Sunday, 7 May 2023

পঞ্চকোশবিবেক—

 


বেদান্তে কোশ অর্থে আবরণ বা আধারকে বুঝায়। তরবারির কোশ অর্থাৎ খাপের মধ্যে যেমন তরবারিটি থাকে, সেরকম অন্নময় প্রভৃতি পাঁচটি কোশের অন্তরালে নিত্যশুদ্ধ আত্মা বিরাজমান থাকে। জল হতে উৎপন্ন শেওলা প্রভৃতির দ্বারা আবৃত হয়ে পুষ্করিণীস্থিত জল যেমন দৃষ্টিগোচর হয় না, সেই প্রকারে আত্মার অবিদ্যাশক্তি হতে উৎপন্ন অন্নময়াদি পঞ্চকোশের দ্বারা আবৃত হয়ে আত্মা প্রকাশ পায় না। যখন বিবেক-বিচারের দ্বারা পাঁচটি কোশের কোনটিই আত্মা নয়, এই প্রকার দৃঢ় নিশ্চয় জন্মে, তখন শুদ্ধ, সদানন্দময়, প্রত্যেকের অন্তরে সাক্ষিরূপে স্থিত, শ্রেষ্ঠ, প্রকাশস্বভাব আত্মা স্বতঃই প্রকাশ পান। তৈত্তিরীয় উপনিষদের দ্বিতীয় বল্লীতে পঞ্চকোশের বর্ণনা স্পষ্টরূপে দ্রষ্টব্য। "গুহাহিত"-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ -.) অর্থাৎ গুহায় অবস্থিত বলে যে ব্রহ্ম বর্ণিত হয়েছে, 'গুহা' শব্দবাচ্য অন্নময়াদি পঞ্চকোশের বিচার দ্বারা সেই ব্রহ্মকে জানতে পারা যায়।

অন্নময় কোশঃ-

"অন্নাৎপুরুষঃ"-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-.) অর্থাৎ রেতোরূপে পরিণত অন্ন হতে শিরঃ হস্তাদি আকৃতিবিশিষ্ট দেহ উৎপন্ন হল। সেই প্রসিদ্ধ দেহ অন্নরসময়অন্নরসের বিকার। মাতাপিতার ভুক্ত অন্নাদির পরিণাম হতে উৎপন্ন এই দেহ অন্নময় কোশ বলে অভিহিত হয়। এটা অন্নের দ্বারা জীবিত থাকে, অন্ন না পেলে মরে যায়।

ত্বক-চর্ম-মাংস-রক্ত-অস্থি-বিষ্ঠার সমষ্টি এই অন্নময় কোশ কখনও নিত্যশুদ্ধ আত্মা হতে পারে না। দেহ আত্মা নয় কেন?

 এই দেহ জন্মের আগে বা মৃত্যুর পরেও বর্তমান থাকে না। এটা জন্ম-মৃত্যুর মধ্যকালে অল্প সময়ের জন্য আবির্ভূত হয় এবং অল্পকালের জন্যই রমণীয়ভাবে প্রকাশ পায়। এটা যতদিন বর্তমান থাকে ততদিন একরূপও থাকে না (অঙ্গপ্রত্যঙ্গাদির হ্রাস-বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন পরিণতিলাভ করে); এটা ঘটাদির মতো দৃশ্য পদার্থ (ঘট যেমন মৃত্তিকার পরিণামমাত্র এবং ক্ষণস্থায়ী, দেহও তেমন ভূতসমূহের পরিণাম) এবং জড় (চৈতন্যরহিত) এই প্রকারের দেহ কিভাবে দেহ মনের সকলপরিণামের জ্ঞাতা স্বীয় আত্মা হতে পারে? (অর্থাৎ জড়দেহ কখনই চৈতন্যস্বরূপ আত্মা নয়; আত্মা দেহ হইতে সর্বতোভাবে ভিন্ন) দেহ আত্মা নয় কেন? উৎপন্ন হয়, বিনাশ পায়, অল্পসময়মাত্র বর্তমান থাকে, বিভিন্ন পরিণামপ্রাপ্ত হয়, বিকারগ্রস্ত হয়, দৃষ্ট হয় এবং জড়স্বভাব বলে দেহ আত্মা হতে পারে না।

