Monday, 29 March 2021

"ত্রিপুরসুন্দরি অষ্টকম্"



ভগবৎপাদ্ শ্রী শঙ্করাচার্য বিরচিত-"ত্রিপুরসুন্দরি অষ্টকম্"

কদম্ববনচারিণীং মুনিকদম্বকাদম্বিনীং

নিতম্বজিতভূধরাং সুরনিতম্বিনীসেবিতাম্ ।

নবাম্বুরুহলোচনাং অভিনবাম্বুদশ্যামলাং

ত্রিলোচনকুটুম্বিনীং ত্রিপুরসুন্দরীমাশ্রয়ে ॥ ১॥

অনুবাদঃ যিনি কদম্ববনমধ্যে সর্ব্বদা বিচরন করেন, যিনি মুনিগনের হৃদয়াকাশে মেঘমালাস্বরূপা, যাঁহার নিতম্ব পর্ব্বতকে জয় করিয়াছে, সুর-নিতম্বিনীগন যাঁহার সেবা করেন, যাঁহার নয়নযুগল নবোৎপন্ন কমলের ন্যায় সুদৃশ্য, যিনি নবীন নীরদের ন্যায় শ্যামবর্ণা এবং যিনি ত্রিলোচনের গৃহিণী, সেই ত্রিপুর সুন্দরীর ( ভক্তি সহকারে ) আমি আশ্রয় গ্রহন করিতেছি।।১।।

 

কদম্ববনবাসিনীং কনকবল্লকীধারিণীং

মহার্হমণিহারিণীং মুখসমুল্লসদ্বারুণীম্ ।

দয়াবিভবকারিণীং বিশদলোচনীং চারিণীং

ত্রিলোচনকুটুম্বিনীং ত্রিপুরসুন্দরীমাশ্রয়ে ॥ ২॥

অনুবাদঃ যিনি কদম্ববনে বাস করেন, যিনি কনকবীণা ধারণ করিতেছেন, যিনি মহামূল্য মণিসমুহের হার পরিধান করিয়াছেন, যাঁহার মুখ কমলে বারুণী উল্লসিত থাকে, যিনি দয়াবিভবকারিণী বিশদলোচনী অর্থাৎ নির্ম্মল-জ্ঞানদায়িনী এবং সুন্দরগমনা ত্রিলোচনের গেহিনী, সেই ত্রিপুরসুন্দরীর আমি আশ্রয় গ্রহন করিতেছি।।২।।

 

কদম্ববনশালয়া কুচমরোল্লসন্মালয়া

কুচোপমিতশৈলয়া গুরুকৃপালসদ্বেলয়া ।

মদারুণকপোলয়া মধুরগীতবাচালয়া

কয়াঽপি ঘননীলয়া কবচিতা বয়ং লীলয়া ॥ ৩॥

 

অনুবাদঃ যিনি কদম্ববনে গৃহ স্থাপন করিয়াছেন, যাঁহার স্তনযুগলে মণিময় হার বিরাজমান আছে, যাঁহার কুচযুগল গিরিবরের ন্যায়, যাঁহার মহতী কৃপা সর্ব্বকালে বিরাজমান, যাঁহার কপোলদেশ মদভরে আরক্ত, যিনি সর্ব্বদা মধুর গীতধ্বনি করিতেছেন, যিনি নবজলধরের ন্যায় নীলবর্ণা, সেই প্রকার দেহ লীলাবশে আমাদিগের রক্ষাকবচ হইয়াছেন ।। ৩ ।।

 

কদম্ববনমধ্যগাং কনকমণ্ডলোপস্থিতাং

ষড়ম্বুরুহবাসিনীং সততসিদ্ধসৌদামিনীম্ ।

বিড়ম্বিতজবারুচিং বিকচচন্দ্রচূড়ামণিং

ত্রিলোচনকুটুম্বিনীং ত্রিপুরসুন্দরীমাশ্রয়ে ॥ ৪॥

 

অনুবাদঃ যিনি কদম্ববনমধ্যবর্ত্তিনী, যিনি সুবর্ণমণ্ডলোপরি উপবিষ্টা আছেন, যিনি মূলাধারাদি ষটচক্রপথে বাস করেন, যিনি সর্ব্বদা সিদ্ধিবিকাশে সৌদামিনীতুল্যা, যাঁহার দেহকান্তি জবাপুষ্পের শোভা তিরস্কৃত করিয়াছে, যাঁহার চূড়াতে পূর্ণচন্দ্র মণিস্বরূপে বিদ্যমান রহিয়াছে, যিনি ত্রিলোচনের কুটুম্বিনী আমি সেই ত্রিপুরসুন্দরীর আশ্রয় গ্রহণ করিতেছি।।৪।।

 

কুচাঞ্চিতবিপঞ্চিকাং কুটিলকুন্তলালংকৃতাং

কুশেশয়নিবাসিনীং কুটিলচিত্তবিদ্বেষিণীম্ ।

মদারুণবিলোচনাং মনসিজারিসংমোহিনীং

মতঙ্গমুনিকন্যকাং মধুরভাষিণীমাশ্রয়ে ॥ ৫॥

অনুবাদঃ যিনি কুচোপরি বীণা রাখিয়া থাকেন, যিনি কুটিল কুন্তলে অলঙ্কৃতা, যিনি কমলাসনা, যিনি কুটিলহৃদয় লোকদিগের দ্বেষ করেন, যাঁহার লোচনযুগল সর্ব্বদা মদবশে আরক্ত, যিনি মদনান্তক মহাদেবকেও মোহিত করিয়াছেন, যিনি মতঙ্গমুনির কন্যারূপে আবির্ভূতা হইয়াছিলেন, আমি সেই মধুরভাষিণীর আশ্রয় গ্রহণ করিতেছি।।৫।।

 

স্মরপ্রথমপুষ্পিণীং রুধিরবিন্দুনীলাম্বরাং

গৃহীতমধুপাত্রিকাং মধুবিঘূর্ণ নেত্রাঞ্চলাম্ ।

ঘনস্তনভরোন্নতাং গলিতকূলিকাং শ্যামলাং

ত্রিলোচনকুটুম্বিনীং ত্রিপুরসুন্দরীমাশ্রয়ে ॥ ৬॥

 

অনুবাদঃ যাঁহাকে প্রথমপুষ্পিণী বলিয়া স্মরণ করা বিহিত, যাঁহার নীলাম্বরে রুধিরবিন্দু বিরাজিত আছে, যিনি মধুপাত্র ধারণ করিয়াছেন, মধুপানে যাঁহার লোচন সর্ব্বদা ঘূর্ণ্যমান এবং স্তনদ্বয় অতি ঘন ও উন্নত, যাঁহার কেশপাশ আলুলায়িত, যিনি শ্যামবর্ণা ও ত্রিলোচনের কুটুম্বিনী, সেই ত্রিপুরসুন্দরীর আশ্রয় গ্রহণ করিতেছি।।৬।।

 

সকুঙ্কুমবিলেপনাং অলকচুম্বিকস্তূরিকাং

সমন্দহসিতেক্ষণাং সশরচাপপাশাঙ্কুশাম্ ।

অশেষজনমোহিনীং অরুণমাল্যভূষাম্বরাং

জবাকুসুমভাসুরাং জপবিধৌ স্মরাম্যম্বিকাং ॥ ৭॥

 

অনুবাদঃ যাঁহার অঙ্গে কুঙ্কুমাদি বিলেপন রহিয়াছে, যাঁহার অলকপ্রান্ত কস্তূরচূর্ণে সজ্জিত, যিনি মন্দ হাস্যসহকারে দৃষ্টিপাত করিতেছেন, যিনি চারি হস্তে বাণ, ধনু, পাশ ও অঙ্কুশ ধারণ করিয়াছেন, যিনি জগতের সকল জনকে মোহিত করেন, যিনি রক্তমাল্য, রক্তবর্ণ অলঙ্কার ও রক্তবসনে বিভুষিতা, যাঁহার দেহকান্তি জবাপুষ্পের ন্যায় অতিশয় সমুজ্জ্বল, সেই জগজ্জননীকে জপকার্য্যে আমি স্মরণ করি।।৭।।

 

পুরন্দরপুরন্ধ্রিকাং চিকুরবন্ধসৈরিন্ধ্রিকাং

পিতামহপতিব্রতাং পটুপটীরচর্চ্চারতাম্ ।

মুকুন্দরমণীমণীং লসদলঙ্ক্রিয়াকারিণীং

ভজামি ভুবনাম্বিকাং সুরবধূটিকাচেটিকাম্ ॥ ৮॥

 

