Saturday, 22 October 2022

তুরীয়ব্রহ্ম

 


অদ্য আলোচ্য বিষয় তৈজসাদি পাদত্রয়াতীত তুরীয় ব্রহ্মস্বরূপ কথন। 'নেতি নেতি' শ্রুতির মত মাণ্ডুক্য শ্রুতিও নিষেধমুখেই তুরীয় ব্রহ্মের স্বরূপ নিরূপণ করিয়াছেন। অথর্ববেদীয়া মাণ্ডুক্য উপনিষদে বর্ণিত হইয়াছে—

নান্তঃপ্রজ্ঞং ন বহিষ্প্রজ্ঞং নোভযতঃপ্রজ্ঞং ন প্রজ্ঞানঘনং ন প্রজ্ঞং নাপ্রজ্ঞম্ । অদৃষ্টমব্যবহার্যমগ্রাহ্যমলক্ষণং অচিন্ত্যমব্যপদেশ্যমেকাত্মপ্রত্যযসারং প্রপঞ্চোপশমং শান্তং শিবমদ্বৈতং চতুর্থং মন্যন্তে স আত্মা স বিজ্ঞেযঃ ..৭..

বিবেকিগণ চতুর্থকে (তুরীয়কে) মনে করেন যে, তিনি অন্তঃপ্রজ্ঞ তৈজস নহেন; বহিঃপ্রজ্ঞ বিশ্ব নহেন; জাগ্রৎও স্বপ্নের মধ্যবর্ত্তী জ্ঞানসম্পন্ন নহেন; প্রজ্ঞানঘন প্রাজ্ঞ নহেন; জ্ঞাতা নহেন; অচেতন নহেন; পরন্তু চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়ের অবিষয়, ‘ইহা অমুক’ ইত্যাকার ব্যবহারের অযোগ্য, কর্ম্মেন্দ্রিয়ের অগ্রাহ্য, অনুমানযোগ্য কোনরূপ চিহ্নরহিত, মানস-চিন্তার অবিষয়, শব্দ দ্বারা নির্দ্দেশের অযোগ্য; কেবল ‘আত্মা’ ইত্যাকার প্রতীতিগম্য, জাগ্রদাদি প্রপঞ্চের নিবৃত্তিস্থান, শান্ত (নির্বিকার); মঙ্গলময়, অদ্বৈত। তিনিই আত্মা; এবং তিনিই একমাত্র জ্ঞাতব্য পদার্থ।।৭।।

ভগবান শঙ্করাচার্য এই শ্রুতির ভাষ্যে বলিতেছেন—

'নান্তঃপ্রজ্ঞ' এইটি 'তৈজসের' প্রতিষেধ; 'ন বহিঃপ্রজ্ঞ' এইটি 'বিশ্বের প্রতিষেধ'; 'নোভয়তঃপ্রজ্ঞ' এটা জাগ্রৎ ও স্বপ্ন, এতদুভয়ের মধ্যবর্তী অবস্থার প্রতিষেধ ; ‘ন প্রজ্ঞানঘন' এটি সুষুপ্তাবস্থার প্রতিষেধ; কারণ, উহার স্বরূপটি বীজভাবাপন্ন অবিবেকাত্মক; 'ন প্রজ্ঞ' এইটি এককালে সৰ্ববিষয়ক জ্ঞানের প্রতিষেধ; আর 'ন অপ্রজ্ঞ' এইটি অচৈতন্যের প্রতিষেধ বুঝিতে হইবে।

প্রশ্ন হইতেছে যে, অন্তঃপ্রজ্ঞত্বাদি ভাবগুলি যখন আত্মাতে প্রত্যক্ষ হইতেছে, তখন কেবল প্রতিষেধ-বলে রজ্জু প্রভৃতিতে সর্পাদির ন্যায় তাদের অসত্তা বা মিথ্যাত্ব বুঝা যায় কিরূপে?

উত্তরে বলা হইতেছে—বিশ্ব-তৈজসাদির স্বরূপগত চৈতন্যাংশে কিছুমাত্র বিশেষ বা পার্থক্য না থাকিলেও ওদের একটির অবস্থিতিকালে যখন অপরটি থাকে না, তখন উহারা ইতরেতর-ব্যভিচারী অর্থাৎ প্রত্যেকেই প্রত্যেককে ছাড়িয়া থাকে। এই কারণেই রজ্জুতে কল্পিত সর্প ও জলধারাদির ন্যায় উহারা অসত্য – মিথ্যা; আর আত্মার জ্ঞাতৃভাবটি কোথাও ব্যভিচারী হয় না, সর্ব্বত্রই অনুস্যূত থাকে সুতরাং উহা সত্য। যদি বল, সুষুপ্তিকালে আত্মারও তো জ্ঞাতৃভাব থাকে না : সুতরাং উহাও ব্যভিচারী হতে পারে? না; সে সময়েও তাহার জ্ঞাতৃভাব অনুভবগোচর হইয়া থাকে; কারণ, শ্রুতি বলিতেছেন যে, 'বিজ্ঞাতা আত্মার জ্ঞান কখনই বিলুপ্ত হয় না', আর এই কারণেই তুরীয় অদৃশ্য (দর্শনের অযোগ্য)। যেহেতু অদৃশ্য, সেই হেতুই অব্যবহার্য্য, এবং কর্মেন্দ্রিয়ের অগ্রাহ্য ( গ্রহণযোগ্য নয় )। অলক্ষণ অর্থ—জ্ঞানোপযোগী লিঙ্গরহিত, অর্থাৎ অনুমানের অবিষয়; অচিন্তনীয় বলেই শব্দ দ্বারা নির্দেশের যোগ্য নয়। ‘একাত্ম-প্রত্যয়সার' অর্থ—জাগ্রৎ, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি, এই স্থানত্রয়ে অনুভূয়মান আত্মা এক—অভিন্ন ; এই প্রকার যে প্রতীতি, তাহা দ্বারা তাহার অনুসরণ বা অনুসন্ধান করিতে হয়; অথবা, আত্ম-প্রত্যয় অর্থ—'আত্মা' ইত্যাকার প্রতীতিই যার তুরীয়ের অনুভব-বিষয়ে একমাত্র প্রমাণ ; সেই তুরীয় পদার্থ 'একাত্ম-প্রত্যয়সার' পদবাচ্য; কেননা, ‘তাকে কেবল ‘আত্মা' বলিয়াই উপাসনা করিবে,' এইরূপ শ্রুতি রয়েছে।

এ পর্যন্ত, জাগ্রদাদি স্থানবর্ত্তী আত্মার অন্তঃপ্রজ্ঞত্বাদি ধর্মের (স্থানিধর্মের) প্রতিষেধ কথিত হইয়াছে। এখন 'প্রপঞ্চোপশম’ ইত্যাদি কথায় আত্মাতে জাগ্রৎ-স্বপ্নাদি স্থানধর্ম্মেরও অভাব (প্রতিষেধ) কথিত হইতেছে। যেহেতু প্রপঞ্চোপশম, অর্থাৎ জাগ্রদাদি সম্বন্ধশূন্য, অতএব, শান্ত অর্থাৎ নির্বিকার ও শিব (মঙ্গলময়) ; (জ্ঞানিগণ) অদ্বৈত অর্থাৎ ভেদ-কল্পনারহিত চতুর্থ—তুরীয় বলিয়া মনে করেন; কেননা, পূর্ব্বোক্ত পাদত্রয়ের যা স্বরূপ, এই চতুর্থ তাহা হইতে বিলক্ষণ বা বিভিন্নপ্রকার। সেই তুরীয়ই প্রকৃত আত্মা, এবং তাহাই বিশেষরূপে জ্ঞেয়। রজ্জু যেমন প্রতীয়মান সর্প, দণ্ড ও ভূ-রেখা প্রভৃতি হইতে পৃথক্, তেমনি 'তুমি তৎস্বরূপ' ইত্যাদি শ্রুতিবাক্য-প্রতিপাদ্য যে আত্মা – কেবলই 'দ্রষ্টা, কিন্তু দৃষ্টির বিষয় নহে,' এবং ‘দ্রষ্টার দৃষ্টির কখনই বিলোপ হয় না' ইত্যাদি বাক্যে বর্ণিত হইয়াছে; তাহাকেই জ্ঞাতব্য বলিয়া উপদেশ করা হইয়াছে। 'জানিতে হইবে' এই কথাটি 'ভূতপূর্ব্ব-গতি' নিয়মানুসারে কথিত হইয়াছে। কেননা, জ্ঞানের পর আর দ্বৈত-প্রপঞ্চ থাকে না বা থাকিতে পারে না; সুতরাং তখন আর কিছুই বিজ্ঞেয় থাকিতে পারে না।

শ্রুতি আরো বলিতেছেন—

অমাত্রশ্চতুর্থোঽব্যবহার্যঃ প্রপঞ্চোপশমঃ শিবোঽদ্বৈত

এবমোঙ্কার আত্মৈব সংবিশত্যাত্মনাঽঽত্মানং য এবং বেদ .. ১২..

শঙ্করাচার্য ভাষ্যে বলিতেছেন— "অমাত্র অর্থ—যাহার মাত্রা নাই; সেই অমাত্র নির্ব্বিশেষ ওঙ্কার তুরীয় আত্মস্বরূপই বটে; অভিধান (বাচক) শব্দ ও অভিধেয় (তদবাচ্য) মন, এতদুভয়ই ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ায় অব্যবহার্য; প্রপঞ্চোপশম (জগতসম্বন্ধরহিত), শিব ও অদ্বৈতভাবসম্পন্ন, কথিতানুরূপ জ্ঞানসম্পন্ন পুরুষপ্রযুক্ত, এই ত্রিমাত্র অর্থাৎ পাদত্রয়যুক্ত ওঙ্কার আত্মস্বরূপই বটে। যিনি এইরূপ জানেন, তিনি স্বয়ংই স্বীয় পারমার্থিক আত্মস্বরূপে প্রবেশ করেন, অর্থাৎ উক্ত ব্রহ্মবিৎ পুরুষ পরমার্থ-দর্শনের বলে তৃতীয় বীজভাব দগ্ধ করিয়া আত্মাতে প্রবিষ্ট হন; এই কারণে আর পুনর্জ্জন্ম লাভ করেন না; কেননা, তুরীয়ে কোনরূপ জন্মাদিবীজ নিহিত নাই। কারণ, রজ্জু ও সর্পের বিবেক-জ্ঞান উপস্থিত হইলে, কল্পিত সর্পটি রজ্জুতে প্রবিষ্ট হইয়া (বিলীন হইয়া) পূর্ব্বসংস্কারবশতঃ কখনই বিবেকিগণের নিকট পুনর্ব্বার প্রাদুর্ভূত হয় না।"

Sunday, 9 October 2022

নির্গুণ, নির্বিশেষ ব্রহ্ম সচ্চিদানন্দ হইবেন কিরূপে? আর ব্রহ্ম সচ্চিদানন্দ হইলে তিনি নির্গুণ ও নির্বিশেষ রহিবেন কিরূপে?