প্রাণময় কোশঃ-

পঞ্চকর্মেন্দ্রিয়ের সহিত সংযুক্ত হয়ে প্রাণই প্রাণময় কোশরূপে পরিণত হয়। এই প্রাণময় কোশের দ্বারা ব্যাপ্ত হয়ে জড় অন্নময়কোশ চেতনের ন্যায় সকল কর্মে প্রবৃত্ত হয়। শ্রুতি বলছেন"তস্মাদ্বা এতস্মাদন্নরসময়াৎ। অন্যোহন্তর আত্মা প্রাণময়ঃ। তেনৈষ পূর্ণঃ।"-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-.) অর্থাৎ এই অন্নরসময় দেহপিণ্ড হতে পৃথক অথচ তারই অভ্যন্তরে প্রাণের পরিণামভূত এবং আত্মারূপে কল্পিত প্রাণময় কোশ আছে। সেই প্রাণময় কোশের দ্বারা অন্নময় কোশ পরিপূর্ণ।

প্রাণময় কোশ অপঞ্চীকৃত বায়ুর বিকার বলে আত্মা নয়। যেহেতু এটা বায়ুর ন্যায় ভিতরে বাইরে যাতায়াত করে, কোন কালে কিছুমাত্র ভাল-মন্দ বুঝতে পারে না, 'কে আপন কে বা পর' নির্ণয় করতে পারে না এবং যেহেতু এটা পরাধীন (অর্থাৎ মনের অধীন), সেহেতু এটা আত্মা হতে পারে না।

মনোময় কোশঃ-

পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয় এবং মন একত্র মনোময়-কোশ বলে অভিহিত হয়। 'আমি' 'আমার' ইত্যাদি প্রকারের নানাবিধ বস্তুকল্পনার কারণ এবং নামরূপ-ক্রিয়াদি বিবিধ ভেদের সহিত বর্তমান এবং বলবান্ এই মনোময় কোশ তৎপুর্ববর্তী প্রাণময়-কোশকে ব্যাপিয়া প্রকাশ পায়।

দেহের চেষ্টাসমূহ প্রাণের অধীন বলে দেহ অপেক্ষা প্রাণ বলবান্। আবার প্রাণের ক্রিয়াসমূহ মনের সংকল্পের উপর নির্ভর করে বলে মনোময় কোশ বলিষ্ঠ। বিষয়ে শ্রুতি প্রমাণ"তস্মাদ্ বা এতস্মাৎ প্রাণময়াৎ অন্যোহন্তরঃ আত্মা মনোময়ঃ। তেনৈষ পূর্ণঃ।'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ -.) অর্থাৎ উক্ত প্রাণময় হতে ব্যতিরিক্ত অথচ তদভ্যন্তরে মনোময় কোশ আছে। সেই মনোময়ের দ্বারা প্রাণময় পূর্ণ।

মনোময় কোশ যেহেতু উৎপত্তি বিনাশশীল, পরিণামী, দুঃখময় এবং জ্ঞানের বিষয়, সেহেতু এটা কিছুতেই পরমাত্মা হতে পারে না। দ্রষ্টা কখনোই দৃশ্য বস্তুরূপে কারও জ্ঞানের বিষয় হন না। 'অন্নমশিতং ত্রেধা বিধীয়তে; তস্য যঃ স্থবিষ্ঠো ধাতুস্তৎ পুরীষং ভবতি, যো মধ্যমস্তন্মাংসং, যোহণিষ্ঠস্তন্মনঃ'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-..)—ভুক্ত অন্ন ত্রিবিধ আকারে পরিণত হয়। ওটার স্থূলতম অংশ মলে, মধ্যমাংশ মাংসে এবং সূক্ষ্মতম অংশ মনে পরিণত হয়। 'অস্য পুরুষস্য প্রয়তো বাঙ্মনসি সম্পদ্যতে মনঃ প্রাণে প্রাণস্তেজসি তেজঃ পরস্যাং দেবতায়াম্।'--(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-..) অর্থাৎ এই পুরুষ যখন মুমূর্ষু হয় তখন তার বাক্ মনে, মন প্রাণে, প্রাণ তেজে এবং তেজ পরম দেবতায় উপসংহৃত হয়। এই দুই শ্রুতিবাক্য দ্বারা মনোময় কোশ যে উৎপত্তি বিনাশশীল তা বলা হল।

