Saturday, 15 August 2020

'শ্রীরামভুজঙ্গস্তোত্র'


ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য বিরচিত 'শ্রীরামভুজঙ্গস্তোত্র' বঙ্গানুবাদ সমেত

বিশুদ্ধং পরং সচ্চিদানন্দরূপম্

গুণাধারমাধারহীনং বরেণ্যম্

মহান্তং বিভান্তং গুহান্তং গুণান্তং

সুখান্তং স্বয়ং ধাম রামং প্রপদ্যে ।।১।।

ভাবার্থ - যিনি নিখিল গুণের আধার অথচ গুণাতীত, যিনি হৃদয়গুহায় অধিষ্ঠিত অথচ নিরাধার, বিষয়সুখের পরপারে স্থিত, সচ্চিদানন্দস্বরূপ, সেই স্বপ্রকাশ, সর্ব্বকারণ বিশুদ্ধ জ্যোতিঃরূপ শ্রীরামের প্রপন্ন হচ্ছি।

শিবং নিত্যমেকং বিভুং তারকাখ্যং

সুখাকারমাকারশূন্যং সুমান্যম্

মহেশং কলেশং সুরেশং পরেশং

নরেশং নিরীশং মহীশং প্রপদ্যে ।।২।।

ভাবার্থ - যিনি মঙ্গলময়, অদ্বিতীয় বিভু, যাঁর নাম তারকব্রহ্ম, যিনি নিরাকার, নিত্যসুখস্বরূপ, সর্ব্বকলার অধীশ্বর জগন্মান্য, যাঁর প্রভু কেউ নেই, যিনি মহেশ্বর, সুরেশ্বর পরমেশ্বর, সেই নরনাথ ভূপালের প্রপন্ন হচ্ছি।

যদাবর্ণয়ৎকর্ণমূলেঽন্তকালে

শিবো রাম রামেতি রামেতি কাশ্যাম্

তদেকং পরং তারকব্রহ্মরূপং

ভজেঽহং ভজেঽহং ভজেঽহং ভজেঽহম্ ।।৩।।

ভাবার্থ - শিব কাশীতে মৃত্যুকালে জীবের কর্ণমূলে যে 'রাম রাম রাম' এই বর্ণ প্রদান করেন, তারকব্রহ্মস্বরূপ সেই এক সর্বশ্রেষ্ঠকে আমি ভজনা করি, আমি ভজনা করি, আমি ভজনা করি।

মহারত্নপীঠে শুভে কল্পমূলে

সুখাসীনমাদিত্যকোটিপ্রকাশম্

সদা জানকীলক্ষ্মণোপেতমেকং

সদা রামচন্দ্রম্ ভজেঽহং ভজেঽহম্ ।।৪।।

ভাবার্থ - শুভ কল্পবৃক্ষমূলে মহারত্মময় পীঠে সুখে আসীন, সতত জানকী এবং লক্ষ্মণ সমন্বিত, কোটিসূর্য্য সমতেজা, অদ্বিতীয় রামচন্দ্রকে আমি ভজনা করি, আমি সর্ব্বদা ভজনা করি।

ক্বণদ্রত্নমঞ্জীরপাদারবিন্দম্

লসন্মেখলাচারুপীতাম্বরাঢ্যম্

মহারত্নহারোল্লসৎকৌস্তুভাঙ্গং

নদচ্চঞ্চরীমঞ্জরীলোলমালম্ ।।৫।।

ভাবার্থ - যাঁর চরণকমলে রত্ননুপুর বাজছে, সুশোভিত-কটি-মনোহর পীতাম্বর যাঁর পরিধানে আছে, বক্ষঃস্থলে মহারত্নহার-শোভিত কৌস্তুভমণি বিরাজমান, যাঁর দোদুল্যমান মালায় কুসুমমঞ্জরী, গুঞ্জনরত ভ্রমরা শোভিত।

লসচ্চন্দ্রিকাস্মেরশোণাধরাভম্

সমুদ্যৎপতঙ্গেন্দুকোটিপ্রকাশম্

নমদ্ব্রহ্মরুদ্রাদিকোটীররত্ন-

স্ফুরৎকান্তিনীরাজনারাধিতান্ঘ্রিম্ ।।৬।।

ভাবার্থ - যাঁর অরুণ অধরের আভা, জ্যোৎস্না সদৃশ ঈষৎ হাস্য-শোভিত হয়ে বিরাজমান, যাঁর জ্যোতি উদীয়মান কোটি সূর্য চন্দ্রের ন্যায়, যাঁর চরণযুগল প্রণত ব্রহ্মা রুদ্র প্রমুখ দেবগণের কিরীটরত্ন-নিঃসৃত কিরণজাল-নীরাজনায় আরাধিত হচ্ছে।

পুরঃ প্রাঞ্জলীনাঞ্জনেয়াদিভক্তান্

স্বচিন্মুদ্রয়া ভদ্রয়া বোধয়ন্তম্

ভজেঽহং ভজেঽহং সদা রামচন্দ্রং

তদন্যং মন্যে মন্যে মন্যে ।।৭।।

ভাবার্থ - যিনি সম্মুখে কৃতাঞ্জলিপুটে অবস্থিত অঞ্জনানন্দন প্রভৃতি ভক্তবৃন্দকে কল্যাণদায়িনী স্বীয়জ্ঞানমুদ্রা দ্বারা জ্ঞানোপদেশ প্রদানে তৎপর, সেই রামচন্দ্রকে আমি ভজনা করি, আমি সদা ভজনা করি। আমি তাকে ব্যতীত কাউকেও মনে আনতে চাই না, মনে আনতে চাই না, মনে আনতে চাই না।

যদা মৎসমীপং কৃতান্তঃ সমেত্য

প্রচণ্ড-প্রকোপৈর্ভটৈর্ভীষয়েন্মাম্

তদাবিষ্করোষি ত্বদীয়ং স্বরূপং

সদাপৎপ্রণাশং -কোদণ্ডবাণম্ ।।৮।।

ভাবার্থ -যখন আমার কাছে কৃতান্ত (যম) এসে ক্রোধযুক্ত নিজ যোদ্ধাগণ দ্বারা আমাকে ভয় দেখাবে, তখন সদা-বিপত্তি-ভঞ্জন ধনুর্বাণধারী তোমার মূর্তি (নিশ্চয়ই আমার সমক্ষে) প্রাদুর্ভাব করবে।

নিজে মানসে মন্দিরে সন্নিধেহি

প্রসীদ প্রসীদ প্রভো রামচন্দ্র

-সৌমিত্রিণা কৈকয়ী-নন্দনেন

স্বশক্ত্যানুভক্ত্যা সংসেব্যমান ।।৯।।

ভাবার্থ - হে প্রভো, রামচন্দ্র! প্রসন্ন হও, প্রসন্ন হও। লক্ষ্মণসহ কৈকেয়ীনন্দন নিজ শক্তি আর অনুগত ভক্তিসহকারে তোমার সেবা করছেন, এইরূপে আমার মানমন্দিরে উপস্থিত হও।

স্বভক্তাগ্রগণ্যৈঃ কপীশৈর্মহীশৈ-

রনীকৈরনেকৈশ্চ রাম প্রসীদ

নমস্তে নমোঽস্ত্বীশ রাম প্রসীদ

প্রশাধি প্রশাধি প্রকাশং প্রভো মাম্ ।।১০।।

ভাবার্থ - নিজভক্তাগ্রগণ্য কপিরাজ-সমূহ, ভূপালসমূহ এবং বহুসৈন্য-সমন্বিত হে রাম! আমার প্রতি প্রসন্ন হও ; হে ঈশ্বর! তোমার প্রতি (আমার) পুনঃ পুনঃ নমস্কার (অর্পিত) হোক। হে রাম, প্রসন্ন হও ; হে প্রভো, আমাকে প্রকাশ্যরূপে উপদেশ প্রদান কর, উপদেশ প্রদান কর।১০

ত্বমেবাসি দৈবং পরং মে যদেকং

সুচৈতন্যমেতৎ ত্বদন্যন্ন মন্যে

যতোঽভূদমেয়ং বিয়দ্-বায়ু-তেজো-

জরোর্ব্ব্যাদিকার্যঞ্চরঞ্চাচরঞ্চ ।।১১।।

ভাবার্থ - যা হতে আকাশ, বায়ু, তেজ, জল, পৃথিবী প্রভৃতি অপরিমিত চরাচরকার্য উৎপন্ন হয়েছে, যিনি এক নিত্য চৈতন্যস্বরূপ, সেই তুমিই আমার পরম দেবতা, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে তোমা ভিন্ন মনে করি না। ১১

নমঃ সচ্চিদানন্দরূপায় তস্মৈ

নমো দেবদেবায় রামায় তুভ্যম্

নমো জানকী-জীবিতেশায় তুভ্যং

নমঃ পুণ্ডরীকায়তাক্ষায় তুভ্যম্ ||১২||

ভাবার্থ - সেই সচ্চিদানন্দরূপকে নমস্কার, হে দেবদেব রাম, তুমিই সেই, তোমাকে নমস্কার, জানকী-জীবিতেশ্বর, তোমাকে নমস্কার, হে পুণ্ডরীক-বিশাললোচন, তোমাকে নমস্কার। ১২

নমো ভক্তিযুক্তানুরক্তায় তুভ্যং

নমঃ পুণ্যপুঞ্জৈকলভ্যায় তুভ্যম্

নমো বেদবেদ্যায় চাদ্যায় পুংসে

নমঃ সুন্দরায়েন্দিরাবল্লভায় ||১৩||

ভাবার্থ - নিজ ভক্তগণের প্রতি অনুরক্ত, তোমাকে নমস্কার। একমাত্র পুণ্যপুঞ্জলভ্য, তোমাকে নমস্কার, বেদবেদ্য আদ্য পুরুষ (তোমাকে) নমস্কার, সুন্দরমূর্তি (শ্রীবল্লভ) তোমাকে নমস্কার। ১৩

নমো বিশ্বকর্ত্রে নমো বিশ্বহর্ত্রে

নমো বিশ্বভোক্ত্রে নমো বিশ্বমাত্রে।

নমো বিশ্বনেত্রে নমো বিশ্বজেত্রে

নমো বিশ্বপিত্রে নমো বিশ্বধাত্রে ।।১৪।।

ভাবার্থ- বিশ্বকর্তাকে নমস্কার, বিশ্বহর্তাকে নমস্কার, বিশ্বভোক্তাকে নমস্কার, বিশ্বজ্ঞাতাকে নমস্কার, বিশ্বনেতাকে নমস্কার, বিশ্বজেতাকে নমস্কার, বিশ্বপিতাকে নমস্কার, বিশ্বধাতাকে নমস্কার। ১৪

