জীবন্মুক্তি
অবস্থা আছে কিনা অথবা
জীবন্মুক্তি সিদ্ধি সম্ভব কিনা এরূপ সংশয়
নিরসনের জন্য শ্রুতি ও
স্মৃতি-বাক্য প্রমাণরূপে গৃহীত হয়। সেই বাক্যসকলের
মধ্যে কঠবল্লীতে রয়েছে—"বিমুক্তশ্চ বিমুচ্যতে", অর্থাৎ বিমুক্ত (—জীবন্মুক্ত) ব্যক্তি দেহান্তে বিদেহমুক্তি লাভ করেন। জীবৎকালেই
প্রত্যক্ষবন্ধন বাসনা থেকে বিশেষরূপে মুক্ত
হয়ে মৃত্যুর পর ভবিষ্যৎ জন্মরূপ
বন্ধন থেকে বিশেষরূপে মুক্ত
হয়ে যায়। সম্পূর্ণ শ্রুতিটি হল—
পুরমেকাদশদ্বারমজস্যাবক্রচেতসঃ
।
অনুষ্ঠায়
ন শোচতি বিমুক্তশ্চ বিমুচ্যতে । এতদ্বৈ তৎ
॥ -(কঠ উপনিষৎ-২।২।১)
ভগবৎপাদ্
শঙ্করাচার্য এই শ্রুতির ভাষ্যে
বলছেন— শরীর নামক এই
নগরটি একাদশদ্বারবিশিষ্ট অর্থাৎ এর এগারটি দরজা,
যথা—মস্তকস্থিত সাতটি (চক্ষুদ্বয়, কর্ণদ্বয়, নাসারন্ধ্রদ্বয় ও মুখ), নাভিসহ
অধঃস্থিত তিনটি (নাভি, পায়ু ও উপস্থ) এবং
মস্তকে একটি (ব্রহ্মরন্ধ্র)। আচ্ছা এই
নগরটি কার? উত্তর— অজের
অর্থাৎ ঐ দেহ নগরের
ধর্ম হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন
জন্মদিবিকাররহিত রাজার সাথে তুলনীয় আত্মার,
যিনি অবক্রচেতা অর্থাৎ যার চৈতন্য (—জ্ঞান)
বক্র অর্থাৎ কুটিল নয়, যা সূর্যালোকের
মতো নিত্য প্রকাশমান একরূপবিশিষ্ট, সেই রাজস্থানীয় আত্মরূপ
ব্রহ্মের এই শরীররূপ নগর।
সেই
শরীররূপ নগরস্বামী পরমেশ্বরের অনুষ্ঠান অর্থাৎ অনুধ্যান করে—কারণ শ্রবণমননসহায়ে
আত্মাকে সম্যগ্ রূপে জেনে নিয়ে
যে অনুধ্যান-করণ, তাই তাঁর
অনুষ্ঠান। অতএব মুমুক্ষু ব্যক্তি
সকল এষণা হতে মুক্ত
হয়ে সর্বভূতস্থ সেই আত্মাকে নিদিধ্যাসনপূর্বক
অভয়প্রাপ্তিহেতু শোকাতীত হয়ে যান এবং
এই দেহেই (জীবিত অবস্থাতেই) অবিদ্যাকৃত কাম ও কর্মরূপ
বন্ধন হতে বিমুক্ত হয়ে
দেহান্তে বিদেহ মুক্তি লাভ করেন অর্থাৎ
তিনি আর শরীর ধারণ
করেন না।
জীবন্মুক্ত
বিষয়ে বরাহ শ্রুতিতে একটি
সুন্দর সংজ্ঞা দেয়া আছে—
যস্য
নাহঙ্কৃতো ভাবো বুদ্ধির্যস্য ন
লিপ্যতে ।
কুর্বতোঽকুর্বতো
বাপি স জীবন্মুক্ত উচ্যতে
॥
-(বরাহ উপনিষৎ-৪/২৫)
অর্থাৎ
"যাঁর 'আমি কর্তা' এইরূপ
ভাব নেই, যাঁর বুদ্ধি
লিপ্ত হয় না, তিনি
কিছু করুন বা না
করুন তিনি— জীবন্মুক্ত বলে কথিত হন।"
এই
বিষয়ে ভগবান্ ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য ব্রহ্মসূত্রের (৪/১/১৩)
