Thursday, 24 October 2019

প্রমাদরূপী মৃত্যুনাশের উপায়ঃ-


পরমপ্রাচীন সনাতন ঋষি সনৎ-সুজাত বলিতেছেন-
এবং মৃত্যুং জায়মানং বিদিত্বা জ্ঞানেন তিষ্ঠন্ন বিভেতি মৃত্যোঃ। বিনশ্যতে বিষয়ে তস্য মৃত্যুঃ মৃত্যোর্ষথা বিষয়ং প্রাপ্য মর্ত্যঃ।।-(শ্রীমহাভারত, উদ্যোগপর্ব, দ্বি-চত্বারিংশোহধ্যায়, সনৎ-সুজাতীয় সম্বাদ-১৬)
ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- এইরূপে কামক্রোধাদি হইতে উৎপন্ন প্রমাদাখ্য মৃত্যুই সর্বানর্থের বীজ, ইহা জানিয়া ঐ কামক্রোধাদি পরিহারপূর্বক অক্রোধাদি গুণসম্পাদন সহায়ে অদ্বিতীয় ব্রহ্মত্মস্বরূপে স্থিতিলাভবশতঃ জ্ঞানী আর মৃত্যু হইতে ভয় পান না। পরমাত্মসাক্ষাৎকারবশতঃ সেই জ্ঞানীর প্রমাদরূপী মৃত্যু বিনাশ প্রাপ্ত হয়। মরণশীল জীব যে প্রকারে মৃত্যুর বিষয়সংসার অর্থাৎ কামাদি দ্বারা কবলিত হইয়া বিনষ্ট হয় জ্ঞানীরও সেইরূপ প্রমাদরূপী মৃত্যুর বিনাশ ঘটিয়া থাকে। অর্থাৎ আত্মসাক্ষাৎকার হইলে শরীরাধ্যাস বা অজ্ঞানরূপ মৃত্যু স্বতই বিনষ্ট হইয়া থাকে- ইহাই ভাবার্থ।

বলহীন ব্যক্তির কখনো আত্মজ্ঞান লাভ হয় নাঃ-


অথর্ববেদের শৌনকীয় শাখার অন্তর্গত মুণ্ডক উপনিষদে বর্ণিত আছে-
নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্যো ন চ প্রমাদাত্তপসো বাপ্যলিঙ্গাৎ ৷ এতৈরুপায়ৈর্যততে যস্তু বিদ্বাংস্তস্যৈষ আত্মা বিশতে ব্রহ্মধাম ৷৷ মুণ্ডক উপনিষদ্- ৩.২.৪ ৷৷

ভগবৎপূজ্যপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- এই আত্মা বলহীন কর্তৃক অর্থাৎ আত্মাতে নিষ্ঠাজনিত বীর্যহীন তথা সামর্থ্যহীন কর্তৃক লভ্য হন না, লৌকিক পুত্র, পশু, প্রভৃতি বিষয়ে আসক্তিজনিত যে প্রমাদ সেই প্রমাদবশতও লভ্য হন না, সেইরূপ লিঙ্গরহিত তপস্যা হইতেও লভ্য হন না। এখানে তপঃ অর্থ জ্ঞান এবং লিঙ্গ অর্থ কর্ম্মসন্ন্যাস। অর্থাৎ সন্ন্যাসরহিত জ্ঞান হইতেও লভ্য হন না। কিন্তু যে বিদ্বান্ বিবেকী আত্মবিৎ এইসকল উপায় অবলম্বনে অর্থাৎ ঐ বল, অপ্রমাদ, সন্ন্যাস ও জ্ঞান সহায়ে তদ্গত হইয়া প্রযত্ন করেন সেই বিদ্বানের সূক্ষ্মশরীর ব্রহ্মধামে অর্থাৎ সত্যব্রহ্মেতে সম্যগ্ রূপে প্রবিষ্ট হয়।

Saturday, 12 October 2019

ব্রহ্মের অভেদতাতেই শাস্ত্রের তাৎপর্য্যঃ-


বিভিন্ন উপাধিতে ব্রহ্মের অভিন্নতাই শাস্ত্র তাৎপর্য্য, ঔপাধিক রূপভেদ উপাসনার জন্য। শ্রীমন্মহর্ষি বাদরায়ণ ভগবৎ প্রণীতম্ উত্তর মীমাংসা বেদান্তদর্শনে বর্ণিত আছে-

'ন ভেদাদিতি চেন্ন প্রত্যেকমতদ্বচনাৎ৷৷'-ব্রহ্মসূত্র ৩.২.১২৷৷

ভগবৎপাদ্ শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য্যের 'শাঙ্করভাষ্য' অনুসারে ভাবার্থঃ-

যেহেতু প্রত্যেক বিদ্যাতে ব্রহ্মের বিভিন্ন আকারসকল উপদিষ্ট হইতেছে, যথাঃ- 'চারিটী চরণযুক্ত ব্রহ্ম'-(ছান্দোগ্য উপনিষদ্-৩।১৮।২), 'ষোলটী কলাযুক্ত ব্রহ্ম'-(ছান্দোগ্য উপনিষদ্-৪।৫।২), 'বামনী প্রভৃতি লক্ষণযুক্ত ব্রহ্ম'-(ছান্দোগ্য উপনিষদ্-৪।১৫।৩), 'বৈশ্বানরশব্দের দ্বারা বর্ণিত ত্রৈলোক্যশরীর ব্রহ্ম'-(ছান্দোগ্য উপনিষদ্-৫।১৮।২) ইত্যাদি এই জাতীয় শ্রুতি রহিয়াছে সেইহতু ব্রহ্মের সবিশেষতাও অঙ্গীকার করিতে হবে। কিন্তু শঙ্কা হইল কথিত হইয়াছে ব্রহ্মের সবিশেষ ও নির্বিশেষ উভয়াত্মকতা সম্ভব নহে, ইত্যাদি। এই পূর্বসমাধানও বিরুদ্ধ নহে, যেহেতু ব্রহ্মের আকারভেদ উপাধিকৃত। অন্যথা উপাধিকৃত রূপভেদ স্বীকার না করিলে ব্রহ্মের ভেদবোধক অর্থাৎ বিভিন্নতাবোধক শাস্ত্র নির্বিষয় হইয়া পড়িবে, এইপ্রকার যদি বলা হয় তাহলে সিদ্ধান্ত এই যে-

তাহা নহে, ইহাই আমরা বলিতেছি। কোন হেতুবলে বলিতেছি? উত্তর হইল- যেহেতু প্রত্যেক স্থলে তদ্বচনের অর্থাৎ ভেদকথনের অভাব আছে। যেহেতু শাস্ত্র প্রত্যেকটী উপাধিভেদে ব্রহ্মের অভেদতাই অর্থাৎ অভিন্নতাই শ্রবণ করাইতেছেন, যথা-

‘যশ্চাযমস্যাং পৃথিব্যাং তেজোময়োমৃতময়ঃ পুরুষো যশ্চাযমধ্যাত্মং শারীরস্তেজোমযোমৃতময়ঃ পুরুষোযমেব স যোয়মাত্মা'-(বৃহদারণ্যক উপনিষদ্-২।৫।১)

'এই পৃথিবীতে যিনি এই তেজোময় অমৃতময় পুরুষ এবং যিনি শরীরসম্বন্ধী ও শরীরে অবস্থিত তেজোময় অমৃতময় পুরুষ, ইনিই তিনি, যিনি এই আত্মা' ইত্যাদি।

আর এইহেতু বিভিন্ন আকারের সহিত ব্রহ্মের সত্য সম্বন্ধ শাস্ত্রীয়, ইহা বলিতে পারা যায় না, যেহেতু ঔপাধিক ভেদ অর্থাৎ বিভিন্নতা উপাসনার জন্য, এবং যেহেতু ব্রহ্মের অভেদতাতেই শাস্ত্রের তাৎপর্য্য।

 

Friday, 27 September 2019

মহামোহ কি?


শ্রীমহাভারতের উদ্যোগপর্বের দ্বি-চত্বারিংশোহধ্যায়ের সনৎ-সুজাতীয় সম্বাদে ব্রহ্মার মানসপুত্র চিরকুমার পরমপ্রাচীন সনাতন ঋষি সনৎ-সুজাত ধৃতরাষ্ট্রের বিবিধ প্রশ্নোত্তরে বলিতেছেন-

তদ্বৈ মহামোহনমিন্দ্রিয়াণাং মিথ্যার্থযোগেহস্য গতিহির্নিত্যা।

মিথ্যার্থযোগাভিহতান্তরাত্মা স্মরন্নুপাস্তে বিষয়ান্ সমস্তাৎ।।১০।।

ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- ভোগ্য বিষয়ে ইন্দ্রিয়সমূহের যে প্রবৃত্তি তাহাই মহামোহ। বিষয়ে সত্যত্ববুদ্ধি থাকিলেই উহা লাভের প্রবৃত্তি হয়। বিষয়ে প্রবৃত্তি না হইয়া আত্মাতেই যাহার প্রবৃত্তি তাহারই মোহ নিবৃত্তি হইয়া থাকে। মিথ্যাবিষয়ানুরাগী পুরুষের নিয়ত সংসারগতিই হইয়া থাকে। কারণ ঐ বিষয়ানুরক্তি জীবকে স্বীয় ব্রহ্মভাব হইতে বিচ্যুত করিয়া থাকে এবং জীব তখন সর্বতোভাবে বিষয়সমূহ স্মরণ করিতে করিতে বিষয়-চিন্তাতেই সদা মগ্ন হয়।

Thursday, 19 September 2019

শঙ্করাচার্য্যের কিছু অমৃত বাণী, পর্ব-০৭ঃ-


৩৬.'আত্মপ্রশংসার অভাব, দম্ভের অভাব ইত্যাদি ভগবদ্গীতোক্ত গুণসমূহ; শৌচাদি নিয়মসমূহ; অহিংসাদি যম প্রভৃতি; শ্রদ্ধা, ভক্তি, মুমুক্ষুতা, ভগবদ্গীতোক্ত অভয়, সত্ত্বসংশুদ্ধি প্রভৃতি বিভিন্ন দৈবী সম্পদ, অসদাচারণ ত্যাগ প্রভৃতি গুণ মিশ্র সত্ত্বগুণ হইতে উৎপন্ন হয়।'
-শঙ্করাচার্য্য (বিবেকচূড়ামণি-১১৮)
৩৭. 'চিত্তের প্রসন্নতা, স্ব-আত্ম অনুভূতি, পরম প্রশান্তি, তৃপ্তি, উত্তম আহ্লাদ এবং পরমাত্মনিষ্ঠা-এইসকল শুদ্ধ সত্ত্বগুণের কাজ। যার ফলে সদানন্দরস প্রাপ্তি হয়'
-শঙ্করাচার্য্য (বিবেকচূড়ামণি-১১৯)
৩৮.'অজ্ঞান, আলস্য, জড়ত্ব, নিদ্রা, প্রমাদ, নির্বুদ্ধিতা প্রভৃতি তমোগুণের কাজ। এইসবের দ্বারা সংসৃষ্ট পুরুষ কিছুই জানে না, কিন্তু নিদ্রিত ব্যক্তি বা স্তম্ভের মত জড়বৎ অবস্থান করে।'
-শঙ্করাচার্য্য (বিবেকচূড়ামণি-১১৬)
৩৯.'কাম, ক্রোধ, লোভ, দম্ভ, দর্পপ্রভৃতি, অসূয়া, ঈর্ষা, মাৎসর্য প্রভৃতি ঘোরবৃত্তিসমূহ রজোগুণ হইতে উৎপন্ন হয়। তাই রজোগুণ বন্ধনের কারণ।'
-শঙ্করাচার্য্য (বিবেকচূড়ামণি-১১২)