নমস্তে নমস্তে সমস্তপ্রপঞ্চ-

প্রভোগ-প্রয়াগ-প্রমাণ-প্রবীণ

মদীয়ং মনস্ত্বৎ-পদদ্বন্দ্বসেবাং

বিধাতুং প্রবৃত্তং সুচৈতন্যসিদ্ধ্যৈ ।।১৫।।

ভাবার্থ - হে সমস্ত জগৎপ্রপঞ্চের অব্যাহত ভোগ, প্রয়োগ এবং যাথার্থ্য-নির্ণয়ে প্রবীণ, তোমাকে পুনঃ পুনঃ নমস্কার করি। আমার মন সুচৈতন্য অর্থাৎ তত্ত্বজ্ঞান লাভের জন্য তোমার চরণযুগল সেবা করতে প্রবৃত্ত হয়েছে। ১৫

শিলাপি ত্বদঙ্ঘ্রি ক্ষমাসঙ্গিরেণু-

প্রসাদাদ্ধি চৈতন্যমাধত্ত রাম

নরস্ত্বৎপদদ্বন্দ্ব-সেবাবিধানাৎ

সুচৈতন্যমেতীতি কিং চিত্রমত্র ।।১৬।।

ভাবার্থ - হে রাম! তোমার চরণসঙ্গত পার্থিব রেণুর প্রসাদে শিলাও চৈতন্য প্রাপ্ত হয়েছিল। মানুষ তোমার চরণযুগল সেবা করলে যে সুচৈতন্য লাভ করবে, এতে আর আশ্চর্য কি। ১৬

পবিত্রং চরিত্রং বিচিত্রং ত্বদীয়ং

নরা যে স্মরন্ত্যন্বহং রামচন্দ্র

ভবন্তং ভবান্তং ভরন্তং ভজন্তো

লভন্তে কৃতান্তং পশ্যন্ত্যতোঽন্তে ।।১৭।।

ভাবার্থ - হে রামচন্দ্র! যাঁরা জগৎপালক তোমাকে ভজনা করতঃ প্রত্যহ তোমার পবিত্র বিচিত্র চরিত্র স্মরণ করে, তারা সংসারের পারপ্রাপ্ত হয়ে থাকে, অতএব অন্তে আর কৃতান্তদর্শন করে না। ১৭

পুণ্যঃ গণ্যঃ শরণ্যো মমায়ং

নরো বেদ যো দেব-চূড়ামণিং ত্বাম্

সদাকারমেকং চিদানন্দরূপং

মনোবাগগম্যং পরং ধাম রাম ।।১৮।।

ভাবার্থ - হে রাম, তুমি দেব-চূড়ামণি, নিত্যমূর্তি, বাক্য-মনের অতীত, চিদানন্দস্বরূপ, পরমজ্যােতিঃ, যে মানব তোমাকেইনি আমার শরণ্য' এটা উপলব্ধি করেন, তিনি পুণ্যবান্ এবং তিনি গণনীয়। ১৮

প্রচণ্ড প্রতাপ প্রভাবাভিভূত-

প্রভূতারিবীর প্রভো রামচন্দ্র

বলং তে কথং বর্ণ্যতেঽতীব বাল্যে

যতোঽখণ্ডি চণ্ডীশকোদণ্ডদণ্ডঃ ।।১৯।।

ভাবার্থ - হে প্রভো রামচন্দ্র, তোমার প্রচণ্ড প্রতাপ-প্রভাবে অগণিত অরাতি বীরগণ অভিভূত হয়েছে, তোমার এই অতীব বল কিরূপে বর্ণনা করব, যেহেতু তুমি অল্প বয়সে হরধনু ভঙ্গ করেছিলে। ১৯

দশগ্রীবমুগ্রং সপুত্রং সমিত্রং

সরিদ্দুর্গ মধ্যস্থ রক্ষো গণেশম্

ভবন্তং বিনা রাম বীরো নরো বা-

সুরো বামরো বা জয়েৎ কস্ত্রিলোক্যাম্ ।।২০।।

ভাবার্থ - হে রাম! সাগর-দুর্গমধ্যস্থ রাক্ষসবৃন্দের অধিপতি সপুত্র সমিত্র উগ্র দশগ্রীবকে জয় করতে ত্রৈলোক্যমণ্ডলে তোমা ব্যতীত কোন্ সুরাসুর-মানব-বীর সমর্থ? ২০

সদারাম রামেতি নামামৃতং তে

সদারামমানন্দ-নিষ্যন্দ-কন্দম

পিবন্তং নমন্তং সুদন্তং হসন্তং

হনুমন্তমন্তর্ভজে তং নিতান্তম্ ।।২১।।

ভাবার্থ - হে রাম, সজ্জনের আরামপ্রদ আনন্দ-প্রস্রবণের মূল উৎস তোমাররাম' এই নামামৃত যিনি সদা পান করছেন, তোমার প্রণাম করছেন, শুভ্র দন্তপঙ্ক্তি বের করে হাস্য করছেন, সেই হনুমানকে আমি অন্তরে একান্ত ভজনা করি। ২১

সদারাম রামেতি নামামৃত তে

সদারামমানন্দ-নিষ্যন্দ-কন্দম্

পিবন্নন্বহং নন্বহং নৈব মৃত্যো-

বিভেমি প্রসাদাদসাদাত্তবৈব ।।২২।।

ভাবার্থ - হে রাম! সজ্জনগণের সতত আরামপ্রদ আনন্দ-প্রস্রবণের মূল উৎস তোমাররাম' এই নামামৃত আমি প্রতিদিন পান করতঃ তোমারই অব্যাহত প্রসাদে মৃত্যুকেও ভয় করি না। ২২

-সীতা-সমেতৈরকোদণ্ড-ভূষৈ-

রসৌমিত্রি-বন্দ্যৈরচণ্ড-প্রতাপৈঃ

অলঙ্কেশ কালৈরসুগ্রীব মিত্রৈ-

ররামাভিধেয়ৈরলং দৈবতৈর্নঃ ।।২৩।।

ভাবার্থ - (হে রাম!) যাঁরা সীতা-সমন্বিত নন, কোদণ্ডভূষণ যাঁদের নেই, যাঁরা সৌমিত্রির বন্দনীয় নন, যাঁরা প্রচণ্ড প্রতাপশালী নন, লঙ্কেশ্বরের মৃত্যু যাঁরা করতে পারে নি, সুগ্রীব যাঁদের মিত্র নয়, রাম যাঁদের নাম নয়, এমন দেবতায় আমার প্রয়োজন নেই। ২৩

-বীরাসনস্থৈর চিন্মুদ্রিকাঢ্যৈ-

রভক্তাঞ্জনেয়াদিতত্ত্বপ্রকাশৈঃ

অমন্দারমূলৈরমন্দারমালৈ-

ররামাভিধেয়ৈরলং দৈবতৈর্নঃ ।।২৪।।

ভাবার্থ - যাঁরা বীরাসনে আসীন নন, জ্ঞানময়ী মুদ্রা যাঁদের হাতে (হস্তে) নেই, অঞ্জনানন্দন প্রভৃতি ভক্ত-সমক্ষে যাঁরা তত্ত্ব প্রকাশ করেন নি, মন্দারবৃক্ষমূলে যাঁদের স্থিতি (বিশ্রাম) নেই, মন্দারমালা যাঁদের নেই, রাম যাঁদের নাম নয়, এইরূপ দেবতায় আমাদের প্রয়োজন নেই। ২৪

-সিন্ধু-প্রকোপৈর-বন্দ্যপ্রতাপৈ-

-বন্ধু-প্রযাণৈর-মন্দ-স্মিতাঢ্যৈঃ

-দণ্ড-প্রবাসৈর-খণ্ডপ্রবোধৈ-

-রামাভিধেয়ৈরলং দৈবতৈর্নঃ ।।২৫।।

ভাবার্থ - সমুদ্রের প্রতি যাঁরা ক্রোধ প্রকাশ করতে পারেন নি, যাঁদের প্রতাপ বন্দনীয় হয় নি, যাঁদের বন্ধুবিচ্ছেদ হয় নি, যাঁদের মুখে মৃদুমন্দ ঈষৎ হাস্য নেই, দণ্ডকারণ্যে যাঁরা প্রবাস করেন নি, যাঁরা আত্মবিস্মৃত নন, রাম যাঁদের নাম নয়, এইরূপ দেবতার আমাদের প্রয়োজন নেই। ২৫

হরে রাম সীতাপতে রাবণারে

খরারে মুরারেঽসুরারে পরেতি

লপন্তং নয়ন্তং সদাকালমেবং

সমালোকয়ালোকয়াশেষবন্ধো ।।২৬।।

ভাবার্থ - হে হরে, হে রাম, হে সীতাপতে, হে রাবণারে, হে খরবিনাশন্, হে মুরারে, হে অসুররিপো, হে পরাৎপর, এইরূপ কথায় সদাকাল যাপন করতে প্রবৃত্ত ব্যক্তিকে হে অখিলবন্ধো, অবলোকন কর, অবলোকন কর। ২৬

নমস্তে সুমিত্রা-সুপুত্রাভিবন্দ্য

নমস্তে সদা কৈকয়ী-নন্দনেভ্য

নমস্তে সদা বানরাধীশবন্দ্য

নমস্তে নমস্তে সদা রামচন্দ্র ।।২৭।।

ভাবার্থ - হে সুমিত্রা-তনয়ের অভিবাদনীয়, তোমাকে নমস্কার। হে কৈকেয়ী-নন্দের স্তবপাত্র, সর্ব্বদা তোমাকে নমস্কার। হে বানরপতি সুগ্রীবের বন্দনীয়, তোমাকে নিরন্তর নমস্কার। হে রামচন্দ্র, সতত তোমার নমস্কার, তোমার নমস্কার। ২৭

