সুরেশ্বরাচার্য
ছিলেন ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্যের শিষ্য। তিনি নর্মদা নদীর
তীরবর্তী মহিষ্মতীর অধিবাসী ছিলেন। সুরেশ্বরাচার্যের গৃহস্থাশ্রমের নাম ছিল মণ্ডন
মিশ্র। তাঁর পিতা হিম
মিত্র কাশ্মীরের রাজদরবারে একজন সম্মানিত পণ্ডিত
ছিলেন। তিনি কান্যকুব্জ গৌড়
ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বিদ্যারণ্যকৃত শঙ্কর দিগ্বিজয়ে দেখা যায় যে,
মণ্ডনমিশ্র উম্বেক এবং বিশ্বরূপ নামেও
পরিচিত ছিলেন। শঙ্কর দিগ্বিজয় অনুসারে, পূর্বাশ্রমে তিনি একজন কট্টর
মীমাংসক আচার্য ছিলেন। মণ্ডনমিশ্র মীমাংসক শিরোমণি কুমারিল ভট্টের নিকট মীমাংসা শাস্ত্র
অধ্যয়ন করেন। কুমারিল ভট্টপাদ্ মণ্ডনমিশ্রের প্রতিভায় এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন
যে, ভগবান্ শঙ্করাচার্য যখন কর্মমীমাংসার বিরুদ্ধে
তর্কযুদ্ধ ঘোষণা করে কুমারিল ভট্টের
নিকট বিচারার্থ গমন করেন, তখন
কুমারিল ভট্ট তাঁকে মণ্ডনমিশ্রের
সাথে বিচার করতে অনুরোধ করেন।
এটা হতে মণ্ডনমিশ্র যে
অসাধারণ পণ্ডিত ছিলেন, তা বেশ বোঝা
যায়।
সাধারণত
শিষ্যই গুরুর কৃপা লাভের আশায়
ভক্তি, নিষ্ঠা ও সেবার মাধ্যমে
গুরুর সান্নিধ্য ও অনুগ্রহ প্রার্থনা
করে থাকেন; কিন্তু এক্ষেত্রে শ্রীশঙ্কর ভগবৎপাদ্ নিজেই শিষ্যের সন্ধানে মহিষ্মতীপুরে গমন করেছিলেন। সেই
যুগে পাটলিপুত্রকে রাজধানী করে মগধ সাম্রাজ্য
সুদূর বিস্তৃত ছিল। বিশাল মগধ
সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি নগরী ছিল
মহিষ্মতীপুর। তিনি মহিষ্মতীপুরে একজন
বৈদিক কর্মকাণ্ডী গৃহস্থাশ্রমী হিসেবে তাঁর স্ত্রী উভয়
ভারতীর সাথে বসবাস করতেন।
উভয় ভারতী ছিলেন শোণভদ্র নদের তীরে বসবাসকারী
বিদ্বান ও ধার্মিক ব্যক্তি
বিষ্ণু মিত্রের কন্যা।
মণ্ডন
মিশ্র ও উভয় ভারতী
ছিলেন এক আদর্শ দম্পতি;
বিদ্যাচর্চা, নৈতিক চরিত্র এবং বৈদিক অনুশাসন
পালনের কঠোর নিষ্ঠায় তাঁরা
একে অপরের সমকক্ষ ছিলেন। মণ্ডন মিশ্রকে যেমন ব্রহ্মার অবতার
বলে মনে করা হতো,
তেমনই উভয় ভারতীকে জ্ঞান
ও বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীর অবতার
বলে গণ্য করা হতো।
তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ও
সর্বজনীন শ্রদ্ধার কারণে তিনি ‘মণ্ডন মিশ্র’ উপাধিতে ভূষিত হন; তাঁর প্রকৃত
নাম ছিল বিশ্বরূপ।
