Thursday, 16 January 2020

ব্রহ্মের তটস্থ লক্ষণঃ-

পারমার্থিক দৃষ্টিতে জগৎ মিথ্যা হওয়ায় সেই কল্পিত জগতের কর্তৃত্ব ব্রহ্মে পরমার্থতঃ না থাকিলেও, ব্যবহারিক দৃষ্টিতে জগতের জন্মাদির কারণ হওয়া-রূপ লক্ষণটি অন্য বস্তু হইতে ভিন্নভাবে ব্রহ্মকে বোধ করায় বলিয়া ইহা ব্রহ্মের তটস্থলক্ষণ। জগতের সৃষ্টি-স্থিতি-লয় যাহা হইতে হয় তিনিই ব্রহ্ম। ইহাই ব্রহ্মের তটস্থ লক্ষণ। বাদরায়ণ ভগবৎ প্রণীত বেদান্তসূত্রে ব্রহ্মের লক্ষণ নিরূপণ হইতেছে এইভাবে

জন্মাদ্যস্য যতঃ।-(ব্রহ্মসূত্র ১।১।২)

ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্য শারীরক ভাষ্যে বলিতেছেন

'জন্ম অর্থ উৎপত্তি, তাহা আদি ইহার', এইরূপে তদ্গুণসংবিজ্ঞান বহুব্রীহি সমাস বুঝিতে হইবে। জন্ম, স্থিতি লয়, ইহাই সমাসটীর অর্থ। আর জন্মের যে আদিত্ব, তাহা শ্রুতির নির্দ্দেশকে বস্তুর স্থিতিকে অপেক্ষা করে। মূলশ্রুতির নির্দ্দেশ এই'যতো বা ইমানি ভূতানি জায়ন্তে৷ যেন জাতানি জীবন্তি৷ যত্প্রয়ন্ত্যভিসংবিশন্তি৷ তদ্বিজিজ্ঞাসস্ব৷ তদ্ব্রহ্মেতি৷' এই শ্রুতিবাক্যটীতে জন্ম, স্থিতি এবং প্রলয়ের ক্রম পরিদৃষ্ট হয়। সূত্রস্থ 'অস্য' এই স্থলে, প্রত্যক্ষ প্রভৃতির দ্বারা উপস্থাপিত জগদ্ রূপ ধর্ম্মীর 'ইদম' শব্দের দ্বারা নির্দ্দেশ হইয়াছে। ষষ্ঠী বিভক্তিটী জন্ম প্রভৃতি ধর্ম্মের সম্বন্ধ বুঝাইবার জন্য। সূত্রস্থ 'যতঃ' এই পদটী জগতের কারণকে নির্দ্দেশ করিতেছে। এইরূপে বাক্যটীর অর্থ হইলনাম রূপের দ্বারা ব্যাকৃত অর্থাৎ অভিব্যক্ত এই জগৎ, যাহা অনেক কর্ত্তা এবং ভোক্তার সহিত সংযুক্ত, যাহা প্রতিনিয়ত দেশ কাল নিমিত্ত ক্রিয়া এবং ফলের আশ্রয়, যাহার রচনার স্বরূপ মনের দ্বারা চিন্তাও করা যায় না তাহার জন্ম স্থিতি লয় যে সর্বজ্ঞ সর্বশক্তিসস্পন্ন কারণ হইতে হয় তিনিই ব্রহ্ম।

কৃষ্ণযজুর্বেদের তৈত্তিরীয় শাখার অন্তর্গত তৈত্তিরীয় উপনিষদের ভৃগুবল্লীতে সেই শ্রুতিটি বর্ণিত আছেবরুণের পুত্র প্রসিদ্ধ ভৃগু পিতা বরুণের নিকট ব্রহ্মতত্ত্ব স্পষ্টরূপে জানিতে ইচ্ছা করিলে পিতা সেই ভৃগুকে ব্রহ্মের লক্ষণ বলিলেন'যতো বা ইমানি ভূতানি জায়ন্তে৷ যেন জাতানি জীবন্তি৷ যত্প্রয়ন্ত্যভিসংবিশন্তি৷ তদ্বিজিজ্ঞাসস্ব৷ তদ্ব্রহ্মেতি৷'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-৩।১।১)

অর্থাৎ  যাঁহা হইতে এই ব্রহ্মাদি তৃণপর্য্যন্ত দেহবর্গ উৎপন্ন হয়, উৎপন্ন হইয়া প্রাণধারণ করে অর্থাৎ বর্ধিত হয়, আবার বিনাশকালে যাঁহাকে প্রাপ্ত হয়, যাহাতে প্রবেশ করে অর্থাৎ অভেদ হইয়া যায় অর্থাৎ উৎপত্তি,স্থিতি লয়কালে দেহবর্গ যৎসত্তা ত্যাগ করে না, এইরূপ যে ব্রহ্মের লক্ষণ, সেই ব্রহ্মকে স্পষ্ট করিয়া জান।.....

তথ্যসূত্রঃ- ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্যের শারীরক-মীমাংসা ভাষ্য তৈত্তিরীয় উপনিষদ্ ভাষ্য।

শ্রীশুভ চৌধুরী

জানুয়ারি ১৫, ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ।

Friday, 10 January 2020

বৃহদারণ্যকের 'নেতি নেতি' শ্রুতি ব্রহ্মে কল্পিত প্রপঞ্চকেই প্রতিষেধ করিতেছেন কিন্তু স্বয়ং ব্রহ্মকে অস্বীকার করে নাঃ-


শ্রীমন্মহর্ষি বাদরায়ণ ভগবৎ প্রণীতম্ উত্তর মীমাংসা বেদান্তদর্শনে বর্ণিত আছে-
'প্রকৃতৈতাবত্ত্বং হি প্রতিষেধতি ততো ব্রবীতি চ ভূয়ঃ।।'-ব্রহ্মসূত্র ৩।২।২২।।
শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- ভগবৎপূজ্যপাদ্ শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য্যের ভাষ্য হইল-
'ব্রহ্মের দুইটী মাত্ররূপ মূর্ত্ত এবং অমূর্ত্ত'-(বৃহদারণ্যক উপনিষদ্-২।৩।১) , এই প্রকার আরম্ভ করিয়া ক্ষিত্যাদি পাঁচটি মহাভূতকে দুইটী রাশিরূপে বিভক্ত করিয়া বায়ু ও আকাশরূপ অমূর্ত্ত ভূতের যাহা রস অর্থাৎ সার পদার্থ এবং যাহা 'পুরুষ', এই শব্দের দ্বারা কথিত, তাহার সমষ্টি করণাত্মা হিরণ্যগর্ভশরীরের এবং দক্ষিণ চক্ষুতে স্থিত ব্যষ্টি লিঙ্গশরীরের মাহারজনাদি রূপসকল (-হরিদ্রারঞ্জিত বস্ত্র প্রভৃতি বর্ণের নায় বর্ণসকল,বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ঃ-২।৩।৬) প্রদর্শন করিয়া পূনরায় পঠিত হইতেছে-

'অথাত আদেশ নেতি নেতি'-(বৃহদারণ্যক উপনিষদ্-২।৫।৬)
'অথ (-সত্যের অর্থাৎ প্রপঞ্চের বর্ণনার অনন্তর) অতঃ (-যাহা সত্যেরও সত্য, তাহার বর্ণনা অবশিষ্ট থাকায়) নেতি নেতি অর্থাৎ 'ইহা নহে', 'ইহা নহে', এইরূপ সত্যের সত্য ব্রহ্মের আদেশ নির্দ্দেশ করা হইতেছে; এই নির্দ্দেশবাক্য হইতে ভিন্ন ব্রহ্মের শ্রেষ্ঠ নির্দ্দেশ অবশ্যই নাই।'

