Wednesday, 6 March 2024

প্রকাশানন্দ সরস্বতী—

 


নব্যন্যায়ের অভ্যুত্থান, বৈষ্ণবমতের জাগরণ সাংখ্যমতের বিকাশ প্রভৃতির ফলে খৃষ্টীয় পঞ্চদশ ষোড়শ শতকে অদ্বৈতবাদের সহিত যে বাদযুদ্ধ ঘনীভূত হয়ে আসছিল, সেই যুদ্ধে অদ্বৈতবাদী প্রকাশানন্দ, নৃসিংহাশ্রম, অপ্পয় দীক্ষিত প্রমুখ আচার্যগণ অগ্রসর হয়ে তাঁদের প্রতিভার অমল জ্যোতিতে সর্বপ্রকার অদ্বৈত-বিরোধী সিদ্ধান্তের অন্ধকাররাশি ভেদ করে অদ্বৈতবেদান্তের গৌরব-পতাকা বহন করেন। তন্মধ্যে অগ্রজ আচার্য হলেন প্রকাশানন্দ সরস্বতী। আচার্য জ্ঞানানন্দের শিষ্য ছিলেন তিনি। কাশীধামে অবস্থান করে তিনি "বেদান্ত-সিদ্ধান্তমুক্তাবলী" নামে এক উপাদেয় গ্রন্থ রচনা করে অদ্বৈতবাদের বিশেষ পুষ্টি সাধন করেন। প্রকাশানন্দ বিদ্যারণ্য মুনীশ্বরের পঞ্চদশী হতে উদাহরণ আহরণ করেছেন বলে মনে হয়, এদিকে অপ্পয় দীক্ষিত তদীয় সিদ্ধান্তলেশ-সংগ্রহে বেদান্ত-সিদ্ধান্তমুক্তাবলীর উক্তি উদ্ধৃত করেছেন। আচার্য অপ্পয় দীক্ষিত ষোড়শ শতকের মধ্যভাগে আবির্ভূত হন, বিদ্যারণ্য মুনীশ্বর খৃষ্টীয় চতুর্দশ শতকে প্রকট হন সুতরাং প্রকাশানন্দের স্থিতিকাল খৃষ্টীয় পঞ্চদশ শতক বলে নিশ্চিতরূপে নির্ণয় করা যায়।

প্রকাশানন্দ সিদ্ধান্তমুক্তাবলীতে মণ্ডনমিশ্রের ব্রহ্মসিদ্ধিতে প্রদর্শিত "দৃষ্টিসৃষ্টিবাদ" বিবিধ যুক্তিতর্কের সাহায্যে স্থাপন করেছেন। গৌড়পাদ্ প্রভৃতি প্রবীণ আচার্যগণ বিশ্ব-সৃষ্টিকে স্বপ্ন-সৃষ্টির সহিত তুলনা করেছেন। বিশ্বপ্রপঞ্চ স্বপ্ন-সৃষ্টির তুল্য হলে দৃষ্টিসৃষ্টিবাদই সঙ্গত বলে মনে হয়। প্রকাশানন্দের বেদান্ত-সিদ্ধান্তমুক্তাবলীর উপর নানাদীক্ষিত সিদ্ধান্ত-দীপিকা নামে টীকা রচনা করে প্রকাশানন্দের মত জিজ্ঞাসুর নিকট সুগম করে দিয়েছেন। বেদান্ত-সিদ্ধান্তমুক্তাবলী ব্যতীত প্রকাশানন্দ তারা-ভক্তি-তরঙ্গিণী, মনোরমাতন্ত্র-রাজ-টীকা, মহালক্ষ্মী-পদ্ধতি, শ্রীবিদ্যা-পদ্ধতি প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করে তন্ত্র-রহস্য প্রকাশ করেন। তিনি একাধারে তান্ত্রিক সাধক অদ্বৈতবেদান্তী ছিলেন। প্রকাশানন্দ নামে শ্রীচৈতন্যদেবের এক শিষ্যের পরিচয় পাওয়া যায়। চৈতন্যদেবের শিষ্য প্রকাশানন্দ বেদান্ত-সিদ্ধান্তমুক্তাবলীর রচয়িতা প্রকাশানন্দ হতে ভিন্নব্যক্তি।.......

