Friday, 7 July 2023

উপাসকগণের জন্যই ব্রহ্মের রূপকল্পনা, ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরের স্বরূপঃ-

 


বেদান্তমতে পদার্থ দ্বিবিধদৃক্ এবং দৃশ্য। অন্যান্য বাদিগণের পরিকল্পিত পদার্থসমূহ এই দুই পদার্থেই অন্তর্ভাব হয়ে থাকে। তন্মধ্যে দৃক্ পদার্থ আত্মা, তা পারমার্থিক এবং এক। সর্বদা একরূপ হলেও ঔপাধিক ভেদে ত্রিবিধ হয়ে থাকেন, যথাঈশ্বর, জীব সাক্ষী। তন্মধ্যে কারণীভূত অজ্ঞান যাঁর উপাধি তিনিই ঈশ্বর।

তন্মধ্যে ঈশ্বর স্বকীয় উপাধি অবিদ্যার সত্ত্ব রজঃ তমঃ এই তিন গুণের ভেদবশতঃ বিষ্ণু, ব্রহ্মা রুদ্রভেদে ত্রিবিধ হয়ে থাকেন। কারণীভূত সত্ত্বগুণরূপ উপাধি দ্বারা অবচ্ছিন্ন (উপাধি) ঈশ্বরচৈতন্য বিষ্ণু, তিনি পালনকর্তা। কারণীভূত রজঃগুণ দ্বারা উপহিত ঈশ্বরচৈতন্য ব্রহ্মা, তিনি সৃষ্টিকর্তা। যদ্যপি মহাভূতের কারণ না হওয়াতে হিরণ্যগর্ভ ব্রহ্মা নন, তথাপি স্থূলভূতের সৃষ্টিকর্তা হওয়াতে কোন কোন স্থলে তাঁকে উপাচারবশতঃ ব্রহ্মা বলা হয়। কারণীভূত তমোগুণ দ্বারা উপহিত ঈশ্বরচৈতন্য রুদ্র, ইনি সংহারকর্তা।

এরূপ এক ঈশ্বরেরই চতুর্ভূজ, চতুর্মুখ এবং পঞ্চমুখ প্রভৃতি পুরুষাকারভেদ এবং শ্রী, ভারতী, ভবানী প্রভৃতি স্ত্রী আকার ভেদ হয়ে থাকে। এতদ্ভিন্ন মৎস্য কূর্মাদি অনন্ত অবতারগণও লীলাবশতঃ ভক্তগণের অনুগ্রহের নিমিত্ত আবির্ভূত হয়ে থাকেন। রামপূর্বতাপনী উপনিষদে বলা হয়েছে

চিন্ময়স্যাদ্বিতীয়স্য নিষ্কলস্যাশরীরিণঃ।

উপাসকানাং কার্য্যার্থং ব্রহ্মণো রূপকল্পনা।।

-(রামপূর্বতাপনী উপনিষৎ -১।৭)

অর্থাৎ উপাসকগণের কার্যনিমিত্তই চৈতন্যস্বরূপ, অদ্বিতীয়, নিরবয়ব অশরীরী ব্রহ্মের রূপকল্পনা হয়ে থাকে।.....

তথ্যসূত্রঃ-

ভগবান্ শঙ্করাচার্যের নির্বাণদশকমের উপর পরমহংস পরিব্রাজকাচার্য শ্রীমন্মধুসূদন সরস্বতীকৃত সিদ্ধান্তবিন্দু।

শ্রীশুভ চৌধুরী

জুলাই , ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।

শঙ্করাচার্য শুদ্রবিদ্বেষী ছিলেন এই অপপ্রচার জবাবঃ-

 


অপপ্রচার—"শঙ্করাচার্য শুদ্রবিদ্বষী ছিলেন, তিনি ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্যে বেদশ্রবণকারী শুদ্রের কর্ণবিবরে গরমসীসা ঢালার কথা বলেছেন, শুদ্রকে ব্রহ্মবিদ্যার অধিকার দেন নি।"

