরস্থ এবং পৃথিবী যাকে জানে না; পৃথিবী যার শরীর, এবং যিনি অভ্যন্তরে থেকে পৃথিবীকে পরিচালিত করছেন; তিনিই তোমার জিজ্ঞাসিত অবিনাশী অন্তর্যামী আত্মা।

ভগবান্ ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য এই শ্রুতির ভাষ্যে বলেছেনদেবতার যে, শরীর ইন্দ্রিয়বর্গ, সাক্ষিস্বরূপ ঈশ্বর-সান্নিধ্যই সে সমুদায়ের প্রবৃত্তি নিবৃত্তি ঘটিয়ে থাকে; ঈদৃশ শক্তিসম্পন্ন, নারায়ণনামক যে ঈশ্বর পৃথিবীকেপৃথিবীর দেবতাকে অন্তরে থেকে যথানিয়মে কর্তব্যবিষয়ে নিয়মিত বা পরিচালিত করছেন; তিনি তোমার, আমার এবং সর্বভূতের আত্মা। তিনিই তোমার জিজ্ঞাসিত অন্তর্যামী অমৃত অর্থাৎ জন্মমরণাদি সর্বপ্রকার সংসারধর্ম-বর্জিত অবিনাশী আত্মা।

যিনি জলে, অগ্নিতে, অন্তরিক্ষে, বায়ুতে, দ্যুলোকে, আদিত্যে, চতুর্দিকে, চন্দ্র তারকামণ্ডলে এবং আকাশে অবস্থিত। যিনি তমেআবরণস্বভাব বাহ্য অন্ধকারে, তেজে অর্থাৎ সমস্ত প্রকাশময় বস্তুতে সাধারণতঃ বিদ্যমান তিনিই অন্তর্যামী অমৃতাত্মা। এতক্ষণ অন্তর্যামী বিষয়ে অধিদৈবত অর্থাৎ দেবতা বিষয়ক বিজ্ঞান বলা হল, অতঃপর শ্রুতিতে অধিভূত অর্থাৎ ব্রহ্মাদি স্থাবরান্ত ভূতবিষয়ে অন্তর্যামী-বিজ্ঞান বর্ণিত হচ্ছে"যঃ সর্বেষু ভূতেষু তিষ্ঠন্সর্বেভ্যো ভূতেভ্যোঽন্তরো সর্বাণি ভূতানি বিদুর্যস্য সর্বাণি ভুতানি শরীরং যঃ সর্বাণি ভূতান্যন্তরো যময়ত্যেষ আত্মাঽন্তর্যাম্যমৃত।"-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-..১৫)

যিনি সমস্ত ভূতে আছেন, সমস্ত ভূতের অভ্যন্তর, সমস্ত ভূত যাকে জানে না; সমস্ত ভূত যার শরীর, এবং যিনি সমস্ত ভূতের অভ্যন্তরে থেকে সমস্ত ভূতকে পরিচালিত করেন, তিনি তোমার অন্তর্যামী অবিনাশী আত্মা।

অতঃপর শ্রুতিতে অধ্যাত্ম (দেহ-সম্বন্ধী) অন্তর্যামীর কথা বলা হচ্ছে। যিনি প্রাণে অর্থাৎ প্রাণসংযুক্ত ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে, যিনি বাগিন্দ্রিয়ে, চক্ষুতে, শ্রবণেন্দ্রিয়ে, মনে, ত্বকে, বিজ্ঞানেবুদ্ধিতে, রেতে অর্থাৎ প্রজননে বর্তমান তিনিই অন্তর্যামী অবিনাশী আত্মা।

"আত্মাঽন্তর্যাম্যমৃতোঽদৃষ্টো দ্রষ্টাঽশ্রুতঃ শ্রোতাঽমতো মন্তাঽবিজ্ঞতো বিজ্ঞাতা। নান্যোঽতোঽস্তি দ্রষ্টা নান্যোঽতোঽস্তি শ্রোতা নান্যোঽতোঽস্তি মন্তা নান্যোঽতোঽস্তি বিজ্ঞাতৈষ আত্মাঽন্তর্যাম্যমৃতোঽতোঽন্যদার্তং।"-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-..২৩)