তথ্যসূত্রঃ-

"বেদান্তদর্শনঅদ্বৈতবাদ", প্রথম খণ্ড, শ্রীআশুতোষ শাস্ত্রী, কাব্য-ব্যাকরণ-সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ বিদ্যাবাচস্পতি।

শ্রীশুভ চৌধুরী

ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৪ খৃষ্টাব্দ।

Tuesday, 27 February 2024

মুক্তির সাধন কি?

 


অদ্বৈতবেদান্তে জ্ঞানই একমাত্র মুক্তির সাধন। ভগবান্ শঙ্করাচার্য শ্রীগীতাভাষ্যের তৃতীয় অধ্যায়ের উপক্রমণিকাতে বলেছেন"তস্মাৎ কেবলাদেব জ্ঞানাৎ মোক্ষ ইত্যেষোঽর্থো নিশ্চিতো গীতাসু সর্বোপনিষৎসু চ।" অর্থাৎ কেবল জ্ঞানের দ্বারাই যে মোক্ষলাভ হয়, তা গীতা সকল উপনিষদে নিশ্চিতরূপে প্রতিপাদিত হয়েছে। জীবের সংসার-বন্ধন মিথ্যা, অজ্ঞানমূলক। জ্ঞানই অজ্ঞানকে বিনাশ করতে পারে; জ্ঞান ব্যতীত অপর কিছু দ্বারা অজ্ঞানের বিনাশ হয় না। আলোক যেমন অন্ধকারকে বিনাশ করেই উৎপন্ন হয়, চিদালোকও সেরূপ অজ্ঞানান্ধকারকে দূর করেই উদিত হয়। জ্ঞানোদয়ে কর্ম নিরস্ত হয়, কর্ম বাধ্য, জ্ঞান কর্মের বাধক; সুতরাং নিত্য ব্রহ্মবিজ্ঞানে কর্ম কোনমতেই সাধন হতে পারে না।

বেদান্তদর্শনের পুরুষার্থাধিকরণে বর্ণিত আছে

"পুরুষার্থোঽতঃ শব্দাদিতি বাদরায়ণঃ"-(ব্রহ্মসূত্র-..)

অর্থাৎ বেদান্তবিহিত এই স্বতন্ত্র (কর্মনিরপেক্ষ) আত্মজ্ঞান হতে (মোক্ষরূপ) পুরুষার্থ সিদ্ধ হয়, এটা আচার্য বাদরায়ণ মনে করেন। কোন প্রমাণবলে? উত্তর —'শব্দ (শ্রুতি) হতে', এটা ভগবান্ সূত্রকার বলছেন। সেই শ্রুতিগুলো এই

'তরতি শোকমাত্মবিৎ'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-..) অর্থাৎ আত্মবিৎ শোককে অতিক্রম করেন।

 ' যো বৈ তৎপরমং ব্রহ্ম বেদ ব্রহ্মৈব ভবতি'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-..) অর্থাৎ যিনি সেই পরব্রহ্মকে জানেন, তিনি ব্রহ্মই হয়ে যান।

 'ব্রহ্মবিদাপ্নোতি পরম্'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-..) অর্থাৎ ব্রহ্মবিদ্ পরব্রহ্মকে প্রাপ্ত হন।

'আচার্যবান্পুরুষো বেদ তস্য তাবদেব চিরং যাবন্ন বিমোক্ষ্যেথ সংপৎস্যে'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-.১৪.) অর্থাৎ আচার্যবান পুরুষই ব্রহ্মকে জানতে পারেন, সৎস্বরূপ আত্মলাভে তাঁর ততকালই বিলম্ব, যতকাল না বিমুক্ত হন (—প্রারব্ধ কর্মের ক্ষয় হয়ে দেহ পাত হয়), অনন্তর সতের সহিত একীভূত হন।

'সর্বাংশ্চ লোকানাপ্নোতি সর্বাংশ্চ কামান্যস্তমাত্মানমনুবিদ্য বিজানাতি'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-..) অর্থাৎ যিনি এই আত্মাকে (শাস্ত্র আচার্যের উপদেশ হতে) অবগত হয়ে বিশেষরূপে জানেন, তিনি সকল লোক সকল কাম্যবস্তু প্রাপ্ত হন।

 'এতাবদরে খল্বমৃতত্বম্'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-..১৫)

অর্থাৎ হে মৈত্রেয়ি, এইটুকুমাত্রই (—আত্মদর্শনই) অমৃতত্বের সাধন", ইত্যাদি এই জাতীয় শ্রুতি কেবল কর্মনিরপেক্ষ ব্রহ্মবিদ্যার পুরুষার্থহেতুতা শ্রবণ করাচ্ছেন।