জবাব — প্রথমত আচার্য শঙ্কর ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্যে এটা গৌতম স্মৃতির বচন উদ্বৃত করেছেন, যথা'অথ হাস্য বেদমুপশ্রৃণ্বতস্ত্রপুজতুভ্যাং শ্রোত্রপ্রতিপূরণম্'-(গৌতম ধর্ম্মসূত্র-১২/) এই গৌতম স্মৃতির মস্করি ভাষ্যে বলা হয়েছে— 'পঞ্চম বর্ষের উর্দ্ধবয়স্ক শুদ্র যদি বুদ্ধিপূর্বক (ভ্রমবশতঃ নহে) সন্নিকৃষ্ট স্থান হতে 'সাঙ্গবেদ' শ্রবণ করে তাহলে সীসা দ্বারা কর্ণবিবরপরিপূরণরূপ প্রায়শ্চিত্ত বিধি স্মৃতি দিয়েছে।' স্মৃতিতে এই কঠোর বিধানগুলো কেন দেয়া হয়েছে তা বর্তমানে শাস্ত্রবিকৃতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনাচারের দৃষ্টান্ত দেখলেই বোধগম্য হয়।

শুদ্রের সরাসরি বেদমূলক বিদ্যাতে অধিকার না থাকলেও আচার্য শঙ্কর কিন্তু ব্রহ্মসূত্রের সেই অপশুদ্রাধিকরণের ভাষ্যে ইতিহাস পুরাণাদি অবলম্বনে শুদ্রের ব্রহ্মবিদ্যাতে অধিকার দিয়েছেন। যথা

"শ্রাবয়েচ্চতুরোবর্ণান্ ' ইতি চেতিহাসপুরাণাধিগমে চাতুর্বর্ণ্যস্যাধিকারস্মরণাৎ৷"-(শাঙ্করভাষ্যম্, ব্রহ্মসূত্র-..৩৮) অর্থাৎ "চারিবর্ণকে শ্রবণ করাইবে", এইপ্রকারে ইতিহাস পুরাণের জ্ঞানলাভে চারিবর্ণেরই অধিকার স্মৃতিতে বর্ণিত হওয়ায়, "সেই সকল হইতে তাহাদের জ্ঞানোৎপত্তি হইবে"

"শ্রাবয়েচ্চতুরোবর্ণান্ কৃত্বা ব্রাহ্মণমগ্রত।"-(মহাভারত, শান্তিপর্ব-৩২৭/৪৯) এই স্মৃতিতে বর্ণিত আছে- 'ব্রাহ্মণকে অগ্রে রেখে চারিবর্ণকেই শ্রবণ করাইবে।' তাছাড়া ইতিহাস পুরাণকে পঞ্চমবেদের উপাধি শাস্ত্র দিয়েছে।

Wednesday, 5 July 2023

সাক্ষীর স্বরূপ—

 


শ্রুতিতে "সাক্ষী চেতা কেবলো নির্গুণশ্চ।" -(শ্বেতাশ্বতর উপনিষৎ-/১১) বলে সাক্ষীর স্বরূপ নির্ণয় করা হয়েছে। এই শ্রুতির ভাষ্যে ভগবান্ শঙ্করাচার্য বলেছেন —"সর্বভূতের সাক্ষী অর্থাৎ সাক্ষাৎ দ্রষ্টা, ব্যাকরণ শাস্ত্রে সাক্ষাৎ দ্রষ্টাকেই 'সাক্ষী' সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। চেতা অর্থ চেতয়িতাচেতন বা চৈতন্যসম্পন্ন, কেবল অর্থ কোনপ্রকার উপাধিবিশেষ বা ধর্ম তার নেই। নির্গুণ অর্থ সত্ত্ব, রজঃ তমোগুণরহিত।" সুতরাং নির্গুণ নির্বিশেষ চৈতন্যই সাক্ষী, এটাই শ্রুতির মর্ম।