বলছেন—পূর্বসিদ্ধ কর্তৃত্ব ও ভোক্তৃত্বের বিপরীত
যে কালত্রয়েই অকর্তৃ ও অভোক্তৃস্বরূপ ব্রহ্ম,
তিনিই আমি; এর পূর্বেও
আমি কর্তা বা ভোক্তা ছিলাম
না, বর্তমানকালেও তা নয়, ভবিষ্যৎকালেও
তা হব না; নির্গুণব্রহ্মবিদ্
এপ্রকার অনুভব করে থাকেন। তাঁর
স্বশরীরও "উইঢিবিতে পরিত্যক্ত সর্পত্বকের ন্যায়" প্রতিভাত হয়। জীবন্মুক্ত অপরোক্ষ
ব্রহ্মাত্মজ্ঞানীর জীবদ্দশাতে অনুভূত যে অশরীরতা তা
কেবল যে যুক্তিসিদ্ধ তা
নয়, বরংচ শ্রুতিসিদ্ধ। বৃহদারণ্যকে
পঠিত হচ্ছে—
যদা
সর্বে প্রমুচ্যন্তে কামা যেঽস্য হৃদি
শ্রিতাঃ ।
অথ
মর্ত্যোঽমৃতো ভবত্যত্র ব্রহ্ম সমশ্নুতে ॥ ইতি। তদ্ যথাঽহিনির্ল্বয়নী বল্মীকে মৃতা
প্রত্যস্তা শয়ীতৈবমেবেদং শরীরং শেতে অথায়মশরীরোঽমৃতঃ প্রাণো
ব্রহ্মৈব তেজ এব'-(বৃহদারণ্যক
উপনিষৎ-৪/৪/৭)
অর্থাৎ
"পরমার্থদর্শীর কোন কাম্য বস্তু
না থাকায় জ্ঞান হওয়ার পূর্বে তাঁর হৃদয়ে (বুদ্ধিতে)
আশ্রিত যে সকল কাম
(বাসনা) ছিল, তারা যখন
সমূলে বিনষ্ট হয়, তখন যিনি
জ্ঞান হওয়ার পূর্বে মরণশীল ছিলেন তিনিই জ্ঞানোদয়ের পর অমৃত (অমর)
হন এবং জন্মান্তরপ্রাপক ঐ
মৃত্যুর বিনাশহেতু তাঁর জন্মান্তরপ্রাপ্তি আর সম্ভব
হয় না বলে এই
দেহেই ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হন অর্থাৎ ব্রহ্মই
হয়ে যান। ব্রহ্মজ্ঞের দেহান্তরের
অপ্রাপ্তি বিষয়ে দৃষ্টান্ত এই— সাপের খোলস
যেমন বল্মীকে (উইঢিবিতে) নিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে থাকে,
ব্রহ্মজ্ঞের এই শরীর ঠিক
তেমনি পড়ে থাকে। অতঃপর
ইনি (জীবন্মুক্ত পুরুষ) শরীরে বর্তমান থাকলেও শরীরাভিমান না থাকায় অশরীর,
অমৃত, প্রাণস্বরূপ (প্রাণের প্রাণ, পরমাত্মা), ব্রহ্মস্বরূপ, তেজস্বরূপই হয়ে থাকেন।"
তাঁর
স্বদৃষ্টিতে তখন স্বীয় শরীর
ও জগদাদি সমস্ত পদার্থই বাধিত হয়ে পড়ে। ভেদক
উপাধি বিনষ্ট হওয়ায় তিনি তখন শুদ্ধ
জলে মিলিত শুদ্ধ জলের ন্যায় নিত্যশুদ্ধবুদ্ধ
পরমানন্দস্বরূপ ব্রহ্মই হয়ে পড়েন। অর্থাৎ
যে বিদ্বানের উপাধিকৃত ভেদদর্শন নষ্ট হয়ে গিয়েছে
এবং যিনি বিশুদ্ধ বিজ্ঞানঘন
একরস অদ্বিতীয় আত্মাকেই কেবল দর্শন করেন,
সেই মননশীল অর্থাৎ জ্ঞানীর আত্মার স্বরূপ কি হয়?
