Wednesday, 10 November 2021

দক্ষিণামূর্তিবর্ণমালাস্তোত্রম্

 


দক্ষিণামূর্তিচতুর্বিংশতিবর্ণমালাস্তোত্রম্ ।

“ ওঁ নমো ভগবতে দক্ষিণামূর্তয়ে মহ্যং মেধাং প্রজ্ঞাং প্রযচ্ছ স্বাহা ”

( এই মন্ত্রের আদ্যাক্ষরগুলি লইয়া এই স্তোত্র রচিত।)

'ওঁ'মিত্যেতদ্যস্য বুধৈর্নাম গৃহীতং

যদ্ভাসেদং ভাতি সমস্তং বিয়দাদি ।

যস্যাজ্ঞাতঃ স্বস্বপদস্থা বিধিমুখ্যা-

স্তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||১||

ভাবার্থ - জ্ঞানীগণ তার ‘ওঁ’ ইত্যাকার নাম জ্ঞাত আছেন, যার দীপ্তিতে এই আকাশাদি সমস্ত জগৎ দীপ্ত হচ্ছে, যার আজ্ঞাবলে ব্রহ্মাদি দেবগণ স্বীয় পদে অধিষ্ঠিত আছেন, সেই সৰ্ব্ব্যাপী দক্ষিণবক্ত্রকে স্তব করছি ||১||

'ন'ম্রাঙ্গাণাং ভক্তিমতাং যঃ পুরুষার্থান্

দত্বা ক্ষিপ্রং হন্তি চ তৎসর্ববিপত্তীঃ ।

পাদাম্ভোজাধস্তনিতাপস্মৃতিমীশং

তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||২||

ভাবার্থ - যিনি নম্রাঙ্গ, ভক্তিমান, অর্থাৎ নম্র অঙ্গ যার এবম্বিধ পুরুষের অভীষ্ট প্রদানপূর্ব্বক ক্ষিপ্রভাবে তার সর্ববিধ বিপত্তি দূর করেন, সেই পাদপদ্ম দ্বারা দূরীকৃত হয়েছে অপস্মৃতি যৎকর্তৃক, এবম্বিধ ঈশ্বর সর্ব্ব্যাপী দক্ষিণবক্ত্রকে স্তব করছি ||২||

'মো'হধ্বস্ত্যৈ বৈণিকবৈয়াসিকিমুখ্যাঃ

সংবিন্মুদ্রাপুস্তকবীণাক্ষগুণান্যম্ ।

হস্তাম্ভোজৈর্বিভ্রতমারাধিতবন্তঃ

তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||৩||

ভাবার্থ - বৈণিক অর্থাৎ শিবভক্তবেণের বংশজাত বৈয়াসকি শিবভক্ত ব্যাসবংশজ শ্রেষ্ঠব্যক্তিগণ মােহনাশের জন্য করকমল দ্বারা সংবিৎমুদ্রা, পুস্তক, বীণা এবং অক্ষগুণধারীণে আরাধনা করেছিলেন, সেই সর্ব্ব্যাপক দক্ষিণবক্ত্রকে স্তব করছি ||৩||

'ভ'দ্রারূঢ়ং ভদ্রদমারাধয়িতৃণাং

ভক্তিশ্রদ্ধাপূর্বকমীশং প্রণমন্তি ।

আদিত্যা যং বাঞ্ছিতসিদ্ধ্যৈ করুণাব্ধিং

তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||৪||

ভাবার্থ - দেবগণ বাঞ্ছিতসিদ্ধির জন্য মঙ্গলময়, উপাসনাকারীর পক্ষে মঙ্গলপ্রদ, করুণাসাগর যে শিবকে (ঈশ্বরকে) ভক্তিশ্রদ্ধাপূর্ব্বক প্রণাম করেন, সেই সর্বব্যাপী দক্ষিণবক্ত্রকে স্তব করছি ||৪||

'গ'র্ভান্তঃস্থাঃ প্রাণিন এতে ভবপাশ-

চ্ছেদে দক্ষং নিশ্চিতবন্তঃ শরণং যম্ ।

আরাধ্যাঙ্ঘ্রিপ্রস্ফুরদম্ভোরুহয়ুগ্মং

তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||৫||

ভাবার্থ - গর্ভমধ্যস্থিত অর্থাৎ জন্মগ্রহণােন্মুখ সুতরাং জন্মমরণ-প্রবাহপতিত এই প্রাণিগণ, ভবপাশচ্ছেদে কুশল, উপাস্য, চরণযুগলে প্রস্ফুটিত পদ্মযুগলবিশিষ্ট যাঁকে আশ্রয়রূপ স্থির করেছে, সেই সর্ব্ব্যাপী দক্ষিণবক্ত্রকে স্তব করছি ||৫||

'ব'ক্ত্রং ধন্যাঃ সংসৃতিবার্ধেরতিমাত্রাদ্

ভীতাঃ সন্তঃ পূর্ণশশাঙ্কদ্যুতি যস্য ।

সেবেন্তেঽধ্যাসীনমনন্তং বটমূলং

তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||৬||

ভাবার্থ - ধন্য ব্যক্তিগণ সংসারসমুদ্র হতে অতিমাত্র ভীত হয়ে অনন্ত বটমূলে আসীন যাঁর পূর্ণচন্দ্রসদৃশ মুখমণ্ডলের সেবা (উপাসনা) করেন, সেই প্রত্যঞ্চ দক্ষিণবক্ত্রকে স্তব করছি ||৬||

'তে'জঃস্তোমৈরঙ্গদসংঘট্টিতভাস্বৎ

মাণিক্যোত্থৈর্ভাসিতবিশ্বো রুচিরৈর্যঃ ।

তেজোমূর্তিং খানিলতেজঃপ্রমুখাব্ধিং

তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||৭||

ভাবার্থ - যিনি কেয়ূরসংলগ্ন উজ্জ্বল মাণিক্য হতে নির্গত মনােজ্ঞ তেজঃসমূহ দ্বারা বিশ্বকে প্রকাশিত করেছেন, সেই আকাশ বায়ু তেজঃ প্রভৃতির সাগরস্বরূপ তেজোময় মূর্তিবিশিষ্ট সর্বব্যাপী দক্ষিণবক্ত্রকে স্তব করছি ||৭||

'দ'ধ্যাজ্যাদিদ্রব্যককর্মাণ্যখিলানি

ত্যক্ত্বাকাঙ্ক্ষাং কর্মফলেষ্বত্র করোতি ।

যজ্জিজ্ঞাসাং রূপফলার্থী ক্ষিতিদেব-

স্তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||৮||

ভাবার্থ - রূপফল ( অর্থাৎ সাদৃশ্য-অভেদ স্বরূপ ফল )-কামী ব্রাহ্মণ নিখিল দধি ঘৃতাদি বস্তুসাধ্য ( যজ্ঞাদি ) কর্মসকল ( ও ) কর্মফলের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে এ জগতে যাকে জানতে ইচ্ছা করেন, সেই বিশ্বব্যাপক দক্ষিণবক্ত্রকে স্তব করছি ||৮||

'ক্ষি'প্রং লোকে যং ভজমানঃ পৃথুপুণ্যঃ

প্রধ্বস্তাধিঃ প্রোজ্ঝিতসংসৃত্যখিলার্তিঃ ।

প্রত্যগ্ভূতং ব্রহ্ম পরং সন্ রমতে যঃ

তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||৯||

ভাবার্থ - ইহলােকে যে বহুপুণ্যবান ব্যক্তি যাকে ভজনা করিতে করিতে মনােব্যথাদিরহিত ও সংসারের সকল দুঃখশূন্য হয়ে অতি শীঘ্রই বিশ্বব্যাপী পরব্রহ্মস্বরূপ হয়ে থাকেন, সেই প্রত্যগ্ রূপ দক্ষিণবক্ত্রকে স্তুতি করছি ||৯||

'ণা'নেত্যেবং যন্মনুমধ্যস্থিতবর্ণান

ভক্তাঃ কালে বর্ণগৃহীত্যৈ প্রজপন্তঃ ।

মোদন্তে সংপ্রাপ্তসমস্তশ্রুতিতন্ত্রা-

স্তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||১০||

ভাবার্থ - ভক্তগণ বর্ণগ্রহণ কালে 'ণান' এইরূপ যাঁর মন্ত্রমধ্যস্থিত বর্ণগুলি ভাবনা করেন, সেই সর্বব্যাপী দক্ষিণবক্ত্রকে স্তব করছি ||১০||

মূর্তিশ্ছায়ানির্জিতমন্দাকিনিকুন্দ-

প্রালেয়াম্ভোরাশিসুধাভূতিসুরেভা ।

যস্যাভ্রাভা হাসবিধৌ দক্ষশিরোধি-

স্তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||১১||

ভাবার্থ - যার মূর্তি হাস্যকালে নিজপ্রভায় মন্দাকিনী, কুন্দপুষ্প, হিম, জলরাশি, চন্দ্রমা ও রঙ্গ (রাং) অভ্রের আভা ও দক্ষগ্রীবাকে পরাজিত করে, সেই সৰ্বব্যাপী দক্ষিণবক্ত্রকে স্তব করছি ||১১||

'ত'প্তস্বর্ণচ্ছায়জটাজূটকটাহ-

প্রোদ্যদ্বীচীবল্লিবিরাজৎসুরসিন্ধুম্ ।

নিত্যং সূক্ষ্মং নিত্যনিরস্তাখিলদোষং

তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||১২||

ভাবার্থ - যাঁহার তপ্তস্বর্ণসদৃশ জটাজুটরূপ কটাহমধ্যে উদ্গত তরঙ্গসমূহ শােভিত গঙ্গা ( আছেন ) এবং যিনি স্বয়ং নিত্য, সূক্ষ্ম, সৰ্ব্বদা নিখিল দোষরহিত সেই বিশ্বব্যাপী দক্ষিণবক্ত্রকে স্তব করছি ||১২||

'যে'ন জ্ঞাতেনৈব সমস্তং বিদিতং স্যাদ্

যস্মাদন্যদ্বস্তু জগত্যাং শশশৃঙ্গম্ ।

যং প্রাপ্তানাং নাস্তি পরং প্রাপ্যমনাদিং

তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||১৩||

ভাবার্থ - যার জ্ঞানমাত্র সমস্ত ( জগৎ ) বিদিত হয় এবং জগতে যা ভিন্ন অন্য বস্তু মাত্রই শশশৃঙ্গবৎ ( অলীক ), আদিরহিত একে প্রাপ্তব্যক্তিগণের এই অপেক্ষায় শ্রেষ্ঠ প্রাপ্য নাই, সেই সৰ্বব্যাপী দক্ষিণবক্ত্রকে স্তব করছি ||১৩||