অনুবাদঃ যিনি পুরন্দরপুরের পুরন্ধ্রীস্বরূপা ( ইন্দ্রাণী ), যিনি কেশবন্ধনে সৈরিন্ধ্রী, যিনি ব্রহ্মার পতিব্রতা শক্তি (ব্রহ্মাণী), যিনি মণিময় ভূষণ ধারণ করেন, যিনি উত্তম চন্দনে অনুলিপ্তা, যিনি মুকুন্দের রমণীরূপা (বৈষ্ণবী), যিনি নিখিল ভুবনের জননী এবং সুরবধূগন যাঁহার দাসীকার্য্যে নিরত আছেন, তাঁহাকে সেবা করি।।৮।।

ইতি পরমহংস পরিব্রাজক আচার্য গোবিন্দভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্য শ্রীশঙ্কর ভগবৎ প্রণীত ত্রিপুরসুন্দরি অষ্টকম্ সমাপ্ত।

 


Tuesday, 23 March 2021

বুদ্ধিরূপ উপাধিবশতঃ জীবের অণুত্ব কথন, জীব স্বরূপত বিভুঃ-



পূর্ব্বের লিখায় শ্রুতি ও স্মৃতিবলে জীবের বিভুত্ব প্রতিপাদিত হইয়াছে। এখন শঙ্কা হইল-আচ্ছা তাহা হইলে শ্রুতিতে জীবের অণুতা প্রভৃতির বর্ণনা আছে কেন? এইহেতু ভগবান সুত্রকার বাদরায়ণ বলিতেছেন-

 'তদ্গুণসারত্বাত্তু তদ্ব্যপদেশঃ '-(ব্রহ্মসূত্র-২.৩.২৯)

অর্থাৎ বুদ্ধির গুণসকল জীবে প্রধানভাবে প্রতীয়মান হয় বলিয়া তাহাকে অণু বলা হইয়াছে।

ভগবান ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য্য ভাষ্যে সূত্রাক্ষর যোজনা করিতেছেন-তাহার-বুদ্ধির যে গুণ, তাহা তদ্গুণ, যথা- ইচ্ছা দ্বেষ সুখ দুঃখ ইত্যাদি এই সকল, সেই গুণসকল সার- প্রধান, যে আত্মার সংসারিত্ব হইলে সম্ভব হয়, তিনি তদ্গুণসার, তাহার যে ভার (-সত্তা) তাহাই তদ্গুণসারত্ব। বুদ্ধির গুণসকল ব্যতিরেকে কেবল (-শুদ্ধ) আত্মার সংসারিত্ব নিশ্চয় সম্ভব নহে। অকর্ত্তাঅভোক্তাঅসংসারী ও নিত্যমুক্ত সৎস্বরূপ আত্মার কর্ত্তৃত্ব ও ভোক্তৃত্বাদিরূপ যে সংসারিত্ব, তাহা বুদ্ধি-রূপ উপাধির ধর্ম্মের অধ্যাসবশতঃই হইয়া থাকে। সেইহেতু সেই গুণসকলের প্রাধান্যবশতঃ বুদ্ধির (অণুতারূপ) পরিমাণের দ্বারা ইহার পরিমাণের কথন হইতেছে। আর বুদ্ধির উৎক্রান্তি প্রভৃতির দ্বারা জীবের উৎক্রান্তি প্রভৃতি বর্ণনা হইতেছে, কিন্তু স্বতঃ নহে। যেমন দেখ-

'বালাগ্রশতভাগস্য শতধা কল্পিতস্য চ৷ ভাগো জীবঃ স বিজ্ঞেযঃ স চানন্ত্যায কল্পতে' -(শ্বেতাশ্বতর উপনিষৎ-৫।৯)

অর্থাৎ কেশাগ্রের শতভাগের এক ভাগকে পুনঃ শতভাগ কল্পনা করিলে তাহাকে জীবের ভাগরূপে (-পরিমাণরূপে) অবগত হইতে হবে, আর সেই জীবই অনন্তপদের বাচ্য হইবার যোগ্য',

এইপ্রকারে জীবের অণুতার কথা বলিয়া পুনরায় তাহারই অনন্ততার কথা শ্রুতি বলিতেছেন। জীবের সেই অনন্ততা এইপ্রকার হইলেই সমঞ্জস হয়।, যদি জীবের অণুতা হয় ঔপচারিক এবং অনন্ততা হয় পারমার্থিক। উভয়কেই মুখ্যরূপে কল্পনা করা যাইবে না। আর জীবের অনন্ততা গৌণ, ইহা অবগত হইতে পারা যায় না, যেহেতু সকল উপনিষদে ব্রহ্মাত্মভাব (-জীবের ব্রহ্মস্বরূপতা) প্রতিপাদন করিতে ইচ্ছা করা হইয়াছে। আর এই প্রকারে অন্য অপ্রকৃষ্টপরিমাণবোধক বাক্যেও

'বুদ্ধের্গুণেনাত্মগুণেন চৈব আরাগ্রমাত্রো হ্যবরোপি দৃষ্টঃ' -(শ্বেতাশ্বতর উপনিষৎ-৫।৮)

অর্থাৎ বুদ্ধির ইচ্ছাদি গুণরূপ নিমিত্তবশতঃ(-সেই গুণসকল আত্মাতে অধ্যস্ত হওয়ায়, সেই অধ্যস্ত আত্মনিষ্ঠ গুণসকলের দ্বারাই জীব আরার অগ্রভাগের ন্যায় পরিমাণবিশিষ্ট রূপে এবং অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিমাণযুক্তরূপে পরিদৃষ্ট হয়',

এই-প্রকারে বুদ্ধিনিষ্ঠ গুণের সম্বন্ধবশতঃ শ্রুতি জীবের আরাগ্রমাত্রতা উপদেশ করিতেছেন; কিন্তু স্বস্বরূপে নহে। আবার অন্য শ্রুতি-

'এষোণুরাত্মা চেতসা বেদিতব্যঃ'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-৩।১।৯)

এই অণু আত্মাকে বিশুদ্ধ চিত্তের দ্বারা অবগত হইতে হইবে',ইত্যাদি এই স্থলেও জীবের অণুপরিমাণতা উপদিষ্ট হইতেছে না, যেহেতু ইহার অব্যবহিত পূর্ব্বেই মুণ্ডক উপনিষৎ ৩।১।৮ শ্রুতিতে পরমাত্মাই চক্ষুরাদির দ্বারা গ্রহণের অযোগ্যরূপে এবং জ্ঞানপ্রসাদগম্যরূপে অর্থাৎ রাগাদিদোষরহিত শুদ্ধ ও স্থির বুদ্ধির দ্বারা প্রাপ্তব্যরূপে প্রস্তাবিত হইয়াছেন। আর পরমাত্মার সহিত অভিন্ন বলিয়া জীবেরও মুখ্য অণুপরিমাণতা যুক্তিসঙ্গত না হওয়ায় অণুত্ববোধিকা শ্রুতিতে ঔপাধিক অণুত্বের জ্ঞাপিকারূপে অবগত হইতে হইবে।

সেইহেতু ব্রহ্মাভিন্ন জীবের মুখ্য অণুতা সম্ভব না হওয়ায় এই অণুতাপ্রতিপাদক বচনকে পরমাত্মার দুর্জ্ঞেয়তার অভিপ্রায়ে, অথবা জীবের বুদ্ধিরূপ উপাধির অভিপ্রায়ে বুঝিতে হইবে।...