এখন প্রশ্ন হল, কর্ম যদি জীবের মুক্তি দানে সমর্থ না হয়, তবে শাস্ত্রে যে যজ্ঞ, দান, সেবা প্রভৃতি জীবের অবশ্য কর্তব্য কর্মের উপদেশ দেয়া হয়েছে, সে সকল শাস্ত্রবিধি কি অর্থহীন? এই আপত্তির উত্তরে শঙ্করাচার্য গীতাভাষ্যে বলেন যে, নিষ্কাম কর্ম চিত্তের শুচিতা সম্পাদন করে বলে কর্ম নিরর্থক নয়। নিষ্কামভাবে ঈশ্বরার্পণ-বুদ্ধিতে কর্মের অনুষ্ঠান করলে চিত্তের মলিনতা বিদূরিত হয়। চিত্তশুদ্ধির ফলে সংসারে বৈরাগ্যোদয় হয়, সংসার-বন্ধন হতে মুক্ত হবার জন্য তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রভৃতির উদয় হয়। নির্মল নিষ্কলুষ চিত্তে স্বতঃস্ফূর্ত ব্রহ্মজ্ঞান প্রতিফলিত হয়। "শুধ্যমানন্তু তচ্চিত্তমীশ্বরাপিতকর্মভিঃ। বৈরাগ্যং ব্রহ্মলোকাদৌ ব্যনক্ত্যর্থ সুনির্মলম্।"-(নৈষ্কর্মসিদ্ধি)

কর্ম অদ্বৈতমতে মুক্তির সাক্ষাৎ সাধন নয়, গৌণ সাধন। ব্রহ্মজ্ঞানে যজ্ঞাদি সকল কর্মেরই যে অপেক্ষা আছে তা আচার্য শঙ্কর ব্রহ্মসূত্রের (..২৬) এর ভাষ্যে স্পষ্ট বলছেন"অপেক্ষতে বিদ্যা সর্বাণ্যাশ্রমকর্মাণি, নাত্যন্তমনপেক্ষৈব৷" অর্থাৎ ব্রহ্মবিদ্যা আশ্রমবিহিত (কাম্যবর্জ্জিত নিত্য নৈমিত্তিক) সকল কর্ম্মকে অপেক্ষা করে, অত্যন্ত অনপেক্ষ অবশ্যই নয়। তাতে প্রমাণ কি? যেহেতু যজ্ঞাদিবোধক শ্রতিবাক্য আছে, যথা'তমেতং বেদানুবচনেন ব্রাহ্মণা বিবিদিষন্তি যজ্ঞেন দানেন তপসানাশকেন '-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-..২২) অর্থাৎ সেই উপনিষৎপ্রতিপাদ্য ব্রহ্মকে ব্রাহ্মণগণ বেদপাঠ, যজ্ঞ, দান যথেচ্ছ ভোজন না করারূপ তপস্যার দ্বারা জানতে ইচ্ছা করেন।" এই শ্রুতিতে 'বিবিদিষা মাত্র', অর্থাৎ ব্রহ্মকে জানবার ইচ্ছা মাত্র উৎপাদ্যরূপে সমর্পিত হচ্ছে। আর বিবিদিষার সহিত সম্বন্ধবশতঃ আশ্রমবিহিত কর্মের ব্রহ্মজ্ঞানের উৎপত্তিতে সাধনভাব নিশ্চিত হচ্ছে। কর্মসকল পরম্পরাসম্বন্ধে ব্রহ্মজ্ঞানের সাধন। কর্মসকল পাপকে নাশ করে, জ্ঞান কিন্তু পরমা গতি (—মোক্ষের সাধন), কর্মসকলের দ্বারা পাপ বিনষ্ট হলে তদনন্তর জ্ঞানের উদয় হয়।....

