Sunday, 23 January 2022

পুষ্করাষ্টকম্

|| শ্রীগণেশায় নমঃ ||

শ্রিয়ায়ুতং ত্রিদেহতাপপাপরাশিনাশকং

মুনীন্দ্রসিদ্ধসাধ্যদেবদানবৈরভিষ্টুতম্ ।

তটেস্তি যজ্ঞপর্বতস্য মুক্তিদং সুখাকরং

নমামি ব্রহ্মপুষ্করং সবৈষ্ণবং সশঙ্করম্ ||১||

ভাবার্থ - যিনি শ্রীমান্‌, যিনি স্থুল সূক্ষ্ম ও কারণদেহস্থ আধ্যাত্মিক, আধিদৈব ও আধিভৌতিক এই তাপত্রয় ও পাতকপুঞ্জ বিনাশ করেন ঋষিশ্রেষ্ঠগণ, সিদ্ধবৃন্দ, সাধ্যগণ ও সুরাসুরগণ যার স্তব করেন, যিনি যজ্ঞশৈলের তটদেশে অধিষ্ঠিত, যিনি মোক্ষপ্রদ ও সুখের আকর, সেই স-বৈষ্ণব সশঙ্কর ব্রহ্মপুষ্কর প্রণাম করি ||১||

সদার্যমাসশুষ্কপঞ্চবাসরে বরাগতং

তদন্যথান্তরিক্ষগং সুতন্ত্রভাবনানুগম্ ।

তদম্বুপানমজ্জনং দৃশাং সদামৃতাকরং

নমামি ব্রহ্মপুষ্করং সবৈষ্ণবং সশঙ্করম্ ||২||

ভাবার্থ - যিনি পুণ্য কার্তিকমাসের শুক্লপক্ষীয় ( অন্তিম ) পঞ্চদিবসে প্রাদুর্ভূত হন, তদ্ভিন্ন অন্য সময়ে গগনমার্গে অধিষ্ঠান করেন, একাগ্রচিন্তে ধ্যান করলে যাকে লাভ করা যায়, যাতে স্নান বা যার জল পান এবং দর্শন করলে সুখলাভ হয়, সেই স-বৈষ্ণব স-শঙ্কর ব্রহ্মপুষ্করকে প্রণাম করি ||২||

ত্রিপুষ্কর ত্রিপুষ্কর ত্রিপুষ্করেতি সংস্মরেৎ

সুদূরদেশগোঽপি যস্তদঙ্গপাপনাশনম্ ।

প্রপন্নদুঃখভঞ্জনং সুরঞ্জনং সুধাকরং

নমামি ব্রহ্মপুষ্করং সবৈষ্ণবং সশঙ্করম্ ||৩||

ভাবার্থ - দুরদেশে অবস্থান করেও যে ব্যক্তি “ত্রিপুষ্কর, ত্রিপুষ্কর, ত্রিপুষ্কর' এই নাম স্মরণ করে, তার শরীরস্থিত যাবতীয় পাতক বিলয় প্রাপ্ত হয়। যিনি আশ্রিতজনের ক্লেশ দূর করেন, যিনি সকলের চিত্তরঞ্জন করেন এবং যিনি অমৃতের আধার, দেই স-বৈষ্ণব স-শঙ্কর ব্রহ্মপুষ্করকে প্রণাম করি ||৩||

মৃকণ্ডুমঙ্কণৌ পুলস্ত্যকণ্বপর্বতাসিতা

অগস্ত্যভার্গবৌ দধীচিনারদৌ শুকাদয়ঃ।

সপদ্মতীর্থপাবনৈকদ্দষ্ট্যো দয়াকরং

নমামি ব্রহ্মপুষ্করং সবৈষ্ণবং সশঙ্করম্ ||৪||

ভাবার্থ - মৃকণ্ডু, মঙ্কণ, পুলস্ত্য, কণ্ব, পর্বত, শুক প্রভৃতি- ঋষিগণ নিজ নিজ জনপাবন দৃষ্টি যে পদ্ম ( পুষ্কর ) তীর্থে একমাত্র নিবন্ধ রেখেছেন, করুণার আকর সেই স-বৈষ্ণব স-শঙ্কর ব্রহ্মপু্ষ্করকে প্রণাম করি ||৪||

সদা পিতামহেক্ষিতং বরাহবিষ্ণুনেক্ষিতং

তথাঽমরেশ্বরেক্ষিতং সুরাসুরৈঃ সমীক্ষিতম্ ।

ইহৈব ভুক্তিমুক্তিদং প্রজাকরং ঘনাকরং

নমামি ব্রহ্মপুষ্করং সবৈষ্ণবং সশঙ্করম্ ||৫||

ভাবার্থ - পিতামহ ব্রহ্মা, বরাহরূপী হরি, সুরপতি ইন্দ্র ও অপরাপর দেবদানবেরা নিরন্তর যাকে দর্শন করেন, যিনি ইহধামেই ভুক্তি, মুক্তি, সন্ততি ও ধনসম্পত্তি প্রদান করেন, সেই স-বৈষ্ণব স-শঙ্কর ব্রহ্মপুষ্করকে প্রণাম করি ||৫||

ত্রিদণ্ডিদণ্ডিব্রহ্মচারিতাপসৈঃ সুসেবিতং

পুরার্ধচন্দ্রপ্রাপ্তদেবনন্দিকেশ্বরাভিধৈঃ ।

সবৈদ্যনাথনীলকণ্ঠসেবিতং সুধাকরং

নমামি ব্রহ্মপুষ্করং সবৈষ্ণবং সশঙ্করম্ ||৬||

ভাবার্থ - ত্রিদণ্ডী, দণ্ডী, ব্রহ্মচারী ও তাপসবৃন্দ যার সেবা করেন, অর্ধচন্দ্রধারী নন্দিকেশ্বরাখ্য দেব যার উপাসনা করেন, বৈদ্যনাথ ও নীলকণ্ঠ যার সেবা করেন এবং যিনি অমৃতের আধার, সেই স-বৈষ্ণব, স-শঙ্কর ব্রহ্মপুষ্করকে প্রণাম করি ||৬||

সুপঞ্চধা সরস্বতী বিরাজতে যদন্ত্তরে

তথৈকয়োজনায়তং বিভাতি তীর্থনায়কম্ ।

অনেকদৈবপৈত্রতীর্থসাগরং রসাকরং

নমামি ব্রহ্মপুষ্করং সবৈষ্ণবং সশঙ্করম্ ||৭||

ভাবার্থ - সরস্বতী পঞ্চমূর্তিতে যার কিঞ্চিৎ দুরে বিরাজ করছেন, যিনি একযোজনবিস্তৃত তীর্থরাজরূপে শোভমান, যিনি অসংখ্য দৈব ও পৈত্র তীর্থের সমুদ্রস্বরূপ এবং যিনি রসের আধার, সেই স-বৈষ্ণব স-শঙ্কর ব্রহ্মপুষ্করকে প্রণাম করি ||৭||

যমাদিসংয়ুতো নরস্ত্রিপুষ্করং নিমজ্জতি

পিতামহশ্চ মাধবোপ্যুমাধবঃ প্রসন্নতাম্ ।

প্রয়াতি তৎপদং দদাত্যযত্নতো গুণাকরং

নমামি ব্রহ্মপুষ্করং সবৈষ্ণবং সশঙ্করম্ ||৮||

ভাবার্থ - যে ব্যক্তি যমাদিপরায়ণ হয়ে এই পু্ষ্করতীর্থে স্নান করে, হরি-হর-ব্রহ্মা তার প্রতি প্রসন্ন হয়ে অনায়াসে স্ব স্ব পদ প্রদান করে থাকেন। আমি এতাদৃশ গুণাকর স-বৈষ্ণব স-শঙ্কর ব্রহ্মপুষ্করকে প্রণাম করি ||৮||

ফলশ্রুতি :-

ইদং হি পুষ্করাষ্টকং সুনীতিনীরজাশ্রিতং

স্থিতং মদীয়মানসে কদাপি মাঽপগচ্ছতু ।

ত্রিসন্ধ্যমাপঠন্তি যে ত্রিপুষ্করাষ্টকং নরাঃ

প্রদীপ্তদেহভূষণা ভবন্তি মেশকিঙ্করাঃ ||৯||

ভাবার্থ - -এই পুষ্করাষ্টক সুনীতিরূপ কমলের আশ্রিত, এ আমার মানসে ( মনন, অপ্সর মানসসরোবরে ) অধিষ্ঠিত হোক, যেন কখনও অন্যত্র গমন না করে। যারা ত্রিসন্ধ্য এই ত্রিপুষ্করাষ্টক স্তোত্র পাঠ করে, তারা দিব্য তেজঃপুর্ণ শরীররূপ অলঙ্কারে অলঙ্কত হয়ে রমাপতির কিঙ্করত্ব প্রাপ্ত হয় ||৯||

|| ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্যস্য শ্রীমচ্ছঙ্কর ভগবতঃ কৃতৌ শ্রীপুষ্করাষ্টকং সমাপ্তম্ ॥

ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্য শ্রীমদ্ শঙ্করাচার্য বিরচিত শ্রীপুষ্করাষ্টক স্তোত্র সমাপ্ত।

 

Monday, 10 January 2022

"সোঽহমস্মি"

 


শুক্লযজুর্ব্বেদীয় বাজসনেয়-সংহিতোপনিষদে বর্ণিত আছে-

পূষন্নেকর্ষে যম সূর্য প্রাজাপত্য ব্যূহ রশ্মীন্ ।

সমূহ তেজো যত্তে রূপং কল্যাণতমং তত্তে পশ্যামি

যোঽসাবসৌ পুরুষঃ সোঽহমস্মি ॥ ঈশোপনিষৎ ১৬ ॥

ভগবান শঙ্করাচার্য্য ভাষ্যে বলিতেছেন-

হে পূষন্! জগতকে পোষণ করেন বলিয়া রবি হইতেছেন পূষা, তথা একাকী গমন করেন বলিয়া একর্ষি, হে একর্ষে! আর সকলকে নিয়মিত করেন বলিয়া যম; হে যম! আর রশ্মি, প্রাণ ও রসসমূহের গ্রাহক বলিয়া সূর্য; হে সূর্য! প্রজাপতির অপত্য বলিয়া প্রাজাপত্য; হে প্রাজাপত্য! স্বীয় রশ্মিসমূহকে ব্যূহ অর্থাৎ দূর কর। তেজ অর্থাৎ তোমার জ্যোতিকে একত্রিত অর্থাৎ উপসংহার কর। তোমার যে অত্যন্ত সুন্দর কল্যাণতমরূপ আছে তাহা তোমার নিজ কৃপায় আমি দেখিব। কিন্তু আমি ভৃত্যের ন্যায় তোমার নিকট প্রার্থনা করিতেছি না। কেন না ঐ যে ব্যাহৃতিরূপ অবয়বসম্পন্ন ঐ আদিত্যমণ্ডলস্থ পুরুষ, যিনি পুরুষাকার বলিয়া অথবা যিনি প্রাণ ও বুদ্ধিরূপে নিখিল জগৎ পূর্ণ করিয়াছেন বলিয়া অথবা যিনি হৃদয়পুরে শয়ন করেন বলিয়া পুরুষ। 'সোঽহম্ অস্মি ভবামি' অর্থাৎ তিনিই (-সেই পুরুষই) আমি।

 

Saturday, 8 January 2022

ইন্দ্রিয়ের সংখ্যা নিরূপণঃ-


পূর্ব আলোচনায় মুখ্যপ্রাণ ও ইন্দ্রিয়সকলের উৎপত্তি নিরূপণ করিয়া সেই সকল হইতে জীবস্বরূপের বিবেকের জন্য এক্ষণে সেই ইতর (-মুখ্যপ্রাণ হইতে ভিন্ন) ইন্দ্রিয়সকলের সংখ্যা নিরূপিত হইতেছে। মুখ্যপ্রাণ ও তদ্বিষয়ে জ্ঞাতব্যসকল পরবর্তীতে আলোচিত হইবে। বেদান্তমীমাংসা শাস্ত্রের সপ্তগত্যধিকরণম্ এর প্রতিপাদ্য বিষয় এইসকল ইন্দ্রিয়ের সংখ্যা নিরূপণ।