'শ্রীশিবমানসপূজা'


শঙ্করাচার্য্য বিরচিত 'শ্রীশিবমানসপূজা' ও ইহার ভাবার্থঃ-
রত্নৈঃ কল্পিতমাসনং হিমজলৈঃ স্নানং চ দিব্যাম্বরং
নানারত্নবিভূষিতং মৃগমদামোদাঙ্কিতং চন্দনম্ ।
জাতীচম্পকবিল্বপত্ররচিতং পুষ্পং চ ধূপং তথা
দীপং দেব দয়ানিধে পশুপতে হৃত্কল্পিতং গৃহ্যতাম্ ॥ ১॥

বহুবিধ রত্ন রচিত সুন্দর আসন, শীতল স্নানীয় জল, মনোহর বস্ত্ৰ, নানাবিধ রত্নময় আভরণ, মৃগমদসৌরভযুক্ত চন্দন, জাতী, চম্পক বিল্বপত্র যুক্ত নানাবিধ পুষ্প, ধূপ ও দীপ আমি মনে মনে আয়োজন করিয়াছি হে দয়ানিধি! হে দেব! হে পশুপতে, তুমি গ্ৰহণ কর।১
সৌবর্ণে নবরত্নখণ্ডরচিতে পাত্রে ঘৃতং পায়সং
ভক্ষ্যং পঞ্চবিধং পয়োদধিয়ুতং রম্ভাফলং পানকম্ ।
শাকানাময়ুতং জলং রুচিকরং কর্পূরখণ্ডোজ্জ্বলং
তাম্বূলং মনসা ময়া বিরচিতং ভক্ত্যা প্রভো স্বীকুরু ॥ ২॥

মণি খণ্ড ও রত্ন দ্বারা খচিত সুবৰ্ণময় পাত্রে আমি ভক্তি পুৰ্ব্বক ঘৃত, পায়স, পঞ্চবিধ খাদ্য, দধি, দুগ্ধ, রম্ভা ও পনস (কঁটাল) ফল, বহুবিধ শাক, সুস্বাদু কর্পূরসুবাসিত জল ও তাম্বূল মনে মনে সংগ্ৰহ করিয়াছি ও রচনা করিয়াছি প্রভো, তুমি গ্ৰহণ কর।২
ছত্রং চামরয়োর্যুগং ব্যজনকং চাদর্শকং নির্মলং
বীণাভেরিমৃদঙ্গকাহলকলা গীতং চ নৃত্যং তথা ।
সাষ্টাঙ্গং প্রণতিঃ স্তুতির্বহুবিধা হ্যেতত্সমস্তং ময়া
সঙ্কল্পেন সমর্পিতং তব বিভো পূজাং গৃহাণ প্রভো ॥ ৩॥

ছত্ৰ, চামর যুগল, ব্যজন, নিৰ্ম্মল দৰ্পণ, বীণা, ভেরী, মৃদঙ্গ কাহল প্ৰভৃতি বাদ্য, কলাসংযুক্ত গীত এবং নৃত্য, সাষ্টাঙ্গ প্ৰণাম, বহুবিধ স্তব, এই সমস্তই প্ৰভো আমি মানস কল্পনায় তোমাকে সমৰ্পণ করিলাম। হে বিভো ! তুমি পুজা গ্ৰহণ কর।
আত্মা ত্বং গিরিজা মতিঃ সহচরাঃ প্রাণাঃ শরীরং গৃহং
পূজা তে বিষয়োপভোগরচনা নিদ্রা সমাধিস্থিতিঃ ।
সঞ্চারঃ পদয়োঃ প্রদক্ষিণবিধিঃ স্তোত্রাণি সর্বা গিরো
য়দ্যত্কর্ম করোমি তত্তদখিলং শম্ভো তবারাধনম্ ॥ ৪॥

আমি যাহাকে আত্মা বা আমি বলি এই আত্মাই তুমি, আর আমার (সতত নৃত্যশালিনী) মতিই গিরিজা, আর পঞ্চ (ভূতময়) প্ৰাণ তোমার সহচর, আমার এই শরীর তোমার পূজামণ্ডপ, বিষয়ভোগরূপ কার্য্যকলাপ তোমার পূজা, আর আমি যে নিদ্রা যায় ইহা তোমাতেই সমাধিলাভ, আমার এই পদসঞ্চালন ইহা তোমারই প্ৰদক্ষিণবিধি, যাহা কিছু কথা বলি সে সমস্তই তোমার স্তব, যে কৰ্ম্ম আমি করি, শম্ভো! সে সমস্তই তোমার আরাধনা ৷
করচরণ কৃতং বাক্কায়জং কর্মজং বা ।
শ্রবণনয়নজং বা মানসং বাপরাধম্ ।
বিহিতমবিহিতং বা সর্বমেতত্ক্ষমস্ব ।
জয় জয় করুণাব্ধে শ্রীমহাদেবশম্ভো ॥ ৫॥

আমি হস্তপদাদি দ্বারা বা বাক্য ও শরীর দ্বারা অথবা কর্ম্ম দ্বারা যে পাপ করিয়াছি, চক্ষু কৰ্ণ ও মনের অসাবধানতায় আমার যে অপরাধ হইয়াছে, তাহা আমার বিদিতই হউক বা অবিদিতই হউক হে দয়াসিন্ধো, তুমি সে সমস্ত ক্ষমা কর, হে শম্ভো! শ্ৰীমহাদেব! তোমার জয় হউক।৫
॥ ইতি শ্রীমচ্ছঙ্করাচার্যবিরচিতা শিবমানসপূজা সমাপ্তা ॥
ইতি শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য্য বিরচিত শিবমানসপূজা সমাপ্ত।

Friday, 13 September 2019

শ্রীভগবানের 'কেশব' নাম মাহাত্ম্যঃ-


শ্রীমহাভারতে অনুশাসনপর্ব্বণি 'বিষ্ণুসহস্রনাম স্তোত্রম্' এর শঙ্করাচার্য্য কৃত শাঙ্করভাষ্যে শ্রীভগবানের 'কেশব' নাম মাহাত্ম্য বর্ণিত আছে এইভাবে-
বিষ্ণুপুরাণে (৫।১৬।২৩) শ্রীকৃষ্ণের প্রতি নারদের বচন-'হে জনার্দন! যেহেতু তুমি দুষ্টাত্মা কেশীকে বিনাশ করেছ, সেইহেতু লোকে তোমাকে কেশব নামে পরিজ্ঞাত হবে।'
-(শঙ্করভাষ্য, বিষ্ণুসহস্রনাম ১৬)

সূর্যাদি সংক্রান্ত অংশু সকল ইঁহার কেশস্বরূপ সেইহেতু ইহাকে কেশব বলা হয়ে থাকে। মহাভারতে (শান্তিপর্ব-৩৪১।৪৮) আছে,হরি বলছেন-'যেসব কিরণ প্রকাশিত হচ্ছে এইসবই আমার কেশ, অতএব সর্বজ্ঞ ব্যক্তিরা আমার কেশব নাম কীর্ত্তন করে থাকে।'
অথবা 'ত্রয় কেশিনঃ' ইতি শ্রুতেঃ। অর্থাৎ ব্রহ্মা,বিষ্ণু,মহেশ ইঁহাদের শক্তিত্রয়ই কেশ সংজ্ঞক এবং এই শক্তিত্রয়রূপ কেশ বিশিষ্ট বলে কেশব নাম হয়েছে। বিষ্ণুপুরাণের অন্যত্র (৫।১।৬১) আছে-'বসুধাতলে আমার কেশদ্বয় (ব্রহ্মা ও মহেশ) আছে।' এই কেশ শব্দটি ভগবানের শক্তিবাচক হিসেবে প্রয়োগ হয়েছে।
-(শঙ্করভাষ্য, বিষ্ণুসহস্রনাম ৮২)
......................................................................................................
নারায়ণং নমস্কৃত্য নরং চৈব নরোত্তমম্।
দেবীং সরস্বতীং চৈব (ব্যাসং) ততো জয়মুদীরয়েৎ ॥ ১-১-১ (১)

॥ শ্রীবেদব্যাসায় নমঃ॥ শ্রীশঙ্করভগবত্পাদাচার্যস্বামিনে নমঃ ॥

Thursday, 12 September 2019

পরব্রহ্মের স্বরূপঃ-

শ্রীমন্মহর্ষি বাদরায়ণ ভগবৎ প্রণীতম্ উত্তর মীমাংসা বেদান্তদর্শনের উভয়লিঙ্গাধিকরণের সিদ্ধান্ত হইল নির্বিশেষ ব্রহ্মই বেদান্ত প্রতিপাদ্য, সবিশেষতা উপাসনার সৌকর্যের জন্য। ব্রহ্মসূত্রের তৃতীয় অধ্যায়ের দ্বিতীয় পাদে বর্ণিত আছে-

ন স্থানতোপি পরস্যোভয়লিঙ্গং সর্বত্র হি৷৷ ব্রহ্মসূত্র- ৩.২.১১৷৷

ভগবৎপাদ্ শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য্যের 'শাঙ্করভাষ্য' অনুসারে ভাবার্থঃ-ব্রহ্মবিষয়ক উভয়লিঙ্গক অর্থাৎ সবিশেষ ও নির্বিশেষ উভয়প্রকার ব্রহ্মজ্ঞাপক শ্রুতিসকল আছে। যথাঃ-

'সর্বকর্মা সর্বকামঃ সর্বগন্ধঃ সর্বরসঃ'-(ছান্দোগ্য উপনিষদ্-৩।১৪।২)

'সমস্ত জগৎ যাহার কর্ম্ম, যিনি সর্ব্ববিধ বিশুদ্ধ কামনাবান্, সকলপ্রকার সুখকর গন্ধযুক্ত, সকল প্রকার উত্তম রসযুক্ত'- ইত্যাদি এই সকল শ্রুতি সবিশেষ লিঙ্গ অর্থাৎ সবিশেষ ব্রহ্মের জ্ঞাপক।

পুনশ্চ বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ এর শ্রতি বলিতেছে-

'অস্থূলমনণ্বহ্রস্বমদীর্ঘম্'-(বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ ৩।৮।৮)

'ইনি স্থুল নহেন, অণু নহেন, হ্রস্ব নহেন, দীর্ঘ নহেন', এইসকল নির্বিশেষ ব্রহ্মের জ্ঞাপক। এই শ্রুতিসকলে কি ব্রহ্মকে সবিশেষ ও নির্বিশেষ উভয়লিঙ্গরূপে বুঝিতে হইবে, অথবা উভয়ের মধ্য যে কোন একরূপে বুঝিতে হইবে?