সেইস্থলে এই প্রতিষেধের বিষয় কি? ব্রহ্মের সপ্রপঞ্চ অর্থাৎ বিস্তৃতভাবে বর্ণিত মূর্ত্ত ও অমূর্ত্তাত্মক রূপদ্বয় এখানে সন্নিহিত অর্থাৎ নিকটে পঠিত হইয়াছে, আর দুইটী রূপ যাঁহার তিনিই ব্রহ্ম। সেইস্থলে বিশেষ কোন নিষেধ্য বস্তু উপলব্ধ না হওয়ায় আমাদের সংশয় উৎপন্ন হইতেছে-'নেতি নেতি' এই প্রতিষেধ কি রূপদ্বয়কে এবং যাঁহার রূপ তাঁহাকে, নাকি উভয়কেই প্রতিষেধ করিতেছে; অথবা দুইটির মধ্যে একটিকে প্রতিষেধ করিতেছে? যদি একটিকে প্রতিষেধ করিয়া থাকে, তাহা হইলে কি ব্রহ্মকে করিতেছে নাকি রূপদ্বয়কে?
রূপপ্রপঞ্চ ও ব্রহ্ম উভয়ের প্রতিষেধ যুক্তিসঙ্গত নহে, যেহেতু শূন্যবাদের প্রাপ্তি হইয়া পড়িবে। যদি বলা হয় শূন্যবাদইতো অভিপ্রেত তদুত্তরে বলিতেছেন-যেহেতু কোন পরমার্থ বস্তুকে অবলম্বন করিয়া অপরামার্থ বস্তু প্রতিষিদ্ধ হয়, যেমন রজ্জু প্রভৃতিতে সর্প প্রভৃতি। আর তাহা প্রতিষেধ কোন ভাববস্তু অবিশিষ্ট থাকিলে হয় সঙ্গত। কিন্তু উভয়ের প্রতিষধ হইলে অন্য কোন্ ভাববস্তু অবশিষ্ট থাকিবে?
প্রতিষেধের অধিষ্ঠানরূপে অন্য ভাববস্তু অবশিষ্ট না থাকিলে, অপর যে বস্তুকে প্রতিষেধ করিতে আরম্ভ করা হয়, প্রতিষেধ করিতে অসমর্থ হওয়ায় তাহারই পরমার্থতা প্রাপ্ত হইয়া পড়ে বলিয়া তাহার প্রতিষেধ যুক্তি সঙ্গত নহে।আবার ব্রহ্মের প্রতিষেধও যুক্তিসঙ্গত নহে, যেহেতু 'আপনাকে ব্রহ্মের কথা বলিব'-(বৃহদারণ্যক উপনিষদ্-২।১।১) ইত্যাদি উপক্রমর বিরোধ হইবে; 'যিনি ব্রহ্মকে অসৎ বলিয়া জানেন, তিনি অসৎই অর্থাৎ পুরুষার্থের সহিত সম্বন্ধশূন্যই হইয়া পড়েন।'-(তৈত্তিরীয় উপনিষদ্-২।৬।১) 'আত্মাকে আছেন, এইরূপেই উপলব্ধি করিতে হইবে।'-(কঠ উপনিষদ্-২।৩।১৩),এই প্রকার অবধারণের বিরোধ হইবে।এবং সকল উপনিষদের অর্থাৎ সমগ্র বেদান্ত সিদ্ধান্তের বিরোধ হইয়া পড়িবে।
আর যদি বলা হয় বাক্যমনের অতীত হওয়ায় ব্রহ্মই প্রতিষেধের যোগ্য তদুত্তরে বলিতেছেন- ব্রহ্মের অবাঙ্মনোগোচরতাও তাঁহার অভাবকে অভিপ্রায় করিয়া বিহিত হয় নাই। যেহেতু মহান পরিকরবন্ধের দ্বারা 'ব্রহ্মবিদ্ সর্ব্বসংসারধর্ম্মাতীত পরব্রহ্মকে প্রাপ্ত হন।'-(তৈত্তিরীয় উপনিষদ্-২।১।১), 'ব্রহ্ম সত্য, জ্ঞান ও অনন্তস্বরূপ।'-(তৈত্তিরীয় উপনিষদ্-২।১।১) ইতাদি এই সকলের দ্বারা উপনিষৎ সকলে ব্রহ্মকে প্রতিপাদন করিয়া পুনরায় তাঁহারই অভাব বর্ণিত হইতে পারে না।
যেহেতু 'শরীরে লিপ্ত পঙ্কের প্রক্ষালন অপেক্ষা দূরে থাকিয়া তাহাকে স্পর্শ না করাই শ্রেয়ঃ।' এইপ্রকার যুক্তি আছে, ব্রহ্মের প্রতিষেধই শ্রুতির অভিপ্রেত হইলে পঙ্কে লিপ্ত হওয়ার ন্যায় তাঁহাকে প্রতিপাদন করিয়া পুনরায় পঙ্ককে প্রক্ষালনের ন্যায় তাঁহার প্রতিষেধ সঙ্গত নহে।

আচ্ছা,'ব্রহ্ম বাক্য মনের অগোচর' এইপ্রকার কথন প্রতিষেধের জন্য না হইলে তাহার অর্থ কি? উত্তর 'যাঁহাকে প্রাপ্ত না হইয়া মনের সহ বাক্যসকল ফিরিয়া আসে'(তৈত্তিরীয় উপনিষদ্-২।৪।১), ইত্যাদি ইহা কিন্তু ব্রহ্মতত্ত্ব প্রতিপাদনের প্রক্রিয়া।উক্ত শ্রুতির মধ্যে ইহাই কথিত হইতেছে-ব্রহ্ম বাক্য ও মনের অগোচর, সুতরাং বিষয়কোটির মধ্যে অপ্রবিষ্ট, সেইহেতু প্রত্যাগাত্মস্বরূপ এবং নিত্যশুদ্ববুদ্ধমুক্ত স্বভাব।ব্রহ্ম প্রত্যাগাত্মস্বরূপ নিত্যশুদ্ধবুদ্ধমুক্ত হওয়াই বৃহদারণ্যকের 'নেতি নেতি' শ্রুতি ব্রহ্ম হইতে রূপপ্রপঞ্চকে অর্থাৎ স্থুল ও সুক্ষ্ম জগৎকে নিষেধ করিতেছেন, অধিষ্ঠানভূত ব্রহ্ম অবিশিষ্ট থাকিতেছেন। প্রস্তাবিত যে ব্রহ্মের 'ইহা এতটা', এইরূপে সীমিত মূর্ত্তামূর্ত্তাত্মক রূপ, তাহাকে 'নেতি নেতি' এই শব্দ প্রতিষেধ করিতেছে।কারণ ব্রহ্মের সেই মূর্ত্তামূর্ত্তাত্মক রূপদ্বয়ই অধিদৈবত এবং অধ্যাত্মরূপে পূর্ববর্ত্তী শ্রুতিসমূহে (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্-২।৩।২-৫) প্রস্তাবিত ও বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হইয়াছে।
কিন্তু 'এতস্মিন মণ্ডলে পুুরুষঃ'-(বৃহদারণ্যক উপনিষদ্-২।৩।৩) এইপ্রকারে পুরুষ শব্দের দ্বারা ব্রহ্মও তো বর্ণিত হইয়াছেন। তদুত্তরে বলিতেছেন আর তজ্জনিত মূর্ত্তামূর্ত্তাত্মক ভূতসূক্ষ্ম হইতে উৎপন্ন অমূর্ত্ত ভূতের সারভূত পুরুষ শব্দের দ্বারা বর্ণিত এবং লিঙ্গশরীরাশ্রিত যে বাসনাত্মক অপর রূপ, তাহাই মাহারজনাদি রূপসকল (-হরিদ্রারঞ্জিত বস্ত্র) প্রভৃতি উপমাসকলের দ্বারা প্রদর্শিত হইয়াছে, ব্রহ্ম বর্ণিত হন নাই।
ব্রহ্মের সেই এই সপ্রপঞ্চ অর্থাৎ বিস্তৃতভাবে বর্ণিত মূর্ত্ত ও অমূর্ত্তাত্মক রূপদ্বয়কে সন্নিহিতালম্বন ইতিকরণের দ্বারা প্রতিষেধক 'ন'কারের নিকট উপনীত করা হইতেছে। ব্রহ্মও নিষেধ্যরূপে উপস্থাপিত হইয়াছেন, এইপ্রকার আশঙ্কার উত্তরে বলিতেছেন পূর্ববর্তী শ্রুতিতে ব্রহ্ম কিন্তু ষষ্ঠী বিভক্তির দ্বারা (ব্রহ্মণঃ রূপে,বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ ২।৩।১) রূপের বিশেষণভাবে নির্দিষ্ট হইয়াছেন, স্বপ্রধানভাবে নহে। আর তাহার রূপদ্বয় বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হইলে পর, যিনি রূপবিশিষ্ট তাঁহার স্বরূপ বিষয়ক জিজ্ঞাসা হইলে 'অথাত আদেশ নেতি নেতি'(বৃহদারণ্যক উপনিষদ্-২।৫।৬) ইহা উপক্রান্ত বর্ণিত হইয়াছে।
কিন্তু প্রত্যক্ষগোচর জগৎপপঞ্চের নিষেধ তো সম্ভব নহে। তদুত্তরে বলিতেছেন-ছান্দোগ্যের এই শ্রুতি- 'হে সৌম্য, যেমন একটি মৃৎপিণ্ডের দ্বারা মৃত্তিকার পরিণামভূত সমস্তই জানা যাইতে পারে কারণ সমস্ত বিকারই বাচাবলম্বনে অবস্থিত নাম মাত্র, কেবল মৃত্তিকাই সত্য।'-(ছান্দোগ্য উপনিষদ্-৬।১।৪) প্রভৃতি হেতুসকল বশতঃ (ব্রহ্মসূত্র ২।১।১৪) কার্য্যবস্তুর অসত্তা যুক্তিসঙ্গত, এইহেতু 'নেতি নেতি' এইপ্রকারে তাহার প্রতিষেধ হইয়াছে।
আর শাস্ত্র নিজেই ব্রহ্মের দুইটীরূপ প্রদর্শন করিয়া নিজেই পুনরায় কি প্রকারে তাহা প্রতিষেধ করিতেছেন যেহেতু'পঙ্কের প্রক্ষালন অপেক্ষা দূরে থাকিয়া তাহাকে স্পর্শ না করাই শ্রেয়ঃ'; এখানে রূপদ্বয়ের নিষেধপক্ষে এইপ্রকার আশঙ্কা করা উচিত নহে। যেহেতু এই শাস্ত্রপ্রতিপাদ্য রূপে ব্রহ্মের রূপদ্বয়কে নির্দ্দেশ করিতেছেন না, কিন্তু ব্রহ্মে কল্পিত লোকপ্রসিদ্ধ এইরূপদ্বয়কে প্রতিষেধের জন্য এবং শুদ্ধব্রহ্মের স্বরূপ প্রতিপাদনের জন্য উল্লেখ করিতেছন, এইহেতু কোন দোষ হয় নাই।
অতএব বৃহদারণ্যকের 'নেতি নেতি' শ্রুতি ব্রহ্মে কল্পিত প্রপঞ্চকেই প্রতিষেধ করিতেছেন এবং প্রতিষেধের অবধি ও অধিষ্ঠানরূপে ব্রহ্ম অবশিষ্ট থাকিতেছেন, ইহাই সিদ্ধান্ত।
'নেতি নেতি' ইহার অর্থ কি? তাহা বলিতেছেন- যেহেতু এই ব্রহ্ম হইতে ব্যতিরিক্ত অর্থাৎ ভিন্ন কিছুই নাই, পরন্তু ব্রহ্মই আছেন এই হেতু 'নেতি নেতি' ইহা বলা হইতেছে, কিন্তু ব্রহ্ম স্বয়ংই নাই তাহা নহে।
'আর ব্রহ্মের নাম সত্যের সত্য, প্রাণসকলই সত্য, তাহাদের মধ্যে ইনি সত্য।'- (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ঃ-২।৩।৬) এইরূপ সত্যের সত্য ব্রহ্মের আদেশ নির্দ্দেশ করা হইতেছে। সেইহেতু 'নেতি নেতি' এই আদেশ ব্রহ্মাবসান, অভাবাবসান নহে। বৃহদারণ্যকের 'নেতি নেতি' শ্রুতির এই প্রতিষেধ ব্রহ্মেই পর্য্যবসিত হয়, অভাবে নহে।
(বিঃ দ্রঃ- ভাষ্যকার ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্য এই সূত্রাবলম্বনে আরও অনেক বৈয়াকরণিক, দার্শনিক আর শাস্ত্রীয় যুক্তি প্রদর্শন করিয়াছেন, এখানে কিছু অংশ তুলে ধরা হইল মাত্র)