বিজ্ঞানময় কোশঃ-

বুদ্ধি যখন পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয়ের সহিত যুক্ত, অহংকারাদি বৃত্তির এবং 'আমি কর্তা' এই অনুভবের সহিত বর্তমান থাকে, তখন তা বিজ্ঞানময়-কোশ নামে অভিহিত হয়। এই বিজ্ঞানময়-কোশই জীবের সংসার-বন্ধনের কারণ। প্রসিদ্ধ মনোময় হতে ভিন্ন তদভ্যন্তরস্থ হচ্ছে বিজ্ঞানময় শরীর। সেই বিজ্ঞানময়ের দ্বারা এই মনোময় পরিপূর্ণ। "তস্মাদ্ বা এতস্মাৎ প্রাণময়াৎ অন্যোহন্তরঃ আত্মা বিজ্ঞানময়ঃ। তেনৈষ পূর্ণঃ।'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ -.)

চিৎ-শক্তির প্রতিবিম্বের সহিত বর্তমান, প্রকৃতির বিকার, জ্ঞান ক্রিয়াশক্তিসম্পন্ন বিজ্ঞানময় কোশ স্বভাবতঃ জড় হলেও চৈতন্য-প্রতিবিম্বিত হওয়ার জন্য সর্বদা সম্পূর্ণরূপে দেহ ইন্দ্রিয়সমূহ 'আমি' এরূপ জ্ঞান করে থাকে। অহংবোধের আশ্রয়, উৎপত্তিরহিত, বিজ্ঞানময়-কোশরূপ এই জীব লৌকিক বৈদিক সকল কর্মের অনুষ্ঠান করে থাকে। সে বিষয়ে শ্রুতিই প্রমাণ। 'বিজ্ঞানং যজ্ঞং তনুতে কর্মাণি তনুতেহপি চ।'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ -.) বিজ্ঞানই (নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি) যজ্ঞ বিস্তৃত করে এবং কর্মসমূহের অনুষ্ঠাতা। বিজ্ঞানময়-কোশরূপী এই জীব নানা যোনিতে জন্মগ্রহণ করে কখনও ঊর্ধ্বগতি কখনও অধোগতি প্রাপ্ত হয়। জাগ্রতস্বপ্নাদি অবস্থার অনুভব এবং সুখ-দুঃখাদিরও অনুভব এই বিজ্ঞানময় জীবেরই হয়ে থাকে। শুদ্ধ আত্মা নির্বিকার। তার জন্মমরণ, সুখদুঃখ-ভোগ বা জাগ্রৎ-স্বপ্নাদি অবস্থার অনুভবএসব কিছুই হয় না। সুতরাং বিজ্ঞানময়-কোশ চিদাত্মা হতে পারে না। এই বিজ্ঞানময়-কোশ বিকারশীল। ইহা জড়, দেশকালের দ্বারা সীমাবদ্ধ, দৃশ্যবস্তু এবং ব্যাভিচারী।

আনন্দময় কোশঃ-

বাঞ্ছিত বস্তুর লাভে প্রকাশপ্রাপ্ত, প্রিয়-মোদ-প্রমোদরূপে পরিণত, স্থিরীভূত এবং অন্তর্মুখ-তমোবৃত্তি আনন্দস্বরূপ আত্মার দ্বারা প্রতিবিম্বিত হয়ে আনন্দময়-কোশরূপে পরিণত হয়। সৌভাগ্যশালী ব্যক্তিগণের পুণ্যকর্মের অনুভবের সময় এই আনন্দময় কোশ স্বতঃ প্রকাশ পায়। দেহধারী জীবমাত্র বিনা চেষ্টায় এই আনন্দময়-কোশে সুখানুভব করে। 