শ্রীভগবৎপাদ্
তাঁর শিষ্যবর্গ ও অনুগামীদের নিয়ে
মহিষ্মতীপুর নগরে পৌঁছলেন। শঙ্করাচার্য
স্পষ্ট বাক্যে মণ্ডনকে বললেন— তিনি এখানে ভিক্ষা
গ্রহণের জন্য আসেননি, বরং
এসেছেন শাস্ত্রীয় তর্কে অবতীর্ণ হতে। পাণ্ডিত্যের ক্ষেত্রে
এর আগে কখনও সমকক্ষ
কাউকে না পাওয়া মণ্ডন
মিশ্র তর্কমূলক এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রস্তুত
ছিলেন এবং তিনি সানন্দে
তা গ্রহণ করলেন। তর্কের জন্য পরদিন সময়
নির্ধারিত হলো।
পরদিন
নিজ নিজ আশ্রমের প্রাত্যহিক
ক্রিয়াকর্ম ও স্নান-আহ্নিক
সেরে তাঁরা বিচারার্থে মিলিত হলেন। মণ্ডন মিশ্রের স্ত্রী উভয় ভারতী বিচারকের
ভূমিকা পালনে সম্মত হলেন; কারণ তাঁরা উভয়েই
তাঁর নিরপেক্ষতার ওপর আস্থা রেখে
এবং তাঁর প্রজ্ঞা ও
পাণ্ডিত্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর সহায়তা চেয়েছিলেন।
তিনিই ছিলেন একমাত্র বিদুষী নারী যিনি তর্কের
খাতিরে তাঁদের চিন্তাধারাকে সেই উচ্চমার্গীয় স্তরে
অনুসরণ করতে সক্ষম ছিলেন।
গৃহবধূ
হিসেবে উভয় ভারতীকে দৈনন্দিন
গৃহস্থালির কাজও করতে হয়,
যার মধ্যে ছিল তর্কে লিপ্ত
ব্যক্তিদের জন্য প্রতিদিনের আহার
প্রস্তুত করা, অতিথিদের সেবা
শুশ্রূষা করা ইত্যাদি; তাই
তিনি তাঁদের দুইজনকে একটি করে ফুলের
মালা দিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন
যে, যার গলার মালাটি
সবার আগে শুকিয়ে বা
ম্লান হয়ে যাবে, তিনিই
পরাজিত বলে গণ্য হবেন।
তর্কযুদ্ধকে আরও অর্থবহ করে
তুলতে তাঁরা একটি পণ বা
শর্তও স্থির করলেন। ঠিক হলো, বিতর্কে
যিনি পরাজিত হবেন, তিনি বিজয়ীর শিষ্যত্ব
গ্রহণ করবেন এবং বিজয়ীর আশ্রম
বা জীবনধারাকেই আপন করে নেবেন।
তাঁরা উভয়েই ছিলেন অসামান্য পাণ্ডিত্যের অধিকারী এবং বেদজ্ঞানে শ্রেষ্ঠ।
তাঁদের প্রাত্যহিক আচার-অনুষ্ঠান, বিশ্রাম
ও অন্যান্য আবশ্যিক কাজকর্মে কোনো ব্যাঘাত না
ঘটিয়েই এই আলোচনা প্রতিদিন
চলতে লাগল।
দিন
যতই গড়াতে লাগল, শ্রীভগবৎপাদের যুক্তির মাঝে মণ্ডন মিশ্র
এক নতুন আলোর সন্ধান
পেলেন। নিজের পূর্ববর্তী মতবাদের ওপর তাঁর আস্থা
ক্রমশ টলমল হয়ে পড়ছিল,
আর অন্যদিকে শ্রীভগবৎপাদের প্রতি তাঁর বিশ্বাস এক
গভীর ও উদ্দীপক উচ্চতায়
পৌঁছাচ্ছিল। তর্কের অষ্টম ও শেষ দিনে
মণ্ডন মিশ্র শ্রীভগবৎপাদের মতবাদের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হলেন। শ্রীভগবৎপাদ্ যেমন বলেছিলেন, ‘একবার