Wednesday, 8 January 2020

ব্রহ্মাত্মৈকত্ব জ্ঞান ও এই জ্ঞানের দ্বারা জগতের সত্যতা-বুদ্ধির বিলোপঃ-



শুক্লযজুর্বেদীয় বাজসনেয় সংহিতার শেষ অধ্যায় ঈশ উপনিষদে বর্ণিত আছে-

ঈশা ব্যসমিদং সর্বং যতকিঞ্চ জগত্যাং জগত্‍।।

তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা মা গৃধঃ কস্যস্বিদ্‌ ধনম্।। ১।।

'শাঙ্করভাষ্য' অনুবাদঃ- ভগবৎপূজ্যপাদ্ শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য্যের ভাষ্য হইল-

‘ঈশ্‌’ ধাতুর অর্থ ঐশ্বর্য্য বা শাসন-ক্ষমতা; যিনি এই জগতের শাসনে সমর্থ পরমাত্মা পরমেশ্বর, তিনিই এখানে ‘ঈশা’-পদের প্রতিপাদ্য। তিনি প্রত্যকরূপে (জীবরূপে) সর্ব্ব বস্তুর অভ্যন্তরে থাকিয়া, সমস্ত জগৎ যথানিয়মে শাসিত ও পরিচালিত করিতেছেন। সেই সর্ব্বাত্মরূপী পরমেশ্বর দ্বারা পৃথিবীস্থ সমস্ত বস্তুকে আচ্ছাদিত করিবে,–সর্ব্বত্র তাঁহার সত্তা উপলব্ধি করিবে। [অভিপ্রায় এই যে] জগৎকারণ পরমেশ্বরই জীবরূপে সর্ব্বদেহে বর্ত্তমান আছেন; এবং তাঁহার সংকল্পপ্রসূত স্থাবর-জঙ্গমময় এই জগৎ বস্তুতঃ মিথ্যা হইয়াও তাঁহাকে আশ্রয় করিয়াই সত্যের ন্যায় প্রতিভাত হইতেছে। সেই পরমাত্মরূপী আমিই এই জগৎ, আমার সত্তাই জগতের সত্তা, তদ্ভিন্ন জগতের আর পৃথক সত্তা নাই; এইরূপ যথার্থ সত্য জ্ঞানের দ্বারা জগতের সত্যতা ঢাকিয়া ফেলিবে, অর্থাৎ ‘জগত সত্য’ বলিয়া যে ভ্রম ছিল, তাহা বিলুপ্ত করিবে। যেমন চন্দন ও অগুরু প্রভৃতি গন্ধদ্রব্যসমূহ জলাদি-সংস্পর্শে কখন কখন দুর্গন্ধযুক্ত বলিয়া মনে হয় সত্য; কিন্তু ঘর্ষণ করিলেই তাহার স্বভাবসিদ্ধ মনোহর সৌরভ প্রকাশ পায়, এবং আগন্তুক দুর্গন্ধ দূর করিয়া দেয়, ঠিক সেইরূপ, কর্ত্তৃত্ব-ভোক্তৃত্বপূর্ণ, ভিন্ন ভিন্ন নাম (সংজ্ঞা), রূপ (আকৃতি) ও চেষ্টা বা ক্রিয়া-সম্পন্ন এই সমস্ত জগৎ নিজে অসত্য হইয়াও, যথার্থ সত্যস্বরূপ পরমেশ্বরের আশ্রয়ে থাকিয়া সত্য বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে মাত্র; বস্তুতঃ উহা মিথ্যা—অধ্যস্ত মাত্র; এইরূপ সত্য ভাবনা দ্বারা জগতের সত্যতা-ভ্রম নিরস্ত হইয়া যায়।

এইপ্রকার নিয়ন্তাই চরাচর দেহাদির মূলসত্তা এই ভাবনাযুক্ত ব্যক্তির পুত্র, সম্পদ বা স্বর্গাদি লোক-লাভের এষণা বা কামনা থাকে না; সুতরাং তদর্থ কর্ম্মেও অধিকার থাকে না; একমাত্র বাসনাত্যাগরূপ সন্ন্যাসেই অধিকার থাকে; তাহার ফলে সেই লোক তখন সন্ন্যাস গ্রহণ করে। অতএব, তুমি তাদৃশ ভাবাপন্ন হইয়া, সন্ন্যাস দ্বারা আত্মাকে পরিপালন কর; অর্থাৎ জগতের মিথ্যাত্ব ভাবনাদ্বারা আত্মার আত্মত্ব (নির্ব্বাকারত্ব ও সত্যত্ব প্রভৃতি ভাবগুলি) রক্ষা কর। তুমি এইরূপে বাসনা পরিত্যাগপূর্ব্বক নিজের কিংবা পরের, কাহারো ধনের আকাঙ্খা করিও না। অথবা, ধন কাহার?—ধন তো কাহারও নহে, যাহা আকাঙ্খা করিতে পারা যায়। আত্মাই সমস্ত জগৎ, এবং সমস্ত জগৎই আত্মরূপ; সেইরূপ পরমেশ্বর-চিন্তা দ্বারা যখন সমস্ত বস্তুই মিথ্যা বলিয়া পরিত্যাগ করিয়াছ, তখন আর সেই মিথায় বিষয়ে আকাঙ্খা বা লোভ করা সঙ্গত হয় না। মন্ত্রে যে, ‘স্বিৎ’ কথাটি আছে, উহা অর্থহীন নিপাত শব্দ (বাক্যের শোভাবর্দ্ধকমাত্র)।।১।।


Friday, 27 December 2019

রূপবিহীন অমূর্ত্ত ও সর্ব্বগত ব্রহ্মের প্রতিবিম্বিত হওয়া বিষয়ে শ্রুতিসম্মতি প্রদর্শনঃ-


