Monday, 21 June 2021

অদ্বৈতবেদান্তে সৃষ্টিক্রমঃ-

 

মায়াবশেই নির্বিকার ব্রহ্মে জগৎ প্রতীতি হইয়া থাকে। ব্রহ্মবিবর্ত জগৎ ব্রহ্মভিন্ন নহে। অতএব এক ব্রহ্মই সদা বিরাজমান রহিয়াছেন। বিবর্তবাদে কার্য একটি মিথ্যা প্রতীত মাত্র; কার্য বস্তুতঃ কোন কালে হয়ই নাই। সৃষ্টির পূর্বে নিত্যমুক্ত অবিক্রিয় এক পরংব্রহ্মই বর্তমান ছিলেন। অর্থাৎ ব্রহ্ম দেশকালরূপ বস্তুপরিচ্ছেদশূন্য, অতএব সৃষ্টিরপূর্বে এক সজাতীয় বিজাতীয়-স্বগতভেদশূন্য পরম অর্থাৎ পরমানন্দস্বরূপ, নিত্যমূক্ত, ত্রিকালেই সর্ব অনর্থরূপ প্রপঞ্চসম্বন্ধশূন্য সচ্চিদানন্দত্মক পরংব্রহ্মই বর্তমান ছিলেন।

শ্রুতিও তাই বলিতেছেন -'সদেব সোম্যেদমগ্র আসীদেকমেবাদ্বিতীয়ম্'- (ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬/২/১)।

‘হে প্রিয়দর্শন, এই জগৎ উৎপত্তির পূর্ব্বে এক অদ্বিতীয় সৎ রূপেই বিদ্যমান ছিল।

এইরূপ অন্যস্থলেও শ্রুতি বলিতেছে-

'আত্মা বা ইদমেক এবাগ্র আসীত্৷ নান্যৎ কিঞ্চন মিষত্৷-(ঐতরেয় উপনিষৎ-১/১/১)

ইহা অর্থাৎ এই জগৎ উৎপত্তির পূর্ব্বে একমাত্র আত্মস্বরূপেই বিদ্যমান ছিল, ব্যাপারবান্ অন্য কিছুই ছিল না।

এইরূপ আরম্ভ করিয়া 'তদৈক্ষত বহু স্যাং প্রজায়েয়েতি তত্তেজোসৃজত'।-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬/২/৩)

'তিনি ইক্ষণ করিলেন, আমি বহু হইব, প্রকৃষ্টরূপে উৎপন্ন হইব, তিনি তেজকে সৃষ্টি করিলেন' ইত্যাদি।

উক্ত শ্রুতিবাক্যে ইদম্ শব্দবাচ্য এবং নাম ও রূপের দ্বারা অভিব্যক্ত এই জগৎকে উৎপত্তির পূর্ব্বে সৎস্বরূপ আত্মরূপে অবধারণ করিয়া সেই প্রস্তাবিত সৎশব্দবাচ্য ব্রহ্মের ইক্ষণপূর্ব্বক তেজঃ প্রভৃতির স্রষ্টৃত্ব প্রদর্শন করিতেছেন। এইরূপ অন্যস্থলেও শ্রুতি বলিতেছে-

'সঃ ঈক্ষত লোকান্নু সৃজা ইতি৷ স ইমা্লোকানসৃজত।'-(ঐতরেয় উপনিষৎ-১/১/২)

সেই আত্মা ঈক্ষণ করিলেন, আমি লোকসমূহকে সৃজন করিব, তিনি এইলোক সকলকে সৃজন করিলেন।' এইপ্রকারে ঈক্ষণপূর্বক সৃষ্টির কথাই শ্রুতি বলিতেছেন।

আবার কোনস্থলে ষোড়শকলাযুক্ত পুরুষের প্রস্তাব করিয়া শ্রুতি বলিতেছেন-'স ঈক্ষাংচক্রে, স প্রাণমসৃজত'।-(প্রশ্ন উপনিষৎ-৬।৩-৪) 'তিনি ঈক্ষণ করিয়াছিলেন'।'তিনি প্রাণকে সৃষ্টি করিয়াছিলেন।'

যঃ সর্বজ্ঞঃ সর্ববিদ্যস্য জ্ঞানময়ং তপঃ৷ তস্মাদেতব্রহ্ম নাম রূপমন্নং চ জায়তে'।(মুণ্ডক উপনিষৎ-১।১।৯)

'যিনি সর্ব্বজ্ঞ এবং সর্ব্ববিৎ, যাহাঁর তপস্যা জ্ঞানময় অর্থাৎ জ্ঞানাত্মক ঈক্ষণক্রিয়াই যাহাঁর তপস্যা, তাঁহা হইতেই এই হিরণ্যগর্ভ, নামরূপ এবং অন্ন উৎপন্ন হয়।'

সেই ব্রহ্মতে শক্তিভূতা এবং নিজেতেই (ব্রহ্মতেই) অধ্যস্তা যে মায়া, মায়াশক্তিবিশিষ্ট সেই আবৃত, সুতরাং অজ্ঞাত ব্রহ্মেই জগৎ প্রপঞ্চ বিক্ষিপ্ত (-সৃষ্ট) হয়। পরমেশ্বরের অধীন এই মায়া ব্যতিরেকে পরমেশ্বরের জগৎস্রষ্টৃত্ব সম্ভব নহে। কারণ যিনি শক্তিরহিত, তাহার (সৃষ্ট্যাদিকর্ম্মে) প্রবৃত্তি যুক্তি সঙ্গত নহে। সেই প্রসিদ্ধা মায়াই অব্যক্ত যা ব্যক্ত নয় তাই অব্যক্ত বা অব্যাকৃত অর্থাৎ ঈশ্বর-শক্তি, যাহা সম্পূর্ণ জগতের বীজভূত অর্থাৎ উপাদান কারণ স্বরূপ।

সদানন্দযোগীন্দ্র সরস্বতী বেদান্তসারে বলিতেছেন—"যেমন রজ্জুর অজ্ঞান রজ্জুকে আবৃত করে রজ্জুতে নিজশক্তির দ্বারা সর্প প্রভৃতি কল্পনা করে, সেরূপ (আত্মাশ্রিত) অজ্ঞান আত্মাকে আবৃত করে আত্মাকে নিজশক্তি বলে আকাশাদি জগৎ সৃষ্টি করে। (এভাবে কল্পনা-বলে) সৃষ্টি করার এই সামর্থ্যকে বিক্ষেপশক্তি বলে। এই সম্পর্কে বাক্যসুধায় শঙ্করাচার্য বলিতেছেন—'বিক্ষেপশক্তি সূক্ষ্মশরীর থেকে আরম্ভ করে ব্রহ্মাণ্ড পর্যন্ত জগৎ সৃষ্টি করে।'-(বাক্যসুধা-১৩)"

মায়াশক্তি বিশিষ্ট ব্রহ্ম হইতে আকাশ, আকাশভাবাপন্ন ব্রহ্ম হইতে বায়ু, ইত্যাদি এই ক্রমে ব্রহ্ম হইতে পঞ্চ অপঞ্চীকৃত ভূতের (তন্মাত্রার) উৎপত্তি হয়। অনন্তর মুখ্যপ্রাণ মন ও ইন্দ্রিয় সকলের উৎপত্তি পরমেশ্বরাধিষ্ঠিত এই ভূতসকল হইতেই হইয়া থাকে। অনন্তর পরমেশ্বর কর্ত্তৃক পঞ্চীকরণ ও স্থুল ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্ট হয়। ইহাই অদ্বৈত বেদান্তে সৃষ্টিক্রম।

প্রথমত সেই ব্রহ্মের ব্যাকৃত সত্তা হইতে আকাশ, আকাশ হইতে বায়ু, বায়ু হইতে অগ্নি, অগ্নি হইতে জল, জল হইতে ক্ষিতি, ক্ষিতি হইতে ওষধিসকল, ওষধিসকল হইতে অন্ন এবং অন্ন হইতে দেহ- এই যে ক্রম, কৃষ্ণ যজুর্বেদীয় তৈত্তিরীয় উপনিষদের দ্বিতীয়া ব্রহ্মানন্দবল্লীতে এর একটী স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়-

