শব্দব্রহ্মবাদী বৈয়াকরণদিগের মতে শব্দ চার প্রকার (১) পরা, (২) পশ্যন্তী, (৩) মধ্যমা, (৪) বৈখরী। 'পরা' বাক্ স্থিরবিন্দুরূপে মূলাধারে অবস্থান করেন। 'পশ্যন্তী' দেহ মধ্যস্থ বায়ুদ্বারা চালিত হয়ে মূলাধার হতে নাভিদেশ পর্যন্ত গমন করে তথায় অবস্থান করে। পরা এবং পশ্যন্তী, এই দ্বিবিধ বাক্ই ব্রহ্মরূপ সরস্বতী। এটা অব্যক্ত নাদ্, অনাহতধ্বনি বা শব্দব্রহ্ম বলে পরিচিত। এটা আমাদের অবাঙ্মনসগোচর, ঋষির জ্ঞাননেত্রে, যোগীর যোগদৃষ্টিতে শব্দব্রহ্মের এই অব্যক্ত সূক্ষ্মরূপ ব্যক্ত বা প্রকাশিত হয়ে থাকে। যে বাক্ আমাদের হৃদয় দেশে অবস্থান করে তার নাম 'মধ্যমা'; কান বন্ধ করলে দেহের মধ্যে যে শব্দ শোনা যায়, তাই 'মধ্যমা' বাক্ বলে অভিহিত করা হয়। বাগিন্দ্রিয়ের সাহায্যে যে বাক্য উচ্চারিত হয়ে আমাদের শ্রুতিগোচর হয় তাকে 'বৈখরী' বাক্ বলা হয়ে থাকে। বিখর শব্দে ইন্দ্রিয় বা দেহ ও ইন্দ্রিয়ের সংঘাতকে বোঝায়। এজন্য দেহেন্দ্রিয় সংঘাতের ফলে উৎপন্ন কণ্ঠদেশে অবস্থিত বাক্যের নাম 'বৈখরী'।
মধ্যমা
বাক্ হৃদয়ে অবস্থান করে, আমাদের হৃদয়স্থ
ভাব প্রকাশে সাহায্য করে বলে বৈয়াকরণগণ
এই মধ্যমা বাক্ কে আখ্যা
দিয়েছেন 'স্ফোট'। এই স্ফোটরূপ
শব্দই নিত্য ব্রহ্মবোধক শব্দ। 'বর্ণাতিরিক্ত বর্ণাভিব্যঙ্গঃ অর্থপ্রত্যায়কঃ নিত্যঃ শব্দঃ স্ফোটঃ' (সর্বদর্শনসংগ্রহ) 'বর্ণ হতে ভিন্ন,
অথচ বর্ণের দ্বারা অভিব্যক্ত, অর্থের বোধ উৎপাদক যে
নিত্য শব্দ, তাই 'স্ফোট'।
এটা স্বপ্রকাশ এবং জ্ঞানস্বরূপ। অর্থকে
প্রস্ফুটিত করে বলেই এটাকে
স্ফোট বলা হয়। শব্দব্রহ্মবাদী
উপনিষদ্ সম্প্রদায়ের আচার্য ভর্তৃহরি তাঁর বাক্যপদীয় গ্রন্থের
প্রারম্ভ শ্লোকেই শব্দব্রহ্মের পরিচয় প্রদান করতে গিয়ে বলেছেন—
'অনাদিনিধনং ব্রহ্ম
শব্দতত্ত্বং যদক্ষরম্।
বিবর্ত্ততেঽর্থভাবেন
প্রক্রিয়া জগতো যতঃ।।
—শব্দের যা
প্রকৃত তত্ত্ব তা অনাদি নিধন
ব্রহ্মবস্তু। শব্দব্রহ্মের কোনরূপ ক্ষয়-ব্যয় নেই, এজন্য তাকে
অক্ষর বলা হয়ে থাকে।
বিভিন্ন অর্থ প্রকাশ করবার
জন্য ঐ শব্দব্রহ্মের বিবিধপ্রকার
বিবর্তরূপের উদ্ভব হয়ে থাকে এবং
তার ফলে নিখিল বাঙ্ময়
জগতের অভিব্যক্তি হয়।
শব্দব্রহ্মের
বিবর্ত সমগ্র বাঙ্ময় জগৎই কার্য ও
অনিত্য। বর্ণ, পদ, প্রভৃতি কার্য
শব্দেরই বিভিন্ন অভিব্যক্তি। ঐ কার্য বা
অনিত্য শব্দের মধ্য দিয়ে নিত্য
শব্দব্রহ্মের ভাতি বা প্রকাশ
হয়ে থাকে। বিবর্তবাদী বৈদান্তিকের অখণ্ড জ্ঞান যেমন ঘটাদি জ্ঞেয়
বস্তুর আকারে আকার প্রাপ্ত হয়ে
সসীম, সখণ্ড হয়ে প্রকাশিত হয়,
সেরুপ নিত্য শব্দব্রহ্ম ও অনিত্য বর্ণ,
পদ, বাক্য প্রভৃতির আকারে আকার প্রাপ্ত হয়ে
পদস্ফোট, বাক্যস্ফোট প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন রূপে অভিব্যক্ত হয়ে
