Saturday, 25 June 2022

উমামহেশ্বরস্তোত্রম্ ও শ্রীশৈলভ্রমরাম্বাস্তুতিঃ-

 


উমামহেশ্বরস্তোত্রম্ 

নমঃ শিবাভ্যাং নবয়ৌবনাভ্যাম্

পরস্পরাশ্লিষ্টবপুর্ধরাভ্যাম্ 

নাগেন্দ্রকন্যাবৃষকেতনাভ্যাম্

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||১||

ভাবার্থ - নবযৌবনবিশিষ্ট পরস্পর মিলিত শরীরধারী ( অর্ধনারীশ্বর মূর্তি ) শিব ও শিবাকে নমস্কার ।নাগেন্দ্রকন্যা, বৃষকেতনযুক্ত শঙ্কর ও পার্বতীকে পুনঃ পুনঃ নমস্কার ||১||

নমঃ শিবাভ্যাং সরসোৎসবাভ্যাম্

নমস্কৃতাভীষ্টবরপ্রদাভ্যাম্ 

নারায়ণেনার্চিতপাদুকাভ্যাং

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||২||

ভাবার্থ - নমস্কৃত হইলে অভীষ্ট বরপ্রদানকারী সরস অনন্দময় শিব ও শিবাকে নমস্কার, যাদের পাদুকা নারায়ণ অর্চ্চনা করেছেন ( এমন ) শঙ্কর ও পার্বতীকে পুনঃ পুনঃ নমস্কার ||২||

নমঃ শিবাভ্যাং বৃষবাহনাভ্যাম্

বিরিঞ্চিবিষ্ণ্বিন্দ্রসুপূজিতাভ্যাম্ 

বিভূতিপাটীরবিলেপনাভ্যাম্

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||৩||

ভাবার্থ - ব্ৰহ্মা, বিষ্ণু ও ইন্দ্র কর্তৃক সুপূজিত বৃষবাহন শিব ও শিবাকে নমস্কার: বিভূতি ও চন্দন বিলেপনযুক্ত শিব ও পার্বতীকে পুনঃ পুনঃ নমস্কার ||৩||

নমঃ শিবাভ্যাং জগদীশ্বরাভ্যাম্

জগৎপতিভ্যাং জয়বিগ্রহাভ্যাম্ 

জম্ভারিমুখ্যৈরভিবন্দিতাভ্যাম্

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||৪||

ভাবার্থ - জগতের অধিপতি জগতের ঈশ্বর জয়রূপী শরীরধারী শিব ও শিবা কে নমস্কার ( অর্থাৎ জগতের পালক, জগৎ সম্বন্ধে সর্বপ্রকার সামর্থ্য বিশিষ্ট এবং জয়রূপ অর্থাৎ সংসারজয়কারী বা মুক্তিদায়ক বিগ্রহ বা শরীরধারী– এ স্থলে এটাই তাৎপর্য যে, শিব ও ভবানীর শরীর ভক্তের সংসার-শৃঙ্খলা মোচন করে সুতরাং ওটাই জয় ) জম্ভারি ইন্দ্রপ্রমুখ দেবগণ কর্তৃক অভি বন্দিত শঙ্কর-পার্বতীকে পুনঃ পুনঃ নমস্কার ||৪||

নমঃ শিবাভ্যাং পরমৌষধাভ্যাম্

পঞ্চাক্ষরী পঞ্জররঞ্জিতাভ্যাম্ 

প্রপঞ্চসৃষ্টিস্থিতি সংহৃতাভ্যাম্

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||৫||

ভাবার্থ - শিব ও শিবাকে নমস্কার। পরম ঔষধস্বরূপ পঞ্চাক্ষর ও পঞ্জরাখ্য স্তব দ্বারা রচিত ( স্তুত ) প্রপঞ্চ ( জগৎ ) সৃষ্টিস্থিতিসংহারকারী শঙ্কর-পার্বতীকে পুনঃ পুনঃ নমস্কার ||৫||

নমঃ শিবাভ্যামতিসুন্দরাভ্যাম্

অত্যন্তমাসক্তহৃদম্বুজাভ্যাম্ 

অশেষলোকৈকহিতঙ্করাভ্যাম্

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||৬||

ভাবার্থ - শিব ও শিবাকে প্রণাম। অতি সুন্দর, যাদের হদয়কমল অত্যন্ত আসক্ত ( অর্থাৎ পরস্পর অত্যন্ত সংবদ্ধ ), নিখিল লােকের একমাত্র হিতকর শঙ্কর-পার্বতীকে পুনঃ পুনঃ নমস্কার ||৬||