সেই আবরণ শক্তি বা
অবিদ্যা দূর হয়ে গেলেই
সেই অদ্বৈত ব্রহ্মাত্ম জ্ঞানের উদয় হয়।’ নিজের
মতবাদের সীমাবদ্ধতা এবং শ্রীভগবৎপাদের মতের
সত্যতা উপলব্ধি করার মুহূর্তে তিনি
দেখলেন যে, তাঁর গলার
ফুলের মালাটি ম্লান হয়ে গেছে। তিনি
শ্রীভগবৎপাদের সামনে সাষ্টাঙ্গে প্রণত হলেন, তাঁর চরণ স্পর্শ
করলেন এবং কম্পিত কণ্ঠে
বললেন, ‘হে জগদ্গুরু শঙ্কর,
আমাকে ও আমার ধৃষ্টতাকে
ক্ষমা করুন। এই আট দিন
ধরে আমি আপনার প্রতি
অপরাধ করেছি। আপনার ক্রোধ সংবরণ করুন এবং এই
দীন দাসের ওপর কৃপা বর্ষণ
করুন ও আমাকে শিষ্য
পদে বরণ করুন।’ তারপর
শ্রীভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য তাঁকে শিষ্যপদে বরণ করে সন্ন্যাস
প্রদানপূর্বক ‘শ্রীসুরেশ্বরাচার্য’ নাম প্রদান করলেন
এবং দক্ষিণাম্নায় শৃঙ্গেরি শারদাপীঠের প্রথম পীঠাধীশ পদে অভিষিক্ত করলেন।
মণ্ডনমিশ্র
সন্ন্যাস গ্রহণের পূর্বে মীমাংসা দর্শনে মীমাংসানুক্রমণিকা, ভাবনাবিবেক ও বিধিবিবেক, এই
তিনখানা গ্রন্থ রচনা করেন। তন্মধ্যে
বিধিবিবেক আয়তনে বৃহৎ ও বিচারবহুল।
এই গ্রন্থে বৈদিক বিধির স্বরূপ আলোচনা করা হয়েছে। এটা
গদ্যে ও পদ্যে লিখিত।
এটার উপর বাচস্পতি মিশ্রের
ন্যায়কণিকা নামে টীকা আছে।
তাছাড়া তিনি ভর্তৃহরির ও
অপরাপর বৈয়াকরণ আচার্যগণের অঙ্গীকৃত স্ফোটবাদের সমর্থনে স্ফোটসিদ্ধি গ্রন্থ, ভ্রমজ্ঞানের স্বরূপ আলোচনায় বিভ্রমবিবেক ও অদ্বৈতবেদান্তের ব্যাখ্যায়
ব্রহ্মসিদ্ধি ও নৈষ্কর্মসিদ্ধি নামক
প্রসিদ্ধ গ্রন্থদ্বয় রচনা করেন। তবে
ব্রহ্মসিদ্ধির দার্শনিক মত শঙ্করবেদান্ত সিদ্ধান্তের
অনুরূপ নয়। তাই এটি
তাঁর পূর্বাশ্রমের রচনা হিসেবে গণ্য
করা হয়। অর্থাৎ এটি
শঙ্কর পূর্ববর্তী বেদান্তের গ্রন্থ। মণ্ডনমিশ্রের ব্রহ্মসিদ্ধি (১) ব্রহ্ম কাণ্ড,
(২) তর্ক কাণ্ড, (৩)
নিয়োগ কাণ্ড এবং (৪) সিদ্ধি
কাণ্ড—এই চার কাণ্ড
বা পরিচ্ছেদে বিভক্ত। প্রত্যেক কাণ্ডই পদ্যে ও গদ্যে লিখিত।
ব্রহ্মসিদ্ধির উপর বাচস্পতি মিশ্রের
তত্ত্বসমীক্ষা টীকা রয়েছে। তত্ত্বসমীক্ষা
ব্রহ্মসিদ্ধির প্রাচীন ও প্রামাণিক টীকা।
তত্ত্বসমীক্ষা ব্যতীত ব্রহ্মসিদ্ধির উপর নিত্যবোধঘনাচার্যের টীকা, আনন্দপূর্ণের
ভাবশুদ্ধি টীকা, চিৎসুখাচার্যের অভিপ্রায়প্রকাশিকা টীকা ও আচার্য
শঙ্খপাণির টীকার পরিচয় পাওয়া যায়।