'প্রিয়াদিগুণকঃ'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-.) প্রিয়, মোদ প্রমোদআনন্দসম্ভোগের এই ত্রিবিধ প্রকার আনন্দময়-কোশের গুণ।

তমোগুণরূপ উপাধিযুক্ত বলে, প্রকৃতির পরিণাম বলে, পূর্বকৃত পূর্ণ্যকর্মসমূহের ফলে উৎপন্ন বলে এবং অন্নময়াদি বিকারসমূহের মধ্যে বর্তমান বলে এই আনন্দময় কোশও পরমাত্মা হতে পারে না। যুক্তির দ্বারা এবং শ্রুতিপ্রমাণের সহায়ে অন্নময়াদি পঞ্চকোশ আত্মা নয়, এটা প্রমাণিত হলে মিথ্যা বলে প্রমাণিত এই কোশসমূহ যাঁর আশ্রয়ে প্রকাশিত হয়, সেই স্বয়ংপ্রকাশ চৈতন্যস্বরূপ আত্মা অবশিষ্ট থাকেন। 'পঞ্চকোশ পরিত্যাগে সাক্ষিবোধ-অবশেষতঃ স্বস্বরূপং এব' অর্থাৎ পঞ্চকোশের পরিত্যাগ করলে যে সাক্ষিরূপ বোধ অবশিষ্ট থাকে, তাই স্বস্বরূপ।.........

তথ্যসূত্র-

. ভগবান্ শঙ্করাচার্যের 'বিবেকচূড়ামণি'

. আচার্য বিদ্যারণ্য স্বামীর 'পঞ্চদশী'

. তৈত্তিরীয় উপনিষৎ।

 

শ্রীশুভ চৌধুরী

ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।

অদ্বৈতজ্ঞান ও উপাসনার মধ্যে পার্থক্য কি?

 


ভগবান্ শঙ্করাচার্য সামবেদীয় ছান্দোগ্য উপনিষদের ভাষ্যভূমিকায় স্পষ্ট বলেছেনঅদ্বৈতজ্ঞান হচ্ছেনিষ্ক্রিয় আত্মাতে আরোপিত কর্তৃ-কর্মাদি কারক, ক্রিয়া তৎফলবিষয়ক নৈসর্গিক ভেদজ্ঞানের বিমর্দক; প্রকাশ বা আলোকজনিত রজ্জু প্রভৃতির স্বরূপ-নিশ্চয় যেরূপ রজ্জু প্রভৃতিতে সর্পাদির আরোপাত্মক জ্ঞানের নিবর্তক হয়, এটাও তদ্রূপ।

আর উপাসনা হচ্ছেশাস্ত্রানুসারে ব্যবস্থিত কোন একটি আলম্বন (ধ্যানের বিষয়) অবলম্বন করে, তাতেই এমনভাবে চিত্তবৃত্তির একাকার প্রবাহ সমুৎপাদন করতে হয় যে, তার মধ্যে আর অন্যবিষয়ক জ্ঞান উৎপন্ন হয়ে ওটার ব্যবধান জন্মাতে না পারে, এটাই উভয়ের মধ্যে বিশেষ। এই উপাসনাসমূহ সত্ত্বশুদ্ধিকর অর্থাৎ মনের রজস্তমোবৃত্তি বিদূরিত করে সত্ত্বগুণের বৃদ্ধি করে বলে বস্তুর যথার্থ তত্ত্ব-প্রকাশক হয়; সুতরাং অদ্বৈতজ্ঞানলাভেরও উপকারী বা সহায়, এবং আলম্বনবিষয়ক হওয়ায় সুখসাধ্যও বটে। পূর্ব হতেই কর্মাভ্যাস বা কর্ম সংস্কার দৃঢ়তর থাকায় হঠাৎ কর্ম পরিত্যাগপূর্বক উপাসনায় মনোনিবেশ করাই দুষ্কর; এজন্য প্রথমেই কর্মাঙ্গ-বিষয়ক উপাসনা এই উপনিষদে উপন্যস্ত হচ্ছে।.....