তাহা হইলে তিনি কি সবিশেষ, অথবা নির্বিশেষ,-ইহা মীমাংসা করা হইতেছে। তাহাতে পূর্ব্বপক্ষীয়রা বলেন দুইপ্রকার শ্রুতি থাকায় ব্রহ্ম সবিশেষ ও নির্বিশেষ উভয়াত্মক।

এই প্রকার পূর্ব্বপক্ষ প্রাপ্ত হইলে বলিতেছি-'পরের' অর্থাৎ সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ব্রহ্মের স্বভাবতঃ উভয়লিঙ্গতা অর্থাৎ সবিশেষ ও নির্বিশেষ উভয়াত্মক হওয়া যুক্তিযুক্ত নহে। যেহেতু একই বস্তুর স্বভাবতঃই রূপাদি বিশেষযুক্ত এবং তাহার বিপরীত, ইহা অবধারণ করিতে পারা যায় না, কারণ বিরোধ হইয়া পড়ে।

শঙ্কা হইল-আচ্ছা, তাহা হইলে 'স্থানবশতঃ' অর্থাৎ পৃথিবী প্রভৃতি উপাধির সহিত সম্বন্ধবশতঃ (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্-২।৫।১)'ব্রহ্মের সবিশেষতা সিদ্ধ হইবে'। সমাধান হইল-তাহাও সঙ্গত নহে। যেহেতু উপাধির সহিত সম্বন্ধ হইলেও একপ্রকার স্বভাব সম্পন্ন বস্তুর অন্যপ্রকার স্বভাব সম্ভব নহে। দেখ, স্ফটিক স্বচ্ছ হওয়ায় আলতা প্রভৃতি উপাধি সহিত সম্বন্ধবশতঃ কদাপি অস্বচ্ছ হয় না, যেহেতু তাহাতে অস্বচ্ছতা বিষয়ক অভিনিবেশ জ্ঞান ভ্রমমাত্র।

আর যেহেতু উপরিউক্ত ছান্দোগ্য শ্রুতির ব্রহ্মের সবিশেষতা সম্পাদক গন্ধ ও রূপরসাদি উপাধিসকল অবিদ্যা কর্তৃক প্রত্যুপস্থাপিত। আর সেইহেতু অন্যতর লিঙ্গের পরিগ্রহ হইলেও সমস্তবিশেষরহিত নির্বিকল্পরূপেই ব্রহ্মকে অবগত হইতে হইবে, তাহার বিপরীতরূপে নহে। যেহেতু সকল স্থলেই অর্থাৎ উপনিষদ্ সকলে ব্রহ্মস্বরূপ প্রতিপাদনপর 'অশব্দমস্পর্শমরূপমব্যয়ম্'-(কঠ উপনিষদ্-১।৩।১৫) অর্থাৎ 'শব্দরহিত, স্পর্শরহিত, রূপবিহীন, ক্ষয়রহিত' ইত্যাদি এই বাক্যসকলে যাঁহা হইতে সমস্ত বিশেষ নিরাকৃত হইয়াছে, সেই ব্রহ্মই উপদিষ্ট হইতেছেন।

 

শ্রীভারতী তীর্থকৃত বৈয়াসিক ন্যায়মালাঃ-
ব্রহ্ম কিং রূপি চারূপং ভবেন্নীরূপমেব বা।
দ্বিবিধ শ্রুতি সদ্ভাবাদ্ব্রহ্মস্যাদুভয়াত্মকম্।।
নীরূপমেব বেদান্তৈ প্রতিপাদ্যমপূর্ব্বতঃ।
রূপং ত্বনুদ্যতে ভ্রান্তমুভয়ত্বং বিরুধ্যতে।।

Friday, 6 September 2019

শঙ্করাচার্য্যের কিছু অমৃত বাণী, পর্ব-০৬ঃ-


৩১.'দেহবাসনা ও লোকজনের প্রিয় হওয়ার চেষ্টায় শাস্ত্রে পান্ডিত্য অর্জন এবং তাহা প্রকাশের ইচ্ছা থাকিলে যথার্থ জ্ঞান জন্মাইতে পারে না।'
-শঙ্করাচার্য্য (বিবেকচূড়ামণি-২৭১)
৩২.'প্রিয় বা অপ্রিয় বিষয়ের প্রাপ্তি হইলে সমদর্শিতাবশতঃ সুখ বা দুঃখ উভয়বিষয়ে মনে হর্ষ-বিষাদের অভাব জীবন্মুক্তের লক্ষণ।'
-শঙ্করাচার্য্য (বিবেকচূড়ামণি-৪৩৪)
৩৩,যিনি দেহে, ইন্দ্রিয়াদিতে এবং গৃহধনাদি বিষয়ক কর্তব্য কর্মে 'আমি আমার'-এইরূপ অহংভাব বর্জিত এবং রাগদ্বেষরহিত তিনিই জীবন্মুক্ত।
-শঙ্করাচার্য্য (বিবেকচূড়ামণি-৪৩৬)
৩৪.'হে বিষ্ণো ! আমার অবিনয় অপনয়ন কর, মনকে দমন কর, বিষয় মৃগতৃষ্ণার শান্তিবিধান কর, সৰ্ব্বজীবে আমার দয়া বিস্তার কর এবং আমাকে ভবসমুদ্র হইতে উদ্ধার কর।'
-শঙ্করাচার্য্য (শ্রীবিষ্ণুষট্পদী-১)
৩৫.'ছেড়ে এবার অর্থবাসনা ,
জাগ - মন ও জাগুক , হয়ে ইচ্ছাবিহীনা ,
সন্তুষ্ট হ' মনে - নিজ শ্রম-উপার্জনে ,,
কায়মনোবাক্যে হোক সাধা .....
গোবিন্দের নাম গা ।।
ভজ গোবিন্দম্ ভজ গোবিন্দম্
গোবিন্দম্ ভজ মূঢমতে ।'
-শঙ্করাচার্য্য ('ভজগোবিন্দম্'-২)

Thursday, 5 September 2019

'শ্রীবিষ্ণুষট্পদী'


শঙ্করাচার্য্য বিরচিত 'শ্রীবিষ্ণুষট্পদী' ও ইহার ভাবার্থঃ-

শ্রীভগবান বিষ্ণুর প্রতি নিবেদিত এই ভক্তি ও বৈরাগ্যমূলক স্তোত্রম্ আচার্য্য শঙ্করের লিখনীতে প্রকাশ পাইতেছে এইভাবে-

অবিনয়মপনয় বিষ্ণো দময় মনঃ শময় বিষয়মৃগতৃষ্ণাম্ ।
ভূতদয়াং বিস্তারয় তারয় সংসারসাগরতঃ ॥ ১॥

হে বিষ্ণো ! আমার অবিনয় অপনয়ন কর, মনকে দমন কর, বিষয় মৃগতৃষ্ণার শান্তিবিধান কর, সৰ্ব্বজীবে আমার দয়া বিস্তার কর এবং আমাকে ভবসমুদ্র হইতে উদ্ধার কর৷ ১ ৷৷
দিব্যধুনীমকরন্দে পরিমলপরিভোগসচ্চিদানন্দে ।
শ্রীপতিপদারবিন্দে ভবভয়খেদচ্ছিদে বন্দে ॥ ২॥

স্বৰ্গগঙ্গা সুরধুনী যে পাদপদ্মের মকরন্দ স্বরূপ, যে পাদপদ্মের পরিমল উপভোগ করিতে পারিলে সচ্চিদানন্দে স্থিতি লাভ হয়, শ্ৰীপতির যে চরণারবিন্দ সংসার ভীতি ছেদন করে আমি সেই চরণপদ্মযুগল বন্দনা করি ৷ ২ ৷৷
সত্যপি ভেদাপগমে নাথ তবাহং ন মামকীনস্ত্বম্ ।
সামুদ্রো হি তরঙ্গঃ ক্বচন সমুদ্রো ন তারঙ্গঃ ॥ ৩॥

তোমায় আমায় যে ভেদ তাহা দূরীভূত হইলেও হে নাথ ! তোমারই আমি ইহাই সত্য কিন্তু আমার তুমি হইতেই পার না । কারণ সমুদ্রেরই তরঙ্গ এইরূপ বলা যায় তরঙ্গের সমুদ্র ইহা কখনও নহে । ৩।।
উদ্ধৃতনগ নগভিদনুজ দনুজকুলামিত্র মিত্রশশিদৃষ্টে ।
দৃষ্টে ভবতি প্রভবতি ন ভবতি কিং ভবতিরস্কারঃ ॥ ৪

হে গোবৰ্দ্ধনধারিন! হে পৰ্ব্বতপক্ষাবিদারক ইন্দ্ৰানুজ! হে দৈত্যকুলের অমিত্ৰ! হে সূৰ্য্যচন্দ্র চক্ষু! তুমি যাহার দৃষ্টিপথে আইস তাঁহার সমস্ত জ্ঞানের প্রকাশ হয় । তখন কি সংসার তাহার কাছে অতি তুচ্ছ ও ঘুণ্য বলিয়া উপেক্ষিত হয় না ? ৪।।
ত্স্যাদিভিরবতারৈরবতারবতাঽবতা সদা বসুধাম্ ।
পরমেশ্বর পরিপাল্যো ভবতা ভবতাপভীতোঽহম্ ॥ ৫॥

মৎস্যাদি দশ-অবতাররূপে অবতরণ করিয়া তুমি পৃথিবীকে রক্ষা কর। হে পরমেশ্বর আমি তােমার প্রতিপাল্য আমি বড়ই ভবতাপে ভীত হইয়াছি।৫।।
দামোদর গুণমন্দির সুন্দরবদনারবিন্দ গোবিন্দ ।
ভবজলধিমথনমন্দর পরমং দরমপনয় ত্বং মে ॥ ৬॥

হে দামোদর ! হে গোবিন্দ ! সমস্ত গুণরাশির মন্দির তুমি। আহা কি সুন্দর তোমার মুখ অরিবিন্দ ! তুমি সংসার সমুদ্ৰ মথনের মন্দর স্বরূপ, তুমি আমার পরম সংসার ভয় নিবারণ কর ৷ ৬ ৷৷
নারায়ণ করুণাময় শরণং করবাণি তাবকৌ চরণৌ ।
ইতি ষট্পদী মদীয়ে বদনসরোজে সদা বসতু ॥ ৭॥