আচার্য শঙ্কর ব্রহ্মসূত্রের (২/৪/৫) ভাষ্যে এই বিষয়ে বিভিন্ন শ্রুতির উল্লেখ করিতেছেন-কোন কোন স্থলে সাতটি ইন্দ্রিয় বর্ণিত হইতেছে-

'সপ্ত প্রাণাঃ প্রভবন্তি তস্মাৎ'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-২/১/৮)

"ব্রহ্ম হইতে সাতটি ইন্দ্রিয় (-পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়, বাক্ ও মন) উৎপন্ন হয়।"

আবার কোন কোন স্থলে উক্ত সাতটি ও হস্ত নিয়ে আটটি ইন্দ্রিয় গ্রহত্বরূপ গুণের দ্বারা বর্ণিত হইতেছে-

'অষ্টৌ গ্রহা অষ্টাবতিগ্রহাঃ'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৩/২/১)

"আটটি গ্রহ ও আটটি অতিগ্রহ" ইত্যাদি।

কোন কোন স্থলে নয়টি ইন্দ্রিয় বর্ণিত হইতেছে-

'সপ্ত বৈ শীর্ষণ্যাঃ প্রাণা দ্বাববাঞ্চৌ'-(তৈত্তিরীয় সংহিতা ৫/১/৭/১)

"মস্তকস্থ ইন্দ্রিয় নিশ্চয় সাতটি (চক্ষুর্দ্বয়, কর্ণদ্বয়, নাসাছিদ্রদ্বয় ও বাক্) এবং (পায়ু ও উপস্থ) এই দুইটি নিম্নে অবস্থিত।"

কোথাও দশটি বর্ণিত হইতেছে-'নব বৈ পুরুষে প্রাণা নাভির্দশমী'-(তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ-২/১/৭)

"পুরুষে (-পুরুষাকার দেহে উপরোক্ত) নয়টি অবশ্যই আছে, নাভি দশম।"

কোথাও এগারটি বর্ণিত হইতেছে-'দশেমে পুরুষে প্রাণা আত্মৈকাদশঃ'-(বৃহদারণ্যক উপনিষদ-৩/৯/৪)

"পুরুষে (-পুরুষোপাধি দেহে, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়) এই দশটি ইন্দ্রিয় বর্তমান আছে, মন একাদশ‌।"

তাছাড়া কোন কোন স্থলে দ্বাদশটি বর্ণিত হইতেছে, যেমন- 'সর্বেষাং স্পর্শানাং ত্বগেকায়নম্'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-২/৪/১১)

"ত্বগিন্দ্রিয়ই সকলপ্রকার স্পর্শের একমাত্র আশ্রয়", ইত্যাদি।

আবার কোথাও ত্রয়োদশটিও বর্ণিত হইয়াছে-'চক্ষুশ্চ দ্রষ্টব্যং চ'-(প্রশ্ন উপনিষৎ-৪/৮)

"চক্ষু এবং দ্রষ্টব্য বিষয়" ইত্যাদি এইস্থলে।

এই প্রকারে ইন্দ্রিয়সকলের সংখ্যা নির্দ্ধারণের প্রতি শ্রুতি সকল বিরোধগ্রস্ত হইতেছে। একপক্ষের মতে ইন্দ্রিয়ের সংখ্যা সাতটিই। যেহেতু উপরোক্ত মুণ্ডক ও তৈত্তিরীয় শ্রুতিতে ইহারা বিশেষিত হইয়াছে। আর যে একাদশাদি সংখ্যান্তরের শ্রবণ তাহা ইন্দ্রিয়ের বিভিন্ন বৃত্তিকে অপেক্ষা করে। এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত সূত্র হইল-

হস্তাদয়স্তু স্থিতেতো নৈবম্৷৷ ব্রহ্মসূত্র-২.৪.৬৷৷

অর্থাৎ 'তু' এই শব্দটি পূর্বসূত্রের একপক্ষীয় মতকে নিরাকরণ করিতেছে। হস্তদ্বয় ইত্যাদিকেও শ্রুতিতে ইন্দ্রিয় হিসেবেই গ্রহণ করা হইয়াছে। ইহা যেহেতু অবধারিত বিষয়, সেইহেতু ইন্দ্রিয়সমূহ সপ্তসংখ্যক মাত্র নহে।

আচার্য শঙ্কর ভাষ্যে সিদ্ধান্ত করিতেছেন- 'হস্তো বৈ গ্রহঃ স কর্মণাতিগ্রহেণ গৃহীতো হস্তাভ্যাং হি কর্ম করোতি'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৩/২/৮)

"হস্তদ্বয়ই গ্রহ, তাহা কর্ম্মরূপ (-গ্রহণকরারূপ) অতিগ্রহের দ্বারা গৃহীত (-আবদ্ধ), যেহেতু হস্তদ্বারায় কর্ম্মানুষ্ঠান করে", ইত্যাদি এইসকল শ্রুতিতে সাতটি হইতে অতিরিক্ত হস্ত প্রভৃতি অপর ইন্দ্রিয়সকল পঠিত হইতেছে।

তাহা হইলে ইন্দ্রিয়ের সংখ্যা কত? ভাষ্যকার সিদ্ধান্ত করিতেছেন একাদশটি। সেই বিষয়ে শ্রুতি উদাহৃতা হইয়াছে-'দশেমে পুরুষে প্রাণা আত্মৈকাদশঃ'-(বৃহদারণ্যক উপনিষদ-৩/৯/৪)

"পুরুষে (-পুরুষোপাধি দেহে, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়) এই দশটি ইন্দ্রিয় বর্তমান আছে, আত্মা (-মন) একাদশ‌স্থানীয়।" আত্মশব্দে কিন্তু অন্তঃকরণ পরিগৃহীত হইতেছে, যেহেতু ইহা করণের (-বিষয়গ্রাহক ইন্দ্রিয়ের প্রকরণ।

কিন্তু একাদশ হইতেও অধিক দ্বাদশ এবং ত্রয়োদশ সংখ্যা উদাহৃত হইয়াছে। হ্যাঁ সত্য, উদাহৃত হইয়াছে; কিন্তু একাদশটি কার্য (—ইন্দ্রিয়ের বিষয়) হইতে অধিক কার্য্য বিদ্যমান নাই, তাহার জন্য অধিক করণ কল্পনা করিতে হইবে। শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধবিষয়ক পাঁচপ্রকার বিভিন্ন বুদ্ধি (—জ্ঞান), তাহাদিগের জন্য পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় আবশ্যক।

আর বচন (—বাগ্ ব্যবহার), আদান (—গ্রহণ), বিহরণ (—চলন), উৎসর্গ (—মলত্যাগ) ও আনন্দ , এই পাঁচপ্রকার বিভিন্ন কর্ম্ম, তাহাদিগের জন্য পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয় আবশ্যক। সকল পদার্থই যাহার বিষয় এবং কালত্রয়েই যাহার বৃত্তি (—ক্রিয়া) হয়, সেই মন কিন্তু এক ও অনেক বৃত্তিযুক্ত। কোন কোন স্থলে বৃত্তির বিভিন্নতাবশতঃ তাহাই বিভিন্নের ন্যায় কথিত হয়, যথা—মন বুদ্ধি অহঙ্কার ও চিত্ত, এইপ্রকার। আর দেখ শ্রুতি কাম প্রভৃতি নানাবিধ বৃত্তিসকলকে উল্লেখ করিয়া বলিতেছেন-

'এতত্সর্বং মন এব'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-১/৫/৩) "এইসমস্ত মনই", ইত্যাদি।

অতএব কার্য্যলিঙ্গক অনুমানপুষ্ট আগমপ্রমাণবলে ইন্দ্রিয়ের একাদশত্ব সংখ্যা নিরূপিত হইল।.......

প্রকারান্তরে ইন্দ্রিয়ের সংখ্যা নিরূপণঃ-

ইতোমধ্যে বেদান্তমীমাংসা শাস্ত্রাবলম্বনে আলোচনা করিয়াছি ইতর ইন্দ্রিয়ের সংখ্যা একাদশটী। এক্ষণে সেই সিদ্ধান্তই আর পুষ্ট করা হইবে। ব্রহ্মসূত্রের সপ্তগত্যধিকরণের দ্বিতীয় বর্ণকে ইন্দ্রিয় সকলই বিষয়। জীবের সহিত কতগুলি প্রাণ উৎক্রমণ করে, ইহা এখানে বিচারিত হইয়াছে।

ভগবান শঙ্করাচার্য সিদ্ধান্ত সূত্রের (২/৪/৬) ভাষ্যে বলিতেছেন-"হস্তদ্বয় নিশ্চয় গ্রহ"-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৩/২/৮), ইত্যাদি শ্রুতি বাক্যসকলে কিন্তু সাতটী হইতে অতিরিক্ত হস্ত প্রভৃতি অপর ইন্দ্রিয়সকল প্রতীত হইতেছে। আর গ্রহত্ব বলিতে বন্ধনভাব অবগত হওয়া যাইতেছে, যেহেতু ক্ষেত্রজ্ঞ (-জীব) এই গ্রহ নামক বন্ধনের দ্বারা বদ্ধ হয়। আর এই ক্ষেত্রজ্ঞ একটী মাত্র শরীরেই বদ্ধ হয় না, যেহেতু অন্য শরীরসকলেও তাহার বন্ধন সমানই হইয়া থাকে। সেইহেতু এই গ্রহনামক বন্ধন অন্য শরীরেও সঞ্চরণ করে, ইহা অর্থবলে কথিত হইতেছে। যেমন দেখ, "প্রাণ যাহার আদি, সেই পূর্য্যষ্টকাত্মক লিঙ্গের দ্বারা জীব বদ্ধ হন। তাহার দ্বারা যিনি বদ্ধ, তাঁহারই বন্ধন এবং তাহা হইতে যিনি মুক্ত তাঁহারই মুক্তি।" ব্রহ্মপুরাণোক্ত ইত্যাদি স্মৃতি মোক্ষের পূর্ব্ব পর্য্যন্ত এই গ্রহসংজ্ঞক বন্ধনের সহিত অবিয়োগ প্রদর্শন করিতেছেন।......