তস্মাদ্বা এতস্মাদাত্মন আকাশঃ সম্ভূতঃ । আকাশাদ্বায়ুঃ ।

বায়োরগ্নিঃ । অগ্নেরাপঃ । অদ্ভ্যঃ পৃথিবী ।

পৃথিব্যা ওষধয়ঃ । ওষধীভ্যোন্নম্ । অন্নাৎপুরুষঃ ।

স বা এষ পুরুষোঽন্নরসময়ঃ......॥ ১॥ ইতি প্রথমোঽনুবাকঃ ॥

শঙ্করাচার্য এই শ্রুতির ভাষ্যে বলিতেছেন- সেই এই আত্মস্বরূপ ব্রহ্মের নিমিত্ত আকাশ উৎপন্ন হইল। এখন শব্দগুণসম্পন্ন আকাশ হইতেছে আকারবিশিষ্ট দ্রব্যসকলের স্থানদাতা। আর সেই আকাশ হইতে স্বীয় গুণ 'স্পর্শ' ও পূর্ববর্তী আকাশের শব্দগুণের সহযোগে দুইগুণবিশিষ্ট বায়ু সম্ভূত (উৎপন্ন) হইল। এবং স্বীয় গুণ 'রূপ' ও পূর্ববর্তী (শব্দস্পর্শ) গুণদ্বয়ের সহযোগে বায়ু হইতে ত্রিগুণবিশিষ্ট অগ্নি উৎপন্ন হইল। আর স্বীয় গুণ রস ও পূর্ববর্ত্তী (শব্দস্পর্শরূপ) গুণত্রয়ের সহযোগে অগ্নি হইতে চতুর্গুণবিশিষ্ট জল উৎপন্ন হইল এবং স্বীয় গুণ গন্ধ ও পূর্ববর্তী (শব্দস্পর্শরূপরস) গুণ চতুষ্টয়ের সহযোগে জল হইতে পঞ্চগুণবিশিষ্ট পৃথিবী উৎপন্ন হইল। আর পৃথিবী হইতে ওষধিসমূহ, ওষধিসমূহ হইতে অন্ন। আর রেতোরূপে পরিণত অন্ন হইতে শিরঃ হস্তাদি আকৃতিবিশিষ্ট পুরুষ (মানবদেহ) সমুৎপন্ন হইল।

এই সেই প্রসিদ্ধ পুরুষ (মানবদেহ) অন্নরসময়-অন্নরসের বিকার অর্থাৎ সমস্ত অঙ্গাদি হইতে তেজসম্ভূত পুরুষাকৃতিপ্রাপ্ত রেতোরূপ বীজ হয়। আর সেই বীজ হইতে যে শরীর জন্মে তাহাও সেইরূপ পুরুষাকৃতি বিশিষ্টই হইয়া থাকে, কেননা সকল জাতিতে জায়মানগণের মধ্যে জনকের আকৃতি প্রাপ্তির নিয়ম দেখা যায়।..................

যোগ কি?


 

যোগদার্শনিক পতঞ্জলি তাঁর যোগসূত্রে যোগের সংজ্ঞা দিচ্ছেন এইভাবে-

‘যোগশ্চিত্তবৃত্তি নিরোধঃ’- (যোগসূত্র, সমাধিপাদ্-২)

অর্থাৎ চিত্তবৃত্তির নিরোধই যোগ।

ব্যাসভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- চিত্ত যেহেতু প্রখ্যা বা প্রকাশশীলতায় সত্ত্বগুণযুক্ত, তাই তা প্রকাশস্বরূপ। প্রবৃত্তিশীলতা ও স্থিতিশীলতায় চিত্ত সত্ত্ব,রজঃ ও তমঃ ত্রিগুণাত্মক। যেহেতু প্রকাশস্বরূপ চিত্ত এই ত্রিগুণের দ্বারা বিজড়িত, তাই সে ঐশ্বর্য্য ও বিষয়প্রিয় হয়। সেই চিত্ত তমোগুণভাবাপন্ন অধর্ম্ম, অজ্ঞান, অবৈরাগ্য ও অনৈশ্বর্য্য প্রভৃতিতে উপগত হয়। সেই চিত্ত আবার নিজ মোহ আবরণের অত্যন্ত ক্ষীণতায় প্রজ্ঞাসম্পন্নে সবদিক দিয়ে আবিষ্ট হলে পর রজোগুণমাত্র স্বীকারে ধর্ম্ম, জ্ঞান, বৈরাগ্য ও ঐশ্বর্য্যে উপগত হয়। সেই চিত্ত আবার রজোগুণরূপ মল-লেশ বিযুক্ত অবস্থায় নিজস্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। নিজগতবুদ্ধি ও পুরুষের (আত্মা) মধ্যে অন্যতাখ্যাতিমাত্র উদয়ে অর্থাৎ পূর্ণ সাত্ত্বিক-প্রসাদ গুণবিশিষ্ট বিবেকখ্যাতি উদয়ে ধর্ম্মমেঘ ধ্যানে উপগত হয়।

ধ্যানশীল যোগীরা এই অবস্থাকে উত্তম প্রসংখ্যান বা জ্ঞানের পরাকাষ্ঠা বলে থাকেন। চিতিশক্তি অপরিণামিনী, অপ্রতিসংক্রমা অর্থাৎ কোন প্রকার কার্য্যে বা বিষয়ে সঞ্চারশূন্যা,তাই চিতিশক্তি দর্শিতবিষয়া অর্থাৎ বিষয়রূপ পরিণতিতে সে সেই বিষয় পুরুষকে প্রদর্শন করায়, এই ভাবের হওয়ায় চিতিশক্তি শুদ্ধা ও অনন্তা। অতএব এই বিবেকখ্যাতি সত্ত্বগুণাত্মিকা, তাই তার বিপরীত হল চিতিশক্তি। এইজন্য বিবেকখ্যাতির উপর সে বিরক্ত চিত্ত, সেই বিবেকখ্যাতিকেও সে নিরুদ্ধ করে। সেই নিরুদ্ধ অবস্থায় চিত্ত মাত্র সংস্কারে অবস্থান করে। তা হলো নির্বীজ সমাধি, আর সেখানে কোনকিছু জ্ঞান না থাকায় তা অসম্প্রজ্ঞাত। এভাবে দু-রকমে চিত্তবৃত্তি নিরোধই যোগ বলা হয়ে থাকে। ইতি ভাষ্যানুবাদ।

স্বয়ং শ্রুতিও চিত্তভূমির এই একাত্মতার অভাবে চিত্তের অসমাহিত অবস্থা বর্ণনা করছে-

নাবিরতো দুশ্চরিতান্নাশান্তো নাসমাহিতঃ ৷

নাশান্তমানসো বাপি প্রজ্ঞানেনৈনমাপ্নুয়াৎ ৷৷কঠ উপনিষৎ ১.২.২৪৷৷

শাঙ্করভাষ্য অনুবাদঃ-এই শ্রুতি অবলম্বনে ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের ভাষ্য হল- তবে এক কথা, যে দুশ্চরিত হতে অর্থাৎ শ্রুতি ও স্মৃতিতে অবিহিত নিষিদ্ধ পাপকর্ম্ম হতে যে অবিরত অর্থাৎ নিবৃত্ত নয়; ইন্দ্রিয়ের চঞ্চলতাবশতঃ যে অশান্ত বা উপরতিশূন্য তাঁর ব্রহ্মপ্রাপ্তি হয় না। যে অসমাহিত অর্থাৎ যাঁর চিত্ত একাগ্র নয় অর্থাৎ যে বিক্ষিপ্তচিত্ত তাঁরও প্রত্যাগাত্মা প্রাপ্তি হয় না। আর একাগ্রচিত্ত হয়েও এই একাগ্রতার ফল কামনায় যে অশান্তচিত্ত অর্থাৎ ফলবিষয়ে ব্যাপৃতচিত্ত, সেজনও ব্রহ্মতত্ত্বের সহায়ে প্রস্তাবিত সেই প্রত্যাগাত্মাকে প্রাপ্ত হতে পারে না। পক্ষান্তরে যিনি দুশ্চরিত্রতা ও ইন্দ্রিয়ের চঞ্চলতা হতে বিরত, একাগ্রচিত্ত এবং ঐ একাগ্রতার ফল হতে যাঁর মন নিবৃত্ত এবং আচার্য্য কর্তৃক উপদিষ্ট, তিনি ব্রহ্মতত্ত্বের সহায়ে পূর্বোক্ত নিশ্চল নির্বিশেষ প্রত্যাগাত্মাকে প্রাপ্ত হন।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায়ও স্বয়ং শ্রীভগবান অর্জুনকে বিভিন্নভাবে যোগের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এক জায়গায় তিনি যোগের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলছেন-

