সগুণ ব্রহ্মের উপাসনা প্রভাবে যাঁরা মনের সহিত ঈশ্বরসাযুজ্য প্রাপ্ত হন, তাঁদের ঐশ্বর্য কি নিরঙ্কুশ (অসীম) নাকি তারতম্যযুক্ত (সসীম)?
'আপ্নোতি স্বারাজ্যম্'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-১।৬।২) অর্থাৎ 'স্বারাজ্য প্রাপ্ত হন'; 'সর্বেস্মৈ দেবা বলিমাবহন্তি' -(তৈত্তিরীয়
উপনিষৎ-১।৫।৩) অর্থাৎ 'সকল দেবতা তাঁর
জন্য উপহার আনয়ন করেন' ইত্যাদি শ্রুতিতে মুক্তপুরুষগণের অপ্রতিহত ঐশ্বর্য বর্ণিত হয়েছে, সেহেতু সংশয় হয়— এই যোগিগণের
কি জগৎস্রষ্টৃত্ব আছে অথবা নেই?
তদুত্তরে ভগবান্ সূত্রকার বাদরায়ণ বলছেন—
জগদ্ব্যাপারবর্জং
প্রকরণাদসন্নিহিতত্বাচ্চ৷৷
-(ব্রহ্মসূত্র-৪.৪.১৭)
ভগবৎপাদ্
শঙ্করাচার্য এই সূত্রের ভাষ্যে
বলছেন— জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় বিষয়ক
ব্যাপারকে বর্জন করে অণিমা প্রভৃতি
অন্যপ্রকার ঐশ্বর্য মুক্তগণের হয়ে থাকে, এটাই
সঙ্গত। জগতের উৎপত্তি প্রভৃতি বিষয়ক ব্যাপার কিন্তু নিত্যসিদ্ধ ঈশ্বরেরই। যেহেতু শ্রুতিতে জগদ্ব্যাপার বিষয়ক প্রকরণে মুক্তপুরুষের কোন উল্লেখ নেই,
কারণ এই প্রকরণে একমাত্র
নিত্যসিদ্ধ ঈশ্বরই প্রস্তাবিত। 'নিত্যং বিভুং সর্বগতং ...ভূতযোনিম্'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-১.১.৬)
ইত্যাদি শ্রুতিতে 'নিত্য' এই শব্দের দ্বারা
তাঁর নিবন্ধন হয়েছে। সেই ঈশ্বরের অন্বেষণ
এবং জিজ্ঞাসাপূর্বকই কিন্তু জীবগণের অণিমাদি ঐশ্বর্য অর্থাৎ 'তেষাং সর্বেষু লোকেষু কামচারো ভবতি'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৮.১.৬)
'সকল লোকে তাঁদের সচ্ছন্দ
গতি হয়' ইত্যাদি শ্রুতিতে
বর্ণিত হয়েছে। সেহেতু তাঁরা জগৎব্যাপারে অসন্নিহিত।
আর
মুক্তপুরুষগণের জগৎস্রষ্টৃত্ব অঙ্গীকৃত হলে মনোযুক্ত হওয়ায়
তাঁদের মধ্যে ঐক্যমত না হলে কারও
জগতের স্থিতি বিষয়ক অভিপ্রায় হবে, কারও সংহার
বিষয়ক অভিপ্রায় হবে, এই প্রকার
বিরোধও কদাচিৎ হতে পারে। ফলে
জগতের সৃষ্টি ও স্থিতি বিষয়ে
কোন প্রকার নিয়ম থাকবে না অথবা পরস্পরের
ঐশ্বর্যের ব্যাঘাতক হওয়ায় কারও ঈশ্বরত্ব সিদ্ধ
হবে না, সৃষ্টি ক্রিয়ারও
ব্যাঘাত হয়ে পড়বে। অতএব
মুক্ত পুরুষের শক্তি অপরিসীম নয়, সীমিত মাত্র।
তাহলে
স্বারাজ্য প্রাপ্তিবোধিকা শ্রুতির গতি কি? তদুত্তরে আচার্য
ভারতী তীর্থ বৈয়াসিক ন্যায়মালাতে বলছেন—ঈশ্বরের অধীনভাবে স্বারাজ্য প্রাপ্তি হয়, এই অভিপ্রায়ে
উক্ত শ্রুতির প্রবৃত্তি হয়েছে। যেহেতু ঈশ্বর যোগিগণের ভোগের জন্য স্বারাজ্য প্রদান
করেন এবং বিদ্যার দ্বারা
মুক্তি প্রদান করেন।
তথ্যসূত্রঃ-
১.
ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের শারীরকমীমাংসা ভাষ্য।
২.
আচার্য ভারতী তীর্থের বৈয়াসিক ন্যায়মালা।
শ্রীশুভ
চৌধুরী
এপ্রিল
১০, ২০২৬ খৃষ্টাব্দ।

No comments:
Post a Comment