হে নারায়ণ ! হে করুণাময় ! আমি তোমার শ্ৰীচরণে শরণা লইলাম । হে প্ৰভু! এই ষট্পদী স্তোত্ররূপ ভ্রমর যেন আমার বদনপদ্মে সদা বাস করে।৭।।
॥ ইতি পরমহংস পরিব্রাজকাচাৰ্য্য শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য্য বিরচিতং বিষ্ণুষট্পদীস্তোত্রং সম্পূর্ণম্ ॥

Wednesday, 4 September 2019

শ্রুতিতে সত্যের জয়গানঃ-


অথর্ববেদীয় মুন্ডক উপনিষদে বর্ণিত আছে
-সত্যমেব জয়তে নানৃতং সত্যেন পন্থা বিততো দেবযানঃ৷ যেনাক্রমন্ত্যৃষয়ো হ্যাপ্তকামা যত্র তত্সত্যস্য পরমং নিধানম্৷৷৩।১।৬।।
ভগবৎপাদ্ শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য্যের শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ-
সত্যই বা সত্যাশ্রয়ীই জয়লাভ করেন, মিথ্যা অর্থাৎ মিথ্যাশ্রয়ী নহে। আর জগতে তো ইহা প্রসিদ্ধ আছে যে, সত্যবাদীকর্তৃক মিথ্যাবাদী পরাভূত হয় কিন্তু ইহার বৈপরীত্য হয় না। অতএব সত্যের প্রবল সাধনত্ব প্রতিপন্ন হইল।

দেবযানসংজ্ঞক মার্গ সত্যের দ্বারা অর্থাৎ যথাযথ কথনরূপ নিষ্ঠা অবলম্বনে বিস্তৃত হয় অর্থাৎ সত্যাবলম্বনের সাথে সাথেই উৎপন্ন হয়। যে পথাবলম্বনে উপাসক ঋষিগণ যাহারা কপটতা, শঠতা, অহঙ্কার, দম্ভ ও অসত্যবর্জিত এবং আপ্তকাম অর্থাৎ সকলবিষয়ে বিগততৃষ্ণা তাহারাই সেখানে আরূঢ় হন যেখানে উত্তম সাধনরূপ সত্যের সম্বন্ধ বিশিষ্ট ফলস্বরূপ যে সত্য ব্রহ্মরূপ প্রকৃষ্ট ধন-পুরষার্থরূপে স্থিত আছেন। সেখানে যে পথ দিয়া সাধক আরোহন করেন সেই পথ সত্যের দ্বারা ব্যাপ্ত।

'হরগৌর্যষ্টকম্'


শঙ্করাচার্য্যকৃত 'হরগৌর্যষ্টকম্' ভাবার্থঃ-

হরগৌরীর শিবশিবান্বিত মূর্ত্তি আচার্য্য শঙ্করের অভেদজ্ঞানে প্রস্ফুটিত হয়েছে এইভাবে-
কস্তূরিকাচন্দনলেপনায়ৈ, শ্মশানভস্মাঙ্গবিলেপনায়।
সৎকুণ্ডলায়ৈ ফণিকুণ্ডলায় নমঃ শিবায়ৈ চ নমঃ শিবায় ॥১॥

ভাবার্থঃ- যাঁর অর্ধেক গৌরীদেহ, কস্তুরিচন্দন বিলেপিত, অপর অর্ধেক হরদেহে শ্মশানভস্মের বিলেপন; অর্ধেক অঙ্গের কর্ণে মনোহরকুণ্ডল শোভিত, অপর অর্ধেকে সর্পকুণ্ডল শোভিত সেই শিবা (দুর্গা) এবং শিবকে প্রণাম করি। ১

মন্দারমালাপরিশোভিতায়ৈ, কপালমালাপরিশোভিতায়।
দিব্যাম্বরায়ৈ চ দিগম্বরায়, নমঃ শিবায়ৈ চ নমঃ শিবায় ॥২॥

ভাবার্থঃ- যাঁর অর্ধেক অঙ্গের গলায় পারিজাতমালা পরিশোভিত, অপর অর্ধেক কপালমালায় পরিশোভিত, অর্ধেক অঙ্গে দিব্য অম্বর (বস্ত্র) এবং অপর অর্ধেকে দিগম্বর সেই শিবা এবং শিবকে প্রণাম করি। ২

চলৎক্বণৎকঙ্কণনূপুরায়ৈ, বিভ্রৎফণাভাসুরনূপুরায়।
হেমাঙ্গদায়ৈ চ ফণাঙ্গদায়, নমঃ শিবায়ৈ চ নমঃ শিবায় ॥৩॥

ভাবার্থঃ- যাঁর অর্ধেক অঙ্গে চরণে চঞ্চল শব্দায়মান নূপুর শোভিত, অপর অর্ধেক ভাগে সর্পের ফণা চরণের নূপুর হয়েছে, অর্ধেক অঙ্গের বাহুতে সুবর্ণ বাজু (অঙ্গদ), অপর অর্ধেকে সর্পের বাজু সেই শিবা ও শিবকে প্রণাম করি। ৩

বিলোলনীলোৎপললোচনায়ৈ, বিকাসিপঙ্কেরুহলোচনায়।
ত্রিলোচনায়ৈ চ বিষমেক্ষণায়, নমঃ শিবায়ৈ চ নমঃ শিবায় ॥৪॥

ভাবার্থঃ- মুখমণ্ডলে অর্ধেক অংশে যাঁর চঞ্চল নীলপদ্মের ন্যায় লোচন (নয়ন) এবং অপর অর্ধেকে স্ফোটনোন্মুখ পদ্মের ন্যায় লোচন, সেই ত্রিনয়না এবং অযুগ্মনেত্র (ত্রিনয়ন) শিবা এবং শিবকে প্রণাম করি। ৪

প্রপন্নপৃষ্ঠৈ সুখদাশ্রয়ায়ৈ, ত্ৰৈলোক্যসংহারকতাণ্ডবায়।
কৃতস্মরায়ৈ বিকৃতস্মরায়, নমঃ শিবায়ৈ চ নমঃ শিবায় ॥৫॥

ভাবার্থঃ- যিনি অর্ধেক অঙ্গে আশ্রিত সিংহপৃষ্ঠে সুখাসীনা, অপর অর্ধেকে ত্রৈলোক্য সংহারের জন্য তাণ্ডবনৃত্য করছেন, অর্ধেক অঙ্গে কামের রচয়িত্রী, অপর অর্ধেকে কামের সংহারকর্তা সেই শিবা ও শিবকে প্রণাম করি। ৫

চাম্পেয়গৌরার্ধ শরীরকায়ৈ, কর্পূরগৌরার্ধশরীরকায়।
ধম্নিল্লবত্যৈ চ জটাধরায়, নমঃ শিবায়ৈ চ নমঃ শিবায় ॥৬॥

ভাবার্থঃ- যাঁর দেহের অর্ধেক চম্পক-কুসুমের ন্যায় গৌরবর্ণ অপর অর্ধেক কর্পূরবৎ শুভ্র, অর্ধেকভাগে কেশপাশে কবরী ধারণ করেছেন, অপর অর্ধেকে জটাধর সেই শিবা ও শিবকে প্রণাম করি। ৬

অম্ভোধরশ্যামলকুন্তলায়ৈ, বিভূতিভূষাঙ্গ জটাধরায়।
জগজ্জনন্যৈ জগদেকপিত্রে, নমঃ শিবায়ৈ চ নমঃ শিবায়॥৭॥

ভাবার্থঃ- যাঁর মস্তকের অর্ধেক অংশ নবীন মেঘের ন্যায় কৃষ্ণবর্ণ কেশগুচ্ছ, অপর অর্ধেকে জটাবিভূতি শোভিত সেই জগজ্জননী এবং জগতের একমাত্র পিতা, সেই শিবা ও শিবকে প্রণাম করি। ৭

সদা শিবানাং পরিভূষণায়ৈ, সদাহশিবানাং পরিভূষণায়।
শিবান্বিতায়ৈ চ শিবান্বিতায়, নমঃ শিবায়ৈ চ নমঃ শিবায় ॥৮॥

ভাবার্থঃ- যিনি সর্বদা অর্ধাঙ্গস্থ মঙ্গলময় বস্তুসমূহেরও শোভাবর্ধনকারিণী, প্রত্যুত যিনি সর্বদা অপরার্ধে স্থিত অমঙ্গল বস্তুসমূহেরও শোভাবর্ধক, যিনি শিবের সহিত সংযুক্তা এবং যিনি শিবার সহিত সংযুক্ত, সেই শিবা ও শিবকে প্রণাম করি। ৮

ইতি জগদ্গুরু আদি শংকরাচার্য্যকৃত 'হরগৌর্যষ্টকম্'।

Thursday, 29 August 2019

ভগবৎপাদ্ শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য্যের কিছু অমৃত বাণী, পর্ব-০৫ঃ-




২৬.'নিত্যাভ্যাস ব্যতিরেকে সচ্চিদানন্দঘন আত্মার প্রাপ্তি সম্ভব নয়, সেইহেতু তত্ত্বান্বেষী ব্যক্তি মুক্তির জন্য নিরন্তর ব্রহ্মের নিদিধ্যাসন করিবে।'
-শঙ্করাচার্য্য (অপরোক্ষানুভূতি-১০১)
২৭.'তরুর জীর্ণপত্র যেমন যেকোন স্থানে পড়িতে পারে, ব্রহ্মজ্ঞ সন্ন্যাসীর শরীরও সেইরূপ যেকোন স্থানে মৃত্যুমুখে পতিত হইতে পারে। তাঁহার দেহ পূর্বেই জ্ঞানাগ্নিতে দগ্ধ হইয়া গিয়াছে।'
-শঙ্করাচার্য্য (বিবেকচূড়ামণি-৫৫৬)
২৮.'যেরূপ জলের কারণে কাহারও বৃক্ষভ্রম হয় সেইরূপ অজ্ঞান প্রভাবে আত্মাতে দেহ দৃষ্ট হয়।'
-শঙ্করাচার্য্য (অপরোক্ষানুভূতি-৭৫)
২৯.'জ্ঞানময়ী দৃষ্টিদ্বারা ব্রহ্মময় জগৎকে দেখাই আদর্শ দর্শন; নাসিকাগ্রভাগ দর্শন নহে।'
-শঙ্করাচার্য্য (অপরোক্ষানুভূতি-১১৬)
৩০.করা, যাওয়া, গ্ৰহণ করা, ত্যাগ করা এ সব কোথায় ? মহা প্ৰলয়ে জল রাশি যেমন নিখিল বিশ্ব ব্যাপিয়া রাখে সেইরূপ আত্মা দ্বারাই সমস্ত পূর্ণা; পূর্ণ আত্মাই সৰ্ব্বত্র অন্য কিছুই নাই।
-শঙ্করাচার্য্য (পরাপূজা-১১)