বুদ্ধিযুক্তো জহাতীহ উভে সুকৃতদুষ্কৃতে৷

তস্মাদ্যোগায় যুজ্যস্ব যোগঃ কর্মসু কৌশলম্৷ ৷(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২।৫০)

শাঙ্করভাষ্য অনুবাদঃ- যিনি সমত্ববিষয়ক বুদ্ধিযুক্ত, ইহলোকে তিনি সুকৃত দুষ্কৃত অর্থাৎ পূণ্য ও পাপ উভয়ই সত্ত্বশুদ্ধিজ্ঞান প্রাপ্তি দ্বারা পরিত্যাগ করেন। তজ্জন্য তুমি সমত্ব বুদ্ধিযুক্ত যোগের অনুষ্ঠান কর। যেহেতু যোগ হইতেছে কর্ম্মের কৌশল। স্বধর্ম্মাখ্য কর্ম্মে যিনি বর্ত্তমান তাঁহার ঈশ্বরার্পিত চিত্ততাহেতু সিদ্ধি ও অসিদ্ধিতে সমত্ববুদ্ধি তাহাই কৌশল অর্থাৎ কুশলভাব। এই কৌশল হইতেছে- যাহা বন্ধস্বভাব কর্ম্ম সকলকে সমত্ববুদ্ধি দ্বারা তাহাদের স্বভাব হইতে নিবর্তিত করে; সেইহেতু তুমি সমত্ববুদ্ধিযুক্ত হও।

.................................................................

 

Thursday, 17 June 2021

জীব ঈশ্বরের কল্পিত অংশ কোন হেতুবশতঃ ?

 


জীব ঈশ্বরের কল্পিত অংশ কোন হেতুবশতঃ ?

ইতোমধ্যে আলোচনা করিয়াছি জীব ঈশ্বরের কল্পিত অংশ। এখন কোন্ হেতুবশতঃ এই অংশতার জ্ঞান হয়? ভগবান সূত্রকার ব্রহ্মসূত্রে বলিতেছেন-

মন্ত্রবর্ণাচ্চ ৷৷- (ব্রহ্মসূত্র-২.৩.৪৪)

'শাঙ্করভাষ্য' অনুবাদঃ- ভগবান ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য শারীরক মীমাংসা ভাষ্যে বলিতেছেন- এই মন্ত্রবর্ণও এই অর্থই অর্থাৎ ব্রহ্মাভিন্ন জীব অবিদ্যাদশাতে তাঁহার কল্পিত অংশ, ইহাই বোধ করাইতেছে। যথা-

"তাবানস্য মহিমা ততো জ্যায়াংশচ পূরুষঃ । পাদোহস্য সর্বা ভূতানি ত্ৰিপাদস্যামৃতং দিবীতি ॥"- (ছান্দোগ্যোপনিষৎ- ৩.১২.৬)

"ব্রহ্মের চতুষ্পদ ও ষড়বিধ বিকারাত্মক যে পরিমাণ একপাদ গায়ত্রী বলিয়া বর্ণিত হইল, সেই পরিমাণই অৰ্থাৎ তৎসমস্তই উক্ত গায়ত্রী সংজ্ঞক সমস্ত ব্ৰহ্মের মহিমা, অর্থাৎ বিভূতির বিস্তার ; অতএব, তদাপেক্ষা অর্থাৎ গায়ত্রী-সংজ্ঞক বাচারম্ভণমাত্ররূপী অসত্য বিকারাত্মক ব্ৰহ্ম অপেক্ষাও পরমার্থ সত্য, বিকারহীন পূরুষ (পরব্রহ্ম) অতিশয় মহৎ ; কারণ, তিনিই সর্ব জগৎকে পরিপূরণ করেন, অথবা হৃদয়রূপ পুরে অবস্থান করেন, এইজন্য পুরুষ-পদবাচ্য হন । সমস্ত ভূত অর্থাৎ তেজ, জল ও পৃথিবী প্রভৃতি স্থাবর-জঙ্গম-সমূহ সেই এই পুরুষেরই একপাদ (একাংশমাত্র); এই গায়ত্র্যাত্মক সমস্ত ব্ৰহ্মের ত্রিপাদযুক্ত অমৃতস্বরূপ পূরুষ প্রকাশময় নিজ আত্মস্বরূপে অবস্থিত আছেন। ইতি শব্দ মহিমা কথন সমাপ্তি জ্ঞাপনার্থ ॥"

এখানে জীব যাহাতে প্রধান, সেই স্থাবরজঙ্গমসকলকে শ্রুতি নির্দেশ করিতেছেন-"অহিংসন্সর্বভূতান্যন্যত্র তীর্থেভ্যঃ" - (ছান্দোগ্যোপনিষৎ- ৮.১৫.১) "তীর্থ (-শাস্ত্রবিহিত কর্ম্ম) হইতে অন্যত্র ভূতসকলকে হিংসা করিবে না", এইপ্রকার প্রয়োগ আছে। অংশ, পাদ ও ভাগ ইহারা অর্থান্তর নহে, ইহারা পর্যায় শব্দ। এই হেতুবশতঃও অর্থাৎ বেদমন্ত্রে পঠিত হইয়াছে বলিয়াও জীব ঈশ্বরের কল্পিত অংশ ইহার জ্ঞান হয়।

আবার শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাতেও জীব ঈশ্বরের অবিদ্যা কল্পিত অংশ ইহা স্মৃত হইতেছে। তাই মহর্ষি বাদরায়ণ পরবর্তী সূত্র করিতেছেন-

অপি চ স্মর্যতে ৷৷- (ব্রহ্মসূত্র-২.৩.৪৫)

'শাঙ্করভাষ্য' অনুসারে ভাবার্থঃ- আর দেখ, ভগবদ্গীতাতেও জীব ঈশ্বরের অংশ ইহা, স্মৃত হইতেছে। আর এইহেতুশতঃও জীবের ঈশ্বরাংশতা অবগত হওয়া যায়। যথা-

'মমৈবাংশো জীবলোকে জীবভূতঃ সনাতনঃ'-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৫।৭)

"কারণ জীবলোকে অর্থাৎ সংসারে কর্তাভোক্তারূপে প্রসিদ্ধ জীব আমারই (পরমাত্মারই) সনাতন অংশ অর্থাৎ ভাগ বা অবয়ব বা একদেশ অর্থাৎ এইগুলি পরমাত্মা হইত পৃথক কোন অর্থান্তর নহে। সেই জীব আমার (পরমাত্মার) অংশ রূপে কল্পিত। জলরূপ নিমিত্ত অপসৃত হইলে সূর্যাংশ জল-সূর্য যেরূপ সূর্যে লীন হয়, অথবা মহাকাশের অভিন্ন অংশ ঘটস্থ আকাশ যেরূপ ঘট নষ্ট হইলে মহাকাশে মিলিত হয়, আর প্রত্যাগমন করে না, সেইরূপ ব্রহ্মাংশ জীব অবিদ্যাকৃত উপাধি-অপগমে ব্রহ্মপ্রাপ্ত হইয়া আর পুনরাবৃত্ত হয় না। কারণ জীব ব্রহ্মই।"...................

ভগবান বাদরায়ণ এইসূত্রে তাই বলিতেছেন-

আভাস এব চ ৷৷- (ব্রহ্মসূত্র-২.৩.৫০)

'শাঙ্করভাষ্য' অনুসারে ভাবার্থঃ- জলে প্রতিবিম্বিত সূর্য্য প্রভৃতির ন্যায় এই জীব অবশ্যই পরমাত্মার আভাস (-প্রতিবিম্ব), ইহা অবগত হইতে হইবে। তিনিই (-উপাধিবর্জ্জিত পরমাত্মাই) সাক্ষাৎ জীব নহেন আবার তিনি জীব হইতে ভিন্ন বস্তুও নহেন।...................

