Showing posts with label "মহাবাক্য". Show all posts
Showing posts with label "মহাবাক্য". Show all posts

Sunday, 14 June 2026

অদ্বৈতবেদান্তোক্ত 'অখণ্ডার্থবোধ' কাকে বলে?

 


বেদ, উপনিষৎ প্রভৃতি অধ্যাত্ম শাস্ত্রমূলে যে তুরীয় ভূমা ব্রহ্মের সাক্ষাৎ অপরোক্ষ পরিচয় পাওয়া যায়, তাকে অদ্বৈতবেদান্তের ভাষায় বলা হয়েছে 'অখণ্ডার্থবোধ'। 'তত্ত্বমসি', 'অহং ব্রহ্মাস্মি', 'অয়মাত্মা ব্রহ্ম' প্রভৃতি বেদান্ত মহাবাক্যের শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসনের ফলে ঐ সকল বাক্যমূলে যে শুদ্ধব্রহ্ম সাক্ষাৎকার উদিত হয়, তাকেই বলে অখণ্ডার্থবোধ বা অখণ্ডব্রহ্মবোধ। এই অখণ্ডার্থতা-বোধের পরিচয় দিতে গিয়ে অদ্বৈতবেদান্তী বলেছেন—বাক্যের সংগঠক পদগুলোর মধ্যে পরস্পর সম্বন্ধ জ্ঞানোদয় না হয়ে, বাক্য হতে সমষ্টিগতভাবে বাক্যের রহস্য হিসেবে যে যথার্থ জ্ঞান উৎপন্ন হয়, তাই 'অখণ্ডার্থবোধ' বলে জানবে। চিৎসুখাচার্য বলেছেন—

"সংসর্গাসঙ্গি সম্যক্ ধীহেতুতা যাগিরামিয়ম্।

উক্তাঽখণ্ডার্থতা যদ্বা তৎপ্রাতিপদিকার্থতা।।"

-(চিৎসুখী, ১ম পরিঃ, ১০৯ পৃঃ, নির্ণয় সাগর সং)

প্রত্যয়ার্থপ্রভৃতির সাথে সম্বন্ধরহিত শব্দার্থের সুনির্দিষ্ট জ্ঞানই এই অখণ্ডার্থতাবোধ। অপর কথায়, যে সকল শব্দ পর্যায়শব্দ নয়, এরূপ শব্দসমষ্টি হতে প্রতিটি শব্দের, শব্দার্থের এবং ওদের অন্তরালবর্তী পরস্পর সম্বন্ধের জ্ঞানোদয় না হয়ে, অর্থাৎ খণ্ডবাক্যার্থের বোধ না হয়ে, সামগ্রিকভাবে বাক্য হতে যে নির্বিকল্প জ্ঞানোদয় হয়, তাকেই বলে অখণ্ডার্থতাবোধ বা অখণ্ডবোধ। আচার্য মধুসূদন সরস্বতী অদ্বৈতসিদ্ধিতে বলেছেন—

"অপর্যায়শব্দানাং সংসর্গাগোচরপ্রমিতিজনকত্বং বা তেষামেকপ্রাতিপাদিকার্থমাত্রপর্যবসায়িত্বং বা অখণ্ডার্থত্বম্।"-(অদ্বৈতসিদ্ধি ৬৬৩ পৃষ্ঠা, নির্ণয় সাগর সং).....

তথ্যসূত্রঃ- বেদান্তদর্শন—অদ্বৈতবাদ, তৃতীয় খণ্ড, কাব্য-ব্যাকরণ-সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ, বিদ্যাবাচস্পতি শ্রীআশুতোষ ভট্টাচার্য শাস্ত্রী।

শ্রীশুভ চৌধুরী

মে ১৫, ২০২৬ খৃষ্টাব্দ। See less

Thursday, 13 May 2021

বেদান্তে মহাবাক্য 'তত্ত্বমসি'-

 


রামগীতায় বেদান্তের 'তত্ত্বমসি' মহাবাক্যের মর্মার্থ-"শ্রদ্ধার সঙ্গে শুদ্ধচিত্ত হয়ে শ্রীগুরুর কৃপায় শ্রুতিবাক্য 'তত্ত্বমসি'র মর্মার্থ জেনে জীবাত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে অভেদ বুঝতে পারলে, দেখবে তুমি পরম আনন্দে সুমেরুর মত অচঞ্চল হয়ে গেছ। বাক্যের অর্থ সঠিকভাবে জানতে গেলে পদের অর্থ আগে জানা দরকার। "তত্ত্বমসি"-এই শ্রুতি বাক্যের মধ্যে রয়েছে তিনটি পদ- 'তৎ', 'ত্বং' আর 'অসি'। 'তৎ' পদের অর্থ-পরমাত্মা, 'ত্বং' পদের অর্থ জীব; 'অসি' পদ দিয়ে দুইয়ের মধ্যে যে অভেদ তা বলা হয়েছে।"-(অধ্যাত্ম-রামায়ণ, উত্তরকাণ্ড, পঞ্চম সর্গ, রামগীতা-২৪,২৫)

এখন আলোচ্য বিষয় সামবেদীয় মহাবাক্য 'তত্ত্বমসি' অর্থাৎ 'তুমিই সেই সৎপদার্থ'। ছান্দোগ্য উপনিষদে ইহার উল্লেখ পাওয়া যায়-

স য এষোহণিমৈতদাত্ম্যমিদং সর্বং তৎ সত্যং স আত্মা তত্ত্বমসি শ্বেতোকেতো ইতি ভূয় এব মা ভগবান্ বিজ্ঞাপয়ত্বিতি তথা সোম্যেতি হোবাচ।-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।৮।৭)