 

সর্বপ্রপঞ্চাতীত নির্বিশেষ ব্রহ্মকে বিধিমুখে অর্থাৎ 'তিনি এইরূপ' এইভাবে প্রকাশ করা যায় না, নিষেধমুখে অর্থাৎ 'অথাত আদেশ নেতি নেতি'-(বৃহদারণ্যক উপনিষদ্-২।৫।৬) 'অথ (-সত্যের অর্থাৎ প্রপঞ্চের বর্ণনার অনন্তর) অতঃ (-যাহা সত্যেরও সত্য, তাহার বর্ণনা অবশিষ্ট থাকায়) নেতি নেতি অর্থাৎ 'ইহা নহে', 'ইহা নহে', এইরূপ সত্যের সত্য ব্রহ্মের আদেশ নির্দ্দেশ করা হইতেছে; এই নির্দ্দেশবাক্য হইতে ভিন্ন ব্রহ্মের শ্রেষ্ঠ নির্দ্দেশ অবশ্যই নাই', এইভাবেই তাহাকে জানিতে পারা যায়। 

ব্রহ্ম নির্বিশেষ বলেই তো শ্রুতি কেবল "নেতি নেতি" দ্বারা অর্থাৎ "ইহা ব্রহ্ম নহে", "উহা ব্রহ্ম নহে", এইরূপে নিষেধমুখে নির্বিশেষ ব্রহ্মের স্বরূপ বুঝাইতে চেষ্টা করিয়াছেন ; ব্রহ্মের স্বরূপ বুঝাইবার জন্য নিষেধসূচক 'ন'-এর অসংখ্য প্রয়োগ করিয়াছেন। ব্রহ্ম সচ্চিদানন্দ হলে বিধিমুখেই তো শ্রুতি ব্রহ্মের স্বরূপ বুঝাইতে পারিতেন? শ্রুতি তাহা করেন নাই কেন? এর উত্তরে নির্বিশেষ ব্রহ্মবাদী অদ্বৈত বেদান্তী বলেন যে, ব্রহ্মের সদ্‌ভাব, চিদ্ভাব ও আনন্দভাব ব্যাখ্যা করায় আপাতদৃষ্টিতে ব্রহ্মকে সগুণ, সবিশেষ বলিয়া মনে হইলেও ব্রহ্ম সেরূপ নহেন। সৎ, চিৎ, আনন্দ এই পদত্রয় বস্তুতঃ 'নেতি'রই প্রতিরূপ, অভাবের সূচক মাত্র। সৎ শব্দের অর্থ মিথ্যা নহে, চিৎ শব্দের অর্থ জড় নহে, আনন্দ শব্দের অর্থ দুঃখরূপ নহে। পরব্রহ্মকে সৎ বলিলে বুঝায় যে, জগৎ যেমন ভঙ্গুর ও মিথ্যা, সেইরূপ মিথ্যা নহে। চিদ্ বলিলে বুঝায়, জড়বস্তু যেমন অপ্রকাশ এবং তমঃস্বভাব, ব্রহ্মবস্তু সেরূপ নহে, ব্রহ্ম স্বয়ংজ্যোতিঃ এবং স্বপ্রকাশ; আনন্দ বলিলে বুঝায় যে, ব্রহ্ম সুখস্বরূপ, দুঃখস্বরূপ নহে। এইরূপে সৎ, চিৎ, আনন্দ এই তিনটি পদ অভাব পরিচয়েই ব্রহ্মের স্বরূপ প্রতিপাদন করে; এবং ব্রহ্ম যে অন্য সকল জাগতিক পদার্থ হইতে বিলক্ষণ তাহা বুঝাইয়া দেয়। এই অভাবও এখানে একটি অতিরিক্ত পদার্থ বা বিশেষ ধর্ম নহে, ইহা সচ্চিদানন্দেরই স্বরূপব্যাখ্যামাত্র। যেমন সাদা বলিলে স্বভাবতঃই বুঝায় যে কালা নহে, এই কৃষ্ণতার অভাব যেমন শুক্লতারই স্বরূপ, কোন অতিরিক্ত বস্তু নহে, সেইরূপ ব্রহ্ম সচ্চিদানন্দ বলিলে স্বভাবতঃ ব্রহ্ম মিথ্যা, ও দুঃখ স্বভাব নহে, ইহাই বুঝা যায়। সৎ, চিৎ, আনন্দ এই পদত্রয় যথাক্রমে ব্রহ্মে মিথ্যাত্ব, জড়তা ও দুঃখস্বরূপের অভাব সাধন করে বলিয়া সার্থকও বটে। বাস্তবিক পক্ষে ব্রহ্ম সৎও নহে, অসৎও নহে, জড়ও নহে, অজড়ও নহে, আনন্দও নহে, নিরানন্দও নহে। ইহা সদসতের অতীত, জ্ঞান ও অজ্ঞানের অতীত, ব্রহ্ম বিজ্ঞান। ব্রহ্ম অজ্ঞেয় হইলেও অজ্ঞাত তত্ত্ব নহে, জ্ঞানবিজ্ঞানের উপরিতনবর্তী 'প্রজ্ঞানের' সাহায্যে ব্ৰহ্মকে জানা যায় সাধারণ জ্ঞানের তিনি অগম্য হইলেও যোগদৃষ্টির সাহায্যে তাঁহাকে দেখা যায়। যোগদৃষ্টিকে লক্ষ্য করেই উপনিষদ্ বলেন যে, অধ্যাত্মবোধ অধিগত হইলে সেই দেবকে জানিয়া ধীরব্যক্তি সাংসারিক সুখদুঃখ অতিক্রম করেন।

তথ্যসূত্রঃ- "বেদান্তদর্শন-অদ্বৈতবাদ্", কাব্য-ব্যাকরণ-সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ, বিদ্যাবাচস্পতি শ্রীআশুতোষ ভট্টাচার্য শাস্ত্রী।

ব্রহ্মের প্রাজ্ঞ-সংজ্ঞক তৃতীয় পাদঃ-

 


আজকের আলোচ্য বিষয় ব্রহ্মের প্রাজ্ঞ-সংজ্ঞক তৃতীয় পাদ নিরূপণ এবং তাহারই সর্ব্বান্তর্য্যামিত্ব ও সর্ব্বকারণত্ব কথন। অথর্ববেদীয়া মাণ্ডুক্য উপনিষদে বর্ণিত আছে—

সুষুপ্ত পুরুষ যে স্থানে বা অবস্থায় কোনরূপ ভোগ্য বিষয় প্রার্থনা করে না; কোনরূপ স্বপ্ন দর্শন করে না; তাহাই ‘সুষুপ্ত’। এই সুষুপ্ত যাহার স্থান, (বাহ্য ও আন্তর সর্ব্বপ্রকার বিষয় বিজ্ঞান না থাকায়) যিনি একীভাবপ্রাপ্ত, যিনি কেবলই প্রকৃষ্ট জ্ঞানমূর্ত্তি, প্রচুর আনন্দপূর্ণ ও আত্মানন্দভোজী এবং স্বীয় বোধশক্তি যাঁহার মুখস্বরূপ, সেই প্রাজ্ঞ আত্মা ইহার তৃতীয় পাদ। শ্রুতি আরো বলিতেছেন—"এষ সর্বেশ্বরঃ এষ সর্বজ্ঞ এষোঽন্তর্যাম্যেষ যোনিঃ সর্বস্য প্রভবাপ্যযৌ হি ভূতানাম্"  অর্থাৎ 'ইনি (প্রাজ্ঞ) সকলের ঈশ্বর, ইনি সর্ব্বজ্ঞ, ইনি অন্তর্যামী (যিনি অভ্যন্তরে থাকিয়া সকলকে নিয়মিত করেন), এবং যেহেতু ইনিই সমস্ত ভূতের উৎপত্তি ও বিলয় স্থান, অতএব ইনিই সর্ব্ব জগতের কারণ।'

ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য এই শ্রুতির ভাষ্যে বলিতেছেন—"উপাধির প্রাধান্য বিলুপ্ত হইয়া যখন কেবল চৈতন্যেরই  প্রাধান্য হয়, তাহাই স্বরূপাবস্থা, সেই অবস্থাপন্ন এই প্রাজ্ঞই সর্ব্বেশ্বর, অর্থাৎ আধিদৈবিকের সহিত সমস্ত কার্য্যজগতের ঈশ্বর—ঈশিতা অর্থাৎ শাসনকর্ত্তা। ঈশ্বর পদার্থটি অপরাপরের ন্যায় ইহা হইতে পৃথক পদার্থ নহে (তৎস্বরূপই বটে)। 'হে সোম্য, প্রাণশব্দাভিহিত ব্রহ্মই মনের অর্থাৎ মন-উপাধিক আত্মার বন্ধন বা পর্য্যবসান-স্থান।' এই শ্রুতিও এই অর্থের গ্রাহক। সর্ব্বপ্রকার বিভাগাপন্ন এই প্রাজ্ঞই সকলের জ্ঞাতা; এই কারণে সর্ব্বজ্ঞ; ইনিই অন্তর্যামী, অর্থাৎ ইনিই সর্ব্বভূতের অন্তরে প্রবেশপূর্ব্বক নিয়মনকারীও বটে;  এবং যেহেতু ইনিই সমস্ত ভূতের উৎপত্তি ও বিলয়স্থান; অতএব, ইনিই বিভিন্ন প্রকার জগৎ প্রসব করেন;  সেইজন্য সমস্ত জগতের যোনি বা উৎপত্তি-স্থানও ইনিই।"

Saturday, 1 October 2022

জীবন্মুক্ত কে?