 


Monday, 14 June 2021

ব্রহ্ম সত্য, জ্ঞান ও অনন্তস্বরূপঃ-

 


কৃষ্ণযজুর্বেদের তৈত্তিরীয় শাখার অন্তর্গত তৈত্তিরীয়োপনিষদের ব্রহ্মানন্দবল্লীতে বর্ণিত আছে-

'সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম ৷' ২।১

শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- 'সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম' এই বাক্য ব্রহ্মের লক্ষণবিষয়ক।

সত্য প্রভৃতি তিনটি পদই বিশেষ্য ব্রহ্মের বিশেষণার্থক। জ্ঞেয়রূপে বলিতে ইচ্ছা হওয়াতে ব্রহ্ম হইতেছেন বিশেষ্য।সত্য অর্থাৎ যেরূপে যাহা নিশ্চিত হইয়াছে সেই স্বরূপকে যাহা লঙ্ঘন করে না তাহা সত্য। কিন্তু যেরূপে যাহা নিশ্চিত হইয়াছে সেই স্বরূপকে লঙ্ঘনকারী যে বস্তু তাহা মিথ্যা বলিয়া কথিত হয়।

 এইজন্য বিকার (পরিণামবিশিষ্ট বস্তু) অনিত্য, যেহেতু 'বিকার মাত্রই বাগবলম্বনে অবস্থিত নাম মাত্র, কেবল মৃত্তিকাই সত্য' এইরূপ 'সৎ' কেই (অবিকারীকেই) সত্য বলিয়া অবধারণ করা হইয়াছে।

অতএব 'সত্যং ব্রহ্ম' ইহা বলিয়া শ্রুতি ব্রহ্মকে বিকার হইতে নিবৃত্ত করিতেছেন।ইহার ফলে কিন্তু ব্রহ্মের (বিকার সমুদয়ের) কারণত্ব প্রাপ্তি হইতেছে।

আর কারণের ক্রিয়াসম্বন্ধ হয় এবং সত্য পদার্থ সত্ত্বাবিশিষ্ট হওয়াতে মৃত্তিকার ন্যায় অচেতনত্ব প্রাপ্তি হইয়া যাইতেছে; এই জন্য 'জ্ঞানং ব্রহ্ম' ইহা বলা হইতেছে।

এই জ্ঞানের অর্থ জ্ঞপ্তি বা অনুভূতি অর্থাৎ অনুভতিরূপ সিদ্ধিবাচক এই জ্ঞান (কিন্তু বৃত্তিজ্ঞানরূপ ক্রিয়া নহে); অর্থাৎ তিনি জ্ঞানকর্তা হন না, কারণ সত্য  অনন্তের সহিত জ্ঞানও ব্রহ্মের আরেক বিশেষণ হয়।আবার যেহেতু (বৃত্তি) জ্ঞানরূপ ক্রিয়ার কর্তা হইলে ব্রহ্মের সত্যতা  অনন্ততা হইতে পারে না।কেননা বৃত্তিজ্ঞানের কর্তারূপে বিক্রিয়মান হইয়া কিরূপে ব্রহ্ম সত্য  অনন্ত হইবেন? কারণ যাহাকে কোন কিছু হইতে পৃথক্ করা যায় না, তাহাই অনন্ত।

ব্রহ্ম জ্ঞানকর্তা হইলে জ্ঞেয়  জ্ঞান হইতে পৃথক্ হইয়া গেলেন বলিয়া আর অনন্ততা সম্ভব হইবে না, যেহেতু 'যাহাতেকেহ কিছু উপলব্ধি করিতে পারে না তাহা ভূমা, আর যাহাতে কেহ কিছু উপলব্ধি করে তাহা অল্প অর্থাৎ সসীম'- এইরূপ অন্য শ্রুতি আছে।

'জ্ঞানং ব্রহ্ম' এই জ্ঞানপদ ব্রহ্মের কর্তৃত্বাদি বিকার নিবৃত্তির জন্য এবং মৃত্তিকাদির ন্যায় অচেতনতা নিবৃত্তির জন্য প্রয়োগ করা হইয়াছে।

 তবে 'জ্ঞানং ব্রহ্ম' এইরূপ বলাতে ব্রহ্মের অন্তবিশিষ্ট হওয়া প্রাপ্ত হইতেছিল, কারণ লৌকিক জ্ঞানের অন্তবিশিষ্ট হওয়া দেখা যায়। এইহেতু তন্নিবৃত্তের জন্য শ্রুতি 'অনন্ত' এই বিশেষণের উল্লেখ করিতেছেন।..


Wednesday, 9 June 2021

'উপনিষদ্' পদের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ কি?

 


শঙ্করাচার্য কৃষ্ণযজুর্বেদীয় কঠোপনিষদের ভাষ্য ভূমিকাতে ইহার একটি সুস্পষ্ট ধারণা দিচ্ছেন- 'উপ' 'নি' পূর্বক সদ্ ধাতুর ক্বিপ্ প্রত্যয় নিষ্পন্ন এই উপনিষদ্ পদটি 'সদ্' ধাতুর বিনাশ, প্রাপ্তি, অবসাদনার্থক তিন প্রকার অর্থভেদে তিন প্রকার অর্থের প্রকাশক হইয়া থাকে।

যে মুমুক্ষুগণ লৌকিক পারলৌকিক বিষয়ে বিতৃষ্ণ হইয়া উপনিষদ্ শব্দের বাচ্য যে আত্মবিষয়ক পরোক্ষ জ্ঞান সেই বিদ্যার 'উপ' বা সমীপে গমন করিয়া অর্থাৎ শ্রবণ করিয়া তাহাতে 'নি' বা নিষ্ঠা সহকারে নিঃসংশয় চিত্তে অনুশীলন করেন তাঁহাদের অবিদ্যাদি সংসার বীজের বিনাশ হয় বলিয়া 'সদ্' ধাতুর এই বিনাশার্থক অর্থের যোগবশতঃ আত্মবিষয়ক বিদ্যাকে উপনিষদ্ বলা হয়।

অথবা পূর্বোক্ত বৈরাগ্য, নিষ্ঠা জ্ঞানানুশীলন প্রভৃতি বিশেষণ বিশিষ্ট মুমুক্ষুগণকে পরব্রহ্ম প্রাপ্ত করাইয়া দেয় বলিয়া 'সদ্' ধাতুর ব্রহ্মের প্রাপকত্ব অর্থের যোগবশতঃও ব্রহ্মবিষয়ক বিদ্যাকে উপনিষদ্ বলা হয়।

ভূঃ, ভুবঃ প্রভৃতি লোক সকলের আদি অর্থাৎ পূর্বে সৃষ্ট ব্রহ্মা হইতে জাত জ্ঞাতা যে অগ্নি বা বিরাট, দ্বিতীয় বরে প্রার্থিত সেই অগ্নি বা বিরাটবিষয়ক বিদ্যার ব্রহ্মলোকরূপ ফলপ্রাপ্তির কারণ হওয়ার ফলে বিদ্যা মনুষ্যাদি লোকে পুনঃ পুনঃ উৎপন্ন গর্ভবাস, জন্ম, জরা প্রভৃতি উপদ্রবসমূহের অবসাদকরূপে শৈথিল্য সম্পাদন করে বলিয়া সদ্ ধাতুর অবসদনার্থক অর্থের যোগবশতঃ অগ্নিবিদ্যাকেও উপনিষদ্ বলা হয়।

অনেকে উপনিষদ্ শব্দের দ্বারা গ্রন্থকেও বুঝাইয়া থাকেন। গ্রন্থ ব্রহ্মবিষয়ক বিদ্যার নিমিত্ত বলিয়া গ্রন্থে উপনিষদ্ শব্দ ব্যবহার করা যাইতে পারে। তবে উপনিষদ্ শব্দ মুখ্য অর্থে ব্রহ্মবিদ্যাতে প্রযুক্ত হয় এবং লক্ষণাসহায়ে গ্রন্থেতেও প্রযুক্ত হয়।.......