এখন প্রশ্ন পূর্য্যষ্টক কি? অর্থাৎ দেহরাজ জীবের আটটী পুরী। সুরেশ্বরাচার্য্য 'পঞ্চীকরণ' সূত্রের বার্ত্তিকে স্পষ্ট করিতেছেন-

"১.আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল ও পৃথিবী- এই পাঁচটী অপঞ্চীকৃত ভূতসূক্ষ্ম একটী পুরী; ২. অবিদ্যা একটী পুরী; ৩. কাম একটী পুরী; ৪. কর্ম্ম একটী পুরী; লিঙ্গশরীর অর্থাৎ ৫. পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় একটী পুরী; ৬. পঞ্চ কর্ম্মেন্দ্রিয় একটী পুরী; ৭. পঞ্চ প্রাণ একটী পুরী; ৮. মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার এবং চিত্তরূপ অন্তঃকরণ একটী পুরী- দেহরাজ জীবের এই অষ্টপুর বলিয়া জানিবে।"-(পঞ্চীকরণ বার্ত্তিক- ৩৬)

ভগবান ভাষ্যকার উক্ত সূত্রের ভাষ্যে আরও একটী শ্রুতিপ্রমাণ প্রদর্শন করিয়া ইহা সিদ্ধ করিলেন যে ইন্দ্রিয়ের সংখ্যা একাদশটী। যথা-

'দশেমে পুরুষে প্রাণা আত্মৈকাদশস্তে যদাস্মাচ্ছরীরান্মর্ত্যাদুত্ক্রামন্ত্যথ রোদয়ন্তি'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৩/৯/৪)

"পুরুষে (-তদাকার দেহে) এই দশটী ইন্দ্রিয়, আত্মা(-মন) একাদশ, তাহারা যখন এই মরণশীল শরীর হইতে উৎক্রমণ করে, তখন (-কুটুম্বগণকে) রোদন করায়", এইপ্রকারে শ্রুতি একাদশটী ইন্দ্রিয়ের উৎক্রান্তি প্রদর্শন করিতেছেন।

 

 

আর্তত্রাণ নারায়ণাষ্টাদশকম্

 


প্রহ্লাদ প্রভুরস্তি চেত্তব দৃরিঃ সর্বত্র মে দর্শয়

স্তম্ভে চৈনমিতি ব্রুবন্তমসুরং তত্রাবিরাসীদ্ধরিঃ ।

বক্ষস্তস্যবিদারয়ন্নিজনখৈর্বাৎসল্যমাবেদয়ন্ন্-

আর্তত্রাণপরায়ণঃ স ভগবান্নারায়ণো মে গতিঃ ||১||

ভাবার্থ - “হে প্রহ্লাদ । তুমি বলছ, হরি তোমার ঈশ্বর এবং সেই হরি সর্বত্রই বিরাজিত আছেন, যদি এই হয়, তা হলে এই স্তম্ভমধোও তোমার হরিকে আমায় দেখাও।” হিরণ্যকশিপু প্রহ্লাদকে এই কথা কইলে তৎক্ষণাৎ শ্রীহরি স্তম্ভমধ্যে আর্বিভূত হলেন এবং আশু স্বীয় তীক্ষ্ণ নখাগ্র দ্বারা দৈত্যপতির বক্ষঃস্থল বিদীর্ণ এবং নিজভক্তের প্রতি ) বাৎসল্যভাব প্রদর্শন- করত আর্তব্যক্তির রক্ষাকার্য্যে নিরতচিত্ত সেই ভগবান্‌ নারায়ণই মদীয় আশ্রয় ||১||

শ্রীরামাব বিভীষণোয়মধুনা ত্বার্তো ভয়াদাগতঃ

সুগ্রীবানয় পালয়েহমধুনা পৌলস্ত্যমেবাগতম্ ।

এবং যোঽভয়মস্য সর্ববিদিতং লঙ্কাধিপত্যং দদা-

বার্তত্রাণপরায়ণঃ স ভগবান্নারায়ণো মে গতিঃ ||২||

ভাবার্থ - একদা বিভীষণ দশানন কাছ থেকে তিরস্কৃত হয়ে শ্রীরামের শরণগ্রহণ করবেন, এইরূপ স্থির করে রামচন্দ্রের সন্ধানে উপস্থিত হলে সুগ্রীব রামচন্দ্রকে বললেন, শ্রীরাম, বিভীষণ নিতান্ত আর্ত ও ভীত হয়ে আপনার শরণগ্রহণমানসে এখানে সমাগত হয়েছে । একে রক্ষা করুন।” (তখন শ্রীরাম কইলেন) “সুগ্রীব, তুমি সেই পুলস্ত্যনন্দনকে আমার কাছে আনয়ন কর, আমি এখনই একে রক্ষা ব্যবস্থা করছি ।” এই প্রকারে রামচন্দ্র বিভীষণকে অভয়দানপূর্বক লঙ্কারাজ্যের আধিপত্য প্রদান যে করেছিলেন, তা সকলেই জ্ঞাত আছে। আর্তজনের রক্ষাকার্য্যে নিরতচিত্ত সেই ভগবান্‌ নারায়ণই আমার আশ্রয় ||২||

নক্রগ্রস্তপদং সমুদ্যতকরং ব্রহ্মেশ দেবেশ মাং

পাহীতি প্রচুরার্তরাবকরিণং দেবেশ শক্তীশ চ ।

মা শোচেতি ররক্ষ নক্রবদনাঞ্চক্রশ্রিয়া তৎক্ষণাদ্-

আর্তত্রাণপরায়ণঃ স ভগবান্নারায়ণো মে গতিঃ ||৩||

ভাবার্থ - গজকুম্ভীরের সংগ্রামকালে যখন কুম্ভীর গজরাজের পদে আক্রমণ করেছিল, তখন গজ অনন্যোপায় হয়ে শুণ্ড উত্তোলন করত বলেছিল, “হে ব্রহ্মেশ্‌, হে দেবেশ, হে শক্তীশ, হে দেব, হে ঈশ্বর, আমাকে পরিত্রাণ কর ।” ( গজরাজের এই আর্তনাদ শ্রবণ পূর্বক নারায়ণ উপস্থিত হয়ে বললেন, ) "করিবর, শোক করিও না ।” এই বলে, চক্রাস্ত্রপ্রভাবে কুম্ভীরের মুখ হতে গজরাজকে তৎক্ষণাৎ যিনি রক্ষা করেন, আর্তব্যক্তির রক্ষাকার্য্যে নিরতচিত্ত সেই ভগবান্‌ নারারণই আমার একমাত্র আশ্রয় ||৩||

হা কৃষ্ণাচ্যুত হা কৃপাজলনিধে হা পাণ্ডবানাং গতে

ক্বাসি ক্বাসি সুয়োধনাদবগতাং হা রক্ষ মাং দ্রৌপদীম্ ।

ইত্যুক্তোঽক্ষয়মস্ত্ররক্ষিততনুং যোঽরক্ষদাপদ্গণাদ্-

আর্তত্রাণপরায়ণঃ স ভগবান্নারায়ণো মে গতিঃ ||৪||

ভাবার্থ - যখন দুর্যোধনের আজ্ঞাক্রমে দুঃশাসন, সভামধ্যে কৃষ্ণার বস্ত্রহরণ করতেছিল, তখন দ্রুপদকুমারী নিরুপায় ভেবে, “হা কৃষ্ণ, হা অচ্যুত, হা করুণাজলনিধে, হা পাণ্ডব গতে, তুমি কোথায় আছ, কোথায় আছ ? দুর্যোধন আমাকে অবমানিতা করছে, এই অনাথ দ্রৌপদীকে রক্ষা কর” বললে দ্রৌপদীর এই সকল কাতরোক্তি শ্রবণে যিনি অক্ষর বসন দ্বারা কষ্ণার তনুযষ্টি রক্ষিত করে বিপন্ন দ্রুপদনন্দিনীকে রক্ষা করেছিলেন, আর্তত্রাণপরায়ণ সেই ভগবান্‌ নারায়ণই আমার গতি ||৪||

যৎপাদাব্জনখোদকং ত্রিজগতাং পাপৌঘবিধ্বসনং

যন্নামামৃতপূরণঞ্চ পিবতাং সন্তাপসংহারকম্ ।

পাষাণশ্চ যদঙ্ঘ্রিতো নিজবধূরূপং মুনেরাপ্তবান্-

আর্তত্রাণপরায়ণঃ স ভগবান্নারায়ণো মে গতিঃ ||৫||

ভাবার্থ - যার চরণ-কমল-নখের জল ত্রিভুবনের পাপরাশি দূর করে, যার নামসুধা পান করলে নিখিল সন্তাপ বিদুরিত হয়, যার পাদস্পর্শে পাষাণও ( অহল্যা ) মুনিবধূরূপ মানবীতনু লাভ করেছিল; আর্তজনের রক্ষা- কার্যে নিরতচিত্ত সেই ভগবান্‌ নারায়ণই আমার আশ্রয় ||৫||

যন্নাম শ্রুতিমাত্রতোঽপরিমিতং সংসারবারাং নিধিং

ত্যক্ত্বা গচ্ছতি দুর্জনোঽপি পরমং বিষ্ণোঃ পদং শাশ্বতম্ ।

তন্নৈবাদ্ভুতকারণং ত্রিজগতাং নাথস্য দাসোস্ম্যহম্-

আর্তত্রাণপরায়ণঃ স ভগবান্নারায়ণো মে গতিঃ ||৬||

ভাবার্থ - যার নাম শ্রবণ করলে দুর্জন লোক আশু অপার সংসারসাগর পার হয়ে নিত্যধাম বিষ্ণুর পরম-পদ লাভ করে, ( যিনি অদ্ভুত কার্য্য- সাধন করছেন ), আমি সেই অদ্ভূতকারণ জগৎপতি জনার্দনে দাস। আর্তজনের রক্ষাকার্য্যে তৎপর সেই ভগবান নারায়ণ আমার আশ্রয় ||৬||

পিত্রা ভ্রাতরমুত্তমাঙ্কগমিতং ভক্তোত্তমং যো ধ্রুবং

দৃষ্ট্বা তৎসমমারুরুক্ষুমুদিতং মাত্রাঽবমানং শতম্ ।

যোদাত্তং শরণাগতং তু তপসা হেমাদ্রিসিংহাসনং

হ্যার্তত্রাণপরায়ণঃ স ভগবান্নারায়ণো মে গতিঃ ||৭||

ভাবার্থ - একদা ধ্রুব স্বীয় পিতার ক্রোড়ে আরোহণ করবেন, এই বাসনায় জনক-সন্নিধানে গমন করেন, তখন পিতা ধ্রুবকে অবহেলা করে তার বৈমাত্রেয় ভ্রাতাকে অঙ্কোপরি তুলে লইলেন এবং ধ্রুবের বিমাতা তাকে নানারূপ তিরস্কার করেছিলেন । বালক ধ্রুব তাতে অবমানিত হয়ে কঠোর তপস্যা দ্বারা জনার্দনের আরাধনা করেন। জনার্দন তাতে প্রীত হয়ে ধ্রুবকে সুমেরুশিখরে সর্বোৎকৃষ্ট অক্ষরস্থান প্রদান করেন। আর্তজনের রক্ষাকার্যে নিরতচিত্ত সেই ভগবান্‌ নারায়ণই আমার আশ্রয় ||৭||

নাধীত শ্রুতয়ো ন তত্ত্বমতয়ো ঘোষস্থিতা গোপিকা

জারিণ্যঃ কুলজাতিধর্মবিমুখা অধ্যাত্মভাবং যয়ুঃ ।

ভক্তির্যস্য দদাতি মুক্তিমতুলাং জারস্য যঃ সদ্গতি-

র্হ্যার্তত্রাণপরায়ণঃ স ভগবান্নারায়ণো মে গতিঃ ||৮||

ভাবার্থ - বেদাধ্যয়ন-বর্জিত ব্রজগোপিকারা শ্রীকৃষ্ণের পরমতত্ত্ব না জেনেও জাতিকুল-ধর্ম বিসর্জন পূর্বক যে জারভাবে সেবা করেছিল, তাতেই তারা অধ্যাত্মভাব লাভ করে। অতএব জারভাবেও যার প্রতি ভক্তি মুক্তি-দায়িনী এবং যিনি সজ্জনগণের একমাত্র গতি, আর্তজনের রক্ষাকার্যে নিরতচিত্ত সেই ভগবান্‌ নারারণই আমার আশ্রয় ||৮||

ক্ষুত্তৃষ্ণার্তসহস্রশিষ্যসহিতং দুর্বাসসং ক্ষোভিতং

দ্রৌপদ্যাভয় ভক্তিয়ুক্তমনসা শাকং স্বহস্তার্পিতম্ ।

ভুক্ত্বাঽতর্পয়দাত্মবৃত্তিমখিলামাবেদয়ন্ যঃ পুমান্

আর্তত্রাণপরায়ণঃ স ভগবান্নারায়ণো মে গতিঃ ||৯||

ভাবার্থ - ভয় ও ভক্তিযুক্ত হৃদয়ে দ্রৌপদীর স্বহস্তার্পিত শাক- কণিকামাত্র ভক্ষণ করে যিনি ক্ষুধা-তৃষার্ত বহু সহস্র শিষ্যসহ উপস্থিত কোপন-স্বভাব মহর্ষি দুর্বাসাকে ভোজন-তৃপ্তি প্রদান করত স্বীয় সর্বাত্মভাব জ্ঞাপন করেছিলেন, আর্তত্রাণপরায়ণ সেই ভগবান্‌ নারারণ আমার আশ্রয় ||৯||