 


ভগবান্ দত্তাত্রেয় জীবন্মুক্তি গীতায় বলেছেন

জীবঃ শিবঃ সর্বমেব ভূতেষ্বেবং ভূতে ভূতে ব্যবস্থিতঃ।এবমেবাভিপশ্যন্ হি এবমেব পশ্যতি যো জীবন্মুক্তঃ স উচ্যতে। এবং ব্রহ্ম জগত্সর্বমখিলং ভাসতে রবিঃ। সংস্থিতং সর্বভূতানাং জীবন্মুক্তঃ স উচ্যতে। একধা বহুধা চৈব দৃশ্যতে জলচন্দ্রবৎ। আত্মজ্ঞানী তথৈবৈকো জীবন্মুক্তঃ স উচ্যতে। সর্বভূতে স্থিতং ব্রহ্ম ভেদাভেদো ন বিদ্যতে। একমেবাভিপশ্যংশ্চ পশ্যতি জীবন্মুক্তঃ স উচ্যতে। ২-৫

অর্থাৎ এই যে জীব, ইনিই শিব। ইনি সর্বভূতে বিরাজমান। ইনি সর্বব্যাপী। এই জীবনে এই জীবকে যিনি এইভাবে দেখতে পেরেছেন, তিনিই জীবন্মুক্ত। অর্থাৎ গগনে রবির উদয়ে বিশ্বচরাচর প্রকাশিত হয়। সেইভাবেই চৈতন্যস্বরূপ পরমাত্মা পরব্রহ্ম জগতের প্রতিটি বস্তুর মধ্যে বিরাজ করে ব্রহ্মাণ্ডকে প্রকাশ করছেন। এইরকম জ্ঞানলাভ করে যিনি জ্ঞানী হতে পেরেছেন তাঁকেই বলা যায় জীবন্মুক্ত। অর্থাৎ আকাশের বুকে একটি মাত্র চাঁদ স্নিগ্ধ কিরণ নিয়ে ভাসমান। স্রোতের মালা নিয়ে জলে সেই এক চাঁদকে অনেক, অনেক রূপে দেখা যায়। সেই রকম এক পরমাত্মা প্রতিটি জীবের বুদ্ধিতে এক-একভাবে প্রকাশিত। এইরকম আত্মজ্ঞানীই জীবন্মুক্ত বলে অভিহিত হন। অর্থাৎ সমুদয় জীবের অন্তঃকরণেই সেই এক ব্রহ্ম বিরাজ করছেন। স্থাবর-জঙ্গম ভেদে জীবদেহ পৃথক পৃথক হলেও, তিনিই সেই এক। তার মধ্যে ভেদও নেই, অভেদও নেই। এইরকম জ্ঞানে যিনি জ্ঞানী হতে পেরেছেন, তিনিই জীবন্মুক্ত।..........

কেবল প্রারব্ধবশেই জীবন্মুক্তের ব্যবহার সম্পাদিত হয়ে থাকেঃ-

 


অষ্টাবক্র মুনি অষ্টাবক্র-গীতার শান্তিশতকম্ প্রকরণে বলছেন—

কৃত্যং কিমপি নৈবাস্তি ন কাপি হৃদিরঞ্জনা।

যথা জীবনমেবেহ জীবন্মুক্তস্য যোগিনঃ।।১৩।।

অনুবাদঃ- জীবন্মুক্ত জ্ঞানীর সঙ্কল্পবশে কিছুই করার নেই। তাঁর মনেও কোন বিষয়ের প্রতি বিন্দুমাত্রও অনুরাগ হয় না। কারণ আসক্তির হেতু অবিদ্যা তাঁর বিনষ্ট হয়ে গেছে। তথাপি জীবনহেতু অদৃষ্ট অর্থাৎ প্রারব্ধ অনুসারেই তাঁর সর্ব কর্ম সম্পন্ন হয়ে থাকে।

সংসারদৃশ্য দর্শন করলেও অহংকাররাহিত্যবশতঃ জীবন্মুক্তের সদা ব্রাহ্মীস্থিতি অব্যাহত থাকে। অষ্টাবক্র মুনি অষ্টাবক্র-গীতার শান্তিশতকম্ প্রকরণে বলছেন

"যস্যান্তঃ স্যাদহঙ্কারো ন করোতি করোতি সঃ।

নিরহঙ্কার ধীরেণ ন কিঞ্চিদকৃতং কৃতম্।।২৯

অর্থাৎ অন্তঃকরণে অহংকারাধ্যাসবিশিষ্ট পুরুষ বাহ্য দৃষ্টিতে কিছু না করলেও কর্তৃত্বাভিমানবশতঃ সঙ্কল্পাদি করে থাকে। কর্তৃত্বাধ্যাস-বিরহিত জ্ঞানী লোকদৃষ্টিতে কর্ম করেও স্বদৃষ্টিতে বস্তুতঃ তিনি কিছুই করেন না।

পুনশ্চ সেই সুমতি কে, যিনি সম্যকদর্শন করেন? তদুত্তরে শ্রীভগবান্ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় বলছেন"যস্য নাহংকৃতো ভাবো বুদ্ধির্যস্য ন লিপ্যতে৷"-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১৮/১৭) অর্থাৎ 'যাঁর অহংকৃত অর্থাৎ 'আমি কর্তা' এরূপ ভাব নেই তাঁর বুদ্ধি লিপ্ত হয় না।' ভগবান শঙ্করাচার্য এই শ্লোকের ভাষ্যে বলছেন

শাস্ত্র এবং আচার্যের উপদেশ ও ন্যায়ের দ্বারা সংস্কৃত আত্মার  অহংকৃত অর্থাৎ "আমি কর্তা" এইরূপ ভাব অর্থাৎ ভাবনা বা প্রত্যয় হয় না। "অধিষ্ঠানাদি পাঁচটি অবিদ্যাদ্বারা আত্মাতে কল্পিত, সর্বকর্মের কর্তা আমি নই, আমি সেই সকল ব্যাপারের সাক্ষী মাত্র, "অপ্রাণো হ্যমনাঃ শুভ্রো হ্যক্ষরাত্পরতঃ পরঃ"-(মুণ্ডক উপনিষৎ- ২৷১৷২) 'অপ্রাণ (প্রাণরহিত) অমন (মনরহিত), শুভ্র (শুদ্ধ), কূটস্থ অক্ষর হতেও পর অর্থাৎ পুরুষোত্তম', কেবল এবং অবিক্রিয়", যিনি এইরূপ দর্শন করেন;—এইরূপ অর্থ।

আত্মার উপাধিস্বরূপ বুদ্ধি অর্থাৎ অন্তঃকরণ যাঁর লিপ্ত হয় না অর্থাৎ "আমি এই কাজ করেছি তার জন্য আমি নরকে যাব"—এইরূপ বুদ্ধিকৃত কর্মে অনুতাপ করেন নাএইরূপ যাঁর বুদ্ধি লিপ্ত হয় না, তিনিই সুমতি, তিনিই যথার্থদর্শী।

Saturday, 17 September 2022

সদ্যোমুক্তি (জীবন্মুক্তি)-

 


সর্বদুঃখের আত্যন্তিক নিবৃত্তি ও পরমানন্দাত্মক ব্রহ্মস্বরূপতা প্রাপ্তিরই নাম মুক্তি। এই প্রাপ্তি শব্দের অর্থ— 'অপ্রাপ্তের প্রাপ্তি নয়', কিন্তু স্বকণ্ঠগত, অথচ বিস্মৃত মণিমালার প্রাপ্তির ন্যায় 'প্রাপ্তের প্রাপ্তিকে' বুঝতে হবে; কারণ স্বকণ্ঠস্থিত মণিমালার ন্যায় ব্রহ্মস্বরূপতা জীবের নিত্য প্রাপ্ত। কিন্তু অনাদি অবিদ্যাবশতঃ সেই ব্রহ্মস্বরূপতা, স্বকণ্ঠস্থিত হলেও বিস্মৃত মণিমালার ন্যায় যেন অপ্রাপ্তই হয়ে পড়েছে। ব্রহ্মাত্মবিজ্ঞানের ফলে অবিদ্যার নাশ হলে সেই নিত্যপ্রাপ্ত ব্রহ্মস্বরূপতারই অভিব্যক্তিরূপ প্রাপ্তি হয়ে থাকে এবং অবিদ্যোত্থ সর্বদুঃখের আত্যন্তিক উপরম হয়ে যায়। একেই মুক্তি বলে। ব্রহ্মস্বরূপভূতা এই মুক্তি একই প্রকার হলেও তৎপ্রাপ্তির উপায়ভূতা বিদ্যার বিভিন্নতা এবং সাধকের প্রাপ্তব্য অবস্থার বিভিন্নতাবশতঃ প্রধানত দুই প্রকারে অভিহিত হয়ে থাকে, যথা— সদ্যোমুক্তি ক্রমমুক্তি

নির্গুণব্রহ্মবিদ্যা অনুশীলনকারীর "অহং ব্রহ্মাস্মি", এপ্রকার জ্ঞানোদয়ের ফলে মূল-অবিদ্যা বিনষ্ট হলে স্বকণ্ঠগত বিস্মৃত মণিমালার প্রাপ্তির ন্যায়, ব্রহ্মরূপ স্বীয় পূর্বসিদ্ধ স্বরূপে যে অবস্থিতি, তাই সদ্যোমুক্তি। কারণ মোক্ষ জীবের স্বরূপ, তা নিত্য; উপাসনারূপ ধর্মের ফল নয়। এই বিষয়ে ব্রহ্মসূত্রের (১/১/৪) ভাষ্যে ভগবান শঙ্করাচার্য বলেছেন—

আত্মার অশরীরত্ব স্বাভাবিক। কি প্রকারে তা জানলে? উত্তর—অশরীর্রীরেষু অনবস্থেষ্ববস্থিতম্৷ মহান্তং বিভুমাত্মানং মত্বা ধীরো ন শোচতি'-(কঠ উপনিষৎ-১/২/২২)

"অনিত্য শরীরসকলে অবস্থিত শরীররহিত মহান্ এবং বিভু আত্মাকে অবগত হয়ে ধীমান ব্যক্তি শোক করেন না",

'অপ্রাণো হ্যমনাঃ শুভ্রঃ'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-২/১/২)

"সেই পুরুষ অপ্রাণ (—ক্রিয়াশক্তিমান মুখ্যপ্রাণ তার নাই), অমন (—জ্ঞানশক্তিমান সংকল্পবিকল্পাত্মক মন তাঁর নাই) সেহেতু তিনি শুভ্র (—শুদ্ধ"),

 'অসঙ্গো হ্যযং পুরুষঃ'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪/৩/১৫)