সাক্ষী কাকে বলে? এই প্রশ্নের উত্তরে চিৎসুখাচার্য বলেছেন যে, "সর্ব্বপ্রত্যগ্ভূতং বিশুদ্ধং ব্রহ্মাত্র জীবাভেদেন সাক্ষীতি ব্যপদিশ্যতে"-(চিৎসুখী) অর্থাৎ বিশুদ্ধ ব্রহ্মই জীবাভিন্ন হয়ে সাক্ষী বলে কথিত হন। এক অদ্বিতীয় মায়াতীত, নির্গুণ, বিশুদ্ধ পরব্রহ্মই জীবের অধিষ্ঠান বা আশ্রয় থেকে জীবের সহিত অভিন্নরূপে প্রতিভাত হয়ে এবং প্রত্যেক জীব-শরীরের ভেদে ভিন্নের ন্যায় প্রতীতি গোচর হয়ে সাক্ষী বলে অভিহিত হয়ে থাকেন। সাক্ষী স্বয়ং উদাসীন, সুতরাং সাক্ষী জীবকোটিও নয়, ঈশ্বরকোটিও নয়। কেন না, জীব বা ঈশ্বর কেউই উদাসীন নন। কূটস্থ চৈতন্যই স্বভাবতঃ উদাসীন এবং সাক্ষী হবার যোগ্য। আচার্য বিদ্যারণ্য স্বামী তৎকৃত পঞ্চদশীর কূটস্থ দীপে জীবের স্থুল সূক্ষ্ম এই দুই প্রকার শরীরের অধিষ্ঠান বা আশ্রয় নির্বিকার কূটস্থ চৈতন্যকে সাক্ষী বলে অভিহিত করেছেন।

স্বয়ংজ্যোতি প্রকাশস্বভাব সর্বাবভাসক চৈতন্য দৃক্ বা জ্ঞানস্বরূপ হলেও ওটাকে দ্রষ্টা বলেই লোকে মনে করে। দৃক্ স্বরূপ শুদ্ধ চৈতন্যের দ্রষ্টৃত্ব বা দর্শন ক্রিয়ার কর্তৃত্ব স্বাভাবিক নয়, ওটা ঔপাধিক। কূটস্থ চৈতন্যের সহিত জীব-চৈতন্যের অন্যোন্যাধ্যাসের ফলে অভেদ বোধের উদয় হয়ে থাকে বলে সাক্ষী জীব অভিন্ন বলে বোধ হয়, বস্তুতঃ ওরা অভিন্ন নয়। কূটস্থ সাক্ষী চৈতন্যের কোন প্রকার ভোগ নেই, সে উদাসীন দ্রষ্টা মাত্র। কিন্তু জীব তাঁর স্বীয় কর্মানুরূপ সুখ, দুঃখ ফল ভোগ করে থাকে, সুতরাং বিষয়ভুক্ জীব-চৈতন্যকে কোনমতেই উদাসীন সাক্ষী বলা যায় না। জীব সাক্ষীর ভেদ কিরূপ, তা আচার্য বিদ্যারণ্য স্বামী পঞ্চদশীর নাটকদীপে নাটকীয় রঙ্গমঞ্চের প্রদীপের দৃষ্টান্তের উল্লেখ করে পরিস্কার ভাবে আমাদের বুঝাবার চেষ্টা করেছেন।

রঙ্গমঞ্চের প্রদীপ যেমন নাচঘর, নট, নটী, দর্শক প্রভৃতি সকলকেই সমানভাবে প্রকাশিত করে, এবং অভিনয় সমাপ্ত হলে নট, নটী, দর্শকগণ চলে গেলেও পূর্বের ন্যায়ই জ্বলতে থাকে, সেরূপ সর্বসাক্ষী স্বপ্রকাশ ব্রহ্ম-দীপ জীব, জৈব অহঙ্কার, বুদ্ধি-বৃত্তি, ইন্দ্রিয় প্রভৃতি সকলকে স্বীয় ভাস্বর জ্যোতিঃদ্বারা প্রকাশিত করে, আবার সর্বপ্রকার জৈব অভিমান, বুদ্ধি, ইন্দ্রিয়-বৃত্তি প্রভৃতি বিলীন হলে ওদের অবর্তমানেও পূর্ণ জ্যোতিতেই বিরাজ করতে থাকে। সংসারের রঙ্গমঞ্চে সর্বদা বুদ্ধির নৃত্য চলছে। অহং অভিমানী জীব বিষয় ভোগের আশায় মশগুল। অহং অভিমানী জীবই গৃহ-স্বামী। বিষয় সকল তাঁর ভোগের সাধন। ইন্দ্রিয়গণ বুদ্ধি-বিকাশের আনুকূল্য সম্পাদন করে বলে ওরা বুদ্ধির নৃত্যের তাল-লয়-রক্ষক বাদ্যকরস্থানীয়। কূটস্থ নিত্য চৈতন্য সাক্ষী। এই সর্বসাক্ষী নিত্য আনন্দময় জ্যোতিঃ বিদ্যমান আছে বলেই সংসারের রঙ্গশালায় বুদ্ধির নৃত্য দেখা যাচ্ছে। বুদ্ধির নৃত্যকলা সমাপ্ত হলেও এই নিত্য জ্যোতিঃ এই ভাবেই বিরাজ করবে। সাক্ষী সর্বপ্রকার অজ্ঞান লীলারই নিরপেক্ষ দ্রষ্টা।.....