যেনারাক্ষি রঘূত্তমেন জলধেস্তীরে দশাস্যানুজ-

স্ত্বায়াতং শরণং রঘূত্তম বিভো রক্ষাতুর মামিতি ।

পৌলস্ত্যেন নিরাকৃতোঽথ সদসি ভ্রাত্রা চ লঙ্কাপুরে

হ্যার্তত্রাণপরায়ণঃ স ভগবান্নারায়ণো মে গতিঃ ||১০||

ভাবার্থ - রাবণ স্বীয় কনিষ্ঠ সহোদর বিভীষণকে লঙ্কা-নগরীস্থ সভা হতে বিদূরিত করলে, বিভীষণ সাগরতীরে রঘুনাথের শরণগ্রহণ করে বলিলেন, “আমার ভ্রাতা আমাকে পরিত্যাগ করেছেন ), আমি বিপন্ন, আপনি আমাকে রক্ষা করুন।” রামরূপধারী যিনি তাকে রক্ষা করেছিলেন । আর্তজনের রক্ষাকার্যে নিরতচিত্ত সেই ভগবান্‌ নারায়ণই আমার আশ্রয় ||১০||

যেনাবাহি মহাহবে বসুমতী সংবর্তকালে মহা-

লীলাক্রোডবপুর্ধরেণ হরিণা নারায়ণেন স্বয়ম্ ।

যঃ পাপিদ্রুমসম্প্রবর্তমচিরাদ্ধত্ত্বা চ যোগাৎ প্রিয়াম্-

আর্তত্রাণপরায়ণঃ স ভগবান্নারায়ণো মে গতিঃ ||১১||

ভাবার্থ - যখন বসুমতী প্রলয়পয়োধি-সলিলে নিমগ্ন হচ্ছিলেন, তখন জনার্দন লীলা-বরাহরূপ পরিগ্রহ করে ধরণীকে বহন করেছিলেন এবং অচিরে আক্রমণকারী পাপীগণকে সংহার করে প্রিয়া বসুমতীকে প্রাপ্ত হয়েছিলেন। আর্তব্যক্তির রুক্ষাকার্যে নিরতচিত্ত সেই ভগবান্‌ নারায়ণই আমার আশ্রয় ||১১||

যোদ্ধাসৌ ভুবনত্রয়ে মধুপতির্ভর্তা নরাণাং বলে

রাধায়া অকরোদ্রতে রতিমনঃপূর্তিঃ সুরেন্দ্রানুজঃ ।

যো বা রক্ষতি দীনপাণ্ডুতনয়ান্নাথেতি ভীতিং গতান্-

আর্তত্রাণপরায়ণঃ স ভগবান্নারায়ণো মে গতিঃ ||১২||

ভাবার্থ - যিনি ত্রিলোকীতলে অদ্বিতীয় যোদ্ধা, যিনি মধুপুরীর ঈশ্বর, যিনি সুরেন্দ্রের কনিষ্ঠ সহোদর, যিনি মানবগণের ভরণকর্তা ও বলরামের অনুরক্ত, যিনি রাধিকার রতি-বাসনা পরিপূর্ণ করেছেন এবং পাগুবগণ ভীত হয়ে শরণাগত হলে যিনি সেই দীনদশাপন্ন পাওুনন্দনদেরকে রক্ষা করেন, আর্ত ব্যক্তির রক্ষাকার্যে নিরতচিত্ত সেই ভগবান্‌ নারায়ণই আমার আশ্রয় ||১২||

যঃ সান্দীপনিদেশতশ্চ তনয়ং লোকান্তরাৎ সন্নতং

চানীয় প্রতিপাদ্য পুত্রমরণাদুজ্জৃম্ভমাণার্তয়ে ।

সন্তোষং জনয়ন্নমেয়মহিমা পুত্রার্থসম্পাদনাদ্-

আর্তত্রাণপরায়ণঃ স ভগবান্নারায়ণো মে গতিঃ ||১৩||

ভাবার্থ - যিনি ( গুরু সান্দীপনির ) পরলোকগত পুত্রকে ( পরলোক হতে ) আনয়ন করে, পুত্রমরণ-শোকাচ্ছন্ন গুরু সান্দীপনির হস্তে প্রদান করত সস্তোষসাধন করেন, গুরুর কার্য্য সম্পাদন দ্বারা, অমিতমহিম সম্পন্ন আর্তত্রাণ পরায়ণ সেই ভগবান্‌ নারায়ণ আমার আশ্রয় ||১৩||

যন্নামস্মরণাদঘৌঘসহিতো বিপ্রঃ পুরাঽজামিলঃ

প্রাণান্মুক্তিমশেষিতামনু চ যঃ পাপৌঘদাবাতিয়ুক্ ।

সদ্যো ভাগবতোত্তমাত্মনি মতিং প্রাপাম্বরীষাভিধ-

শ্চার্তত্রাণপরায়ণঃ স ভগবান্নারায়ণো মে গতিঃ ||১৪||

ভাবার্থ - পুরাকালে দীবানলসদশ পাপরাশিজনিত-পীড়া-ভোগ-যোগ্য বিপ্র অজামিল অন্তিমকালে যার নাঁম স্মরণে সমস্ত পাপবর্জ্জিত হয়ে পরিণামে শাশ্বত মুক্তি প্রাপ্ত হয়েছিলেন, এবং অন্বরীষ, প্রধান ভগবদ্ভক্তস্বরূপ আত্মাকে সদ্যঃ জানতে পেরেছিলেন, আর্তব্যক্তির রক্ষাকার্যে নিরতচিত্ত সেই ভগবান্‌ নারায়ণই আমার আশ্রয় ||১৪||

যোঽরক্ষদ্বসনাদিনিত্যরহিতং বিপ্রং কুচৈলাভিধং

দৈন্যাদ্দীনজনৈকপালনপরঃ শ্রীশঙ্খচক্রোজ্জ্বলঃ ।

তজ্জীর্ণাম্বরমুষ্টিপাত্রপৃথুকানাদায় ভুক্ত্বা ক্ষণাদ্-

আর্তত্রাণপরায়ণঃ স ভগবান্নারায়ণো মে গতিঃ ||১৫||

ভাবার্থ - দীনজনের একমাত্র পালক শ্রীশঙ্খচক্রোজ্জ্বল যে দেব, সদা বসনাদিশূন্য কুচেলনামক এক ব্রাহ্মণকে তার জীর্ণ বস্ত্রখণ্ড হতে এক মুষ্টি চিপি টুক গ্রহণ পূর্বক ভক্ষণ করে তৎক্ষণাৎ দারিদ্র্য হতে পরিত্রাণ করেছিলেন, আর্তব্যক্তির রক্ষাকার্যে নিরতচিত্ত সেই ভগবান্‌ নারায়ণই আমার আশ্রয় ||১৫||

যৎকল্যাণগুণাভিরামমমলং মন্ত্রানিশং শিক্ষতে

যস্মিন্ সৎ পততি প্রতিষ্ঠিতমিদং বিশ্বং বদত্যাগমঃ ।

যো যোগীন্দ্রমনঃসরোরুহতমঃপ্রধ্বংসকৃদ্ভানুমান্-

আর্তত্রাণপরায়ণঃ স ভগবান্নারায়ণো মে গতিঃ ||১৬||

ভাবার্থ - যার নির্মল মঙ্গলময় গুণে রমণীয় শিক্ষা, মননশীল সাধক সতত করে থাকেন, এই বিশ্ব যাতে আবির্ভূত, প্রতিষ্ঠিত এবং লীন হয়, আগম একে বলেন, যিনি যোগিবৃন্দের মানসিক অজ্ঞানরূপ তিমির-সংহারে সাক্ষাৎ সূর্যস্বরূপ, আর্তজনের রক্ষাকার্যে নিরতচিত্ত সেই ভগবান্‌ নারায়ণই আমার আশ্রয় ||১৬||

কালিন্দীহৃদয়াভিরামপুলিনে পুণ্যে জগন্মঙ্গলে

চন্দ্রাম্ভোজবটে পুটে পরিসরে ধাত্রা সমারাধিতে ।

শ্রীরঙ্গে ভুজগেন্দ্রভোগশয়নে শেতে সদা যঃ পুমান্-

আর্তত্রাণপরায়ণঃ স ভগবান্নারায়ণো মে গতিঃ ||১৭||

ভাবার্থ - যে পরমপুরুষ অতিমনোহর সর্বকল্যাণকর পবিত্র যমুনা-পুলিন প্রদেশে কর্পুর শুভ্র-প্রলয়-সাগর জলজাত বটপত্রে বিধাতৃ-সমারাধিত পরি শ্রীরঙ্গক্ষেত্রে এবং অনন্তশয্যায় সদা শয়ান, আর্তজনের রক্ষাকার্যে নিরতচিত্ত সেই ভগবান্‌ নারায়ণই আমার আশ্রয় ||১৭||

বাৎসল্যাদভয়প্রদানসময়াদার্তার্তিনির্বাপণাদ্-

ঔদার্যাদঘশোষণাদগণিতশ্রেয়ঃ পদপ্রাপণাৎ ।

সেব্যঃ শ্রীপতিরেব সর্বজগতামেতে হি তৎসাক্ষিণঃ

প্রহ্লাদশ্চ বিভীষণশ্চ করিরাট্ পাঞ্চাল্যহল্যা ধ্রুবঃ ||১৮||

ভাবার্থ - বাৎসল্য, অভয়-দান, দুঃখ-নিবারণ, ঔদার্য, পাপধ্বংসন এবং অসীম-মঙ্গলপদ-প্রদানের জন্য শ্রীপতিই সর্ব্বজগতের সেব্য | প্রহলাদ, বিভীষণ, গজরাজ, দ্রৌপদী, অহল্যা এবং ধ্রুব ( যথাক্রমে বাৎসল্যাদির ) সাক্ষী । ( নারায়ণ প্রহ্লাদের প্রতি যে প্রকার বাৎসল্য প্রকাশ করেছিনেন, তা সকলেই অবগত আছে ; আর তিনি বিভীষণকে অভয়দান করেছিলেন ; গজরাজ যখন কুম্ভীরের সহিত সংগ্রামে আক্রান্ত হয়েছিল, আর্তত্রাণপরায়ণ নারায়ণ সেই সময়ে সেই গজরাজকে রক্ষা করেছিলেন, দ্রুপদনন্দিনীর প্রতি অসীম উদারতা প্রকাশ করেছিলেন। গৌতমপত্নী অহল্যা পতিশাপে পাষানী হয়েছিলেন, নারায়ণ তার অখিল পাপ বিনাশ করেন ও ধ্রুবের প্রতি করুণা করে তাকে অত্যুচ্চপদ প্রদান করেছিলেন ) ||১৮||

|| ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্যস্য শ্রীমচ্ছঙ্কর ভগবতঃ কৃতৌ আর্তত্রাণপরায়ণ নারায়ণাষ্টাদশকং সম্পূর্ণম্ ||

ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্য শ্রীমদ্ শঙ্করাচার্য ভগবতঃ বিরচিত আর্তত্রাণপরায়ণ নারায়ণাষ্টাদশক স্তোত্র সমাপ্ত।

 

শ্রীকামাক্ষীস্তোত্রম্

 