তথ্যসূত্রঃ-

. ভগবান্ শঙ্করাচার্যের শারীরক-মীমাংসা শ্রীগীতা ভাষ্য।

. সুরেশ্বরাচার্যের নৈষ্কর্মসিদ্ধি।

শ্রীশুভ চৌধুরী

ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৪ খৃষ্টাব্দ।

Monday, 12 February 2024

আচার্য নৃসিংহাশ্রম—

 


নৃসিংহাশ্রম অদ্বৈতবেদান্তের একজন বিখ্যাত আচার্য। তিনি জগন্নাথ আশ্রমের শিষ্য এবং রামতীর্থের সতীর্থ। ইনি ১৫৪৭ খৃষ্টাব্দে "বেদান্ত-তত্ত্ববিবেক" নামে এক অতি উপাদেয় প্রমেয় বহুল গ্রন্থ রচনা করেন। এতদ্ব্যতীত তিনি ভেদ-ধিক্কার, অদ্বৈত-দীপিকা, অদ্বৈতপঞ্চরত্ন, পঞ্চপাদিকা বিবরণের উপর ভাব-প্রকাশিকা টীকা, সংক্ষেপ শারীরকের ব্যাখ্যা তত্ত্ববোধিনী, মল্লনারাধ্যাচার্যের অভেদরত্নের উপর তত্ত্বদীপন নামে টীকা, বৈদিকসিদ্ধান্ত-সংগ্রহ প্রভৃতি রচনা করে অদ্বৈত-বিরোধী মতবাদ ছিন্নভিন্ন করে অদ্বৈতবেদান্তের বিজয়-বৈজয়ন্তী সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।

নৃসিংহাশ্রমের প্রত্যেকখানা গ্রন্থই যুক্তির গভীরতায়, তর্কের সাবলীল গতিতে এবং রচনা-কৌশলে অতুলনীয়। ইনার মত পণ্ডিত কদাচিৎ দৃষ্ট হয়। নৃসিংহাশ্রমই অপ্পয়-দীক্ষিতকে তাঁর পিতা রঙ্গরাজাধ্বরি পিতামহ আচার্য দীক্ষিতের অসামান্য অদ্বৈত-বিদ্যাবত্তা অদ্বৈত-নিষ্ঠার কথা স্মরণ করিয়ে শৈব-বিশিষ্টাদ্বৈত মত পরিত্যাগ করিয়ে অদ্বৈতবাদের বিবিধ নিবন্ধ রচনায় উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁরই অনুপ্রেরণাই অপ্পয়দীক্ষিত বেদান্তকল্পতরু পরিমল, সিদ্বান্তলেশ-সংগ্রহ প্রভৃতি অদ্বৈতবেদান্তের কালজয়ী গ্রন্থরাজি রচনা করে অদ্বৈতবাদকে সুদৃঢ় ভিত্তিতে স্থাপন করেন।

নৃসিংহাশ্রম বেদান্ত-তত্ত্ববিবেকে জগতের মিথ্যাত্ব নিরূপণ করতে গিয়ে চিৎসুখাচার্যের মতের অনুবর্তন করেছেন। এই বেদান্ত-তত্ত্ববিবেকের উপর জ্ঞানেন্দ্র সরস্বতীর শিষ্য অগ্নিহোত্রীর তত্ত্ববিবেচনী নামে টীকা আছে। সিদ্ধান্তকৌমুদীর রচয়িতা ভট্টোজি দীক্ষিতও তত্ত্ববিবেকের উপর বিবরণ নামে টীকা রচনা করেছিলেন বলে জানা যায়। নৃসিংহাশ্রমের শিষ্য নারায়ণাশ্রম নৃসিংহাশ্রমের অদ্বৈতদীপিকার উপর বিবরণ নামে টীকা ভেদধিক্কারের উপর সৎক্রিয়া নামে টীকা রচনা করে নৃসিংহাশ্রমের দার্শনিক মত বুঝবার পথ সুগম করেন।.......

তথ্যসূত্রঃ-

. বেদান্তদর্শনঅদ্বৈতবাদ, আশুতোষ শাস্ত্রী কাব্য-ব্যাকরণ-সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ বিদ্যাবাচস্পতি।

. শ্রীযোগেন্দ্রনাথ তর্কসাংখ্যবেদান্ততীর্থ অনুবাদিত "অদ্বৈতসিদ্ধিঃ" গ্রন্থের ভূমিকা।

শ্রীশুভ চৌধুরী

ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৪ খৃষ্টাব্দ।

মায়া কি অনাদি? এই বিষয়ে শাস্ত্রপ্রমাণ কি?

