প্রশ্ন এই—আত্মা নির্গুণ, ভোগবর্জিত অর্থাৎ সুখ দুঃখ তাঁর নেই, বাসুদেব যদি আত্মস্বরূপ হয়ে থাকেন, তাহলে বিবিধ ছলচাতুরী ও পরস্ত্রীগণের সহিত ক্রীড়া করছেন কেন?
তদুত্তরে
ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য প্রবোধসুধাকরে বলেছেন— অভিনবরূপসম্পন্ন সুন্দর শ্রীকৃষ্ণ দর্শনে গোপিকাগণ মনে মনে তাঁর
অভিলাষিণী হয়ে মদনজন্য বিরহব্যথা
প্রাপ্ত হয়েছিলেন। অর্থাৎ ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ ভোগার্থে কোন প্রযত্ন করেন
নি। গমন, অবস্থান, গৃহকর্মপরায়ণতা
এবং ভোজন সবসময়ই তাঁরা
শ্রীকৃষ্ণ ব্যতীত অপর বিষয় সম্মুখে
থাকলেও কখনোই গ্রহণ করতে পারতেন না।
গোপরমণী যে কার্যই করুন
না কেন, মন তাঁদের
সর্বদা কৃষ্ণময়ই হয়ে থাকত। সম্মুখে
স্থিত বস্তুকেও কৃষ্ণরূপে দর্শন করতেন। এই অসামান্য সাধনায়
ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের প্রতি অনুগ্রহ করেছিলেন। সর্বত্র কৃষ্ণদর্শনপরায়ণা গোপীগণের এই প্রেমভাব ভোগ
বা আসক্তির পরিচয় নয় বরংচ যোগ
বা আত্মদৃষ্টিতে সমদর্শিতার পরিচয়।
দুঃসহ
বিরহজনিত ভ্রমে গোপীগণ নিজ নিজ পতি,
তরু মানব ও পশুদের
'ইনি শ্রীকৃষ্ণ'— এইরূপে দর্শন করেছিলেন, অসীমপ্রীতিবশে সসম্ভ্রমে আলিঙ্গনও করেছিলেন। কোন কোন গোপী
কৃষ্ণবৎ হয়ে পূতনানুকারিণী হয়ে
অন্য গোপীর স্তন পান করছেন,
এটা ব্যাসদেব ভাগবতে বলেছেন। কৃষ্ণের তন্ময়তাবশতঃ ব্রজরমণীগণ নিজ নিজ পতিদের
কৃষ্ণাকারে দর্শন করেছিলেন। আর ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ
স্বজন ও পরজন, পতি
ও পত্নী সকলেরই সাক্ষাৎ অন্তর্যামী। রাসলীলায় গোপীগণের শ্রীকৃষ্ণতন্ময়ত্ব সাধনা বিবৃত হয়েছে। এইরূপ সাধনার ফলস্বরূপ যে কৃষ্ণরতিভোগ, তা
প্রাকৃত সুখ নয়, তা
হল যোগানন্দ লাভ।
রাসক্রীড়ায়
সর্বপ্রকার চিত্তরঞ্জনের দ্বারা গোপীগণের ভক্তি উদ্রিক্তা হলে, তারা কৃষ্ণানুরাগিণী
হয়ে নিজেদেরকেই কৃষ্ণ বলে জানত, কৃষ্ণের
কথিতব্য কথা বলতে থাকত,
এবং কেবল জগদীশ্বরের সৌন্দর্যের
অনুরাগিণী হয়ে জীবাত্মা পরমাত্মায়
যে অভেদ জ্ঞান, যা
যোগীর যোগের এবং জ্ঞানীর জ্ঞানের
চরমোদ্দেশ্য, তা প্রাপ্ত হয়ে
ঈশ্বরে বিলীন হত। বিষ্ণুপুরাণে বর্ণিত
আছে—
"কৃষ্ণ অন্যত্র
চলে গেলে গোপীগণ কৃষ্ণচেষ্টার
অনুকারিণী হয়ে দলে দলে