ভগবৎপাদ্ শ্রী শঙ্করাচার্যের 'শাঙ্করভাষ্য' অনুসারে ভাবার্থঃ- সেই যে এই সৎসংজ্ঞক অণিমা অর্থাৎ অতি সূক্ষ্ম ভাবকে জগতের মূল বলে উক্ত হয়েছে, সমস্ত জগৎই এতদাত্মক – এই সৎপদার্থই যাদের আত্মা, তারাই এতদাত্ম, সেই এতদাত্মের ভাব বা ধর্ম ঐতদাত্ম্য। এ দ্বারা বলা হলো যে – পরিদৃশ্যমান এই সমস্ত জগৎ এই সৎসংজ্ঞক পরমাত্মা দ্বারাই আত্মবান্ অর্থাৎ সত্তাবান্ বা সৎ, এ ব্যতীত এর আর অন্য কোন সংসারী আত্মা নাই। এ বিষয়ে অপর কোন শ্রুতি বলেছেন, “এ ভিন্ন অপর কোন দ্রষ্টা নাই, এ ভিন্ন অপর কোন শ্রোতা নাই" ইত্যাদি। পরিদৃশ্যমান এই সমস্ত জগৎ যে আত্মা দ্বারা আত্মবান্ , সৎসংজ্ঞক সেই কারণটিই সত্য অর্থাৎ বাস্তবিক সৎ ; অতএব তাই জগতের আত্মা, তিনিই প্রত্যক্ষস্বরূপ অর্থাৎ জীবরূপী যথার্থ তত্ত্ব, যেহেতু উপপদশূন্য আত্ম শব্দটি অর্থাৎ যা দ্বারা অন্য অর্থ বুঝতে পারে, এমন কোন উপসর্গ যে আত্মশব্দের পূর্বে নাই, ( যেমন- পরমাত্মা, বিশ্বাত্মা ইত্যাদি ) গো প্রভৃতি শব্দের ন্যায় তা প্রত্যগাত্মা অর্থাৎ জীবাত্মা অর্থেই প্রসিদ্ধ; অতএব হে শ্বেতকেতু! তুমিও সেই সৎপদার্থই বটে।

পিতা এইরূপে সৎপদার্থ বিষয়ে শ্বেতকেতুর উৎপাদন করলে তদনন্তর শ্বেতকেতু বলেছিলেন – ভগবান্ , আপনি আমাকে পুনরায় এ বিষয়ে বিশেষ করে উপদেশ দান করুন, কারণ আপনি যে বলেছিলেন– প্রাণীসমূহ সুষুপ্তিকালে প্রত্যহই সৎস্বরূপ সম্পন্ন হয়, তারা সৎসম্পন্ন হয়েও বুঝতে পারে না যে, আমরা সৎসম্পন্ন হয়েছি। এ বিষয়ে আমার এখনো সন্দেহ রয়েছে; অতএব দৃষ্টান্ত দ্বারা আমাকে এ বিষয়ে ভালো করে বুঝিয়ে দিন। শ্বেতকেতুর এইরূপ বললে পিতা বলেছিলেন, হে সৌম্য! আচ্ছা তাই হোক ||৭||...............................

এই বিষয়ে ভগবান ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য ছান্দোগ্যের ৬।১৬।৩ শ্রুতির ভাষ্যে বিস্তৃত ব্যাখ্যা করছেন-

এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে, ত্বম্ পদবাচ্য এই শ্বেতকেতু কে? উত্তর হল যিনি আমি উদ্দালকপুত্র শ্বেতকেতু বলে আপনাকে জেনেছিলেন, এবং উপদেশ শ্রবন করে, মনন করে এবং বিশেষরূপে অনুভব করে অশ্রুত, অমত ও অবিজ্ঞাত বিষয়সমূহ জানবার নিমিত্ত পিতাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন,– ‘ভগবান, সেরূপ আদেশ কিরূপে হতে পারে।’ ইতি। সেই এই অধিকারী শ্রোতা, মন্তা, বিজ্ঞাতা (শ্বেতকেতু অপুর কিছুই নয়, পরব্ধ) দর্পণে প্রতিবিম্বিত পুরুষের ন্যায়, এবং জলাদিতে প্রতিবিম্বিত সূর্য্যাদির ন্যায়, নাম রূপ প্রকটীকরণার্থ তেজঃ, জল ও অন্নময় কার্য-কারণাত্মক দেহে প্রবিষ্ট পরা দেবতাই (পরমাত্মাই) (অন্য কিছু নয় )।

কিন্তু তা হলেও পিতার উপদেশ শ্রবনের পূর্বে সে আত্মাকে কার্য-কারণসঙ্ঘাতাত্মক দেহ হতে সম্পূর্ণ পৃথক সৎস্বরূপ সর্বাত্মক বলে জানত না। অনন্তর পিতা, এখন দৃষ্টান্ত ও যুক্তি দ্বারা ‘তুমি সেই ব্রহ্ম’ (তত্ত্বমসি) উত্তমরূপে বুঝিয়ে দিলে পর, পিতার উপদেশ প্রাপ্ত হয় – বিশেষরূপে বুঝেছিলেন যে , ‘আমি সৎ ব্রহ্মস্বরূপই' বটে। ...............

“তত্ত্বমসি" এই মহাবাক্য অসত্য বিকারাত্মক দেহাদিতে অধিকারী জীবেরই আত্মবুদ্ধি নির্বত্তক। শঙ্করশিষ্য সুরেশ্বরাচার্য 'নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধিঃ'তে বলছেন-"এইরূপ পুরুষ যখন 'তত্ত্বমসি' প্রভৃতি বাক্য হতে 'আমি ব্রহ্ম' এই জ্ঞান লাভ করেন, তখন 'আমি' ও আমার ভাব দূরীকৃত হওয়ায় তিনি বাক্য ও মনের অতীত অর্থাৎ সর্বব্যবহারাতীত হন। 'তত্ত্বমসি' বাক্যে তৎ পদ প্রকরণোক্ত অদ্বিতীয় ব্রহ্মপর এবং ত্বং-পদ (উদ্দেশ্য) প্রত্যাগাত্মাতে বর্ত্তমান। এই দুইটী পদ নীলোৎপলের ন্যায় (পরস্পর নিয়ম্যনিয়ামকভাবে অবস্থিত থাকিয়া বিধেয় ব্রহ্মভাববশতঃ প্রত্যাগাত্মাতে) দুঃখিত্বের ব্যাবৃত্তি (নিষেধ) করে এবং অনাত্মত্বের ব্যবৃত্তি করে।"-(নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধিঃ, তৃতীয় অধ্যায়-২,৩)