যথোদকং
শুদ্ধে শুদ্ধমাসিক্তং তাদৃগেব ভবতি ৷ এবং
মুনের্বিজানত আত্মা ভবতি গৌতম ৷৷-(কঠ উপনিষৎ ২।১।১৫)
—যেইরূপ শুদ্ধ
অর্থাৎ নির্মল উদকে (জলে) প্রক্ষিপ্ত নির্মল
জল একরসই হয় অর্থাৎ অন্যপ্রকার
হয় না কিন্তু তদ্রূপই
হয়, সেইরূপ হে গৌতম! আত্মৈকদর্শী
জ্ঞানীর আত্মাও ঠিক এইরূপই হয়।
আর
'স্থিতপ্রজ্ঞস্য কা ভাষা'-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৫৪) "স্থিতপ্রজ্ঞের
লক্ষণ কি"? ইত্যাদি স্মৃতিতেও স্থিতপ্রজ্ঞের লক্ষণসকলের বর্ণনা করতে গিয়ে জীবন্মুক্তের
কথায় বর্ণিত হয়েছে। তাছাড়া এটা বলা বাহুল্য
যে, ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ গীতায় স্থিতপ্রজ্ঞ, গুণাতীত, ভগবৎভক্ত প্রভৃতির নামে জীবন্মুক্তেরই লক্ষণ
তুলে ধরেছেন। যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণের বশিষ্ঠরাম সংবাদের উৎপত্তি প্রকরণে বর্ণিত আছে—
নোদেতি
নাস্তমায়াতি সুখে দুঃখে মুখপ্রভা।
যথাপ্রাপ্তে
স্থিতির্যস্য স জীবন্মুক্ত উচ্যতে।"
-(যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণ,
উৎপত্তিপ্রকরণ, ৯/৬)
—যিনি সুখপ্রাপ্তিতে
হর্ষ, দুঃখের দ্বারা দৈন্যপ্রাপ্ত হন না, যাঁর
যদৃচ্ছালব্ধ বস্তুতেই দেহযাত্রা নির্বাহ হয় তাঁকেই জীবন্মুক্ত
বলা হয়।
ভগবান্
দত্তাত্রেয় জীবন্মুক্তি গীতায় বলেছেন—
জীবঃ
শিবঃ সর্বমেব ভূতেষ্বেবং ভূতে ভূতে ব্যবস্থিতঃ।এবমেবাভিপশ্যন্
হি এবমেব পশ্যতি যো জীবন্মুক্তঃ স
উচ্যতে। এবং ব্রহ্ম জগৎসর্বমখিলং
ভাসতে রবিঃ। সংস্থিতং সর্বভূতানাং জীবন্মুক্তঃ স উচ্যতে। একধা
বহুধা চৈব দৃশ্যতে জলচন্দ্রবৎ।
আত্মজ্ঞানী তথৈবৈকো জীবন্মুক্তঃ স উচ্যতে। সর্বভূতে
স্থিতং ব্রহ্ম ভেদাভেদো ন বিদ্যতে। একমেবাভিপশ্যংশ্চ
পশ্যতি জীবন্মুক্তঃ স উচ্যতে। -(জীবন্মুক্তি
গীতা- ২-৫)
অর্থাৎ
এই যে জীব, ইনিই
শিব। ইনি সর্বভূতে বিরাজমান।
ইনি সর্বব্যাপী। এই জীবনে এই
জীবকে যিনি এইভাবে দেখতে