বৃন্দাবনমধ্যে ঘুরেফিরে বেড়াতে লাগল; এবং কৃষ্ণে নিরুদ্ধহৃদয়া
হয়ে পরস্পরকে এরূপ বলতে লাগল,
‘আমি কৃষ্ণ, এই ললিতগতিতে গমন
করছি, তোমরা আমার গমন অবলোকন
কর।’ অন্য গোপী বলল,
‘আমি কৃষ্ণ, আমার গান শ্রবণ
কর।’ অপর গোপী বলল
‘দুষ্ট কালিয়! এখানে থাক, আমি কৃষ্ণ,’
এবং বাহু আস্ফোটন-পূর্বক
কৃষ্ণলীলার অনুকরণ করল। আর কেউ
বলল, ‘হে গোপগণ! তোমরা
নির্ভয়ে এখানে থাক, বৃথা বৃষ্টির
ভয় কর না, আমি
এখানে গোবর্ধন ধরে আছি।’ অন্যা
কৃষ্ণলীলানুকারিণী গোপী বলল, ‘এই
ধেনুককে আমি নিক্ষিপ্ত করেছি,
তোমরা যদৃচ্ছাক্রমে বিচরণ কর।’ এরূপে সেসকল
গোপী তখন নানাপ্রকার কৃষ্ণচেষ্টানুবর্তিনী
হয়ে ব্যগ্রভাবে রম্য বৃন্দাবন বনে
সঞ্চরণ করতে লাগল।" -(বিষ্ণুপুরাণ,
পঞ্চমাংশ, ত্রয়োদশ অধ্যায়, ২৪-২৯)
যিনি
বাক্য ও মনের অগোচর,
তিনি ব্ৰহ্ম ; ব্ৰহ্মই আনন্দামৃতরূপ রস। শ্রুতি বলেছেন—
"রসো বৈ সঃ" (তৈত্তিরীয়
উপনিষৎ-২/৭) অর্থাৎ
ব্রহ্মই রসস্বরূপ। এই রস আস্বাদনার্থই
ভগবানের সৃষ্টিকাৰ্য; জীব সেই বাসনাবিদগ্ধ
হয়ে, রসের পিপাসু হয়ে,
ঘুরে মরছে। গোপীভাবের সাধনায় সেই রস-রতির
জ্ঞান হয়, হৃদয়ে তা
প্রকাশ পায়। ভগবান ও ভক্তের স্বরূপগত
অভেদাত্মক মিলনের নামই রমণ; যোগীর
এটাই সমাধি। মহাভারতের বিষ্ণুসহস্রনামের ভাষ্যে শঙ্করাচার্য বলেছেন— "নিত্য আনন্দস্বরূপ ভগবানের সহিত যোগীজন রমন
করেন, সেজন্যই তিনি 'রাম' নামে অভিহিত
হন।" ভগবান্ ভক্তের সহিত রমণ করবেন,
ভক্তও ভগবানের সহিত রমণ করবেন।
এ রমণ বা মিলন
পরস্পরের ইচ্ছায় নয়, স্বাভাবিক। ভগবান
এই প্রকারে যে নিজশক্তি বা
প্রকৃতির সহিত রমণ করেন,
এ রমণ মায়িক জগতের
কেউ জানতে পারে না, —এটাই
ব্রজের অমানুষী গূঢ়লীলা।.....
তথ্যসূত্রঃ-
১.
শিবাবতার শঙ্করাচার্যের গ্রন্থমালা, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রবোধসুধাকরঃ, পণ্ডিতপ্রবর পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত।
২.
বিষ্ণুপুরাণ, নবভারত পাবলিশার্স।
৩.
ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্যের বিষ্ণুসহস্রনাম ভাষ্য।
৪.
স্বামী নিগমানন্দ সরস্বতীর "প্রেমিকগুরু" শীর্ষক গ্রন্থ।
শ্রীশুভ
চৌধুরী
রাস
পূর্ণিমা, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ।

No comments:
Post a Comment