প্রসীদ প্রসীদ প্রচণ্ডপ্রতাপ

প্রসীদ প্রসীদ প্রচণ্ডারিকাল

প্রসীদ প্রসীদ প্রপন্নানুকম্পিন্

প্রসীদ প্রসীদ প্রভো রামচন্দ্র ।।২৮।।

ভাবার্থ - হে প্রচণ্ড-প্রতাপ, প্রসন্ন হও, প্রসন্ন হও। হে প্রচণ্ড-শত্রুর কৃতান্ত, প্রসন্ন হও, প্রসন্ন হও। হে প্রপন্নজনের সদা অনুকম্পাপরায়ণ, প্রসন্ন হও প্রসন্ন হও। হে প্রভো রামচন্দ্র, প্রসন্ন হও, প্রসন্ন হও। ২৮

ফলশ্রুতি:-

ভুজঙ্গপ্রয়াতং পরং বেদসারং

মুদা রামচন্দ্রস্য ভক্ত্যা নিত্যম

পঠন্ সন্ততং চিন্তয়ন্ স্বান্তরঙ্গে

এব স্বয়ং রামচন্দ্রঃ ধন্যঃ।।২৯।।

ভাবার্থ - (যে ব্যক্তি) ভুজঙ্গপ্রয়াতচ্ছন্দে নির্মিত রামচন্দ্রের বেদসার পরমস্তব সানন্দে ভক্তি সহকারে পাঠ করেন এবং অন্তঃকরণে সদা চিন্তা করেন, তিনি ধন্য এবং তিনিই স্বয়ং রামচন্দ্র। ২৯

ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্যস্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্যস্য শ্রীমচ্ছঙ্কর ভগবতঃ কৃতৌ শ্রীরামভুজঙ্গপ্রয়াত স্তোত্রং সম্পূর্ণম্ ।।

ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্য ভগবান্ শঙ্করাচার্য বিরচিত শ্রীরামভুজঙ্গপ্রয়াত স্তোত্র সমাপ্ত।

...................................................................................................................

শ্রীশুভ চৌধুরী

রামনবমী, ২০২০ খৃষ্টাব্দ।

Thursday, 13 August 2020

শব্দের দ্বারা যিনি উচ্চারিত হন না, পক্ষান্তরে যাঁহার নিমিত্ত শব্দ প্রকাশিত হয় তিনিই ব্রহ্মঃ-


সামবেদের তলবকার ব্রাহ্মণের অন্তর্গত কেনোপনিষদের প্রথম খণ্ডে বর্ণিত আছে-

যদ্বাচানভ্যুদিতং যেন বাগভ্যুদ্যতে ৷
তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং যদিদমুপাসতে ৷৷ কেন উপনিষৎ ১.৪ ৷৷

ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের 'শাঙ্করভাষ্য' অনুসারে ভাবার্থঃ- যে চৈতন্যমাত্রসত্তাস্বরূপ ব্রহ্ম, যিনি বাক্যের দ্বারা অপ্রকাশিত তিনিও বাক্, আবার বাক্ জিহ্বামূল প্রভৃতি আটটি স্থান সংলগ্ন অগ্নিদেবতা কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত বর্ণসকলের অভিব্যক্তকারী বাগিন্দ্রিয়কেও বুঝায় এবং অর্থসম্বন্ধ বিশিষ্ট নির্দিষ্টসংখ্যক নির্দিষ্টক্রমে প্রযুক্ত বর্ণসকলকে অথবা ঐ প্রকারে বর্ণসকলের ধ্বনির দ্বারা অভিব্যক্ত শব্দও, পদ বা বাক্ বলিয়া কথিত হয়।

'অকারো বৈ সর্বা বাক্সৈষাস্য স্পর্শান্তঃস্থোষ্মভির্ব্যজ্যমানা বহ্বী নানারূপা ভবতি'-(ঐতরেয় আরণ্যক ২।৩।৬।১৮)
অর্থাৎ 'অকারই সম্পূর্ণ বাক্ অর্থাৎ অকার প্রধান ওঙ্কার (অ+উ+ম) দ্বারা উপলক্ষিত স্ফোট নামক চৈতন্যের শক্তিই সকল শব্দের মূল যাহা স্পর্শ, অন্তঃস্থ এবং উষ্ম প্রভৃতি বর্ণদ্বারা অভিব্যক্ত হইয়া বহু নাম ও নানারূপ হইয়া থাকে।'

এবং নিয়ত ঋক্ মন্ত্র, অনিয়ত যজুঃমন্ত্র, গীতিবিশিষ্ট সামমন্ত্র এবং সত্য ও মিথ্যাবচন-এই যাঁহার বিকার তাহা (অর্থাৎ সেই মূল বাক্ বা ব্রহ্ম), সেই পদরূপ পরিচ্ছিন্ন বাকের দ্বারা এবং বাগিন্দ্রিয়রূপ গৌনবাকের দ্বারা অপ্রকাশিত অর্থাৎ অনুচ্চারিত। পক্ষান্তরে ব্রহ্মের নিমিত্তই যে বাগিন্দ্রিয়ের সহিত শব্দ অভীষ্ট অর্থকে প্রকাশ করিতে উচ্চারিত হয় অর্থাৎ চৈতন্যজ্যোতিঃস্বরূপ ব্রহ্মের নিমিত্তই যে শব্দ প্রকাশিত হয় এবং বাগিন্দ্রিয় প্রেরিত হয়, এইকথা 'যিনি বাক্যেরও বাক্যস্বরূপ' এইরূপে এই উপনিষদের ২য় মন্ত্রে বলা হইয়াছে। আবার বৃহদারণ্যক উপনিষদে-

"বদন্বাক্"-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-১।৪।৭)
অর্থাৎ 'শব্দ সম্পাদন করেন বলিয়া তাঁহার নাম বাক্।'

যো বাচমন্তরো যময়তি-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৩।৭।১৭)
অর্থাৎ 'যিনি অন্তরে থাকিয়া বাক্যকে নিয়ন্ত্রিত করেন।' ইত্যাদি শ্রুতিবাক্যেও বলা হইয়াছে।

'যে বাক্ পুরুষে অ্থাৎ চেতন প্রাণীতে আছেন, তিনিই শব্দে স্থিত, তাঁহাকে কোন ব্রহ্মনিষ্ঠ পুরুষই জানিতে পারেন'-এইভাবে শ্রুতিতে মূল বাক্ বা ব্রহ্মের সম্বন্ধে প্রশ্ন উঠাইয়া উত্তরে বলা হইয়াছে-'যাঁহার নিমিত্ত জীব স্বপ্নে কথা বলে তিনিই মূল বাক্।' অর্থাৎ সেই চৈতন্যজ্যোতিঃস্বরূপ নিত্য বাক্ই বক্তার বচনশক্তি। শ্রুতিতেও আছে-

"ন হি বক্তুর্বক্তের্বিপরিলোপো বিদ্যতে"- -(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪।৩।২৬)
অর্থাৎ 'বক্তার (নিত্য) বচনশক্তির (ব্রহ্মের) কখনই বিনাশ হয় না।'

অতএব হে শিষ্য, সেই নিজস্বরূপকেই তুমি ব্রহ্ম বলিয়া জানিও কারণ বৃহৎ বলিয়া তাঁহাই সর্বোৎকৃষ্ট ভূমা সংজ্ঞক ব্রহ্ম। বাকের বাক্, চক্ষুর চক্ষু, কর্ণের কর্ণ, মনের মন, কর্তা, ভোক্তা, বিজ্ঞাতা, নিয়ন্তা, শাসনকর্তা, বিজ্ঞানস্বরূপ, আনন্দস্বরূপ ব্রহ্ম ইত্যাদি যে সমস্ত ব্যবহার, সর্বলোকব্যবহারের অবিষয় নির্বিশেষ, অতিশয় সাম্য (সর্বত্র একরূপ) ব্রহ্মেতে বাগিন্দ্রিয় প্রভৃতি উপাধি নিমিত্তই প্রযুক্ত হয়, সেই সমস্ত উপাধিকে নিরাকৃত করিয়া নিজের নির্বিশেষ আত্মাকেই ব্রহ্ম বলিয়া জানিবে-ইহাই শ্রুতিতে 'তৎএব' শব্দের তাৎপর্য্যার্থ। এমনকি এই যে লোকে বিবিধ অনাত্ম-উপাধিরূপ ভেদবিশিষ্ট ঈশ্বরাদিকে উপাসনা অর্থাৎ ধ্যান করে ইনিও শুদ্ধ ব্রহ্মসংজ্ঞক নন। এই বাক্য দ্বারা অনাত্মা উপাধি প্রভৃতির অব্রহ্মত্ব বলা হইয়াছে। নির্বিশেষ আত্মাতেই ব্রহ্মবুদ্ধি করিতে হইবে এই নিয়ম করিবার জন্য অথবা আত্মভিন্ন পদার্থে ব্রহ্মবুদ্ধির নিবৃত্তি করিবার জন্য 'ইহা ব্রহ্ম নহে' এই বাক্য শ্রুত হইয়াছে।.

Saturday, 8 August 2020

বাক্যবৃত্তিঃ-


ভগবৎপাদ শঙ্করাচার্য্য বিরচিত 'বাক্যবৃত্তি'র গুরুশিষ্যসংবাদ- 

॥ শ্রী গণেশায় নমঃ॥

সর্গস্থিতিপ্রলয়হেতুমচিন্ত্যশক্তিং বিশ্বেশ্বরং বিদিতবিশ্বমনন্তমূর্তিম্ ।

নির্মুক্তবন্ধনমপারসুখাম্বুরাশিং শ্রীবল্লভং বিমলবোধঘনং নমামি ॥ ১॥ 

যস্য প্রসাদাদহমেব বিষ্ণুর্ময়্যেব সর্বং পরিকল্পিতং চ ।

ইত্থং বিজানামি সদাত্মরূপং তস্যাংঘ্রিপদ্মং প্রণতোঽস্মি নিত্যম্ ॥ ২॥

 

তাপত্রয়ার্কসংতপ্তঃ কশ্চিদুদ্বিগ্নমানসঃ ।

শমাদিসাধনৈর্যুক্তঃ সদ্গুরুং পরিপৃচ্ছতি ॥ ৩॥

আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক এই ত্রিবিধ দুঃখরূপ সূর্য্যের দ্বারা সন্তপ্ত, উদ্বিগ্নচিত্ত কোন শিষ্য অনন্তর শমাদি সাধন সম্পত্তিযুক্ত হইয়া সদ্গুরুকে জিজ্ঞাসা করিলেন-