শ্রীমৃত্যুঞ্জয়মানসিকপূজাস্তোত্রম্

 


কৈলাসে কমনীয়রত্নখচিতে কল্পদ্রুমূলে স্থিতং

কর্পূরস্ফটিকেন্দুসুন্দরতনুং কাত্যায়নীসেবিতম্

গঙ্গাতুঙ্গতরঙ্গরঞ্জিতজটাভারং কৃপাসাগরং

কণ্ঠালঙ্কৃতশেষভূষণমমুং মৃত্যুঞ্জয়ং ভাবয়ে ||||

ভাবার্থ - কৈলাস পর্বতে মনোহর রত্নখচিত কল্পবৃক্ষমূলে অবস্থিত কর্পূর-স্ফটিক-চন্দ্রবৎ সুন্দর শরীর, কাত্যায়নী দ্বারা সেবিত, গঙ্গার উচ্চ তরঙ্গসমূহ শোভিত জটাবিশিষ্ট, কৃপাসিন্ধু, কন্ঠের শোভিত শেষনাগরূপ ভূষণবিশিষ্ট, মৃত্যুঞ্জয়কে ভাবনা ( চিন্তা ) করতেছি ||||

আগত্য মৃত্যুঞ্জয় চন্দ্রমৌলে

ব্যাঘ্রাজিনালঙ্কৃত শূলপাণে

স্বভক্তসংরক্ষণকামধেনো

প্রসীদ বিশ্বেশ্বর পার্বতীশ ||||

ভাবার্থ - হে মৃত্যুঞ্জয়, চন্দ্রচূড়, ব্যাঘ্রচর্মালঙ্কৃত, শূলপাণে, স্বীয় ভক্তের রক্ষা বিষয়ে কামধেনু রূপ, বিশ্বেশ্বর, পার্বতীপতি আগমন করে ( আমার প্রতি ) প্রসন্ন হও ||||

ভাস্বন্মৌক্তিকতোরণে মরকতস্তম্ভায়ুতালঙ্কৃতে

সৌধে ধূপসুবাসিতে মণিময়ে মাণিক্যদীপাঞ্চিতে

ব্রহ্মেন্দ্রামরয়োগিপুঙ্গবগণৈর্যুক্তে কল্পদ্রুমৈঃ

শ্রীমৃত্যুঞ্জয় সুস্থিরো ভব বিভো মাণিক্যসিংহাসনে ||||

ভাবার্থ - উজ্জ্বল মুক্তাখচিত তোরণযুক্ত, বহু সংখ্যক মরকতমণি নির্মিত স্তম্ভশোভিত, মণিময়, মাণিক্য দীপযুক্ত, ব্রহ্মা ইন্দ্র যোগিশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ বিশিষ্ট, কল্পদ্রুম শোভিত, ধূপ দ্বারা সুবাসিত, সৌধস্থিত মাণিক্যময় সিংহাসনে প্রভু শ্রীমৃত্যুঞ্জয় সুস্থির হও ( অচঞ্চল ভাবে অবস্থান করো ) ||||

মন্দারমল্লীকরবীরমাধবী-

পুন্নাগনীলোৎপলচম্পকান্বিতৈঃ

কর্পূরপাটীরসুবাসিতৈর্জলৈ-

রাধৎস্ব মৃত্যুঞ্জয় পাদ্যমুত্তমম্ ||||

ভাবার্থ - হে মৃত্যুঞ্জয়, মন্দার-মল্লিকা-করবী-মাধবী-পুন্নাগ-নীলপদ্ম চম্পকাদি যুক্ত, কর্পূর চন্দনাদি সুবাসিত জল দ্বারা ( রচিত ) উত্তম পাদ্য স্বীকার করো ||||

সুগন্ধপুষ্পপ্রকরৈঃ সুবাসিতৈ-

র্বিয়ন্নদীশীতলবারিভিঃ শুভৈঃ

ত্রিলোকনাথার্তিহরার্ঘ্যমাদরাৎ

গৃহাণ মৃত্যুঞ্জয় সর্ববন্দিত ||||

ভাবার্থ - সুগন্ধপুষ্প সমূহ দ্বারা সুবাসিত পবিত্র ( মঙ্গলজনক ) গঙ্গার শীতল জল দ্বারা কল্পিত অর্ঘ্য ( হে ) ত্রিলোকনাথ, দুঃখনাশন, সর্বপূজ্য মৃত্যুঞ্জয় সাদরে ( সস্নেহে ) গ্রহণ কর ||||

হিমাম্বুবাসিতৈস্তোয়ৈঃ শীতলৈরতিপাবনৈঃ

মৃত্যুঞ্জয় মহাদেব শুদ্ধাচমনমাচর ||||

ভাবার্থ - ( হে ) মৃত্যুঞ্জয়! মহাদেব! হিমজল সংযুক্ত, শীতল, অতি পবিত্র জল দ্বারা শুদ্ধ আচমন কর ||||

গুড়দধিসহিতং মধুপ্রকীর্ণং

সুঘৃতসমন্বিতধেনুদুগ্ধয়ুক্তম্

শুভকর মধুপর্কমাহর ত্বং

ত্রিনয়ন মৃত্যুহর ত্রিলোকবন্দ্য ||||

ভাবার্থ - গুড় দধিযুক্ত, মধুমিশ্রিত, উৎকৃষ্ট ঘৃতযুক্ত গোদুগ্ধ বিশিষ্ট, শুভকারী মধুপর্ক হে ত্রিনয়ন! মৃত্যুহর! ত্রিলোকপূজ্য তুমি গ্রহণ কর ||||

পঞ্চাস্র শান্ত পঞ্চাস্য পঞ্চপাতকসংহর

পঞ্চামৃতস্নানমিদং কুরু মৃত্যুঞ্জয় প্রভো ||||

ভাবার্থ - হে প্রভো! যৎ কর্তৃক ( পঞ্চাস্ত্র ) কাম বিনষ্ট হয় এবম্ভূত পঞ্চানন! পঞ্চবিধপাতক সংহারকারী ( তুমি ) এই পঞ্চামৃত দ্বারা স্নান কর ||||

জগত্রয়ীখ্যাত সমস্ততীর্থ-

সমাহৃতৈঃ কল্মষহারিভিশ্চ

স্নানং সুতোয়ৈঃ সমুদাচর ত্বং

মৃত্যুঞ্জয়ানন্তগুণাভিরাম ||||

ভাবার্থ - ( হে ) অনন্তগুণ দ্বারা মনোহর! মৃত্যুঞ্জয়, ত্রিজগতের প্রসিদ্ধ সমস্ত তীর্থ হতে আহৃত, পাপ ( মল ) নাশক, পবিত্র জল দ্বারা তুমি স্নান আচরণ কর ||||

আনীতেনাতিশুভ্রেণ কৌশেয়েনামরদ্রুমাৎ

মার্জয়ামি জটাভারং শিব মৃত্যুঞ্জয় প্রভো ||১০||

ভাবার্থ - হে প্রভু! মৃত্যুঞ্জয়! শিব! কল্পদ্রুম হতে আনীত অতিশুভ্র কৌশেয় ( রেশমী ) বস্ত্র দ্বারা ( আমি তোমার ) জটাভারকে মার্জ্জনা করি ( অর্থাৎ স্নানের দ্বারা আর্দ্র জটাভারকে রেশমী বস্ত্র দ্বারা শুষ্ক করে দেই ) ||১০||

নানাহেমবিচিত্রাণি চীরচীনাম্বরাণি

বিবিধানি দিব্যানি মৃত্যুঞ্জয় সুধারয় ||১১||

ভাবার্থ - হে মৃত্যুঞ্জয় ! দিব্য বিবিধ, নানা প্রকার স্বর্ণাদি বিচিত্রিত চীর চীনাম্বর পরিধান করো ||১১||

বিশুদ্ধমুক্তাফলজালরম্যং

মনোহরং কাঞ্চনহেমসূত্রম্

যজ্ঞোপবীতং পরমং পবিত্র-

মাধৎস্ব মৃত্যুঞ্জয় ভক্তিগম্য ||১২||

ভাবার্থ - হে ভক্তিদ্ধারা-জ্ঞেয়! মৃত্যুঞ্জয়! ( তুমি ) বিশুদ্ধ মুক্তাফল ( মুক্তা ) সমূহ যোগে রমনীয়, মনোজ্ঞ, উজ্জ্বল স্বর্ণনির্মিত, পরম পবিত্র যজ্ঞোপবীত ধারণ করো ||১২||

শ্রীগন্ধং ঘনসারকুঙ্কুময়ুতং কস্তূরিকাপূরিতং

কালেয়েন হিমাম্বুনা বিরচিতং মন্দারসংবাসিতম্

দিব্যং দেবমনোহরং মণিময়ে পাত্রে সমারোপিতং

সর্বাঙ্গেষু বিলেপয়ামি সততং মৃত্যুঞ্জয় শ্রীবিভো ||১৩||

ভাবার্থ - হে প্রভু! শ্রীমৃত্যুঞ্জয়! চন্দন কুঙ্কুমযুক্ত, কস্তূরিকাপূর্ণ, কৃষ্ণাগুরু হিমজল দ্বারা প্রস্তুত, মন্দার পুষ্পদ্বারা সুরভিত, দিব্য, দেবগণের মনোরম, মণিময় পাত্রে স্থাপিত, শোভাযুক্ত গন্ধ সর্বদা ( তোমার ) সর্বাঙ্গে লেপন করতেছি ||১৩||