 

Thursday, 18 February 2021

স্বাত্মপ্রকাশিকা (১-১০)

 


॥স্বাত্মপ্রকাশিকা॥

ভগবৎপাদ শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য বিরচিত 'স্বাত্মপ্রকাশিকা' ও ইহার ভাবার্থ-
জগৎকারণমজ্ঞানমেকমেব চিদন্বিতম্।
এক এব মনঃ সাক্ষী জানাত্যেবং জগত্ত্রয়ম্॥১॥

শিষ্য বলিতেছেন- একমাত্র ব্রহ্মাশ্রিত অজ্ঞান জগতের উপাদান, মনের সাক্ষীস্বরূপ একই আত্মা এই ত্রিজগৎকে জানেন।১

বিবেকয়ুক্তবুদ্ধ্যাহং জানাম্যাত্মানমদ্বয়ম্।
তথাপি বন্ধমোক্ষাদিব্যবহারঃ প্রতীয়তে॥২॥

আমি বিবেকযুক্ত বুদ্ধিদ্বারা অদ্বিতীয় আত্মাকে জানি, তথাপি বন্ধন, মোক্ষ প্রভৃতি ব্যবহার প্রতীত হইয়া থাকে। ২

বিবর্তোঽপি প্রপঞ্চো মে সত্যবদ্ভাতি সর্বদা।
ইতি সংশয়পাশেন বদ্ধোঽহং ছিন্দ্ধি সংশয়ম্॥৩

এই জগৎপ্রপঞ্চ ব্রহ্মের বিবর্ত্ত হইলেও ইহা আমার নিকট সত্যের ন্যায় সর্বদা প্রতীয়মান হইতেছে। হে গুরু! আমি এইরূপ সংশয়রূপ বন্ধনের দ্বারা বদ্ধ হইয়াছি, আমার বন্ধন ছেদন করুন। ৩

এবং শিষ্যবচঃ শ্রুৎবা গুরুরাহোত্তরং স্ফুটম্।
নাজ্ঞানং ন চ বুদ্ধিশ্চ ন জগন্ন চ সাক্ষিতা॥৪॥

শিষ্যের এইরূপ বাক্য শ্রবণ করিয়া শ্রীগুরু স্পষ্টভাষায় উত্তর করিলেন-অজ্ঞান, বুদ্ধি, জগৎ ও তাহার সাক্ষীএই সমুদায় কিছুই নাই। ৪

গন্ধমোক্ষাদয়ঃ সর্বে কৃতাঃ সত্যেহদ্বয়ে ত্বয়ি।
ভাতীত্যুক্তে জগৎসর্বং সদ্রূপং ব্রহ্ম তদ্ভবেৎ॥৫॥

কিন্তু সত্য, অদ্বিতীয়, ব্রহ্মস্বরূপ তোমাতে বন্ধনমোক্ষ প্রভৃতি সমুদায় কল্পিত হইয়াছে, এবং তোমাতে সকল জগৎ প্রকাশ পাইতেছে- একথা বলিলে সৎস্বরূপ সেই ব্রহ্মই প্রকাশ পাইতেছেন, ইহা বুঝিতে হইবে। ৫

সর্পাদৌ রজ্জুসত্তেব ব্রহ্মসত্তৈব কেবলম্।
প্রপঞ্চাধাররূপেণ বর্ততে তজ্জগন্ন হি॥৬॥

রজ্জুতে আরোপিত সর্পে যেমন রজ্জুর সত্তা, সেইরূপ জগতে কেবল ব্রহ্মেরই সত্তা। প্রপঞ্চের আধাররূপে অবস্থান করিতেছেন। জগৎ সৎ নহে। ৬

যথেক্ষুমভিসংব্যাপ্য শর্করা বর্ততে তথা।
আশ্চর্যব্রহ্মরূপেণ ৎবং ব্যাপ্তোঽসি জগত্ত্রয়ম্॥৭॥

যেমন চিনি সমস্ত ইক্ষুকে ব্যাপিয়া অবস্থান করে সেইরূপ তুমি আশ্চর্যস্বরূপ ব্রহ্মরূপে ত্রিজগৎ ব্যাপিয়া আছ। ৭

মরুভূমৌ জলং সর্বং মরুভূমাত্রমেব তৎ।
জগত্ত্রয়মিদং সর্বং চিন্মাত্রং সুবিচারতঃ॥৮॥

মরভূমিতে যে জল দৃষ্ট হয়, তাহা মরুভূমিমাত্র, সেইরূপ ত্রিজগৎ চৈতন্যমাত্র-ইহা উত্তমরূপে বিচারের দ্বারা অবগত হও। ৮

ব্রহ্মাদিস্তম্বপর্যন্তাঃ প্রাণিনস্ত্বয়ি কল্পিতাঃ।
বুদ্বুদাদিতরঙ্গান্তা বিকারাঃ সাগরে যথা॥৯॥

যেমন বুদ্বুদ্ ও তরঙ্গ প্রভৃতি সমস্তবিকার সাগরে কল্পিত আছে, সেইরূপ ব্রহ্মা হইতে স্থাবর পর্যন্ত সকল প্রাণী ব্রহ্মস্বরূপ তোমাতে কল্পিত রহিয়াছে।৯

তরঙ্গ ত্বং ধ্রুবং সিন্ধুর্ন বাঞ্ছতি যথা তথা।
বিষয়ানন্দবাঞ্ছা তে মহদানন্দরূপতঃ॥১০॥

সমুদ্র যেমন তরঙ্গ হইতে চায় না, সেইরূপ তুমি পরমানন্দস্বরূপ , তোমারও বিষয়ানন্দে বাঞ্ছা হইতে পারে না।
.........................................................................

বিঃদ্রঃ-ধারাবাহিকভাবে লিখব

Monday, 15 February 2021

শারদাভুজঙ্গপ্রয়াতাষ্টকম্ঃ-



ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্য বিরচিত শারদাভুজঙ্গপ্রয়াতাষ্টকম্ ও ইহার ভাবার্থ-