অনায়াসেন যেনাস্মান্মুচ্চ্যেয়ং ভববন্ধনাৎ ।

তন্মে সংক্ষিপ্য ভগবন্কেবলং কৃপয়া বদ ॥ ৪॥

হে ভগবন! যাঁহার দ্বারা আত্মা অনায়াসে সংসার বন্ধন হইতে মুক্ত হয়, সেই মুক্তির বিষয় আমাকে কৃপাপূর্ব্বক সংক্ষেপে বলুন।

গুরুরুবাচ ।

সাধ্বীতে বচনব্যক্তিঃ প্রতিভাতি বদামি তে ।

ইদং তদিতি বিস্পষ্টং সাবধানমনাঃ শৃণু ॥ ৫॥

গুরু বলিলেন-"তোমার বাক্যের অভিব্যক্তি সমীচীন বলিয়া প্রতিভাত হইতেছে। অর্থাৎ তুমি উত্তম প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়াছ। আমি তোমার প্রশ্নের অতিস্পষ্ট উত্তর বলিতেছি, তুমি অবহিতচিত্তে শ্রবণ কর।"

তত্ত্বমস্যাদিবাক্যোত্থং যজ্জীবপরমাত্মনোঃ ।

তাদাত্ম্যবিষয়ং জ্ঞানং তদিদং মুক্তিসাধনম্ ॥ ৬॥

"'তত্ত্বমসি' প্রভৃতি বেদান্তের মহাবাক্য হইতে উৎপন্ন যে জীব ও পরমাত্মার তাদাত্ম্যবিষয়ক জ্ঞান (ঐক্যজ্ঞান), তাহাই মুক্তির উপায়।"

শিষ্য উবাচ ।

কো জীবঃ কঃ পরশ্চাত্মা তাদাত্ম্যং বা কথং তয়োঃ ।

তত্ত্বমস্যাদিবাক্যং বা কথং তৎপ্রতিপাদয়েৎ ॥ ৭॥

শিষ্য কহিলেন-" জীব কে? পরমাত্মাই বা কে? কিরূপে জীব ও পরমাত্মার তাদাত্ম্য হয়? তত্ত্বমসি প্রভৃতি মহাবাক্য কিরূপেই বা জীব ও পরমাত্মার ঐক্য প্রতিপাদন করিয়া থাকে?

গুরুরুবাচ ।

অত্র ব্রূমঃ সমাধানং কোঽন্যো জীবস্ত্বমেব হি ।

যস্ত্বং পৃচ্ছসি মাং কোঽহং ব্রহ্মৈবাসি ন সংশয়ঃ ॥ ৮॥

গুরু বলিলেন- আমি এই প্রশ্নের উত্তর অতি সাবধানে বলিতেছি। অন্য জীব আর কে? যেহেতু তুমিই জীব। যে তুমি 'আমি কে',-এই বলিয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করিতেছ, সেই তুমিই ব্রহ্ম, ইহাতে কোনরূপ সংশয় নাই।

শিষ্য উবাচ ।

পদার্থমেব জানামি নাদ্যাপি ভগবন্স্ফুটম্ ।

অহং ব্রহ্মেতি বাক্যার্থং প্রতিপদ্যে কথং বদ ॥ ৯॥

শিষ্য বলিলেন-ভগবন! আমি অদ্যপি ত্বং ও তৎ পদার্থের অর্থ স্পষ্টরূপে জানিলাম না, 'আমিই ব্রহ্ম'-এইরূপে বাক্যার্থ কিরূপ জানিব, তাহাই বলুন।

গুরুরুবাচ ।

সত্যমাহ ভবানত্র বিজ্ঞানং নৈব বিদ্যতে ।

হেতুঃ পদার্থবোধো হি বাক্যার্থাবগতেরিহ ॥ ১০॥

অন্তঃকরণতদ্বৃত্তিসাক্ষিচৈতন্যবিগ্রহঃ ।

আনন্দরূপঃ সত্যঃ সন্কিং নাত্মানং প্রপদ্যসে ॥ ১১॥

সত্যানন্দস্বরূপং ধীসাক্ষিণং বোধবিগ্রহম্ ।

চিন্তয়াত্মতয়া নিত্যং ত্যক্ত্বা দেহাদিগাং ধিয়ম্ ॥ ১২॥

রূপাদিমান্যতঃ পিণ্ডস্ততো নাত্মা ঘটাদিবৎ ।

বিয়দাদিমহাভূতবিকারৎবাচ্চ কুম্ভবৎ ॥ ১৩॥

অনাত্মা যদি পিণ্ডোঽয়মুক্তহেতুবলান্মতঃ ।

করামলকবৎসাক্ষাদাত্মানং প্রতিপাদয় ॥ ১৪॥

গুরু বলিলেন-

তুমি এই বিষয়ে যথার্থ বলিতেছ; কারণ পদার্থজ্ঞান যে বাক্যার্থজ্ঞানের হেতু, এইবিষয়ে কোনরূপ মতভেদ নাই। যিনি অন্তঃকরণ ও অন্তঃকরণবৃত্তির সাক্ষী, যিনি জ্ঞানমূর্ত্তি, যিনি আনন্দস্বরূপ ও সত্য, তুমি সেইরূপ হইয়া কেন আত্মাকে জানিতেছ না? তুমি দেহাশ্রিত বুদ্ধিকে পরিত্যাগ করিয়া যিনি সত্য ও আনন্দস্বরূপ, বুদ্ধিবৃত্তির সাক্ষী, জ্ঞানমূর্ত্তি, তাহাকেই সর্ব্বদা আত্মা ভাবিয়া ধ্যান কর। দেহ আত্মা নহে, কারণ, দেহের রূপরসাদি আছে, যেমন ঘট আত্মা নহে, যেহেতু সে রূপাদিবিশিষ্ট। যেমন ঘট আকাশাদি মহাভূতের বিকার, দেহও সেইরূপ। যদি উক্ত হেতুবশতঃ দেহ অনাত্মা হইল, তাহা হইলে করস্থিত আমলকের ন্যায় প্রত্যক্ষভাবে আত্মাকে প্রতিপাদন কর। 

ঘটদ্রষ্টা ঘটাদ্ভিন্নঃ সর্বথা ন ঘটো যথা ।

দেহদ্রষ্টা তথা দেহো নাহমিত্যবধারয় ॥ ১৫॥

যেরূপ ঘটের দ্রষ্টা সর্বকালে ঘট থেকে ভিন্ন, কিন্তু ঘট নয়; সেরূপ আমি দেহের দ্রষ্টা কিন্তু দেহ নই-এরূপ অবধারণ করো।

এবমিন্দ্রিয়দৃঙ্নাহমিন্দ্রিয়াণীতি নিশ্চিনু ।

মনোবুদ্ধিস্তথা প্রাণো নাহমিত্যবধারয় ॥ ১৬॥ 

এরূপে আমি ইন্দ্রিয় সকল নই, পরন্তু ইন্দ্রিয়ের দ্রষ্টা- এ নিশ্চয় করো; সেরূপ মন, বুদ্ধি, প্রাণও আমি নই- এরূপে অবধারণ করো। ১৬


Friday, 7 August 2020

অদ্বৈতবেদান্তে জীবঃ


ইতোমধ্যে আলোচনা করিয়াছি অদ্বৈতবেদান্তে ব্রহ্মই অজ্ঞানের (-মায়ার) আশ্রয় ও বিষয়। পরমার্থতঃ ব্রহ্মভিন্ন জীব নামক কিছুই নাই। জীব স্বরূপতঃ ব্রহ্মই, বুদ্ধিরূপ উপাধিসম্বন্ধই জীবের জীবত্ব। সেই সম্বন্ধ ব্রহ্মাত্মজ্ঞানোদয় পর্য্যন্ত বর্তমান থাকে। ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্য ব্রহ্মসূত্রের (২.৩.৩০) শারীরকভাষ্যে তাহা স্পষ্ট করিতেছেন-

" বুদ্ধিসংযোগ (বুদ্ধির সহিত চৈতন্যের সম্বন্ধ) যাবদাত্মভাবী অর্থাৎ (ব্রহ্মাত্মজ্ঞানোৎপত্তি দ্বারা জীবাত্মভাবের উপশম না হওয়া পর্য্যন্ত স্থায়ী)। এই আত্মা যতকাল পর্য্যন্ত সংসারী থাকে, অর্থাৎ সম্যগ্ দর্শনের দ্বারা ইহার সংসারিত্ব যতকাল পর্য্যন্ত নিবৃত্ত না হয়, ততকাল পর্য্যন্ত বুদ্ধির সহিত ইহার সংযোগ নিবৃত্ত হয় না। আর যতকাল পর্য্যন্ত বুদ্ধিরূপ উপাধির সহিত এই সম্বন্ধ থাকে, ততকাল পর্য্যন্তই জীবের জীবত্ব ও সংসারিত্ব। পরমার্থতঃ কিন্তু বুদ্ধিরূপ উপাধির সহিত সম্বন্ধের দ্বারা পরিকল্পিত স্বরূপ ব্যতিরেকে জীব নামক কিছুই নাই। যেহেতু উপনিষদৎসকলের অর্থ নিরূপণ করিলে নিত্যমুক্তস্বরূপ সর্ব্বজ্ঞ ঈশ্বর হইতে ভিন্ন দ্বিতীয় চেতন ধাতু(-পদার্থ) উপলব্ধ হয় না;

'নান্যোতোস্তি দ্রষ্টা শ্রোতা মন্তা বিজ্ঞাতা'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৩।৭।২৩)
অর্থাৎ 'ইঁহা হইতে ভিন্ন কোন দ্রষ্টা, শ্রোতা, মননকর্ত্তা ও বিজ্ঞাতা নাই।'

'নান্যদতোস্তি দ্রষ্টৃ শ্রোতৃ মন্তৃ বিজ্ঞাতৃ'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৩।৮।১১)
অর্থাৎ ''ইঁহা হইতে ভিন্ন দ্রষ্টা, শ্রোতা, মনতা ও বিজ্ঞাতা কেহ নাই।'

'তত্ত্বমসি'-(ছান্দোগ্যোপনিষৎ ৬।৮।৭)
অর্থাৎ 'তুমিই তৎস্বরূপ।'

'অহং ব্রহ্মাস্মি' -(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-১।৪।১০)
অর্থাৎ 'আমিই ব্রহ্ম।'

ইত্যাদি শত শত শ্রুতি হইতে ইহা অবগত হওয়া যায়।....."