শ্রীশুভ চৌধুরী

এপ্রিল ২৪, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।

Wednesday, 29 March 2023

নির্বিশেষ অদ্বৈতবাদ শূন্যবাদ হইয়া পড়ে—এইরূপ আপত্তির নিরসনঃ-

 


পূর্বপক্ষঃ- তুরীয়ে যদি কোনরূপই বিশেষ ভাব না থাকে, তাহা হইলে তাহা শূন্য হইয়া পড়ে?

উত্তরপক্ষঃ- নাতাহা শূন্য নহে; কারণ, বিনা কারণে কখনই মিথ্যাময় কল্পনা হইতে পারে না; কেননা, শুক্তি, রজ্জু, স্থাণু (কাণ্ডশাখাদিবিহীন বৃক্ষাংশ) মরুভূমি প্রভৃতি আশ্রয় ব্যতিরেকে নিরাশ্রয়ভাবে কখনই (যথাক্রমে) রজত, সর্প, মনুষ্য, মৃগতৃষ্ণাদি ভ্রমপ্রতীতি কল্পনা করিতে পারা যায় না।

আপত্তিঃ- তিনি যদি সর্ব্বকল্পনার আশ্রয়স্থান হন, তাহা হইলে ঘটাদি পদার্থ যেরূপ জলাধারাদিরূপে শব্দ-বাচ্য হয়, সেইরূপ তুরীয়ও (ভ্রমাধিষ্ঠানরূপে) শব্দবাচ্য হইতে পারেন; সুতরাং নিষেধ দ্বারা তাঁহার প্রতীতি সম্পাদনের আবশ্যক হয় না।

উত্তরঃ- না আপত্তি হইতে পারে না ; কারণ, শুক্তিকা প্রভৃতিতে কল্পিত রজতাদির ন্যায় প্রাণাদির কল্পনাও অসৎঅবস্তু; সৎ অসতের সম্বন্ধ কখনই শব্দজনিত বোধের বিষয় হইতে পারে না ; কারণ, উহা অবস্তুমিথ্যা। আর গবাদি সত্য পদার্থ যেরূপ স্বরূপতই প্রত্যক্ষাদি প্রমাণান্তরের বিষয় হয়, সেরূপও হইতে পারে না; কারণ, আত্মা বস্তুটি নিরুপাধিক। গবাদির ন্যায় জাতিবিশিষ্টও নহে, কারণ, অদ্বিতীয় পদার্থের সামান্য বিশেষভাব নাই; আর পাচকাদির ন্যায় ক্রিয়াবত্ত্বও নাই, কারণ, অবিক্রিয়; নীলাদি দ্রব্যের ন্যায় গুণবত্তাও নাই, কারণ, তিনি নির্গুণ; কাজেই তিনি শব্দ দ্বারা নির্দ্দেশযোগ্য হন না।.......

ঋণঃ- ভগবান্ শঙ্করাচার্য্যের মাণ্ডুক্য উপনিষৎ ভাষ্য।

শ্রীশুভ চৌধুরী

মার্চ ২৬, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।

সমাধিঃ-

 


প্রত্যয়ের একতানতা অর্থাৎ একতত্ত্ববিষয়ে প্রবাহ। তাহাও দুই প্রকারবিচ্ছিন্ন হইয়া জাত এবং সতত (প্রবাহমান) দুইটি প্রকার যথাক্রমে ধ্যান সমাধি হয়। ইতোমধ্যে ধ্যান বিষয়ে পূর্ব লিখায় আলোচনা করিয়াছি। সেই ধ্যানই যখন তাহার বিষয়মাত্র প্রকাশে স্বরূপ-শূন্য-মতো হয়, তখন তাহা হইল সমাধি। ভগবান্ যোগসূত্রকার তাহাই বলিতেছেন

তদেবার্থমাত্রনির্ভাসং স্বরূপশূন্যমিব সমাধিঃ।।(যোগসূত্র-/)

-তাহাই যখন সমুদয় বাহ্যোপাধি পরিত্যাগ করিয়া কেবল অর্থমাত্রকে প্রকাশ করে, তখনসমাধিআখ্যা প্রাপ্ত হয়।