"যেহেতু সে পুরুষ অসঙ্গ স্থূলসূক্ষ্মাদি দেহের সহিত সম্বন্ধশূন্য",  ইত্যাদি শ্রুতিসমূহ হতে আত্মার স্বাভাবিক অশরীরতা অবগত হওয়া যায়। অতএব অনুষ্ঠেয় কর্ম্মের ফল হতে ভিন্ন মোক্ষ নামক অশরীরত্ব নিত্য, এটি সিদ্ধ হল।

সদ্যোমুক্তি শব্দের অর্থ 'জ্ঞানোদয়সমকালে মুক্তি' , তখনই মুক্তি, এখন অবিদ্যাধ্বংসী নিশ্চল অপরোক্ষ ব্রহ্মাত্মবিজ্ঞানের উদয় হল, আর মুক্তি কর্মফলের ন্যায় কালান্তরে হবে, এইরূপ নয়। সদ্যোমুক্ত পুরুষ ব্রহ্মাত্মজ্ঞানোৎপত্তির সমকালেই 'ইহার পূর্বেও আমি কর্তা বা ভোক্তা ছিলাম না, বর্তমানকালেও তা নয় এবং ভবিষ্যৎকালেও তা হব না', 'আমি এক অদ্বয় ব্রহ্মস্বরূপ' ইত্যাদি এই প্রকার অনুভব করতে থাকেন। তখন তাঁর আর দেহাত্মবিষয়ক জ্ঞান থাকে না। তখন তাকে জীবন্মুক্ত বলা হয়। এই বিষয়ে বরাহ শ্রুতিতে একটি সুন্দর সংজ্ঞা দেয়া আছে—

"যস্য নাহংকৃতো ভাবো বুদ্ধির্যস্য ন লিপ্যতে। কুর্বতোহকুর্বতো বাপি স জীবন্মুক্ত উচ্যতে।"-(বরাহ উপনিষৎ-৪/২৫)

অর্থাৎ "যাঁর 'আমি কর্তা' এইরূপ ভাব নেই, যাঁর বুদ্ধি লিপ্ত হয় না, তিনি কিছু করুন বা না করুন তিনি— জীবন্মুক্ত বলে কথিত হন।"

তাঁর স্বদৃষ্টিতে তখন স্বীয় শরীর ও জগদাদি সমস্ত পদার্থই বাধিত হয়ে পড়ে। ভেদক উপাধি বিনষ্ট হওয়ায় তিনি তখন শুদ্ধ জলে মিলিত শুদ্ধ জলের ন্যায় নিত্যশুদ্ধবুদ্ধ পরমানন্দস্বরূপ ব্রহ্মই হয়ে পড়েন। এই বিষয়ে ভগবান্ ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য ব্রহ্মসূত্রের (৪/১/১৩) বলিতেছেন—"পূর্বসিদ্ধ কর্তৃত্ব ও ভোক্তৃত্বের বিপরীত যে কালত্রয়েই অকর্তৃ ও অভোক্তৃস্বরূপ ব্রহ্ম, তিনিই আমি; ইহার পূর্বেও আমি কর্তা বা ভোক্তা ছিলাম না, বর্তমানকালেও তা নয়, ভবিষ্যৎকালেও তা হব না; নির্গুণব্রহ্মবিদ্ এপ্রকার অনুভব করে থাকেন।" তাঁর স্বশরীরও "বল্মীকে পরিত্যক্ত সর্পত্বকের ন্যায়" প্রতিভাত হয়। জীবন্মুক্ত অপরোক্ষ ব্রহ্মাত্মজ্ঞানীর জীবদ্দশাতে অনুভূত যে অশরীরতা তা কেবল যে যুক্তিসিদ্ধ তা নয়, বরংচ শ্রুতিসিদ্ধ। ব্রহ্মবিদ্গণের বিষয়ে এইরূপ শ্রুতিতেও আছে, যথা—

'যথা পর্বে প্রমুচ্যন্তে কামা যেহস্য হৃদি শ্রিতাঃ। অথ মর্ত্যোহমৃতো ভবত্যত্র ব্রহ্মসমশ্নুতে।। ইতি।  তদ্যথাহিনির্ল্বযনী বল্মীকে মৃতা প্রত্যস্তা শযীতৈবমেবেদ্রীরং শেতে অথাযমশরীরোমৃতঃ প্রাণো ব্রহ্মৈব তেজ এব'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪/৪/৭)

অর্থাৎ "মনুষ্যের হৃদয়ে (বুদ্ধিতে) যে সকল কামাশ্রিত তৃষ্ণা আছে, তারা সকলে যখন সমূলে বিনষ্ট হয়, তখন মরমানুষ অমর হয় এবং এই দেহেই ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হয়। ব্রহ্মজ্ঞের দেহান্তরের অপ্রাপ্তি বিষয়ে দৃষ্টান্ত এই— সাপের খোলস যেমন বল্মীকে (উইটিবি) নিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে থাকে, ব্রহ্মজ্ঞের এই শরীর ঠিক তেমনি পড়ে থাকে। অতঃপর জীবন্মুক্ত পুরুষ শরীরে বর্তমান থাকলেও শরীরাভিমান না থাকায় অমৃত, প্রাণস্বরূপ (প্রাণের প্রাণ, পরমাত্মা), ব্রহ্মস্বরূপ, তেজস্বরূপই হয়ে পড়েন।"

আর 'স্থিতপ্রজ্ঞস্য কা ভাষা'-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-২/৫৪) "স্থিতপ্রজ্ঞের লক্ষণ কি"? ইত্যাদি স্মৃতিও স্থিতপ্রজ্ঞের লক্ষণসকলের বর্ণনা করতে প্রবৃত্ত হয়ে সকলপ্রকার প্রবৃত্তির সহিত বিদ্বান পুরুষের সম্বন্ধশূন্যতাই প্রদর্শন করছেন। সুতরাং সদ্যোমুক্ত পুরুষের স্বদৃষ্টিতে তাঁর শরীরপাত হয়ে গেছে। তখন "জীবন্মুক্তি ইত্যাদি তাঁর দৃষ্টিতে কল্পিত বস্তু মাত্র এবং তৎপ্রতিপাদক শাস্ত্র তাঁর দৃষ্টিতে অর্থবাদ" (সংক্ষেপ শারীরক-৪/৩৯)। জগৎ তাঁর কাছে দগ্ধ বস্ত্রের ন্যায়, স্বাপ্নপদার্থের স্মৃতির ন্যায়, অথবা মায়ামরীচিকার ন্যায় প্রতিভাত হতে থাকে। স্বদৃষ্টিতে তাঁর প্রারব্ধ ইত্যাদি কিছুই থাকেনা। তাঁর প্রাণও (—লিঙ্গশরীরও) উৎক্রমণ করে না, তিনি সচ্চিদানন্দস্বরূপ ব্রহ্মেই বিলীন হয়ে যান। পরদৃষ্টিতে কিন্তু তাঁর প্রারব্ধকর্মবলে যতদিন শরীর থাকে, ততদিন তিনি জগৎকে স্বপ্নবৎ, বা মায়ামরীচিকাবৎ দর্শন করেন। এটিই সিদ্ধান্ত সম্মত সদ্যোমুক্তাবস্থা।

কিন্তু 'অজ্ঞানিজনবোধার্থং প্রারব্ধং বক্তি বৈ শ্রুতিঃ"-(অপরোক্ষানুভূতি-৯৭) —' অজ্ঞানী ব্যক্তির দৃষ্টিকে অপেক্ষা করে শ্রুতি তাদৃশ নির্গুণব্রহ্মাত্মবিদের প্রারব্ধকর্মের কথা বলেন‌'। সুতরাং তাদৃশ সদ্যোমুক্ত পুরুষের প্রারব্ধকর্মবশে যতকাল শরীর থাকে, ততকাল তাঁকে বলা হয়—'জীবন্মুক্ত'। সেহেতু তৎকালে তাঁর মুক্তির আখ্যা হয়—'জীবন্মুক্তি'। আবার প্রারব্ধকর্মক্ষয়ে সেই জীবন্মুক্ত পুরুষের শরীর বিনষ্ট হলে, তাঁকে বলা হয়—'বিদেহমুক্ত',  'নির্বাণমুক্ত', ইত্যাদি। সেহেতু তখন তাঁর মুক্তির আখ্যা হয় বিদেহমুক্তি, নির্বাণমুক্তি, ইত্যাদি। এরূপে এটিই সিদ্ধ হয় যে— জীবন্মুক্তি, বিদেহমুক্তি এবং নির্ব্বাণমুক্তি প্রভৃতি উক্ত সদ্যোমুক্তিরই দৃষ্টিভেদে নামান্তর মাত্র।.......

Wednesday, 14 September 2022

ত্রিগুণ:-

 


এই বিষয়ে আজকে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার গুণত্রয়বিভাগযোগের শঙ্করাচার্যের ভাষ্যানুসারে বিস্তৃত আলোচনা করব। ত্রিগুণ কি? "সত্ত্বং রজঃ তমঃ ইতি এবংনামানঃ", অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই নামের তিনটি গুণ। এখানে 'গুণ' শব্দটি পারিভাষিক; এটা নৈয়ায়িকদের রূপরসাদির ন্যায় দ্রব্যাশ্রিত কিন্তু দ্রব্য হতে ভিন্ন কোন পদার্থ নয়। অথবা এখানে ভেদাভেদবাদি-বেদান্তসম্মত গুণগুণী পদার্থদ্বয়ের প্রথমটিও বিবক্ষিত নয়। এটা হলো অনির্বাচ্য ভগবান্মায়া সম্ভবারূপ পদার্থ।

এখন প্রশ্ন ত্রিগুণ কি হতে জাত?