বুদ্ধির (-অন্তঃকরণের) সহিত ব্যাপক ব্রহ্মচৈতন্যের যে সম্বন্ধবশতঃ তিনি জীব নামে কথিত হন, সেইসম্বন্ধ কি প্রকার, এই বিষয়ে বিভিন্ন অদ্বৈতবাদী আচার্য্যের বিভিন্ন মতবাদ পরিদৃষ্ট হয়। যথা-

পূজ্যপাদ বিবরণাচার্য্য কর্তৃক বর্ণিত প্রতিবিম্ববাদ মতে-'অজ্ঞানে (-অবিদ্যাতে) প্রতিবিম্বিত ব্রহ্মচৈতন্যকে জীব বলা হয়।' পূজ্যপাদ্ আচার্য্য বিদ্যারণ্য স্বামীর আভাসবাদে জীবের স্বরূপ এইপ্রকার-'জলপূর্ণ ঘটে ব্যাপক আকাশের প্রতিবিম্বের ন্যায় অন্তঃকরণে যে সর্ব্বব্যাপী ব্রহ্মচৈতন্যের প্রতিবিম্ব (-চিদাভাস) এবং সেই অন্তঃকরণের অধিষ্ঠানভূত যে কূটস্থ ব্রহ্মচৈতন্য, এই উভয়ের যে আধ্যাসিক মিলিতাবস্থা, ইহাই জীব।' আবার আচার্য্য বাচস্পতি মিশ্র কর্তৃক বর্ণিত অবচ্ছেদবাদে-'আকাশ ব্যাপক পদার্থ হইলেও ব্যবহারিক দৃষ্টিতে ঘট যেমন তাহাকে যেন সসীম করিয়া ফেলে অর্থাৎ ঘটমধ্যগত আকাশ মহাকাশ হইতে যেন ভিন্নই হইয়া পড়ে; তদ্রূপ ব্রহ্মচৈতন্য সর্ব্বব্যাপী হইলেও অন্তঃকরণ যেন তাঁহাকে কতকটা সসীমরূপে বোধ করায়। অন্তঃকরণের দ্বারা সসীমভাব প্রাপ্ত এই যে চৈতন্য, অর্থাৎ অন্তঃকরণাবচ্ছিন্ন চৈতন্য, ইহাই জীব।'

অষ্টাবক্র মুনির মতে-"ভ্রমবশতই আত্মা সংসারী জীবের ন্যায় প্রতিভাত হন। কিন্তু বস্তুতঃ জীব (আত্মা) সংসারী নহেন, কারণ আত্মা স্বভাবতই সাক্ষী, বিভূ, পূর্ণ, এক, মুক্ত, চিদ্রূপ, অক্রিয়, অসঙ্গ, নিঃস্পৃহ শান্তস্বরূপ।"-(অষ্টাবক্র গীতা, আত্মানুভব উপদেশ-১২)

মহাভারতের উদ্যোগপর্বে ভগবান সনৎ-সুজাত বলিতেছেন-"ব্রহ্মে নানাত্ব কল্পনা করিলে বহুদোষ (নানারূপে পরিণামহেতু ব্রহ্মের অনিত্যত্বাদি দোষ) অপরিহার্য হইবে। বস্তুতঃ অনাদি মায়াযোগেই নিত্যজীবসমূহ উৎপন্ন হয়। মায়িকভেদ স্বীকার করিলেও ব্রহ্মের স্বরূপমহিমা কিছু মাত্র ক্ষুণ্ন হয় না। অদ্বিতীয় পরমাত্মার মায়িক বহুরূপত্বে কোন দোষ হয় না। সৃষ্ট জীব-জগৎ সব মায়াময় বলিয়া ব্রহ্ম নির্বিকার সদা অপরিণামীরূপেই বিরাজমান থাকেন। অনাদি মায়াযোগেই বিভিন্ন জীব সৃষ্টি হয় জানিবে।"-(সুনাৎ-সুজাতীয় সংবাদ, প্রথম অধ্যায়-২০)

অদ্বৈতবেদান্তে জীব নিত্য, নিত্যচৈতন্যস্বরূপ এবং স্বরূপত ব্রহ্ম হওয়ায় বিভু হইলেও বদ্ধদশাতে অবিদ্যা ও তদুথ্থ অন্তঃকরণের পরিমাণানুযায়ী মধ্যমপরিমাণ, কর্ত্তা ভোক্তা এবং পরমেশ্বরের কল্পিত অংশরূপে অঙ্গীকৃত হয়। জীবের কর্ত্তৃত্ব ঈশ্বরাধীন।....................................

Monday, 3 August 2020

ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্য প্রতিষ্ঠিত দশনামী সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের নামসমূহের তাৎপর্য্যঃ-




১.'গিরি'-
বাসো গিরিবনে নিত্যং গীতাধ্যয়নতৎপরঃ ।
গংভীরাচলবুদ্ধিশ্চ গিরিনামা স উচ্যতে ॥-(জ্যোতির্মঠাম্নায়- ৬)
অর্থাৎ যিনি পার্ব্বত্য বনে বাস করেন, সর্ব্বদা গীতাপাঠে নিরত, গম্ভীর ও স্থিরবুদ্ধি, তাঁহার নাম 'গিরি'।

২.'পর্ব্বত'-
বসন্ পর্বতমূলেষু প্রৌঢং জ্ঞানং বিভর্তি যঃ ।
সারাসারং বিজানাতি পর্বতঃ পরিকীর্ত্যতে ॥-(জ্যোতির্মঠাম্নায়- ৭)
অর্থাৎ যিনি পর্ব্বতমূলে বাস করিয়া দৃঢ়জ্ঞান ধারণ করেন, যিনি সার (নিত্য) ও অসার (অনিত্য) বিষয় জানেন, তাহাকে 'পর্ব্বত' বলিয়া অভিহিত করা হয়।

৩.'সাগর'-
তৎবসাগরগম্ভীর জ্ঞানরত্নপরিগ্রহঃ ।
মর্যাদাং বৈ ন লঙ্ঘ্যেত সাগরঃ পরিকীর্ত্যতে ॥ -(জ্যোতির্মঠাম্নায়- ৮)
অর্থাৎ যিনি তত্ত্ববিষয়ে সাগরবৎ গম্ভীর, যিনি জ্ঞানরূপ রত্নের ধারণ করেন এবং শাস্ত্রমর্যাদা লঙ্ঘন করেন না, তিনি 'সাগর' বলিয়া কথিত হন।

৪.'সরস্বতী'-
স্বরজ্ঞানরতো নিত্যং স্বরবাদী কবীশ্বরঃ ।
সংসারসাগরাসারহন্তাঽসৌ হি সরস্বতী ॥-(শৃঙ্গেরীমঠাম্নায়- ৬)
অর্থাৎ যিনি সর্ব্বদা বেদের স্বরজ্ঞানে রত, স্বরোচ্চারণে নিপূণ ও কবিশ্রেষ্ঠ এবং অসার সংসার সাগরের হন্তা তাঁহার নাম 'সরস্বতী'।

৫.'ভারতী'-
বিদ্যাভরেণ সম্পূর্ণঃ সর্বভারং পরিত্যজন্ ।
দুঃখভারং ন জানাতি ভারতী পরিকীর্ত্যতে ॥-(শৃঙ্গেরীমঠাম্নায়- ৭)
অর্থাৎ যিনি সকল ভার পরিত্যাগ করিয়া বিদ্যাভারের দ্বারা পরিপূর্ণ, এজন্য দুঃখভারকে জানেন না, তাঁহাকে 'ভারতী' বলা হয়।

৬.'পুরী'-
জ্ঞানতত্ত্বেন সম্পূর্ণঃ পূর্ণতত্ত্বপদে স্থিতঃ ।
পরব্রহ্মরতো নিত্যং পুরীনামা স উচ্যতে ॥-(শৃঙ্গেরীমঠাম্নায়- ৮)
অর্থাৎ যিনি জ্ঞানতত্ত্বের দ্বারা পরিপূর্ণ, যিনি পরিপূর্ণতত্ত্বে অবস্থিত, সর্ব্বদা পরব্রহ্মে নিরত, তাঁহার নাম 'পুরী'।

৭.'তীর্থ'-
ত্রিবেণীসঙ্গমে তীর্থে তত্ত্বমস্যাদিলক্ষণে ।
স্নায়াত্তত্ত্বার্থভাবেন তীর্থনাম্না স উচ্যতে ॥ ৬॥-(শারদামঠাম্নায়- ৬)
অর্থাৎ যিনি তত্ত্বমস্যাদিরূপ ত্রিবেণীসঙ্গমতীর্থে তত্ত্বার্থভাবে স্নান অর্থাৎ তত্ত্বমস্যাদিপ্রতিপাদ্য বস্তু অবগত আছেন, তাঁহাকে 'তীর্থ' বলা হয়।

৮. 'আশ্রম'-
আশ্রমগ্রহণে প্রৌঢ় আশাপাশবিবর্জিতঃ ।
যাতায়াতবিনির্মুক্ত এতদাশ্রমলক্ষণম্ ॥ ৭॥-(শারদামঠাম্নায়- ৭)
অর্থাৎ যিনি সন্ন্যাসাশ্রম গ্রহণে নিপূণ, যিনি আশারূপ বন্ধনশূন্য, ও সংসারের গতাগতি বিরহিত, তাঁহাকে 'আশ্রম' বলা হয়।

৯. 'বন'-
সুরম্যে নির্জনে স্থানে বনে বাসং করোতি যঃ ।
আশাবন্ধবিনর্মুক্তো বননামা স উচ্যতে ॥ (গোবর্দ্ধনমঠাম্নায়- ৫-৬)
অর্থাৎ যিনি অতি রমণীয় নির্জ্জনস্থানরূপ বনে বাস করেন, যিনি সমস্ত আশাবন্ধন হইতে নির্ম্মুক্ত হন, তিনি 'বন' নামে কথিত হইয়া থাকেন।

১০. 'অরণ্য'-
অরণ্যে সংস্থিতো নিত্যমানন্দে নন্দনে বনে ।
ত্যক্ত্বা সর্বমিদং বিশ্বমারণ্যং পরিকীর্ত্যতে ॥- (গোবর্দ্ধনমঠাম্নায়- ৬-৭)
অর্থাৎ যাঁহারা এই সমুদায় বিশ্ব পরিত্যাগ করিয়া সর্ব্বদা আনন্দময় নন্দনবন সদৃশ অরণ্যে বাস করেন, তাঁহাদিগকে 'অরণ্য' বলা হইয়া থাকে।

Saturday, 1 August 2020

বেদান্তের মহাবাক্য ‘অয়মাত্মা ব্রহ্ম’-


শ্রুতিতে চতুর্মহাবাক্যের মধ্যে অথর্ববেদীয়া মহাবাক্য হল ‘অয়মাত্মা ব্রহ্ম’ অর্থাৎ আত্মাই ব্রহ্ম। মাণ্ডুক্য উপনিষদের প্রারম্ভে আগম প্রকরণের আলোচ্য বিষয় হইল ওঙ্কারের সর্ব্বাত্মকতা প্রতিপাদন। যথা-

ইত্যেতদক্ষরমিদঁ সর্বং তস্যোপব্যাখ্যানং

ভূতং ভবদ্ ভবিষ্যদিতি সর্বমোঙ্কার এব

যচ্চান্যত্ ত্রিকালাতীতং তদপ্যোঙ্কার এব .. ১..

শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ-পরমহংস পরিব্রাজক ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের ভাষ্য হইল- ওঙ্কারের তত্ত্বনির্ণয়ই যে আত্মতত্ত্ববোধের উপায়, তাহা জানা যায় কিরূপে?

ওঙ্কারের তত্ত্বনির্ণয়ই যে আত্মতত্ত্ববোধের উপায়, তাহা জানা যায় কিরূপে? হ্যাঁ বলা হইতেছে এই 'ওঙ্কারই শ্রেষ্ঠ আলম্বন (ধ্যেয়)', 'হে সত্যকাম এই যে ওঙ্কার, ইহাই পর ও অপর ব্রহ্ম; সেইজন্য ওঙ্কারবিৎ পুরুষ এই ওঙ্কার আলম্বন দ্বারা (উত্তরায়ণ ও দক্ষিণানায়নের মধ্যে) একটিকে প্রাপ্ত হন।' 'আত্মাকে ইত্যাকারে চিন্তা করিবে।' 'ওঙ্কারই ব্রহ্ম', 'ওঙ্কারই এই সমস্ত' ইত্যাদি শ্রুতি হইতে তাহা জানা যায়। রজ্জু প্রভৃতি সত্য পদার্থ যেমন সর্পাদি-বিতর্কের আশ্রয়, তেমনি যথার্থ সত্য অদ্বিতীয় আত্মাই প্রাণাদি বিভিন্ন কল্পিত ভাবের আশ্রয়। উক্ত দৃষ্টান্তটি যেরূপ ঠিক, সেইরূপই আত্মাতে প্রাণাদি বিকল্পবুদ্ধির বিষয়ীভূত সমস্ত বাক্-প্রপঞ্চ বা শব্দরাশিও ওঙ্কারস্বরূপই, সেই ওঙ্কারও আবার নিশ্চয়ই আত্মস্বরূপ; কেননা ওঙ্কারই আত্মার অভিধায়ক বা প্রতিপাদক। শব্দমাত্রই ওঙ্কার বিকার (অর্থাৎ ওঙ্কার হইতে উৎপন্ন), সেই শব্দের অভিদেয় প্রাণাদি পদার্থমাত্রই আত্ম-বিকল্প (আত্মাতে কল্পিত); সুতরাং সে সকলের শব্দাতিরিক্ত সত্তাই নাই। 'বিকার মাত্রই বাক্যারব্ধ নাম মাত্র।' 'এই ব্রহ্মসম্বন্ধী এই সমস্ত জগৎই বাক্যরূপ দীর্ঘসূত্রময় নামরূপ রজ্জু দ্বারা আবদ্ধ।' এই সমস্তই নামে স্থিত; ইত্যাদি শ্রুতি হইতে প্রমাণিত হয়। এইজন্য বলিতেছেন-

এই যে অভিধেয়রূপ (বাক্যার্থ-স্বরূপ) বিষয়সমূহ, যেহেতু তাহা স্বীয় অভিধান বা বাচক শব্দ হইতে অতিরিক্ত নহে, এবং যেহেতু বাচকশব্দমাত্রই ওঙ্কার হইতে অনতিরিক্ত; অতএব ওঙ্কারই এই দৃশ্যমান সমস্ত পদার্থ। বাচ্য-বাচক সম্বন্ধ হইতেই পরব্রহ্মের প্রতীতি হইয়া থাকে; সুতরাং তাহাও ওঙ্কার স্বরূপই বটে। পর ও অপরব্রহ্ম স্বরূপ সেই এই অক্ষরের উপব্যাখ্যান অর্থাৎ ইহাই ব্রহ্মপ্রতীতির উপায়স্বরূপ; অতএব ব্রহ্মসন্নিহিতরূপে স্পষ্টাক্ষরে প্রকৃষ্টরূপে কথনরূপ (বর্ণনাত্মক) ইহার উপব্যাখ্যান আরব্ধ হইতেছে, বুঝিতে হইবে। পূর্বোক্ত যুক্তি অনুসারে বুঝিতে হইবে ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্ত্তমান, এই কালত্রয়বর্ত্তী যেকোন বস্তু, তাহাও ওঙ্কারস্বরূপই। এতদতিরিক্ত প্রকৃতি প্রভৃতি যে সমস্ত পদার্থ উক্তকালত্রয় দ্বারা পরিচ্ছেদ যোগ্য নহে, অথচ কার্য্য-গম্য-মাত্র (কার্য্য-দর্শনে অনুমেয় মাত্র), তাহাও এই ওঙ্কার হইতে অতিরিক্ত নহে।১

পরবর্তীতে সেই ব্রহ্মের সর্ব্বাত্মকতা, আত্মস্বরূপতা বিষয়ক শ্রুতি মহাবাক্যটীর উল্লেখ রহিয়াছে-

‘সর্বম্ হ্যেতদ্ ব্রহ্ম, অয়মাত্মা ব্রহ্ম,........'।২

শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ-এই সমস্তই ব্রহ্মস্বরূপ, অর্থাৎ যে সমস্তকে ওঙ্করাত্মক বলা হইয়াছে, সেই সমস্তই ব্রহ্মস্বরূপ। সেই ব্রহ্মকে ইতঃপূর্ব্বে পরোক্ষভাবে নির্দ্দেশ করা হইয়াছে, এখন আবার সাক্ষাৎ সম্বন্ধে বিশেষ করিয়া নির্দ্দেশ করিয়া বলিতেছেন যে- "এই আত্মা ব্রহ্মস্বরূপ"। 'অয়ম্ আত্মা' এই বাক্যে 'অয়ং' শব্দ দ্বারা চতুস্পাদবিশিষ্টরূপে যাহার বিভাগ করা হইতেছে, সেই আত্মাকে অভিনয় করিয়া প্রত্যক্ (জীব) আত্মারূপে নির্দ্দেশ করিতেছেন।

বিদ্যারণ্য স্বামী "অয়মাত্মা ব্রহ্ম" অথর্ববেদীয় এই মহাবাক্যের ব্যাখ্যায় বলিতেছেন-" 'অয়ম' এই শব্দের উচ্চারণ দ্বারা আত্মার স্বপ্রকাশতা ও অপরোক্ষতা বুঝানো অভিপ্রেত। অহঙ্কার হইতে আরম্ভ করিয়া দেহ পর্য্যন্ত যে সঙ্ঘাত, তাহার অন্তরে সাক্ষিরূপে যিনি বিদ্যমান, তিনিই এই স্থলে 'আত্মা' শব্দদ্বারা লক্ষিত হইয়াছেন। দৃশ্যমান সমগ্র সৃষ্টির যাহা মূল কারণ তাহাই 'ব্রহ্ম' শব্দ দ্বারা কথিত হইয়াছে। সেই ব্রহ্ম স্বপ্রকাশ আত্মস্বরূপ।"-(পঞ্চদশী, মহাবাক্যবিবেক-প্রকরণ-৭,৮)

 


Friday, 31 July 2020

অনাদি সৃষ্টিতে পূর্ব্ব পূর্ব্ব কর্ম্মই উত্তরোত্তর সৃষ্টিবৈচিত্রের হেতু, ঈশ্বর নহেনঃ-


ইতোমধ্যে আলোচনা করিয়াছি জাগতিক বৈষম্য বা ক্রূরতার জন্য ঈশ্বরের প্রতি দোষারোপ করা অনুচিত,কারণ যে প্রাণিগণ সৃষ্ট হয়, তাহাদের ধর্ম্ম ও অধর্ম্মকে অপেক্ষা করিয়া বিষম সৃষ্টি হইয়া থাকে। এখন পুনরায় সূত্রকার শ্রীমৎমহর্ষি বাদরায়ণ ভগবৎ আপত্তি উপস্থাপন পূর্ব্বক সিদ্ধান্ত করিতেছেন এইভাবে-

ন কর্মাবিভাগাদিতি চেৎ, ন, অনাদিত্বাৎ’।। (ব্রহ্মসূত্র-২/১/৩৫)।।

শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- পরমহংসপরিব্রাজক ভগবৎপূজ্যপাদ্ শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য্য শারীরকমীমাংসা ভাষ্যে বলিতেছেন-

'সদেব সোম্যেদমগ্র আসীদেকমেবাদ্বিতীয়ম্'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ ৬।২।১)
অর্থাৎ হে সোম্য, সৃষ্টির পূর্ব্বে এই জগৎ এক ও অদ্বিতীয় ব্রহ্মরূপে বর্তমান ছিল।"

-এইপ্রকার শ্রুতিবলে সৃষ্টির পূর্ব্বে ব্রহ্ম ও জগতের অবিভাগ নিশ্চিত হয় বলিয়া প্রথম সৃষ্টির পূর্ব্বে কর্ম্ম থাকে না, যাহাকে অপেক্ষা করিয়া পরবর্তী বিষমসৃষ্টি হইবে। সৃষ্টির পরবর্তীকালেই শরীরাদিরূপ বিভাগকে অপেক্ষা করিয়া কর্ম্ম অনুষ্ঠিত হয় এবং কর্ম্মকে অপেক্ষা করিয়া হয় শরীরাদিরূপ বিভাগ, এইপ্রকার ইতরেতরাশ্রয়দোষ হইয়া পড়ে। সেইহেতু বিভাগের পরবর্ত্তিকালে কর্ম্মকে অপেক্ষা করিয়া ঈশ্বর যদি প্রবৃত্ত হন, তাহা হউন; কিন্তু শরীরাদিরূপে বিভাগের পূর্ব্বে সৃষ্টির বিচিত্রতার হেতুভূত কর্ম্মের অভাববশতঃ প্রথম সৃষ্টিতুল্য উচ্চাবচ দেবতির্য্যগাদি ভেদবিহীন হইয়া পড়িতেছে, এইপ্রকার যদি আপত্তি করা হয় তদুত্তরে সিদ্ধান্ত হইল-