সুবক্ষোজকুম্ভাং সুধাপূর্ণকুংভাং
প্রসাদাবলম্বাং প্রপুণ্যাবলম্বাম্ ।
সদাস্যেন্দুবিম্বাং সদানোষ্ঠবিম্বাং
ভজে শারদাম্বামজস্রং মদম্বাম্ ॥ ১॥
অনুবাদঃ-যিনি রমণীয় কুচকলসদ্বয়ে বিরাজমানা, যাঁহার হস্তে সুধা -পূরিত কুম্ভ শোভা পায়, যিনি প্রসন্নভাবেই সদা অবস্থিতা, যাঁহাকে অবলম্বন করিলে পরমপূণ্য লাভ হয়, যাঁহার উত্তম মুখমণ্ডল শশাঙ্ক বিম্বের ন্যায় শোভা পাইতেছে এবং যাঁহার বরদানস্ফুরিত ওষ্ঠপুট পক্কবিম্ববৎ সুদৃশ্য, আমার জননীরূপা সেই জগজ্জননী শারদাকে নিরন্তর ভজনা করি।১
কটাক্ষে দয়ার্দ্রাং করে জ্ঞানমুদ্রাং
কলাভির্বিনিদ্রাং কলাপৈঃ সুভদ্রাম্ ।
পুরস্ত্রীং বিনিদ্রাং পুরস্তুঙ্গভদ্রাং
ভজে শারদাম্বামজস্রং মদম্বাম্ ॥ ২॥
অনুবাদঃ-যিনি কটাক্ষে দয়ার্দ্রা, অর্থাৎ যিনি কৃপাকটাক্ষে দর্শন করিতেছেন , যাঁহার হস্তে জ্ঞানমুদ্রা, যিনি (নিরন্তন) নৃত্যগীতদি চতুঃষষ্টি কলা-বিদ্যায় জাগরিত (ব্যাপৃত) রহিয়াছেন , যিনি বিশুদ্ধ স্বর্ণালঙ্কার ভূষিতা পুরস্ত্রী, যিনি আলস্য-বিহীনা,তুঙ্গভদ্রা -নাম্নী নদী যাঁহার পুরোভাগে অবস্থিতা, আমার জননীরূপা সেই জগজ্জননী শারদাকে নিরন্তর ভজনা করি।২
ললামাঙ্কফালাং লসদ্গানলোলাং
স্বভক্তৈকপালাং যশঃশ্রীকপোলাম্ ।
করে ৎবক্ষমালাং কনৎপ্রত্নলোলাং
ভজে শারদাম্বামজস্রং মদম্বাম্ ॥ ৩॥
অনুবাদঃ-যাঁহার ললাট কস্তূরী-তিলকে অঙ্কিত, উত্তম সঙ্গীতে যিনি আকৃষ্টা হয়েন , যিনি স্বীয় ভক্তবৃন্দের একমাত্র রক্ষাকর্ত্রী, যাঁহার (স্বচ্ছ) কপোল-স্থল ,মূর্ত্তিমতি যশঃশ্রী, যাঁহার হস্তে অক্ষমালা, যাঁহার প্রাচীন লীলাবলী সমুজ্জল, আমার জননীরূপা সেই জগজ্জননী শারদাকে নিরন্তর ভজনা করি।৩
সুসীমন্তবেণীং দৃশা নির্জিতৈণীং
রমৎকীরবাণীং নমদ্বজ্রপাণীম্ ।
সুধামন্থরাস্যাং মুদা চিন্ত্যবেণীং
ভজে শারদাম্বামজস্রং মদম্বাম্ ॥ ৪॥
অনুবাদঃ-যাঁহার সীমান্ত-বেণী মনোরম, যাঁহার নয়নশোভায় মৃগী পরাজিত, শুক পক্ষীকুলের মুখে যাঁহার কথা ধ্বনিত হইতেছে, বজ্রধারী দেবেন্দ্র যাঁহাকে প্রণাম করেন, যাঁহার বদন অমৃতে পরিপূর্ণ, ভক্তবৃন্দ যাঁহার বেণীকে হর্ষসহকারে ধ্যান করেন, আমার জননীরূপা সেই জগজ্জননী শারদাকে নিরন্তর ভজনা করি। ৪
সুশান্তাং সুদেহাং দৃগন্তে কচান্তাং
লসৎসল্লতাঙ্গীমনন্তামচিন্ত্যাম্ ।
স্মরেত্তাপসৈঃ সঙ্গপূর্বস্থিতাং তাং
ভজে শারদাম্বামজস্রং মদম্বাম্ ॥ ৫॥
অনুবাদঃ-যিনি সুশান্ত-প্রকৃতি, যাঁহার কলেবর কমনীয়, যাঁহার নেত্রপ্রান্ত কেশান্তস্পর্শী, অলকদাম -সংলগ্ন যাঁহার সত্যস্বরূপ, অঙ্গবল্লী শোভাসম্পন্ন, যাঁহার অন্ত নাই, যিনি স্মরণপরায়ণ , যিনি তাপসগণেও অচিন্তনীয়া , সৃষ্টির পূর্ব্বেও যিনি স্বরূপে অবস্থিতা, আমার জননীরূপা সেই জগজ্জননী শারদাকে নিরন্তর ভজনা করি।৫
কুরঙ্গে তুরঙ্গে মৃগেন্দ্রে খগেন্দ্রে
মরালে মদেভে মহোক্ষেঽধিরূঢাম্ ।
মহত্যাং নবম্যাং সদা সামরূপাং
ভজে শারদাম্বামজস্রং মদম্বাম্ ॥ ৬॥
অনুবাদঃ-যিনি (বায়ুরূপে) মৃগে, (সূর্যরূপে) অশ্বে, (দূর্গারূপে) সিংহে, (বিষ্ণুরূপে) গরুড়ে, (ব্রহ্মারূপে) হংসে, (ইন্দ্ররূপে) মত্তহস্তীতে, (শিবরূপে) মহাবৃষে আরোহণ করেন, অথচ যিনি অরূপা (নিরাকারা) এবং মহানবমীতে নিত্যআসীনা, আমার জননীরূপা সেই জগজ্জননী শারদাকে নিরন্তর ভজনা করি।৬
জ্বলৎকান্তিবহ্নিং জগন্মোহনাঙ্গীং
ভজে মানসাম্ভোজসুভ্রান্তভৃঙ্গীম্ ।
নিজস্তোত্রসঙ্গীতনৃত্যপ্রভাঙ্গীম্
ভজে শারদাম্বামজস্রং মদম্বাম্ ॥ ৭
অনুবাদঃ-যাঁহার কান্তি-লহরী উজ্জ্বল, দেহযষ্টি যাঁহার বিশ্বপ্রপঞ্চকে বিমোহিত করেন, যিনি মানসকমলচারিণী, ভৃঙ্গরূপিণী, নিজস্তুতি সঙ্গীত ও নৃত্য যাঁহার প্রকাশের অঙ্গ,আমার জননীরূপা সেই বিশ্বমাতা শারদাকে নিরন্তর ভজনা করি।৭
ভবাম্ভোজনেত্রাজসম্পূজ্যমানাং
লসন্মন্দহাসপ্রভাবক্ত্রচিহ্নাম্ ।
চলচ্চঞ্চলাচারুতাটঙ্ককর্ণাং
ভজে শারদাম্বামজস্রং মদম্বাম্ ॥ ৮॥
ইতি শ্রীমৎপরমহংসপরিব্রাজকাচার্যস্য
শ্রীগোবিন্দভগবৎপূজ্যপাদশিষ্যস্য
শ্রীমচ্ছঙ্করভগবতঃ কৃতৌ
শারদাভুজঙ্গপ্রয়াতাষ্টক সম্পূর্ণম্ ॥
অনুবাদঃ-মহেশ্বর পদ্মপলাশলোচন, হরি ও ব্রহ্মা যাঁহার অর্চনা করেন, যাঁহার বদনমন্ডল মৃদু মৃদু হাস্যচ্ছটায় সদা লক্ষিত, সৌদামিনী -রমনীয় তাটঙ্ক-ভূষন যাঁহার কর্ণে দোদুল্যমান, আমার জননীরূপা সেই জননী বিশ্বমাতা সেই শারদাকে নিরন্তর ভজনা করি। ৮
ইতি ভগবৎপাদ্ শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য্য বিরচিত শারদাভুজঙ্গপ্রয়াতাষ্টক সম্পূর্ণ।

Sunday, 14 February 2021

অপরোক্ষানুভূতি (১-৭)




ভগবৎপদ্ শঙ্করাচার্য বিরচিত অপরোক্ষানুভূতি

শ্রীহরিং পরমানন্দমুপদেষ্টারমীশ্বরম্ ।

ব্যাপকং সর্বলোকানাং কারণং তং নমাম্যহম্ ॥ ১॥

অনুবাদঃ- পরমানন্দস্বরূপ, উপদেষ্টা, সকলের নিয়ামক, সর্ব্বব্যাপী, সকল লোকের কারণস্বরূপ সেই শ্রীহরিকে আমি প্রণাম করিতেছি।১

অপরোক্ষানুভূতির্বৈ প্রোচ্যতে মোক্ষসিদ্ধয়ে ।

সদ্ভিরেষা প্রয়ত্নেন বীক্ষণীয়া মুহুর্মুহুঃ ॥ ২॥

অনুবাদঃ- অপরোক্ষানুভূতি মোক্ষসিদ্ধির জন্যই কথিত হইতেছে। সাধুদের দ্বারাই ইহা যত্নসহকারে বারংবার বিচার্য্য।২

স্ববর্ণাশ্রমধর্মেণ তপসা হরিতোষণাৎ ।

সাধনং প্রভবেৎপুংসাং বৈরাগ্যাদি চতুষ্টয়ম্ ॥ ৩॥

অনুবাদঃ- নিজ নিজ বর্ণ ও আশ্রমবিহিত কর্ম্ম, তপস্যা ও শ্রীহরির তুষ্টিবিধানের দ্বারা সাধকপুরুষ বৈরাগ্যাদি সাধনচতুষ্টয় প্রাপ্ত হইয়া থাকে। ৩

বৈরাগ্য কি?

ব্রহ্মাদিস্থাবরান্তেষু বৈরাগ্যং বিষয়েষ্বনু ।

যথৈব কাকবিষ্ঠায়াং বৈরাগ্যং তদ্ধি নির্মলম্ ॥ ৪॥

অনুবাদঃ- ব্রহ্মা হইতে স্থাবর পর্যন্ত বিষয়সকলে কাকবিষ্ঠায় বৈরাগ্যবৎ যে বৈরাগ্য তাহাই নির্ম্মল বৈরাগ্য বলিয়া জানিবে। ৪

বিবেকজ্ঞান কি?

নিত্যমাত্মস্বরূপং হি দৃশ্যং তদ্বিপরীতগম্ ।

এবং যো নিশ্চয়ঃ সম্যগ্বিবেকো বস্তুনঃ স বৈ ॥ ৫॥

অনুবাদঃ- আত্মস্বরূপই নিত্য এবং অন্যদৃশ্য পদার্থ অনিত্য-এইরূপ দৃঢ়প্রত্যয়ই বিবেকজ্ঞান। ৫

'শম' ও 'দম' কি?

সদৈব বাসনাত্যাগঃ শমোঽয়মিতি শব্দিতঃ ।

নিগ্রহো বাহ্যবৃত্তীনাং দম ইত্যভিধীয়তে ॥ ৬॥

অনুবাদঃ-সর্বদা বাসনা ত্যাগ 'শম' শব্দে কথিত হয় এবং বাহ্যবৃত্তিসমূহের নিগ্রহ 'দম' বলিয়া অভিহিত হয়। ৬

উপরতি ও তিতিক্ষা কি?