শ্রীমন্মহর্ষি বাদরায়ণ ভগবৎ প্রণীতম্ উত্তর মীমাংসা বেদান্তদর্শনে বর্ণিত আছে
-'দর্শনাচ্চ।।'-ব্রহ্মসূত্র ৩।২।২১।।
শারীরকভাষ্যম্ঃ-ভগবৎপূজ্যপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের ভাষ্য হইল- আর দেহাদি উপাধিসকলের মধ্যে পরব্রহ্মেরই অনুপ্রবেশ প্রদর্শন করিতেছেন, যথা-'দ্বিপদ পুরসক অর্থাৎ শরীর সকল নির্ম্মাণ করিলেন, চতুষ্পদ পুরসকলের নির্ম্মাণ করিলেন। সেই পরমপুরুষ পূর্ব্বে পক্ষী হইয়া শরীরসকলে প্রবেশ করিলেন।'-(বৃহদারণ্যক উপনিষদ্-২।৫।১৮) ইত্যাদি এবং 'এই জীবাত্মারূপে অনুপ্রবেশ করিয়া' (ছান্দোগ্য উপনিষদ্-৬।৩।২) ইত্যাদি।
সেইহেতু রূপহীন সর্ব্বগত অমূর্ত্ত ব্রহ্মের প্রতিবিম্বরূপে পুরসকলে প্রবেশ শ্রতিসম্মত হওয়ায় 'অতএব চোপমা সূর্য্যকাদিবৎ।।'-ব্রহ্মসূত্র ৩।২।১৮।। সূত্রাদি যুক্তিসঙ্গত। সেইহেতু প্রতিবিম্বে প্রতিভাত ধর্ম্মসকল পরমার্থতঃ বিম্বে থাকে না বলিয়া ব্রহ্ম অবশ্যই নির্বিকল্পরূপ একলিঙ্গযুক্ত অর্থাৎ সর্ব্বপ্রকারবিকল্প-বর্জ্জিতত্বই তাঁহার একমাত্র স্বরূপ, তিনি সবিশেষ ও নির্বিশেষ উভয়স্বরূপ নহেন এবং নির্বিশেষতার বিপরীতস্বরূপ সবিশেষ নহেন, ইহা সিদ্ধ হইল।

Friday, 20 December 2019

'কালভৈরবাষ্টকম্'




ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য বিরচিত '#কালভৈরবাষ্টকম্' ও এর ভাবার্থঃ-

শ্রীকালভৈরবাষ্টকং

দেবরাজসেব্যমানপাবনাঙ্ঘ্রিপঙ্কজং

ব্যালযজ্ঞসূত্রমিন্দুশেখরং কৃপাকরম্ ।

নারদাদিযোগিবৃন্দবন্দিতং দিগম্বরং

কাশিকাপুরাধিনাথকালভৈরবং ভজে ||১||

ভাবার্থ - দেবরাজ ইন্দ্র যাঁর পতিত পাবন চরণ কমল সেবা করেন, সৰ্প যাঁর গলদেশের যজ্ঞসুত্ৰ, যিনি চন্দ্ৰশেখর, যিনি দয়া নিধান, নারদাদি যোগিগণ যাকে বন্দনা করেন, যিনি দিগম্বর আমি সেই কাশিপুরের অধীশ্বর কালভৈরবকে ভজনা করি ||১||

ভানুকোটিভাস্বরং ভবাব্ধিতারকং পরং

নীলকণ্ঠমীপ্সিতার্থদায়কং ত্রিলোচনম্ ।

কালকালমম্বুজাক্ষমক্ষশূলমক্ষরং

কাশিকাপুরাধিনাথকালভৈরবং ভজে ||২||

ভাবার্থঃ- যিনি কোটি সুৰ্য্য প্ৰতীকাশ, যিনি সংসার সাগরের কর্ণধার এবং পরাৎপর, যার কণ্ঠদেশ নীলবর্ণে রঞ্জিত, যিনি বাঞ্ছাকল্পতরু ও ত্ৰিলোচন, যিনি কালসংহারকারী মহাকাল এবং পদ্মপলাশলোচন, যিনি অক্ষমালা ও শূল ধারণ করেন এবং যিনি সনাতন, কাশীপুরীর অধীশ্বর সেই কালভৈরবকে আমি ভজনা করি ||২||

শূলটঙ্কপাশদণ্ডপাণিমাদিকারণং

শ্যামকায়মাদিদেবমক্ষরং নিরাময়ম্ ।

ভীমবিক্রমং প্রভুং বিচিত্রতাণ্ডবপ্রিয়ং

কাশিকাপুরাধিনাথকালভৈরবং ভজে ||৩||

ভাবার্থ - শূল, টঙ্ক (পাষাণভেদী অস্ত্ৰ বিশেষ), নাগপাশ ও দণ্ড যাঁর হস্তে, যিনি এই জগতের আদি কারণ, যাঁহার দেহ শ্যামবৰ্ণ, যিনি আদি দেব, অবিনাশী ও নিরাময়, যাঁর (অসুর-বিনাশকারী) বিক্ৰম অতি ভয়ানক, যিনি জগতের প্রভু এবং বিচিত্র তাণ্ডবপ্রিয়, কাশিকা রাজধানীর অধীশ্বর সেই কালভৈরবকে আমি ভজনা করি ||৩||

ভুক্তিমুক্তিদায়কং প্রশস্তচারুবিগ্রহং

ভক্তবৎসলং স্থিতং সমস্তলোকবিগ্রহম্ ।

বিনিক্বণন্মনোজ্ঞহেমকিঙ্কিণীলসৎকটিং

কাশিকাপুরাধিনাথকালভৈরবং ভজে ||৪||

ভাবার্থ - যিনি ভক্তজনের ভোগ ও মোক্ষবিধান করেন, যাঁর দেহ প্ৰশস্ত ও মনোরম, যিনি ভক্তবৎসল ও সুখাসীন, এই ত্ৰিভুবন যার মূৰ্ত্তি, যার কটিদেশ মঝুরধ্বনিবিশিষ্ট মনোহর সুবর্ণকিঙ্কিণী দ্বারা পরিশোভিত, কাশিকা রাজধানীর অধীশ্বর সেই কালভৈরবকে ভজনা করি ||৪||

ধর্মসেতুপালকং ত্বধর্মমার্গনাশকং

কর্মপাশমোচকং সুশর্মদায়কং বিভুম্ ।

স্বর্ণবর্ণশেষপাশশোভিতাঙ্গমণ্ডলং

কাশিকাপুরাধিনাথকালভৈরবং ভজে ||৫||

ভাবার্থ - যিনি (সংসার সাগরের) ধৰ্মরূপ সেতু রক্ষা করেন, এবং অধৰ্মপথ বিনাশ করেন, যিনি ভক্তজনের কৰ্মপাশ ছেদন করেন ও বিমল আনন্দ দান করেন, যিনি এই সংসারের প্রভু, স্বর্ণের ন্যায় মনোহর বর্ণবিশিষ্ট অনন্ত সৰ্পরূপ রজ্জুতে যাঁর অঙ্গ সুশোভিত, কাশিকা রাজধানীর অধীশ্বর সেই কালভৈরবকে ভজনা করি ||৫||

রত্নপাদুকাপ্রভাভিরামপাদযুগ্মকং

নিত্যমদ্বিতীয়মিষ্টদৈবতং নিরংজনম্ ।

মৃত্যুদর্পনাশনং করালদংষ্ট্রমোক্ষদং

কাশিকাপুরাধিনাথকালভৈরবং ভজে ||৬||

ভাবার্থ - রত্ননিৰ্মিত পাদুকা দ্বারা যাঁর পদযুগল বিরাজিত, যিনি সনাতন, মনোভিরাম এবং যিনি সৰ্বতোভাবে অদ্বিতীয়, যিনি ত্ৰিজগতের ইষ্টদেব ও নিরঞ্জন (নির্লিপ্ত), যিনি ভক্তের জন্য মৃত্যুর দিগ্বিজয়জনিত দৰ্প বিনাশ করেন, কালের করালদংষ্ট্রার মধ্য হতে যিনি ভক্তকে উদ্ধার করেন, কাশিকা রাজধানীর অধীশ্বর সেই কালভৈরবকে ভজনা করি ||৬||

অট্টহাসভিন্নপদ্মজাণ্ডকোশসন্ততিং

দৃষ্টিপাতনষ্টপাপজালমুগ্রশাসনম্ ।

অষ্টসিদ্ধিদায়কং কপালমালিকাধরং

কাশিকাপুরাধিনাথকালভৈরবং ভজে ||৭||

ভাবার্থ - (প্ৰলয় সময়ে) যাঁর অট্টহাসে অনন্ত ব্ৰহ্মাণ্ডকোষ চূর্ণ বিচুর্ণ হয়, যাঁর দৃষ্টিপাতমাত্ৰে পাপজাল ভস্মীভূত হয়, যাঁর (দেবাসুর শিরোধাৰ্য্য) শাসন নিতান্ত উগ্র, যিনি সাধকগণকে অষ্টসিদ্ধি দান করেন, এবং যাঁর গলদেশ নরকপাল মালায় অলঙ্কৃত ; কাশিকাপুরীর অধীশ্বর সেই কালভৈরবকে ভজনা করি ||৭||