কল্পানোকহপুষ্পজালবিলসন্নীলালকাং মাতৃকাং

কান্তাং কঞ্জদলেক্ষণাং কলিমলপ্রধ্বংসিনীং কালিকাম্ ।

কাঞ্চীনূপুরহারদামসুভগাং কাঞ্চীপুরীনায়িকাং

কামাক্ষীং করিকুম্ভসন্নিভকুচাং বন্দে মহেশপ্রিয়াম্ ||১||

ভাবার্থ - যিনি ইচ্ছাপূরণকারী বৃক্ষের (কল্পতরু), পুষ্পের মতো ঘন কালো কেশগুলো উজ্জ্বল করে এবং মহৎ মাতৃকা হিসাবে উপবিষ্ট, পদ্মদলের ন্যায় সুন্দর অক্ষি আবার কখনো কলির পাপ ধ্বংসিনী ভয়ঙ্করী মা কালী। যিনি কাঞ্চী, নূপুর, কোমরহার ও কণ্ঠপুষ্পমালা দ্বারা সজ্জিত, সৌভাগ্যদায়িনী, কাঞ্চীপুরীর নায়িকা, যার বক্ষ কুম্ভের ন্যায় সুন্দর, করুণাময়ী, সেই মহেশ্বরপ্রিয়া কামাক্ষীর বন্দনা করি ||১||

কাশাভাংশুকভাসুরাং প্রবিলসৎকোশাতকীসন্নিভাং

চন্দ্রার্কানললোচনাং সুরুচিরালঙ্কারভূষোজ্জ্বলাম্ ।

ব্রহ্মশ্রীপতিবাসবাদিমুনিভিঃ সংসেবিতাঙ্ঘ্রিদ্বয়াং

কামাক্ষীং গজরাজমন্দগমনাং বন্দে মহেশপ্রিয়াম্ ||২||

ভাবার্থ - যার হস্তপুষ্পোপরি কাশফুল ঘাসের ন্যায় সবুজ শুকপাখি বিরাজ করছে; যার চন্দ্র, সূর্য ও অগ্নির ন্যায় ত্রিনয়ন এবং দীপ্তিমান ও উজ্জ্বল সুরুচিপূর্ণ অলঙ্কার দ্বারা সুশোভিত। ব্রহ্মা, শ্রীপতি বিষ্ণু, অন্যান্য দেবগণ আর সমস্ত মহর্ষি ও মুনিগণ দ্বারা চরণকমল যুগল সেবিত, মর্ত্যে যার প্রতিটি পদক্ষেপ বা চলন ও গমন গজরাজের মতো, সেই মহেশ্বরপ্রিয়া কামাক্ষীর বন্দনা করি ||২||

ঐং ক্লীং সৌরিতি যাং বদন্তি মুনয়স্তত্ত্বার্থরূপাং পরাং

বাচাং আদিমকারণং হৃদি সদা ধ্যায়ন্তি যাং যোগিনঃ ।

বালাং ফালবিলোচনাং নবজপাবর্ণাং সুষুম্নাশ্রিতাং

কামাক্ষীং কলিতাবতংসসুভগাং বন্দে মহেশপ্রিয়াম্ ||৩||

ভাবার্থ - মুনিগণ দ্বারা প্রকাশিত তত্ত্বার্থরূপ বীজ মন্ত্র ‘ঐং ক্লীং সৌ’ যার অতীন্দ্রিয় বদনকমল, সমস্ত শব্দাদির কারণ ও সদা ধ্যানমগ্ন যোগীদের হৃদয়ে বাস করে। যাকে বালা ত্রিপুরাসুন্দরীর রূপে ( অষ্টম বর্ষীয় বালিকা রূপ ) পূজা করা হয়, যার ফালে অর্থাৎ কপালে ত্রিনেত্র রয়েছে, নবীন ও তাজা জবাপুষ্পের ন্যায় গাত্রবর্ণ, ষটচক্রের সুষুম্নাতে সদা আশ্রিতা, নানা পুষ্প দ্বারা সজ্জিতা ও সৌভাগ্যদায়িনী, সেই মহেশ্বরপ্রিয়া কামাক্ষীর বন্দনা করি ||৩||

যৎপাদাম্বুজরেণুলেশং অনিশং লব্ধ্বা বিধত্তে বিধির্-

বিশ্বং তৎ পরিপাতি বিষ্ণুরখিলং যস্যাঃ প্রসাদাচ্চিরম্ ।

রুদ্রঃ সংহরতি ক্ষণাৎ তদ্ অখিলং যন্মায়যা মোহিতঃ

কামাক্ষীং অতিচিত্রচারুচরিতাং বন্দে মহেশপ্রিয়াম্ ||৪||

ভাবার্থ - যার পাদপদ্মের সর্বদা রেণু সমান ধুলো নিয়ে বিধির বিধানকারী প্রজাপতি ব্রহ্মা বিশ্ব সৃষ্টি করেন, যার চিরজীবী প্রসাদে শ্রীবিষ্ণু অখিল বিশ্বকে রক্ষা করেন। এবং রুদ্র ক্ষণমধ্যে অখিল সৃষ্টিকে ধ্বংস করেন যা মায়ার শক্তিতে মোহিত হয়ে যায়, যার প্রকৃতির চিত্র বৈচিত্র্যময় ও মনোরম, সেই মহেশ্বরপ্রিয়া কামাক্ষীর বন্দনা করি ||৪||

সূক্ষ্মাৎ সূক্ষ্মতরাং সুলক্ষিততনুং ক্ষান্তাক্ষরৈর্লক্ষিতাং

বীক্ষাশিক্ষিতরাক্ষসাং ত্রিভুবনক্ষেমঙ্করীং অক্ষয়াম্ ।

সাক্ষাল্লক্ষণলক্ষিতাক্ষরময়ীং দাক্ষায়ণীং সাক্ষিণীং

কামাক্ষীং শুভলক্ষণৈঃ সুললিতাং বন্দে মহেশপ্রিয়াম্ ||৫||

ভাবার্থ - যার সারমর্ম অর্থাৎ অক্ষরজ্ঞান সূক্ষ্মের চেয়ে সূক্ষ্মতর, যার অবিনশ্বর রূপ মঙ্গলময় ও ধৈর্য দ্বারা লক্ষিত, যার সারমর্মের শিক্ষা রাক্ষসকে পরিমার্জিত করে ( এখানে রাক্ষস বলতে অশুভ প্রবণতাকে বুঝানো হয়েছে ), যিনি ত্রিভুবনের অক্ষয় ক্ষেমঙ্করী। যার অবিনশ্বর সারাংশ সাক্ষাৎ ধ্যানে সরাসরি অনুভব করা যায়, যিনি দাক্ষায়ণী ( প্রজাপতি দক্ষকন্যা সতী ), সমস্ত কিছুর অন্তর্নিহিত সাক্ষী, যিনি শুভলক্ষণা ও সুললিতা অর্থাৎ সর্বদা ক্রীড়নশীল, সেই মহেশ্বরপ্রিয়া কামাক্ষীর বন্দনা করি ||৫||

ওঙ্কারাঙ্গণদীপিকাং উপনিষৎ প্রাসাদপারাবতীম্

আম্নায়াম্বুধিচন্দ্রিকাং অধতমঃ প্রধ্বংসহংসপ্রভাম্ ।

কাঞ্চীপট্টণপঞ্জরাঽঽন্তরশুকীং কারুণ্যকল্লোলিনীং

কামাক্ষীং শিবকামরাজমহিষীং বন্দে মহেশপ্রিয়াম্ ||৬||

ভাবার্থ - যিনি পর্বতে অবস্থিত উপনিষদের প্রাসাদের আঙ্গনে ওঁঙ্কারের দীপের ন্যায় ( মহারাজ হিমবানের প্রাসাদে মাতা পার্বতীকে বুঝানো হয়েছে ), যে চার বেদের মতো চন্দ্রের ন্যায় পিছনে আলোকসজ্জায় সজ্জিত, অধতমঃ গুণসম্পন্ন পাপকে ধ্বংস করে অন্তরে হংসের ন্যায় জ্যোতি প্রকাশ করেন। খাঁচায় বন্দী থাকা শুকপাখির মতো কাঞ্চীপুরের জন্য অন্তরে কারুণ্যের ঢেউ উঠছে, যিনি শিবের রাজমহিষী ও সকল ইচ্ছা পূরণ করেন, সেই মহেশ্বরপ্রিয়া কামাক্ষীর বন্দনা করি ||৬||

হ্রীঙ্কারাত্মকবর্ণমাত্রপঠনাদ্ ঐন্দ্রীং শ্রিয়ং তন্বতীং

চিন্মাত্রাং ভুবনেশ্বরীং অনুদিনং ভিক্ষাপ্রদানক্ষমাম্ ।

বিশ্বাঘৌঘনিবারিণীং বিমলিনীং বিশ্বম্ভরাং মাতৃকাং

কামাক্ষীং পরিপূর্ণচন্দ্রবদনাং বন্দে মহেশপ্রিয়াম্ ||৭||

ভাবার্থ - ‘হ্রীং’ কার বর্ণ পাঠ করা মাত্রেই ঐন্দ্রী ও শ্রী সম্পন্ন শক্তি ছড়িয়ে পড়ে, যিনি মাতা ভুবনেশ্বরী রূপে হয়ে বিশুদ্ধ চেতনার প্রতীক, কৃত পাপের প্রায়শ্চিত্তে ভিক্ষারূপে ক্ষমা প্রদান করেন। যিনি জগতের সর্বধারক মাতা, যিনি নির্বিকার ও শুদ্ধ, জগতের সমস্ত পাপ ভক্তদের হৃদয় থেকে দূর করে দেয়, যার মুখ পূর্ণিমার চন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল, সেই মহেশ্বরপ্রিয়া কামাক্ষীর বন্দনা করি ||৭||

বাগ্দেবীতি চ যাং বদন্তি মুনয়ঃ ক্ষীরাব্ধিকন্যেতি চ

ক্ষোণীভৃত্তনয়েতি চ শ্রুতিগিরো যাং আমনন্তি স্ফুটম্ ।

একানেকফলপ্রদাং বহুবিধাঽঽকারাস্তনূস্তন্বতীং

কামাক্ষীং সকলার্তিভঞ্জনপরাং বন্দে মহেশপ্রিয়াম্ ||৮||

ভাবার্থ - যিনি সমস্ত অক্ষর ও বাক্যের অধীশ্বরী ( দেবী সরস্বতী ), যিনি ক্ষীর ও সুধাসাগর এবং মহর্ষি ভৃগুর কন্যা ( দেবী লক্ষ্মী ) ধরিত্রীতে জন্ম নেওয়া কন্যা ( দেবী সীতা ) এবং যিনি শ্রুতিদের ( উপনিষদ ) সমস্ত বাণী নিজের ইচ্ছায় প্রকাশ করেন। যিনি ভক্তদের এক থেকে অনেক ফল প্রদান করে, বিভিন্ন সময়ে বহুরূপে ধরণীতে প্রকাশ করেন, যিনি সকল আর্তের দুঃখবিনাশকারী ও অতীন্দ্রিয়, সেই মহেশ্বরপ্রিয়া কামাক্ষীর বন্দনা করি ||৮||

মায়ামাদিম্ কারণং ত্রিজগতাং আরাধিতাঙ্ঘ্রিদ্বয়াম্

আনন্দামৃতবারিরাশিনিলয়াং বিদ্যাং বিপশ্চিদ্ধিয়াম্ ।

মায়ামানুষরূপিণীং মণিলসন্মধ্যাং মহামাতৃকাং

কামাক্ষীং করিরাজমন্দগমনাং বন্দে মহেশপ্রিয়াম্ ||৯||

ভাবার্থ - যিনি মায়াদির কারণ, ত্রিজগতে যার চরণযুগল সদা আরাধিত, যিনি আনন্দ সুধামৃতের বারিধারা নিবাসী, যার শুদ্ধজ্ঞানে বিদ্বানেরা ধ্যানমগ্ন করেন। যিনি মাতৃকা হিসেবে মায়াশক্তি দ্বারা মানব রূপে অবতীর্ণ হন, সদা একটি মণির মতো অন্তরে দীপ্তিমান অবস্থায় থাকে, যার চলন ও গমন করিরাজের মতো, সেই মহেশ্বরপ্রিয়া কামাক্ষীর বন্দনা করি ||৯||