শ্রীভগবান্ বলছেন"প্রকৃতিসংভবাঃ" এই শ্লোকের ভাষ্যে ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য বলেন"ভগবন্মায়াসংভবাঃ", প্রকৃতি-সম্ভব অর্থাৎ ভগবান্মায়া হতে জাত। প্রকৃতিজাত সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ - অনাদিত্ব ও নির্গুণত্বহেতু অব্যয় আত্মাকে এই গুণত্রয় দেহাভিমান দ্বারা শরীরে আবদ্ধ করে। এরা অবিদ্যাত্মক বলে ক্ষেত্রজ্ঞকে যেন বন্ধনও করে। পরমার্থতঃ দেহী লিপ্ত হন না, 'যেন' শব্দের অধ্যাহার কোরে সেই 'যেন' শব্দের দ্বারা 'দেহী যেন নিবদ্ধ হন', এইরূপ অর্থ।

 এই গুণত্রয়ের মধ্যে সত্ত্বগুণ স্ফটিকমণির ন্যায় নির্মল, স্বচ্ছ চৈতন্যপ্রতিবিম্বগ্রহণে সমর্থ বলে নিরুপদ্রব ও প্রকাশক। এই সত্ত্বগুণ 'আমি সুখি' এইরূপ সুখাসক্তি এবং 'আমি জ্ঞানী' এইরূপ জ্ঞানাসক্তি দ্বারা আত্মাকে যেন আবদ্ধ করে। রজোগুণ রাগাত্মক। ইহা অপ্রাপ্তের অভিলাষ ও প্রাপ্তবিষয়ে মনের প্রীতির উৎপাদক বলে জানবে। দৃষ্ট ও অদৃষ্ট ফলের নিমিত্ত কর্মে আসক্তি দ্বারা ইহা আত্মাকে যেন আবদ্ধ করে, অর্থাৎ যেন 'আমি করি' - এই অভিমান দ্বারা কর্মে প্রবর্তিত করে। তমোগুণ আবরণশক্তিপ্রধান প্রকৃতির অংশ হতে উৎপন্ন এবং দেহধারিগণের মোহজনক (হিতাহিত-বিবেকের প্রতিবন্ধক) জানবে। উহা প্রমাদ, আলস্য ও নিদ্রা দ্বারা আত্মাকে দেহে যেন বদ্ধ করে।

পুনরায় গুণসকলের ব্যাপার সংক্ষেপে আলোচনা করব। সত্ত্বগুণ সাধ্য বিষয়ে ও রজোগুণ সাধ্য কর্মে জীবকে আবদ্ধ করে এবং তমোগুণ সত্ত্বকৃত বিবেককে আবৃত করে জীবকে প্রমাদ ও আলস্য প্রভৃতিতে নিমজ্জিত করে।

গুণসকল পূর্বোক্ত কার্যসকল কখন করে থাকে?

 তদুত্তরে ভগবান বলছেন"সত্ত্বগুণ রজঃ ও তমোগুণকে অভিভূত করে প্রবল হয়। রজোগুণ সত্ত্ব ও তমোগুণকে অভিভূত করে প্রবল হয়। আর তমোগুণ সত্ত্ব ও রজোগুণকে অভিভূত করে প্রবল হয়।"

যখন যে গুণ উদ্ভূত হয়, তখন তার কি চিহ্ন হয় তাই বলা হচ্ছে

"যখন এই ভোগায়তন দেহের সমস্ত ইন্দ্রিয়দ্বার বুদ্ধিবৃত্তির প্রকাশ দ্বারা উদ্ভাসিত হয়, তখন জানবে যে সত্ত্বগুণ বর্ধিত হচ্ছে। লোভ, কর্মে প্রবৃত্তি ও প্রচেষ্টা, হর্ষ ও অনুরাগাদির অনিবৃত্তি এবং বিষয়ভোগের স্পৃহা - এই সকল রজোগুণের বৃদ্ধিকালে উৎপন্ন হয়। কর্তব্যাকর্তব্য বিবেকের অভাব, অনুদ্যম, কর্তব্যে অবহেলা ও মূঢ়তা প্রভৃতি লক্ষণ তমোগুণ বৃদ্ধি পেলে জন্মে।"

মরণকালের সত্ত্বাদি অবস্থার দ্বারা যে ফল জীব প্রাপ্ত হয়, সে সবের হেতু আসক্তি ও বিষয়রাগ, সেজন্য তা ত্রিগুণের প্রভাবজন্যই এটি দেখানোর জন্য ভগবান বলছেন

"সত্ত্বগুণের বৃদ্ধিকালে মানুষ দেহত্যাগ করলে হিরণ্যগর্ভাদি উপাসকদিগের সুখময় ব্রহ্মলোকাদিতে গমন করে। রজোগুণের বৃদ্ধিকালে মৃত্যু হলে কর্মভূমি মনুষ্যলোকে জন্ম হয় এবং তমোগুণের বৃদ্ধিকালে মৃত্যু হলে পশ্বাদি মূঢ়জন্ম প্রাপ্ত হয়। শিষ্টগণ বলেন - সাত্ত্বিক কর্মের ফল নির্মল সুখ, রাজসিক কর্মের ফল দুঃখ ও তামসিক কর্মের ফল মূঢ়তা (পশু প্রভৃতি জন্মে দৃশ্যমান অজ্ঞান)। রজঃ ও তমোগুণকে অভিভূত করবার পর সত্ত্বগুণ হতে সকল ইন্দ্রিয়ের জ্ঞান জন্মে। সত্ত্ব ও তমোগুণকে অভিভবের পর রজোগুণ হতে লোভপ্রবৃত্তি জাত হয়। আর তমোগুণ সত্ত্ব ও রজোগুণকে অভিভূত করলে তা হতে অবিবেক, অনবধানতা ও মূঢ়তা উৎপন্ন হয়। সত্ত্বগুণে অবস্থিত (শাস্ত্রীয় উপাসনা ও কর্মে নিরত) ব্যক্তিগণ দেবলোকাদিতে গমন করেন, রজোগুণী (লোভাদিবশতঃ কাম্য-নিষিদ্ধাদি কর্মে নিযুক্ত) ব্যক্তিগণ দুঃখবহুল মনুষ্যলোকে জন্মগ্রহণ করেন এবং জঘন্যগুণবৃত্তিতে (নিদ্রা-আলস্যাদিতে) স্থিত তামসিক ব্যক্তিগণ পশ্বাদি হীন জন্মলাভ করে।"

আর গুণাতীত অবস্থায় জীবের অমৃতত্ব প্রাপ্তি হয়, এই বিষয়ে শ্রীভগবান্ বলছেন

"যখন জীব কার্য-কারণ-বিষয়াকারে পরিণত ত্রিগুণ ব্যতীত অন্য কাউকেও কর্তা বলে দেখেন না এবং ত্রিগুণের অতীত ও তাদের কার্যসমূহের সাক্ষী আত্মাকে জ্ঞাত হন, তখন তিনি ব্রহ্মস্বরূপ অধিগত হন। দেহোৎপত্তির কারণ এই অবিদ্যাময় গুণত্রয় অতিক্রম করলে জীব জন্ম, মৃত্যু ও জরা-রূপ দুঃখ হতে জীবনকালেই বিমুক্ত হন এবং ব্রহ্মানন্দরূপ অমৃতত্ত্ব লাভ করেন।"

ব্রহ্মবিদ্ গুরুর কর্তব্য কি?


 

এই বিষয়ে শ্রুতি কি বলছে দেখে নেয়া যাক

তস্মৈ স বিদ্বানুপসন্নায় সম্যক্

প্রশান্তচিত্তায় শমান্বিতায় ।

যেনাক্ষরং পুরুষং বেদ সত্যং প্রোবাচ

তাং তত্ত্বতো ব্রহ্মবিদ্যাম্ ॥ -(মুণ্ডক উপনিষৎ-১/২/১৩)

অর্থাৎ সেই বিদ্বান্ অর্থাৎ ব্রহ্মবিদ্ গুরু যথাবিধি সমীপাগত প্রশান্তচিত্ত (দর্পাদিদোষরহিত), শমান্বিত (সংযতেন্দ্রিয় অর্থাৎ সর্ববিষয়ে বৈরাগ্যযুক্ত) সেই শিষ্যকে সেই ব্রহ্মবিদ্যা যথাযথরূপে বলবেন যে বিদ্যার নিমিত্ত সেই অক্ষরসংজ্ঞক পরমার্থস্বভাববিশিষ্ট সত্য পুরুষকে জানা যায়।

দীন শরণাগত শিষ্যদর্শনে জ্ঞানীগণ করুণাপরবশ হয়ে অবশ্যই উপদেশ প্রদান করে থাকেন। বসন্তের ন্যায় লোকহিত আচরণ করাই বিদ্বানগণের স্বভাব। যোগবাশিষ্ঠসারের বৈরাগ্য প্রকরণে বর্ণিত আছে"জ্ঞানিনামপি চিত্তং চেৎ কেবলাত্মসুখোদিতম্। সত্ত্বাঃ সংসারদুঃখার্ত্তা কং যান্তি শরণং তদা।" অর্থাৎ জ্ঞানীগণের চিত্ত যদি কেবল আত্মানন্দ লাভেই সমুৎসুক থাকে, তবে সংসারদুঃখসন্তপ্ত জীবগণ একটু শান্তি প্রাপ্তির আশায় কার শরণাপন্ন হবে? অতএব জ্ঞানীগণ সদা পরোপকারপরায়ণ হয়ে থাকেন।

বিদ্বানগণ স্বয়ং এই সংসারপ্রহেলিকার পারে উত্তীর্ণ হয়ে তাঁরা অপরকেও সেই মোক্ষমার্গে আরূঢ় করিয়ে থাকেন। এটা তাঁদের কর্তব্য। আচার্য শ্রীশঙ্কর উপরোক্ত মুণ্ডক শ্রুতির ভাষ্যে বলেছেন"বিধিপূর্বক সমীপাগত, যোগ্য, সৎ শিষ্যকে সংসাররূপ অবিদ্যা-সাগর হতে উদ্ধার করা আচার্যের অবশ্য কর্তব্য।"

শ্রীমদ্ভাগবত্ পুরাণের (১/৩/৫) শ্লোকের বিকৃত তাৎপর্য ও ভগবান শিবকে নিয়ে নির্লজ্জ অপপ্রচারের খণ্ডনঃ-

 


প্রথমত বলে রাখি শুধুমাত্র সত্য প্রকাশের নিমিত্ত ও বিবিধ অপপ্রচারের বিরুদ্ধে জবাব দেবার জন্যই আমি এই খণ্ডনকর্মে প্রবৃত্ত হচ্ছি। নিজেদের বৈষ্ণব দাবি করা একটি নির্দিষ্ট সংগঠনের অনুসারীরা শ্রীমদ্ভাগবত্ পুরাণের প্রথম স্কন্ধের তৃতীয় অধ্যায়ের ৫ম শ্লোকের তাৎপর্যে বলেন

পূর্বপক্ষশিব কোন সাধারণ জীব নন, তিনি ভগবানের অংশ। কিন্তু যেহেতু শিব সরাসরিভাবে জড়া প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত, তাই তিনি ঠিক বিষ্ণুর মতো পূর্ণরূপে গুণাতীত নন। তাঁদের পার্থক্য অনেকটা দুধ এবং দইয়ের মধ্যে পার্থক্যের মতো। দই দুধ ছাড়া আর কিছুই নয়, তবুও তা দুধ নয়।