অক্ষতৈর্ধবলৈর্দিব্যৈঃ সম্যক্তিলসমন্বিতৈঃ

মৃত্যুঞ্জয় মহাদেব পূজয়ামি বৃষধ্বজ ||১৪||

ভাবার্থ - হে বৃষধ্বজ! মহাদেব! মৃত্যুঞ্জয়! তিলযুক্ত দিব্য, শ্বেত, অক্ষত দ্বারা ( তোমাকে ) সম্যকরূপে পূজা করতেছি ||১৪||

চম্পকপঙ্কজকুরবককুন্দৈঃ করবীরমল্লিকাকুসুমৈঃ

বিস্তারয় নিজমকুটং মৃত্যুঞ্জয় পুণ্ডরীকনয়নাপ্ত ||১৫||

ভাবার্থ - হে পদ্মচক্ষু! পরম মঙ্গলদায়ক! মৃত্যুঞ্জয় ( তুমি ) চম্পক পদ্ম ঝিন্টী কুন্দ প্রভৃতি পুষ্পদ্বারা নিজ মুকুটকে শোভিত করো ||১৫||

মাণিক্যপাদুকাদ্বন্দ্বে মৌনিহৃৎপদ্মমন্দিরে।

পাদৌ সৎপদ্মসদৃশৌ মৃত্যুঞ্জয় নিবেশয় ||১৬||

ভাবার্থ - হে মৃত্যুঞ্জয়! সুন্দর পদ্মসদৃশ পাদযুগলকে মৌনব্রত ধারীগণের হৃৎপদ্মমন্দির স্থিত মানিক্য নির্মিত পাদুকাযুগলে রক্ষা করো ||১৬||

মাণিক্যকেয়ূরকিরীটহারৈঃ

কাঞ্চীমণিস্থাপিতকুণ্ডলৈশ্চ

মঞ্জীরমুখ্যাভরণৈর্মনোজ্ঞৈ-

রঙ্গানি মৃত্যুঞ্জয় ভূষয়ামি ||১৭||

ভাবার্থ - হে মৃত্যুঞ্জয়! মানিক্য নির্মিত কেয়ূর কিরীট ( মস্তকভূষণ ) হার প্রভৃতি দ্বারা, মনোহর কাঞ্চী ( বস্ত্রবন্ধন রজ্জু ) মণিতে সংলগ্ন কুণ্ডল দ্বারা, প্রধান অলঙ্কার দ্বারা ( তোমার ) অঙ্গ সজ্জিত করতেছি ||১৭||

গজবদনস্কন্দধৃতেনাতিস্বচ্ছেন চামরয়ুগেন

গলদলকাননপদ্মং মৃত্যুঞ্জয় ভাবয়ামি হৃৎপদ্মে ||১৮||

ভাবার্থ - হে মৃত্যুঞ্জয়! গণেশ কার্তিকেয় ধৃত অতি স্বচ্ছ চামরযুগল দ্বারা উৎক্ষিপ্ত অলকযুক্ত মুখপদ্মকে হৃৎপদ্মে চিন্তা করতেছি ||১৮||

মুক্তাতপত্রং শশিকোটিশুভ্রং

শুভপ্রদং কাঞ্চনদণ্ডয়ুক্তম্

মাণিক্যসংস্থাপিতহেমকুম্ভং

সুরেশ মৃত্যুঞ্জয় তেঽর্পয়ামি ||১৯||

ভাবার্থ - হে মৃত্যুঞ্জয়! কোটিচন্দ্র তুল্য শুভ্র, মঙ্গলদায়ক, স্বর্ণনির্মিত দণ্ড ( ধারক দণ্ড ) যুক্ত, মানিক্য খচিত স্বর্ণকুম্ভ বিশিষ্ট, মুক্তা নির্মিত ছত্র তোমাকে অর্পণ করতেছি ||১৯||

মণিমুকুরে নিষ্পটলে ত্রিজগদ্গাঢান্ধকারসপ্তাশ্বে

কন্দর্পকোটিসদৃশং মৃত্যুঞ্জয় পশ্য বদনমাত্মীয়ম্ ||২০||

ভাবার্থ - হে মৃত্যুঞ্জয়! অনাবৃত, ত্রিজগতের গাঢ় অন্ধকারে সপ্তাশ্ব ( সূর্যের বাহন বা কিরণ ) রূপ ( অর্থাৎ অন্ধকার নাশক ), মণিময় দর্পণে, কোটি কামতুল্য নিজ বদন নিরীক্ষণ করো ||২০||

কর্পূরচূর্ণং কপিলাজ্যপূতং

দাস্যামি কালেয়সমান্বিতৈশ্চ

সমুদ্ভবং পাবনগন্ধধূপিতং

মৃত্যুঞ্জয়াঙ্গং পরিকল্পয়ামি ||২১||

ভাবার্থ - অগুরুযুক্ত, কপিলা দুগ্ধদ্বারা পবিত্র, কর্পূরচূর্ণ দান করব। হে মৃত্যুঞ্জয়, পবিত্র গন্ধ ধূপ দ্বারা সুরভিত ( জগতের ) কারণস্বরূপ ( তোমার ) অঙ্গ চিন্তা করতেছি ||২১||

বর্তিত্রয়োপেতমখণ্ডদীপ্ত্যা

তমোহরং বাহ্যমথান্তরং

সাজ্যং সমস্তামরবর্গহৃদ্যং

সুরেশ মৃত্যুঞ্জয় বংশদীপম্ ||২২||

ভাবার্থ - হে সুরেশ, মৃত্যুঞ্জয়, অখণ্ড দীপ্তিদ্বারা বাহ্য অন্তর অন্ধকারনাশক, তিনটি বর্তি ( পলিতা ) যুক্ত, ঘৃতবিশিষ্ট, সমস্ত দেবগণের হৃদয়গ্রাহী, দীপ-সন্তান ( তুমি গ্রহণ করো ) ||২২||

রাজান্নং মধুরান্বিতং মৃদুলং মাণিক্যপাত্রে স্থিতং

হিঙ্গূজীরকসন্মরী মিলিতৈঃ শাকৈরনেকৈঃ শুভৈঃ

শাকং সম্যগপূপসূপসহিতং সদ্যোঘৃতেনাপ্লুতং

শ্রীমৃত্যুঞ্জয় পার্বতীপ্রিয় বিভো সাপোশনং ভুজ্যতাম্ ||২৩||

ভাবার্থ - হিঙ্গুজীরক ( জীরা ) মরীচ ( গোলমরিচ ) যুক্ত, মঙ্গলকর, অনেকবিধ শাকযুক্ত, কোমল, মধুর রসযুক্ত, সদাঃ প্রস্তুত ঘৃতাপ্লুত ( অন্ধ্রদেশজাত ধান হতে প্রস্তুত অন্ন ) সম্যক প্রকার পিষ্টক সূপ সহিত হে প্রভু পার্বতী প্রিয়! ভোগ করো ||২৩||

কূষ্মাণ্ডবার্তাকপটোলিকানাং

ফলানি রম্যাণি কারবল্ল্যাঃ

সুপাকয়ুক্তানি সসৌরভাণি

শ্রীকণ্ঠ মৃত্যুঞ্জয় ভক্ষয়েশ ||২৪||

ভাবার্থ - হে ঈশ্বর! শ্রীকণ্ঠ! মৃত্যুঞ্জয়! সুরভিযুক্ত, সুপক্ব, বার্তাকু, পটল উচ্ছে প্রভৃতি মনোরম ফলগুলি ভোজন করো ||২৪||

শীতলং মধুরং স্বচ্ছং পাবনং বাসিতং লঘু

মধ্যে স্বীকুরু পানীয়ং শিব মৃত্যুঞ্জয় প্রভো ||২৫||

ভাবার্থ - হে প্রভু! মৃত্যুঞ্জয়! শিব! ইতোমধ্যে শীতল মধুর পবিত্র সুবাসিত লঘু পানার্থ জল গ্রহণ করো ||২৫||