অর্থাৎ তিনি অদৃষ্ট অর্থাৎ চাক্ষুষ দর্শনের বিষয়ীভূত নন, কিন্তু নিজে স্বপ্রকাশস্বরূপে সর্বদা চক্ষুতে বিদ্যমান থাকেন বলে দ্রষ্টা; সেরূপ, অশ্রুত অর্থাৎ শ্রবণেন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত নন, অথচ তাঁর নিজের শ্রবনশক্তি কখনও বিলুপ্ত হয় না; সকল শ্রবণেন্দ্রিয়ে তাঁর সন্নিধান আছে বলে তিনি শ্রোতা। এরূপ তিনি মানসিক সংকল্প বিকল্পের বিষয়ীভূত নন; কারণ, যা চক্ষু দ্বারা দৃষ্ট কিম্বা শ্রবণ দ্বারা শ্রুত হয়, মন তদ্বিষয়েই সংকল্প করতে পারে, কিন্তু অন্তর্যামী যখন অদৃষ্ট এবং অশ্রুত, তখন তদ্বিষয়ে মনের সংকল্প করবার ক্ষমতা নেই; কাজেই তিনি অমত; তাঁর মনন শক্তি কখনও বিলুপ্ত হয় না, এবং নিখিল মনেতেই তাঁর নিত্য সন্নিধান রয়েছে; কারণে তিনি মন্তা (মননকর্তা); সেরূপ তিনি অবিজ্ঞাত, অর্থাৎ বাহ্য রূপরসাদির ন্যায় এবং আন্তর সুখ-দুঃখাদির ন্যায় নিশ্চয়াত্মক জ্ঞানের বিষয়ীভূত হন না, অথচ তাঁর জ্ঞানশক্তি কখনও বিলুপ্ত না হওয়ায় এবং নিরন্তর বিজ্ঞান-ক্ষেত্র বুদ্ধিতে সন্নিহিত থাকায় তিনি নিজে বিজ্ঞাতা।

উক্ত অন্তর্যামীর অতিরিক্ত কোন দ্রষ্টা নেই, এবং এর অতিরিক্ত অপর শ্রোতাও নেই, এর অতিরিক্ত অপর কেউ মন্তামননকর্তা নেই এবং এতদতিরিক্ত আর বিজ্ঞাতাও নেই। যার অতিরিক্ত দ্রষ্টা শ্রোতা মন্তা বিজ্ঞাতা নেই, যিনি স্বয়ং অপরের অদৃষ্ট অথচ দ্রষ্টা; অপরের অশ্রুত অথচ শ্রোতা; অপরের অমত অথচ মন্তা, এবং অন্যের অবিজ্ঞাত হয়েও বিজ্ঞাতা, তিনিই তোমার অন্তর্যামী অমৃত আত্মা। এই অন্তর্যামিসংজ্ঞক আত্মস্বরূপ ঈশ্বরের অতিরিক্ত সমস্ত বস্তুই আর্ত (বিনাশশীল)......

তথ্যসূত্রঃ- ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ ভাষ্য।

শ্রীশুভ চৌধুরী

মার্চ , ২০২৫ খৃষ্টাব্দ।

জ্ঞানী ভোগ্যবিষয়ে মনের কঠিনতা আর ভগবদ্বিষয়ে মনের কোমলতা সম্পাদন করে—

  আচার্য মধুসূদন সরস্বতী ভক্তিরসায়নে বলছেন — কাঠিন্যং বিষয়ে কুর্যাদ্ দ্রবত্বং ভগবৎপদে। উপায়ৈঃ শাস্ত্রনির্দিষ্টৈরনুক্ষণমতো ব...