তথ্যসূত্রঃ-

. ভগবান্ শঙ্করাচার্যের শ্বেতাশ্বতর উপনিষৎ ভাষ্য।

. "বেদান্ত দর্শনঅদ্বৈতবাদ" শীর্ষক গ্রন্থ, কাব্য-ব্যাকরণ-সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ, বিদ্যাবাচস্পতি, অধ্যাপক শ্রীআশুতোষ ভট্টাচার্য শাস্ত্রী।

শ্রীশুভ চৌধুরী

জুন ২৬, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।

আচার্যই যথার্থ জন্মদাতাঃ-

 


শরীরমেতৌ কুরুতঃ পিতামাতা ভারত।

আচার্যতস্তু যজ্জন্ম তৎ সত্যং বৈ তথামৃতম্।।

-(সনৎ-সুজাতীয় সংবাদ -৩।৭)

হে ভারত! মাতা পিতা উভয়ে এই শরীর মাত্র উৎপাদন করেন, তাঁহারা আত্মজ্ঞান উৎপাদন করেন না। কিন্তু আচার্য হইতে যে জন্মলাভ হয়, উহাই সত্য পরমার্থভূত অবিনাশী জন্ম। সুতরাং তিনিই যথার্থ জন্মদাতা।

পূর্বে ভগবান্ সনৎকুমার 'আচার্যযোনিমিহ..' এই শ্লোকে (৩।৫) আচার্যকে যোনি অর্থাৎ জন্মস্থান বলেও সম্বোধন করিয়াছেন। শিষ্য হওয়াই গুরুর গর্ভভূত হওয়া। শ্রুতিতে শ্রীগুরুকৃপায় বেদান্তবাক্য শ্রবণানন্তর তত্ত্বজ্ঞানলাভে কৃতকৃত্য শিষ্যগণ আচার্যকে পূজা করিতে করিতে বলিলেন—"আপনিই আমাদের পিতা, কারণ আপনি আমাদিগকে অবিদ্যার পরপারে লইয়া গেলেন।"-(প্রশ্ন উপনিষৎ, ৬।৮)

আপস্তম্ভ ঋষিও বলিয়াছেন—'বিদ্যাপ্রদানে আচার্য জন্ম দিয়া থাকেন। উহাই শ্রেষ্ঠ জন্ম। মাতাপিতা মাত্র শরীরটিকে উৎপন্ন করিয়া থাকেন।"....

শ্রীশুভ চৌধুরী

গুরু পূর্ণিমা, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।

বেদার্থ জ্ঞাতাই যথার্থ ব্রাহ্মণঃ-

 


বেদের বেদস্বরূপ আত্মার প্রতিপাদনপ্রকার সম্যক্ অবগত হয়ে যিনি তা ব্যাখ্যা করতে সমর্থ তিনিই যথার্থ ব্রাহ্মণ। বেদ বাক্যার্থ বর্ণনকুশল, অপরোক্ষ জ্ঞানবান্ পুরুষই যথার্থ ব্রাহ্মণ, ভগবান্ শ্রীসনৎ সুজাত তাই বলেছেন

"অভিজানামি ব্রাহ্মণমাখ্যাতারং বিচক্ষণম্।"

-(সনৎ-সুজাতীয় সংবাদ -/৪৫)

অর্থাৎ উপক্রমোপসংহারাদি ষড়বিধ তাৎপর্য লিঙ্গানুসারে বাক্যার্থ বর্ণনকুশল, শ্রুতার্থানুচিন্তন সমর্থ, পরিপক্ক নিদিধ্যাসন বলে অপরোক্ষ জ্ঞানবান্ পুরুষকেই যথার্থ ব্রাহ্মণ বলে আমি মনে করি।.....