শর্করামিলিতং স্নিগ্ধং দুগ্ধান্নং গোঘৃতান্বিতম্

কদলীফলসংমিশ্রং ভুজ্যতাং মৃত্যুসংহর ||২৬||

ভাবার্থ - হে মৃত্যুঞ্জয়! শর্করা মিশ্রিত, স্নিগ্ধ, গব্যঘৃত যুক্ত, কদলীফল সংযুক্ত দুগ্ধান্ন ভোজন করো ( উপভোগ করো ) ||২৬||

কেবলমতিমাধুর্যং দুগ্ধৈঃ স্নিগ্ধৈশ্চ শর্করামিলিতৈঃ

এলামরীচমিলিতং মৃত্যুঞ্জয় দেব ভুঙ্ক্ষ্ব পরমান্নম্ ||২৭||

ভাবার্থ - হে দেব মৃত্যুঞ্জয়! স্নিগ্ধ, শর্করা মিশ্রিত দুগ্ধ দ্বারা প্রস্তুত কেবল অতি মধুর রস, এলাচ মরীচ সংযুক্ত, পায়েস ভোজন করো ||২৭||

রম্ভাচূতকপিত্থকণ্ঠকফলৈর্দ্রাক্ষারসাস্বাদুমৎ

খর্জূরৈর্মধুরেক্ষুখণ্ডশকলৈঃ সন্নারিকেলাম্বুভিঃ

কর্পূরেণ সুবাসিতৈর্গুড়জলৈর্মাধুর্যযুক্তৈর্বিভো

শ্রীমৃত্যুঞ্জয় পূরয় ত্রিভুবনাধারং বিশালোদরম্ ||২৮||

ভাবার্থ - হে প্রভু শ্রীমৃত্যুঞ্জয়! কদলী, আম্র, কপিত্থ, কাঁটাল প্রভৃতি দ্বারা, দ্রাক্ষারস স্বাদযুক্ত খর্জুর দ্বারা, মধুর ইক্ষুখণ্ড দ্বারা, উৎকৃষ্ট নারিকেল জল দ্বারা, মাধুর্য্যযুক্ত, কর্পূর দ্বারা সুবাসিত গুড় জল দ্বারা ত্রিভুবনের আধারভূত বিশাল উদর পূর্ণ করো ||২৮||

মনোজ্ঞরম্ভাবনখণ্ডখণ্ডিতান্

রুচিপ্রদান্ সর্ষপজীরকাংশ্চ

সসৌরভান্ সৈন্ধবসেবিতাংশ্চ

গৃহাণ মৃত্যুঞ্জয় লোকবন্দ্য ||২৯||

ভাবার্থ - হে লোকবন্দিত মৃত্যুঞ্জয় ! মনোরম কদলীবন খণ্ড খণ্ডিত , রুচিপ্রদ, সুরভি সৈন্ধবযুক্ত সর্ষপ জীরক গ্রহণ করো ||২৯||

হিঙ্গূজীরকসহিতং বিমলামলকং কপিত্থমতিমধুরম্

বিসখণ্ডাঁল্লাবণয়ুতান্মৃত্যুঞ্জয় তেঽর্পয়ামি জগদীশ ||৩০||

ভাবার্থ - প্রভু মৃত্যুঞ্জয়! তোমাকে হিঙ্গু জীরক যুক্ত পবিত্র আমলকী ফল, অতি মধুর কপিত্থ, লবণযুক্ত মৃণালখণ্ড অর্পণ করতেছি ||৩০||

এলাশুণ্ঠীসহীতং দধ্যন্নং চারুহেমপাত্রস্থম্

অমৃতপ্রতিনিধিমাঢ্যং মৃত্যুঞ্জয় ভুজ্যতাং ত্রিলোকেশ ||৩১||

ভাবার্থ - ত্রিলোকপতি! মৃত্যুঞ্জয়! মনোরম স্বর্ণপাত্রস্থ, এলাচ শুণ্ঠীযুক্ত, অমৃত প্রতিনিধি ( অমৃত তুল্য ) বিশিষ্ট ( বিশেষ গুণশালী ) দধ্যন্ন ( দধিযুক্ত অন্ন ) ভোগ করো ||৩১||

জম্বীরনীরাঞ্চিতশৃঙ্গবেরং

মনোহরানম্লশলাটুখণ্ডান্

মৃদূপদংশান্ সহসোপভূঙ্ক্ষ্ব

মৃত্যুঞ্জয় শ্রীকরুণাসমুদ্র ||৩২||

ভাবার্থ - হে শ্রীকরুণাসিন্ধু! মৃত্যুঞ্জয়! জম্বীর রসসিঞ্চিত আর্দ্রক, ( ) মৃদু ক্ষুধাবর্দ্ধক মনোরম অম্লশলাটু নামক ফলের খণ্ড সকল সহসা উপভোগ করো ||৩২||

নাগররামঠয়ুক্তং সুললিতজম্বীরনীরসম্পূর্ণম্

মথিতং সৈন্ধবসহিতং পিব হর মৃত্যুঞ্জয় ক্রতুধ্বংসিন্ ||৩৩||

ভাবার্থ - হে যজ্ঞধ্বংসকারিনী! হর! মৃত্যুঞ্জয়! শুণ্ঠী হিঙ্গুযুক্ত, সুন্দর জম্বীর রসপূর্ণ, সৈন্ধবযুক্ত, তক্র ( নির্জলঘোল ) পান করো ||৩৩||

মন্দারহেমাম্বুজগন্ধয়ুক্তৈ-

র্মন্দাকিনীনির্মলপুণ্যতোয়ৈঃ

গৃহাণ মৃত্যুঞ্জয় পূর্ণকাম

শ্রীমৎপরাপোশনমভ্রকেশ ||৩৪||

ভাবার্থ - হে পূর্ণকাম! ( তৃপ্তিবিশিষ্ট ) মৃত্যুঞ্জয়! ব্যোমকেশ! মন্দার স্বর্ণবর্ণ পদ্ম গন্ধযুক্ত মন্দাকিনীর নির্মল পবিত্র জল দ্বারা, মঙ্গলজনক পরবর্তী আপোশন ( ভোজন কালে আদি অন্তে পেয় জল ) গ্রহণ করো ||৩৪||

গগনধুনীবিমলজলৈর্মৃত্যুঞ্জয় পদ্মরাগপাত্রগতৈঃ

মৃগমদচন্দনপূর্ণং প্রক্ষালয় চারু হস্তপদয়ুগ্মম্ ||৩৫||

ভাবার্থ - মৃত্যুঞ্জয়! পদ্মরাগমণি নির্মিত পাত্রস্থিত, কস্তূরী-চন্দনপূর্ণ গঙ্গাজল দ্বারা, মনোহর হস্ত পদযুগল প্রক্ষালন করো ||৩৫||

পুন্নাগমল্লিকাকুন্দবাসিতৈর্জাহ্নবীজলৈঃ

মৃত্যুঞ্জয় মহাদেব পুনরাচমনং কুরু ||৩৬||

ভাবার্থ - হে মৃত্যুঞ্জয় মহাদেব! পুন্নাগ মল্লিকা কুন্দ পুষ্পবাসিত গঙ্গাজল দ্বারা পুনরাচমন করো ||৩৬||

মৌক্তিকচূর্ণসমেতৈর্মৃগমদঘনসারবাসিতৈঃ পূগৈঃ

পর্ণৈঃ স্বর্ণসমানৈর্মৃত্যুঞ্জয় তেঽর্পয়ামি তাম্বূলম্ ||৩৭||

ভাবার্থ - হে মৃত্যুঞ্জয়! মুক্তা চূর্ণযুক্ত, কস্তূরী চন্দনাদিবাসিত, সুপারি যুক্ত, স্বর্ণসদৃশ পর্ণ ( পান ) দ্বারা তোমাকে তাম্বুল অর্পণ করতেছি ||৩৭||

নীরাজনং নির্মলদীপ্তিমদ্ভি-

র্দীপাঙ্কুরৈরুজ্জ্বলমুচ্ছ্রিতৈশ্চ

ঘণ্টানিনাদেন সমর্পয়ামি

মৃত্যুঞ্জয়ায় ত্রিপুরান্তকায় ||৩৮||

ভাবার্থ - নির্মল কিরণশালী, উচ্চ, দীপশিখা দ্বারা ঘণ্টাধ্বনি সহকারে উজ্জ্বল আরত্রিক ত্রিপুরান্তক মৃত্যুঞ্জয়কে সমর্পণ করতেছি ||৩৮||