Saturday, 24 August 2019

ভগবৎপাদ্ শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য্যের কিছু অমৃত বাণী, পর্ব-০৪ঃ-


২১. 'দুষ্ট অহঙ্কারের সহিত জীবের যতকাল সম্বন্ধ থাকিবে, ততকাল বিলক্ষণ মুক্তিবার্তা লেশমাত্রও পাওয়া যায় না।'
-শঙ্করাচার্য্য (বিবেকচূড়ামণি-২৯৯)
২২. 'অদ্বয়-আনন্দরস অনুভূতি হইলে বন্ধনের কারণ অহঙ্কারাদি নষ্ট হইয়া যায়, সেই অবস্থায় দুঃখের লেশমাত্রও থাকে না।'
-শঙ্করাচার্য্য (বিবেকচূড়ামণি-৩১৯)
২৩. ব্রহ্মনিষ্ঠায় কখন প্রমাদ করিবে না। ব্রহ্মার মানসপুত্র ভগবান্ সনৎকুমার বলিয়াছেন,'প্রমাদই মৃত্যুতুল্য।'
-শঙ্করাচার্য্য (বিবেকচূড়ামণি-৩২১)
২৪. 'মানুষ যতদিন শবতুল্য দেহের ভজনা করে, ততকাল অশুচি থাকে।'
-শঙ্করাচার্য্য (বিবেকচূড়ামণি-৩৯৬)
২৫. 'সর্বাত্মতাই বন্ধন মুক্তির হেতু। সর্বাত্মভাবের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আর কিছু নেই।'-শঙ্করাচার্য্য (বিবেকচূড়ামণি-৩৩৯)

Thursday, 22 August 2019

শ্রীভগবানের এক নাম 'হৃষীকেশ' নামের মাহাত্ম্যঃ-



শ্রীমদ্ভদ্গীতার অর্জ্জুনবিষাদযোগের ১৫ শ্লোকে বর্ণিত আছে-'হৃষীকেশ পাঞ্চজন্য নামক শঙ্খ বাজাইলেন।' শ্রীমহাভারতের অনুশাসন পর্ব্বের ১৪৯ তম অধ্যায়ে বিষ্ণুসহস্রনাম স্তোত্রম্ এ শ্রীভগবানের এই 'হৃষীকেশ' নামের মাহাত্ম্য বর্ণিত আছে। ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের বিষ্ণুসহস্রনাম শাঙ্করভাষ্য-১৯ শ্লোকে এ উল্লেখিত আছে-
"হৃষিক" অর্থাৎ পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়ের যিনি ঈশ অর্থাৎ ঈশ্বর তিনিই পরমাত্মা হৃষীকেশ ; ইহারই বশীভূত হয়ে ইন্দ্রিয়গণ স্ব স্ব বিষয়ে প্রবৃত্ত হয়। সূর্য ও চন্দ্র তাপদান ও বস্তু প্রকাশ করে লোক সমুদায়কে আহ্লাদিত করেন বলে হৃষী নামে অভিহিত হন। ঐ সূর্য ও চন্দ্র তাঁর কেশস্বরূপ বা কেশ-সংস্থিত কিরণস্বরূপ, তাই তাঁর নাম হৃষীকেশ।
'হে পান্ডুনন্দন! যিনি সূর্য ও চন্দ্রকে কেশ নামক অংশুর(কিরণের) দ্বারা সর্বদা যুক্ত করে, তাঁদের দ্বারা জগৎকে জাগরিত এবং নিদ্রিত করে তা হতে পৃথকভাবে উত্থিত হন(অর্থাৎ সর্বত্র অসংগ থাকেন)। জগৎকে জাগরিত এবং নিদ্রিত করার জন্য তিনি জগতের হর্ষণ এবং আনন্দপ্রদানকারী হন। তিনি তাঁর কেশ (শক্তি)-স্বরূপ অগ্নি (এখানে অগ্নি অর্থ তেজ বা সূর্য) এবং চন্দ্রের দ্বারা জগৎকে হৃষ্ট করেন বলে হৃষীকেশ (হর্ষণ + কেশ), মহেশ্বর, বরদানকারী ও লোক (ভূঃ প্রভৃতি লোক এবং সেই লোকবাসীগনের)-পালকরূপে চরাচরে খ্যাত হন।'-(মহাভারত শান্তিপর্ব ৩৪২।৬৬-৬৭)

Sunday, 18 August 2019

ভগবৎপাদ্ শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য্যের কিছু অমৃত বাণী, পর্ব-০২ঃ-


১১.পুত্রাদি পিতাকে ঋণ হইতে মুক্ত করিতে পারেন। কিন্তু অবিদ্যাবন্ধন হইতে মুক্তিলাভের কর্তা নিজে ছাড়া আর কেহ নহে।
-শঙ্করাচার্য্য (বিবেকচূড়ামণি-৫১)

১২.'ওম' এই অক্ষরটি পরমাত্মার সন্নিহিত অভিধান অর্থাৎ বাচক নাম;প্রিয় নাম গ্ৰহণ করিলে অর্থাৎ উচ্চারণ করিলে, যেমন সাধারণ লোক সন্তুষ্ট হয়, তেমনি সেই ওঙ্কার-নাম উপাসনায় প্ৰযুক্ত হইলে, তিনিও (পরমাত্মাও) প্ৰসন্ন হইয়া থাকেন।
-শঙ্করাচার্য্য (ছান্দোগ্য উপনিষদ্ শাঙ্করভাষ্য-১।১।১)

১৩.আত্মস্বরূপে অবিজ্ঞাত থাকিলে শাস্ত্রপাঠ নিষ্ফল হয়। আর আত্মস্বরূপ বিজ্ঞাত হওয়ার পর শাস্ত্র অধ্যয়ন নিষ্প্রয়োজন হইয়া পড়ে।
-শঙ্করাচার্য্য (বিবেকচূড়ামণি-৫৯)

১৪.ওরে ও অবোধ, আন ফিরিয়ে বোধ,
শ্রীগোবিন্দের নাম গা ।।
শেষের সময় আসবে যখন ,,
বৃথা হবে শিক্ষা- 'ব্যাকরণ '
সার হবে এক পতিতপাবন ,
সেই যে এক সাধা...
শ্রীগোবিন্দ -র নাম গা ।।
ভজ গোবিন্দম্ ভজ গোবিন্দম্
গোবিন্দম্ ভজ মূঢমতে ।
-শঙ্করাচার্য্য (ভজ গোবিন্দম্)

১৫.ঔষধ পান না করিয়া কেবল 'ঔষধ' শব্দ উচ্চারণ করিলে রোগ সারে না। অপরোক্ষানুভূতি ব্যতীত কেবল 'ব্রহ্ম' শব্দের উচ্চারণের দ্বারা মুক্তিলাভ হয় না।
-শঙ্করাচার্য্য (বিবেকচূড়ামণি-৬২)

Friday, 16 August 2019

ভগবৎপাদ্ শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য্যের অমৃত বাণী-



১.'মনুষ্যত্ব, মুমুক্ষুত্ব ও মহাপুরুষের সঙ্গ, এই তিনটি এ জগতে দুর্লভ। কেবলমাত্র ঈশ্বরের বিশেষ অনুগ্রহে এগুলি পাওয়া যায়।'
-শঙ্করাচার্য্য (বিবেকচূড়ামণি-৩)

২.'শাস্ত্র ও আচার্য্যের বাক্যে ভক্তি, বিশ্বাসই শ্রদ্ধা নামে প্রসিদ্ধ। এবং সৎ-লক্ষ্যে চিত্তের একাগ্রতাই সমাধান বলিয়া কথিত হয়।'
-শঙ্করাচার্য্য (অপরোক্ষানুভূতি-৮)

৩.'শাস্ত্র ও গুরুবাক্যের সত্যতায় দৃঢ় বিশ্বাস রাখা ও অন্তরে সেই বিশ্বাসকে দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করাকে জ্ঞানীরা শ্রদ্ধা বলেন। এই শ্রদ্ধার সাহায্যে আত্মবস্তুর উপলব্ধি হয়।'
-শঙ্করাচার্য্য (বিবেকচূড়ামণি-২৫)

৪.'বেদান্তের অর্থ বিচারের দ্বারা উত্তম জ্ঞান উৎপন্ন হয়। এই জ্ঞান উৎপত্তির সাথে সাথে সংসারদুঃখের সর্বতোভাবে নাশ হয়।'
-শঙ্করাচার্য্য (বিবেকচূড়ামণি-৪৫)

৫.'অবিদ্যা হয়েছে শবল অর্থাৎ উপাধি যাঁর এমন যে ব্রহ্ম, তিনিই বিচার্য সৎ-শব্দবাচ্য।'
-শঙ্করাচার্য্য (পঞ্চীকরণসূত্র-২)

৬.'শাস্ত্ররূপ প্রমাণ হইতেই জগতের জন্মাদির কারণরূপে ব্রহ্ম অধিগত হন।'
-শঙ্করাচার্য্য (ব্রহ্মসূত্র শাঙ্করভাষ্য-১।১।৩)

৭.'এই গীতাশাস্ত্র সমস্ত বেদাৰ্থ সারসংগ্ৰহ স্বরূপ ও দুর্বিজ্ঞেয়ার্থ।'
-শঙ্করাচার্য্য (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা শাঙ্করভাষ্য উপক্ৰমণিকা)

৮.'যে ব্যক্তি এই পবিত্র গীতাশাস্ত্র পাঠ করেন, তিনি ভয় ও শোকাদি শূন্য হয়ে বিষ্ণুধাম প্রাপ্ত হন।'
-শঙ্করাচার্য্য (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা মাহাত্ম্য)

৯.'মোক্ষের সাধনসমূহের মধ্যে ভক্তিই গরীয়সী। নিজের স্বরূপের সন্ধানকেই ভক্তি বলে অভিহিত করা হয়। আবার অন্য অনেকে আত্মার ও পরমাত্মার তত্ত্ব-বিচারকেই ভক্তি বলে থাকেন।'
-শঙ্করাচার্য্য (বিবেকচূড়ামণি-৩১)

১০.'কাম, ক্রোধ, লোভ ও মোহ চেষ্টা করে পরিত্যাগ কর। নিজের আত্মাকে জানার চেষ্টা কর, তুমি কে? এই আত্মজ্ঞান না হলে তুমি মূর্খই রয়ে যাবে। এই জীবন-মৃত্যু নরকময় সংসারে জন্ম জন্মান্তর ধরে পঁচতে হবে।'
-শঙ্করাচার্য্য (মোহমুদগর-১৫)
........................................................................