ভূতসঙ্ঘনায়কং বিশালকীর্তিদায়কং

কাশিবাসলোকপুণ্যপাপশোধকং বিভুম্ ।

নীতিমার্গকোবিদং পুরাতনং জগৎপতিং

কাশিকাপুরাধিনাথকালভৈরবং ভজে ||৮||

ভাবার্থ - যিনি (প্রমথ প্রভৃতি) ভূতগণের (জীব সমূহের) নায়ক, যিনি কীৰ্তিলিপ্সু, জনগনকে কৰ্মানুযায়ী অসাধারণ কীৰ্ত্তি দান করেন, যাঁর প্ৰসাদে কাশীবাসিজনগণের পুণ্যপ্ৰভাবে পাপরাশি দূরীভূত হয়, যিনি জগতের বিভু এবং নীতিপথে অভিজ্ঞ, যিনি (সনাতন বলে) পুরাতন এবং জগৎপতি; কাশিকাপুরীর অধীশ্বর সেই কালভৈরবকে ভজনা করি ||৮||

॥ ফল শ্রুতি ॥

কালভৈরবাষ্টকং পঠন্তি যে মনোহরং

জ্ঞানমুক্তিসাধনং বিচিত্রপুণ্যবর্ধনম্ ।

শোকমোহদৈন্যলোভকোপতাপনাশনং

প্রয়ান্তি কালভৈরবাংঘ্রিসন্নিধিং নরা ধ্রুবম্ ||৯||

ভাবার্থ - যাঁরা বিচিত্র পুণ্যবর্দ্ধন, জ্ঞান ও মুক্তিসাধন, শোক, মোহ, দৈন্য, লোভ, কোপ ও তাপনাশক এই “কালভৈরবাষ্টক’ পাঠ করেন, তাঁরা নিশ্চয় শ্ৰীকালভৈরবের পদপ্রান্তে উপনীত হন ||৯||

|| ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্যস্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্যস্য শ্রীমচ্ছঙ্কর ভগবতঃ কৃতৌ শ্রী কালভৈরবাষ্টকং সম্পূর্ণম্ ||

ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্য শ্রীমৎ শঙ্কর ভগবৎ বিরচিত কালভৈরবা অষ্টক স্তোত্র সমাপ্ত।

..........................................................................


শ্রীশুভ চৌধুরী

ডিসেম্বর ২০, ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ।

Thursday, 19 December 2019

ব্রহ্মবিন্দু শ্রুতিস্থ জলমধ্যগত সূর্য্যাদি প্রতিবিম্ববৎ উপমাবলে আত্মার নির্বিশেষতা প্রতিপাদনঃ-


শ্রীমন্মহর্ষি বাদরায়ণ ভগবৎ প্রণীতম্ উত্তর মীমাংসা বেদান্তদর্শনে বর্ণিত আছে
-'অতএব চোপমা সূর্য্যকাদিবৎ।।'-ব্রহ্মসূত্র ৩।২।১৮।।
শারীরকভাষ্যম্ঃ-ভগবৎপূজ্যপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের ভাষ্য হইল-আর যেহেতু এই আত্মা চৈতন্যস্বরূপ, বিশেষবর্জ্জিত, বাক্য ও মনের অগোচর এবং অনাত্ম প্রতিষেধের দ্বারা উপদেশ্য, এইহেতু উপাধিরূপ নিমিত্তবশতঃ ইঁহার যে অপারমার্থিক সবিশেষস্বরূপতা, তাহাকে অভিপ্রায় করিয়া মোক্ষশাস্ত্রসকলে 'জলমধ্যগত সূর্য্যাদি প্রতিবিম্বের ন্যায়' এই উপমা পরিগৃহীত হইতেছে,যথা-
'যেমন জ্যোতিঃস্বরূপ এই সূর্য্য এক হইলেও বিভিন্ন জলকে অনুগমনকরতঃ বিভিন্ন পাত্রস্থ জলে প্রতিবিম্বিত হইয়া বহুপ্রকার হইয়া থাকেন, এইপ্রকারে এই স্বয়ংপ্রকাশ দেব জন্মরহিত আত্মা, মায়ারূপ উপাধির দ্বারা ক্ষেত্রসকলে অর্থাৎ মায়ার পরিণামভূত দেহেন্দ্রিয়াদি সংঘাত সকলে অনুগমন করতঃ প্রতিবিম্বিত হইয়া বিভিন্নরূপে কৃত বা প্রতিভাত হন।'-(ব্রহ্মবিন্দু উপনিষদ্-১২)
'যেহেতু প্রাণিগণের এই একই আত্মা বিভিন্ন প্রাণীতে বিশেষভাবে অবস্থিত আছেন, তিনি জলমধ্যস্থ চন্দ্রের ন্যায় একরূপে ও বহুরূপে পরিদৃষ্ট হন।'-(ঐ) ইত্যাদি এই সকল স্থলেও 'তাঁহার ঔপাধিক সবিশেষতা প্রদর্শিত হইয়াছে।'
অতএব নির্বিশেষতা আত্মার যথার্থ স্বরূপ, সবিশেষতা উপাধিকৃত, ইহাই সিদ্ধ হয়।

Wednesday, 18 December 2019

শ্রীভগবানের 'জনার্দন' নাম মাহাত্ম্যঃ-


শ্রীমহাভারতের অনুশাসনপর্ব্বের 'বিষ্ণুসহস্রনাম স্তোত্রম্' এর শঙ্করাচার্য্যকৃত শাঙ্করভাষ্যে শ্রীভগবানের 'জনার্দন' নাম মাহাত্ম্য বর্ণিত আছে এইভাবে-
'জন অর্থাৎ দুর্জন ব্যক্তিকে যিনি অর্দিত করেন অর্থাৎ হিংসা করেন তিনি জনার্দন। অথবা দুর্জন ব্যক্তিকে যিনি নরক প্রভৃতিতে পাঠাইয়া দেন তিনি জনার্দন। অথবা জনগণ যাঁর কাছে অভ্যুদয় অর্থাৎ স্বর্গাদি এবং নিঃশ্রেয়স মোক্ষ যাচঞা করে তিনিই জনার্দন।'-(শঙ্করভাষ্য, বিষ্ণুসহস্রনাম ২৭)

Tuesday, 17 December 2019

'পঞ্চীকরণ সূত্রম্' (১-৮)


                                              

শঙ্করাচার্য্য বিরচিত 'পঞ্চীকরণ সূত্রম্' সুরেশ্বরাচার্য্যের বার্তিক সমেতঃ-
শ্রীশ্রীশঙ্করভগবৎ বিরচিতং সূত্রম্-'অথাতঃ পরমহংসানাং সমাধিবিধিং ব্যাখ্যাস্যামঃ।।১
ভাবার্থঃ- 'অথ' এই মাঙ্গলিক শব্দ উচ্চারণপূর্বক 'অতঃ' অর্থাৎ তত্ত্বজ্ঞানের উপযোগ্যতাহেতু, পরমহংসগণের সমাধিবিধি ব্যাখ্যা করব।
শ্রীমৎ শঙ্করভগবৎ পূজ্যপাদশিষ্য শ্রীমৎ সুরেশ্বরাচার্য্যের বার্তিকঃ- ॐকার সমস্ত বেদের সার এবং তত্ত্বজ্ঞানের প্রকাশক। সেই ॐকারের দ্বারা মুমুক্ষুগণের কিপ্রকারে চিত্ত সমাহিত হয়, তাই প্রকাশ করা হচ্ছে।১
আচার্য্য শ্রীশ্রীশঙ্করভগবৎ বিরচিতং সূত্রম্-
'সৎ-শব্দবাচ্যম্ অবিদ্যাশবলং ব্রহ্ম।।'২
ব্রহ্মণঃ অব্যক্তম্।।৩
ভাবার্থঃ- অবিদ্যা হয়েছে 'শবল' অর্থাৎ উপাধি যাঁর এমন যে ব্রহ্ম, তিনিই বিচার্য সৎ-শব্দবাচ্য।।২
ব্রহ্ম হতে অব্যক্ত প্রধান অর্থাৎ অব্যাকৃতা বিক্ষেপাবরণাত্মিকা মায়া উদ্ভূতা হয়েছেন।।৩