বিরিঞ্চিমুখ্যামরবৃন্দবন্দিতে

সরোজমৎস্যাঙ্কিতচক্রচিহ্নিতে

দদামি মৃত্যুঞ্জয় পাদপঙ্কজে

ফণীন্দ্রভূষে পুনরর্ঘ্যমীশ্বর ||৩৯||

ভাবার্থ - হে ঈশ্বর! মৃত্যুঞ্জয়! ব্রহ্মা প্রমুখ দেবগণবন্দিত, পদ্ম মৎস্যচিহ্নিত চক্রচিহ্নযুক্ত সর্পভূষিত পাদপদ্মে পুনরায় অর্ঘ্য দান করতেছি ||৩৯||

পুন্নাগনীলোৎপলকুন্দজাজী-

মন্দারমল্লীকরবীরপঙ্কজৈঃ

পুষ্পাঞ্জলিং বিল্বদলৈস্তুলস্যা

মৃত্যুঞ্জয়াঙ্ঘ্রৌ বিনিবেশয়ামি ||৪০||

ভাবার্থ - পুন্নাগ, নীলোৎপল, কুন্দ, জাতী, মন্দার, মল্লিকা, করবী, পদ্ম প্রভৃতি পুষ্প, বিল্বপত্র তুলসীপত্র দ্বারা মৃত্যুঞ্জয়ের চরণে পুষ্পাঞ্জলী স্থাপন করতেছি ||৪০||

পদে পদে সর্বতমোনিকৃন্তনং

পদে পদে সর্বশুভপ্রদায়কম্

প্রদক্ষিণং ভক্তিয়ুতেন চেতসা

করোমি মৃত্যুঞ্জয় রক্ষ রক্ষ মাম্ ||৪১||

ভাবার্থ - ভক্তিযুক্ত চিত্তে প্রতি পদক্ষেপে সর্বপ্রকার অজ্ঞাননাশক, প্রতি পদক্ষেপে সর্বপ্রকার শুভদায়কপ্রদক্ষিণ করতেছি। হে মৃত্যুঞ্জয়, আমাকে রক্ষা করো ||৪১||

নমো গৌরীশায় স্ফটিকধবলাঙ্গায় নমো

নমো লোকেশায় স্তুতবিবুধলোকায় নমঃ

নমঃ শ্রীকণ্ঠায় ক্ষপিতপুরদৈত্যায় নমো

নমঃ ফালাক্ষায় স্মরমদবিনাশায় নমঃ ||৪২||

ভাবার্থ - গৌরীপতিকে নমস্কার, স্ফটিক সদৃশ ধবল শরীরকে ( শিবকে ) নমস্কার, লোকেশকে নমস্কার, দেবলোক কর্তৃক স্তুতকে ( শিবকে ) নমস্কার, শ্রীকণ্ঠকে ( শিবকে ) নমস্কার, পুরদৈত্যবিনাশকারীকে ( শিবকে ) নমস্কার, ফালসদৃশ চক্ষুকে ( শিবকে ) নমস্কার, কামের অহঙ্কার বিনাশকারীকে নমস্কার ||৪২||

সংসারে জনিতাপরোগসহিতে তাপত্রয়াক্রন্দিতে

নিত্যং পুত্রকলত্রবিত্তবিলসৎপাশৈর্নিবদ্ধং দৃঢ়ম্

গর্বান্ধং বহুপাপবর্গসহিতং কারুণ্যদৃষ্ট্যা বিভো

শ্রীমৃত্যুঞ্জয় পার্বতীপ্রিয় সদা মাং পাহি সর্বেশ্বর ||৪৩||

ভাবার্থ - হে পার্বতীপ্রিয়! প্রভু! সর্বেশ্বর! শ্রীমৃত্যুঞ্জয়! জন্ম-কর্ম্ম-রোগযুক্ত, তাপত্রয় দ্বারা আক্রন্দিত, সংসারের পুত্র-কলত্র-বিত্ত-শোভিত পাশদ্বারা চিরকাল দৃঢ়ভাবে বদ্ধ, গর্বান্ধ, বহু পাপসমূহ যুক্ত আমাকে সর্বদা করুণাদৃষ্টির দ্বারা রক্ষা করো ||৪৩||

সৌধে রত্নময়ে নবোৎপলদলাকীর্ণে তল্পান্তরে

কৌশেয়েন মনোহরেণ ধবলেনাচ্ছাদিতে সর্বশঃ

কর্পূরাঞ্চিতদীপদীপ্তিমিলিতে রম্যোপধানদ্বয়ে

পার্বত্যাঃ করপদ্মলালিতপদং মৃত্যুঞ্জয়ং ভাবয়ে ||৪৪||

ভাবার্থ - রত্নময় সৌধে অবস্থিত, নবোৎপলদলযুক্ত, সর্বত্র মনোহর শ্বেতবর্ণ কৌশেয় ( রেশম ) বস্ত্রাচ্ছাদিত, কর্পূর যুক্ত দীপের কিরণ শোভিত, রমণীয় উপাধান ( বালিশ ) দ্বয়যুক্ত, শয্যায় মধ্যবর্তী, পার্বতীর করপদ্ম কর্তৃক আদৃত চরণ মৃত্যুঞ্জয়কে চিন্তা করতেছি ||৪৪||

চতুশ্চত্বারিংশৎ-বিলসদুপচারৈরভিমতৈ-

র্মনঃপদ্মৈর্ভক্ত্যা বহিরপি পূজাং শুভকরীম্

করোতি প্রত্যূষে নিশি দিবসমধ্যেঽপি পুমান

প্রয়াতি শ্রীমৃত্যুঞ্জয়পদমনেকাদ্ভুতপদম্ ||৪৫||

ভাবার্থ - পুরুষ অভিমত চুয়াল্লিশ ( চতুরশ্যত্বারিংশৎ ) প্রকার শোভমান উপচার দ্বারা ভক্তিপূর্বক মনঃপদ্মে বহির্ভাগে প্রত্যুষে রাত্রে মধ্যাহ্নে মঙ্গলজনক পূজা করে, সে বহু প্রকার বিস্ময়স্থান শ্রীমৃত্যুঞ্জয় শিবলোকে গমন করে ||৪৫||

প্রাতর্লিঙ্গমুমাপতেরহরহঃ সন্দর্শনাৎ স্বর্গদং

মধ্যাহ্নে হয়মেধতুল্যফলদং সায়ন্তনে মোক্ষদম্

ভানোরস্তময়ে প্রদোষসময়ে পঞ্চাক্ষরারাধনং

তৎকালত্রয়তুল্যমিষ্টফলদং সদ্যোঽনবদ্যং দৃঢম্ ||৪৬||

ভাবার্থ - উমাপতির লিঙ্গ প্রতিদিন প্রাতঃকালে দর্শনে স্বর্গ ফলপ্রদ, মধ্যাহ্নের অশ্বমেধতুল্য ফলপ্রদ, সায়ংকালে মোক্ষফলপ্রদ, সূর্য্যাস্তকালে প্রদোষে পঞ্চাক্ষরের ( শিবের নমঃ শিবায় এই মন্ত্র দ্বারা ) আরাধনা অচিরে প্রশংসিত নিশ্চিত প্রাতঃ, মধ্যাহ্ন সায়ংকালে লিঙ্গ দর্শনের তুল্য অভীষ্ট ফলপ্রদ হয় ||৪৬||

ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্যস্য শ্রীমচ্ছঙ্কর ভগবতঃ কৃতৌ

শ্রীমৃত্যুঞ্জয়মানসিকপূজাস্তোত্রং সম্পূর্ণম্

ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্য শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য ভগবান বিরচিত শ্রীমৃত্যুঞ্জয় মানসিক পূজা স্তোত্র সমাপ্ত।

 

জ্ঞানী ভোগ্যবিষয়ে মনের কঠিনতা আর ভগবদ্বিষয়ে মনের কোমলতা সম্পাদন করে—

  আচার্য মধুসূদন সরস্বতী ভক্তিরসায়নে বলছেন — কাঠিন্যং বিষয়ে কুর্যাদ্ দ্রবত্বং ভগবৎপদে। উপায়ৈঃ শাস্ত্রনির্দিষ্টৈরনুক্ষণমতো ব...