Saturday, 10 August 2019

গায়ত্রী মন্ত্র (শাঙ্করভাষ্য, যোগী যাজ্ঞবল্ক্য ও গায়ত্রীতন্ত্রের ব্যাখ্যা)-


বেদে যে ঋক্ টি গায়ত্রী মন্ত্র নামে প্রসিদ্ধ সেটি ঋগ্বেদের একটি ঋক্। তৃতীয় মণ্ডলে দ্বিষষ্টিতম সূক্তের ১৮টি ঋক আছে ; তন্মধ্যে দশম ঋক্ গায়ত্রী। এই সূক্তের ঋষি বিশ্বামিত্র। ইন্দ্রাবরুণৌ (ইন্দ্র ও বরুণ একত্রে) বৃহস্পতি, পূষা, সবিতা, সোম, মিত্রাবরুণৌ (মিত্র ও বরুণ একত্রে) এই সূক্তের দেবতা। ঐ স্তুত দেবতাদিগের মধ্যে সবিতা এক জন। যে ঋক্টিকে গায়ত্রী বলা যায়, তাহা তাঁহারই স্তব। এই ৬২তম সূক্তের প্রথম তিনটি ঋক ত্রিষ্টুপ ছন্দে। আর ১৫টি গায়ত্রীচ্ছন্দে। এই ঋক্টির প্রাধান্য আছে বলিয়াই ইহাই গায়ত্রী নামে প্রচলিত। এই ঋক্ এর পূর্ব্বে পরব্রহ্মবাচ্য প্রণব ও মহাব্যাহৃতি ‘ভূ’ ‘ভুব’ ‘স্বর্’ সংযুক্ত করিয়া প্রখ্যাত গায়ত্রীমন্ত্র দ্বিজাতিদের নিত্যজপ্য।

ॐ ভূর্ভুবঃ স্বঃ
তৎ সবিতুর্বরেণ্যং
ভর্গো দেবস্য ধীমহি
ধিয়ো য়ো নঃ প্রচোদয়াৎ।।

গায়ত্রী প্রাণায়াম-মন্ত্রঃ-
ॐ ভূঃ ॐ ভূবঃ ॐ স্বঃ ॐ মহঃ ॐ জনঃ ॐ তপঃ ॐ সত্যং, ॐ তত্সবিতুর্বরেণ্যং ভর্গো দেবস্য ধীমহি ধিয়ো য়ো নঃ প্রচোদয়াৎ, আপো জ্যোতীরসোহমৃতং ব্রহ্ম ভূর্ভূবঃ স্বরোম্।
'ॐ' এই অক্ষরটি পরমাত্মার সন্নিহিত অভিধান অর্থাৎ বাচক নাম প্রণব।কৃষ্ণযজুর্বেদীয় তৈত্তিরীয় উপনিষদের প্রথম শীক্ষাবল্লাধ্যায়ের পঞ্চম অনুবাক অনুসারে- ‘ভূ’ ‘ভুব’ ‘স্বর্’ এই তিনটি সুপ্রসিদ্ধ মহাব্যাহৃতি।পৃথিবীলোকই ভূঃ, অন্তরিক্ষলোকই ভুবঃ, ঐ দ্যুলোকই স্বর।ঋক্ সমূহই ভূঃ, সামসমূহ ভুবঃ, যজুঃসমূহ স্বর্। আর ওঙ্কারই মহঃ-কারণ ওঙ্কারের দ্বারাই সকল বেদ মহীয়ান্ হয়।
যোগী যাজ্ঞবল্ক্যের ব্যাখ্যাঃ-‘পঞ্চকর্ম্মেন্দ্রিয়, পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয়, পঞ্চইন্দ্রিয়ার্থ, পঞ্চমহাভূত, মন, বুদ্ধি, আত্মা আর অব্যক্ত- এই চতুর্বিংশতি গায়ত্রীর অক্ষর। পরমপুরুষ প্রণব লইয়া পঞ্চবিংশ।’
শাঙ্করভাষ্য ও অনুবাদঃ-ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের ভাষ্য হল-
যঃ = সবিতা দেবঃ,
নঃ = অস্মাকং
ধিয়ঃ = কর্মাণি ধর্মাদিবিষয়া বা বুদ্ধীঃ,
প্রচোদয়াৎঃ = প্রেরয়েৎ,
তৎঃ = তস্য সর্বাসু শ্রুতিষু প্রসিদ্ধস্য,
দেবস্যঃ = দ্যীতমানস্য,
সবিতুঃ = সর্বান্তর্যামিতয়া প্রেরকস্য জগত্সৃষ্টুঃ পরমেশ্বরস্য আত্মভূতং,
বরেণ্যং = সর্বরূপাস্যতয়াজ্ঞেয়তয়া চ সংভজনীয়ং,
ভর্গ = অবিদ্যা তত্কার্যয়োর্ভর্জনাদ্ভর্গঃ,
স্বয়ংজ্যোতিঃ = পরমব্রহ্মাত্মক তেজঃ,
ধীমহি = তদ্যোহং সোহসো যোহসো সোহহমিতি বয়ং ধ্যায়েম।
(সামান্য অর্থ)
১. যে সবিতা দেব আমাদের বুদ্ধি অর্থাৎ কর্মকে অথবা ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষলাভ বিষয়ে অন্তঃকরণ বুদ্ধিবৃত্তি প্রেরণ করে, যিনি সকল শ্রুতিতে প্রসিদ্ধ প্রকাশমান দেবতা সকলকে অন্তর্যামীরূপে প্রেরণাদানকারী জগৎ-স্রষ্টা পরমেশ্বর, অবিদ্যা এবং তার কর্মফল দূর করে শুভবুদ্ধিদানকারী , যিনি সবার আত্মা, যিনি সকলের বরণীয়, যিনি সকলের দ্বারা উপাস্য এবং জ্ঞেয় হওয়ার জন্য সাবধানের সাথে অর্চনা করার যোগ্য, স্বয়ং প্রকাশ (সকলের আত্মস্বরূপ) পরমব্রহ্মরূপ তেজ, আমরা অভেদভাবে সেই পরম জ্যোতির ধ্যান করছি।

যদ্বা তদিতি ভর্গো বিশেষণং = সবিতুর্দেবস্য তত্তাদশং ভর্গো ধীমহি।
কিং তদিত্যপেক্ষায়ামাহ = য ইতি লিংগব্যত্যয়ঃ, যদ্ভর্গো ধিয়ঃ প্রচোদয়াদিতি তদ্ভয়ায়েমেতি সমন্বয়ঃ।।

(আধ্যাত্মিক অর্থ)
২. ‘তৎ’ যা ভর্গ এর বিশেষণ। (ভর্গ শব্দের অর্থ অবিদ্যা এবং কর্মফল হতে চিত্তশুদ্ধির জন্য যে জ্ঞান), সবিতা দেবতা এর যে ভর্গ, আমরা তারই ধ্যান করি।

তিনি কে? আমরা অপেক্ষার সাথে করি ‘যঃ’ এই শব্দের প্রতীকী যা ভর্গ অর্থাৎ পরব্রহ্ম আমাদের বুদ্ধিকে প্রেরণাদান করে সেই ব্রহ্মেরই আমরা ধ্যান করছি। এভাবেই সমন্বয় করতে হবে।
যদ্বা যঃ সবিতা = সূর্য,
ধিয়ঃ = কর্মাণি,
প্রচোদয়াৎ = প্রেরয়তি,
স তস্য সবিতুঃ = সর্বস্য প্রসবিতুঃ,
দেবস্য = দ্যোতমানস্য সূর্যস্য,
তৎ = সর্বৈর্দৃশ্যতয়া প্রসিদ্ধং
বরেণ্যং = সর্বৈঃ সংভজনীয়ং,
ভর্গঃ = পাপানাং তাপক তে জোমণ্ডলং
ধীমহি = ধ্যায়েম,
মনসা ধারয়েম।।

(আধিদৈবিক অর্থ)
৩. যে সবিতা অর্থাৎ সূর্য বুদ্ধি-গত কর্মকে প্রেরণাদান করে, এই সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের প্রসব কর্তা সবিতাদেব অর্থাৎ প্রকাশমান সূর্যের, যিনি সবার দ্বারা দর্শনীয় হয়ে প্রসিদ্ধ এবং সবার গন্তব্য – সকলের দ্বারা সাবধানের সাথে সেবন করার যোগ্য তেজ তথা পাপকে ভষ্ম করার অগ্নিতেজ মণ্ডল, আমরা তারই ধ্যান করছি অর্থাৎ তাকে আমরা মনে মনে ধারণ করছি।
যদ্বা ভর্গঃ শব্দেনাত্রান্নমভি = ধীয়তে যঃ সবিতা দেবো ধিয়ঃ প্রচোদয়তি তস্য প্রসাদাদ্ভর্গোহন্নাদি লক্ষণং ফলং ধীমহি ধারয়ামঃ তস্যাধারভূতা ভবেমেত্যর্থঃ।।

(আধিভৌতিক অর্থ)
৪. ভর্গ শব্দে যেখানে অন্ন বলা হয়। যে সূর্যদেব বুদ্ধিকে প্রেরণাদান করে তার প্রসাদে ভর্গ অর্থাৎ অন্ন আদি লক্ষ্মণযুক্ত পূণ্যফলের ধারণকারী, তিনিই আমাদের গন্তব্য, এরূপ অর্থ।

প্রাণায়াম গায়ত্রী মহামন্ত্র এর উপাসনা-
অথ সর্বদেবাত্মনঃ সর্বশক্তেঃ সর্বাবভাসকতেজোময়স্য পরমাত্মনঃ সর্বাত্মকত্ব প্রতিপাদক গায়ত্রীমহামন্ত্রস্যোপাসনা প্রকারঃ প্রকাশ্যতে – তত্র গায়ত্রী প্রণবাদি সপ্তব্যাহত্যুপেতাং, শিরঃ সমেতাং সর্ববেদসারমিতি বদন্তি, এবংবিশিষ্টা গায়ত্রী প্রাণায়ামৈরূপাস্যা।

এখন সর্বদেবরূপ, সর্বশক্তি, সবার অভবাসক, তেজরূপ পরমাত্মার সর্বাত্মকতাকে সিদ্ধকারী গায়ত্রী মহামন্ত্রের উপাসনার প্রকারভেদ বর্ণনা করছি-
এই বিষয়ে প্রণবাদি সাত (৭) প্রকার ব্যবহৃত পদ সহিত (সপ্তব্যাহতি- ওঁকারমাদিত পুরাকল্পে সমুতপন্ন ভূঃভূবঃস্বঃ সনাতনাঃ) এবং মূখ্যমন্ত্র সহিত গায়ত্রী মন্ত্রকে ‘সকল বেদের সার’ বলছি। এভাবেই গায়ত্রীকে সর্বশাস্ত্র এবং সর্বমন্ত্রের সার হিসেবেই প্রাণায়াম দ্বারা উপাসনা করা উচিৎ।