 


প্রথমেই শ্রীগীতার ভগবৎবচন দিয়ে আরম্ভ করি। ভগবান্ বলছেন"প্রকৃতিং পুরুষং চৈব বিদ্ধ্যনাদী উভাবপি।"-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৩/২০) অর্থাৎ প্রকৃতি পুরুষ উভয়কেই অনাদি বলে জানবে। এই প্রকৃতি হচ্ছেন ঈশ্বরের বিকার-কারণ-শক্তি ত্রিগুণাত্মিকা মায়া। গীতার এই শ্লোকের ভাষ্যে ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য তাই বলেছেন"প্রকৃতিঃ ঈশ্বরস্য বিকারকারণশক্তিঃ ত্রিগুণাত্মিকা মায়া।" তাছাড়া শ্রুতিতেও প্রকৃতিকে মায়া বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে —"মায়াং তু প্রকৃতিং বিদ্যান্মায়িনং তু মহেশ্বরম্"-(শ্বেতাশ্বতর উপনিষৎ-/১০) অর্থাৎ প্রকৃতিকে মায়া বলে জানবে এবং মহেশ্বরকে মায়াধীশ বলে জানবে।

এই শ্বেতাশ্বতর উপনিষদেই অনাদি প্রকৃতিকে অজা অর্থাৎ জন্মরহিত বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যথাঅজামেকাং লোহিতশুক্লকৃষ্ণাং বহ্বীঃ প্রজাঃ সৃজমানাং সরূপাঃ। -(শ্বেতাশ্বতর উপনিষৎ-/) ইত্যাদি।

মাণ্ডুক্য কারিকার আগম প্রকরণে বর্ণিত আছে

"অনাদিমায়য়া সুপ্তো যদা জীবঃ প্রবুধ্যতে। অজমনিদ্রমস্বপ্নমদ্বৈতং বুধ্যতে তদা।"

অর্থাৎ অনাদি মায়া বিমোহিত, অজ্ঞাননিদ্রায় সুপ্ত, তত্ত্বজ্ঞানবিমূঢ় জীব যখন জাগরিত হয় অর্থাৎ গুরু কর্তৃক উপদিষ্ট হয়ে শ্রবণ, মনন, নিদিধ্যাসনপূর্বক ব্রহ্মাত্মৈক্য জ্ঞান লাভ করে, তখন সেই সাধক জন্ম-মৃত্যুরহিত, অন্যথাগ্রহণরূপ বিপরীত জ্ঞানবর্জিত, অজ্ঞাননিদ্রা রহিত অদ্বৈত ব্রহ্মাত্মতত্ত্ব অবগত হয়।

তাছাড়া অথর্ববেদীয় সর্বসারোপনিষদে অনাদি অনির্বচনীয় মায়ার স্বরূপ অত্যন্ত স্পষ্টরূপেই বর্ণিত আছে

"অনাদিরন্তর্বত্নী প্রমাণাপ্রমাণসাধারণা সতী নাসতী, সদসতী স্বয়ম্ অবিকারাৎ বিকারহেতৌ নিরূপ্যমাণেঽসতী। অনিরূপ্যমানে সতী লক্ষণশূন্যা মায়েত্যুচ্যতে।"

-(সর্বসারোপনিষৎ-১৩)

"আদি নেই কিন্তু অন্ত আছে, প্রমাণ আছে আবার প্রমাণ নেই, আছে বলা যায় না আবার নেইও বলা যায় না। সৎ অসৎ একসঙ্গে বলা যায় না, (ব্রহ্ম) স্বয়ং বিকারশূন্য হওয়ায় বিকারের হেতুরূপে নিরূপ্যমান (জ্ঞাত) হলে নেই এবং বিকারের হেতুরূপে নিরূপিত না হলে আছে-এইরূপ লক্ষণশূন্য যা (ভাব) তাই- মায়া বলে কথিত হয়।"

শ্রীশুভ চৌধুরী

ফেব্রুয়ারি , ২০২৪ খৃষ্টাব্দ।

Wednesday, 31 January 2024

শ্রীশারদাপ্রার্থনা

 


শঙ্করাচার্য বিরচিত "শ্রীশারদাপ্রার্থনা" অথবা সরস্বতীস্তুতিঃ বঙ্গানুবাদ সমেত

নমস্তে শারদে দেবি কাশ্মীরপুরবাসিনি

ত্বামহং প্রার্থয়ে নিত্যং বিদ্যাদানং দেহি মে ।।১।। 

ভাবার্থ- হে কাশ্মীরপুরবাসিনী শারদা দেবী, তোমায় নমস্কার, আমি তোমার কাছে নিত্য (প্রত্যহ) প্রার্থনা করি, আমায় অনুগ্রহ করে বিদ্যা দান কর।