কান্তা কামদুহা করীন্দ্রগমনা কামারিবামাঙ্কগা

কল্যাণী কলিতাবতারসুভগা কস্তূরিকাচর্চিতা

কম্পাতীররসালমূলনিলয়া কারুণ্যকল্লোলিনী

কল্যাণানি করোতু মে ভগবতী কাঞ্চীপুরীদেবতা ||১০||

ভাবার্থ - যিনি ভক্তদের প্রিয় ও কামধেনুর দুগ্ধের মতো সকল ইচ্ছা পূরণ করে, যার গমন করীন্দ্ররাজের মতো, সর্বদা কামারির ( মহাদেবের আরেক নাম; অর্থ - যিনি কামদেবের শত্রু ) বামভাগে বাস করে, যিনি কল্যাণী ও সৌভাগ্যদায়িনী, কস্তূরিকা দ্বারা চর্চিতা। যিনি কম্পানদীর তীরে আম্রবৃক্ষের মূ্লে অবস্থিত ( কাঞ্চীপুরমে কম্পা নদীর ধারে দেবী পার্বতী মহাদেবের ধ্যান করেছিলেন ) কারুণ্যময়ী, হে কাঞ্চীপুরী নায়িকা, আমার জীবনকে সুখ ও সমৃদ্ধি দ্বারা কল্যাণ করুন ||১০||

|| ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্যস্য শ্রীমচ্ছঙ্কর ভগবতঃ কৃতৌ শ্রীকামাক্ষীস্তোত্রং সম্পূর্ণম্ ||

ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্য শ্রীমদ্ শঙ্করাচার্য বিরচিত শ্রীকামাক্ষী স্তোত্র সমাপ্ত।

 

Sunday, 2 January 2022

নবরত্নমালিকা

 


হারনূপুরকিরীটকুণ্ডলবিভূষিতাবয়বশোভিনীং

কারণেশবরমৌলিকোটিপরিকল্প্যমানপদপীঠিকাম্ ।

কালকালফণিপাশবাণধনুরঙ্কুশামরুণমেখলাং

ফালভূতিলকলোচনাং মনসি ভাবয়ামি পরদেবতাম্ ||১||

ভাবার্থ - ( আমি ) মনে ( চিত্তে ) হার নূপুর-কিরীট-কুণ্ডলালঙ্কৃত অবয়বশােভিতা, কারণরূপী শিবের শীর্ষদেশের মধ্যভাগে যাঁর পাদপীঠ পরিকল্পিত হয়, সেই কালের ( যমের ) পক্ষেও কাল ( অন্ত ) স্বরূপ সর্পাত্মক পাশ বাণ, ধনু, ও অঙ্কুশযুক্তা, অরুণবর্ণ-মেখলাধারিণী, ললাটদেশস্থ তিলকরূপ নয়নযুক্তা ( বা ভালদেশস্থ তিলক দ্বারা শােভমানা ) পরদেবতাকে চিন্তা করছি ||১||

গন্ধসারঘনসারচারুনবনাগবল্লিরসবাসিনীং

সান্ধ্যরাগমধুরাধরাভরণসুন্দরাননশুচিস্মিতাম্ ।

মন্ধরায়তবিলোচনামমলবালচন্দ্রকৃতশেখরীং

ইন্দিরারমণসোদরীং মনসি ভাবয়ামি পরদেবতাম্ ||২||

ভাবার্থ - ( আমি ) মনে কর্পূর চন্দন ও মনােহর নতুন তাম্বুললতারসবাসিনী, শুভ্রস্মিত ( হাস্য ) যুক্তা, অচঞ্চল বিশালচক্ষুযুক্তা যিনি নির্ম্মল ( প্রতিপৎকালীন শিশু ) চন্দ্র দ্বারা চূড়া ( শিরােভূষণ ) রচনা করেছেন, বিষ্ণুর সােদরী ( সমানােদরী ) পরদেবতাকে চিন্তা করছি ||২||

স্মেরচারুমুখমণ্ডলাং বিমলগণ্ডলম্বিমণিমণ্ডলাং

হারদামপরিশোভমানকুচভারভীরুতনুমধ্যমাম্ ।

বীরগর্বহরনূপুরাং বিবিধকারণেশবরপীঠিকাং

মারবৈরিসহচারিণীং মনসি ভাবয়ামি পরদেবতাম্ ||৩||

ভাবার্থ - ( আমি ) মনে মনে স্মিত ( হাস্য ) দ্বারা মনােহর মুখমণ্ডলযুক্তা মনােহর গণ্ডদেশে লম্বিত ( কর্ণকুণ্ডলস্থিত ) মণিমণ্ডল ( বিম্ব ) যুক্তা, হার ও মাল্য দ্বারা পরিশােভমান কুচভার দ্বারা ভীতিবিশিষ্ট শরীর মধ্যদেশযুক্তা, ( অর্থাৎ কুচভারের ভয়ে যার শরীরের মধ্যদেশ ভীতশীর্ণ) বীরগণের গর্বহারী নূপুরবিশিষ্টা, নানা কারণভূত ঈশ্বরাদি ( সদাশিবাদি ) কর্তৃক কল্পিত হয়েছে-পীঠ যাঁর এবম্ভূতা, মদনান্তক শিবের সহচারিণী, পরদেবতাকে চিন্তা করছি ||৩||

ভূরিভারধরকুণ্ডলীন্দ্রমণিবদ্ধভূবলয়পীঠিকাং

বারিরাশিমণিমেখলাবলয়বহ্নিমণ্ডলশরীরিণীম্ ।

বারিসারবহকুণ্ডলাং গগনশেখরীং চ পরমাত্মিকাং

চারুচন্দ্ররবিলোচনাং মনসি ভাবয়ামি পরদেবতাম্ ||৪||

ভাবার্থ - ( আমি ) প্রভূত ভারধারণকারী সর্পরাজের ( বাসুকির ) মণিতে আবদ্ধ ভূমণ্ডল যাঁর পীঠ, জলরাশি ও মণিমেখলা দ্বারা বলয়িত ( বেষ্টিত ) বহ্নিমণ্ডলরূপ যাঁর শরীর, বারিসার ( মুক্তা ) বহনকারী ( অর্থাৎ মুক্তাখচিত ) কুণ্ডলবিশিষ্টা, আকাশ যাঁর শিরােভূষণ, পরমাত্মস্বরূপা ( পরব্রহ্মরূপিণী ) মনােহর চন্দ্র ও সূর্য্য যাঁর নয়নদ্বয়, এবম্ভূতা পরদেবতাকে মনে চিন্তা করছি ||৪||

কুণ্ডলত্রিবিধকোণমণ্ডলবিহারষড়্দলসমুল্লসৎ

পুণ্ডরীকমুখভেদিনীং চ প্রচণ্ডভানুভাসমুজ্জ্বলাম্ ।

মণ্ডলেন্দুপরিবাহিতামৃততরঙ্গিণীমরুণরূপিণীং

মণ্ডলান্তমণিদীপিকাং মনসি ভাবয়ামি পরদেবতাম্ ||৫||

ভাবার্থ - কুণ্ডল ( মণ্ডল ) ত্রিকোণ ও মণ্ডলে বিহরণকারী ষড়্দলশােভিত পদ্মের মুখভেদ ( বিকাশ ) কারিণী, প্রচণ্ড সূর্য্যসদৃশ উজ্জ্বল ( তেজঃ সম্পন্না ) চন্দ্রমণ্ডল হতে পরিবাহিত ( ক্ষরিত ) অমৃতের নদীস্বরূপা, অরুণবর্ণা, মণ্ডলমধ্যে মণিদ্বীপস্বরূপা ( প্রকাশশীলা ) পরদেবতাকে মনে মনে চিন্তা করছি ||৫||

বারণাননময়ূরবাহমুখদাহবারণপয়োধরাং

চারণাদিসুরসুন্দরীচিকুরশেখরীকৃতপদাম্বুজাম্ ।

কারণাধিপতিপঞ্চকপ্রকৃতিকারণপ্রথমমাতৃকাং

বারণান্তমুখপারণাং মনসি ভাবয়ামি পরদেবতাম্ ||৬||

ভাবার্থ - গজানন ও ময়ূরবাহনের ( কার্তিকেয়ের ) মুখদাহ ( ক্ষুধা, যা মুখের তাপ জন্মায় ) বারণ সমর্থ স্তনযুগলবিশিষ্টা, চারণাদি ( স্তুতিপাঠ কার্য্যে রত ) দেবস্ত্রীগণের কেশপাশের উর্দ্ধভাগে অলঙ্কাররূপে অবস্থিত পাদপদ্মবিশিষ্টা, কারণের ( জগৎসৃষ্টি, স্থিতি প্রভৃতির ) অধিপতি পঞ্চকের ( ব্রহ্মা বিষ্ণু প্রভৃতির ) প্রকৃতিরূপ কারণ ( অর্থাৎ ব্রহ্মা প্রভৃতির প্রকৃতিরূপে যিনি কারণ ) স্বরূপ প্রথম মাতৃকা, ( বারণান্তমুখপারণা ) পরদেবতাকে মনে মনে চিন্তা করছি ||৬||

পদ্মকান্তিপদপাণিপল্লবপয়োধরাননসরোরুহাং

পদ্মরাগমণিমেখলাবলয়নীবিশোভিতনিতম্বিনীম্ ।

পদ্মসম্ভবসদাশিবান্তময়পঞ্চরত্নপদপীঠিকাং

পদ্মিনীং প্রণবরূপিণীং মনসি ভাবয়ামি পরদেবতাম্ ||৭||

ভাবার্থ - পদ্মসদৃশ কান্তিযুক্ত পদ, পাণিপল্লব ( হস্ত ), পয়ােধর ও মুখকমলযুক্তা, পদ্মরাগমণি নির্মিত মেখলা বলয় ( কটিদেশের অলঙ্কার ) ( নীবি ) রূপ বস্ত্রবন্ধনার্থ বস্তু-বিশেষ শােভিত নিতম্বদেশযুক্তা, ব্রহ্মাদি সদাশিবান্ত ( ব্রহ্মা, বিষ্ণু, রুদ্র, ঈশ্বর, সদাশিব ) এতৎ স্বরূপ পঞ্চরত্ন হয়েছে পাদপীঠ যার এবম্ভূতা, প্রণবস্বরূপিণী, পদ্মিনী, পরদেবতাকে মনে মনে চিন্তা করছি ||৭||

আগমপ্রণবপীঠিকামমলবর্ণমঙ্গলশরীরিণীং

আগমাবয়বশোভিনীমখিলবেদসারকৃতশেখরীম্ ।

মূলমন্ত্রমুখমণ্ডলাং মুদিতনাদবিন্দুনবয়ৌবনাং

মাতৃকাং ত্রিপুরসুন্দরীং মনসি ভাবয়ামি পরদেবতাম্ ||৮||

ভাবার্থ - আগম ( তন্ত্র ) ও প্রণব যাঁর পীঠ (আসন), নির্মলবর্ণগুলি ( শব্দরূপ ) যাঁর মঙ্গলময় শরীর, –আগমের অবয়ব ( অংশগুলির ) দ্বারা যিনি শােভিত, নিখিল (সমগ্র) বেদের সারভূত বস্তুর দ্বারা ( উপনিষদ দ্বারা ) রচিত যাঁর শিরােভূষণ, মূলমন্ত্র যাঁর মুখমণ্ডলস্বরূপ, বিকাশপ্রাপ্ত নাদ ও বিন্দু যাঁর নবযৌবন, এবম্ভূতা পরদেবতা, মাতা ত্রিপুরসুন্দরীকে মনে মনে চিন্তা করছি ||৮||