'ম'ত্তো মারো যস্য ললাটাক্ষিভবাগ্নি-

স্ফূর্জৎকীলপ্রোষিতভস্মীকৃতদেহঃ ।

তদ্ভস্মাসীদ্যস্য সুজাতঃ পটবাস-

স্তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||১৪||

ভাবার্থ - মদন যাঁর ললাটাক্ষি হতে উদ্ভূত অগ্নি দ্বারা ভস্মীভূতদেহ হয়েছিলেন, সেই ভস্ম যার অতি প্রশস্ত পরিধেয় ( আবরণ ) হয়েছিল, সেই বিশ্বব্যাপী দক্ষিণবক্ত্রকে স্তব করছি ||১৪||

'হ্য'ম্ভোরাশৌ সংসৃতিরূপে লুঠতাং তৎ

পারং গন্তুং যৎপদভক্তির্দৃঢ়নৌকা ।

সর্বারাধ্যং সর্বগমানন্দপয়োধিং

তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||১৫||

ভাবার্থ - সংসাররূপ জলধিতে লুণ্ঠিত ব্যক্তির যার পদে ভক্তি ওর ( সংসার জলধির ) পারে যাবার পক্ষে দৃঢ় নৌকারূপ, সেই সর্বারাধ্য, সর্বত্রব্যাপ্ত আনন্দসমুদ্র স্বরূপ, সর্বব্যাপী দক্ষিণবক্ত্রকে স্তব করছি ||১৫||

'মে'ধাবী স্যাদিন্দুবতংসং ধৃতবীণং

কর্পূরাভং পুস্তকহস্তং কমলাক্ষম্ ।

চিত্তে ধ্যায়ন্ যস্য বপুর্দ্রাঙ্নিমিষার্ধং

তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||১৬||

ভাবার্থ - যাঁর চন্দ্রালঙ্কৃত, বীণাধারী, কর্পূরের ন্যায় গৌরবর্ণ হস্তে পুস্তকযুক্ত, পদ্মনয়নযুক্ত, শরীরকে সহসা নিমিষার্ধকাল চিত্তে ধ্যান করলেই ( লোকে ) মেধাবী হতে পারে, সেই বিশ্বব্যাপক দক্ষিণবক্রকে স্তব করছি ||১৬||

'ধা'ম্নাং ধাম প্রৌঢরুচীনাং পরমং যৎ

সূর্যাদীনাং যস্য স হেতুর্জগদাদেঃ ।

এতাবান্যো যস্য ন সর্বেশ্বরমীড্যং

তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||১৭||

ভাবার্থ - যিনি সূর্য্যাদি অত্যুজ্জ্বল কিরণসমূহের পরম আশ্রয়, জগতের হেতুভূত, সর্বেশ্বরও যাঁর স্তবযােগ্য নয় ( যিনি তদপেক্ষায় উৎকৃষ্ট ) যিনি এইরূপ, সেই বিশ্বব্যাপক দক্ষিণবক্ত্রকে স্তব করছি ||১৭||

'প্র'ত্যাহারপ্রাণনিরোধাদিসমর্থৈঃ

ভক্তৈর্দান্তৈঃ সংযতচিত্তৈর্যতমানৈঃ ।

স্বাত্মত্বেন জ্ঞায়ত এব ত্বরয়া য-

স্তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||১৮||

ভাবার্থ - যিনি প্রত্যাহার প্রাণায়ামাদি সমর্থ, দান্ত ( দমযুক্ত ) সংযতচিত্ত, নিরন্তর চেষ্টাযুক্ত ভক্তগণ কর্তৃক শীঘ্রই নিজ নিজ আত্মস্বরূপেই জ্ঞাত হয়েন, সেই বিশ্বব্যাপী দক্ষিণবক্ত্রকে স্তব করছি ||১৮||

'জ্ঞাং'শীভূতান্ প্রাণিন এতান্ ফলদাতা

চিত্তান্তঃস্থঃ প্রেরয়তি স্বে সকলেঽপি ।

কৃত্যে দেবঃ প্রাক্তনকর্মানুসরঃ সং-

স্তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||১৯||

ভাবার্থ - জ্ঞ'এর অংশীভূত এই সকল প্রাণীবর্গকে ( যেই ) ( কর্ম্ম- )ফলদাতাদেব মনোমধ্যে ( চিত্ত মধ্যে ) থেকে প্রাক্তন ( পূর্বজন্মের ) কর্মানুসারে ( কর্মানুসারী হয়ে ) স্বীয় সকল প্রকার কার্য্যে প্রেরণ করেন, সেই সর্বব্যাপী দক্ষিণবক্ত্রকে স্তব করছি ||১৯||

'প্রজ্ঞা'মাত্রং প্রাপিতসংবিন্নিজভক্তং

প্রাণাক্ষাদেঃ প্রেরয়িতারং প্রণবার্থম্ ।

প্রাহুঃ প্রাজ্ঞা বিদিতানুশ্রবতত্ত্বা-

স্তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||২০||

ভাবার্থ - যিনি জ্ঞানমাত্রেই নিজ ভক্তকে সংবিৎ প্রাপ্ত করিয়ে থাকেন, প্রাণ ও ইন্দ্রিয়ের ( বিষয়াদিতে ) প্রেরক, বেদতত্ত্বজ্ঞ প্রাজ্ঞ ব্যক্তিগণ যাঁকে প্রণবের অর্থ বলে নির্দেশ করেন-সেই বিশ্বব্যাপক দক্ষিণবক্ত্রকে স্তব করছি ||২০||

'য'স্যাংজ্ঞানাদেব নৃণাং সংসৃতিবোধো

যস্য জ্ঞানাদেব বিমোক্ষো ভবতীতি ।

স্পষ্টং ব্রূতে বেদশিরো দেশিকমাদ্যং

তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||২১||

ভাবার্থ - যার অজ্ঞানই ( যাঁকে না জানা হেতু ) মনুষ্যগণের সংসারজ্ঞান হয় ( অর্থাৎ বদ্ধ হয়েছি এরূপ বােধ হয় ) যাঁর জ্ঞান ( যাঁকে জানলে ) মুক্তি হয়- এটা স্পষ্ট ( ভাবে ) বেদশিরঃ ( উপনিষৎ ) বলেন, আদিগুরু সেই বিশ্বব্যাপী দক্ষিণবক্ত্রকে স্তব করছি ||২১||

'ছ'ন্নেঽবিদ্যারূপপটেনৈব চ বিশ্বং

যত্রাধ্যস্তং জীবপরেশত্বমপীদম্ ।

ভানোর্ভানুষ্বম্বুবদস্তাখিলভেদং

তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||২২||

ভাবার্থ - অবিদ্যারূপ পট দ্বারা বিশ্ব আচ্ছাদিত হলে, যাতে জীবত্ব পরেশত্ব ( প্রভৃতি ) অধ্যস্ত হয়ে থাকে ( অন্যথা হয় না ) সূর্য্যকিরণে জলের ন্যায় যাতে কোনও প্রকার ভেদ নাই, সেই সর্বব্যাপক দক্ষিণবক্ত্রকে স্তব করছি ||২২||

'স্বা'পস্বপ্নৌ জাগ্রদবস্থাপি ন যত্র

প্রাণশ্চেতঃ সর্বগতো যঃ সকলাত্মা ।

কূটস্থো যঃ কেবলসচ্চিৎসুখরূপ-

স্তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||২৩||

ভাবার্থ - যে স্থলে ( যাতে ) প্রাণ চেতঃ সুষুপ্তি, স্বপ্ন ও জাগ্রদবস্থাদি নাই, চিনি সর্ব স্বরূপ ও সর্বগত, যিনি কেবল সচ্চিদানন্দ স্বরূপ সেই বিশ্বব্যাপী দক্ষিণবক্ত্রকে স্তব করছি ||২৩||

'হা'-হেত্যেবং বিস্ময়মীয়ুর্মুনিমুখ্যা

জ্ঞাতে যস্মিন্ স্বাত্মতয়ানাত্মবিমোহঃ ।

প্রত্যগ্ ভূতে ব্রহ্মণি যাতঃ কথমিত্থং

তং প্রত্যঞ্চং দক্ষিণবক্ত্রং কলয়ামি ||২৪||

ভাবার্থ - মুনিশ্রেষ্ঠগণ যে ব্যাপক পরব্রহ্মকে নিজ আত্মরূপে ( অহং ব্রহ্মাস্মি ) জ্ঞানলাভ করার পর ( অহাে দুস্ত্যাজ্য ) এই প্রকার অনাত্মবিষয়ক ভ্রম ( সমূহ ) কিরূপে চলিয়া গেল – এই প্রকার বিস্মিত হয়ে থাকেন, সেই সর্বব্যাপক দক্ষিণবক্ত্রকে স্তব করছি ||২৪||

যৈষা রম্যৈর্মত্তময়ূরাভিধবৃত্তৈ-

রাদৌ ক্লৃপ্তা যন্মনুবর্ণৈর্মুনিভঙ্গী ।

তামেবৈতাং দক্ষিণবক্ত্রঃ কৃপয়াসা-

বূরীকুর্যাদ্দেশিকসম্রাট্ পরমাত্মা ||২৫||

ভাবার্থ - রমণীয় মত্তময়ূরনামকচ্ছন্দে রচিত আদিভাগে যা মন্ত্রস্থিত বর্ণগুলি দ্বারা কল্পিত ( রচিত ) এই যে মন্ত্রবিন্যাস-( রূপ কবিতা ) একে পরমাত্মা গুরু সম্রাট দক্ষিণবক্ত্র কৃপাপূর্বক স্বীকার করুন ||২৫||

|| ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রজকাচার্য্যস্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্যস্য শ্রীমচ্ছঙ্কর ভগবতঃ কৃতৌ শ্রীদক্ষিণামূর্তিবর্ণমালাস্তোত্রং সম্পূর্ণম্ ||

ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্য শ্রীমদ্ শঙ্করাচার্য ভগবান বিরচিত শ্রীদক্ষিণামূর্তিবর্ণমালা স্তোত্র সমাপ্ত।

 

Saturday, 6 November 2021

জলোপাধিক ব্রহ্ম হইতে পৃথিবীর উৎপত্তিঃ-

 


অদ্বৈতবেদান্তে সৃষ্টিক্রম বিষয়ক ধারাবাহিক আলোচনায় আজকের আলোচ্যবিষয় পৃথিবীর উৎপত্তি। ভগবান্ বাদরায়ণের বেদান্তমীমাংসা শাস্ত্রের 'পৃথিব্যধিকরণম্' এর প্রতিপাদ্য বিষয় জলভাবাপন্ন ব্রহ্ম হইতে পৃথিবীর উৎপত্তি হয়।

পৃথিব্যধিকাররূপশব্দান্তরেভ্যঃ ৷৷ ব্রহ্মসূত্র-২।৩।১২৷৷

এই সূত্রে ভগবান ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য্যের ভাষ্য হইল-'তা আপ ঐক্ষন্ত বহ্ব্যঃ স্যাম প্রজাযেমহীতি তা অন্নমসৃজন্ত'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।২।৪) "তাহা (-সেই জল) ঈক্ষণ করিল 'বহু হইব, প্রকৃষ্টরূপে উৎপন্ন হইব', তাহা অন্নকে সৃষ্টি করিল", এইপ্রকার শ্রুত হইতেছে। সেই স্থলে সংশয় হয়-এই 'অন্ন' শব্দের দ্বারা কি ধান্য ও যবাদি এবং ভক্ষণযোগ্য ভোজ্যবস্তু প্রভৃতি কথিত হইতেছে, অথবা পৃথিবী কথিত হইতেছে?