শুদ্ধ গায়ত্রী জপ অনুযায়ী
স প্রণব ব্যাহতিত্রয়োপোতা, প্রণবান্তা, গায়ত্রী জপাদিভিরূপাস্যা। তত্র শুদ্ধা গায়ত্রী প্রত্যক্ ব্রহ্মৈক্যপ্রবোধিকা। ধিয়ো য়ো নঃ প্রচোদয়াদিতি – নোহস্মাকং ধিয়ো বুদ্ধির্যঃ প্রচোদয়াৎ-প্রেরয়েদিতি সর্ববুদ্ধিসংজ্ঞাহন্তঃকরণ প্রকাশক সর্বসাক্ষী প্রত্যগাত্মেত্যুচ্যতে, তস্য প্রচোদয়াচ্শব্দনির্দিষ্টস্যাত্মনঃ স্বরূপভূতং পরমব্রহ্ম তৎসবিতুরিত্যাদিপদৌর্নির্দিশ্যতে, তত্র ॐ তৎসদিতি নির্দেশো ব্রহ্মণস্ত্রিবিধঃ স্মৃত ইতি তচ্ছব্দেন প্রত্যগ্ভূত স্বতঃ সিদ্ধং পরং ব্রহ্মোচ্যতে।
অনুবাদঃ- এই গায়ত্রী এর উপাসনা প্রণব এর সাথে তিন ব্যাহতিয়োং এবং শেষে প্রণব মন্ত্রাদি জপ করা উচিৎ। এই বিষয়ে শুদ্ধ গায়ত্রী অর্থাৎ ব্যাহৃতিত্রয় সহিত তথা শিরোমন্ত্র সহিত যেখানে মন্ত্র ব্রহ্মের সাথে জীবকে একত্ববোধ করায়।
‘ধিয়ো য়ো নঃ প্রচোদয়াৎ’ এর অর্থ হচ্ছে ‘আমাদের বুদ্ধিকে যিনি প্রেরিত করেন’ এর দ্বারা আমাদের বুদ্ধি সংগায়িত সব অন্তঃকরণের প্রকাশক, সকল কিছুর সাক্ষী এবং প্রত্যাগাত্মা করে। সেই ‘প্রচোদয়াৎ’ শব্দ দ্বারা নির্দেশিত আত্মার স্বরূপ যিনি পরমব্রহ্ম, ‘তৎসবিতুঃ’ পদ দ্বারা নির্দেশ করা হয়। এই বিষয়ে ‘তৎসদিতি নির্দেশো ব্রহ্মণস্ত্রিবিধঃ স্মৃতঃ’ অর্থাৎ ॐ তৎ সৎ, এমনই তিন প্রকারের সচ্চিদানন্দঘন ব্রহ্মের নাম বলা হয়, এই স্মৃতি প্রমাণ অনুসারে ‘তৎ’ শব্দ দ্বারা প্রত্যগ্ভূত তথা স্বতঃসিদ্ধ পরমব্রহ্ম বলা হয়।
সবিতুরিতি সৃষ্টিস্থিতিলয়লক্ষণকস্য সর্বপ্রপঞ্চস্য সমস্তদ্বৈতবিভ্রমস্যাধিষ্ঠানং লক্ষ্যতে।
অনুবাদঃ- ‘সবিতুঃ’ এর অর্থ হচ্ছে – যেখানে সৃষ্টি স্থিতি তথা লয় লক্ষণযুক্ত যে দ্বৈত প্রপঞ্চ (জগৎ সংসার) দেখি, সেই সকলের অধিষ্ঠান সবিতার অভেদভাব হেতু ধ্যান করছি।
বরেণ্যমিতি সর্ববরণীয় নিরতিশয়ানন্দরূপং
ভর্গ ইত্যবিদ্যাদিদোষ ভর্জনাত্মক-জ্ঞানৈকবিষয়ত্বং।

অনুবাদঃ ‘বরেণ্যং’ এর অর্থ হচ্ছে- সবার দ্বারা বরণীয় পরিপূর্ণ আনন্দ স্বরূপ,
ভর্গ’ এর অর্থ হচ্ছে- অবিদ্যাদি দোষের ভর্জনকারী কেবল জ্ঞানের বিষয়।
দেবস্যেতি সর্বদ্যোতনাত্মকাখণ্ডসদেকরকরসং সবিতুর্দেবস্যেত্যত্র ষষ্ঠয়র্থো রাহোঃ শিরোবদৌপচারিকঃ বুদ্ধয়াদি সর্বদৃশ্য সাক্ষীলক্ষণং যন্মে স্বরূপং তৎসর্বাধিষ্ঠানভূতং পরমানন্দং নিরস্তসমস্তানর্থরূপং স্বপ্রকাশচিদাত্মকং ব্রহ্মেত্যেবং ধীমহি ধ্যায়েম।

অনুবাদঃ দেবস্য’ এর অর্থ হচ্ছে- সবাইকে প্রকাশকারী অখণ্ড সৎ একরস যিনি সেই দেবতার। ‘সবিতুর্দেবস্য(ভর্গঃ)’ এই ষষ্ঠী বিভক্তির পদের ঔপচারিক (কাল্পনিক) ভেদে অভেদ অর্থ। যেমন ‘রাহুর শির’ যেখানে রাহু এবং শির (মস্তক) বস্তুতঃ দুই ব্যাক্তি নয়। মস্তকই রাহু, রাহু থেকে মস্তক ভিন্ন নয়। দুটোই অভেদ। এই জন্য সেখানে ষষ্ঠী বিভক্তির ভেদকৃত অর্থ গৌণ।
[ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস অনুযায়ী “রাহুর শির= রাহুশির” অর্থাৎ ষষ্ঠী বিভক্তি ‘র’ লোপ পায়। অতএব রাহুর শির বললে ষষ্ঠী বিভক্তি এর জন্য রাহু এবং তার শির দুটি বুঝালেও এখানে ঔপচারিক ‘র’ লুপ্ত হয়ে সমাস অনুযায়ী একই অভেদ শব্দে (রাহুশির) ভেদ বিলুপ্ত হয়ে যায়]

যথা লক্ষিত-মূখ্য-অভেদার্থ যেখানে অন্তঃকরণাদি সকল দৃশ্যমান সাক্ষী যিনি আমার স্বরূপ তিনি হিলেন সবার অধিষ্ঠান পরমানন্দ, যাতে সকল প্রকার অনর্থের নিরসন হয় এবং যিনি স্বয়ংপ্রকাশ চিদাত্মারূপ ব্রহ্ম, আমরা তার – ‘ধীমহি’ অর্থাৎ অভেদভাবে চিন্তা করি।
এবং সতি সহব্রহ্মণা (হিরণ্যগর্ভেন সহ) স্ববিবর্ত্তজড়প্রপঞ্চেন সহ রজুসর্পন্যায়েনাপবাদ সামানাধিকরণ্য রূপ্যৈকত্বন্যায়ৈন সর্বসাক্ষী প্রত্যগাত্মনো ব্রহ্মণা সহ তাদাত্ম্যরূপমেকত্বং ভবতীতি সর্বাত্মক ব্রহ্মবোধকোহয়ং গায়ত্রী মন্ত্রঃ সংপদ্যতে।।
অনুবাদঃ- এমন ভাবেই, হিরণ্যগর্ভরূপ ব্রহ্মার সাথে নিজের স্বরূপে বিবর্ত্তভূত জড় প্রপঞ্চযুক্ত হয়ে এতে রজ্জুসর্পন্যায় আরোপ এবং শুক্তিকা-রজতের ন্যায়- রজতভাবের একতার ন্যায় সর্বসাক্ষী প্রত্যগাত্মার সাথে তাদাত্ম্যরূপ ঐক্য স্থাপিত হয়। এভাবেই সর্বাত্মরূপ ব্রহ্মের বোধ যা গায়ত্রী মন্ত্র সিদ্ধ হয়ে থাকে।
সাত ব্যাহৃতিয়াং —ॐ ভূঃ ॐ ভূবঃ ॐ স্বঃ ॐ মহঃ ॐ জনঃ ॐ তপঃ ॐ সত্যং,
সপ্তব্যাহৃতীনাময়মর্থঃ –
ভূরিতি সন্মাত্রমুচ্যতে, ভূব ইতি সর্ব ভাবং প্রকাশয়তোতি ব্যুৎপত্যা চিন্দ্রূপমুচ্যতে,
স্বরিতি সুব্রিয়ত ইতি ব্যুৎপত্যা সুবরিতি সুষ্ঠু সর্বৈব্রিয়মাণ সুখ স্বরূপমুচ্যতে,

সাত ব্যাহৃতি এর অর্থ হচ্ছে –
ভূঃ’ = থেকে সন্মাত্র (যার দ্বারা সমস্ত জগৎ উৎপন্ন হয়) এরূপ অর্থ।
ভূবঃ’ = যিনি সমস্ত সত্ত্বা এই ব্যুৎপত্তি চিদ্রূপ অর্থে বলা হয়।
স্বঃ’ = ‘ সুব্রিয়তঃ’ এই ব্যুৎপত্তি দ্বারা ‘সুবঃ’ যা সকল কিছুর দ্বারা উৎকৃষ্টতার সাথে বরণ করা হয়। তাকেই সেই সুখ স্বরূপ আনন্দ বলা হয়।

মহ ইতি মহীয়তে পূজ্যতে ইতি ব্যুৎপত্যা সর্বাতিশয়ত্বমুচ্যতে,
জন ইতি জনয়তীতি জন সকলকারণত্বমুচ্যতে,
তপ ইতি সর্বতেজোরূপত্ব,
সত্যামিতি সর্ববাধারহিতং।

মহঃ’ = যাকে মহান বলা হয়, যাকে পূজা করা হয়। এই ব্যুৎপত্তি দ্বারা যা সর্বাধিক তেজ স্বরূপ বুঝায়।
জনঃ’ = ‘যিনি উৎপন্ন করেন’ এই ব্যুৎপত্তি দ্বারা তাকে সমস্ত কিছুর কারণ বলা হয়।
তপঃ’ = এই শব্দের অর্থ হচ্ছে জ্ঞানস্বরূপ। ‘যস্য জ্ঞানময়ং তপঃ’ অর্থাৎ যিনি সবাইকে প্রকাশিত করেন।
সত্যম্’ = যা তিন কল্পে (অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অথবা সুষুপ্তি, জাগ্রত এবং স্বপ্ন অবস্থায়) সকল বাধারহিত হয়। এক কথায় যা তিন কালে বাধিত হয় না সেটাই সত্য।

এতদুক্তং ভবতি – লোকে স্বরূপং তদোংকারবাচ্যং ব্রহ্মৈবাত্মনোহস্য সচ্চিদ্রুপস্বভাবাদিতি।
অথ ভূরাদয়ঃ সর্বেলোকাঃ ওঙ্কারবাচা ব্রহ্মাত্মকাঃ ন তদ্বয়তিরিক্তং কির্চিদস্তোতি ব্যাহতয়ঃ সর্বাত্মকব্রহ্মবোধিকাঃ।