শ্রীশুভ চৌধুরী

জুন ২৫, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।

Wednesday, 21 June 2023

শ্রীভগবানের 'অচ্যুত' নাম মাহাত্ম্যঃ-

 


এই 'অচ্যুত' পদটি ভগবানের সদা নির্বিকার স্বরূপের বাচ্যার্থে ব্যবহৃত হয়। বিষ্ণুসহস্রনামের ভাষ্যে শঙ্করাচার্য বলেছেন"ষড়ভাববিকার-রহিতত্বাদ্ অচ্যুতঃ।"—(শং ভা বিষ্ণু সঃ ৪৮)

অর্থাৎ জন্ম, উৎপত্তি, বৃদ্ধি, পরিণাম, অপক্ষয় বিনাশ এই ষড়ভাব-বিকার-রহিততাই তাঁর নাম অচ্যুত।

যাঁর স্বরূপের কখনও ক্ষয় হয় নি, হচ্ছে না বা কোনও কালে হবে না, তিনি অচ্যুত। মহানারায়ণ শ্রুতিতে উল্লেখ রয়েছে"শাশ্বতং শিবমচ্যুতম্"-(মহানারায়ণ উপনিষৎ-২।১৩।১) অর্থাৎ "তিনি সর্বকালে বিদ্যমান, নিত্য কল্যাণস্বরূপ এবং অচঞ্চল।"

যেমন ভগবানের বাক্য"যস্মান্নচ্যুত পূর্বোহহমচ্যুতস্তেন কর্মণা" ইতি—(শং ভা বিষ্ণুসহস্রনাম ২৪)

অর্থাৎ 'যেহেতু আমি পূর্বে চ্যুত (যুদ্ধাদি হতে ভ্রষ্ট) হই নি সেইহেতু অচ্যুত।......

শ্রীশুভ চৌধুরী

এপ্রিল ২০, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।

Saturday, 17 June 2023

ব্রহ্মজ্ঞই সর্বজ্ঞঃ-

 


ব্রহ্মজ্ঞই সর্বজ্ঞ, এই কথা ভগবান্ সনৎকুমার বলছেন

প্রত্যক্ষদর্শী লোকানাং সর্বদর্শী ভবেন্নরঃ।

সত্যে বৈ ব্রহ্মণি তিষ্ঠন্ তদ্বিদ্বান্ সর্ববিদ্ভবেৎ।।

-(সনৎ-সুজাতীয় সংবাদ-/৫০)

যোগবলে ভূর্ভুবাদি সর্বলোকসমূহ প্রত্যক্ষদর্শনকারী পুরুষ সর্বদর্শী হয়ে থাকেন। বিদ্বান সর্বরূপে পরমাত্মাকেই দর্শন করে থাকেন। এই বিদ্বান সত্যাদি লক্ষণযুক্ত ব্রহ্মেতেই স্থিত হয়ে তাঁতেই মন সমাহিত করে থাকেন। সত্যস্বরূপ এই ব্রহ্মকেই বিদ্বান নিজের সহিত অভিন্নরূপে জানেন বলে তিনি সর্ববিৎ অর্থাৎ সর্বজ্ঞরূপে কথিত হন। ইনিই যথার্থ সর্বজ্ঞ। কেবল অনাত্মমাত্র দর্শনকারী সর্বজ্ঞ নন।

কোন বস্তুরই অধিষ্ঠানাতিরিক্ত সত্তা নেই। অধিষ্ঠানের সত্তাই কল্পিত বস্তুর সত্তা। অতএব যিনি সর্বজগদধিষ্ঠান ব্রহ্মকে জেনেছেন তিনি স্বরূপতঃ সর্ববস্তুকেই জেনেছেন বলে তিনি যথার্থ সর্বজ্ঞ।......

শ্রীশুভ চৌধুরী

জুন ১৬, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।

Tuesday, 6 June 2023

পরব্রহ্মই জগদধিষ্ঠানঃ-

 


মুণ্ডকে শ্রুত হচ্ছে"যস্মিন্ দৌঃ পৃথিবী চান্তরিক্ষম্"-(মুণ্ডক উপনিষৎ-..) অর্থাৎ যাঁতে দ্যুলোক, পৃথিবী অন্তরিক্ষ সমর্পিত আছে", এই স্থলে দ্যুলোক ভূর্লোক প্রভৃতি কোন কিছুতে সমর্পিত আছে এই প্রকার শ্রুত হচ্ছে বলে কোন অধিষ্ঠানের প্রতীতি হচ্ছে। সেই অধিষ্ঠান বা আশ্রয় কি?