বিষয়েভ্যঃ পরাবৃত্তিঃ পরমোপরতির্হি সা ।

সহনং সর্বদুঃখানাং তিতিক্ষা সা শুভা মতা ॥ ৭॥

অনুবাদঃ-বিষয়সমূহ হইতে চিত্তবৃত্তিকে ফিরাইয়া আনাই সেই পরম উপরতি। সকল দুঃখের সহনকে সেই শুভ তিতিক্ষা মনে করা হয়। ৭.......

 


Saturday, 30 January 2021

স্বপ্রকাশ পরমাত্মার স্বগুণাবৃত শক্তিই জগতের মূল কারণঃ-


কৃষ্ণযজুর্বেদীয় শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎ এ বর্ণিত আছে-

তে ধ্যানয়োগানুগতা অপশ্যন্
দেবাত্মশক্তিং স্বগুণৈর্নিগূঢাম্ ।
যঃ কারণানি নিখিলানি তানি
কালাত্ময়ুক্তান্যধিতিষ্ঠত্যেকঃ ॥-(শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎ-১।৩)
ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- প্রত্যক্ষাদি কোন প্রমাণে যাহাকে জানিতে পারা যায় না, সেই মূলকারণ বস্তুটির জানিবার আর উপায়ান্তর না দেখিয়া ব্রহ্মবাদিগণ ধ্যান যোগের অনুশীলনে প্রবৃত্ত হইলেন। ধ্যান অর্থ চিত্তের একাগ্রতা, তাহাই যোগ। যাহা দ্বারা চিত্তসংযোজন করা যায়, তাহাই যোগ শব্দের অর্থ। ব্রহ্মবাদিরা সেই ধ্যানযোগের অনুগত অর্থাৎ সমাহিত হইয়া জগতের মূল কারণ রূপে দেবাত্মশক্তিকে দর্শন করিলেন।
পূর্ব শ্রুতিতে কথিত প্রশ্ন পরিহারর সূত্ররূপে যাহা উক্ত হইয়াছে, এক্ষণে তাহাই একটী একটী করিয়া বর্ণিত হইবে। সেই উক্তিগুলোর সংক্ষেপার্থ এইরূপ- ব্রহ্মই কি জগৎকারণ অথবা কাল প্রভৃতি কারণ? দ্বিতীয় প্রশ্ন-ব্রহ্ম কি কারণ, না কার্য্য-কারণভাব রহিত?
তৃতীয় প্রশ্ন-ব্রহ্ম কি কারণ, না অকারণ? চতুর্থ প্রশ্ন হইল- কারণ হইলেও উপাদান কারণ না নিমিত্তকারণ? নাকি উভয় কারণই? পঞ্চম প্রশ্নঃ- ব্রহ্ম কারণ হইলেই বা তাহার লক্ষণ বা স্বরূপ কি? আর অকারণ হইলেই বা তাহার লক্ষণ কিরূপ?
এইসকল প্রশ্নের পরিহার বা সমাধান এইরূপ-ব্রহ্ম কারণ নহে, অকারণও নহে, উভয়রূপও নহে অনুভয়রূপও নহে এবং তিনি নিমিত্ত নহে উপাদানও নহে অথবা উভয়াত্মকও নহে। এই কথা বলা হইতেছে যে-অদ্বিতীয় পরমাত্মার স্বরূপতঃ কারণতা বা উপাদান নিমিত্তভাব কিছুই নাই। সে সমস্তই ঔপাধিক।
যে উপাধিসহযোগে ব্রহ্মের কারণত্বাদি ঘটে, বস্তুতঃ তাহাই নিমিত্তকারণ। একথা সমর্থনপূর্বক তাহারই প্রযোজকতা পৃথক করিয়া দেখাইতেছেন-'দেবাত্মশক্তিম্' ইত্যাদি । স্বপ্রকাশ মায়াধীশ্বর পরমেশ্বর পরমাত্মার আত্মভূতা -অস্বতন্ত্রা, কিন্তু সাংখ্য শাস্ত্রোক্ত প্রধান বা প্রকৃতির ন্যায় স্বতন্ত্রা নহে, পরন্তু পরমেশ্বরের অধীনা শক্তিকে (মায়াকে) তাহারা কারণরূপে দর্শন করিয়াছিলেন।
এই উপনিষদেই পরবর্তীতে -'মায়াকে প্রকৃতি (জগৎকারণ) বলিয়া জানিবে, এবং মায়ীকে (মায়াযুক্তকে) মহেশ্বর বলিয়া জানিবে।'-(শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎ-৪।১০) এইরূপ শ্রুতিবাক্য দ্বারা প্রদর্শিত হইবে।
ব্রহ্মপুরাণে কথিত আছে-'মহত্তত্ত্ব প্রভৃতি চতুর্বিংশতি ভাগে বিভক্ত। এই মায়াই পরাপ্রকৃতি।'
শ্রীভগবানও বলিতেছেন- 'হে কৌন্তেয়! সর্বতোভাবে দ্রষ্টামাত্রস্বরূপ এবং স্বরূপতঃ বিকাররহিত আমি যে অধ্যক্ষ-আমার দ্বারা প্রেরিত হইয়া আমার ত্রিগুণাত্মিকা মায়া অর্থাৎ অবিদ্যালক্ষণা প্রকৃতি এই চরাচর জগৎ উৎপাদন করে।'-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, রাজযোগ-১০)
সেই শক্তিটী স্বগুণে সত্ত্বরজস্তমোনামক স্বকীয়গুণে ও স্বীয় কার্য্য (প্রকৃতিজাত) পৃথিব্যাদি দ্বারা নিগূঢ়া অর্থাৎ আবৃতা বা আচ্ছাদিতা। কারণ মাত্রই স্বীয় কার্য্য দ্বারা আবৃত থাকে, কারণের আকারটী কার্য্যের আকারে লুকায়িত থাকে, সেইকারণে কার্য্যবস্তু হইতে কারণ বস্তুটিকে পৃথক করিয়া ধরিতে পারা যায় না। গুণসমূহ যে প্রকৃতিজাত, তাহা ভগবান বেদব্যাস দেখাইয়াছেন-
'সত্ত্ব, রজঃ, ও তমগুণত্রয় ভগবন্মায়া প্রকৃতি হইতে সম্ভূত।'-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, গুনত্রয়বিভাগযোগ-৫)
আচ্ছা এই 'দেবাত্মশক্তি' র দেবতাটি কে? যাঁহার এই বিশ্বজনীন শক্তির স্বীকার করা হইতেছে? তদুত্তরে বলিতেছেন-'যঃ কারণানি' ইত্যাদি। যে এক অদ্বিতীয় পরমাত্মা পূর্বোক্ত কালাত্মযুক্ত -কাল ও আত্মসহকৃত অর্থাৎ কাল ও পুরুষসমন্বিত 'কালঃস্বভাবঃ' ইত্যাদি মন্ত্রোক্ত সমস্ত কারণের অধিষ্ঠাতা অর্থাৎ ঐ সকল কারণকে যিনি যথানিয়মে পরিচালিত করেন, তাঁহার শক্তিকে ব্রহ্মবাদিগণ দর্শন করিয়াছিলেন। ইহাই উক্ত শ্রুতি বাক্যের অর্থ।

Sunday, 10 January 2021

এক অভিন্ন অদ্বয় আত্মস্বরূপ ভিন্ন স্বরূপতঃ আর কোন কিছুরই অস্তিত্ব নাইঃ-


আচার্য শঙ্কর কৃষ্ণযজুর্বেদের কঠ শাখার অন্তর্গত কঠোপনিষৎ ভাষ্যে বলিতেছেন-  ব্রহ্ম বা আত্মচৈতন্য ব্রহ্মাদি হইতে আরম্ভ করিয়া স্থাবর (বৃক্ষলতাদি) পর্যন্ত সমস্ত প্রাণীতে বর্তমান আছেন এবং সেই সেই বিশেষ দেহরূপ উপাধিনিমিত্ত অব্রহ্মের ন্যায় প্রতীয়মান হইতেছেন, তিনি পরব্রহ্ম হইতে ভিন্ন সংসারী-এইরূপ আশঙ্কা কাহারও না হউক, এইজন্য শ্রুতি এই অদ্বয়তত্ত্ব বলিতেছেন-