শ্রীমৎ শঙ্করভগবৎ পূজ্যপাদশিষ্য শ্রীমৎ সুরেশ্বরাচার্য্যের বার্তিকঃ-
সৃষ্টির পূর্বে নিত্যমুক্ত অবিক্রিয় এক পরংব্রহ্মই বর্তমান ছিলেন। সেই ব্রহ্মতে শক্তিভূতা এবং নিজেতেই (ব্রহ্মতেই) অধ্যস্তা যে মায়া, তাঁহার আধ্যাসিক তাদাত্মাহেতু অব্যাকৃতাত্মক অর্থাৎ অনভিব্যক্ত নামরূপাত্মক জগতের তিনিই ঈশ্বর নামধেয় বীজস্বরূপ অর্থাৎ উপাদান কারণ।
ব্যাখ্যাঃ-সুরেশ্বরাচার্য্যের বার্তিকের উপর শ্রীমৎ অভিনবনারায়ণেন্দ্র সরস্বতী বিরচিত আভরণম্ এ বর্ণিত আছে- এখানে ভগবান ভাষ্যকার শঙ্কর কর্তৃক অধ্যারোপ-অপবাদ-ন্যায়ের দ্বারা প্রত্যক্ অর্থৎ জীব সাক্ষিচৈতন্য ও ব্রহ্মচৈতন্যের অভেদ-প্রতিপত্তি-প্রকার দেখানোর জন্য অধিষ্ঠানব্রহ্মের বাস্তবরূপ এবং তাতে অধ্যারোপ্য প্রপঞ্চের সৃষ্টি সিদ্ধবৎ গ্রহণ করে, তাকে কেবল অধ্যারোপ মাত্র বলিয়াছেন। 'বস্তুতে অবস্তুর আরোপ অর্থাৎ ভ্রমের নাম অধ্যারোপ।'-(বেদান্ত সার ১৩) 'বস্তুবিবর্ত অবস্তু সকল মিথ্যা অর্থাৎ চিদাত্মাতে অজ্ঞানকল্পিত জগৎপ্রপঞ্চ সমস্তই মিথ্যা, চিদাত্মাই সত্য- এইরূপ প্রতিপাদনকে অর্থাৎ জড়-পদার্থের মিথ্যাত্ব অর্থাৎ কার্য্য সকল মিথ্যা, কারণই সত্য-এইরূপ দেখানোকে অপবাদ বলে।-(বেদান্ত সার ৬০)
বার্তিকাচার্য্য সুরেশ্বরও প্রথমে জগদধ্যারোপের পূর্বে অবস্থিত অধিষ্ঠানভূত আত্মস্বরূপ সম্বন্ধে বলিতেছেন-'সৃষ্টির পূর্বে নিত্যমুক্ত অবিক্রিয় এক পরংব্রহ্মই বর্তমান ছিলেন।'অর্থাৎ ব্রহ্ম দেশকালরূপ বস্তুপরিচ্ছেদশূন্য, অতএব সৃষ্টিরপূর্বে এক সজাতীয় বিজাতীয়-স্বগতভেদশূন্য পরম অর্থাৎ পরমানন্দস্বরূপ, নিত্যমূক্ত, ত্রিকালেই সর্ব অনর্থরূপ প্রপঞ্চসম্বন্ধশূন্য সচ্চিদানন্দত্মক পরংব্রহ্মই বর্তমান ছিলেন।
শ্রুতিও তাই বলিতেছেন -'সদেব সোম্যেদমগ্র আসীদেকমেবাদ্বিতীয়ম্'- (ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬/২/১)।
‘হে প্রিয়দর্শন, এই জগৎ উৎপত্তির পূর্ব্বে এক অদ্বিতীয় সৎ রূপেই বিদ্যমান ছিল।

এইরূপ অন্যস্থলেও শ্রুতি বলিতেছে-
'আত্মা বা ইদমেক এবাগ্র আসীত্৷ নান্যৎ কিঞ্চন মিষত্৷-(ঐতরেয় উপনিষৎ-১/১/১)
ইহা অর্থাৎ এই জগৎ উৎপত্তির পূর্ব্বে একমাত্র আত্মস্বরূপেই বিদ্যমান ছিল, ব্যাপারবান্ অন্য কিছুই ছিল না।

'বিজ্ঞানমানন্দং ব্রহ্ম'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৩/৯/২৮)।
অর্থাৎ ব্রহ্ম বিজ্ঞান ও আনন্দস্বরূপ।

'সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম'(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২/১/১)
অর্থাৎ ব্রহ্ম সত্য জ্ঞান ও অনন্তস্বরূপ।

ইত্যাদি শ্রুতিহেতু এইরূপ অর্থ। যদিও দেশকালাতীত অদ্বিতীয়ের সহিত 'ছিলেন'-রূপ কালসম্বন্ধ যুক্তিযুক্ত হয় না, তথাপি শ্রোতাদের বুঝিবার সুবিধার জন্য ব্রহ্মে কালসম্বন্ধ আরোপ করে শ্রুতি উপদেশ করিতেছেন-এইরূপ বুঝিতে হইবে।
জগদুপাদান ব্রহ্মের কালত্রয়ের সহিত সম্বন্ধশূন্য কেন? তা সুরেশ্বর আচার্য্য বার্তিকে 'অবিক্রিয়ম্' অর্থাৎ অবিকারী ইত্যাদি পদের দ্বারা স্পষ্ট করিয়াছেন। বৃহদারণ্যক শ্রুতিও তাই বলছেন-''স বা এষ মহানজ আত্মাজরোমরোমৃতোভযো ব্রহ্ম'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪/৪/২৫) অর্থাৎ সেই এই মহান ও জন্মরহিত আত্মাই জরাবিহীন-অবিনাশী অমৃতস্বরূপ অভয়স্বরূপ ও নিরতিশয় মহান।'
ব্রহ্মের নিরবয়বত্ব ও বিভুত্বহেতু তাতে পরিণাম ও পরিস্পন্দন অসম্ভব বলিয়া ব্রহ্মের উপাদানত্বও নাই অর্থাৎ স্বীকৃত হয় না। তাহলে 'আত্মান আকাশঃ সম্ভূতঃ'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২/১) অর্থাৎ 'আত্মা থেকে আকাশ হয়েছিল।', 'তৎ তেজোহসৃজত'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬/২/৩) অর্থাৎ 'তাহা হইতে তেজ সৃষ্টি হইয়াছিল।' ইত্যাদি শ্রুতিসকল হইতে যে ব্রহ্মের উপাদানত্ব-অভিধান পাওয়া যায়, তাহা কেমন করে সিদ্ধ হয়?
উত্তর হইল- 'তত্ত্বের অন্যথাভাবলক্ষণ' পরিণাম অর্থাৎ যেমন মৃত্তিকারূপ তত্ত্বটি হইতে ঘটের উৎপত্তি হয়, তখন ঘট অন্য প্রকারতা ধর্ম্ম বিশিষ্ট হইলেও তাহাতে তত্ত্ব বা কারণ মৃত্তিকা বর্তমান থাকে, এইভাবে পরিণামরূপ ব্রহ্মের জগৎকার্য্যত্ব সম্বন্ধে উপাদানত্ব হওয়া অসম্ভব হওয়ায়, ব্রহ্মের 'অতত্ত্বতঃ অন্যথালক্ষণ'-বিবর্ত অর্থাৎ শুক্তিতে যখন রজতভ্রান্তি হয়, তখন রজতরূপ মিথ্যা প্রতীতিটির সহিত তত্ত্বরূপ অর্থাৎ কারণরূপ শুক্তি ত্রিকালে পৃথক্ থাকেই, ঐ মিথ্যা প্রত্যয়ের অধিষ্ঠান হওয়ারূপ বিবর্ত-উপাদনত্ব সম্ভব হয়, এইজন্য সুরেশ্বর আচার্য্য বার্তিকে বলেছেন-'সেই ব্রহ্ম নিজ মায়া' ইত্যাদি। সেই ব্রহ্মতে শক্তিভূতা এবং নিজেতেই (ব্রহ্মতেই) অধ্যস্তা যে মায়া, তাঁহার আধ্যাসিক তাদাত্ম্য হইয়া থাকে, সেইজন্য ব্রহ্মকে বীজ বা উপাদান বলা যাইতে পারে। যেহেতু শুক্তি প্রভৃতির স্বরূপ বিকৃত না হইয়াই মিথ্যা-রজতাদির উপাদানত্ব অর্থাৎ আধ্যাসিক কারণত্ব দেখা যায়। অবিক্রিয় ব্রহ্মের জগদ্ বিবর্তের উপাদানত্ব অবিরুদ্ধ এইরূপ অর্থ।
(টীকাঃ- 'সতত্ত্বতোহন্যথা প্রথা বিকার ইত্যুদীরিতঃ। অতত্ত্বতোহন্যথা প্রথা বিবর্ত ইত্যুদাহৃতঃ।।'-(বেদান্ত সার ৬০)
অর্থাৎ যে কারণ স্বরূপ হইতে চ্যুত হয়ে কার্য্য উৎপন্ন করে তা বিকাররূপ কার্য্য; যেমন দুগ্ধ দধি হয়। আর যে কারণটি স্বরূপ হতে চ্যুত না হয়ে কার্য্য উৎপন্ন করে সেই কার্য্যের নাম বিবর্ত। যেমন রজ্জু সর্প হয়।
তাছাড়া আচার্য্য গৌড়পাদ মাণ্ডুক্যকারিকায় বলিতেছেন-
অনিশ্চিতা য়থা রজ্জুরন্ধকারে বিকল্পিতা ।
সর্পধারাদিভির্ভাবৈস্তদ্বদাত্মা বিকল্পিতঃ ॥ মাণ্ডুক্যকারিকা-২।১৭।।
অর্থাৎ অজ্ঞাত রজ্জু যেমন সর্পরূপে প্রতীতির হেতু, অজ্ঞাত নির্বিশেষ ব্রহ্মই তদ্রূপ জগৎরূপে প্রতীতির হেতু।)