ভাষ্যকার ব্যাস বলিতেছেন— 'ধ্যেয়ের আকার প্রকাশক ধ্যানই যখন নিজ জ্ঞান-বৃত্ত্যাত্মক স্বরূপের দ্বারা শূন্য-মতো হইয়া যায় ধ্যাতাতে ধ্যেয় বস্তুর স্বভাবের একটানা আবেশ ঘটায়, তখন তাহাকে সমাধি বলা হইয়াছে।'

যোগবার্তিককারের মতে জীবাত্মা পরমাত্মার যে সমতা অর্থাৎ যখন জীবাত্মা মন বুদ্ধি অস্মিতার মিলন সত্ত্বা ভিন্ন অন্য পরম সত্ত্বায় অর্থাৎ কেবলমাত্র পরমাত্মায় স্থিতি (ব্রাহ্মীস্থিতি লাভ) করে, তখনকার সেই অবস্থা হইল সমাধি। ভগবান্ শঙ্করাচার্য্য অপরোক্ষানুভূতিতে তাহাই বলিতেছেন—'সম্পূর্ণ বিকাররহিত বৃত্তিদ্বারা পুনরায় ব্রহ্মের সহিত একাত্ম চিন্তন দ্বারা যথাযথভাবে বৃত্তিসমুদায়ের বিস্মৃতিই জ্ঞানসংজ্ঞক সমাধি বলিয়া কথিত।'

সমাধি দুই প্রকার। একটিকেসম্প্রজ্ঞাত অপরটিকেঅসম্প্রজ্ঞাতবলে।

#সম্প্রজ্ঞাত

যোগসূত্রের সমাধিপাদে বর্ণিত আছে"বিতর্কবিচারানন্দাস্মিতানুগমাৎ সম্প্রজ্ঞাতঃ" অর্থাৎ যে সমাধিতে বিতর্ক, বিচার, আনন্দ অস্মিতা অনুগত থাকে, তাহাকে সম্প্রজ্ঞাত সমাধি বলে। ধ্যানাভ্যাসের উৎকর্ষ হলে অহঙ্কার বর্জিত  ব্রহ্মাকারা মনোবৃত্তির প্রবাহ হয়, তাকে সম্প্রজ্ঞাত সমাধি বলে। শ্রুতি তাহাই বলিতেছেন

ব্রহ্মাকারমনোবৃত্তিপ্রবাহোঽহঙ্কৃতং বিনা।সম্প্রজ্ঞাতসমাধিঃ স্যাদ্ধ্যানাভ্যাসপ্রকর্ষতঃ॥-(মুক্তিকোপনিষৎ-/৫৩)

#অসম্প্রজ্ঞাত

 "বিরাম-প্রত্যয়াভ্যাসপূর্বঃ সংস্কারশেষোহন্যঃ" অর্থাৎ অন্যপ্রকার সমাধিতে সর্বদা সমুদয় মানসিক ক্রিয়ার বিরাম অভ্যাস করা হয়, কেবল চিত্তের দৃঢ় সংস্কার-মাত্র অবশিষ্ট থাকে। ইহাই পূর্ণ জ্ঞানাতীতঅসম্প্রজ্ঞাত সমাধি’; এই সমাধি পরমানন্দদায়ী। শ্রুতি তাহাই বলিতেছেন

প্রশান্তবৃত্তিকং চিত্তং পরমানন্দদায়কম্।

অসম্প্রজ্ঞাতনামায়ং সমাধির্যোগিনাং প্রিয়ঃ -(মুক্তিকোপনিষৎ-/৫৪)

যখন এই অসম্প্রজ্ঞাত অর্থাৎ জ্ঞানাতীত অবস্থা লাভ হয়, তখন সমাধি নির্বীজ হইয়া যায়।.....