সিদ্ধান্ত এইধরণের কোন তাৎপর্যই আলোচ্য শ্লোকের মূল বা শ্রীধর টীকাতে নেই। প্রথমে মূলে কি বলা আছে অনুবাদসমেত দেখে নেয়া যাক

এতন্নানাবতারাণাং নিধানং বীজমব্যয়ম্ ।

যস্যাংশাংশেন সৃজ্যন্তে দেবতির্যঙ্নরাদয়ঃ ॥ ৫॥

অনুবাদঃ- উল্লিখিত কারণোদকশায়ী রূপই লীলাবসানে নানা অবতারের প্রবেশস্থলী অক্ষয় এবং উদ্গমস্থান যাঁর অংশ ব্রহ্মা ও ব্রহ্মাংশ মরীচাদি ঋষিগণ, (তিনিই) দেব-নর-তীর্যক-সর্বপ্রকার প্রাণী সৃষ্টি করেন।

এবার শ্রীচৈতন্যদেবাদি মান্য শ্রীমদ্ভাগবতের  সর্বপ্রাচীনতম ও পণ্ডিতগণ স্বীকৃত প্রখ্যাত টীকাকার পূজ্যপাদ্ আচার্য শ্রীধর স্বামী ভাবার্থদীপিকায় কি বলছেন দেখে নেয়া যাক।

শ্রীধরটীকাঃ- এতত্তু কূটস্থং ন ত্বন্যাবতারবদাবির্ভাব-তিরোভাববদিত্যাহএতদিতি। এতত্তু আদিনারায়ণরূপম। নিধীয়তেহস্মিন্নিতি নিধানং, কার্যাবসানে প্রবেশস্থানমিত্যর্থঃ। বীজমন্ত্র উদ্গমস্থানং বীজত্বেহপি নান্যবীজতুল্যং কিন্ত্বব্যয়ম। ন কেবলমবতারাণামেব বীজং, কিন্তু সর্বপ্রাণিনামিত্যাহ, যস্যাংশো ব্রহ্মা তস্যাংশো মরীচ্যাদিস্তেন।

টীকানুবাদঃ- এটি কূটস্থ অর্থাৎ অন্য অবতারের মতো এখানে আবির্ভাব-তিরোভাব নেইএই কথা বলার জন্য 'এতৎ' ইত্যাদি শ্লোক। 'এতৎ' শব্দের অর্থ আদিনারায়ণরূপ। নিধানমএখানে রক্ষিত হয়। অর্থাৎ লীলাবসানে যেটি প্রবেশস্থল। 'বীজম'—উদ্গমস্থান, এখানে শব্দটি বীজ হলেও অন্য বীজের মত নয়। কারণ এই বীজ অক্ষয়অব্যয়। আবার কেবল অবতারদেরই বীজ নয়, অন্য সর্বপ্রকার প্রাণীদেরও বীজস্বরূপ, এই কথা বোঝানোর জন্য বলা হলো, 'যস্যাংশো ব্রহ্মা তস্যাংশো মরীচ্যাদিস্তেন'—যাঁর অংশ ব্রহ্মা, আবার সেই ব্রহ্মার অংশ মরীচাদি ঋষিগণ, তাঁর দ্বারাই (সৃষ্ট হয়)।......

বেদান্তে অবিদ্যা কি?

 


বেদান্তে অবিদ্যা কি?

অঘটন-ঘটন-পটীয়সী অবিদ্যাই ভ্রান্তি জননী, জীব জগৎপ্রসবিনী। অদ্বৈতবেদান্তোক্ত এই অনির্বচনীয় অবিদ্যার লক্ষণ বা পরিচয় কি? এই প্রশ্নের উত্তরে চিৎসুখাচার্য বলেন

'অনাদি ভাবরূপং যদবিজ্ঞানেন বিলীয়তে।

 তদজ্ঞানমিতি প্রজ্ঞা লক্ষণং সংপ্রচক্ষতে।।' -(চিৎসুখী, ১ম পরিচ্ছেদ)

"যা অনাদি, ভাবস্বরূপ এবং তত্ত্বজ্ঞানের উদয়ে বিলয় প্রাপ্ত হয়, অজ্ঞানের তাই লক্ষণ বলে পণ্ডিতগণ ব্যাখ্যা করে থাকেন।"

শ্রীমৎ মধুসূদন সরস্বতী তাঁর অদ্বৈতসিদ্ধিতে অবিদ্যার লক্ষণ নিরূপণ করতে গিয়ে, উল্লেখিত চিৎসুখের লক্ষণের প্রতিধ্বনি করে বলেন"অনাদিভাবত্বে সতি জ্ঞাননিবর্ত্যাসেতি"-(অদ্বৈতসিদ্ধি, অজ্ঞানলক্ষণ নিরুক্তি) অর্থাৎ "যা অনাদি ভাবরূপ এবং জ্ঞানবিনাশ্য তাকেই অবিদ্যা বলে জানবে।"

ব্রহ্মসূত্রের দেবতাধিকরণের ৩০শ সূত্রে বেদান্তকল্পতরু টীকায় অমলানন্দ স্বামী"ভাবরূপা মতাঽবিদ্যা স্ফুটং বাচস্পতেরিহ।" এইরূপে অবিদ্যার ব্যাখ্যা করে ভাবরূপ অবিদ্যাই যে ভামতীকার বাচস্পতি মিশ্রের অনুমোদিত তা নিঃসংশয়ে প্রতিপাদন করেছেন।

সুতরাং অবিদ্যার লক্ষণে অবিদ্যার পরিচায়ক তিনটি বিশেষণ পদের প্রয়োগ দেখতে পাওয়া যায়—() অনাদি, () ভাবরূপ, () জ্ঞাননাশ্য। তবে অদ্বৈতবেদান্তে অবিদ্যাকে 'অনির্বাচ্য' বলেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অবিদ্যা লক্ষণের ব্যাখ্যায় আচার্য মধুসূদন সরস্বতী বলেনঅবিদ্যার লক্ষণে অবিদ্যাকে ভাবরূপা বলা হলেও অবিদ্যা প্রকৃতপক্ষে ভাবরূপা নয়, এটা 'ভাবাভাববিলক্ষণা', অনির্বাচ্যা। অদ্বৈতবাদী অবিদ্যালক্ষণোক্ত ভাব শব্দের স্বাভাবিক ভাবরূপতা অর্থ পরিত্যাগ করে ভাব শব্দের 'অভাববিলক্ষণ' রূপ গৌণ অর্থ গ্রহণ করেছেন। অবিদ্যা কেবল অভাবেরই উপাদান নয়, অবিদ্যা ভাব বস্তুরও উপাদান। এই অবস্থায় অবিদ্যাকে শুধু অভাববিলক্ষণ বললে চলবে না; এটাকে ভাববিলক্ষণও বলতে হবে। ফলে ভাব শব্দের 'ভাবাভাববিলক্ষণা' বা অনির্বাচ্যই হবে প্রকৃত অর্থ।

অনির্বাচ্য অবিদ্যাররহস্য এই যে, অবিদ্যা সৎও নয়,  অসৎও নয়, সদসৎও নয়; ভাবও নয়, অভাবও নয়, ভাবাভাবও নয়, এরূপেই মধুসূদন সরস্বতী তাঁর অদ্বৈতসিদ্ধিতে অনির্বাচ্য অবিদ্যার লক্ষণ নিরূপণ করার চেষ্টা করেছেন। যথা"অবিদ্যা ভাবাভাববিলক্ষণং যৎকিঞ্চিদ্বস্তু সত্ত্বরহিতত্বে সতি সদসত্ত্বরহিতত্বম"- (অদ্বৈতসিদ্ধি, অনির্বাচ্যত্বলক্ষণোপপত্তিঃ)

পঞ্চপাদিকা বিবরণে আচার্য প্রকাশাত্মযতি বলছেনমায়া অবিদ্যা ভিন্ন তত্ত্ব নয়। মায়া অবিদ্যারই নামান্তর। ভাষ্যকার ভগবান্ শঙ্করাচার্য ব্রহ্মসূত্র .. ভাষ্যে মায়া শক্তিকে "অবিদ্যাত্মিকা" বলে মায়া অবিদ্যার অভেদই উপপাদন করেছেন। মায়া অবিদ্যা বস্তুতঃ এক হলেও ব্যবহারে দেখা যায় যে, ব্রহ্মের তিরস্করণী (আবরণশক্তি প্রধানা) মায়াকে অবিদ্যা, আর বিশ্ব-জননী (বিক্ষেপশক্তিপ্রধানা) মায়াকে মায়া বলা হয়ে থাকে।

অব্যক্ত নামক পরমেশ্বরের শক্তিই অনাদি অবিদ্যা। ভগবান্ শঙ্করাচার্য বিবেকচূড়ামণি গ্রন্থে বলেছেন"অব্যক্তনাম্নী পরমেশশক্তিরনাদ্যবিদ্যা ত্রিগুণাত্মিকা পরা" অর্থাৎ "অব্যক্ত নামক পরমেশ্বরের শক্তিই অনাদি অবিদ্যা। ইহা সত্ত্ব, রজঃ তমঃ এই ত্রিগুণাত্মিকা এবং পরা অর্থাৎ কারণরূপা।" সদানন্দযোগীন্দ্র সরস্বতী বেদান্তসারে এই বিষয়ে শ্রুতি প্রমাণ দিচ্ছেন"দেবাত্মশক্তিং স্বগুণৈঃ নিগূঢ়াম্"-( শ্বেতাশ্বতর উপনিষৎ-/)

তবে শঙ্করশিষ্য সুরেশ্বরাচার্য নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধিতে অবিদ্যা বিষয়ে বলেছেন—"ঐকত্ম্যাপ্রতিপত্তির্যা স্বাত্মানুভবসংশ্রয়া। সাহবিদ্যা সংসৃতের্বীজং তন্নাশো মুক্তিরাত্মনঃ" অর্থাৎ স্বাত্মানুভবসংশ্রয়া সংসারবীজরূপ যে একাত্মতার অপ্রতিপত্তি (অজ্ঞান) তাই অবিদ্যা। তার নাশই আত্মার মুক্তি। অবিদ্যাবশতঃই দেহকে 'আমি' বলে বোধ হয়। এই দেহবন্ধন অবিদ্যাকল্পিত। মনের অতিরিক্ত অবিদ্যা নেই; মনই সংসার বন্ধনের হেতু অবিদ্যা। মনের নাশ হলে সকল সংসার বন্ধন নষ্ট হয়ে যায়।