পূর্বপক্ষীয়গণ (ভিন্ন মতাবলম্বী) বলেন যে সেই স্থলে ধান্য যবাদি ও ভোগ্যবস্তু প্রভৃতিকে গ্রহণ করিতে হইবে, যেহেতু লোকমধ্যে তাহাতে 'অন্ন' শব্দের প্রসিদ্ধি আছে। আর এই শ্রুতিবাক্যশেষও এই অর্থকে পুষ্ট করিতেছে, যথা-'তস্মাদ্যত্র ক্বচন বর্ষতি তদেব ভূযিষ্ঠমন্নং ভবতি'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।২।৪) "সেইহেতু যেখানেই বর্ষণ হয়, সেখানেই প্রচুর অন্ন উৎপন্ন হয়", ইত্যাদি। দেখ, বর্ষণ হইলে ধান্য ও যবাদিই প্রচুর হয়, পৃথিবী নহে।

এইপ্রকার পূর্বপক্ষ প্রাপ্ত হইলে বলিতেছি- জল হইতে উৎপদ্যমানরূপে এই পৃথিবীই অন্ন শব্দের দ্বারা বিবক্ষিত হইতেছে। কোন হেতুবলে বলিতেছ? যেহেতু অধিকার (-প্রকরণপ্রমাণ) আছে, রূপ (-লিঙ্গপ্রমাণ) আছে এবং অন্য শ্রুতিবাক্যও আছে।

'তত্তেজোসৃজত' 'তদপোসৃজত'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।২।৩)

"তিনি তেজকে সৃষ্টি করিলেন", "তিনি জলকে সৃষ্টি করিলেন", এইপ্রকার মহাভূতবিষয়ক তদুৎপত্তিপ্রতিপাদক প্রকরণপ্রমাণ বর্ত্তমান আছে। সেইস্থলে ক্রমপ্রাপ্ত পৃথিবীরূপ মহাভূতকে লঙ্ঘন করিয়া অকস্মাৎ ধান্য প্রভৃতির গ্রহণ ন্যায্য নহে।

আবার এইরূপে বাক্যশেষে পৃথিবীর অনুগুণ (অনুকূল) রূপও পরিদৃষ্ট হইতেছে-

'যত্কৃষ্ণং তদন্নস্য'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।৪।১) "যাহা কৃষ্ণবর্ণ তাহা অন্নের", ইত্যাদি। ভক্ষণযোগ্য অন্ন প্রভৃতির কৃষ্ণত্বনিয়ম অর্থাৎ তাহাদের বর্ণ কৃষ্ণই হইবে এইপ্রকার নিয়ম নিশ্চয় নাই, আর ধান্য প্রভৃতিরও তাহা নাই। কিন্তু পৃথিবীরও কৃষ্ণত্বনিয়ম নিশ্চয়ই নাই, যেহেতু দুগ্ধের ন্যায় শ্বেতবর্ণ ও অঙ্গারের ন্যায় লোহিতবর্ণ ক্ষেত্রপরিদৃষ্ট হয়। তদুত্তরে বলিব, ইহা দোষ নহে, যেহেতু বাহুল্যকে অপেক্ষা করে। যেহেতু পৃথিবীরই কৃষ্ণবর্ণের প্রাচুর্য্য আছে, শ্বেত ও লোহিতবর্ণের তাদৃশ প্রাচুর্য্য নাই। পৌরাণিকগণও পৃথিবীর ছায়াকে শর্বরীরূপে (রাত্রিরূপে) উপদেশ করেন; আর তাহা কৃষ্ণবর্ণা এইহেতু পৃথিবীর বর্ণ কৃষ্ণ, ইহা যুক্তিসঙ্গত।

আবার মহাভূতের উৎপত্তিবিষয়ক সমান প্রকরণে পঠিত অন্য শ্রুতিও আছে, যথা-

'অদ্ভ্যঃ পৃথিবী'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২।১)

"জল হইতে পৃথিবী উৎপন্ন হইল" এবং

'তদ্যদপাং শর আসীত্তত্সমহন্যত সা পৃথিব্যভবত্'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-১।২।২)

"সেইস্থলে জলের উপর শরের ন্যায় যাহা ছিল, তাহা গাঢ়তা প্রাপ্ত হইল, তাহাই হইল পৃথিবী", ইত্যাদি।

কিন্তু পৃথিবী হইতে ধান্য প্রভৃতির উৎপত্তি শ্রুতি প্রদর্শন করিতেছেন-

'পৃথিব্যাঃ ওষধয়ঃ ওষধীভ্যোন্নম্'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২।১)

"পৃথিবী হইতে ওষধিসকল এবং ওষধিসকল হইতে অন্ন উৎপন্ন হইল।"

এইপ্রকারে পৃথিবীর প্রতিপাদক প্রকরণ, লিঙ্গ ও অন্যশ্রুতিপ্রমাণ বর্ত্তমান থাকায় ছান্দোগ্যপঠিত 'অন্ন' শব্দ হইতে ব্রীহি প্রভৃতির জ্ঞান কি প্রকারে হইবে? লৌকিক প্রসিদ্ধিও উক্তপ্রকরণ প্রমাণাদির দ্বারা বাধিত হইতেছে। আর ঐ ছান্দোগ্য শ্রুতির বাক্যশেষও ভক্ষণীয় অন্ন পৃথিবী হইতে উৎপন্ন হওয়ায় তাহাকে দ্বার করিয়া পৃথিবীরই জল হইতে উৎপত্তি সূচনা করিতেছে, এইপ্রকার বুঝিতে হইবে। সেইহেতু এই পৃথিবীই অন্ন শব্দবাচ্য।

Sunday, 31 October 2021

গৌরীদশকম্

গৌরীদশকম্ অথবা গৌরী স্তুতিঃ

॥ শ্রীঃ ॥

লীলালব্ধস্থাপিতলুপ্তাখিললোকাং

লোকাতীতৈর্যোগিভিরন্তশ্চিরমৃগ্যাম্ ।

বালাদিত্যশ্রেণিসমানদ্যুতিপুঞ্জাং

গৌরীমমম্বামম্বুরুহাক্ষীমহমীড়ে ||১||

ভাবার্থ - যাঁর লীলা দ্বারাই নিখিল ভুবন লব্ধ ( প্রাপ্ত ) স্থাপিত ও লুপ্ত হয়, ( অর্থাৎ যাঁর লীলাতে সৃষ্টি-স্থিতি-সংহার হয়ে থাকে ) যিনি লোকাতীত যোগীগণ দ্বারা অন্তরে চিরকাল অন্বেষণযোগ্য ( অর্থাৎ লোকাতীত যোগীগণ যাঁকে চিরকাল হৃদয়ে অন্বেষণ বা চিন্তা করেন ) সেই উদয়কালীন সূর্যসমূহের সমান তেজঃপুঞ্জা, পদ্মলোচনা, মাতা গৌরীকে আমি স্তব করছি ||১||

প্রত্যাহারধ্যানসমাধিস্থিতিভাজাং

নিত্যং চিত্তে নির্বৃতিকাষ্ঠাং কলয়ন্তীম্ ।

সত্যজ্ঞানানন্দময়ীং তাং তনুরূপাং

গৌরীমম্বামম্বুরুহাক্ষীমহমীড়ে ||২||

ভাবার্থ - সর্বদা প্রত্যাহার, ধ্যান ও সমাধিতে অবস্থিত ব্যক্তিগণের চিত্তে নির্বৃতির পরম উৎকর্ষ আনয়নকারিণী, সত্য, জ্ঞান ও আনন্দময়ী, শরীরধারিণী ( যেন শরীরিণী ব্রহ্মরূপা ) পদ্মলোচনা, সেই মাতা গৌরীকে আমি স্তুতি করি ||২||

চন্দ্রাপীড়ানন্দিতমন্দস্মিতবক্ত্রাং

চন্দ্রাপীড়ালঙ্কৃতনীলালকভারাম্ ।

ইন্দ্রোপেন্দ্রাদ্যর্চিতপাদাম্বুজয়ুগ্মাং

গৌরীমম্বামম্বুরুহাক্ষীমহমীড়ে ||৩||

ভাবার্থ - চন্দ্রাপীড়ের ( শিবের ) সাহচর্য্য হেতু আনন্দিত ( অতএব ) ঈষৎ হাস্যযুক্ত বদনা, চন্দ্রস্বরূপ শিরোভূষণ দ্বারা শোভিত কৃষ্ণ অলকভার যুক্তা; ইন্দ্র, বিষ্ণু প্রভৃতি কর্তৃক পূজিত চরণকমলযুগল বিশিষ্টা, পদ্মলোচনা মাতা গৌরীকে আমি স্তুতি করছি ||৩||

আদিক্ষান্তামক্ষরমূর্ত্যা বিলসন্তীং

ভূতে ভূতে ভূতকদম্বপ্রসবিত্রীম্ ।

শব্দব্রহ্মানন্দময়ীং তাং তটিদাভাং

গৌরীমম্বামম্বুরুহাক্ষীমহমীড়ে ||৪||

ভাবার্থ - অক্ষর ( মাতৃকা ) রূপ মূর্তিতে শোভমানা ‘অ’কারাদি ‘ক্ষ’কারান্ত প্রতিভূতে ব্যবস্থানুসারে ভূতসমূহ-প্রসবকর্ত্রী, শব্দব্রহ্মানন্দময়ী, বিদ্যুৎসদৃশ বর্ণযুক্তা পদ্মলোচনা মাতা গৌরীকে আমি স্তুতি করছি ||৪||

মূলাধারাদুত্থিতবীথ্যা বিধিরন্ধ্রং

সৌরং চান্দ্রং ব্যাপ্য বিহারজ্বলিতাঙ্গীম্ ।

যেয়ং সূক্ষ্মাৎ সূক্ষ্মতনুস্তাং সুখরূপাং

গৌরীমম্বামম্বুরুহাক্ষীমহমীড়ে ||৫||

ভাবার্থ - যিনি সূক্ষ্ম হতেও সূক্ষ্মশরীরা, সেই মূলাধার হতে উত্থিত পথে ব্রহ্মরন্ধ্র সুখস্বরূপিণী, পদ্মলোচনা মাতা গৌরীকে আমি স্তুতি করছি ||৫||