তদুত্তরে ভগবান্ সূত্রকার বাদরায়ণ সিদ্ধান্ত করছেন

দ্যুভ্বাদ্যায়তনং স্বশব্দাৎ৷৷ (ব্রহ্মসূত্র-..)

ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য এই সূত্রের ভাষ্যে বলেছেন

দৌঃ এবং ভূ (—দ্যুলোক এবং ভূর্লোক) এই প্রকারে 'দ্যুভূবৌ' এই পদ নিষ্পন্ন হয়, সেই দ্যু এবং ভূঃ হয় আদি যার, তা এই দ্যুভ্বাদি। এই বাক্যে এই যা দ্যুলোক পৃথিবী  অন্তরিক্ষ মন এবং প্রাণসকল (—ইন্দ্রিয়সকল) ইত্যাদি এইপ্রকার স্বরূপবিশিষ্ট জগৎ সূত্রাশ্রিত বস্ত্রের ন্যায় পরব্রহ্মে আশ্রিতরূপে নির্দিষ্ট হয়েছে, তার 'আয়তন' (—আশ্রয়, অধিষ্ঠান) হন পরব্রহ্ম, এটাই সঙ্গত। কোন হেতু বলে? 'স্বশব্দাৎ' অর্থাৎ যেহেতু 'আত্ম' শব্দের প্রয়োগ আছে, এটাই ভাব। 'তমেবৈকং জানথ আত্মানম্'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-..) "সেই অদ্বিতীয় আত্মাকে অবগত হও" ইত্যাদি এই স্থলে আত্মশব্দের প্রয়োগ আছে। আর পরমাত্মা পরিগৃহীত হলে আত্মশব্দ সম্যগ্ভাবে সঙ্গত হয়, কিন্তু অন্য পদার্থ গৃহীত হলে তা হয় না। আবার কোন কোন স্থলে স্বশব্দের (—ব্রহ্মবোধক শব্দের) দ্বারাই ব্রহ্মের আয়তনতা (—জগদাধারতা) শ্রুতিতে বর্ণিত হচ্ছে, যথা

'সন্মূলাঃ সোম্যেমাঃ সর্বাঃ প্রজাঃ সদায়তনাঃ সৎপ্রতিষ্ঠাঃ'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-..)

"হে সোম্য, এইসকল প্রজা (—স্থাবরজঙ্গমাত্মক এই জগৎ) সৎস্বরূপ ব্রহ্ম হতে উৎপন্ন হয়, স্থিতিকালে সৎস্বরূপ ব্রহ্মে আশ্রিত থাকে এবং প্রলয়কালে সৎস্বরূপ ব্রহ্মে বিলীন হয়", ইত্যাদি।

আবার স্বশব্দের দ্বারাই মুণ্ডকের শ্লোকের পূর্বে এবং পরে ব্রহ্ম বর্ণিত হচ্ছে, যথা'পুরুষঃ এবেদং বিশ্বং কর্ম তপঃ ব্রহ্ম পরামৃতম্'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-..১০) অর্থাৎ "পুরুষই এই অগ্নিহোত্রাদি কর্ম জ্ঞানাত্মক বিশ্ব, পরম অমৃতস্বরূপ ব্রহ্ম", ইত্যাদি এবং 'ব্রহ্মৈবেদমমৃতং পুরস্তাদ্ব্রহ্ম পশ্চাদ্ব্রহ্ম দক্ষিণতশ্চোত্তরেণ'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-..১১) "এই অমৃতস্বরূপ ব্রহ্মই পুরোভাগে, ব্রহ্মই পশ্চাদ্ভাগে, ব্রহ্মই দক্ষিণভাগে, ব্রহ্মই উত্তরভাগে প্রকাশিত হচ্ছেন", ইত্যাদি। সুতরাং প্রকরণবলে ব্রহ্মই যে জগদাধার, এটা নির্ণীত হয়েছে।