ভগবান শঙ্করাচার্য 'তত্ত্বোপদেশ' নামক প্রকরণ গ্রন্থে 'তত্ত্বমসি'(তৎ, ত্বম্, অসি) এই শ্রুতিবাক্যের তৎ ও ত্বং পদের প্রতিপাদ্য পদার্থের শোধনের নিমিত্ত বলছেন-

"যে যুক্তি দ্বারা তত্ত্বামস্যাদি বেদবাক্য ব্রহ্মে প্রমাণ বলে নিরূপিত হয়েছে, সে যুক্তি হল-ত্বং পদার্থ শোধিত হলে 'তত্ত্বমস্যদি' বাক্যের চিন্তা (বিচার) সম্ভব অন্যথা নয়। যিনি মিথ্যাভূত দেহ, ইন্দ্রিয় প্রভৃতির ধর্ম্ম আত্মাতে আরোপিত করে কর্ত্তৃত্ব, ভোক্তৃত্ব প্রভৃতির অভিমানী হন, তিনিই 'ত্বং' পদের বাচ্যার্থ। যিনি দেহ ইন্দ্রিয় প্রভৃতির সাক্ষী, দেহ ইন্দ্রিয় প্রভৃতি হইতে বিলক্ষণ-ভাবে (পৃথকভাবে) প্রকাশ পান, স্বয়ং জ্ঞানস্বরূপ তিনিই 'ত্বং' পদের লক্ষ্যার্থ। যিনি একমাত্র বেদান্তবাক্যের দ্বারা জ্ঞেয়, যিনি বিশ্বের অতীত, অবিনাশী, অদ্বিতীয় ও বিশুদ্ধ, যিনি স্বয়ং প্রকাশ, তিনিই 'তৎ' পদের লক্ষ্যার্থ।"-(তত্ত্বোপদেশ ২১-২৫)

'তৎ' পদার্থের বাচ্যার্থ যে স্বগুণ ঈশ্বর তাহা ভগবান শঙ্করাচার্য পরবর্তীতে ৪১ শ্লোকে বলছেন-" তত্ত্বমসি এই শ্রুতিতে কিরূপ লক্ষণা হবে তা শ্রবণ কর-ত্বং পদ প্রতিপাদ্য জীবধর্ম প্রত্যক্ত প্রভৃতিকে ত্যাগ করিয়া এবং তৎ পদ প্রতিপাদ্য সর্বজ্ঞত্ব ও পরোক্ষত্ব-প্রভৃতি ধর্ম ত্যাগ করে শ্রুতি আদর পূর্বক কেবল শুদ্ধ, কূটস্থ অদ্বৈত বস্তুকে বুঝাচ্ছে।-(তত্ত্বোপদেশ ৪০-৪১)

অর্থাৎ 'তৎ' পদার্থের লক্ষ্যার্থ কেবল চৈতন্য। সদানন্দযোগীন্দ্র সরস্বতী 'বেদান্ত সার'এ তাই বলছেন-"এবং ঐ সকল উপাধি ও উপহিতের আধারস্বরূপ কেবল চৈতন্য 'তৎ' পদের লক্ষ্যার্থ।"-(বেদান্তসার-১৪৫)

সদানন্দযোগীন্দ্র সরস্বতী আরো বলছেন-" এই 'তৎ ত্বম্ অসি' বাক্যটি তিনপ্রকার সম্বন্ধের দ্বারা অখণ্ড অর্থের জ্ঞাপক হয়। সমন্ধত্রয় হল-পদদ্বয়ের সামানাধিকরণ্য, পদার্থ দুইটীর বিশেষণ-বিশেষ্যভাব, পদার্থ দুইটী ও প্রত্যাগাত্মার লক্ষ্য-লক্ষণভাব সম্বন্ধ।"-(বেদান্তসার-১৪৮, ১৪৯)

স্বয়ং আচার্য শঙ্কর 'তত্ত্বোপদেশ' এ তাহা স্পষ্ট করছেন-" 'তত্ত্বমসি' মহাবাক্যে 'তৎ' ও 'তম্'-এই দুইটীপদের সামানাধিকরণ্য-রূপ সম্বন্ধ, অতএব বেদান্ত বাক্য সমূহের জীব ও ব্রহ্মের ঐক্য প্রতিপাদিত হচ্ছে। যে স্থলে দুটী পদ বিভিন্নরূপে একটীবস্তুর প্রতিপাদক হয়, তাদৃশ সমান বিভক্তিযুক্ত একার্থ প্রতিপাদক পদদ্বয়কে সমানাধিরণ বলে, তাহাদের সম্বন্ধই সামানাধিকরণ্য। ইহা বেদান্ত সম্প্রদায়িগণ কর্ত্তৃক উক্ত হয়েছে। সেইরূপ পদার্থ দ্বয়ের মধ্যে বিশেষ্যবিশেষণতারূপ সম্বন্ধ আছে। 'অয়ং সঃ' এবং 'সোহয়ং'-এই দুইবাক্যে যেমন একবার 'অয়ং' পদার্থটী বিশেষ্য ও 'সঃ' পদার্থটী বিশেষণ এবং অন্যবার 'সঃ' পদার্থটী বিশেষ্য ও 'অয়ং' পদর্থটী বিশেষণ হয়, তদ্রূপ 'তৎ' ও 'ত্বং' পদার্থদ্বয় মধ্যে বিশেষ্যবিশেষণতারূপ সম্বন্ধ হয়ে থাকে। আর 'তৎ' ও 'ত্বং' পদার্থের পরোক্ষত্ব ও প্রত্যকত্ব এবং পূর্ণতা ও স্বদ্বিতীয়ত্ব পরস্পর বিরুদ্ধধর্ম, অতএব তৎ ও ত্বং পদার্থের ঐক্য প্রদর্শন করতে হলে 'তৎ' ও 'ত্বং' পদের অর্থ লক্ষণা করতে হয়। এইরূপ পদের বাচ্যার্থ অর্থাৎ 'তৎ' ও 'ত্বং' পদপ্রতিপাদ্য বস্তু ও প্রত্যাগাত্মার মধ্যে লক্ষ্যলক্ষণভাবরূপ সম্বন্ধ। তৎত্বংপদের যা প্রতিপাদ্য বা বাচ্যার্থ তা লক্ষণ ও প্রত্যাগাত্মা লক্ষ্য।"- (তত্ত্বোপদেশ ২৬-৩০)

