আচার্য মধুসূদন সরস্বতী ভক্তিরসায়নে বলছেন—
কাঠিন্যং
বিষয়ে কুর্যাদ্ দ্রবত্বং ভগবৎপদে।
উপায়ৈঃ
শাস্ত্রনির্দিষ্টৈরনুক্ষণমতো
বুধাঃ।।
-(ভক্তিরসায়নম্, প্রথম
উল্লাস, ৩১)
—বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন পুরুষ শাস্ত্রনির্দিষ্ট
উপায়ে নিরন্তর ভোগ্যবিষয়ে চিত্তের কঠিনতা ও ভগবদ্বিষয়ে চিত্তের
কোমলতা সম্পাদন করবে অর্থাৎ ভোগ্যবস্তুতে
মনের আসক্তি রহিত করে ভগবৎপদে
মনের অনুরাগ বর্ধিত করবে।
চিত্তের
যে বিষয়াকারে পরিণতি, তা চিত্তের স্বাভাবিক
ধর্ম নয়; ওটা আগন্তুক
বা সাময়িক কারণ হতে উৎপন্ন
হয়। দেখ, জাগরণ অবস্থায়
চিত্তের যে স্থূল বিষয়াকারতা,
ইন্দ্রিয়ের সাথে বাহ্যবিষয়ের সন্নিকর্ষ
বা নিকটসম্বন্ধ প্রভৃতিই তার কারণ। স্বপ্নাবস্থায়
যে চিত্তের সূক্ষ্ম বিষয়াকারতা, তার কারণ মনের
বাসনা; আর সুষুপ্তিদশার ন্যায়
উক্ত উভয়প্রকার কারণের অনুপস্থিতিতে চিত্ত নির্বিষয় হয়, অর্থাৎ তখন
চিত্তে কোন প্রকার বিষয়াকারই
থাকে না।
চিত্তের
যে ভগবদাকারতা অর্থাৎ ভগবদাকারে পরিণতি, তা কিন্তু চিত্তের
স্বভাবসিদ্ধ ধর্ম, আগন্তুক নয়; কারণ চিত্তের
কারণীভূত যে সূক্ষ্মভূত, সেগুলোরও
কারণ যে অনেকবিধ বিচিত্র
শক্তিযুক্ত অনির্বচনীয় মায়া, তারও আশ্রয়ভূত সর্বান্তর্যামী
ও সর্বব্যাপী ভগবান সকল বস্তুতেই অনুস্যূত
রয়েছেন।
এখন
প্রশ্ন, চিত্তের ভগবদাকারতা স্বভাবসিদ্ধ বলে যদি তার
জন্য আর সাধনের অপেক্ষা
না থাকে, তাহলে সাধনশাস্ত্রের উপযোগিতা কোথায়? হ্যাঁ, চিত্তের অন্যবিষয়াকারতার বিরোধী ভগবদাকারতা সম্পাদনেই সাধনের সার্থকতা জানবে। চিত্তের যে স্বভাবসিদ্ধ ভগবদাকারতা,
তা বিষয়াকারতার সহচর অর্থাৎ সঙ্গে
সঙ্গে থাকে বলে এবং
বিষয়াকার সমুৎপাদনে সহায়তা করে বলে প্রকৃতপক্ষে
বিষয়াকারতার বিরোধী নয়, কিন্তু শাস্ত্রজনিত
অর্থাৎ শাস্ত্রোক্ত সাধন অনুষ্ঠান ক্রমে
সমুৎপন্ন যে ভগবদাকারতা, ওটা
প্রথমত সাধন অভ্যাস সময়ে
পরোক্ষরূপে প্রকাশ পায় এবং অল্প
অল্প করে বিষয়াকারতা ক্ষয়
করতে থাকে; শেষে সাধনার পরিপক্কদশায়