শ্রীশুভ চৌধুরী

মার্চ ১৭, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।

Saturday, 18 March 2023

ব্রহ্ম শাস্ত্রপ্রমাণগম্য, অনুমানাদিগম্য নহেনঃ-

 


ব্রহ্ম বেদৈকবেদ্য। একমাত্র বেদরূপ প্রমাণের দ্বারাই জগতের কারণাদিরূপে ব্রহ্মকে জানা যায় বলিয়া, ব্রহ্ম বেদমাত্রগম্য। ভগবান্ বাদরায়ণ বলিতেছেনশাস্ত্রযোনিত্বাৎ৷৷- (ব্রহ্মসূত্র- ১।১।৩)

ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য শারীরক-মীমাংসা ভাষ্যে বলিতেছেন

প্রদীপের ন্যায় সর্বার্থপ্রকাশক মহৎ যে ঋগ্বেদাদি শাস্ত্র, যাহা বেদাঙ্গ, পুরাণ, ন্যায়, মীমাংসা, স্মৃতি ধর্ম্মশাস্ত্র প্রভৃতি অনেক বিদ্যাস্থান দ্বারা পুষ্ট এবং যাহা সর্বজ্ঞকল্প অর্থাৎ সর্ব্বপ্রকার জ্ঞানের আকর হইলেও অচেতন হওয়াই যাহাকে প্রায় সর্বজ্ঞ বলা যায়, তাহার যোনি অর্থাৎ উপাদান এবং নিমিত্ত কারণ ব্রহ্ম।

'অস্য মহতো ভূতস্য নিঃশ্বসিতং যদেতদৃগ্বেদো যজুর্বেদঃ সামবেদঃ অর্থবাঙ্গিরসঃ।'-(বৃহদারণ্যক উপনিষদ ..১০)

অর্থাৎ এই যে ঋগ্বেদাদি চতুর্বেদ ইহারা এই মহৎভূতের নিঃশ্বসিত তথা নিঃশ্বাসের ন্যায় ব্রহ্মের বিনাপ্রযত্নে অভিব্যক্ত।

এই প্রকার শ্রুতি আছে বলিয়া ঋগ্বেদাদি শাস্ত্র সর্ব্ববিধ জ্ঞানের আকর স্বরূপ, তাহা বিনাপ্রযত্নে লীলান্যায়ে পুরুষের নিঃশ্বাসের ন্যায় মহৎ ভূত ব্রহ্মরূপ যোনি কারণ হইতে উৎপন্ন। এই ব্রহ্মের যথার্থ স্বরূপ অবগতির প্রতি পূর্ব্ব কথিত ঋগ্বেদাদি শাস্ত্র হয় যোনি, অর্থাৎ কারণ অর্থাৎ প্রমাণ। শাস্ত্ররূপ প্রমাণ হইতেই জগতের জন্মাদির কারণরূপে ব্রহ্ম অধিগত হন, ইহাই অভিপ্রায়।

শ্রীভারতী তীর্থ বৈয়াসিক ন্যায়মালাতে বলিতেছেন

রূপ এবং লিঙ্গরহিত হওয়ায় ইঁহার অন্য প্রমাণযোগ্যতা নাই। কোনপ্রকার রূপ-রসাদি না থাকায় ব্রহ্ম ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নহেন এবং লিঙ্গ (—জ্ঞাপক চিহ্ন) সাদৃশ্যাদি রহিত হওয়ায় তিনি অনুমান উপমানাদি প্রমাণেরও বিষয় নহেন। "তং তু ঔপনিষদং পুরুষং পৃচ্ছামি"-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-..২৬) অর্থাৎ সেই উপনিষৎপ্রতিপাদ্য পুরুষের বিষয় জিজ্ঞাসা করিতেছি", ইত্যাদি শ্রুতিতে পরব্রহ্মরূপ পুরুষ উপনিষদ্গম্য, ইহা প্রতীত হইতেছে।.....

শ্রীশুভ চৌধুরী

মার্চ , ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।

 

জ্ঞানী ভোগ্যবিষয়ে মনের কঠিনতা আর ভগবদ্বিষয়ে মনের কোমলতা সম্পাদন করে—

  আচার্য মধুসূদন সরস্বতী ভক্তিরসায়নে বলছেন — কাঠিন্যং বিষয়ে কুর্যাদ্ দ্রবত্বং ভগবৎপদে। উপায়ৈঃ শাস্ত্রনির্দিষ্টৈরনুক্ষণমতো ব...