বিদ্যারণ্য স্বামী 'পঞ্চদশী'র মহাবাক্য-বিবেক প্রকরণে এক সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত করছেন এইভাবে-"সৃষ্টির পূর্বে এক অদ্বিতীয় নামরূপবিবর্জিত যে সৎ ছিলেন, সৃষ্টির পরেও সেই সৎ যে সেই অবস্থায়ই রয়েছেন-তা 'তৎ' এই পদ দ্বারা লক্ষিত হয়েছে। শ্রোতার দেহেন্দ্রিয়াতিরিক্ত যে সত্তা তিনি এস্থলে 'ত্বম্' পদদ্বারা সূচিত হয়েছেন। 'অসি' এই পদ দ্বারা একতা বুঝাচ্ছে। সেই একতা অনুভব করতে হবে।"-(পঞ্চদশী, মহাবাক্যবিবেক-প্রকরণ-৫,৬)

অর্থাৎ 'তত্ত্বমসি' এই শ্রুতিবাক্য তৎ ও ত্বং পদের ঐক্য সম্যগরূপে বুঝাচ্ছে। এরূপ ঐক্য জ্ঞান উৎপন্ন হলে যুক্তির দ্বারা দৃঢ় সম্যক্ জ্ঞান হয়। যাঁর 'অহং ব্রহ্ম' অর্থাৎ 'আমি ব্রহ্ম' এইরূপ জ্ঞান উদিত হয় তিনি শোকরূপ সংসার হতে উত্তীর্ণ হন, ইহাই আচার্য শঙ্করের বেদান্ত তত্ত্বোপদেশ।

 

Monday, 10 May 2021

বেদান্তে মহাবাক্য 'অহং ব্রহ্মাস্মি'-


ইতোমধ্যে বেদের চতুর্মহাবাক্যের মধ্যে ‘অয়মাত্মা ব্রহ্ম’ ও ‘প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম’ আচার্য শঙ্করের ভাষ্যসমেত আলোচনা করিয়াছি। এক্ষণে যজুর্বেদীয়া মহাবাক্য 'অহং ব্রহ্মাস্মি' অর্থাৎ 'আমিই ব্রহ্ম' হইল আলোচ্য বিষয়। ইহা

কাণ্বশাখীয় শুক্লযজুর্বেদের অন্তর্গত শতপথ ব্রাহ্মণের শেষাংশ বৃহদারণ্যক উপনিষদে বর্ণিত আছে-

ব্রহ্ম কোন জ্ঞানের ফলে সর্বাত্মক হইলেন? এই প্রশ্নের সর্ব্বদোষবর্জিত উত্তর এই-

ব্রহ্ম বা ইদমগ্র আসীত্তদাত্মানমেবাবেৎ। অহং ব্রহ্মাস্মীতি। তস্মাৎ তৎ সর্বমভবৎ তদ্ যো যো দেবানাং প্রত্যবুধ্যত স এব তদভবৎ তথর্ষীণাং তথা মনুষ্যাণাং তদ্বৈতৎ পশ্যন্নৃষির্বামদেবঃ প্রতিপেদেহহং মনুরভবং সূর্যশ্চেতি। তদিদমপ্যেতর্হি য এবং বেদাহং ব্রহ্মাস্মীতি স ইদং সর্বং ভবতি...........(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-১।৪।১০)

ভগবৎপূজ্যপাদ্ আচার্য শঙ্করের 'শাঙ্করভাষ্য' অনুসারে ভাবার্থঃ- 'ব্রহ্ম বা ইদমগ্র আসীৎ' এই ব্রহ্ম শব্দে অপর ব্রহ্ম অর্থাৎ কার্য্য ব্রহ্ম বুঝিতে হইবে; কেননা সর্বাত্মভাবপ্রাপ্তি যখন ক্রিয়াসাধ্য, তখন তাঁহার সম্বন্ধেই ঐরূপ ফল প্রাপ্তির কথা উপপন্ন হয়। কিন্তু পরব্রহ্মের যে সর্ব্বাত্মভাব , তাহা কোন ক্রিয়া দ্বারা নিষ্পন্ন নহে, তাহা তাঁহার স্বাভাবিক।....

'ইদ' অর্থ-শরীর মধ্যস্থরূপে যাহা গৃহীত হয়, অর্থাৎ দেহমধ্যে যে জগৎস্রষ্টা ব্রহ্ম প্রবেশ করিয়া জীবরূপে অনুভূত হইতেছেন; এখানে তিনিই ব্রহ্ম শব্দের অর্থ। শ্রুতির 'বৈ' শব্দের অর্থ- অবধারণ, অগ্রে অর্থাৎ জ্ঞানোদয়ের পূর্ব্বে, সেই সময়েও এই সমস্ত ব্রহ্মস্বরূপই ছিল; কিন্তু প্রতিবোধ বা সম্যক্ জ্ঞানের অভাবে অব্রহ্মভাব ও অসর্ব্বত্ব অধ্যারোপিত হওয়ায় -'আমি কর্ত্তা, ক্রিয়া সম্পন্ন এবং স্বকৃত ক্রিয়া ফলের ভোক্তা, সুখী, দুঃখী ও সংসারী' ইত্যাদি ভাবনিচয় আত্মাতে অধ্যারোপিত করিয়া থাকে; প্রকৃতপক্ষে কিন্তু তৎকালেও কর্ত্তৃত্বভোক্তৃত্বাদির বিপরীত ব্রহ্মস্বরূপই এবং সর্ব্বাত্মকই ছিল। দয়ালু আচার্য্য কোনরকমে বুঝাইয়া দিলেন যে.'তুমি সংসারী নহে''; শিষ্য সেই প্রতিবোধের ফলে স্বাভাবিক আত্মস্বরূপ উপলব্ধি করিয়াছিলেন। শ্রুতির 'এব' শব্দের অভিপ্রায় এই যে, তিনি যাহা জানিয়াছিলেন তাহাতে কোনপ্রকার অবিদ্যাসমারোপিত বিশেষ ধর্ম্মের সম্বন্ধ ছিল না।.....