সুরেশ্বরাচার্যের
নৈষ্কর্মসিদ্ধি শঙ্করবেদান্তের অতি উপাদেয় ও
প্রামানিক গ্রন্থ। এটিও গদ্যে ও
পদ্যে লিখিত। এটিও চার অধ্যায়ে
সমাপ্ত। নৈষ্কর্মসিদ্ধির উপর আচার্য জ্ঞানোত্তম
মিশ্রের চন্দ্রিকা টীকা ও চিৎসুখাচার্যের
ভাবতত্ত্বপ্রকাশিকা নামে টীকা আছে।
তবে চন্দ্রিকা টীকায় প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ টীকা।
এই টীকাদ্বয় ব্যতীত নৈষ্কর্মসিদ্ধির উপর জ্ঞানামৃতের বিদ্যাসুরভি,
অখিলাত্মনের নৈষ্কর্মসিদ্ধি-বিবরণ ও রামদত্তের সারার্থ
নামক টীকাও রচিত হয়েছিল বলে
জানা যায়।
তাছাড়া
তিনি অদ্বৈতবেদান্তের বার্তিককার নামেও প্রসিদ্ধ। ভগবান্ ভাষ্যকার শঙ্করাচার্যের ভাষ্যের উপর বৃহদারণ্যক ভাষ্য
বার্তিক, তৈত্তিরীয় ভাষ্য বার্তিক, পঞ্চীকরণ বার্তিক, কাশীমোক্ষনির্ণয়, দক্ষিণামূর্তি স্তোত্রের উপর মানসোল্লাস বার্তিক
ও যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতির উপর বালক্রীড়া নামক
টীকা রচনা করেছেন।
তিনি
শৃঙ্গেরির পাশাপাশি মূলাম্নায় কাঞ্চী কামকোটি পীঠের রক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। জ্যৈষ্ঠ
শুক্ল দ্বাদশী তিথিতে (৮৩৪ খৃষ্টাব্দ মতান্তরে
৪০৭ খৃষ্টপূর্বাব্দ) রাত্রিকালে তিনি সিদ্ধি লাভ
করেন। কথিত আছে যে,
কাঞ্চীপুরমের ‘পুণ্যরস’ নামক এক অত্যন্ত
পবিত্র স্থানে তিনি লয়যোগের এক
উচ্চস্তরে প্রবেশ করেন এবং নিজের
শরীরকে শিবলিঙ্গে রূপান্তরিত করে ইহলীলা সংবরণ
করেছিলেন। সেই সিদ্ধিস্থানটি পরবর্তীকালে
তাঁর পূর্বাশ্রমের নামানুসারে ‘মণ্ডনমিশ্র অগ্রহার’ নামে পরিচিত হয়।
তিনি
ছিলেন এক মহান যোগীশ্বর।
ভগবৎপাদ্ শ্রীশঙ্করের পরম্পরাভুক্ত পরবর্তী অনেক আচার্যের গুরু
ছিলেন তিনি। সংক্ষেপ শারীরককার আচার্য সর্বজ্ঞাত্ম মুনি তাঁরই শিষ্য
ছিলেন। তাঁর অসাধারণ প্রশাসনিক
দক্ষতা ও জ্ঞানের কারণে
শ্রীশঙ্কর তাঁকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমস্ত
পীঠের কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বভারও অর্পণ করেছিলেন।
তথ্যসূত্রঃ-
১.
বেদান্তদর্শন— অদ্বৈতবাদ, প্রথম খণ্ড, আশুতোষ ভট্টাচার্য শাস্ত্রী।
২.https://www.srisharadapeetham.com/.../sri-sureshwaracharya
শ্রীশুভ
চৌধুরী
জানুয়ারি
২৯, ২০২৬ খৃষ্টাব্দ।
Photo editing credit Thākur
Vishāl See less

No comments:
Post a Comment