"সকল পদার্থ ব্রহ্মস্বরূপ" এই প্রকার সামাণাধিকরণ্য প্রতীত হচ্ছে বলে, যেমন শাখা স্কন্ধ এবং মূল ইত্যাদি ভেদে বৃক্ষ হয় অনেকাত্মক, এইরূপে আত্মাও নানারস বিচিত্র হবেন, এই প্রকার আশঙ্কা হওয়া সম্ভব; তাকে নিরাকরণ করবার জন্য শ্রুতি নিশ্চয়পূর্বক বলছেন'তমেবৈকং জানথ আত্মানম্'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-..) "সেই অদ্বিতীয় আত্মাকে অবগত হবে।"

কিন্তু ব্রহ্ম জগতের আশ্রয় হলে একরস কি প্রকারে হবেন? এখানে এটাই বলা হচ্ছেকার্যপ্রপঞ্চবিশিষ্ট বিচিত্র আত্মা (—সবিশেষ ব্রহ্ম) বিজ্ঞেয় নন। তবে কীদৃশ ব্রহ্ম বিজ্ঞেয়? অবিদ্যাকৃত কার্যপ্রপঞ্চকে বিদ্যার দ্বারা বিলোপকরতঃ সেই অধিষ্ঠানভূত অদ্বিতীয় একরস আত্মাকে অবগত হবে যেমন 'দেবদত্ত যাতে উপবিষ্ট আছে, তা আনয়ন কর', এরূপ বললে লোকে আসনই আনয়ন করে, দেবদত্তকে নয়; তদ্রূপ অধিষ্ঠানভূত যে একরস আত্মা, তাঁরই বিজ্ঞেয়তা উপদিষ্ট হচ্ছে, কিন্তু দ্যুলোকাদিবিশিষ্ট সবিশেষ আত্মার নয়। আর কার্যভূত মিথ্যাবস্তুতে যাঁর অভিসন্ধি থাকে, শ্রুতিতে তাঁর অপবাদ বর্ণিত হচ্ছে, যথা

'মৃত্যোঃ মৃত্যুমাপ্নোতি ইহ নানেব পশ্যতি'-(কঠ উপনিষৎ-..১১) অর্থাৎ "যিনি একরস ব্রহ্মে নানার ন্যায় দর্শন করেন অর্থাৎ স্বল্পমাত্রও ভেদ দর্শন করেন, তিনি মৃত্যু হতে মৃত্যুকে প্রাপ্ত হন।"

আর 'সকল পদার্থই ব্রহ্মস্বরূপ', এইপ্রকার যে সামানাধিকরণ্য, তা প্রপঞ্চকে বিলোপ করবার জন্য, কিন্তু ব্রহ্মের অনেক রসতা প্রতিপাদন করবার জন্য নয়; যেহেতু ' যথা সৈন্ধবঘনোনন্তরোবাহ্যঃ কৃত্স্নো রসঘন এবৈবং বা অরেযমাত্মানন্তরোবাহ্যঃ কৃত্স্নঃ প্রজ্ঞানঘন এব'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ -..১৩)

"সেই লবণপিণ্ড যেমন অন্তরে বাইরে একইপ্রকার রসযুক্ত এবং সমগ্রভাবে রসঘনই, হে মৈত্রেয়ি! এই প্রকারে এই আত্মা অন্তররহিত বাহ্যরহিত এবং সমগ্রভাবে প্রজ্ঞানঘনই অর্থাৎ সর্বাত্মকভাবে চৈতন্যৈকরসস্বরূপ।" এই প্রকারে শ্রুতিতে ব্রহ্মের একরসতা বর্ণিত হয়েছে। সেহেতু পরব্রহ্মই দ্যুলোক ভূর্লোকাদির অধিষ্ঠান।....

শ্রীশুভ চৌধুরী

মে ২৬, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ।

জ্ঞানী ভোগ্যবিষয়ে মনের কঠিনতা আর ভগবদ্বিষয়ে মনের কোমলতা সম্পাদন করে—

  আচার্য মধুসূদন সরস্বতী ভক্তিরসায়নে বলছেন — কাঠিন্যং বিষয়ে কুর্যাদ্ দ্রবত্বং ভগবৎপদে। উপায়ৈঃ শাস্ত্রনির্দিষ্টৈরনুক্ষণমতো ব...