তিনি কি প্রকারে জানিয়াছিলেন, তাহা বলিতেছেন-"আমি দৃষ্টির দ্রষ্টা আত্মা-ব্রহ্মস্বরূপ"। এখানে ব্রহ্ম অর্থ-যাহা সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষস্বরূপ সর্ব্বান্তর অশনায়াদির অতীত "নেতি নেতি" শ্রুতিপ্রতিপাদ্য এবং অস্থূল ও অনণু ইত্যাদি প্রকারে সর্ব্বজগৎ বিলক্ষণ; সেই ব্রহ্মই আমি, কিন্তু আপনি যেরূপ বলিতেছেন, আমি বস্তুঃত সেইরূপ ব্রহ্মাতিরিক্ত স্বতন্ত্র সংসারী নহি। অতএব, এবংবিধ জ্ঞানের প্রভাবে সেই ব্রহ্ম সর্ব্বাত্মক হইয়াছিলেন, অর্থাৎ আরোপিত অব্রহ্মভাব ও অসর্ব্বভাব নিবৃত্তি করিয়া সর্ব্বাত্মভাবাপন্ন হইয়াছিলেন।

এইজগতে দেবগণের মধ্যে যিনি যিনি প্রতিবুদ্ধ হইয়াছিলেন অর্থাৎ যথোক্ত বিধানে আত্মস্বরূপ জানিয়াছিলেন, প্রতিবুদ্ধ সেই সেই আত্মাই ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন; এইরূপ ঋষিগণের মধ্যে এবং মনুষ্যগণের মধ্যেও হইয়াছিল।

(এইখানে যে দেবমনুষ্যাদি বিভাগের উক্তি করা হইয়াছে, তাহা কেবল লৌকিক ব্যবহার অনুযায়ী মাত্র, কিন্তু ব্রহ্মজ্ঞানানুসারে নহে; কেননা, "পুরঃ পুরষ আবিশৎ" এই সকল শ্রুতি অনুসারে ব্রহ্মই যে সর্বত্র অনুস্যূত আছেন একথা পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। শ্রুতিতে যে 'দেবানাম' ইত্যাদি ভেদোল্লেখ করা হইয়াছে, তাহা কেবল শরীরাদি-উপাধিকৃত লোকপ্রতীতির অনুযায়ী মাত্র; প্রকৃতপক্ষে কিন্তু বিজ্ঞানলাভের পূর্ব্বেও সেই সমস্ত দেবাদি শরীরেও ব্রহ্ম বিদ্যমানই ছিলেন, কেবল বুদ্ধিদোষে অন্য প্রকার প্রতীতি হইত মাত্র। পরে তিনি আত্মাকে উপলব্ধি করিয়াছিলেন এবং সেই জ্ঞানপ্রভাবেই সর্ব্বাত্মভাব লাভ করিয়াছিলেন।)

এই ব্রহ্মবিদ্যা হইতে যে সর্ব্বভাবপ্রাপ্তিরূপ ফল লাভ হয়, এইকথার দৃঢ়তা সম্পাদনার্থ শ্রুতি নিজেই মন্ত্রসমূহের উল্লেখ করিতেছেন- বামদেব নামক ঋষি-'আমি হইতেছি এই ব্রহ্মস্বরূপ' এই প্রকার আত্মদর্শন লাভ করত অর্থাৎ এইরূপ ব্রহ্মদর্শনের ফলে তৎক্ষণেই আপনার সর্ব্বাত্মভাব বুঝিয়াছিলেন অর্থাৎ তিনি উক্ত ব্রহ্মদর্শনে অবস্থিত হইয়া এইসমস্ত মন্ত্রার্থ দর্শন করিয়াছিলেন-'আমিই মনু ও সূর্য্য হইয়াছিলাম' ইত্যাদি।

ব্রহ্মবিদ্যার ফল যে সর্ব্বভাবপ্রাপ্তি ইহা মহাবীর্য্যশালী দেবতা, ঋষ্যাদির ক্ষেত্রে সম্ভবপর হইয়াছিল, কিন্তু ইহা বর্ত্তমানযুগের হীনবীর্য্য অল্পশক্তিসম্পন্ন মনুষ্যের জন্য সম্ভবপর নহে, এইরূপ আশঙ্কা মনে জাগিতে পারে, ইহা অপনোদনের জন্য বলিতেছেন-দর্শনাদি ক্রিয়ানুমিত এই যে সর্ব্বভূতানুপ্রবিষ্ট ব্রহ্মের কথা বলা হইল, তাহা বর্ত্তমান সময়েও যেকোন লোক বাহ্যবিষয়ে আসক্তি পরিত্যাগপূর্ব্বক 'আমি উক্ত ব্রহ্মস্বরূপ' এই বলিয়া আত্মাকে জানেন। উপাধিসম্বন্ধজনিত ভ্রান্তিজ্ঞানের ফলে যে সমূদয় বিশেষধর্ম্ম আরোপিত হইয়াছিল, সে সমস্ত অপনীত করিয়া, আমি নিশ্চয়ই সংসারধর্ম্মে অসংস্পৃষ্ট এবং আমি সেই বাহ্যাভ্যন্তরভাবরহিত ব্রহ্মস্বরূপ, এইরূপ আত্মোপলব্ধি করেন, ব্রহ্মবিজ্ঞানে অবিদ্যাকৃত অসর্ব্বত্বভ্রান্তি নিবৃত্ত হইয়া যাওয়াই তিনিও উক্ত সর্ব্বভাবাপন্ন হইতে পারেন। কারণ, মহাশক্তিসম্পন্ন বামদেব প্রভৃতিতে কিংবা বর্ত্তমানকালীন হীনবীর্য্য মনুষ্যেতে ব্রহ্ম বা ব্রহ্মবিজ্ঞানের কিঞ্চিন্মাত্রও তারতম্য ঘটে নাই, অর্থাৎ ব্রহ্ম ও ব্রহ্মবিদ্যা সকলের পক্ষেই চিরদিন সমান আছে।.................................