যা শ্রদ্ধা ধারণা মেধা বাগ্দেবী বিধিবল্লভা

ভক্তজিহ্বাগ্রসদনা শমাদিগুণদায়িনী ।।২।।

ভাবার্থ- তুমিই শ্রদ্ধা, ধারণা, মেধা বাগ্দেবী (বাক্শক্তির অধিষ্ঠাত্রী দেবী) তথা বিধির (ব্রহ্মার) পত্নী। তুমি ভক্তের জিহ্বার অগ্রভাগে বাস কর শম, দম, তিতিক্ষা প্রভৃতি গুণদায়িনী।

নমামি যামিনীং নাথলেখালঙ্কৃতকুন্তলাম্

ভবানীং ভবসন্তাপনির্বাপণসুধানদীম্ ।।৩।।

ভাবার্থ- হে যামিনী (সংযমী বা ধৈর্যশীল), তোমাকে নমস্কার। তোমার কেশের বেণীবন্ধন আঁকাবাঁকা ডোরা যেন জ্ঞানের রেখা দিয়ে সজ্জিত। হে ভবানী, তুমি সুধামৃত নদীর ন্যায় এই ভব সংসারের শোক, দুঃখাদি নিরাময় কর। 

ভদ্রকাল্যৈ নমো নিত্যং সরস্বত্যৈ নমো নমঃ

বেদবেদাঙ্গবেদান্তবিদ্যাস্থানেভ্য এব ।।৪।। 

ভাবার্থ- ভদ্রকালীকে সর্বদা নমস্কার। সরস্বতীকে বারংবার নমস্কার। বেদ, বেদাঙ্গ, বেদান্ত এবং বিদ্যাস্থানসমূহকেও নমস্কার। 

ব্রহ্মস্বরূপা পরমা জ্যোতিরূপা সনাতনী

সর্ববিদ্যাধিদেবী যা তস্যৈ বাণ্যৈ নমো নমঃ ।।৫।। 

ভাবার্থ - তুমি পরব্রহ্মের স্বরূপ জ্যোতিরূপা তথা সনাতনী, তুমি সর্ববিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। হে বাণী, তোমাকে প্রণাম করি। 

যয়া বিনা জগৎসর্বং শশ্বজ্জীবন্মৃতং ভবেৎ

জ্ঞানাধিদেবী যা তস্যৈ সরস্বত্যৈ নমো নমঃ ।।৬।।

ভাবার্থ- যিনি বিনা সম্পূর্ণ জগৎ মৃত মনে হবে যদিও তা প্রকৃত পক্ষে জীবিত, সেই জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীকে প্রণাম। 

যয়া বিনা জগৎসর্বং মূকমুন্মত্তবৎসদা

যা দেবী বাগধিষ্ঠাত্রী তস্যৈ বাণ্যৈ নমো নমঃ |||| 

ভাবার্থ - আমি সেই বাক্যের অধিষ্ঠাত্রী বাগ্দেবী বাণীকে প্রণাম করি যার অনুপস্থিতিতে সমগ্র জগৎ মূক (বাক্শক্তিহীন) তথা উন্মত্তের মত হয়ে যেত। 

ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্যস্য শ্রীমচ্ছঙ্কর ভগবতঃ কৃতৌ শ্রীশারদাপ্রার্থনা অথবা সরস্বতীস্তুতিঃ সম্পূর্ণম্। 

ইতি ভগবান্ শঙ্করাচার্য বিরচিত শ্রীশারদাপ্রার্থনা অথবা সরস্বতীস্তুতিঃ সমাপ্ত।

 

শ্রীশুভ চৌধুরী

জানুয়ারি ২৯, ২০২০ খৃষ্টাব্দ।

জ্ঞানী ভোগ্যবিষয়ে মনের কঠিনতা আর ভগবদ্বিষয়ে মনের কোমলতা সম্পাদন করে—

  আচার্য মধুসূদন সরস্বতী ভক্তিরসায়নে বলছেন — কাঠিন্যং বিষয়ে কুর্যাদ্ দ্রবত্বং ভগবৎপদে। উপায়ৈঃ শাস্ত্রনির্দিষ্টৈরনুক্ষণমতো ব...