যদেবেহ তদমুত্র যদমুত্র তদন্বিহ। মৃত্যোঃ স মৃত্যুমাপ্নোতি য ইহ নানেব পশ্যতি।।-(কঠ উপনিষৎ-২।১।১০)

'শাঙ্করভাষ্য' অনুসারে ভাবার্থঃ- যে আত্মচৈতন্যস্বরূপ এখানে অর্থাৎ কার্যোপাধি (দেহে) ও কারণোপাধি (মায়াতে) যুক্ত হইয়া জীব, ব্রহ্মা ইত্যাদিরূপে অবিবেকিগণের নিকট সংসারধর্ম্মবিশিষ্ট বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছেন, স্বস্বরূপে স্থিত সেই আত্মচৈতন্যস্বরূপই আবার অমুত্র অর্থাৎ ঐ নিত্য বিজ্ঞানঘনস্বরূপ সম্পূর্ণ সংসার ধর্মশূন্য ব্রহ্ম। যে আত্মচৈতন্যস্বরূপ ঐ স্বরূপে স্থিত তাহাই আবার নামরূপাত্মক কার্যকারণরূপ উপাধি অনুযায়ী (জীব, ব্রহ্মা ইত্যাদি) বিবিধরূপে প্রতীত হন, কিন্তু তিনি ভিন্ন তাহা অন্য কেহই নয়।

এইরূপ (একত্ব) হইলেও যে ব্যক্তি ভেদদৃষ্টিই যে অন্তঃকরণরূপ উপাধির স্বভাব, সেই ভেদদৃষ্টিরূপ অধ্যাসের দ্বারা মোহিত হইয়া অভিন্নস্বরূপ সমরস ব্রহ্মে 'আমি পরব্রহ্ম হইতে ভিন্ন এবং পরব্রহ্মও আমা হইতে ভিন্ন' এইপ্রকার ভিন্নবৎ উপলব্ধি করেন তিনি মৃত্যু হইতে অপর মৃত্যু অর্থাৎ পুনঃ পুনঃ জন্মমরণভাব প্রাপ্ত হন। অতএব এইরূপ ভেদদর্শন করিবে না। পরন্তু 'আমি ভেদরহিত সমরস বিজ্ঞানস্বরূপ আকাশতুল্য পরিপূর্ণ ব্রহ্ম' এইরূপ উপলব্ধি করিবে।

ইতি শ্রতি বাক্যার্থ..

Monday, 28 December 2020

চক্ষু নিজ মূলসত্তা ব্রহ্মকে গ্রহণ করিতে পারে না, পক্ষান্তরে ব্রহ্মের দ্বারা উদ্ভাসিত হইয়াই চক্ষু অন্য দৃশ্যপদার্থকে গ্রহণ করিতে পারেঃ-



সামবেদীয় কেন উপনিষদে (১।৬) বর্ণিত আছে-

যচ্চক্ষুষা ন পশ্যতি যেন চক্ষূংষি পশ্যতি। তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি....

শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- যাঁহাকে (অর্থাৎ যে ব্রহ্মকে) লোকে অন্তঃকরণের বৃত্তির সহিত সংযুক্ত চক্ষুর দ্বারা দেখিতে পায় না অর্থাৎ যাঁহাকে প্রকাশ করিতে পারে না, কিন্তু যাঁহার নিমিত্ত অর্থাৎ চৈতন্যস্বরূপ আত্মজ্যোতির দ্বারা চক্ষুসকলকে অর্থাৎ অন্তঃকরণের বৃত্তির ভেদানুসারে পৃথক্ পৃথক্ চক্ষুর বৃত্তিসকলকে দেখিয়া থাকে অর্থাৎ প্রকাশিত এবং ব্যাপ্ত করে। তাঁহাকেই তুমি ব্রহ্ম বলিয়া জানিবে।

Wednesday, 16 December 2020

শ্রুতি ও স্মৃতি বলে জীবের বিভুত্ব প্রতিপাদনঃ-


এক্ষণে জীব কি পরিমাণবিশিষ্ট, ইহা চিন্তা করা হইতেছে। তাহা কি অণুপিমাণ, অথবা মধ্যম পরিমাণ অথবা মহাপরিমাণ অর্থাৎ বিভু,সর্ব্বব্যাপক? কিন্তু আত্মা উৎপন্ন হয় না এবং নিত্যচৈতন্যস্বরূপ, ইহা কথিত হইয়াছে। আর সেই হেতু পরমাত্মাই জীব ইহা আসিয়া পড়িতেছে। আবার পরমাত্মার অনন্ততা শ্রুতিতে পঠিত হইয়াছে, তাহাতে জীবের পরিমাণবিষয়ক বিচারের অবতারণা কি প্রকারে হইতেছে? তদুত্তরে বলা হইতেছে হ্যাঁ ইহা সত্য, কিন্তু উৎক্রান্তি, চন্দ্রলোকাদিতে গতি এবং তথা হইতে আগমন প্রতিপাদক শ্রুতিবাক্যসকল জীবের পরিচ্ছেদ (সসীমতা) প্রাপ্ত করাইতেছে। আর কোন কোন স্থলে স্ব (-অণুপরিমাণতা) বোধক শব্দের দ্বারা জীবের অণুপরিমাণতা পঠিত হইতেছে। সেই শ্রুতি বাক্যসকলের পরস্পর অবিরোধ প্রতিপাদনের জন্য ভগবান বাদরায়ণ সিদ্ধান্ত করিতেছেন-

তদ্গুণসারত্বাত্তু তদ্ব্যপদেশঃ প্রাজ্ঞবৎ ৷৷ ব্রহ্মসূত্র-২.৩.২৯৷৷
শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- ভগবাৎপাদ্ শ্রীশঙ্করাচার্য্য শারীরকভাষ্যম্ এ বলিতেছেন-সূত্রস্থ 'তু' শব্দটী (বিরোধী) পক্ষকে ব্যাবৃত্ত (খণ্ডিত) করিতেছে। আত্মা (জীব) অণু ইহা শ্রুতিতে নাই। জীবের উৎপত্তি শ্রুতিতে বর্ণিত না হওয়ায়, পরব্রহ্মেরই জীবরূপে প্রবেশ শ্রুতিতে বর্ণিত হওয়াই এবং ব্রহ্মের সহিত জীবের তাদাত্ম্য অর্থাৎ তৎস্বরূপতা বা অভিন্নতা উপদিষ্ট হওয়ায় পরব্রহ্মই জীব, ইহা কিন্তু পূর্বে কথিত হইয়াছে। আর যদি জীব পরব্রহ্মই হয়, তাহা হইলে পরব্রহ্ম যতটা জীবও ততটা হওয়া উচিত। আর পরব্রহ্মের বিভুতা শ্রুতিতে পঠিত হইয়াছে, সেইহেতু জীব বিভু। তাহা হইলে-
'স বা এষ মহানজ আত্মা যোযং বিজ্ঞানমযঃ প্রাণেষু'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪।৪।২২)
"সেই এই মহান জন্মরহিত আত্মা, যিনি ইন্দ্রিয়সকলের মধ্যে বিজ্ঞানময়(-বুদ্ধিরূপ উপাধিযুক্ত)", ইত্যাদি এই জাতীয় জীববিষয়ক বিভুত্বপ্রতিপাদক শ্রুতি ও স্মৃতি সকল সমর্থিত হইয়া থাকে।.......................................