পূজ্যপাদ্ বিদ্যারণ্য স্বামী 'পঞ্চদশীতে' 'অহম্ ব্রহ্মাস্মি' মহাবাক্যের অর্থ খুব সুন্দর করে উপস্থাপন করিতেছেন-

"পরিপূর্ণ পরমাত্মা এই মায়াময় জগতে বিদ্যালাভযোগ্য মনুষ্যাদি দেহে বুদ্ধির সাক্ষিরূপে অবস্থিত থাকিয়া প্রকাশমান রহিয়াছেন। তিনিই 'অহম্' শব্দের দ্বারা উপলক্ষিত হইতেছেন। স্বভাবতঃ পূর্ণ পরমাত্মা এইস্থলে 'ব্রহ্ম' শব্দের দ্বারা বর্ণিত হইয়াছেন। 'অস্মি' শব্দ অহম্ শব্দবাচ্য চৈতন্যের সহিত ব্রহ্মচৈতন্যের একতা বুঝাইতেছে। সেইকারণে 'আমি ব্রহ্ম' এই অর্থ সিদ্ধ হইল।" -(পঞ্চদশী, মহাবাক্যবিবেক-প্রকরণ-৩,৪)

Saturday, 1 August 2020

বেদান্তের মহাবাক্য ‘অয়মাত্মা ব্রহ্ম’-


শ্রুতিতে চতুর্মহাবাক্যের মধ্যে অথর্ববেদীয়া মহাবাক্য হল ‘অয়মাত্মা ব্রহ্ম’ অর্থাৎ আত্মাই ব্রহ্ম। মাণ্ডুক্য উপনিষদের প্রারম্ভে আগম প্রকরণের আলোচ্য বিষয় হইল ওঙ্কারের সর্ব্বাত্মকতা প্রতিপাদন। যথা-

ॐ ইত্যেতদক্ষরমিদঁ সর্বং তস্যোপব্যাখ্যানং

ভূতং ভবদ্ ভবিষ্যদিতি সর্বমোঙ্কার এব

যচ্চান্যত্ ত্রিকালাতীতং তদপ্যোঙ্কার এব .. ১..

শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ-পরমহংস পরিব্রাজক ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের ভাষ্য হইল- ওঙ্কারের তত্ত্বনির্ণয়ই যে আত্মতত্ত্ববোধের উপায়, তাহা জানা যায় কিরূপে?

ওঙ্কারের তত্ত্বনির্ণয়ই যে আত্মতত্ত্ববোধের উপায়, তাহা জানা যায় কিরূপে? হ্যাঁ বলা হইতেছে এই 'ওঙ্কারই শ্রেষ্ঠ আলম্বন (ধ্যেয়)', 'হে সত্যকাম এই যে ওঙ্কার, ইহাই পর ও অপর ব্রহ্ম; সেইজন্য ওঙ্কারবিৎ পুরুষ এই ওঙ্কার আলম্বন দ্বারা (উত্তরায়ণ ও দক্ষিণানায়নের মধ্যে) একটিকে প্রাপ্ত হন।' 'আত্মাকে ॐ ইত্যাকারে চিন্তা করিবে।' 'ওঙ্কারই ব্রহ্ম', 'ওঙ্কারই এই সমস্ত' ইত্যাদি শ্রুতি হইতে তাহা জানা যায়। রজ্জু প্রভৃতি সত্য পদার্থ যেমন সর্পাদি-বিতর্কের আশ্রয়, তেমনি যথার্থ সত্য অদ্বিতীয় আত্মাই প্রাণাদি বিভিন্ন কল্পিত ভাবের আশ্রয়। উক্ত দৃষ্টান্তটি যেরূপ ঠিক, সেইরূপই আত্মাতে প্রাণাদি বিকল্পবুদ্ধির বিষয়ীভূত সমস্ত বাক্-প্রপঞ্চ বা শব্দরাশিও ওঙ্কারস্বরূপই, সেই ওঙ্কারও আবার নিশ্চয়ই আত্মস্বরূপ; কেননা ওঙ্কারই আত্মার অভিধায়ক বা প্রতিপাদক। শব্দমাত্রই ওঙ্কার বিকার (অর্থাৎ ওঙ্কার হইতে উৎপন্ন), সেই শব্দের অভিদেয় প্রাণাদি পদার্থমাত্রই আত্ম-বিকল্প (আত্মাতে কল্পিত); সুতরাং সে সকলের শব্দাতিরিক্ত সত্তাই নাই। 'বিকার মাত্রই বাক্যারব্ধ নাম মাত্র।' 'এই ব্রহ্মসম্বন্ধী এই সমস্ত জগৎই বাক্যরূপ দীর্ঘসূত্রময় নামরূপ রজ্জু দ্বারা আবদ্ধ।' এই সমস্তই নামে স্থিত; ইত্যাদি শ্রুতি হইতে প্রমাণিত হয়। এইজন্য বলিতেছেন-

এই যে অভিধেয়রূপ (বাক্যার্থ-স্বরূপ) বিষয়সমূহ, যেহেতু তাহা স্বীয় অভিধান বা বাচক শব্দ হইতে অতিরিক্ত নহে, এবং যেহেতু বাচকশব্দমাত্রই ওঙ্কার হইতে অনতিরিক্ত; অতএব ওঙ্কারই এই দৃশ্যমান সমস্ত পদার্থ। বাচ্য-বাচক সম্বন্ধ হইতেই পরব্রহ্মের প্রতীতি হইয়া থাকে; সুতরাং তাহাও ওঙ্কার স্বরূপই বটে। পর ও অপরব্রহ্ম স্বরূপ সেই ॐ এই অক্ষরের উপব্যাখ্যান অর্থাৎ ইহাই ব্রহ্মপ্রতীতির উপায়স্বরূপ; অতএব ব্রহ্মসন্নিহিতরূপে স্পষ্টাক্ষরে প্রকৃষ্টরূপে কথনরূপ (বর্ণনাত্মক) ইহার উপব্যাখ্যান আরব্ধ হইতেছে, বুঝিতে হইবে। পূর্বোক্ত যুক্তি অনুসারে বুঝিতে হইবে ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্ত্তমান, এই কালত্রয়বর্ত্তী যেকোন বস্তু, তাহাও ওঙ্কারস্বরূপই। এতদতিরিক্ত প্রকৃতি প্রভৃতি যে সমস্ত পদার্থ উক্তকালত্রয় দ্বারা পরিচ্ছেদ যোগ্য নহে, অথচ কার্য্য-গম্য-মাত্র (কার্য্য-দর্শনে অনুমেয় মাত্র), তাহাও এই ওঙ্কার হইতে অতিরিক্ত নহে।১