আবার সেই নিত্যমুক্ত ব্রহ্মে উৎপত্তির পূর্ব্বে জগতের সুক্ষ্মরূপে অবস্থান অসম্ভব বলিয়া কি করে ব্রহ্মে জগদ্ বীজত্বের প্রতিষ্ঠা করা যায়?
তাই পূজ্যপাদ সুরেশ্বরাচার্য্য বার্তিকে বলিতেছেন-অব্যাকৃতাত্মক অর্থাৎ অনভিব্যক্ত নামরূপাত্মক জগতের তিনিই ঈশ্বর নামধেয় বীজস্বরূপ অর্থাৎ উপাদান কারণ।
স্বতঃসিদ্ধ নিত্যমুক্ত ব্রহ্মের সুক্ষ্মজগৎরূপ কার্য্যের আশ্রয়ত্ব অসম্ভব হইলেও তদাশ্রিত মায়াতে তাহা সম্ভব হওয়ায়, সেই অব্যাকৃতাত্মক অর্থাৎ অনভিব্যক্ত নামরূপাত্মক জগদাশ্রয় মূল মায়ার দ্বারা (শক্তি-শক্তিমানের আধ্যাসিক তাদাত্ম্য সম্বন্ধে এবং শ্রুতিতে 'সেই এই জগৎ অব্যাকৃতরূপে ছিল'-এইরূপ উপদেশ থাকায়, ব্রক্ষকেও অব্যাকৃতাত্মক
অর্থাৎ অনভিব্যক্ত নামরূপাত্মক জগদাশ্রয় বলা চলে।

(টীকাঃস্বতঃসিদ্ধ বিষয়ে টীকা হইল-'স্বস্য সত্তায়াঃ স্বত এব প্রমাণম্।' যো বেত্তি বিশ্বং ন চ তস্য বেত্তা'(শ্বেতাশ্বতর উপনিষৎ ৩।১৯)-অজ্ঞানবোধিনী।
অর্থাৎ নিজের সত্তার তুমি নিজেই প্রমাণ। যিনি সমগ্র বিশ্বকে জানেন, তাঁহার বেত্তা কেউ নাই।)
অতএব ব্রহ্মের জগৎবীজত্ব যুক্তই হইল-এইরূপ অর্থ।

অনন্ত শ্রীমৎ শঙ্কর ভগবৎপূজ্যপাদ্ বিরচিত-

সূত্রম্- অব্যক্তাৎ মহৎ।।৪

ভাবার্থঃ-অব্যাকৃতা প্রকৃতি হতে মহৎতত্ত্বের উদ্ভব হয়। ৪

সূত্রম্- মহতোহহংকারঃ।। ৫

ভাবার্থঃ-মহৎ হতে অহংকারের উৎপত্তি। ৫

সূত্রম্- অহংকারাৎ পঞ্চতন্মাত্রাণি।।৬

ভাবার্থঃ-অহংকার হতে পঞ্চ তন্মাত্র।৬

সূত্রম্- পঞ্চতন্মাত্রেভ্যঃ পঞ্চমহাভূতানি।।৭

ভাবার্থঃ-পঞ্চ তম্মাত্র হতে পঞ্চ স্থূল ভূতের উৎপত্তি হয়।৭

সূত্রম্- পঞ্চমহাভূতেভ্যঃ অখিলং জগৎ।।৮

ভাবার্থঃ-পঞ্চীকৃত পঞ্চ মহাভূত সকল হতে অখিল জগৎ উৎপত্তি হয়।।৮

ভগবান্ শঙ্করাচার্যের শিষ্য শ্রীমৎ সুরেশ্বরাচার্যের বার্তিক- এই ভাবে ব্রহ্মের প্রপঞ্চ-উপাদানত্ব (উপাদান কারণত্ব) প্রতিপাদন করে, এখন তাঁতে জগতের অধ্যারোপ দেখাবার জন্য তা হতে সৃষ্টি - বিবরণ বলছেন-

সেই অব্যক্তা প্রকৃতি হতে (কর্ণেন্দ্রিয়ের শব্দোৎপাদক সর্বাপকৃষ্ট শব্দ-স্পন্দ-কণারূপ) শব্দতন্মাত্ররূপ আকাশ উৎপন্ন হয়েছে, তা হতে (ত্বগেন্দ্রিয়ের স্পর্শোৎপাদক সর্বাপকৃষ্ট স্পর্শ-স্পন্দ-কণারূপ) স্পর্শতন্মাত্রাত্মক বায়ু,তা হতে (চক্ষুরিন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপোৎপাদক সর্বাপকৃষ্ট রূপ-স্পন্দ-কণারূপ) রূপতন্মাত্রাত্মক তেজের উৎপত্তি হয়েছে।।৩।।

বার্তিক- সেই তেজঃ হতে ( রসনায় রসোৎপাদক রস- স্পন্দ-কণারূপ ) রসাত্মিকা আপ (জল) এবং সেই জল-সমূহ হতে (নাসিকায় গন্ধোৎপাদক গন্ধ-স্পন্দ-কণারূপ) গন্ধতন্মাত্র-গুণবিশিষ্ট মহীর উৎপত্তি হয়। আকাশের একটি মাত্র অসাধারণ গুণ শব্দ অর্থাৎ কর্ণেন্দ্রিয়-গ্রাহ্য ধ্বনির উৎপাদক সর্বাপকৃষ্ট স্পন্দ-কণা।।৪।।

পূর্বোক্তরূপে (অস্তিত্ব, অনিত্যত্ব), শব্দ, স্পর্শ, (সাধারণ) ও রূপ (বিশেষ) গুণহেতু তেজের তিনটি গুণ। (মতান্তরে রসাকর্ষণ, ঊর্ধ্ব গতি, বেগ এই গুণত্রয় বায়ু হতে প্রাপ্ত সাধারণ গুণও তেজের আছে)। তারপর (অস্তিত্ব, অনিত্যত্ব) শব্দ, স্পর্শ, রূপ (সাধারণ) ও রস (অসাধারণ) গুণহেতু আপের চারটি গুণ। (মতান্তরে দ্রবত্ব, স্নেহত্ব, স্যন্দনত্বও জলের বিশেষ গুণ )।।৫।।

এবং পূর্বোক্তরূপে (অস্তিত্ব, অনিত্যত্ব) শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস (সাধারণ) এবং গন্ধ (বিশেষ) গুণহেতু মহী-ভূত পঞ্চগুণ-বিশিষ্ট। (মতান্তরে কঠিনত্ব, ভস্মাবশেষত্ব ক্ষিতির অপর দুটি বিশেষ গুণ)। এই (মহদব্রহ্মাখ্য, যাতে সাক্ষিচৈতন্য প্রতিবিম্বরূপ গর্ভাধান করে থাকেন) পঞ্চ মূল অপঞ্চীকৃত ভূতে অভিমানহেতু চিদাভাসরূপ সূত্রাত্মা (প্রতিবিম্ববাদীদের চিৎপ্রতিবিম্ব) সম্ভূত হলেন; অর্থাৎ মহত্তত্ত্বাভিমানী, ব্যষ্টি-সমষ্টি লিঙ্গ যাঁর সূক্ষ্মশরীর, সর্ব ব্যষ্টি-লিঙ্গশরীরে ব্যাপ্ত বলে যিনি সর্বাত্মক এবং হিরণ্যোজ্জ্বল পঞ্চীকৃত স্থূল সৃষ্টির যিনি গর্ভস্বরূপ অথবা হিরণ্যোজ্জ্বল সত্ত্ব-প্রধান মহদ্-ব্রহ্মাখ্য প্রকৃতি যাঁর গর্ভস্থান, তাঁর উৎপত্তি হলো।।৬।।

সেই পঞ্চ মূল-ভূত হতে পাঁচটি স্থূলভূতের উৎপত্তি হয় এবং তা হতে ঐ সমষ্টি স্থূলভূতাভিমানী বিরাট্-পুরুষ উৎপন্ন হন। পন্ডিতগণকর্তৃক পঞ্চীকৃত ভূত সকলই স্থূলভূত বলে কথিত হয়।।৭।।........