নিত্যঃ শুদ্ধো নিষ্কল একো জগদীশঃ

সাক্ষী যস্যাঃ সর্গবিধৌ সংহরণে চ ।

বিশ্বত্রাণক্রীড়নলোলাং শিবপত্নীং

গৌরীমম্বামম্বুরুহাক্ষীমহমীড়ে ||৬||

ভাবার্থ - নিত্য নির্মল ( নির্লেপ ) অদ্বিতীয় জগদীশ্বর ( শিব ) যাঁর সৃষ্টি ও সংহার বিষয়ে সাক্ষী ( মাত্র ) থাকেন এবম্ভূতা, বিশ্বের ত্রাণরূপ ক্রীড়াতে অভিলাষবতী শিবপত্নী পদ্মলোচনা মাতা গৌরীকে আমি স্তুতি করছি ||৬||

যস্যাঃ কুক্ষৌ লীনমখণ্ডং জগদণ্ডং

ভূয়ো ভূয়ঃ প্রাদুরভূদুত্থিতমেব ।

পত্যা সার্ধং তাং রজতাদ্রৌ বিহরন্তীং

গৌরীমম্বামম্বুরুহাক্ষীমহমীড়ে ||৭||

ভাবার্থ - সমগ্র জগৎরূপ অণ্ড ( ডিম্ব ) যাঁর কুক্ষিদেশে লীন ( থেকেই ) পুনঃ পুনঃ উখিত হয়ে প্রাদুর্ভূত হয়েছিল, ( অর্থাৎ জগৎ বস্তুতঃ কোনঃ কালেই জগন্মাতার কুক্ষিচ্যুত হয় নাই। ওটা জগন্মাতাে কুক্ষিমধ্যে থেকেই পুনঃ পুনঃ প্রাদুর্ভূত হচ্ছে বলে মনে হয় মাত্র ) পতির সহিত কৈলাস পর্বতে বিহারকারিণী, সেই পদ্মলোচনা মাতা গৌরীকে আমি স্তুতি করছি ||৭||

যস্যামোতং প্রোতমশেষং মণিমালা-

সূত্রে যদ্বৎ ক্কাপি চরং চাপ্যচরং চ ।

তামধ্যাত্মজ্ঞানপদব্যা গমনীয়াং

গৌরীমম্বামম্বুরুহাক্ষীমহমীড়ে ||৮||

ভাবার্থ - কোনও মণিমালার সূত্রে যেমন ( মণিগুলি ওতপ্রোত থাকে ) তদ্রূপ যাঁতে নিখিল চরাচর ওতপ্রোত, অধ্যাত্ম জ্ঞান ( আত্মবিষয়ক জ্ঞান ) পথে প্রাপ্তব্যা সেই পদ্মলোচনা মাতা গৌরীকে আমি স্তুতি করছি ||৮||

নানাকারৈঃ শক্তিকদম্বৈর্ভুবনানি

ব্যাপ্য স্বৈরং ক্রীড়তি যেয়ং স্বয়মেকা ।

কল্যাণীং তাং কল্পলতামানতিভাজাং

গৌরীমম্বামম্বুরুহাক্ষীমহমীড়ে ||৯||

ভাবার্থ - যিনি একাকী নানাপ্রকার শক্তিসমূহের দ্বারা ভুবনসমূহের ব্যাপ্ত হয়ে স্বতন্ত্র ভাবে স্বয়ং ক্রীড়া করছেন, প্রণতজনের পক্ষে কল্পলতারূপিণী সেই পদ্মলোচনা মাতা গৌরীকে আমি স্তুতি করছি ||৯||

আশাপাশক্লেশবিনাশং বিদধানাং

পাদাম্ভোজধ্যানপরাণাং পুরুষাণাম্ ।

ঈশামীশার্ধাঙ্গহরাং তামভিরামাং

গৌরীমম্বামম্বুরুহাক্ষীমহমীড়ে ||১০||

ভাবার্থ - পদকমল ধ্যানপরায়ণ পুরুষগণের আশাপাশজনিত ক্লেশবিনাশকারিণী, সেই মনোজ্ঞা, শিবের অর্ধাঙ্গহারিণী, ঈশানী, পদ্মলোচনা মাতা গৌরীকে আমি স্তুতি করছি ||১০||

প্রাতঃকালে ভাববিশুদ্ধঃ প্রণিধানাৎ

ভক্ত্যা নিত্যং জল্পতি গৌরিদশকং যঃ ।

বাচাং সিদ্ধিং সম্পদমগ্র্যাং শিবভক্তিং

তস্যাবশ্যং পর্বতপুত্রী বিদধাতি ||১১||

ভাবার্থ - যে ভাববিশুদ্ধ হয়ে ( শুদ্ধ ভাবযুক্ত হয়ে ) সদা প্রাতঃকালে ভক্তি পূর্বক মনোযোগ সহকারে গৌরীদশক পাঠ করে, অবশ্যই পর্বতকন্যা ( পার্বতী ) তার বাকসিদ্ধি, শ্রেষ্ঠ সম্পদ ( ঐশ্বর্য্য ) শিবভক্তি বিধান করেন ||১১||

|| ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্যস্য শ্রীমচ্ছঙ্কর ভগবতঃ কৃতৌ গৌরীদশকম্ সম্পূর্ণম্ ||

ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্য শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য ভগবতঃ বিরচিত গৌরীদশক সমাপ্ত।

 

Friday, 22 October 2021

প্রৌঢ়ানুভূতি

 



।।।।।।প্রৌঢ়ানুভূতি।।।।।।

প্রৌঢপ্রৌঢনিজানুভূতিগলিতদ্বৈতেন্দ্রজালো গুরু-

র্গূঢং গূঢমঘৌঘদুষ্টকুধিয়াং স্পষ্টং সুধীশালিনাম্ ।

স্বান্তে সম্যগিহানুভূতমপি সচ্ছিশিষ্যাববোধায় ত-

ৎসত্যং সংস্মৃতবান্সমস্তজগতাং নৈজং নিজালোকনাৎ ॥ ১॥ 

যে সত্য আত্মস্বরূপ পাপরাশির দ্বারা কলুষিতবুদ্ধি ব্যক্তিগণের নিকট অত্যন্ত আবৃত, সুধীব্যক্তিদিগের স্পষ্ট প্রতিভাত অতি সুদৃঢ়ভাবে নিজস্বরূপের অনুভবের দ্বারা যাঁহার দ্বৈতরূপ ইন্দ্রজাল বিগলিত হইয়াছে এবংবিধ গুরু, আত্মসাক্ষাৎকার প্রভাবে সমস্ত জগতের নিজ পারমার্থিক স্বরূপ সেই সত্য অন্তঃকরণে সম্যক অনুভব করিলেও সৎ শিষ্যগণের অববোধের নিমিত্ত স্মরণ করিয়াছিলেন।।১।। 

দ্বৈতং ময়্যখিলং সমুত্থিতমিদং মিথ্যা মনঃকল্পিতং

তোয়ং তোয়বিবর্জিতে মরুতলে ভ্রান্ত্যৈব সিদ্ধং ন হি ।

যদ্যেবং খলু দৃশ্যমেতদখিলং নাহং ন বা তন্মম

প্রৌঢানন্দচিদেকসন্ময়বপুঃ শুদ্ধোঽস্ম্যখণ্ডোঽস্ম্যহম্ ॥ ২॥

মনের দ্বারা কল্পিত এই মিথ্যা সমস্ত দ্বৈত, আমাতে আবির্ভূত হইয়াছে জলবিহীন মরুভূমিতে ভ্রমবশতঃ কখন জল নিষ্পন্ন হয় না। যদি এইসমস্ত দৃশ্য বস্তু আমি নহি অথবা সেই সকল দৃশ্য আমার নহে, তথাপি আমি একমাত্র সৎ-চিৎ-আনন্দ অখণ্ড ব্রহ্মস্বরূপ।।২।।

দেহো নাহমচেতনোঽয়মনিশং কুড্যাদিবন্নিশ্চিতো

নাহং প্রাণময়োঽপি বা দৃতিধৃতো বায়ুর্যথা নিশ্চিতঃ ।

সোঽহং নাপি মনোময়ঃ কপিচলঃ কার্পণ্যদুষ্টো ন বা

বুদ্ধির্বুদ্ধকুবৃত্তিকেব কুহনা নাজ্ঞানমন্ধংতমঃ ॥ ৩॥ 

আমি কুড্য (স্তম্ভ) প্রভৃতির ন্যায় সর্ব্বদা অচেতন দেহ নহি, ইহা নিশ্চিত, আমি কর্ম্মকারের ভস্ত্রার (হাপরের) দ্বারা ধৃত (বদ্ধ) বায়ুর ন্যায় প্রাণময় নহি ইহাও নিশ্চিত। আমি বানরের ন্যায় চঞ্চল কাপর্ণ্যদুষ্ট মনোময় নহি, কিংবা বুদ্ধের কুৎসিতবৃত্তির ন্যায় কুহকময়ী বুদ্ধি (বিজ্ঞানময় কোষ) নহি, এবং আমি অন্ধকার-সদৃশ অজ্ঞানও (আনন্দময়কোষও) নহি।।৩।।

নাহং খাদিরপি স্ফুটং মরুতলভ্রাজৎপয়ঃসাম্যত-

স্তেভ্যো নিত্যবিলক্ষণোঽখিলদৃশিঃ সৌরপ্রকাশো যথা ।

দৃশ্যৈঃ সঙ্গবিবর্জিতো গগনবৎসম্পূর্ণরূপোঽস্ম্যহং

বস্তুস্থিত্যনুরোধতস্ত্বহমিদং বীচ্যাদি সিন্ধুর্যথা ॥ ৪॥

স্ফুটরূপে মরুভূমিতে প্রকাশমান, জলের তুল্য আকাশাদি আমি নহি, অর্থাৎ যেমন মরুভূমিতে জল বলিয়া যাহা লোকের ধারণা হয়, বাস্তবিক তাহা জল নহে, কিন্তু মিথ্যা, সেইরূপ আকাশাদিও মিথ্যা, আমি সেই আকাশাদি রূপ নহি; কারণ, আমি সৎস্বরূপ ব্রহ্ম। কিন্তু আমি আকাশাদি হইতে সতত বিলক্ষণস্বভাব সমস্ত বস্তুর দর্শনস্বরূপ; যেমন সূর্যের প্রকাশ, প্রকাশ্য ঘটাটি হইতে বিলক্ষণ। আমি আকাশের ন্যায় সঙ্গবিহীন ও সম্পূর্ণ-স্বরূপ, বাস্তবিকপক্ষে এই সমস্ত বস্তু আমি অর্থাৎ আমাতে আরোপিত; যেমন সমুদ্রে তরঙ্গ, ফেন, বুদ্বুদপ্রভৃতি আরোপিত।।৪।।