পরবর্তীতে সেই ব্রহ্মের সর্ব্বাত্মকতা, আত্মস্বরূপতা বিষয়ক শ্রুতি মহাবাক্যটীর উল্লেখ রহিয়াছে-

‘সর্বম্ হ্যেতদ্ ব্রহ্ম, অয়মাত্মা ব্রহ্ম,........'।২

শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ-এই সমস্তই ব্রহ্মস্বরূপ, অর্থাৎ যে সমস্তকে ওঙ্করাত্মক বলা হইয়াছে, সেই সমস্তই ব্রহ্মস্বরূপ। সেই ব্রহ্মকে ইতঃপূর্ব্বে পরোক্ষভাবে নির্দ্দেশ করা হইয়াছে, এখন আবার সাক্ষাৎ সম্বন্ধে বিশেষ করিয়া নির্দ্দেশ করিয়া বলিতেছেন যে- "এই আত্মা ব্রহ্মস্বরূপ"। 'অয়ম্ আত্মা' এই বাক্যে 'অয়ং' শব্দ দ্বারা চতুস্পাদবিশিষ্টরূপে যাহার বিভাগ করা হইতেছে, সেই আত্মাকে অভিনয় করিয়া প্রত্যক্ (জীব) আত্মারূপে নির্দ্দেশ করিতেছেন।

বিদ্যারণ্য স্বামী "অয়মাত্মা ব্রহ্ম" অথর্ববেদীয় এই মহাবাক্যের ব্যাখ্যায় বলিতেছেন-" 'অয়ম' এই শব্দের উচ্চারণ দ্বারা আত্মার স্বপ্রকাশতা ও অপরোক্ষতা বুঝানো অভিপ্রেত। অহঙ্কার হইতে আরম্ভ করিয়া দেহ পর্য্যন্ত যে সঙ্ঘাত, তাহার অন্তরে সাক্ষিরূপে যিনি বিদ্যমান, তিনিই এই স্থলে 'আত্মা' শব্দদ্বারা লক্ষিত হইয়াছেন। দৃশ্যমান সমগ্র সৃষ্টির যাহা মূল কারণ তাহাই 'ব্রহ্ম' শব্দ দ্বারা কথিত হইয়াছে। সেই ব্রহ্ম স্বপ্রকাশ আত্মস্বরূপ।"-(পঞ্চদশী, মহাবাক্যবিবেক-প্রকরণ-৭,৮)

 