Monday, 7 December 2020

উপদেশসাহস্রী (১-৩)



পরমহংস পরিব্রাজক ভগবৎপাদ্ শ্রী শঙ্করাচার্য্য বিরচিত উপদেশসাহস্রী প্রারম্ভ-
গদ্যবন্ধঃ প্রথমো ভাগঃ ।
শিষ্যপ্রতিবোধবিধিপ্রকরণম্ ॥
অথ মোক্ষসাধনোপদেশবিধিং ব্যাখ্যাস্যামো মুমুক্ষূণাং শ্রদ্দধানানামর্থিনামর্থায় ॥ ১॥
বঙ্গানুবাদঃ- অনন্তর শ্রদ্ধালু মুক্তিকাম অধিকারীদিগের উপকারের নিমিত্ত মুক্তির উপায়ভূত তত্ত্বজ্ঞানের উপদেশবিধি বিশদরূপে ব্যাখ্যা করব।১
তদিদং মোক্ষসাধনং জ্ঞানং
সাধনসাধ্যাদনিত্যাৎসর্বস্মাদ্বিরক্তায় ত্যক্তপুত্রবিত্তলোকৈষণায়
প্রতিপন্নপরমহংসপারিব্রাজ্যায় শমদমদয়াদিয়ুক্তায়
শাস্ত্রপ্রসিদ্ধশিষ্যগুণসম্পন্নায় শুচয়ে ব্রাহ্মণায়
বিধিবদুপসন্নায় শিষ্যায় জাতিকর্মবৃত্তবিদ্যাভিজনৈঃ পরীক্ষিতায়
ব্রূয়াৎপুনঃপুনঃ যাবদ্গ্রহণং দৃঢ়ীভবতি ॥ ২॥
বঙ্গানুবাদঃ- আচার্য্য অনিত্য সমূদয় (ব্রহ্মলোক পর্যন্ত) দৃষ্ট ও অদৃষ্টসাধন ঐহিক ও পারলৌকিক ভোগসমূহ হতে বিরক্ত, পুত্রৈষণা, বিত্তৈষণা, লোকৈষণা-পরিত্যাগী, পরমহংসপরিব্রাজ্যাশ্রমী সন্ন্যাসী, শমদমাদি-বিশিষ্ট, শাস্ত্রপ্রসিদ্ধ শিষ্যগুণ সম্পন্ন, শৌচশীল, যথাশাস্ত্র পাদবন্দনাদিপূর্বক বিদ্যাগ্রহণার্থ গুরুসমীপবর্ত্তী, জাতি-কর্ম্ম-স্বভাব, বেদবিদ্যা ও কুল দ্বারা পরীক্ষিত বিপ্র শিষ্যকে শাস্ত্রপ্রসিদ্ধ এই মোক্ষসাধন তত্ত্বজ্ঞানের উপদেশ প্রদান করিবেন, যে পর্য্যন্ত শিষ্য দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করিতে না পারে ততক্ষণ গুরু পুনঃ পুনঃ বলিবেন।২
টীকাঃ- এষণা শব্দের অর্থ কামপ্রযুক্ত প্রবৃত্তি। পুত্রের নিমিত্ত পত্নীসংগ্রহে প্রবৃত্তির নাম পুত্রৈষণা, কর্মাদি অনুষ্ঠানের নিমিত্ত বিত্তসংগ্রহের নাম বিত্তৈষণা, পুত্র,কর্ম্ম ও অপরবিদ্যাসাধ্য পৃথিবীলোক, পিতৃলোক ও দেবলোকে প্রবৃত্তির নাম লোকৈষণা।
শ্রুতিশ্চ--- ' পরীক্ষ্য লোকান্ ...তত্ত্বতো ব্রহ্মবিদ্যাম্ '
ইতি । দৃঢগৃহীতা হি বিদ্যা আত্মনঃ শ্রেয়সে সন্তত্যৈ চ ভবতি ।
বিদ্যাসন্ততিশ্চ প্রাণ্যনুগ্রহায় ভবতি নৌরিব নদীং তিতীর্ষোঃ ।
শাস্ত্রং চ---' যদ্যপ্যস্মা ইমামদ্ভিঃ পরিগৃহীতাং ধনস্য পূর্ণাং
দদ্যাদেতদেব ততো ভূয়ঃ ' ইতি ।
অন্যথা চ জ্ঞানপ্রাপ্ত্যভাবাৎ---' আচার্যবান্ পুরুষো বেদ ' ,
'আচার্যাদ্ধৈব বিদ্যা বিদিতা', 'আচার্যঃ প্লাবয়িতা ',
'সম্যগ্জ্ঞানং প্লব ইহোচ্যতে ' ইত্যাদিশ্রুতিভ্যঃ, ' উপদেক্ষ্যন্তি
তে জ্ঞানং, ' ইত্যাদিস্মৃতেশ্চ ॥ ৩॥
বঙ্গানুবাদঃ-গুরু শিষ্যকে উপদেশ প্রদান করিবেন এই বিষয়ে শ্রুতিও আছে-“বিপ্র কর্ম্মের দ্বারা সম্পাদিত স্বর্গাদিলোকসমূহ পরীক্ষা করিয়া কর্ম্মদ্বারা মোক্ষলাভ হয় না বলিয়া বৈরাগ্য লাভ করিবেন। যাহা অভয়, মঙ্গলময়, অকৃত, নিত্যলক্ষ্যবস্তু সেই ব্রহ্মকে বিশেষভাবে বুঝিবার জন্য তিনি গুরুকেই অর্থাৎ শমদমদয়াদিসম্পন্ন আচার্য্যকেই আশ্রয় করিবেন। শাস্ত্রজ্ঞানসম্পন্ন হইলেও নিজে স্বতন্ত্রভাবে ব্রহ্মবিষয়ক বিদ্যার নিমিত্ত আকাঙ্খা করিবে না। তিনি হোমীয় কাষ্ঠভার গ্রহণ করিয়া, শ্রোত্রিয় অর্থাৎ বেদাধ্যয়নে ও বেদার্থে পারদর্শী এবং সর্বকর্ম পরিত্যাগ করিয়া কেবল অদ্বয় ব্রহ্মেতে নিষ্ঠা যাহাঁর এইরূপ ব্রহ্মনিষ্ঠ গুরুর নিকট গমন করিবেন। তিনি ঐ গুরুর নিকট যথাবিধি উপস্থিত হইয়া, তাহাঁকে প্রসন্ন করিয়া অব্যয় চিরন্তন পুরুষের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিবেন।“-(মুণ্ডক উপনিষদ্-১.২.১২)
“সেই বিদ্বান সমীপস্থিত সম্পূর্ণরূপ প্রশান্তচিত্ত শমবিশিষ্ট সেই শিষ্যের উদ্দেশ্যে সত্যস্বরূপ অক্ষরপুরুষের জ্ঞানের উপায়ভূত ব্রহ্মবিদ্যা যথাযথ রূপে বর্ণন করিবেন।”(মুণ্ডক উপনিষদ্-১.২.১৩)
যেহেতু বিদ্যা দৃঢ়ভাবে গৃহীত হইলে তাহা আত্মার (পুরুষের) কল্যাণের (অবিদ্যাদোষ ও সংসারের নিবৃত্তের) এবং শিষ্য প্রশিষ্য ক্রমে বিদ্যার অবিচ্ছেদের নিমিত্ত হইয়া থাকে। নদী হইতে উত্তীর্ণ হইবার উপায়স্বরূপ নৌকার ন্যায় অবিচ্ছিন্নভাবে বিদ্যা প্রাণীর অনুগ্রহের (সংসার সমুদ্র হইতে উত্তীর্ণ হইবার) নিমিত্ত হইয়া থাকে।
এইবিষয়ে শাস্ত্রেও উদ্ধৃত আছে-“যদি কোন লোক সমুদ্রপরিবৃত ধনপূর্ণা পৃথিবী কাহাকেও প্রদান করে, তাহা হইলেও সে তাহাকে ব্রহ্মজ্ঞান প্রদান করিবে না, কারণ তাহা হইতেও ব্রহ্মজ্ঞান উৎকৃষ্টতর।“-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৩।১১।৬)
অন্যপ্রকারে অর্থাৎ আচার্য্যের অপেক্ষা না করিয়া জ্ঞানলাভ হতে পারে না। “আচার্য্যযুক্ত পুরুষ জ্ঞান লাভ করে।“-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।১৪।২)
'ভগবৎসদৃশ আচার্য্যগণের নিকটেই আমি ইহা বিদিত আছি যে, গুরুমুখে বিজ্ঞাত বিদ্যাই কল্যাণতম হইয়া থাকে।-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৪।৯।৩)
আচার্য্যই যে সংসারসাগর হইতে উদ্ধারকর্ত্তা এবং তত্ত্বজ্ঞানই যে ভেলাস্বরূপ ইত্যাদি শ্রুতিসমূহ প্রমাণস্বরূপ।
“সেই বিশিষ্ট জ্ঞান যে বিধির দ্বারা পাওয়া যায় তাহা জান। আচার্য্যের নিকট গমন করে প্রকৃষ্টরূপে সর্বাঙ্গ নিম্নকরণের দ্বারা প্রণিপাত অর্থাৎ দীর্ঘ নমস্কারের দ্বারা ‘বন্ধন কি?’, ‘মোক্ষ কি?’, ‘বিদ্যা কি?’, ‘অবিদ্যাই বা কি?’ ইত্যাদি পরিপ্রশ্ন এবং সেবা অর্থাৎ গুরুশুশ্রূষার দ্বারা সেই ব্রহ্মজ্ঞান প্রাপ্ত হওয়া যায়। এইরূপ বিনয়াদির দ্বারা প্রসন্নভূত তত্ত্বদর্শী জ্ঞানী আচার্য্যেরা তোমাকে যথোক্ত-বিশেষণ অর্থাৎ তত্ত্বদর্শনরূপ জ্ঞান উপদেশ প্রদান করিবেন।“-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৪।৩৪) ইত্যাদি স্মৃতিতেও তাহা স্পষ্ট