অবিদ্যা ভ্রান্তিস্বরূপা। সপ্তশতী চণ্ডীর দেব্যাদূতসংবাদ নামক পঞ্চম অধ্যায়ে বর্ণিত আছে "যা দেবী সর্বভূতেষু ভ্রান্তিরূপেণ সংস্থিতা।" অর্থাৎ 'যে দেবী সর্বপ্রাণীতে ভ্রান্তিরূপে অর্থাৎ যা যা নয়, তাকে তা মনে করারূপ মিথ্যাজ্ঞানরূপে অবস্থিতা।' বিদ্যা বা জ্ঞানের দ্বারা এই অবিদ্যার নিবৃত্তি হয়। আচার্য বিদ্যারণ্য স্বামী 'পঞ্চদশী' চিত্রদীপে তাই বলেছেন"সংসারঃ পরমার্থোহয়ং সংলগ্নঃ স্বাত্মবস্তুনি। ইতি ভ্রান্তিরবিদ্যা স্যাদ্বিদ্যয়ৈষা নিবর্ততে", অর্থাৎ "এই সংসার পরমার্থতঃ আত্মায় যুক্ত, এরূপ যে ভ্রান্তি, তাই অবিদ্যা। বিদ্যা বা জ্ঞানের দ্বারা এই অবিদ্যার নিবৃত্তি হয়।"

ভগবান্ ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য ব্রহ্মসূত্রের অধ্যাসভাষ্যে একই সুরে বলেছেন"অধ্যাসং পণ্ডিতাঃ অবিদ্যা ইতি মন্যন্তে" অর্থাৎ এই অধ্যাসকে (—ভ্রমকে) পণ্ডিতগণ মূলাবিদ্যার কার্য হওয়ায় অবিদ্যা বলে মনে করেন।" এই মূলাবিদ্যা কি? 'পঞ্চদশী' চিত্রদীপে আচার্য বিদ্যারণ্য স্বামী তা স্পষ্ট করেছেন—"অয়ং জীবো কূটস্থং বিবিনক্তি কদাচন। অনাদিরবিবেকোহয়ং মূলাবিদ্যেতি গম্যতাম্", অর্থাৎ "এই জীব কখনই কূটস্থকে বিবেকদ্বারা আপনা হতে পৃথক করে বুঝতে পারে না। এই যে অনাদি অবিবেক, ইহাকে মূল-অবিদ্যা বলে বুঝতে হবে।"

সুতরাং অবিদ্যা হতে উৎপন্ন এই জগৎ অনাদি হলেও প্রাগভাবের ন্যায় নাশশীল, নিত্য নয়; এটা স্পষ্ট উপলব্ধ হয়। প্রাগভাব (প্রাক্+অভাব) অর্থাৎ কোন বস্তু কোন সময়ে উৎপন্ন হয়েছে বললে এটাও বোঝায় যে সেই বস্তু সেই সময়ের প্রাক্ (পূর্বে) বর্তমান ছিল না; তখন তার 'অভাব' ছিল। এই অভাব অনাদি। কিন্তু সেই বস্তুর উৎপত্তির সঙ্গে ওটার সেই 'প্রাগভাব'টি নষ্ট হয়ে যায়। এই প্রকার অবিদ্যা অনাদি হলেও জ্ঞান উৎপত্তির সঙ্গে সঙ্গে এর বিনাশ হয়। তাই অবিদ্যা প্রাগভাবের ন্যায় অনিত্য।....

তথ্যসূত্রঃ-

. ভগবান্ শঙ্করাচার্যের শারীরক-মীমাংসা ভাষ্য "বিবেকচূড়ামণি"

. আচার্য বিদ্যারণ্য স্বামীর "পঞ্চদশী"

. "বেদান্তদর্শন-অদ্বৈতবাদ", কাব্য-ব্যাকরণ-সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ আশুতোষ শাস্ত্রী বিদ্যাবাচস্পতি।

শ্রীশুভ চৌধুরী

সেপ্টেম্বর , ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ।


Friday, 26 August 2022

ব্রহ্ম জগতের বিবর্ত্তোপাদানঃ-

 


ব্রহ্ম অবিকারী এবং কূটস্থ। ব্রহ্মের কোনপ্রকার বিকার বা পরিণাম নেই। অদ্বৈতবেদান্তে ব্রহ্ম অপরিণামী উপাদান বা বিবর্ত্ত উপাদান, এই দৃশ্যমান বিশ্বপ্রপঞ্চ মায়ার পরিণাম এবং ব্রহ্মের বিবর্ত্ত। অজ্ঞানবশতঃ রজ্জুতে যেমন মিথ্যা সর্পের সৃষ্টি হয়, শুক্তিতে যেমন মিথ্যা রজতের ভাতি হয়, সেরূপই অবিদ্যাবশে পরব্রহ্মে মিথ্যা জগতের ভাতি হয়ে থাকে। ব্রহ্মপরিণামবাদীর মতানুসারে ব্রহ্মের বাস্তব পরিণাম স্বীকার করতে গেলেই শ্রুতি প্রতিপাদিত পরব্রহ্মের নির্বিকারত্ব ব্যাহত হয়।বেদান্তমীমাংসা শাস্ত্রের কৃৎস্নপ্রসক্ত্যধিকরণের প্রতিপাদ্য বিষয় হল নিরবয়ব ব্রহ্মের জগদ্রূপে মায়িক পরিণাম অর্থাৎ বিবর্ত্ত। এই বিষয়ে সর্বাগ্রে শ্রীভারতী তীর্থের বৈয়াসিক ন্যায়মালার অনুসরণে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করব। "ইন্দ্রঃ মায়াভিঃ পুরুরূপঃ ঈয়তে"-(ঋগ্বেদ সংহিতা-৬/৪৭/১৮) অর্থাৎ "ইন্দ্র মায়াসকলের দ্বারা বহুপ্রকার রূপ ধারণ করেন" ইত্যাদি শ্রুতিতে মায়া সকলের দ্বারা ব্রহ্মের বহুরূপতা অবগত হওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সমগ্রভাবে পরিণামবশতঃ অথবা অংশতঃ পরিণামবশতঃ তাঁর বহুরূপতা হয় না। আচ্ছা, অবয়ববিহীন ব্রহ্মের দুগ্ধ ও দধি প্রভৃতির ন্যায় পরিণাম কিপ্রকারে হবে? তা বলা হচ্ছে— উক্ত পরিণাম কিন্তু বাস্তব নয়। যেহেতু এই ব্রহ্মকারণবাদে নিরবয়ব হলেও ব্রহ্মের মায়িক পরিণাম অর্থাৎ বিবর্ত্ত যুক্তিসঙ্গত। সেইহেতু সমগ্রভাবে পরিণাম এবং একাংশে পরিণাম, এই কল্পনাদ্বয়ের এখানে অবকাশ নেই। আর "সাবয়ব বস্তুই উপাদান", এই যুক্তিও মায়িক পরিণামে অর্থাৎ বিবর্ত্তে সঙ্গত নয়। এই বিষয়ে ভামতীকার বাচস্পতি মিশ্র বলেন— "জীবাশ্রিত মায়ার দ্বারা বিষয়ীকৃত হয়ে ব্রহ্ম স্বতঃই জড়তার আশ্রয়ীভূত জগৎপ্রপঞ্চরূপে বিবর্তিত হন।"

এখন ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্যের ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্যানুসারে বিস্তৃত আলোচনা করব।

"শ্রুতেস্তু শব্দমূলত্বাৎ"৷৷-(ব্রহ্মসূত্র-২/১/২৭)

'তু' শব্দটির দ্বারা ভগবান সূত্রকার আক্ষেপকে পরিহার করছেন। কৃৎস্নপ্রসক্তি অর্থাৎ ব্রহ্মের সমগ্রভাবে জগদাকারে পরিণামপ্রাপ্তি হয় না। তাতে হেতু কি? "শ্রুতে"— অর্থাৎ যেহেতু "যতো বা ইমানি ভূতানি জায়ন্তে"-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-৩/১) "যাঁ হতে এই ভূতসকল উৎপন্ন হয়", ইত্যাদি শ্রুতিতে যেমন ব্রহ্মের জগদুপাদনতা শ্রত হচ্ছে, এইরূপে "তাবানস্য মহিমা ততো জ্যায়াংশচ পূরুষঃ। পাদোহস্য সর্বা ভূতানি ত্ৰিপাদস্যামৃতং দিবীতি"-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ- ৩/১২/৬) অর্থাৎ "ব্রহ্মের চতুষ্পদ ও ষড়বিধ বিকারাত্মক যে পরিমাণ একপাদ গায়ত্রী বলে বর্ণিত হল, সেই পরিমাণই অৰ্থাৎ তৎসমস্তই উক্ত গায়ত্রী সংজ্ঞক সমস্ত ব্ৰহ্মের মহিমা, অর্থাৎ বিভূতির বিস্তার ; অতএব, তদাপেক্ষা অর্থাৎ গায়ত্রী-সংজ্ঞক বাচারম্ভণমাত্ররূপী অসত্য বিকারাত্মক ব্ৰহ্ম অপেক্ষাও পরমার্থ সত্য, বিকারহীন পুরুষ (পরব্রহ্ম) অতিশয় মহৎ ; কারণ, তিনিই সর্ব জগৎকে পরিপূরণ করেন, অথবা হৃদয়রূপ পুরে অবস্থান করেন, এইজন্য পুরুষ-পদবাচ্য হন। সমস্ত ভূত অর্থাৎ তেজ, জল ও পৃথিবী প্রভৃতি স্থাবর-জঙ্গম-সমূহ সেই এই পুরুষেরই একপাদ (একাংশমাত্র); এই গায়ত্র্যাত্মক সমস্ত ব্ৰহ্মের ত্রিপাদযুক্ত অমৃতস্বরূপ পুরুষ প্রকাশময় নিজ আত্মস্বরূপে অবস্থিত আছেন", ইত্যাদি শ্রুতিতে কার্য-ব্যতিরেকে তাঁর অস্তিত্বও শ্রুত হচ্ছে। এপ্রকারে শ্রুতিকর্তৃকই বিবর্ত্তবাদ স্পষ্টীকৃত হয়েছে, যেহেতু পরিণামবাদে কার্যব্যতিরেকে নিরবয়ব কারণের অস্তিত্ব সম্ভব হয় না। অতএব কার্যব্যতিরেকে ব্রহ্মের অস্তিত্ব শ্রুতিতে পঠিত হচ্ছে বলে ব্রহ্মের সমগ্রভাবে জগদাকারে পরিণামপ্রাপ্তিরূপ দোষের অবকাশ নেই। কিন্তু যুক্তির দ্বারা বাধিত হওয়ায় শ্রুতিই বা কি প্রকারে কার্যব্যতিরেকে ব্রহ্মের অস্তিত্ব বোধ করাবেন? তদুত্তরে ভগবান সূত্রকার বলছেন"শব্দমূলত্বাৎ"—যেহেতু ব্রহ্ম একমাত্র বেদরূপ প্রমাণগম্য। অতীন্দ্রিয় ব্রহ্মবস্তুর স্বরূপ শ্রুতিমাত্রগম্য। 'অচিন্ত্যাঃ খলু যে ভাবা ন তাংস্তর্কেণ যোজযেত্৷ প্রকৃতিভ্যঃ পরং যচ্চ তদচিন্ত্যস্য লক্ষণম্'-(মহাভারত, ভীষ্মপর্ব-৫/১২) অর্থাৎ "যে সকল পদার্থ চিন্তার অতীত, তাদেরকে তর্কের সহিত যোজনা করা অর্থাৎ যুক্তির দ্বারা বাধিত করা উচিত নয়। যা প্রকৃতি হতে বিলক্ষণ কেবলমাত্র শাস্ত্র ও আচার্যের উপদেশগম্য, তাই অচিন্ত্যের লক্ষণ (—স্বরূপ)।" অতএব তর্কের অগম্য হওয়ায় অতীন্দ্রিয় বস্তুর যথার্থস্বরূপবিষয়কজ্ঞান নিশ্চয়ই শব্দমূল (—বেদরূপ প্রমাণগম্য)। অতএব নিরবয়ব ব্রহ্ম জগদ্রূপে পরিণত হলেও তদতিরিক্ত অবিকৃত নিরবয়বস্বরূপেও অবস্থান করেন, আগমপ্রমাণবলে ইহা সিদ্ধ হয়। সুতরাং এতে সিদ্ধান্তীপক্ষে নিরবয়বত্বশব্দকোপরূপ দোষ হয় না অর্থাৎ ব্রহ্মের নিরবয়বতা প্রতিপাদক শ্রুতিবাক্যের বাধিত হওয়া নিরাকৃত হল।