কালিকাতিমিরকুন্তলান্তঘনভৃঙ্গমঙ্গলবিরাজিনীং

চূলিকাশিখরমালিকাবলয়মল্লিকাসুরভিসৌরভাম্ ।

বালিকামধুরগণ্ডমণ্ডলমনোহরাননসরোরুহাং

বালিকামখিলনায়িকাং মনসি ভাবয়ামি পরদেবতাম্ ||৯||

ভাবার্থ - নবজলধর সদৃশ ও অন্ধকারবৎ কৃষ্ণবর্ণ কুন্তলের প্রান্তভাগস্থিত নিবিড় ভৃঙ্গসমূহরূপ মঙ্গল শােভিত, চূলিকারূপ ( চূলিকা-শিরােভূষণ ) শিখরদেশস্থিত মাল্যমধ্যস্থ মল্লিকাপুষ্পের সুগন্ধযুক্তা, বালিকার মনােহর গণ্ডদেশের ন্যায় মনােহর মুখপদ্মবিশিষ্টা, কালিকা স্বরূপিণী নিখিল বিশ্বের নায়িকা ( নেতৃস্বরূপিণী ) পরদেবতাকে মনে মনে চিন্তা করছি ||৯||

নিত্যমেব নিয়মেন জল্পতাং

ভুক্তিমুক্তিফলদামভীষ্টদাম্ ।

শংকরেণ রচিতাং সদা জপেৎ

নামরত্ননবরত্নমালিকাম্ ||১০||

ভাবার্থ - নিয়মপূর্ব্বক নিত্য পাঠকারীর ভােগ ও মােক্ষরূপ ফলদায়ক, অভীষ্ট ফলদানকারিণী, শঙ্কররচিতা এই নামরত্বরূপ নবরত্নমালিকা সৰ্ব্বদা পাঠ করা উচিত ||১০||

|| ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রজকাচার্যস্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্যস্য শ্রীমচ্ছঙ্কর ভগবতঃ কৃতৌ নবরত্নমালিকা সম্পূর্ণং ||

ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্য শ্রীমদ্ শঙ্করাচার্য ভগবতঃ বিরচিত নবরত্নমালিকা সমাপ্ত।

 

Monday, 27 December 2021

মুখ্য প্রাণ ও ইন্দ্রিয়ের উৎপত্তিঃ-

 

সদানন্দযোগীন্দ্র সরস্বতী বেদান্তসারে বলিতেছেন-"পণ্ডিতেরা সেই প্রথমোৎপন্ন আকাশাদি পঞ্চভূতকে সূক্ষ্মভূত, তন্মাত্রা ও অপঞ্চীকৃত মহাভূত বলিয়া থাকেন।"-(বেদান্তসারঃ, ৫৯)

অপঞ্চীকৃত পঞ্চ সূক্ষ্মভূতকে পণ্ডিতেরা তন্মাত্র বলেন কেন?

ভগবান শঙ্করাচার্যের "অহংকারাৎ পঞ্চতন্মাত্রাণি" এই পঞ্চীকরণ সূত্রের বার্ত্তিকাভরণম্ এ অভিনবনারায়ণেন্দ্র সরস্বতী বলছেন-

বিষ্ণুপুরাণেও এইরূপ উক্ত হয়েছে- 'শব্দ স্পর্শাদি বিশেষ বিশেষ ধর্ম আকাশাদি পৃথক্ পৃথক্ ভূত সকলে তাদাত্ম্য সম্বন্ধেই থাকে, অন্যত্র থাকে না। অর্থাৎ শব্দ আকাশেই থাকে, স্পর্শ বায়ুতেই থাকে ইত্যাদি। এইজন্য স্মৃতি শাস্ত্রে উহাদের নাম তন্মাত্র বলা হয়েছে।'

সূক্ষ্মশরীর কি?

সদানন্দযোগীন্দ্র সরস্বতী বেদান্তসারে বলিতেছেন- "আকাশাদি এইসকল পাঁচটি সূক্ষ্মভূত থেকে সূক্ষ্মশরীর সকল উৎপন্ন হয়। সতেরটি অবয়ব বিশিষ্ট লিঙ্গশরীরকে সূক্ষ্মশরীর বলে। পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়, পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয়, পাঁচটি বায়ু, মন ও বুদ্ধি- এই সতেরোটি অবয়ব নিয়ে সূক্ষ্মশরীর গঠিত।"-(বেদান্তসার,৬০-৬২)

লিঙ্গশরীর কেন বলা হয়?

তদুত্তরে বলিব, ইহার দ্বারা আত্মা জ্ঞাপিত হয় বলিয়া ইহাকে বলা হয় 'লিঙ্গ'।

আনন্দ গিরি পঞ্চীকরণ বিবরণে তাহাই বলিতেছেন- "এই লিঙ্গ কোন প্রকারে প্রত্যাগাত্মার জ্ঞাপক- এইকারণে‌ ইহাকে 'লিঙ্গ' এইরূপে ব্যাখ্যা করা হয়। এই লিঙ্গের কার্য্যত্ব বলিয়া ফলতঃ ভৌতিকত্ব বলায় লিঙ্গে অহম্ অভিমান অর্থাৎ 'লিঙ্গই আমি' এইরূপ অভিমান অপ্রামাণিক- ইহাই মনে করিতেছেন। অতএব এই অপঞ্চীকৃত ভূতপঞ্চক্বই লিঙ্গ। এই পূর্বোক্ত সপ্তদশ অবয়বযুক্ত লিঙ্গ ভূতকার্য বলিয়া ভৌতিক।"-(পঞ্চীকরণ বিবরণ-১৩)

বেদান্ত মীমাংসা শাস্ত্রের প্রাণোৎপত্ত্যধিকরণের প্রতিপাদ্য বিষয় পরমেশ্বর হইতে আকাশাদির ন্যায় ইন্দ্রিয়াদিও উৎপন্ন হইয়াছে। এক্ষণে সেই আকাশাদি মহাভূত হইতে লিঙ্গশরীরের উৎপত্তি বিষয়ক আলোচনার সূচনা হইবে। ইন্দ্রিয়সকল কি অনাদি অথবা পরমেশ্বর কর্তৃক সৃষ্ট হয়? এই প্রশ্নের উত্তরে ভগবান সূত্রকার বাদরায়ণ বলিতেছেন-

তথা প্রাণাঃ ৷৷ ব্রহ্মসূত্র ২.৪.১৷৷

ভগবান ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য শারীরক মীমাংসা ভাষ্যে বলিতেছেন- এই স্থলে প্রাণ সকলের (-মুখ্য প্রাণ ও ইন্দ্রিয়সকলের) উৎপত্তিবোধক শ্রুতি বাক্যসকলই উদাহরণ, যথা-

'এতস্মাদাত্মনঃ সর্বে প্রাণাঃ সর্বে লোকাঃ সর্বে দেবাঃ সর্বাণি ভূতানি ব্যুচ্চরন্তি'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-২।১।১০)

"এই আত্মা হইতে সকল প্রাণ, সকল লোক, সকল দেবতা এবং সকল প্রাণী নানাভাবে উদ্গত হয়।"

উক্ত শ্রুতিবাক্যে যেমন লোক প্রভৃতি পরব্রহ্ম হইতে উৎপন্ন হয়, 'তথা'(-তদ্রূপ) প্রাণসকলও উৎপন্ন হয়, ইহাই অর্থ।

এইপ্রকারে 'এতস্মাজ্জায়তে প্রাণো মনঃ সর্বেন্দ্রিয়াণি চ৷ খং বায়ুর্জ্যোতিরাপঃ পৃথিবী বিশ্বস্য ধারিণী'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-২।১।৩)

"ইঁহা হইতে প্রাণ, মন, ইন্দ্রিয়সকল, আকাশ, বায়ু, বহ্নি, জল এবং সকলের আধারভূতা পৃথিবী উৎপন্ন হয়।"

ইত্যাদি এইসকল শ্রুতিবাক্যেও আকাশাদির ন্যায় প্রাণ সকলের উৎপত্তি শ্রুত হয়। সুতরাং প্রাণসকল যে বিকার (-কার্য্য বস্তু) শ্রুতিপ্রমাণ হেতু তাহা সিদ্ধ হইল।

আবার ছান্দোগ্য শ্রুতিতে স্পষ্টতই বুঝাইতেছে যে, যে-ভূতবর্গ স্বয়ং ব্রহ্ম হইতে জাত সেই ভূতবর্গ হইতেই ইন্দ্রিয়াদি উৎপন্ন হইয়াছে। ছান্দোগ্যের এই প্রকরণেই বাগিন্দ্রিয়, প্রাণ ও মনের যথাক্রমে তেজঃ, জল ও ক্ষিতি হইতে উৎপত্তি পঠিত হইতেছে, যথা-

'অন্নময়ং হি সোম্য মন আপোময়ঃ প্রাণস্তেজোময়ী বাক্'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।৫।৪)

"হে সৌম্য, মন অন্নের বিকার (-কার্য্য), প্রাণ জলের বিকার এবং বাগেন্দ্রিয় তেজের বিকার" ইত্যাদি। এইস্থলে ক্ষিত্যাদি পরম্পরাতে প্রাণসকলের (-মুখ্য প্রাণ ও ইন্দ্রিয়সকলের) ব্রহ্মকার্য্যতাই সিদ্ধ হয়।........

Saturday, 25 December 2021

নর্মদাষ্টকং স্তোত্র

 


|| শ্রী গণেশায় নমঃ ||

সবিন্দুসিন্ধুসুস্খলত্তরঙ্গভঙ্গরঞ্জিতং

দ্বিষৎসু পাপজাতজাতকাদিবারিসংয়ুতম্ ।

কৃতান্তদূতকালভূতভীতিহারিশর্মদে

ত্বদীয়পাদপঙ্কজং নমামি দেবি নর্মদে ||১||

ভাবার্থ - হে সুখদায়িনি, ( তোমার ) তরঙ্গভঙ্গ, বিন্দু এবং সিন্ধু ( নদীপ্রবাহ ) চুম্বিত দৃষৎ অর্থাৎ শিলাতটে আস্ফালিত হয়ে যার শোভা সম্পাদন করেছে, যা পাপরাশিবিনাশিনী ও পুনর্জন্মনিবারিণী তোমারই বারিধারার বিধৌত, যা প্রাণিগণের কৃতান্তদূতভীতি এবং মৃত্যুভীতি নিবারণ করে, দেবি নর্মদে তোমার সেই চরণকমলে আমি প্রণাম করছি ।

[ নর্মদাপ্রপাতস্থলে উপরিভাগে শিলাখণ্ড-স্খলিত জলবিন্দু যে শুত্র কুসুমরাশি বর্ষণ করছে, অধোদেশে দুগ্ধাবর্তবৎ প্রবাহ, –পাষাণময় উভয় তটে আস্ফালিত তরঙ্গমালা তুলে যে আবেগে ছুটেছে, এই বন্দনায় তার স্বরূপ অভিব্যক্ত। দুঃখ এই, পাঠ-বিকৃতি, এই অর্থকে এত দিন ফুটিতে দেয় নাই ] ||১||

ত্বদম্বুলীনদীনমীনদিব্যসম্প্রদায়কং

কলৌ মলৌঘভারহারিসর্বতীর্থনায়কম্ ।

সুমৎস্যকচ্ছনক্রচক্রবাকচক্রশর্মদে

ত্বদীয়পাদপঙ্কজং নমামি দেবি নর্মদে ||২||

ভাবার্থ - হে মৎস্য-শোভিত-সজল-তটশালিনি, হে কুম্ভীর-চক্রবাক- মণ্ডল-সুখদায়িনী, দেবি নর্মদে, –তোমার জলে যে সকল নগণ্য মীন লয় প্রাপ্ত হয়, তাদের দিব্য সম্পৎপ্রাপ্তি যার প্রসাদে হয়, কলিমল-রাশি-ভারহারি সর্বতীর্থ-নায়িকা তোমার সেই চরণকমলে নমস্কার করি ||২||