Thursday, 30 July 2020

বেদান্তে মহাবাক্য ‘প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম’-


চতুর্বেদের চতুর্মহাবাক্যের মধ্যে ‘প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম’ একটী। ঋগ্বেদীয় ঐতরেয় উপনিষদের তৃতীয় অধ্যায়ের প্রথম খণ্ডের তৃতীয় শ্রুতিতে এই মহাবাক্যের উল্লেখ রহিয়াছে।
‘এষঃ ব্রহ্ম, এষঃ ইন্দ্রঃ, এষঃ প্রজাপতিঃ, এতে সর্বে দেবাঃ, ইমানি চ পঞ্চ মহাভূতানি-পৃথিবী বায়ুরাকাশ আপো জ্যোতীংষীত্যেতানি, ইমানি চ ক্ষুদ্রমিশ্রাণীব বীজানি, ইতরাণি, চেতরাণি চ-অণ্ডজানি চ জারুজানি চ স্বেদজানি চোদ্ভিজ্জানি চ-অশ্বা গাবঃ পুরুষা হস্তিনঃ, যৎকিঞ্চেদং প্রাণি জঙ্গমং চ পতত্রি চ যচ্চ স্থাবরম;- সর্বং তৎ প্রজ্ঞানেত্রং প্রজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিতং, প্রজ্ঞানেত্রো লোকঃ, প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠা, প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম।’- (ঐতরেয় উপনিষদ-৩।১।৩)
শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ-ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের ভাষ্য হইল-সেই এই প্রজ্ঞানস্বরূপ আত্মাই অপরব্রহ্ম (উপাধিযুক্ত ব্রহ্ম) ; ইহাই সর্ব্বশরীরস্থিত প্রাণ ও প্রজ্ঞাত্মা এবং বিভিন্ন জলপাত্রে পতিত জল সূর্য্যপ্রতিবিম্বের ন্যায় ইহাও অন্তঃকরণরূপ উপাধিমধ্যে প্রবেশ করিয়া হিরণ্যগর্ভ প্রাণ ও প্রজ্ঞাত্মা। ইন্দ্র শব্দের প্রকৃতি প্রত্যয় অনুসারে হিরণ্যগর্ভ কিংবা সাক্ষাৎ দেবরাজ অর্থও গ্রহণ করা যাইতে পারে। ইনিই প্রজাপতি, যিনি প্রথমোৎপন্ন শরীরধারী পুরুষ; যাঁহার মুখছিদ্র ইত্যাদি প্রকাশের ফলে লোকপাল ইন্দ্র, অগ্নি প্রভৃতি উৎপন্ন হইয়াছেন, সেই প্রজাপতিও ইনিই। এবং এই যে, অগ্নি প্রভৃতি দেবতাগণ, তাঁহারাও ইনিই অর্থাৎ ব্রহ্মস্বরূপই বটে। আর এই যে সমস্ত শরীরের উপাদানরূপে এবং অন্ন ও অন্নভোজনকারী রূপে পরিণত পৃথিবী(মাটি), বায়ু, আকাশ, জল ও তেজঃ প্রভৃতি পঞ্চমহাভূত, ইহারা, এবং মশক প্রভৃতি ক্ষুদ্র প্রাণীদের সহিত সর্প প্রভৃতি।
বীজ অর্থাৎ কারণ- কার্য্যোৎপাদক, অবীজ অর্থাৎ কার্য্যের অনুৎপাদক, এইদুইভাগে বিভক্ত যে সমুদয় প্রাণী (ইতরাণি, চেতরাণি চ বলিয়া যাহাদের নির্দ্দেশ করা হইয়াছে) তাহারা কাহারা? বলা হইতেছে অণ্ডজ-পক্ষি প্রভৃতি, জারুজ-জরায়ুজ মনুষ্য প্রভৃতি, স্বেদজ-উকুন প্রভৃতি, উদ্ভিজ্জ-বৃক্ষলতা প্রভৃতি। অশ্ব, গো, পুরুষ ও হস্তি প্রভৃতি, আরও যে কিছু প্রাণী। তাহা কি কি? জঙ্গম-যাহারা পায়ের দ্বারা গমন করিয়া থাকে; আর পতত্রি, যাহারা আকাশপথে উড়িয়া থাকে; যাহা স্থাবর অর্থাৎ চলিতে পারে না; সে সমুদয়ই প্রজ্ঞানেত্র। প্রজ্ঞা অর্থ প্রকৃষ্ট জ্ঞান, তাহা নিশ্চিতই ব্রহ্মস্বরূপ; নেত্র অর্থাৎ যাহা দ্বারা নীত হয় (সত্তালাভ হয়)। সেই প্রজ্ঞা যাহার নেত্র, তাহার নাম প্রজ্ঞানেত্র; উৎপত্তি, স্থিতি ও লয় এই তিন সময়েই যাহা প্রজ্ঞাস্বরূপ ব্রহ্মে অবস্থিত অর্থাৎ প্রজ্ঞাতে আশ্রিত; এইজন্য উহারা প্রজ্ঞানেত্র। লোক অর্থাৎ ভূঃ প্রভৃতি লোকও প্রজ্ঞানেত্র; অথবা প্রজ্ঞাই সমস্ত জগতের প্রতিষ্ঠা বা স্থিতির মূল; সেই কারণে উহারা প্রজ্ঞান ব্রহ্মস্বরূপ।
সেই যে, এই সকল উপাধিশূন্য নিত্য, নিরঞ্জন, নির্ম্মল ও নিষ্ক্রিয়; অতএব শান্ত এক অদ্বিতীয়; 'নেতি নেতি' প্রণালীক্রমে সমস্ত বিশেষণ-পরিত্যক্তরূপে বিজ্ঞেয় এবং শব্দজাত সর্ব্বপ্রকার জ্ঞানের অগোচর ব্রহ্ম, তাহাই আবার অত্যন্ত বিশুদ্ধবুদ্ধিসত্ত্বরূপ উপাধিসম্পর্কবশতঃ সর্ব্বজ্ঞ ঈশ্বরভাবে সর্ব্বজীবভোগ্য সমস্ত অব্যক্ত (অপ্রকাশিত) জগতের প্রবর্ত্তক বা আবির্ভাবের কারণ এং সর্ব্ববস্তুর নিয়ন্ত্রণকারীরূপে অন্তর্যামী বলিয়া কথিত হন। তিনিই আবার যখন ব্যক্ত (প্রকাশিত) জগতের বীজস্বরূপ বুদ্ধি ও আত্মারূপ উপাধিগ্রহণ করেন, তখন হিরণ্যগর্ভ নাম লাভ করেন। তিনিই আবার ব্রহ্মাণ্ডমধ্যে প্রথম উৎপন্ন শরীররূপ বৈশিষ্ট্য লাভ করিয়া বিরাট ও প্রজাপতি নাম লাভ করিয়া থাকেন। তিনিই আবার প্রকাশিত অগ্নি প্রভৃতি উপাধিবিশেষযোগে দেবতা নামে কথিত হইয়া থাকেন। এইরূপ ব্রহ্ম হইতে আরম্ভ করিয়া তৃণ পর্য্যন্ত বিশেষ বিশেষ শরীরসম্বন্ধবশতঃ সেই ব্রহ্মেরই বিশেষ বিশেষ নাম লাভ হইয়া থাকে। নানাপ্রকার উপাধিভেদে ভিন্নপ্রকার সেই ব্রহ্মকেই সমস্তপ্রাণী ও তার্কিকগণ বিভিন্ন প্রকারে জানিয়া থাকেন এবং নানা প্রকারে তাহার কল্পনা করিয়া থাকেন। মনুস্মৃতি বলিয়াছেন-
'একশ্রেণীর লোকেরা ইঁহাকে অগ্নি বলিয়া নির্দেশ করেন; অপরে প্রজাপতি মনু বলিয়া নির্দ্দেশ করেন; অপরে প্রজাপতি মনু বলিয়া বর্ণনা করেন, কেহ কেহ ইন্দ্র বলেন, কেহ বা প্রাণ বলেন; কেহ আবার শাশ্বত ব্রহ্ম বলিয়াও জানেন' ইত্যাদি।........

স্বামী বিদ্যারণ্য মুনি (মাধবাচার্য) পঞ্চদশীতে বলিতেছেন-"চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়সকল দিয়া নির্গত যে অন্তঃকরণবৃত্তি-উপহিত চৈতন্যের দ্বারা পুরুষ রূপসকল দর্শন করে, শব্দসকল শ্রবণ করে, গন্ধসমূহের আঘ্রাণ লয়, বাক্য-সকল উচ্চারণ করে, সুস্বাদু ও অস্বাদু রস আস্বাদন করে, তাহা 'প্রজ্ঞান' বলিয়া কথিত হয়। ব্রহ্মা-ইন্দ্র প্রভৃতি উত্তম জীবে, মনুষ্যাদি মধ্যম জীবে এবং অশ্ব-গবাদি অধম জীবে-সর্বত্র যে একমাত্র চৈতন্যরূপে বিরাজিত, তাহাই ব্রহ্ম। সুতরাং আমাতে অবস্থিত প্রজ্ঞানও ব্রহ্ম।"

-(পঞ্চদশী, মহাবাক্যবিবেক-প্রকরণ-১,২)


নিত্যকর্মসমূহ কিরূপে মোক্ষের হেতু হয়?

  সুরেশ্বরাচার্য তদীয় নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধিতে বলছেন — কদাচিৎ কোন প্রকারে পুণ্য অনুশীলন দ্বারা এবং নিত্যকর্মানুষ্ঠান দ্বারা বুদ্ধি ব...