অপরোক্ষভাব প্রাপ্ত হয়ে সেই বিষয়াকারতাকে
সমূলে বিনষ্ট করে দেয়। এইজন্যই
ভাগবতে উদ্ধবের প্রতি স্বয়ং ভগবান বলছেন—
যর্হ্যব্জনাভচরণৈষণয়োরুভক্ত্যা
চেতোমলানি
বিধমেদ্গুণকর্মজানি ।
তস্মিন্
বিশুদ্ধ উপলভ্যত আত্মতত্ত্বং
সাক্ষাদ্
যথাঽমলদৃশোঃ সবিতৃপ্রকাশঃ ॥
-(শ্রীমদ্ভাগবত, ১১/৩/৪০)
— যখন পদ্মনাভ
শ্রীহরির চরণলাভের ইচ্ছায় প্রবল ভক্তিপ্রভাবে সত্ত্বাদিগুণানুগত কর্মজাত রাগদ্বেষাদি চিত্তমলসকল বিনষ্ট হয়, তখন সেই
বিশুদ্ধ চিত্তে—নির্মল নয়নে সূর্যালোকের ন্যায় আত্মতত্ত্ব সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষ হয়।
ভগবান্
পরবর্তীতে আরও বলছেন—
যথাগ্নিনা
হেম মলং জহাতি
ধ্মাতং
পুনঃ স্বং ভজতে চ
রূপম্ ।
আত্মা
চ কর্মানুশয়ং বিধূয়
মদ্ভক্তিযোগেন
ভজত্যথো মাম্ ॥
যথা
যথাত্মা পরিমৃজ্যতেঽসৌ
মৎপুণ্যগাথাশ্রবণাভিধানৈঃ
।
তথা
তথা পশ্যতি বস্তু সূক্ষ্মং
চক্ষুর্যথৈবাঞ্জনসম্প্রয়ুক্তম্
॥
বিষয়ান্
ধ্যায়তশ্চিত্তং বিষয়েষু বিষজ্জতে ।
মামনুস্মরতশ্চিত্তং
ময়্যেব প্রবিলীয়তে ॥
তস্মাদসদভিধ্যানং
যথা স্বপ্নমনোরথম্ ।
হিত্বা
ময়ি সমাধৎস্ব মনো মদ্ভাবভাবিতম্ ॥
-(শ্রীমদ্ভাগবত, ১১/১৪/২৫-২৮)
—স্বর্ণ যেমন
অগ্নিসংযোগে উত্তপ্ত হয়ে মলরাশি ত্যাগ
করে এবং নিজের স্বাভাবিক
রূপ প্রাপ্ত হয়, আত্মাও তেমনই
মদীয় ভক্তিযোগ লাভ করে বাসনারাশি
পরিত্যাগ করে আমাকে প্রাপ্ত
হয়। আমার পুণ্যকথার
শ্রবণ ও কীর্তনাদি দ্বারা
আত্মা যেমন যেমন পরিমার্জিত
(বিশুদ্ধ) হয়, অঞ্জনযুক্ত চোখের
ন্যায় আত্মাও সেই পরিমাণেই সূক্ষ্মবস্তু
(পরমাত্মা) দর্শন করতে সমর্থ হয়।
যে লোক বিষয়চিন্তা করে,
তার চিত্ত বিষয়েই আসক্ত হয়, আর যে
লোক কেবল আমাকেই স্মরণ
করে, তার চিত্ত আমাতেই
বিলীন হয়। অতএব স্বপ্নদৃশ্যের
ন্যায় অসৎ বিষয়ের অনুধ্যান
পরিত্যাগ করে মনকে আমার
ভাবে ভাবিত করে আমাতেই সমাহিত
কর।.....
তথ্যসূত্রঃ-
মধূসুদন সরস্বতী বিরচিত, ভক্তিরসায়নম্, মহামহোপাধ্যায় দুর্গাচরণ সাংখ্যবেদান্ততীর্থ অনূদিত ও সম্পাদিত, উদ্বোধন
কার্যালয়, কলকাতা।
শ্রীশুভ
চৌধুরী
জুলাই
২১, ২০২৬ খৃষ্টাব্দ।