ইহা দোষ নহে, যেহেতু জগৎ সংসার অনাদি। এই দোষ হইতে পাড়িত যদি সংসার সাদি হইত। কিন্তু অনাদি সংসারে বীজ ও অঙ্কুরের ন্যায় হেতু ও হেতুমদ্ভাবে অর্থাৎ কারণ ও কার্য্যভাবে কর্ম্মের ও সৃষ্টিবৈষম্যের যে প্রবৃত্তি, তাহার বিরোধ হয় না।

আচ্ছা, কি প্রকারে অবগত হওয়া যায় যে, এই জগৎ সংসার অনাদি? এই হেতু ভগবান্ সূত্রকার পূনরায় বলিতেছেন-

‘উপপদ্যতে চাপ্যুপলভ্যতে চ’।। (ব্রহ্মসূত্র-২/১/৩৬)।।

শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- আচার্য্য শঙ্কর ভগবতের ভাষ্য হইল-জগৎ সংসারের অনাদিত্ব যুক্তিসঙ্গত। যেহেতু সংসার সাদি হইলে অকস্মাৎ অর্থাৎ বিনাকারণে তাহার উৎপত্তি হওয়ায় (তৎপরর্বর্তী সৃষ্টিও বিনা কারণে সম্ভব হইতে পারে বলিয়া পূর্ব্বসৃষ্টিতে) মুক্তপুরুষগণের (সংসারের হেতুভূত অবিদ্যাদি না থাকিলেও) পুনরায় সংসারে উদ্ভূতি অর্থাৎ জন্ম হইয়া পড়িবে। (তাহাতে বেদের জ্ঞানকাণ্ড মোক্ষশাস্ত্র ব্যর্থ হইয়া পড়ে)।

আবার অকৃতাভ্যাগমও (অর্থাৎ যে ব্যক্তি যে কর্ম্মের অনুষ্ঠান করে নাই, তৎকর্তৃক সেই কর্ম্মের ফলভোগও) হইয়া পড়িবে, যেহেতু সুখ ও দুঃখ প্রভৃতির যে বৈষম্য, তাহার কোন হেতু নাই।(তাহাতে শুভকর্ম্মের বিধায়ক এবং অশুভকর্ম্মের নিবর্ত্তক যে বিধিনিষেধ শাস্ত্র অর্থাৎ বেদের কর্ম্মকাণ্ড ব্যর্থ হইয়া পড়ে।)

আর ঈশ্বর যে বৈষম্যের হেতু নহেন তাহা পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। কেবল অর্থাৎ অন্য সহায়বিহীন মূলা অবিদ্যাও বৈষম্যের কারণ নহে, যেহেতু তাহা একরূপ। কিন্তু রাগাদি ক্লেশবাসনার দ্বারা আক্ষিপ্ত অর্থাৎ প্রবর্ত্তিত কর্ম্মকে অপেক্ষা করিয়াই অবিদ্যা হয় বৈষম্যকারী। কিন্তু কর্ম্ম ব্যতিরেকে শরীর সম্ভব নহে এবং শরীর ব্যতিরেকে কর্ম্ম সম্ভব নহে, এই প্রকারে ইতরেতরাশ্রয় দোষ হইয়া পড়ে। অনাদি হইলেই কিন্তু বীজাঙ্কুরের ন্যায় কার্য্যকারণ ভাব উপপন্ন হওয়ায় কোন দোষ হয় না।(অগ্রে বীজ উৎপন্ন হয়, পরে তাহা হইতে অঙ্কুর উৎপন্ন হয়, অথবা অগ্রে অঙ্কুর উৎপন্ন হয়, পরে তাহা হইতে বীজ উৎপন্ন হয়; ইহা নিরূপণ করা যায় না বলিয়া এই বীজাঙ্কুর প্রবাহকে অনাদিরূপে অঙ্গীকার করা হয়।)

আর শ্রুতি এবং স্মৃতি উভয়েই এই জগৎ সংসারের অনাদিত্ব উপলব্ধ হয়। শ্রুতি এইপ্রকার আছে-'অনেন জীবেনাত্মনা'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ ৬।৩।২) অর্থাৎ "এই জীবাত্মারূপে", এইরূপ সৃষ্টির নব কল্পারম্ভের প্রারম্ভে শরীরসম্বন্ধী আত্মাকে প্রাণধারণের নিমিত্তক জীবশব্দের দ্বারা অভিহিত করিয়া সংসার যে অনাদি, ইহা শ্রুতি প্রদর্শন করিতেছেন। কিন্তু সংসার সাদি হইলে পূর্ব্বে প্রাণধারণ না করিয়া প্রাণধারণরূপ নিমিত্তবশতঃ যে জীবশব্দের প্রয়োগ হয়, তাহার দ্বারা সৃষ্টির প্রারম্ভে পরমাত্মা কি প্রকারে অভিহিত হইবেন? আর প্রাণকে ধারণ করিবেন, এই হেতু পরমাত্মা জীব শব্দে অভিহিত হইবেন, ইহা বলা যায় না, যেহেতু অনাগত সম্বন্ধ অপেক্ষা অতীত সম্বন্ধ বলবান, কারণ তাহা সম্পাদিত হইয়া গিয়াছে। আর শাস্ত্রেও জগৎ যে সৃষ্টির পূর্ব-কল্পেও বর্তমান ছিলো তা এ-জাতীয় শ্রুতিতেই আছে-

‘সূর্যাচন্দ্রমসৌ ধাতা যথাপূর্বমকল্পয়ৎ।
দিবং চ পৃথিবীং চান্তরিক্ষমথো স্বঃ’।। (ঋগ্বেদ-১০/১৯০/৩)।।
অর্থাৎ বিধাতা পূর্ববৎ-ই অর্থাৎ পূর্ব্বকল্পানুযায়ী সূর্য ও চন্দ্রকে সংস্থাপিত করিলেন এবং স্বর্গ, পৃথিবী ও আকাশ সৃষ্টি করিলেন।

স্মৃতিতেও সংসারের অনাদিত্ব উপলব্ধ হইতেছে- 'ন রূপমস্যেহ তথোপলভ্যতে নান্তো ন চাদির্ন চ সংপ্রতিষ্ঠা'-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১৫।৩)

'ইহলোকে এই সংসাররূপ অশ্বত্থের উক্তপ্রকার রূপ উপলব্ধ হয় না, কারণ স্বপ্ন-মরীচিকার ন্যায় ইহা দৃষ্ট-নষ্ট-স্বরূপ । এই সংসারের আরম্ভ নাই, কারণ ইহা অনাদি।'

আর পুরাণে অতীত ও ভবিষ্যৎ কল্পসকলের পরিমাণ নাই, ইহা স্থাপিত হইয়াছে। অতএব অনাদি ক্লেশকর্ম্মাদিই জগৎ বৈষম্যের হেতু হওয়ায় পরমেশ্বরে পক্ষপাতিতা ও নির্দ্দয়তাদোষ প্রসক্ত হয় না বলিয়া নিরবদ্য, নিরঞ্জন ব্রহ্মই জগৎকারণ, ইহা সিদ্ধ হইল