ব্রহ্ম নিরবয়ব হলে জগতের পরিণামী উপাদান হতে পারবেন না; সাবয়ব হলে বিনাশী হয়ে পড়বেন ও নিরবয়বত্ব প্রতিপাদিকা শ্রুতিসকল বাধিত হয়ে পড়বে; বস্তুর স্বরূপে বিকল্প সম্ভব নয় এবং অন্যপ্রকার উপপত্তিও প্রাপ্ত হওয়া যাচ্ছে না; এ সকল হেতুবশতঃ ব্রহ্মের জগৎকারণতাপ্রতিপাদিকা শ্রুতির প্রামাণ্য দুর্ঘট, ইত্যাদি। তদুত্তরে বলব এটা দোষ নয়, যেহেতু অবিদ্যার দ্বারা কল্পিত রূপের বিভিন্নতা অঙ্গীকার করা হয়। ব্রহ্ম স্বরূপতঃ নিরবয়ব ও অবিকারি, মায়াবশতঃ তাঁর নানা মিথ্যা পরিণাম অঙ্গীকৃত হয়, সুতরাং দুর্ঘটত্বদোষ হয় না। কিন্তু এপ্রকারে রূপভেদ অঙ্গীকার করলে ব্রহ্মের সাবয়বতা দুর্বার হয়ে পড়বে। তদুত্তরে বলবঅবিদ্যাকল্পিত রূপভেদের দ্বারা বস্তু কদাপি সাবয়ব হয়ে পড়ে না। যার চক্ষু তিমির-রোগগ্রস্ত, তৎকর্তৃক যেন অনেকরূপে পরিদৃশ্যমান চন্দ্রমা নিশ্চয়ই অনেক হয়ে পড়ে না। কিন্তু নামরূপের বিভিন্নতা অবিদ্যাকল্পিত হলে অবিদ্যাই হবে জগৎ-কারণ, ব্রহ্ম নন। তদুত্তরে বলব অবিদ্যার দ্বারা কল্পিত নাম ও রূপাত্মক যে রূপভেদ, যা ব্যক্ত ও অব্যক্তস্বরূপ এবং যা সৎ নয় ও অসৎ নয় বলে তত্ত্ব এবং অন্যত্বের দ্বারা 'এটা এপ্রকার অথবা এপ্রকার নয়'— এরূপে নির্বাচনীয় নয়, তা দ্বারা তদধিষ্ঠানভূত ব্রহ্ম পরিণাম প্রভৃতি সকলপ্রকার ব্যবহারের আশ্রয় হয়ে থাকেন সুতরাং ব্রহ্মই কারণ, পারমার্থিক সত্তাহীন অবিদ্যা নয়। কিন্তু অবিদ্যার আশ্রয়ভূত ব্রহ্মের অপরিণামিতা কি প্রকারে সিদ্ধ হবে? তদুত্তরে বলব পারমার্থিকরূপে স্বীয় যথার্থস্বরূপে, তিনি সকল প্রকার ব্যবহারের অতীত অপরিণামিরূপে অবস্থান করেন। আর অবিদ্যার দ্বারা কল্পিত নাম ও রূপের বিভিন্নতা বাঙ্মাত্রকে অবলম্বনকরতঃ (ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬/১/৪) বর্তমান থাকে বলে (—পরমার্থতঃ থাকে না বলে) ব্রহ্মের নিরবয়বতা বাধিত হয় না। কিন্তু "সচ্চ ত্যচ্চ অভবৎ....যদিদং কিঞ্চ" (তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২/৬) ইত্যাদি শ্রুতিপ্রতিপাদ্য ব্রহ্মের পরিণাম বাঙ্মাত্রকে অবলম্বনকারী মিথ্যা কি প্রকারে হবে? তদুত্তরে বলব এই পরিণামবিষয়িণী শ্রুতি অর্থাৎ সৃষ্টিপ্রতিপাদক শ্রুতিবাক্যসকল, ব্রহ্মের পরিণাম প্রতিপাদনের জন্য নয়, যেহেতু তদ্বিষয়ক জ্ঞান হলে কোনরূপ ফল অবগত হওয়া যায় না। আচ্ছা, উক্ত শ্রুতিবাক্যসকল তা হলে কি প্রতিপাদন করে? উত্তরে বলব এই পরিণামবিষয়িণী শ্রুতি সকলপ্রকার ব্যবহারের অতীত ব্রহ্মাত্মভাব প্রতিপাদনের জন্য, যেহেতু তদ্বিষয়ক জ্ঞান হলে মোক্ষরূপ ফল অবগত হওয়া যায়। ব্রহ্মাত্মজ্ঞান হলে মোক্ষরূপ ফল হয়, এই বিষয়ে প্রমাণ প্রদর্শন করব "সঃ এষঃ নেতি নেতি আত্মা", "সেই এই আত্মা ইহা নয়, ইহা নয়", এইপ্রকারে আরম্ভ করে শ্রুতি বলছেন "অভয়ং বৈজনক প্রাপ্তঃ অসি" (বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪/২/৪) "হে জনক, তুমি ভয়শূন্যকে অর্থাৎ জন্মমরণাদিভয়রহিত ব্রহ্মকে প্রাপ্ত হয়েছ", ইত্যাদি। সেহেতু এইপ্রকারে নিরবয়ব ও অবিকারি ব্রহ্মের মিথ্যা পরিণাম অঙ্গীকৃত হওয়ায়, বিবর্ত্তবাদী আমাদের পক্ষে কৃৎস্নপ্রসক্তি ও নিরবয়বত্ব-শব্দকোপ প্রভৃতি কোনপ্রকার দোষের সম্ভাবনা নেই।

তাছাড়া ভগবান্ সূত্রকার বাদরায়ণ স্বপ্নের প্রকাশক সাক্ষিচৈতন্যকে দৃষ্টান্তরূপে গ্রহণের দ্বারা ব্রহ্মের বিবর্ত্তোপাদানতাই প্রতিপাদন করেছেন, যথা

আত্মনিচৈবং বিচিত্রাশ্চ হি৷৷-(ব্রহ্মসূত্র-//২৮)

এই সূত্রের ভাষ্যে ভগবান্ ভাষ্যকার শঙ্কর স্পষ্ট করছেনআর দেখ এই বিষয়ে বিবাদ করা উচিত নয় যে, কিপ্রকারে স্বরূপের নাশ ব্যাতিরেকেই একব্রহ্মে অনেকপ্রকার আকারবিশিষ্ট সৃষ্টি হবে? যেহেতু '' তত্র রথা রথযোগা পন্থানো ভবন্ত্যথ রথান্রথযোগান্পথঃ সৃজতে'-বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-//১০, অর্থাৎ 'সেখানে (স্বপ্নে) রথসকল থাকে না, অশ্বসকল থাকে না এবং পথসকল থাকে না অথচ তিনি রথসকল অশ্বসকল পথসকলকে সৃষ্টি করেন।' ইত্যাদি শ্রুতিবাক্যের দ্বারা স্বপ্নদর্শী এক আত্মাতেও স্বরূপের নাশ ব্যাতিরেকেই অনেকপ্রকার আকারবিশিষ্ট সৃষ্টি পঠিত হচ্ছে। আর লোকমধ্যেও দেবতা প্রভৃতিতে এবং মায়াবী প্রভৃতিতে স্বরূপের নাশ ব্যতিরেকেই হস্তী অশ্ব প্রভৃতি বিচিত্র সৃষ্টিসকল পরিদৃষ্ট হচ্ছে। এই প্রকার এক ব্রহ্মেও স্বরূপের নাশ ব্যতিরেকেই অনেকপ্রকার আকার বিশিষ্ট সৃষ্টি হবে। ..........

শ্রীশুভ চৌধুরী

আগস্ট ২৬, ২০২১ খ্রিষ্টাব্দ।

জ্ঞানী ভোগ্যবিষয়ে মনের কঠিনতা আর ভগবদ্বিষয়ে মনের কোমলতা সম্পাদন করে—

  আচার্য মধুসূদন সরস্বতী ভক্তিরসায়নে বলছেন — কাঠিন্যং বিষয়ে কুর্যাদ্ দ্রবত্বং ভগবৎপদে। উপায়ৈঃ শাস্ত্রনির্দিষ্টৈরনুক্ষণমতো ব...