পেরেছেন, তিনিই জীবন্মুক্ত। অর্থাৎ গগনে রবির উদয়ে
বিশ্বচরাচর প্রকাশিত হয়। সেইভাবেই চৈতন্যস্বরূপ
পরমাত্মা পরব্রহ্ম জগতের প্রতিটি বস্তুর মধ্যে বিরাজ করে ব্রহ্মাণ্ডকে প্রকাশ
করছেন। এইরকম জ্ঞানলাভ করে যিনি জ্ঞানী
হতে পেরেছেন তাঁকেই বলা যায় জীবন্মুক্ত।
অর্থাৎ আকাশের বুকে একটি মাত্র
চাঁদ স্নিগ্ধ কিরণ নিয়ে ভাসমান।
স্রোতের মালা নিয়ে জলে
সেই এক চাঁদকে অনেক,
অনেক রূপে দেখা যায়।
সেই রকম এক পরমাত্মা
প্রতিটি জীবের বুদ্ধিতে এক-একভাবে প্রকাশিত।
এইরকম আত্মজ্ঞানীই জীবন্মুক্ত বলে অভিহিত হন।
অর্থাৎ সমুদয় জীবের অন্তঃকরণেই সেই এক ব্রহ্ম
বিরাজ করছেন। স্থাবর-জঙ্গম ভেদে জীবদেহ পৃথক
পৃথক হলেও, তিনিই সেই এক। তার
মধ্যে ভেদও নেই, অভেদও
নেই। এইরকম জ্ঞানে যিনি জ্ঞানী হতে
পেরেছেন, তিনিই জীবন্মুক্ত।
অষ্টাবক্র
মুনি অষ্টাবক্র-গীতার শান্তিশতকম্ প্রকরণে বলছেন—
কৃত্যং
কিমপি নৈবাস্তি ন কাপি হৃদিরঞ্জনা।
যথা
জীবনমেবেহ জীবন্মুক্তস্য যোগিনঃ।।১৩।।
অর্থাৎ
জীবন্মুক্ত জ্ঞানীর সঙ্কল্পবশে কিছুই করার নেই। তাঁর
মনেও কোন বিষয়ের প্রতি
বিন্দুমাত্রও অনুরাগ হয় না। কারণ
আসক্তির হেতু অবিদ্যা তাঁর
বিনষ্ট হয়ে গেছে। তথাপি
জীবনহেতু অদৃষ্ট অর্থাৎ প্রারব্ধ অনুসারেই তাঁর সর্ব কর্ম
সম্পন্ন হয়ে থাকে।.......
তথ্যসূত্রঃ-
১.
আচার্য বিদ্যারণ্য স্বামী প্রণীত জীবন্মুক্তিবিবেকঃ, স্বামী অলোকানন্দ অনূদিত, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।
২.
কঠোপনিষৎ, শাঙ্করভাষ্য, স্বামী জুষ্টানন্দ অনূদিত, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।
৩.
গীতা সংগ্রহ, গ্রন্থিক সংস্করণ।
৪.
বৃহদারণ্যকোপনিষদ্, শাঙ্করভাষ্য ও আনন্দ গিরি
টীকা, মহামহোপাধ্যায় দুর্গাচরণ সাংখ্যবেদান্ততীর্থ অনূদিত, দেব সাহিত্য কুটীর।
৫.
অষ্টাবক্র গীতা, স্বামী ধীরেশানন্দ অনূদিত, উদ্বোধন কার্যালয় কলকাতা।
শ্রীশুভ
চৌধুরী
মে
৩১, ২০২৬ খৃষ্টাব্দ। See less