মহাগভীরনীরপূরপাপধূতভূতলং

ধ্বনৎসমস্তপাতকারিদারিতাপদাচলম্ ।

জগল্লয়ে মহাভয়ে মৃকণ্ডুসূনুহর্ম্যদে

ত্বদীয়পাদপঙ্কজং নমামি দেবি নর্মদে ||৩||

ভাবার্থ - হে দেবী, যৎসংসৃষ্ট মহাগভীর জলস্পর্শে পাপগ্রস্তভূতল পূত হয়েছে, যদীয় গর্জনপরায়ণ বারি নিখিলপাতকবিনাশী এৰং পর্বত বিদীর্ণ করে প্রবাহিত, ভীতিপ্রদ মহা প্রলয়কালে হে মার্কণ্ডেয় মুনির আশ্রয়দায়িনী, হে দেবী নর্মদে! তোমার সেই চরণকমলে নমস্কার ||৩||

গতং তদৈব মে ভয়ং ত্বদম্বু বীক্ষিতং যদা

মৃকণ্ডুসূনুশৌনকাসুরারিসেবিতং সদা ।

পুনর্ভবাব্ধিজন্মজং ভবাব্ধিদুঃখশর্মদে

ত্বদীয়পাদপঙ্কজং নমামি দেবি নর্মদে ||৪||

ভাবার্থ - হে দেবি, মার্কণ্ডেয়-শৌনকাদি মুনিগণ ও সুরগণের সদাসেবিত ভবদীয় বারি আমি যখন দর্শন করছি, তখনই পুনঃ সংসার-সাগরে জন্মজনিত ভয় গিয়েছে, ( অতএব ) হে ভবসমুদ্রদুঃখবারিণী হে দেবি নর্মদে, তোমার চরণকমলে নমস্কার করি ||৪||

অলক্ষ্যলক্ষকিন্নরামরাসুরাদিপূজিতং

সুলক্ষনীরতীরধীরপক্ষিলক্ষকূজিতম্ ।

বসিষ্ঠশিষ্টপিপ্পলাদিকর্দমাদিশর্মদে

ত্বদীয়পাদপঙ্কজং নমামি দেবি নর্মদে ||৫||

ভাবার্থ - হে বশিষ্ট-শিষ্ট-পিপ্পলাদ-কর্দমাদি মহর্ষিগণসুখদায়িনী, দেবি নর্মদে, অসংখ্য কিন্নর অমর ও অসুর প্রভৃতি পুজিত সুলক্ষণ নীরতীরস্থ লক্ষপক্ষিকুজনসুচিত তদীয় চরণকমলে নমস্কার করি ||৫||

সনৎকুমারনাচিকেতকশ্যপাত্রিষট্পদৈঃ

ধৃতং স্বকীয়মানসেষু নারদাদিষট্পদৈঃ ।

রবীন্দুরন্তিদেবদেবরাজকর্মশর্মদে

ত্বদীয়পাদপঙ্কজং নমামি দেবি নর্মদে ||৬||

ভাবার্থ - হে সূর্য চন্দ্র দেবরাজ ও রাজা রন্তিদেবের কর্মানুসারে সুখবিধায়িনী দেবি নর্মদে, সনৎকুমার, নাচিকেত, কশ্যপ, অত্রি প্রমুখ ঋষির ছয়টি আশ্রমস্থানে ও ভ্রমরসদৃশ নারদাদি মুনিগণের মানসমধ্যে স্থিত ত্বদীয় চরণকমলে নমস্কার করি ||৬||

অলক্ষলক্ষলক্ষপাপলক্ষসারসায়কং

ততস্তু জীবজন্তুতন্তুভুক্তিমুক্তিদায়কম্ ।

বিরিঞ্চিবিষ্ণুশঙ্করস্বকীয়ধামশর্মদে

ত্বদীয়পাদপঙ্কজং নমামি দেবি নর্মদে ||৭||

ভাবার্থ - হে ব্রহ্মলোক, বিষ্ণুলোক ও শিবলোক-সুখ-বিধায়িনী দেবি নর্মদে, অলক্ষ্য লক্ষ লক্ষ পাপ যার ভেদ্য-লক্ষ্য–সেইরপ শরস্বরূপে যিনি অবস্থিত, যিনি ভূচর জীব, খেচর জন্ত এবং গ্রাহ প্রভৃতি জলচরকেও ভোগ-মোক্ষ প্রদান করেনঃ তোমার সেই বিশাল চরণকমলে নমস্কার করি ||৭||

অহোঽমৃতং সমং শ্রুতং মহেশকেশজাতটে

কিরাতসূতবাড়বেষু পণ্ডিতে শঠে নটে ।

দুরন্তপাপতাপহারি সর্বজন্তুশর্মদে

ত্বদীয়পাদপঙ্কজং নমামি দেবি নর্মদে ||৮||

ভাবার্থ - হে সর্বজীবসুখবিধায়িনী দেবী নর্মদে, তোমার এই অমৃত ( জল ) গোদাবরীতটে, কিরাত, সূত ও বাড়ব জাতিতে এবং পণ্ডিত ও শঠে সর্বত্র সমান, এ শান্ত্রে শত হয়েছে, অতএব তোমার চরণকমলে নমস্কার করি ||৮||

ইদং তু নর্মদাষ্টকং ত্রিকালমেব যে সদা

পঠন্তি তে নিরন্তরং ন যান্তি দুর্গতিং কদা ।

সুলভ্যদেহদুর্লভং মহেশধামগৌরবং

পুনর্ভবা নরা ন বৈ বিলোকয়ন্তি রৌরবম্ ||৯||

ভাবার্থ - হে দেবি! যে ব্যক্তি প্রতিদিন প্রাতঃকালাদি সন্ধ্যাত্রয়ে ভক্তিপূর্বক এই নর্মদাষ্টক পাঠ করে, সে কখনো দুঃখভোগ করে না, এই নিত্য লভ্য দেহে দুর্লভ মহেশ্বরলোকের গৌরবলাভ করে, আর সেই ব্যক্তি পুনর্বার সংসারযাতনা ভোগ করে না এবং কখনও তার রৌরব নরকদর্শন হয় না ||৯||

|| ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্যস্য শ্রীমচ্ছঙ্কর ভগবতঃ কৃতৌ নর্মদাষ্টকং সম্পূর্ণম্ ||

ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্য শ্রীমদ্ শঙ্করাচার্য ভগবতঃ বিরচিত নর্মদাষ্টক স্তোত্র সমাপ্ত

 

Thursday, 9 December 2021

প্রলয়কালে সৃষ্টির বিপরীতক্রমে ভূতসকলের লয়ঃ-


অদ্বৈতবেদান্তে সৃষ্টিক্রম বিষয়ক ধারাবাহিক আলোচনায় আজকের আলোচ্য বিষয় প্রলয়ে উৎপত্তিক্রমের বৈপরীত্য। বেদান্ত মীমাংসা শাস্ত্রের বিপর্যয়াধিকরণম্ এর প্রতিপাদ্য বিষয় প্রলয়কালে সৃষ্টির বিপরীতক্রমে ভূতবর্গ লয় প্রাপ্ত হয়। এখন প্রশ্ন হইতেছে- বিশ্বের প্রলয়ের সময় পদার্থসমূহ যে ব্রহ্মে লীন হয় তাহা কি সৃষ্টিকালীন ক্রমানুসারে না বিপরীতক্রমে? ভগবান সূত্রকার বাদরায়ণ সিদ্ধান্ত করিতেছেন-

বিপর্যয়েণ তু ক্রমোত উপপদ্যতে চ৷৷ ব্রহ্মসূত্র-২.৩.১৪

ভগবান ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য এই সূত্রের ভাষ্যে সিদ্ধান্ত করিতেছেন- সেহেতু আমরা বলিতেছি- প্রলয়ের ক্রম এই উৎপত্তিক্রম হইতে বিপরীতভাবেই হওয়া উচিত। যেহেতু লোকমধ্যে সেইপ্রকারই পরিদৃষ্ট হইতেছে, যে ক্রমে সোপানে আরূঢ় হয়, তাহার বিপরীতক্রমে অবরোহন করে। আর দেখাও যাইতেছে- মৃত্তিকা হইতে উৎপন্ন ঘট ও শরা প্রভৃতি বিলয়কালে মৃত্তিকাভাবই প্রাপ্ত হয়, আবার জল হইতে উৎপন্ন হিমশিলা প্রভৃতি বিলয়কালে মৃত্তিকাভাবই প্রাপ্ত হয়, ইত্যাদি। এইহেতু ইহা সঙ্গত যে, পৃথিবী জল হইতে উৎপন্ন হইয়া স্থিতিকাল অতীত হইলে জলে লয় প্রাপ্ত হইবে, আর জলও তেজঃ হইতে উৎপন্ন হইয়া তেজে লয় প্রাপ্ত হইবে। এই প্রকারে ক্রমশঃ সূক্ষ্ম ও সূক্ষ্মতর অনন্তর অনন্তর কারণে লয় প্রাপ্ত হইয়া সমস্ত কার্য্য-প্রপঞ্চ পরমকারণ ও পরমসূক্ষ্ম ব্রহ্মে বিলীন হয়, এইপ্রকার অবগত হইতে হইবে। যেহেতু নিজের কারণকে অতিক্রম দ্বারা কারণ এর কারণে কার্য্যের বিলয় ন্যায্য নহে। স্মৃতিতেও তত্তৎস্থলে-

জগত্প্রতিষ্ঠা দেবর্ষে পৃথিব্যপ্সু প্রলীয়তে৷ জ্যোতিষ্যাপঃ প্রলীৎন্তে জ্যোতির্বায়ৌ প্রলীয়তে'-(মহাভারত, শান্তিপর্ব-৩৩৯।২৯)

"হে দেবর্ষি, জগতের প্রতিষ্ঠা (উপাদান) পৃথিবী জলে প্রলীন হয়, জল তেজে প্রলীন হয়, তেজঃ বায়ুতে প্রলীন হয়", ইত্যাদি এইসকল স্থলে উৎপত্তিক্রমের বিপরীতভাবেই প্রলয়ের ক্রম প্রদর্শিত হইয়াছে।

উৎপত্তিক্রম কিন্তু ভুতসকলের উৎপত্তিতেই শ্রুত হইয়াছে বলিয়া প্রলয়েও গৃহীত হইতে পারে না। আর তাহা (—সেই শ্রৌত উৎপত্তিক্রম) অযোগ্য হওয়ায় প্রলয়কর্ত্তৃক আকাঙ্ক্ষিত হয় না, কার্য্য ধ্রিয়মাণ (—কারণাবলম্বনে বর্ত্তমান) থাকিলে কারণের প্রলয় নিশ্চয়ই সঙ্গত নহে, যেহেতু কারণের নাশ হইলে কার্য্যের অবস্থান যুক্তিসঙ্গত নহে। কিন্তু কার্য্যের বিনাশ হইলে কারণের অবস্থান যুক্তিসঙ্গত, যেহেতু মৃত্তিকা প্রভৃতিতে এইপ্রকার পরিদৃষ্ট হয়।

ব্রহ্মানুচিন্তনম্ বা আত্মচিন্তনম্ বা মহাবাক্যসিদ্ধান্তস্তোত্রম্

  অহমেব পরং ব্রহ্ম বাসুদেবাখ্যমব্যয়ম্ । ইতি স্যান্নিশ্চিতো মুক্তো বদ্ধ এবান্যথা ভবেৎ || ১ || অনুবাদ - " আমিই সেই অবিনা...