নির্দ্বৈতোঽস্ম্যহমস্মি নির্মলচিদাকাশোঽস্মি পূর্ণোঽস্ম্যহং

নির্দেহোঽস্মি নিরিন্দ্রিয়োঽস্মি নিতরাং নিষ্প্রাণবর্গোঽস্ম্যহম্ ।

নির্মুক্তাশুভমানসোঽস্মি বিগলদ্বিজ্ঞানকোশোঽস্ম্যহং

নির্মায়োঽস্মি নিরন্তরোঽস্মি বিপুলপ্রৌঢপ্রকাশোঽস্ম্যহম্ ॥ ৫॥ 

আমি অদ্বৈতস্বরূপ, আমি নির্মলচিদাকাশ, আমি পরিপূর্ণস্বভাব, আমি দেহ, ইন্দ্রিয় ও প্রাণপঞ্চক হইতে অত্যন্ত ভিন্ন, আমি অশুভমনোবিহীন, বিজ্ঞানময়কোশশূন্য, মায়াবিরহিত, আমার কোন অন্তর নাই, আমি বিশালগাঢ়প্রকাশস্বরূপ।। ৫।।

মত্তোঽন্যন্ন হি কিংচিদস্তি যদি চিদ্ভাস্যং ততস্তন্মৃষা

গুঞ্জাবহ্নিবদেব সর্বকলনাধিষ্ঠানভূতোঽস্ম্যহম্ ।

সর্বস্যাপি দৃগস্ম্যহং সমরসঃ শান্তোঽস্ম্যপাপোঽস্ম্যহং

পূর্ণোঽস্মি দ্বয়বর্জিতোঽস্মি বিপুলাকাশোঽস্মি নিত্যোঽস্ম্যহম্ ॥ ৬॥ 

আমি ভিন্ন অপর কোন বস্তু নাই, যদি থাকে তবে তাহা চৈতন্যপ্রকাশ্য, অতএব তাহা গুঞ্জাতে (কূঁচ) আরোপিত অগ্নির ন্যায় মিথ্যা, আমি সমস্ত বস্তুর কল্পনার অধিষ্ঠানরূপ। আমি সমস্ত বস্তুর দ্রষ্টা, সমরস (একরূপসার) ও শান্ত, আমার কোন পাপ নাই, আমি পূর্ণ, দ্বৈতরহিত, বিশাল আকাশস্বরূপ ও নিত্য।।৬।। 

ময়্যস্মিন্পরমার্থকে শ্রুতিশিরোবেদ্যে স্বতো ভাসনে

কা বা বিপ্রতিপত্তিরেতদখিলং ভাত্যেব যৎসংনিধেঃ ।

সৌরালোকবশাৎপ্রতীতমখিলং পশ্যন্ন তস্মিঞ্জনঃ

সংদিগ্ধোঽস্ত্যত এব কেবলশিবঃ কোঽপি প্রকাশোঽস্ম্যহম্ ॥ ৭॥

যাঁহার সন্নিধানবশতঃ এই সমুদায় বস্তু প্রকাশ থাকে। সেই পরমার্থভূত, বেদান্তবেদ্য, স্বতঃপ্রকাশ আমাতে বিপ্রতিপত্তি (বিরুদ্ধজ্ঞান) কিরূপ থাকিবে? লোক সূর্য্যালোকে দীপ্ত সমস্ত বস্তু দেখিয়া সেই সূর্যালোকে সন্ধিগ্ধ হয় না। অতএব আমি কেবল শিব, কোন এক প্রকাশস্বরূপ।।৭।। 

নিত্যস্ফূর্তিময়োঽস্মি নির্মলসদাকাশোঽস্মি শান্তোঽস্ম্যহং

নিত্যানন্দময়োঽস্মি নির্গতমহামোহান্ধকারোঽস্ম্যহম্ ।

বিজ্ঞাতং পরমার্থতত্ত্বমখিলং নৈজং নিরস্তাশুভং

মুক্তপ্রাপ্যমপাস্তভেদকলনাকৈবল্যসংজ্ঞোঽস্ম্যহম্ ॥ ৮॥ 

আমি সততপ্রকাশস্বরূপ, নির্মলসদাকাশরূপ, শান্ত ও নিত্য আনন্দস্বরূপ, আমা হইতে মহামোহরূপ, অন্ধকার দূরীভূত হইয়াছে; যেখানে সমস্ত অমঙ্গল অপসৃত, যাহা মুক্তগণের প্রাপ্ত ঈদৃশ নিজের সম্পূর্ণ পরমার্থস্বরূপ অবগত হইয়াছি। অতএব আমি অভেদজ্ঞান লাভ করায় কেবলস্বরূপ।।৮।।

স্বাপ্নদ্বৈতবদেব জাগ্রতমপি দ্বৈতং মনোমাত্রকং

মিথ্যেত্যেব বিহায় সচ্চিদমলস্বান্তৈকরূপোঽস্ম্যহম্ ।

যদ্বা বেদ্যমশেষমেতদনিশং মদ্রূপমেবেত্যপি

জ্ঞাত্বা ত্যক্তমরুন্মহোদধিরিব প্রৌঢো গভীরোঽস্ম্যহম্ ॥ ৯॥

আমি স্বপ্নাবস্থায় অনুভূত দ্বৈতের নয় জাগ্রদবস্থায় দ্বৈত মনঃকল্পিত অতএব মিথ্যা জানিয়া সচ্চিদানন্দস্বরূপে অবস্থান করি। এই সমুদায় জ্ঞেয় বস্তু সর্ব্বদা মৎস্বরূপ—ইহা জানিয়া আমি বায়ুবিহীন মহাসমুদ্রের ন্যায় অচল ও গম্ভীর আছি ।।৯।।

গন্তব্যং কিমিহাস্তি সর্বপরিপূর্ণস্যাপ্যখণ্ডাকৃতেঃ

কর্তব্যং কিমিহাস্তি নিষ্ক্রিয়তনোর্মোক্ষৈকরূপস্য মে ।

নির্দ্বৈতস্য ন হেয়মন্যদপি বা নো বাপ্যুপেয়ান্তরং

শান্তোঽদ্যাস্মি বিমুক্ততোয়বিমলো মেঘো যথা নির্মলঃ ॥ ১০॥

আমি সকল বস্তুতে পরিপূর্ণভাবে বিরাজমান আছি ও অখন্ডস্বরূপ, আমার এই সংসারে গন্তব্য কি কিছু আছে ? আমি নিষ্ক্রিয়মূর্ত্তি ও একমাত্র মোক্ষস্বরূপ, আমার এখানে কি কোনরূপ কর্ত্তব্য আছে ? আমার ত্যাজ্য বা গ্রাহ্য কোন বস্তু নাই? আমি এখন জলনির্ম্মুক্ত নির্ম্মল মেঘের ন্যায় শান্তস্বভাব ।।১০।।

কিং ন প্রাপ্তমিতঃ পুরা কিমধুনা লব্ধং বিচারাদিনা

যস্মাত্তৎসুখরূপমেব সতত্তং জাজ্বল্যমানোঽস্ম্যহম্ ।

কিং বাপেক্ষ্যমিহাপি ময়্যতিতরাং মিথ্যাবিচারাদিকং

দ্বৈতাদ্বৈতবিবর্জিতে সমরসে মৌনং পরং সম্মতম্ ॥ ১১॥

ইতঃ পূর্ব্বে আমি বিচারাদির দ্বারা কোন্ বস্তু প্রাপ্ত হইয়াছি ? আর অধুনাই বা কি প্রাপ্ত হইতেছি ? যেহেতু আমি সুখস্বরূপ এবং সর্ব্বদা প্রকাশস্বরূপ দ্বৈত ও অদ্বৈতবিহীন সমরস (তুল্যরূপ) আমাতে অতিশয় অপেক্ষিত মিথ্যা বিচারাদিই বা কি হইবে ? সুতরাং মৌনই একমাত্র সম্মত ।।১১।।

শ্রোতব্যং চ কিমস্তি পূর্ণসুদৃশো মিথ্যাপরোক্ষস্য মে

মন্তব্যং চ ন মেঽস্তি কিংচিদপি বা নিঃসংশয়জ্যোতিষঃ ।

ধ্যাতৃধ্যেয়বিভেদহানিবপুষো ন ধ্যেয়মস্ত্যেব মে

সর্বাত্মৈকমহারসস্য সততং নো বা সমাধির্মম ॥ ১২॥

পরিপূর্ণ দ্রষ্টৃ স্বরূপ ব্রহ্ম ভিন্ন বস্তুর মিথ্যাত্বদ্রষ্টা আমার কি শ্রোতব্য আছে ? নিঃসন্দিগ্ধপ্রকাশস্বরূপ আমার কিছু মননের নাই। আমি ধ্যাতৃ, ধ্যেয়প্রভৃতিবিহীন, আমার কোন ধ্যানের বস্তু নাই। সর্ব্বদা সমস্ত বস্তুই আত্মার স্বরূপ ইহা যিনি সার ভাবিয়াছেন, এবংবিধ আমার কোন সমাধি নাই ।।১২।।

আত্মানাত্মবিবেচনাপি মম নো বিদ্বৎকৃতা রোচতে-

ঽনাত্মা নাস্তি যদস্তি গোচরবপুঃ কো বা বিবেক্তুং ক্ষমী ।

মিথ্যাবাদবিচারচিন্তনমহো কুর্বন্ত্যদৃষ্টাত্মকা

ভ্রান্তা এব ন পারগা দৃঢধিয়স্তূষ্ণীং শিলাবৎস্থিতঃ ॥ ১৩॥

বিদ্বদগণ যে আত্মা ও অনাত্মার বিবেক করিয়াছেন, তাহাতে আমার কোন রুচি নাই, অনাত্মা বলিয়া কোন বস্তু নাই, যা আছে তাহা প্রত্যক্ষশরীর আত্মাই। সুতরাং আত্মা ও অনাত্মার বিবেক করিতে কে সমর্থ ? যাহারা আত্মদর্শন করে নাই, হায় ! তাহারা মিথ্যা বাদবিচার চিন্তা করিয়া থাকে। তাহারা ভ্রান্তই, সংসারপরগামী নহে, এ জন্য দৃঢ়চিত্ত ব্যক্তিগণ প্রস্তরের ন্যায় নীরবে অবস্থান করিয়া থাকেন ।।১৩।।

বস্তুস্থিত্যনুরোধতস্ত্বহমহো কশ্চিৎপদার্থো ন চা-

প্যেবং কোঽপি বিভামি সংততদৃশী বাঙ্মানসাগোচরঃ ।

নিষ্পাপোঽস্ম্যভয়োঽস্ম্যহং বিগতদুঃশঙ্কাকলঙ্কোঽস্ম্যহং

সংশান্তানুপমানশীতলমহঃপ্রৌঢপ্রকাশোঽস্ম্যহম্ ॥ ১৪॥

বাস্তবিকপক্ষে ‘আমি’ এইরূপ কোন পদার্থ নাই, কিন্তু আমি সর্ব্বদা দৃক্-স্বরূপ, বাক ও মনের অবিষয় হইয়া প্রকাশ পাইতেছি। আমি পাপরহিত, অভয়, আমাতে দুঃখশঙ্কারূপ কলঙ্ক দূরীভূত হইয়াছে। আমি সম্যকশান্তস্বরূপ উপমারহিত শীতলতেজের (চন্দ্রের) ন্যায় প্রবৃদ্ধ-প্রকাশস্বরূপ ।।১৪।।