Wednesday, 11 December 2019

ব্রাহ্মীশ্রী প্রাপ্তির ছয়টি উপায়ঃ-



মানসম্বন্ধী বিষয়ে সর্বদা রত থাকিলে লৌকিক ঐশ্বর্যশ্রী প্রাপ্তি হয় বটে, কিন্তু সর্ব্বগুণ ও রূপবিহীন নিত্য চিদ্ঘন আনন্দস্বরূপ পরমশুদ্ধা ব্রাহ্মীশ্রী প্রাপ্তির উপায় বিষয়ে শ্রীমহাভারতের উদ্যোগপর্বের দ্বি-চত্বারিংশোহধ্যায়ের সনৎ-সুজাতীয় সম্বাদে পরমপ্রাচীন সনাতন ঋষি ভগবান সনৎ-সুজাত বলিতেছেন-
'দ্বারাণি সম্যক্ প্রবদন্তি সন্তো বহুপ্রকারাণি দুরাচরাণি।
সত্যার্জবে হ্রীর্দম শৌচ বিদ্যাঃ ষন্মান মোহ প্রতিবন্ধকানি।।৪৩।।

ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- মান ও মোহের প্রতিবন্ধক অর্থাৎ বিনাশক সত্য তথা যথার্থ ভাষণ, আর্জব অর্থাৎ অকুটিলতা, হ্রী অর্থাৎ অন্যায় কার্য্য প্রবৃত্তিতে লজ্জা, দম অর্থাৎ অন্তরিন্দ্রিয় ও বহিরিন্দ্রিয় নিগ্রহ, শৌচ অর্থাৎ মলিনতা মার্জ্জন তথা বাহ্য মলিনতা মৃজ্জলাদি সহায়ে ও আন্তরমালিন্য চিত্তশুদ্ধির সাধনাভ্যাস দ্বারা ও ব্রহ্মবিদ্যা- বহুপ্রকার কষ্টসাধ্য সাধনের মধ্যে এই ছয়টিকে তত্ত্ববিদ্ সজ্জনগণ ব্রাহ্মীশ্রী অর্থাৎ মোক্ষস্বরূপের প্রবেশদ্বার রূপে বর্ণন করিয়া থাকেন। ৪৩

Friday, 6 December 2019

শ্রুতি ও স্মৃতিশাস্ত্রে দ্বৈতপ্রপঞ্চ নিষেধের দ্বারা উপদিষ্ট হওয়ায় ব্রহ্ম নির্বিশেষঃ-




শ্রুতি বলিতেছেন ব্রহ্ম চৈতন্যমাত্র, অন্য বিশেষ রূপরহিত এবং নির্বিশেষ, যথাঃ' যথা সৈন্ধবঘনোনন্তরোবাহ্যঃ কৃৎস্নো রসঘন এবৈবং বা অরেযমাত্মানন্তরোবাহ্যঃ কৃৎস্নঃ প্রজ্ঞানঘন এব'-(বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ ৪।৫।১৩)

'সৈন্ধবঘন অর্থাৎ লবণপিণ্ড যেমন অন্তরশূন্য বাহ্যশূন্য অর্থাৎ বাহিরে ভিতরে সর্ব্বত্রই অন্য রসবর্জ্জিত, সমগ্রভাবে রসঘনই অর্থাৎ লবণৈকরসই; এইরূপ প্রিয়ে, এই আত্মা অন্তর্বহির্ভেদশূন্য সমগ্রভাবে চৈতন্যমাত্রস্বরূপই।'

কিন্তু সবিশেষ লবণপিণ্ড দৃষ্টান্তরূপে গৃহীত হওয়ায় দার্ষ্টান্তিক ব্রহ্মও সবিশেষ হইবেন। তদুত্তরে বলিতেছেনইহাই কথিত হইতেছে-এই আত্মার ভিতরে বাহিরে চৈতন্য হইতে ভিন্ন কোনরূপ নাই, একমাত্র চৈতন্যই কিন্তু ইঁহার নিরন্তর নিরবচ্ছিন্ন স্বরূপ। যেমন লবণ পিণ্ডের বাহিরে ভিতরে লবণরসই নিরবচ্ছিন্নভাবে বর্ত্তমান থাকে, অন্য রস থাকে না, সেইপ্রকারই; ইহাই ভাব। আর নির্বিশেষ হওয়ায় অনাত্মরূপের প্রতিষেধদ্বারাই শ্রুতি ব্রহ্মকে প্রদর্শন করিতেছেন, যথাঃ-

'অথাত আদেশো নেতি নেতি'-(বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ ২।৩।৬)

'অনন্তর সত্যের স্বরূপ নির্দ্ধারণের পর, যেহেতু সত্যের সত্যব্রহ্ম অবশিষ্ট আছেন এইহেতু তাঁহার স্বরূপ নির্দ্ধারণের জন্য নেতি নেতি অর্থাৎ ইহা নহে ইহা নহে-ইহাই নির্দ্দেশ।'

'অন্যদেব তদ্বিদিতাদথো অবিদিতাদধি'-(কেন উপনিষদ্ ১।৩)

'তিনি জ্ঞাতবস্তু হইতে অবশ্যই ভিন্ন, আবার অজ্ঞাতবস্তু হইতেও ভিন্ন।'

'যতো বাচো নিবর্তন্তে অপ্রাপ্য মনসা সহ'-(তৈত্তিরীয় উপনিষদ্ ২।৪।১)

'যাঁহাকে প্রাপ্ত না হইয়া মনের সহিত বাগিন্দ্রিয় যাঁহা হইতে ফিরিয়া আসে', ইত্যাদি এইসকল শ্রুতি।

আবার বাষ্কলি কর্ত্তৃক জিজ্ঞাসিত হইয়া বাধ্ব অবচনের দ্বারাই অর্থাৎ কিছু না বলিয়াই ব্রহ্মবিষয়ে বলিয়াছিলেন ইহা শ্রুতিতে বর্ণিত হইতেছে, যথা-'তিনি অর্থাৎ বাষ্কলি বলিয়াছিলেন-'হে ভগবান, ব্রহ্মবিষয়ে উপদেশ করুন, তিনি অর্থাৎ বাধ্ব নিরুত্তর ছিলেন, দ্বিতীয় অথবা তৃতীয়বার জিজ্ঞাসিত হইলে বাধ্ব বাষ্কলিকে বলিয়াছিলেন-আমি বলিতেছি, তুমি কিন্তু বুঝিতে পারিতেছ না, এই আত্মা উপশান্ত অর্থাৎ দ্বৈতভাববিবর্জ্জিত' ইত্যাদি। এইপ্রকারে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাতে বর্ণিত আছে

'জ্ঞেয়ং যত্তত্প্রবক্ষ্যামি যজ্জ্ঞাত্বামৃতমশ্নুতে৷ অনাদিমত্পরং ব্রহ্ম সত্তন্নাসদুচ্যতে'-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৩।১২)

'যাহা জ্ঞেয়, তাহা তোমাকে বলিব, যাঁহাকে জানিয়া অমৃতত্ব লব্ধ হয়। তাহা এই অনাদি মৎপর অর্থাৎ আমা হইতে শ্রেষ্ঠ, আমার নির্বিশেষস্বরূপ ব্রহ্ম সদ্ রূপে অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যরূপে কথিত হন না, অসদ্ রূপে কথিত হন না।' ইত্যাদি এইসকল স্মৃতিশাস্ত্রেও অনাত্মরূপের প্রতিষেধ দ্বারাই ব্রহ্ম উপদিষ্ট হইতেছেন'।

এইরূপে বিশ্বরূপধারী নারায়ণ নারদকে বলিয়াছিলেন

'মায়া হ্যেষা ময়া সৃষ্টা যন্মাং পশ্যসি নারদ সর্বভূতগুণৈর্যুক্তং নৈবং মাং জ্ঞাতুমর্হসি।'

-(মহাভারত, শান্তিপর্ব্ব, ৩৩৯।৪৫-৪৬)

'হে নারদ, সর্ব্বভূতের গুণের দ্বারা অর্থাৎ জনকত্ব পালকত্বাদিরূপ সকল প্রাণীর গুণের দ্বারা, অথবা পৃথিব্যাদি ভূতের গুণ দিব্য গন্ধাদি দ্বারা যুক্ত এই যে আমাকে দর্শন করিতেছ, ইহা মৎকর্ত্তৃক সৃষ্টা অর্থাৎ অস্মদধিষ্ঠানে অভিব্যক্তা মায়া, এই প্রকারে তুমি আমার যথার্থস্বরূপ জানিতে পারিবে না, কারণ আমি বস্তুতঃ দ্বৈতাতীত।' ইত্যাদি স্মৃতিশাস্ত্রে বর্ণিত হইতেছে।....

তথ্যসূত্রঃ- ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্যের শারীরক-মীমাংসা ভাষ্য। (ব্রহ্মসূত্র //১৬, ১৭ শাঙ্করভাষ্য দ্রষ্টব্য)

শ্রীশুভ চৌধুরী

ডিসেম্বর , ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ।

জ্ঞানী ভোগ্যবিষয়ে মনের কঠিনতা আর ভগবদ্বিষয়ে মনের কোমলতা সম্পাদন করে—

  আচার্য মধুসূদন সরস্বতী ভক্তিরসায়নে বলছেন — কাঠিন্যং বিষয়ে কুর্যাদ্ দ্রবত্বং ভগবৎপদে। উপায়ৈঃ শাস্ত্রনির্দিষ্টৈরনুক্ষণমতো ব...