এই বিষয়ে বলা হয় – সৎ চিৎ রূপ স্বভাবযুক্ত হওয়ায় এই আত্মার স্বরূপ যা ব্রহ্মই, লোকের কাছে তিনি ওঙ্কার নামে খ্যাত। এবং ভূঃ আদিতে পুনঃ পুনঃ বলা হয়েছে প্রণব-মন্ত্র যা এই ভুবনে ব্রহ্মরূপতার প্রতিপাদন করে। এর দ্বারা ব্যাহতিয়া ব্রহ্মের সর্বাত্মকতার বোধ উপলদ্ধ করায়।

গায়ত্রী শিরোমন্ত্র – ‘ আপোজ্যোতীরসোহমৃতং ব্রহ্ম ভূর্ভূবঃ স্বরেম্।’
গায়ত্রীশিরসোপ্যয়মেবার্থঃ –
আপ ইতি আপ্নোতীতি ব্যুৎপত্যা ব্যাপকত্বমুচ্যতে,
জ্যোতিরিতি প্রকাশরূপত্বং (কাশ্দোপ্তৌ),
রস ইতিসর্বাতিশয়ত্বং,
অমৃতমিতি মরণাদি সংসারনির্মুক্তত্বং,
সর্বব্যাপি সর্বপ্রকাশকত্বং সর্বোৎকৃষ্টনিত্যমুক্তত্বমাত্মরূপং, সচ্চিদানন্দাত্মকং যদোংকারবাচ্যং ব্রহ্ম তদহমস্মীতি গায়ত্রীমন্ত্রস্যার্থঃ

অনুবাদঃ- গায়ত্রী শিরোমন্ত্র এর অর্থঃ-
‘আপলৃ ব্যাপ্তী’ ধাতু দ্বারা ‘আপঃ’ শব্দ নিষ্পন্ন হয়। এই ব্যুৎপত্তি শব্দে এর ব্যাপকতা বর্ণিত হয়েছে।
‘জ্যোতিঃ’ এর অর্থ প্রকাশ স্বরূপ। (কারণ ‘কাশ্’ দীপ্তির অর্থ দ্বারা এর স্বয়ং প্রকাশমানতা বুঝায়।)
সেই পরমানন্দ স্বভাবকে ‘রস’ বলা হয়। ‘রসো বৈ সঃ’
জগৎ সংসার ও মৃত্যু চক্রাদি হতে নির্মুক্ত হওয়ার জন্য সেটা ‘অমৃত’ নামে প্রসিদ্ধ।
তিনি সকল কিছুতে ব্যাপ্ত এবং সকলের প্রকাশক, সবার থেকে উৎকৃষ্ট এবং নিত্যমুক্ত আত্মরূপ, সৎ-চিৎ-আনন্দ স্বরূপ ‘ব্রহ্ম’ যিনি ওঙ্কার বাচ্য, আমিই তিনি। (অহম ব্রহ্মাস্মি) এরূপ অর্থ গায়ত্রী শিরোমন্ত্র এর।

শাস্ত্র-প্রমাণ
গুহাশয়ে ব্রহ্মহুতাশনেহহং কর্ত্তিদমংশাখ্যহবির্হুতং সৎ। বিলীয়তে নেদমহং ভবানীত্যেষ প্রকারস্ত্বভিধীয়তেহত্র।। যদস্তি যদ্ভাতি তদাত্মরূপং নান্যত্ততো ভাতি ন চান্যদস্তি। স্বভাবসংবিৎপ্রতিভাতি কেবলা গ্রাহ্যং গ্রহীতেতি মৃপৈব কল্পনা।।

অনুবাদঃ- “বুদ্ধি-গুহার ব্রহ্মরূপ অগ্নিতে ‘কর্তা’ এবং ‘ইদং’ অংশময় হবি হবন করায় জীবরূপ অহংভাব এর বিলয় হয়ে যায়। ‘আমি যে (দৃশ্যমান জগৎ প্রপঞ্চ) নই এই ভেবে উপাসনা করতে বলা হয়েছে। যা কিছু আছে এবং যা দৃশ্যমান সেই সমস্তই আত্মরূপ। আত্মা ভিন্ন অন্য কিছু নেই এবং না কিছু হতে পারে। স্বভাবের দ্বারাই কেবল সবিৎ প্রতিভাসিত হয়। অতঃপর গ্রাহ্য এবং গ্রহীতা (কর্তা ও ভোক্তা) কেবল মিথ্যা কল্পনা মাত্র।।
ইতি শ্রীমৎ শঙ্করভগবানঃ কৃতো গায়ত্রীভাষ্যং সমাপ্তম্।
ভগবান শঙ্করাচার্যকৃত গায়ত্রী ভাষ্য এর বঙ্গানুবাদ সমাপ্ত হল।

গায়ত্রীতন্ত্রের ব্যাখ্যাঃ-'গায়ত্রীর ১ম অক্ষর অগ্নিদেবতা,২য় অক্ষর বায়ুদেবতা, ৩য় সূর্য,ক্রমান্বয়ে বিদ্যুৎ, যম, বরুণ, বৃহস্পতি, পর্জ্জন্য, ইন্দ্র, গন্ধর্ব্ব, পূষা, মিত্রাবরুণ, ত্বষ্টা, বাসব, মরুত, সোম,আঙ্গিরস, বিশ্বদেব, অশ্বিনীকুমার, প্রজাপতি, সর্ব্বদেবতা, রুদ্র, ব্রহ্মা, বিষ্ণু।'
সায়ণাচার্য গায়ত্রীর ব্যাখ্যা কালে “তৎসবিতুঃ” ইতি বাক্যের অর্থ করেন, “জগৎপ্রসতুঃ”। কারণ “সু” ধাতু হতে সবিতৃ শব্দ নিষ্পন্ন হয়েছে। সবিতা অর্থে প্রসবিতা। কাহার প্রসবিতা? নিরুক্তকার যাস্কাচা্র্য্য বলেন, “সর্ব্বস্য প্রসবিতা”। যদি তাই হয়, তাহলে সবিতা, পরব্রহ্ম পরমেশ্বর। স্মার্ত্তভট্টাচার্য্য রঘুনন্দন প্রভৃতি পন্ডিতেরাও “তৎসবিতুঃ” শব্দের ব্যাখ্যা পরব্রহ্ম পক্ষে করে থাকেন। তাছাড়া ঋগ্বেদসংহিতা, ১ম মন্ডল, ১৬৪ সুক্ত, ৪৬ ঋক্ এ বলা হচ্ছে- ‘একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি’ অর্থাৎ সেই এক পরব্রহ্মকেই বিপ্রগণ ইন্দ্র,মিত্র, বরুণ, অগ্নি বহুনামে অভিহিত করিয়া থাকেন।

তথ্যসূত্রঃ-
১.জ্ঞানবেদ,দুর্গাদাস লাহিড়ী।
২.বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায় » প্রবন্ধ » দেবতত্ত্ব ও হিন্দুধর্ম্ম » সবিতা ও গায়ত্রী।
৩.শংকরাচার্য কৃত সংস্কৃত ভাষ্যকে হিন্দীতে ভাষ্যানুবাদ করেছেন লোকেশ্বরানন্দ,বঙ্গানুবাদে সহায়তা ও কৃতজ্ঞতায় জয় বিশ্বাস।
.........................................................................

শ্রীশুভ চৌধুরী।
আগষ্ট ১০, ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ।

Friday, 9 August 2019

গায়ত্রী সংজ্ঞক ব্ৰহ্মের মহিমাঃ-


সামবেদীয়া ছান্দোগ্যোপনিষৎ এর তৃতীয় অধ্যায়ের দ্বাদশ খন্ডে বর্ণিত আছে- 

সৈষা চতুষ্পদা ষড়্ বিধা গায়ত্রী তদেতদৃচাহভ্যনূক্তম্ ৷৷ ৫

তাবানস্য মহিমা ততো জ্যায়াংশচ পূরুষঃ । পাদোহস্য সর্বা ভূতানি ত্ৰিপাদস্যামৃতং দিবীতি ॥ ৬

শাঙ্করভাষ্য অনুবাদঃ- ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের ভাষ্য হইল- সেই প্ৰসিদ্ধা এই গায়ত্রীর চারিটি পাদ, এবং বাক্, ভূত, পৃথিবী, শরীর, হৃদয় ও প্রাণ, এই ছয়টি তাহার বিধা(অক্ষরস্থানীয়) অংশ অর্থাৎ ষড়প্রকারা । উক্তার্থেরই সমর্থকরূপে এখানে গায়ত্রী অনুগত যে গায়ত্রী-নামক ব্ৰহ্ম, গায়ত্ৰী বলিয়া অভিহিত হইল, ঋক্ মন্ত্রেও তাহা প্ৰকাশিত হইয়াছে ॥

 ব্রহ্মের চতুষ্পদ ও ষড়বিধ বিকারাত্মক যে পরিমাণ একপাদ গায়ত্রী বলিয়া বর্ণিত হইল, সেই পরিমাণই অৰ্থাৎ তৎসমস্তই উক্ত গায়ত্রী সংজ্ঞক সমস্ত ব্ৰহ্মের মহিমা, অর্থাৎ বিভূতির বিস্তার ; অতএব, তদাপেক্ষা অর্থাৎ গায়ত্রী-সংজ্ঞক বাচারম্ভণমাত্ররূপী অসত্য বিকারাত্মক ব্ৰহ্ম অপেক্ষাও পরমার্থ সত্য, বিকারহীন পূরুষ (পরব্রহ্ম) অতিশয় মহৎ ; কারণ, তিনিই সর্ব জগৎকে পরিপূরণ করেন, অথবা হৃদয়রূপ পুরে অবস্থান করেন, [ এইজন্য পুরুষ-পদবাচ্য হন]। সমস্ত ভূত অর্থাৎ তেজ, জল ও পৃথিবী প্রভৃতি স্থাবর-জঙ্গম-সমূহ সেই এই পুরুষেরই একপাদ (একাংশমাত্র); এই গায়ত্র্যাত্মক সমস্ত ব্ৰহ্মের ত্রিপাদযুক্ত অমৃতস্বরূপ পূরুষ প্রকাশময় নিজ আত্মস্বরূপে অবস্থিত আছেন। [ইতি শব্দ মহিমা কথন সমাপ্তি জ্ঞাপনার্থ ] ॥

জ্ঞানী ভোগ্যবিষয়ে মনের কঠিনতা আর ভগবদ্বিষয়ে মনের কোমলতা সম্পাদন করে—

  আচার্য মধুসূদন সরস্বতী ভক্তিরসায়নে বলছেন — কাঠিন্যং বিষয়ে কুর্যাদ্ দ্রবত্বং ভগবৎপদে। উপায়ৈঃ শাস্ত্রনির্দিষ্টৈরনুক্ষণমতো ব...