 যোঽহং পূর্বমিতঃ প্রশান্তকলনাশুদ্ধোঽস্মি বুদ্ধোঽস্ম্যহং

যস্মান্মত্ত ইদং সমুত্থিতমভূদেতন্ময়া ধার্যতে ।

ময়্যেব প্রলয়ং প্রয়াতি নিরধিষ্ঠানায় তস্মৈ সদা

সত্যানন্দচিদাত্মকায় বিপুলপ্রজ্ঞায় মহ্যং নমঃ ॥ ১৫॥

যে আমি ইহার পূর্ব্বে ভেদজ্ঞান দূর হওয়ায় শুদ্ধ, বুদ্ধস্বরূপ হইয়াছি, যেহেতু এই সমস্ত জগৎ আমা হইতে উত্থিত হইয়াছে। এই জগৎ আমা-কর্ত্তৃক ধৃত হইতেছে, আমাতে লয় প্রাপ্ত হয়। সেই অধিষ্ঠানশূন্য বিপুল জ্ঞানরূপ সচ্চিদানন্দস্বরূপ আমার (আত্মার) উদ্দেশ্যে সর্ব্বদা নমস্কার ।।১৫।।

সত্তাচিৎসুখরূপমস্তি সততং নাহং চ ন ত্বং মৃষা

নেদং বাপি জগৎপ্রদৃষ্টমখিলং নাস্তীতি জানীহি ভো ।

যৎপ্রোক্তং করুণাবশাত্ত্বয়ি ময়া তৎসত্যমেতৎস্ফুটং

শ্রদ্ধৎস্বানঘ শুদ্ধবুদ্ধিরসি চেন্মাত্রাস্তু তে সংশয়ঃ ॥ ১৬॥

আমি সতত সচ্চিদানন্দস্বরূপ, আমি, তুমি, এইরূপ ভেদ নাই, কারণ— ইহা মিথ্যা। প্রত্যক্ষদৃষ্ট এই সমস্ত জগৎ মিথ্যা, হে বৎস ! এই জগৎ স্বরূপতঃ নেই বলিয়া জানিও। হে নিষ্পাপ ! আমার উপদেশে শ্রদ্ধাবান হও, যদি তোমার বুদ্ধি নির্ম্মল হইয়া থাকে, তাহা হইলে এ বিষয়ে তোমার সন্দেহ হইবে না ।।১৬।।

স্বারস্যৈকসুবোধচারুমনসে প্রৌঢানুভূতিস্ত্বিয়ং

দাতব্যা ন তু মোহদুগ্ধকুধিয়ে দুষ্টান্তরঙ্গায় চ ।

যেয়ং রম্যবিদর্পিতোত্তমশিরঃ প্রাপ্তা চকাস্তি স্বয়ং

সা চেন্মর্কটহস্তদেশপতিতা কিং রাজতে কেতকী ॥ ১৭॥ 

 এই প্রৌঢ় অনুভূতি (পরাকাষ্ঠাপ্রাপ্ত আত্মজ্ঞান) স্বভাবতঃ তত্ত্বজ্ঞানের দ্বারা শুদ্ধচিত্ত ব্যক্তিকে প্রদান করিবে, মোহকলুষিতচিত্ত, দুষ্টসঙ্গ ব্যক্তিকে দিবে না। কেতকীপুষ্প, রমণীয়তাজ্ঞ ব্যক্তি মস্তকে ধারণ করিলে যেরূপ শোভা পায়, তাহা যদি বানরের হস্তে পতিত হয়, তাহা হইলে কি সেইরূপ শোভা পায় ।।১৭।।

ইতি শ্রীমৎপরমহংসপরিব্রাজকাচার্যস্য শ্রীগোবিন্দভগবৎপূজ্যপাদশিষ্যস্য

শ্রীমচ্ছঙ্করভগবতঃ কৃতৌ প্রৌঢানুভূতিঃ সম্পূর্ণা ॥

ইতি শঙ্করাচার্য বিরচিত প্রৌঢ়ানুভূতিঃ সমাপ্ত।


Tuesday, 28 September 2021

শ্রবণেন্দ্রিয়ের দ্বারা যাঁহাকে কেহ শ্রবণ করিতে পারে না, পক্ষান্তরে যাঁহার নিমিত্ত শ্রবণেন্দ্রিয় সক্রিয় হয় তিনিই ব্রহ্মঃ-

 


সামবেদীয় কেন উপনিষদের প্রথম খণ্ডে- বর্ণিত আছে-

যচ্ছ্রোত্রেণ ন শৃণোতি যেন শ্রোত্রমিদং শ্রুতম্। তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি ....৭

ভগবান শঙ্করাচার্য ভাষ্যে বলিতেছেন- "মনের বৃত্তিদ্বারা সংযুক্ত ও দিগ্দেবতাপরিচালিত আকাশের কার্য শ্রোত্রেন্দ্রিয় দ্বারা লোকে যাঁহাকে (যে ব্রহ্মকে) শুনিতে পায় না অর্থাৎ বিষয়ীভূত বা প্রকাশ করিতে পারে না, পরন্তু যাঁহার দ্বারা অর্থাৎ চৈতন্যস্বরূপ আত্মজ্যোতির দ্বারাই এই লোক প্রসিদ্ধ শ্রোত্রেন্দ্রিয় শ্রুত অর্থাৎ প্রকাশিত হয়। তাহাকেই তুমি ব্রহ্ম বলিয়া জানিবে।"

প্রত্যেক ইন্দ্রিয়ের এক একজন অধিষ্ঠাত্রী দেবতা আছেন। শ্রোত্রেন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা হইতেছেন দিগ্দেবতা। ইন্দ্রিয়াধিষ্ঠাত্রী এই সকল দেবতাকর্তৃক পরিচালিত হইয়া ইন্দ্রিয়সকল কার্য করে। তবে এই শ্রোত্রেন্দ্রিয়ের শব্দ গ্রহণের ক্ষমতা কিন্তু আত্মচৈতন্যের সন্নিধিবশতঃই হইয়া থাকে। কিন্তু শ্রোত্রেন্দ্রিয় ব্রহ্মকে গ্রহণ করিতে পারেনা।

Saturday, 25 September 2021

তেজোপাধিক (-তেজোভাবাপন্ন) ব্রহ্ম হইতে জলোৎপত্তিঃ-

 


অদ্বৈতবেদান্তে সৃষ্টিক্রম বিষয়ক ধারাবাহিক আলোচনায় আজকের বিচার্য বিষয় জলোৎপত্তি। পূর্বাধিকরণে তেজের বায়ু হইতে উৎপত্তি কথিত হইয়াছে। এক্ষণে বেদান্তমীমাংসা শাাস্ত্রের অবধিকরণম্ এ ভগবান্ সূত্রকার বাদরায়ণ বলিতেছেন-

আপঃ ৷৷ ব্রহ্মসূত্র ২.৩.১১৷৷

ভগবান ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য্য ভাষ্য করিতেছেন-জল তেজঃ হইতে উৎপন্ন হয়। কিন্তু বহ্নি ও জলের বিরোধ থাকায় কোন হেতুবলে বলিতেছ? উত্তর-যেহেতু

'তদপোসৃজত'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬।২।৩)

"তিনি (-সেই তেজোপাধিক সৎ) জলকে সৃষ্টি করিলেন"

'অগ্নেঃ আপঃ'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২।১)

"অগ্নি হইতে জল উৎপন্ন হইল", ইত্যাদি শ্রুতি সেইপ্রকার বলিতেছেন। এইরূপ বচন থাকায় সংশয় হয় না; তেজের সৃষ্টিকে ব্যাখ্যা করিয়া পৃথিবীর ব্যাখ্যা করিতে প্রবৃত্ত ভগবান্ সূত্রকার জলকে মধ্যবর্ত্তী (-তেজঃ ও ক্ষিতির উৎপত্তির মধ্যে জলোৎপত্তিকে নিবিষ্ট) করিতেছি এইপ্রকার 'চিন্তা করিয়া' "আপঃ", এইসূত্রটী রচনা করিয়াছেন।......

 

Friday, 3 September 2021

বায়ুভাবাপন্ন ব্রহ্ম হইতে তেজোৎপত্তিঃ-

 


অদ্বৈতবেদান্তে সৃষ্টিক্রম বিষয়ক আলোচনায় তেজোৎপত্তি বিষয়ক বাক্যসকল আজকের বিচার্য্য বিষয়। ছান্দোগ্যে (৬.২.৩) সৎস্বরূপ ব্রহ্ম হইতে তেজের উৎপত্তি শ্রাবিত হইয়াছে, তৈত্তিরীয়কে (২.১) কিন্তু বায়ু হইতে তেজের উৎপত্তি শ্রাবিত হইয়াছে। এইস্থলে একবাক্যতার সম্ভাবনা বা অসম্ভাবনাবশতঃ সংশয় হয়-বহ্নি ব্রহ্ম হইতে উৎপন্ন হয়, অথবা ব্রহ্মসংযুক্ত বায়ু হইতে?

ভগবান্ সূত্রকার বাদরায়ণ সিদ্ধান্ত করিতেছেন-

তেজোতস্তথাহ্যাহ ৷৷ ব্রহ্মসূত্র ২.৩.১০৷৷

ভগবান্ ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য্য ভাষ্য করিতেছেন-এইপ্রকার শঙ্কা প্রাপ্ত হইলে কথিত হইতেছে-তেজঃ ইহা হইতে, অর্থাৎ বায়ু হইতে উৎপন্ন হয়। তাহাতে প্রমাণ কি? যেহেতু শ্রুতি সেইপ্রকারই বলেন, যথা-

'বায়োরগ্নিঃ'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২।১)

'বায়ু হইতে অগ্নি উৎপন্ন হইল', ইত্যাদি।

তেজঃ অব্যবহিত ব্রহ্মজ (-সাক্ষাৎভাবে ব্রহ্ম হইতে উৎপন্ন) হইলে, বায়ু হইতে উৎপন্ন না হইলে এই শ্রুতি কদর্থিতা হইয়া পড়িবে। ....