Thursday, 30 July 2020

বেদান্তে মহাবাক্য ‘প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম’-


চতুর্বেদের চতুর্মহাবাক্যের মধ্যে ‘প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম’ একটী। ঋগ্বেদীয় ঐতরেয় উপনিষদের তৃতীয় অধ্যায়ের প্রথম খণ্ডের তৃতীয় শ্রুতিতে এই মহাবাক্যের উল্লেখ রহিয়াছে।
‘এষঃ ব্রহ্ম, এষঃ ইন্দ্রঃ, এষঃ প্রজাপতিঃ, এতে সর্বে দেবাঃ, ইমানি চ পঞ্চ মহাভূতানি-পৃথিবী বায়ুরাকাশ আপো জ্যোতীংষীত্যেতানি, ইমানি চ ক্ষুদ্রমিশ্রাণীব বীজানি, ইতরাণি, চেতরাণি চ-অণ্ডজানি চ জারুজানি চ স্বেদজানি চোদ্ভিজ্জানি চ-অশ্বা গাবঃ পুরুষা হস্তিনঃ, যৎকিঞ্চেদং প্রাণি জঙ্গমং চ পতত্রি চ যচ্চ স্থাবরম;- সর্বং তৎ প্রজ্ঞানেত্রং প্রজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিতং, প্রজ্ঞানেত্রো লোকঃ, প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠা, প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম।’- (ঐতরেয় উপনিষদ-৩।১।৩)
শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ-ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের ভাষ্য হইল-সেই এই প্রজ্ঞানস্বরূপ আত্মাই অপরব্রহ্ম (উপাধিযুক্ত ব্রহ্ম) ; ইহাই সর্ব্বশরীরস্থিত প্রাণ ও প্রজ্ঞাত্মা এবং বিভিন্ন জলপাত্রে পতিত জল সূর্য্যপ্রতিবিম্বের ন্যায় ইহাও অন্তঃকরণরূপ উপাধিমধ্যে প্রবেশ করিয়া হিরণ্যগর্ভ প্রাণ ও প্রজ্ঞাত্মা। ইন্দ্র শব্দের প্রকৃতি প্রত্যয় অনুসারে হিরণ্যগর্ভ কিংবা সাক্ষাৎ দেবরাজ অর্থও গ্রহণ করা যাইতে পারে। ইনিই প্রজাপতি, যিনি প্রথমোৎপন্ন শরীরধারী পুরুষ; যাঁহার মুখছিদ্র ইত্যাদি প্রকাশের ফলে লোকপাল ইন্দ্র, অগ্নি প্রভৃতি উৎপন্ন হইয়াছেন, সেই প্রজাপতিও ইনিই। এবং এই যে, অগ্নি প্রভৃতি দেবতাগণ, তাঁহারাও ইনিই অর্থাৎ ব্রহ্মস্বরূপই বটে। আর এই যে সমস্ত শরীরের উপাদানরূপে এবং অন্ন ও অন্নভোজনকারী রূপে পরিণত পৃথিবী(মাটি), বায়ু, আকাশ, জল ও তেজঃ প্রভৃতি পঞ্চমহাভূত, ইহারা, এবং মশক প্রভৃতি ক্ষুদ্র প্রাণীদের সহিত সর্প প্রভৃতি।
বীজ অর্থাৎ কারণ- কার্য্যোৎপাদক, অবীজ অর্থাৎ কার্য্যের অনুৎপাদক, এইদুইভাগে বিভক্ত যে সমুদয় প্রাণী (ইতরাণি, চেতরাণি চ বলিয়া যাহাদের নির্দ্দেশ করা হইয়াছে) তাহারা কাহারা? বলা হইতেছে অণ্ডজ-পক্ষি প্রভৃতি, জারুজ-জরায়ুজ মনুষ্য প্রভৃতি, স্বেদজ-উকুন প্রভৃতি, উদ্ভিজ্জ-বৃক্ষলতা প্রভৃতি। অশ্ব, গো, পুরুষ ও হস্তি প্রভৃতি, আরও যে কিছু প্রাণী। তাহা কি কি? জঙ্গম-যাহারা পায়ের দ্বারা গমন করিয়া থাকে; আর পতত্রি, যাহারা আকাশপথে উড়িয়া থাকে; যাহা স্থাবর অর্থাৎ চলিতে পারে না; সে সমুদয়ই প্রজ্ঞানেত্র। প্রজ্ঞা অর্থ প্রকৃষ্ট জ্ঞান, তাহা নিশ্চিতই ব্রহ্মস্বরূপ; নেত্র অর্থাৎ যাহা দ্বারা নীত হয় (সত্তালাভ হয়)। সেই প্রজ্ঞা যাহার নেত্র, তাহার নাম প্রজ্ঞানেত্র; উৎপত্তি, স্থিতি ও লয় এই তিন সময়েই যাহা প্রজ্ঞাস্বরূপ ব্রহ্মে অবস্থিত অর্থাৎ প্রজ্ঞাতে আশ্রিত; এইজন্য উহারা প্রজ্ঞানেত্র। লোক অর্থাৎ ভূঃ প্রভৃতি লোকও প্রজ্ঞানেত্র; অথবা প্রজ্ঞাই সমস্ত জগতের প্রতিষ্ঠা বা স্থিতির মূল; সেই কারণে উহারা প্রজ্ঞান ব্রহ্মস্বরূপ।
সেই যে, এই সকল উপাধিশূন্য নিত্য, নিরঞ্জন, নির্ম্মল ও নিষ্ক্রিয়; অতএব শান্ত এক অদ্বিতীয়; 'নেতি নেতি' প্রণালীক্রমে সমস্ত বিশেষণ-পরিত্যক্তরূপে বিজ্ঞেয় এবং শব্দজাত সর্ব্বপ্রকার জ্ঞানের অগোচর ব্রহ্ম, তাহাই আবার অত্যন্ত বিশুদ্ধবুদ্ধিসত্ত্বরূপ উপাধিসম্পর্কবশতঃ সর্ব্বজ্ঞ ঈশ্বরভাবে সর্ব্বজীবভোগ্য সমস্ত অব্যক্ত (অপ্রকাশিত) জগতের প্রবর্ত্তক বা আবির্ভাবের কারণ এং সর্ব্ববস্তুর নিয়ন্ত্রণকারীরূপে অন্তর্যামী বলিয়া কথিত হন। তিনিই আবার যখন ব্যক্ত (প্রকাশিত) জগতের বীজস্বরূপ বুদ্ধি ও আত্মারূপ উপাধিগ্রহণ করেন, তখন হিরণ্যগর্ভ নাম লাভ করেন। তিনিই আবার ব্রহ্মাণ্ডমধ্যে প্রথম উৎপন্ন শরীররূপ বৈশিষ্ট্য লাভ করিয়া বিরাট ও প্রজাপতি নাম লাভ করিয়া থাকেন। তিনিই আবার প্রকাশিত অগ্নি প্রভৃতি উপাধিবিশেষযোগে দেবতা নামে কথিত হইয়া থাকেন। এইরূপ ব্রহ্ম হইতে আরম্ভ করিয়া তৃণ পর্য্যন্ত বিশেষ বিশেষ শরীরসম্বন্ধবশতঃ সেই ব্রহ্মেরই বিশেষ বিশেষ নাম লাভ হইয়া থাকে। নানাপ্রকার উপাধিভেদে ভিন্নপ্রকার সেই ব্রহ্মকেই সমস্তপ্রাণী ও তার্কিকগণ বিভিন্ন প্রকারে জানিয়া থাকেন এবং নানা প্রকারে তাহার কল্পনা করিয়া থাকেন। মনুস্মৃতি বলিয়াছেন-
'একশ্রেণীর লোকেরা ইঁহাকে অগ্নি বলিয়া নির্দেশ করেন; অপরে প্রজাপতি মনু বলিয়া নির্দ্দেশ করেন; অপরে প্রজাপতি মনু বলিয়া বর্ণনা করেন, কেহ কেহ ইন্দ্র বলেন, কেহ বা প্রাণ বলেন; কেহ আবার শাশ্বত ব্রহ্ম বলিয়াও জানেন' ইত্যাদি।........

স্বামী বিদ্যারণ্য মুনি (মাধবাচার্য) পঞ্চদশীতে বলিতেছেন-"চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়সকল দিয়া নির্গত যে অন্তঃকরণবৃত্তি-উপহিত চৈতন্যের দ্বারা পুরুষ রূপসকল দর্শন করে, শব্দসকল শ্রবণ করে, গন্ধসমূহের আঘ্রাণ লয়, বাক্য-সকল উচ্চারণ করে, সুস্বাদু ও অস্বাদু রস আস্বাদন করে, তাহা 'প্রজ্ঞান' বলিয়া কথিত হয়। ব্রহ্মা-ইন্দ্র প্রভৃতি উত্তম জীবে, মনুষ্যাদি মধ্যম জীবে এবং অশ্ব-গবাদি অধম জীবে-সর্বত্র যে একমাত্র চৈতন্যরূপে বিরাজিত, তাহাই ব্রহ্ম। সুতরাং আমাতে অবস্থিত প্রজ্ঞানও ব্রহ্ম।"

-(পঞ্চদশী, মহাবাক্যবিবেক-প্রকরণ-১,২)


তত্ত্বজ্ঞানীর দেহে থাকাঃ-


আচার্য্য শঙ্কর ভগবদ্গীতার (৫।১৩) ভাষ্যে বলিতেছেন-'দেহ ও ইন্দ্রিয়াদি সংঘাত হইতে আত্মা ভিন্ন' এইরূপ বিবেকীর 'আমি শরীরে থাকি' এইরূপ প্রত্যয় হইতে পারে। পরাত্মাতে অবিদ্যা দ্বারা অধ্যারোপিত অপরের অর্থাৎ দেহেন্দ্রিয়াদি জাত কর্ম্মসকলের, বিবেকজ্ঞানরূপ বিদ্যাবিশিষ্ট মনের দ্বারা তত্ত্বজ্ঞানীর সংন্যাস উৎপন্ন হয়। উৎপন্ন-বিবেকজ্ঞান সর্ব্বকর্ম্ম সংন্যাসীরও দেহেই বিশেষ বিজ্ঞান হওয়ায়, গৃহের মত নবদ্বার যুক্ত দেহপুরে তাঁহার থাকা কেবল প্রারব্ধ কর্ম্মের অবশিষ্ট সংস্কার সকলের ফলভোগের অনুবৃত্তিহেতু।
শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এই তত্ত্বটিকে অপূর্ব্ব দৃষ্টান্ত দ্বারা উপস্থাপন করিতেছেন-'নারকেলের ফোঁপল শুকিয়ে গেলে যেমন খোল থেকে আলাদা হয়ে যায়, তেমনিভাবে তত্ত্বজ্ঞানী দেহে অবস্থান করেন। তবে একটা না একটা জায়গায় একটু লেগে থাকে-এরই নাম প্রারব্ধ।'

সেই পরমাত্মাই জীবভাব প্রাপ্ত হইয়া নবদ্বার-যুক্ত দেহপুরে অবস্থান করে। এই বিষয়ে কৃষ্ণযজুর্ব্বেদীয় শ্বেতাশ্বতরোপনিষদ্ এ বর্ণিত আছে-
নবদ্বারে পুরে দেহী হংসো লেলায়তে বহিঃ৷

বশী সর্বস্য লোকস্য স্থাবরস্য চরস্য চ৷৷-(শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎ -৩।১৮)

শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- নবদ্বারযুক্ত পুরে অর্থাৎ মস্তকস্থ দুই চক্ষু, দুই কর্ণ, দুই নাসিকা এবং মুখ এই সাতটি আত্মার রূপ, শব্দ, গন্ধ এবং রস উপলব্ধির দ্বার, বাকি দুইটী নিম্নাঙ্গে মুত্র ও পুরীষ ত্যাগের জন্য উপস্থ এবং পায়ু; সর্ব্বসমেত এই নয়টী দ্বারযুক্ত শরীরে দেহী তথা বিজ্ঞানাত্মা অর্থাৎ ভূত ও ইন্দ্রিয়রূপ উপাধিযুক্ত হইয়া হংস অর্থাৎ পরমাত্মা বহির্বিষয় গ্রহণার্থ সচেষ্ট হন। এখানে অবিদ্যাজনিত কার্যকে হনন করিবার জন্য তিনি হংস। তথা স্থাবরজঙ্গম সমস্ত লোকের নিয়ন্তা তিনিই। এভাবেই এই শ্রুতিতে ব্রহ্মের সর্বাত্মকভাব প্রতিপাদন করা হইয়াছে।

জ্ঞানী ভোগ্যবিষয়ে মনের কঠিনতা আর ভগবদ্বিষয়ে মনের কোমলতা সম্পাদন করে—

  আচার্য মধুসূদন সরস্বতী ভক্তিরসায়নে বলছেন — কাঠিন্যং বিষয়ে কুর্যাদ্ দ্রবত্বং ভগবৎপদে। উপায়ৈঃ শাস্ত্রনির্দিষ্টৈরনুক্ষণমতো ব...