Friday, 27 November 2020

জীব নিত্যচৈতন্য অর্থাৎ জ্ঞানস্বরূপঃ-

জীব কি বৈশেষিকমতাবলম্বিগণের মতানুসারে আগন্তুক চৈতন্যবিশিষ্ট স্বভাবতঃ অচেতন, অথবা সাংখ্যমতাবলম্বিগণের ন্যায় নিত্য চৈতন্যস্বরূপই, এইরূপ সংশয়ের প্রত্যুত্তরে ভগবান বাদরায়ণ ব্রহ্মসূত্রের জ্ঞাধিকরণম্ এ সিদ্ধান্ত করিতেছে-

'জ্ঞোত এব৷৷' ব্রহ্মসূত্র-২।৩।১৮৷৷
'শাঙ্করভাষ্য' অনুসারে ভাবার্থঃ- ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্য ভাষ্যে বলিতেছেন- এই প্রকার সংশয় প্রাপ্ত হইলে কথিত হইতেছে-এই আত্মা (-জীব) জ্ঞ অর্থাৎ নিত্য চৈতন্যস্বরূপ,'অতএব', অর্থাৎ যেহেতু ইহা উৎপন্নই হয় না। পরব্রহ্মই উপাধির সহিত সম্পর্কবশতঃ জীবরূপে অবস্থান করিতেছেন। যেহেতু-
'বিজ্ঞানমানন্দং ব্রহ্ম'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৩।৯।২৮)
"ব্রহ্ম বিজ্ঞান ও আনন্দস্বরূপ।"
'সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২।১)
"ব্রহ্ম সত্য, জ্ঞান ও অনন্তস্বরূপ।"
'অনন্তরোবাহ্যঃ কৃত্স্নঃ প্রজ্ঞানঘন এব'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪।৫।১৩)
"(এই আত্মা) অন্তররহিত, বাহ্যরহিত সম্পূর্ণরূপে প্রজ্ঞানঘন।"
ইত্যাদি শ্রুতিসকলে পরব্রহ্মেরই চৈতন্যস্বরূপতা পঠিত হইয়াছে। জীব নিশ্চয়ই সেই পরব্রহ্মস্বরূপ, সেইহেতু অগ্নির উষ্ণতা ও প্রকাশের ন্যায় জীবেরও নিত্য-চৈতন্যস্বরূপতা অবগত হওয়া যাইতেছে।
আর বিজ্ঞানময় প্রক্রিয়াতে-
'অসুপ্তঃ সুপ্তানভিচাকশীতি'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪।৩।১১)
"স্বয়ং অসুপ্ত (-অলুপ্ত দৃকশক্তি) থাকিয়া সুপ্তসকলকে (-স্বপ্নকালীন অন্তঃকরণবৃত্তিসকলকে) দর্শন (-প্রকাশিত) করেন।"
'অত্রায়ং পুরুষঃ স্বয়ংজ্যোতির্ভবতি'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪।৩।৯)
"এখানে (-স্বপ্নাবস্থাতে) পুরুষ স্বয়ং জ্যোতি হন।"
'ন হি বিজ্ঞাতুর্বিজ্ঞাতের্বিপরিলোপো বিদ্যতে'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪।৩।৩০)
"যেহেতু বিজ্ঞাতার বিজ্ঞানের বিপরিলোপ হয় না অর্থাৎ সাক্ষিচৈতন্যের জ্ঞান বিনষ্ট হয় না।"
ইত্যাদি এইরূপ আগমপ্রমাণবলে জীবের নিত্য চৈতন্যস্বরূপতা প্রতিপাদন হয়। আবার-
'অথ যো বেদেদং জিঘ্রাণীতি স আত্মা'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৮।১২।৪)
"আর যিনি জানেন' আমি ইহা আঘ্রাণ করি', তিনি আত্মা।"
এইপ্রকারে সকলপ্রকার ইন্দ্রিয়রূপ দ্বার সকলের দ্বারা 'ইহা জানেন, ইহা জানেন', এইপ্রকার জ্ঞানের দ্বারা জ্ঞাতা আত্মার অনুসন্ধান অনুভব হয় বলিয়া জীবের নিত্যজ্ঞানরূপতা সিদ্ধ হয়।
(শঙ্কা-) যদি বলা হয়, (জীবাত্মা) নিত্যচৈতন্যস্বরূপ হইলে ঘ্রাণাদি ইন্দ্রিয়ের ব্যার্থতা হইয়া পড়িবে। তদুত্তরে সিদ্ধান্তী বলেন-না, তাহা বলা যায় না, যেহেতু গন্ধ প্রভৃতি বিশেষ বিষয়সকলের পরিচ্ছেদের জন্য ইন্দ্রিয়সকলের আবশ্যকতা আছে। 'গন্ধায় ঘ্রাণম্'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৮।১২।৪) অর্থাৎ "গন্ধের জন্য ঘ্রাণেন্দ্রিয়", ইত্যাদি শ্রুতি।
আর যে শঙ্কা জন্মায়-সুপ্ত প্রভৃতি পুরুষের চেতনা থাকে না ইত্যাদি। তদুত্তরে সিদ্ধান্তী বলিতেছেন- সুষুপ্ত পুরুষকে প্রস্তাব করিয়া-
'যদ্বৈ তন্ন পশ্যতি পশ্যন্বৈ তন্ন পশ্যতি; ন হি দ্রষ্টুর্দৃষ্টের্বিপরিলোপো বিদ্যতেবিনাশিত্বাত্; ন তু তদ্দ্বিতীযমস্তি ততোন্যদ্বিভক্তং যত্পশ্যেত্'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪।৩।২৩)
"সুষুপ্তিতে তিনি যে দর্শন করেন না, তাহা দর্শন করিয়াও দর্শন করেন না, যেহেতু দ্রষ্টার দৃষ্টির বিপরিলোপ হয় না, কারণ দ্রষ্টা অবিনাশী,, কিন্তু তাহা হইতে বিভক্ত অন্য দ্বিতীয় বস্তু নাই, যাহাকে দর্শন করিবেন।"
ইত্যাদি বাক্যের দ্বারা শ্রুতি কর্ত্তৃকই তাহার পরিহার কথিত হইয়াছে। ইহাই কথিত হইয়াছে যে অচেতয়মানতা (-কিছুই না জানা), ইহা (সুষুপ্তিকালে) বিষয়ের অভাব বশতঃ হইয়া থাকে, কিন্তু (জীবাত্মার) চৈতন্যের অভাবপ্রযুক্ত নহে।। যেমন আকাশে আশ্রিত যে প্রকাশ (-সূর্য্যকিরণ), প্রকাশ্য বস্তুর অভাববশতঃই তাহার অনভিব্যক্তি হইয়া থাকে, কিন্তু (তাহার) স্বরূপের অভাববশতঃ নহে। আর বৈশেষিক প্রভৃতি মতাবলম্বীগণের তর্কও শ্রুতির সহিত বিরোধ হওয়ায় অসৎ তর্করূপে নিরাকৃত হইয়া পড়িতেছে। অতএব আত্মা অবশ্যই নিত্যচৈতন্যস্বরূপ, ইহা আমরা নিশ্চয় করিতেছি।
ইতি

ব্রহ্মানুচিন্তনম্ বা আত্মচিন্তনম্ বা মহাবাক্যসিদ্ধান্তস্তোত্রম্

  অহমেব পরং ব্রহ্ম বাসুদেবাখ্যমব্যয়ম্ । ইতি স্যান্নিশ্চিতো মুক্তো বদ্ধ এবান্যথা ভবেৎ || ১ || অনুবাদ - " আমিই সেই অবিনা...