এখন যদি বলা হয়, অন্য শ্রুতিও তেজের ব্রহ্ম হইতে উৎপত্তি বোধ করাইতেছে, যথা-

'তত্তেজোসৃজত'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬.২.৩)

'তিনি তেজকে সৃষ্টি করিলেন।'

তাহা হইলে তো শ্রুতি বিরোধ হইয়া পড়িবে। তদুত্তরে সিদ্ধান্তী বলিতেছেন-না তাহা হয় না, যেহেতু পারম্পর্য্য (-পরম্পরাভাবে ব্রহ্ম হইতে উৎপন্ন) হইলেও এইশ্রুতির বিরোধ হয় না। যেহেতু যখন 'আকাশ ও বায়ু সৃষ্টি করিয়া বায়ুভাবাপন্ন (-বায়ুরূপ উপাধিযুক্ত) ব্রহ্ম তেজকে সৃষ্টি করিলেন', এইপ্রকার কল্পনা করা হয়, তখনও তেজের ব্রহ্ম হইতে উৎপত্তি বিরোধগ্রস্ত হয় না। যেমন উষ্ণ দুগ্ধ গাভীর সাক্ষাৎ কার্য্য, দধি তাহার পরম্পরাপ্রাপ্ত কার্য্য, ছানা তাহার আরও ব্যবহিত কার্য্য, ইত্যাদি সকল স্থলে গাভীকেই কারণরূপে অঙ্গীকার করা হয়। আর ব্রহ্ম আকাশাদি কার্য্যরূপেও অবস্থান করেন, ইহা-

'তদাত্মানম্ স্বয়ম্ অকুরুত'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২।৭)

'তিনি নিজেই নিজেকে নাম ও রূপের দ্বারা অভিব্যক্ত করিয়াছিলেন' ইত্যাদি শ্রুতি প্রদর্শন করিতেছেন।

আর সেইপ্রকার ঈশ্বরস্মরণও (ঈশ্বর শ্রীকৃষ্ণের উক্তিরূপা স্মৃতিও) আছে, যথা-

বুদ্ধির্জ্ঞানমসংমোহঃ ক্ষমা সত্যং দমঃ শমঃ ৷

সুখং দুঃখং ভবোভাবো ভযং চাভযমেব চ ৷৷

অহিংসা সমতা তুষ্টিস্তপো দানং যশোযশঃ৷

ভবন্তি ভাবা ভূতানাং মত্ত এব পৃথগ্বিধাঃ৷৷-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, বিভূতিযোগ-৪,৫)

'অন্তঃকরণের সুক্ষ্মবিষয়ে বোধসামর্থ, আত্মাদি পদার্থের জ্ঞান, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, ক্ষমা, সত্য, বাহ্যেন্দ্রিয় ও অন্তরিন্দ্রিয়ের সংযম, সুখ, দুঃখ, জন্ম, মৃত্যু, ভয়, অভয়, অহিংসা, সমচিত্ততা, সন্তোষ, তপস্যা, দান, ধর্মনিমিত্ত কীর্তি ও অধর্মর্নিমিত্ত অকীর্তি - এইসকল ভিন্ন ভিন্ন ভাব প্রাণীগণের স্ব স্ব কর্মানুসারে আমা হইতেই উৎপন্ন হয়।'

যদিও বুদ্ধি প্রভৃতিকে স্ব স্ব কারণ হইতে উৎপন্ন হইতে প্রত্যক্ষভাবে দেখা যাইতেছে, তাহা হইলেও সকল ভাব পদার্থ সাক্ষাৎ, অথবা পরম্পরাভাবে ঈশ্বরের বংশে জাত হওয়ায় 'আমা হইতে উৎপন্ন' এইপ্রকার উক্তি কখনও অসঙ্গত নহে।

এইভাবে ব্রহ্ম হইতে সাক্ষাৎ অথবা পরম্পরাভাবে উৎপত্তি অঙ্গীকারের দ্বারা যেসকল শ্রুতিতে সৃষ্টির ক্রম বর্ণিত হয় নাই, তাহারা ব্যাখ্যাত হইলে তাহাদের সকলপ্রকার যুক্তিযুক্ততা সিদ্ধ হয়। কিন্তু যেসকল শ্রুতিতে ক্রমবিশিষ্ট সৃষ্টি বর্ণিত হইয়াছে, তাহাদের অন্যপ্রকারে (-পারম্পর্য্য অঙ্গীকার না করিয়া) উপপত্তি হয় না বলিয়া 'উক্তপ্রকারে ব্যাখ্যা করা যায় না'। 'একবিজ্ঞানে সর্ববিজ্ঞান' বিষয়ক প্রতিজ্ঞাও সৎস্বরূপ ব্রহ্মের বংশে উৎপত্তিমাত্রকে অপেক্ষা করে, কিন্তু ব্রহ্ম হইতে অব্যবহিতভাবে উৎপত্তিকে অপেক্ষা করে না, অতএব শ্রুতিবাক্যসকলের মধ্যে বিরোধ নাই।....

 

Thursday, 2 September 2021

স্বরূপানুসন্ধানাষ্টকম্ বিজ্ঞাননৌকা

 


তপোয়জ্ঞদানাদিভিঃ শুদ্ধবুদ্ধি-

র্বিরক্তো নৃপাদৌ পদে তুচ্ছবুদ্ধ্যা ।

পরিত্যজ্য সর্বং যদাপ্নোতি তত্ত্বং

পরং ব্রহ্ম নিত্যং তদেবাহমস্মি ||১||

ভাবার্থ - তপ ও যজ্ঞদানাদি দ্বারা শুদ্ধবুদ্ধি ও রাজপদ ইত্যাদিকে তুচ্ছ বিবেচনা করে আসক্তিহীন হয়ে সমস্ত পরিত্যাগ পূর্বক যে স্বরূপ তত্ত্বপদ প্রাপ্ত হওয়া যায়, সেই তত্ত্বপদস্বরূপ নিত্য পরব্রহ্মদেব আমি ||১||

দয়ালুং গুরুং ব্রহ্মনিষ্ঠং প্রশান্তং

সমারাধ্য তক্ত্যা বিচার্য স্বরূপম্ ।

যদাপ্নোতি তত্ত্বং নিদিধ্যাস বিদ্বান্-

পরং ব্রহ্ম নিত্যং তদেবাহমস্মি ||২||

ভাবার্থ - ভক্তিপূর্বক দয়ালু প্রশান্ত ব্রহ্মনিষ্ঠ গুরুর আরাধনা, স্বরূপ বিচার এবং নিদিধ্যাসন (ধ্যানের) দ্বারা বিদ্বান ব্যক্তি যে স্বরূপ তত্ত্বপদ প্রাপ্ত হন, সেই তত্ত্বপদস্বরূপ নিত্য পরব্রহ্ম দেব আমি ||২||

যদানন্দরূপং প্রকাশস্বরূপং

নিরস্তপ্রপঞ্চং পরিচ্ছেদহীনম্ ।

অহংব্রহ্মবৃত্ত্যৈকগম্যং তুরীয়ং

পরং ব্রহ্ম নিত্যং তদেবাহমস্মি ||৩||

ভাবার্থ - যিনি আনন্দস্বরূপ স্বপ্রকাশ, যার অংশ কল্পনা করা যায় না, যাকে জগৎপ্রপঞ্চ স্পর্শ করতে পারে না, জাগ্রত-স্বপ্ন-সুষুপ্ত্যাদি তিন অবস্থার অতীত এবং 'আমি ব্রহ্ম' এই একমাত্র তত্ত্ববৃত্তি দ্বারা যাকে প্রাপ্ত হওয়া যায়, সেই নিত্য পরব্রহ্ম দেব আমি ||৩||

যদজ্ঞানতো ভাতি বিশ্বং সমস্তং

বিনষ্টং স চাপি যদাত্মপ্রবোধে ।

মনোবাগতীতং বিশুদ্ধং বিমুক্তং

পরং ব্রহ্ম নিত্যং তদেবাহমস্মি ||৪||

ভাবার্থ - যে আত্মজ্ঞান অভাবে সমস্ত জগতের অস্তিত্ব প্রতীয়মান হয় এবং যে আত্মজ্ঞান উৎপন্ন হলে জগতের অস্তিত্ব উপলব্ধি হয় না, সেই আত্মজ্ঞান স্বরূপ শুদ্ধ, মুক্ত, মন ও বাক্যের অতীত নিত্য পরব্রহ্ম দেব আমি ||৪||

নিষেধে কৃতে নেতি নেতীতি বাক্যে

সমাধিস্থিতানাং যদাভাতি পূর্ণম্ ।

অবস্থাত্রয়াতীতমদ্বৈতমেকং

পরং ব্রহ্ম নিত্যং তদেবাহমস্মি ||৫||

ভাবার্থ - 'এ ব্রহ্ম নয়, এ ব্রহ্ম নয়,' এইরূপ উপনিষদুক্ত নিষেধ নির্ধারণ দ্বারা ব্রহ্মপদার্থ নির্ধারণকারী সমাধিমগ্ন ঋষিদের প্রজ্ঞায় যিনি পূর্ণরূপে প্রতীয়মান হয়, যিনি এক, অদ্বিতীয় এবং জাগ্রত, স্বপ্ন, সুষুপ্তি এই তিন অবস্থার অতীত, সেই নিত্য পরব্রহ্ম দেব আমি ||৫||

যদানন্দলেশৈঃ সদানন্দি বিশ্বং

যদাভাতি সত্ত্বে তদাভাতি সর্বম্ ।

যদালোচনে হেমমন্যৎ সমস্তং

পরং ব্রহ্ম নিত্যং তদেবাহমস্মি ||৬||

ভাবার্থ - যার আনন্দ কণামাত্রে সমস্ত বিশ্ব আনন্দময়, যিনি আত্মায় প্রকাশিত, যার সত্তায় সমস্ত প্রকাশ এবং যে স্থানে সমস্তই হেমময় উজ্জ্বল জ্যোতিঃ স্বরূপ, সেই নিত্য পরমব্রহ্ম দেব আমি ||৬||

অনন্তং বিভুং নির্বিকল্পং নিরীহং

শিবং সঙ্গহীনং যদোঙ্কারগম্যম্ ।

নিরাকারমত্যুজ্জ্বলং মৃত্যুহীনং

পরং ব্রহ্ম নিত্যং তদেবাহমস্মি ||৭||

ভাবার্থ - যিনি অনন্ত, বিভু এবং সর্বযোনি অথচ সর্বচেষ্টা রহিত শিব, নিঃসঙ্গ আর যিনি ওঙ্কার ( প্রণবের ) গম্য, নিরাকার, অতিশয় উজ্জ্বল ও মৃত্যুহীন, সেই পরব্রহ্ম দেব আমি ||৭||

যদানন্দ সিন্ধৌ নিমগ্নঃ পুমান্

স্যাদ্বিদ্যাবিলাসঃ সমস্তপ্রপঞ্চঃ ।

তদা নঃ স্ফুরত্যদ্ভুতং যন্নিমিত্তং

পরং ব্রহ্ম নিত্যং তদেবাহমস্মি ||৮||

ভাবার্থ - যে আনন্দসাগরে সিদ্ধপুরুষগণ নিমগ্ন হলেন যার প্রভায় এই অদ্ভুত অবিদ্যাবিলাস প্রপঞ্চ প্রকাশ প্রাপ্ত হয় না, সেই পরব্রহ্ম দেব আমি ||৮||

স্বরূপানুসন্ধানরূপাং স্তুতিং যঃ

পঠেদাদরাদ্ভক্তিভাবো মনুষ্যঃ ।

শৃণোতি বা নিত্যং মদ্যক্তচিত্তো

ভবেদ্বিষ্ণুরত্রৈব বেদপ্রমাণাৎ ||৯||

ভাবার্থ - স্বরূপ অনুসন্ধানে যিনি তুরীয় অর্থাৎ চতুর্থাবস্থা প্রাপ্ত, আর যে মনুষ্য সাদরে ও ভক্তিপূর্বক এ পাঠ করেন এবং নিত্য বিষ্ণুরত চিত্তে শ্রবণ করে, তিনিও বিষ্ণুস্বরূপ হন, এ বেদের প্রমাণ ||৯||

|| ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্যস্য শ্রীমচ্ছঙ্কর ভগবতঃ কৃতৌ স্বরূপানুসন্ধানাষ্টকং বিজ্ঞাননৌকা  সম্পূর্ণম্ ||

ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্য শ্রীমদ শঙ্করাচার্য বিরচিত স্বরূপানুসন্ধানাষ্টকং বিজ্ঞাননৌকা সমাপ্ত।

 

শ্রীকৃষ্ণাষ্টকং শ্রীকৃষ্ণতাণ্ডবস্তোত্রং

 


নিত্যানন্দৈকরসং সচ্চিন্মাত্রং স্বয়ঞ্জ্যোতিঃ ।

পুরুষোত্তমমজমীশং বন্দে শ্রীযাদবাধীশম্ ॥

নিত্যানন্দ, একরস, সৎচিৎ মাত্র, স্বয়ংজ্যোতি, পুরুষোত্তম, অজাত ঈশ্বর, যাদবাধীশকে বন্দনা করি।

যত্র গায়ন্তি মদ্ভক্তাঃ তত্র তিষ্ঠামি নারদ ।

শ্রীকৃষ্ণাষ্টকম্

ভজে ব্রজৈকমণ্ডনং সমস্তপাপখণ্ডনং

স্বভক্তচিত্তরঞ্জনং সদৈব নন্দনন্দনম্ ।

সুপিচ্ছগুচ্ছমস্তকং সুনাদবেণুহস্তকং

অনঙ্গরঙ্গসাগরং নমামি কৃষ্ণনাগরম্ ||১||

ভাবার্থ - ব্ৰজমণ্ডলের একমাত্র অলঙ্কারস্বরূপ, সমস্ত পাপখণ্ডনকারী, নিজভক্তগণের চিত্তরঞ্জনকারী, নন্দনন্দনকে সর্বদা ভজনা করি; সুন্দর ময়ূরপুচ্ছশােভিত মস্তকবিশিষ্ট, সুস্বর বেণুযুক্তহস্তবিশিষ্ট, অনঙ্গরঙ্গের সাগরস্বরূপ, নাগর শ্রীকৃষ্ণকে প্রণাম করি ||১||

মনোজগর্বমোচনং বিশাললোললোচনং

বিধূতগোপশোচনং নমামি পদ্মলোচনম্ ।

করারবিন্দভূধরং স্মিতাবলোকসুন্দরং

মহেন্দ্রমানদারণং নমামি কৃষ্ণাবারণম্ ||২||

ভাবার্থ - কামগৰ্বহারী, বিশাল চঞ্চল লােচনশালী, কম্পিত ( ভীত ) গােপগণ কর্তৃক শােচিত ( যার গােবর্ধন ধারণ কালে মােহগ্রস্ত গােপগণ বালকবুদ্ধিতে যার জন্য শােক করেছিলেন ) সেই পদ্মলােচনকে প্রণাম করি। যার করপদ্মে ভূধর ( পৰ্ব্বত ), যার ঈষৎ হাস্যযুক্ত দৃষ্টি অতি মনােজ্ঞ, যিনি ইন্দ্রের মানহরণ করেন, সেই কৃষ্ণরূপ বারণ বা হস্তীকে প্রণাম ||২||

কদম্বসূনকুণ্ডলং সুচারুগণ্ডমণ্ডলং

ব্রজাঙ্গনৈকবল্লভং নমামি কৃষ্ণদুর্লভম্ ।

যশোদয়া সমোদয়া সগোপয়া সনন্দয়া

যুতং সুখৈকদায়কং নমামি গোপনায়কম্ ||৩||

ভাবার্থ - যার কদম্বপুষ্পবৎ কুণ্ডল, যার গণ্ডদেশ অতি মনােহর, যিনি ব্রজাঙ্গনাগণের একমাত্র বল্লভ ( প্রিয় ) সেই দুর্লভ কৃষ্ণকে প্রণাম করি; নন্দ ও গােপীগণসহ বর্তমান আনন্দিতা যশােদার সহিত যুক্ত, একমাত্র সুখদাতা, গােপগণের নায়ককে প্রণাম করি ||৩||

সদৈব পাদপঙ্কজং মদীয় মানসে নিজং

দধানমুক্তমালকং নমামি নন্দবালকম্ ।

সমস্তদোষশোষণং সমস্তলোকপোষণং

সমস্তগোপমানসং নমামি নন্দলালসম্ ||৪||

ভাবার্থ - আমার চিত্তে নিজ পাদপদ্ম সর্বদা স্থাপনকারী, উত্তম অলক বিশিষ্ট ( অলক শব্দে চূর্ণ কুন্তল বুঝায় ) নন্দের বালককে ( পুত্রকে ) প্রণাম করি। যিনি সমস্ত দোষের শোষণকারী, সমস্ত লােকের পােষণকারী, সমস্ত গােপের অভিলাষের বিষয়, ( কাম্য ) লালসারূপী কৃষ্ণকে প্রণাম করি ||৪||

ভুবো ভরাবতারকং ভবাব্ধিকর্ণধারকং

যশোমতীকিশোরকং নমামি চিত্তচোরকম্ ।

দৃগন্তকান্তভঙ্গিনং সদা সদালিসঙ্গিনং

দিনে দিনে নবং নবং নমামি নন্দসম্ভবম্ ||৫||

ভাবার্থ - পৃথিবীর ভার অবতারক ( লাঘবকারী ), সংসারসমুদ্রে কর্ণধারস্বরূপ, যশােমতীর কিশাের দুগ্ধচোরকে প্রণাম করি; চক্ষুঃপ্রান্তের কমনীয় ভঙ্গীবিশিষ্ট, সর্বদা মদে অলস অঙ্গবিশিষ্ট, প্রতিদিনই নতুন নতুন ( শােভাবিশিষ্ট ) নন্দের পুত্রকে প্রণাম করি ||৫||

গুণাকরং সুখাকরং কৃপাকরং কৃপাবরং

সুরদ্বিষন্নিকন্দনং নমামি গোপনন্দনম্ ।

নবীনগোপনাগরং নবীনকেলিলম্পটং

নমামি মেঘসুন্দরং তড়িৎপ্রভালসৎপটম্ ||৬||

ভাবার্থ - গুণের আকর, সুখের আকর, কৃপা দ্বারা শ্রেষ্ঠ, ( কৃপালুগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ) নবীন গােপরূপ নাগর, নূতন নূতন কেলি বা ক্রীড়ায় আসক্ত, বিদ্যুৎ-প্রভা সদৃশ ছটাসম্পন্ন বস্ত্রধারী, মেঘবৎ সুন্দরকে ( কৃষ্ণকে‌ ) প্রণাম করি ||৬||

সমস্তগোপনন্দনং হৃদম্বুজৈকমোদনং

নমামি কুঞ্জমধ্যগং প্রসন্নভানুশোভনম্ ।

নিকামকামদায়কং দৃগন্তচারুসায়কং

রসালবেণুগায়কং নমামি কুঞ্জনায়কম্ ||৭||

ভাবার্থ - সমস্ত গােপগণের আনন্দদায়ক, হৃদয়স্বরূপ পদ্মের একমাত্র মােহ সম্পাদনকারী, উজ্জ্বল সূর্য্যবৎ শােভাসম্পন্ন, কুঞ্জমধ্যস্থিতকে নমস্কার করি। অতিশয় কামনা বা অভিলাষপুরণ-কারী, চক্ষুঃপ্রান্তরূপ ( অপাঙ্গরূপ ) মনােজ্ঞ বাণযুক্ত, মনােহর রসযুক্ত বেণুদ্বারা গানকারী, কুঞ্জনায়ককে প্রণাম করি ||৭||

বিদগ্ধগোপিকামনোমনোজ্ঞতল্পশায়িনং

নমামি কুঞ্জকাননে প্রবৃদ্ধবহ্নিপায়িনম্ ।

কিশোরকান্তিরঞ্জিতং দৃগঞ্জনং সুশোভিতং

গজেন্দ্রমোক্ষকারিণং নমামি শ্রীবিহারিণম্ ||৮||

ভাবার্থ - রসিক গােপীগণের মনােরূপ মনোহর শয্যাশায়ী, কুঞ্জকাননে অবস্থিত হয়ে প্রবৃদ্ধকামরূপবহ্নি পানকারীকে প্রণাম করি, যার চোখ ছেলেবেলার আকর্ষণ দ্বারা আকর্ষণীয় করা হয়েছে এবং চক্ষুঃপ্রান্তের কালো অধম (অঞ্জন), যিনি গজেন্দ্র হাতিটিকে মুক্ত করেছিলেন অর্থাৎ মোক্ষপ্রদানকারিনী ( কুমিরের চোয়াল থেকে ), এবং সেই লক্ষ্মীর সঙ্গী (শ্রী) কে প্রণাম করি ||৮||

যদা তদা যথা তথা তথৈব কৃষ্ণসৎকথা

ময়া সদৈব গীয়তাং তথা কৃপা বিধীয়তাম্ ।

প্রমাণিকাষ্টকদ্বয়ং জপত্যধীত্য যঃ পুমান

ভবেৎস নন্দনন্দনে ভবে ভবে সুভক্তিমান ||৯||

ভাবার্থ - যেখানে সেখানে যেরূপে সেরূপেই কৃষ্ণ-সতকথা সর্ব্বদা মৎ কর্তৃক গীত হইতে পারে সেইরূপ কৃপা বিধান কর, যে ব্যক্তি প্রমাণিকাছন্দের আটটি শ্লোক অধ্যয়ন করে জপ বা ভাবনা করে, সে জন্ম জন্ম শ্রীনন্দনন্দন কৃষ্ণে সুভক্তিসম্পন্ন হয় ||৯||

|| ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্যস্য শ্রীমচ্ছঙ্করাচার্য ভগবত কৃতৌ শ্রীকৃষ্ণাষ্টকং কৃষ্ণকৃপাকটাক্ষ স্তোত্রং সম্পূর্ণম্ ||

ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্য শ্রীমদ শঙ্করাচার্য বিরচিত শ্রীকৃষ্ণ তাণ্ডব স্তোত্র বা শ্রীকৃষ্ণাষ্টকম্ কৃষ্ণকৃপাকটাক্ষ স্তোত্র সমাপ্ত।

 শ্রী কৃষ্ণার্পণমস্তু

 

জ্ঞানী ভোগ্যবিষয়ে মনের কঠিনতা আর ভগবদ্বিষয়ে মনের কোমলতা সম্পাদন করে—

  আচার্য মধুসূদন সরস্বতী ভক্তিরসায়নে বলছেন — কাঠিন্যং বিষয়ে কুর্যাদ্ দ্রবত্বং ভগবৎপদে। উপায়ৈঃ শাস্ত্রনির্দিষ্টৈরনুক্ষণমতো ব...