থাকে। এটা শব্দব্রহ্মের সোপাধিকরূপ,
সুতরাং মিথ্যা। স্ফোটরূপ নিত্য, চিন্ময় ও অখণ্ড শব্দব্রহ্মই
সত্য।
প্রসিদ্ধ
দার্শনিক মণ্ডন মিশ্র তাঁর 'ব্রহ্মসিদ্ধি' গ্রন্থে শব্দাদ্বৈতবাদ বা শব্দব্রহ্মবাদ সমর্থন
করেছেন। ব্রহ্মসিদ্ধির প্রথম শ্লোকে 'অক্ষরম্' এই পদটির মণ্ডনোক্ত
ব্যাখ্যার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে, মণ্ডন যে তাঁর গ্রন্থে
শব্দব্রহ্মবাদ প্রতিপাদন করেছেন তা নিঃসন্দেহে বোঝা
যায়। 'ওমিতি ব্রহ্ম, ওমিতীদং সর্বম্'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ ১।৮।১), 'ওঁকার এবেদং সর্বং'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-২।২৩।৩), 'ওঁকার এব সর্বা বাক্,
পরঞ্চাপরঞ্চ ব্রহ্ম যদ্ ওঙ্কারঃ'-(প্রশ্ন
উপনিষৎ-৫।২), এই সকল শ্রুতিবাক্যের
ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে মণ্ডন মিশ্র প্রণব বা ওঁকারই যে
সমস্ত বাঙ্ময় জগতের আদি প্রস্রবণ, ওঁকারই
ব্রহ্ম, এই শব্দব্রহ্মবাদ অতি
স্পষ্ট ভাষায় বিবৃত করেছেন। শব্দব্রহ্মবাদীর মতে প্রণব হতে
গায়ত্রী, গায়ত্রী হতে বেদবাণীর বিকাশ
হয়েছে এবং বেদ হতে
ক্রমে সমস্ত বাঙ্ময় জগতের অভ্যুদয় হয়েছে। সূতসংহিতায় বর্ণিত আছে — প্রণবের দুটি রূপ আছে,
একটি তার পর বা
উৎকৃষ্ট ব্রহ্মরূপ, অপরটি স্থূল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য শব্দরূপ। ঐ স্থূল শব্দরূপকে
বাদ দিয়ে ওঁকারের পরব্রহ্মরূপ উপলব্ধিই সর্বপ্রকার জ্ঞানের পরাকাষ্ঠা। ভগবান্ শঙ্করাচার্য তদীয় অদ্বৈতবেদান্তে শব্দব্রহ্মবাদ সমর্থন করেন নি। তিনি
ভর্তৃহরির অঙ্গীকৃত স্ফোটবাদ ব্রহ্মসূত্রভাষ্যে ( ব্রহ্মসূত্র ১।৩।২৮ শঙ্করভাষ্যে) দৃঢ়তার সাথে খণ্ডন করেছেন।
মণ্ডন মিশ্র শঙ্করাচার্যের নিকট সন্ন্যাস গ্রহণ
করার পর, সুরেশ্বরাচার্য নামে
পরিচিত হয়ে যে সকল
গ্রন্থরাজি রচনা করেছেন, তাতে
কোথাও তিনি এই স্ফোটবাদ
বা শব্দাদ্বৈতবাদ অনুমোদন করেন নি। শঙ্কর-সম্মত ব্রহ্মাদ্বৈতবাদই প্রতিপাদন করেছেন। আচার্য বিমুক্তাত্ম-ভগবান্ তদীয় ইষ্টসিদ্ধি গ্রন্থে বলেছেন যে—'তস্মাদাত্মাদ্বৈতমেব সিধ্যতি, ন
শব্দাদ্বৈতং ঘটাদ্বৈতং
বা।' অর্থাৎ আত্মা বা ব্রহ্মাদ্বৈতবাদই প্রকৃত
অদ্বৈতবাদ্, শব্দাদ্বৈতবাদ বস্তুতঃ অদ্বৈতবাদ নয়, ওটা ঘটাদ্বৈতবাদের
ন্যায় অদ্বৈতবাদের এক বিকৃত রূপ।.....
তথ্যসূত্রঃ-
১.
আচার্য ভর্তৃহরির 'বাক্যপদীয়' হেলারাজ-কৃত টীকা সমেত।
২.বেদান্তদর্শন—অদ্বৈতবাদ, প্রথম খণ্ড, আশুতোষ ভট্টাচার্য শাস্ত্রী।
৩.
বেদান্তদর্শন, প্রথম খণ্ড, স্বামী বিশ্বরূপানন্দের ভাবদীপিকা, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।
শ্রীশুভ
চৌধুরী
এপ্রিল
৩, ২০২৬ খৃষ্টাব্দ।
.jpg)
No comments:
Post a Comment