নমঃ শিবাভ্যাং কলিনাশনাভ্যাম্

কঙ্কালকল্যাণবপুর্ধরাভ্যাম্ 

কৈলাসশৈলস্থিতদেবতাভ্যাম্

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||৭||

ভাবার্থ - শিব ও শিবাকে প্রণাম। কলিনাশকারী অস্থিমালা ও কল্যাণদায়ক শরীরবিশিষ্ট কৈলাসপর্বতস্থিত দেবতা শঙ্কর ও পার্বতীকে পুনঃ পুনঃ প্রণাম ||৭||

নমঃ শিবাভ্যামশুভাপহাভ্যাম্

অশেষলোকৈকবিশেষিতাভ্যাম্ 

অকুণ্ঠিতাভ্যাম্  স্মৃতিসম্ভৃতাভ্যাম্

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||৮||

ভাবার্থ - শিব ও শিবা কে নমস্কার, অশুভাপহারী অশেষলোকবিলক্ষণ, অকুণ্ঠিত, স্মৃতিতে অবস্থিত ( চিন্তার বিষয় ) শঙ্কর পার্বতী কে পুনঃ পুনঃ নমস্কার ||৮||

নমঃ শিবাভ্যাং রথবাহনাভ্যাম্

রবীন্দুবৈশ্বানরলোচনাভ্যাম্ 

রাকাশশাঙ্কাভমুখাম্বুজাভ্যাম্

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||৯||

ভাবার্থ - শিব ও শিবাকে প্রণাম। রথ ও বাহনযুক্ত, সূর্য্য, চন্দ্র ও অগ্নিরূপ চক্ষুবিশিষ্ট, পূর্ণিমাচন্দ্রের ন্যায় মুখপদ্মের কান্তিবিশিষ্ট শঙ্কর ও পার্বতীকে পুনঃ পুঃ প্রণাম ||৯||

নমঃ শিবাভ্যাং জটিলন্ধরভ্যাম্

জরামৃতিভ্যাং চ বিবর্জিতাভ্যাম্ 

জনার্দনাব্জোদ্ভবপূজিতাভ্যাম্

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||১০||

ভাবার্থ - শিব ও শিবাকে নমস্কার। জটাধারী জরা ও মৃত্যু কর্তৃক বিবর্জিত ( অর্থাৎ অজর ও অমর ), বিষ্ণু ও ব্ৰহ্মা কর্ক্তৃক পূৃজিত শঙ্কর ও পার্বতীকে পুনঃ পুনঃ নমস্কার ||১০||

নমঃ শিবাভ্যাং বিষমেক্ষণাভ্যাম্

বিল্বচ্ছদামল্লিকদামভৃদ্ভ্যাম্ 

শোভাবতী শান্তবতীশ্বরাভ্যাম্

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||১১||

ভাবার্থ - শিব ও পার্বতীকে নমঙ্কার। বিষম সংখ্যক চক্ষুর্যুক্ত, বিল্বপত্র ও মল্লিকামালাধারী, শােভাবর্তী ও শান্তবতীশর শঙ্কর-পার্ব্বতীকে বারংবার প্রণাম ||১১||

নমঃ শিবাভ্যাং পশুপালকাভ্যাম্

জগত্রয়ীরক্ষণ বদ্ধহৃদ্ভ্যাম্ 

সমস্ত দেবাসুরপূজিতাভ্যাম্

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||১২||

ভাবার্থ - শিব ও শিবাকে নমস্কার. পশু (জীব) পালক, জগত্রয়ের রক্ষণে বদ্ধহৃদয়, সমস্ত দেবাসুরপূজিত শঙ্কর ও পার্বতীকে পুনঃ পুনঃ নমস্কার ||১২||

স্তোত্রং ত্রিসন্ধ্যং শিবপার্বতীভ্যাম্

ভক্ত্যা পঠেদ্দ্বাদশকং নরো যঃ ।

স সর্বসৌভাগ্য ফলানি ভুঙ্ক্তে

শতায়ুবন্তে শিবলোকমেতি ||১৩||

ভাবার্থ - যে ব্যাক্তি ত্রিসন্ধ্যায় ভক্তিপূর্বক শিবপার্বতীর দ্বাদশ (শিবপার্বতীভ্যাম্ উপলক্ষিতং দ্বাদশকং) সংখ্যক স্তব পাঠ করে, সে শতায়ু লাভ করে সর্বপ্রকার সৌভাগ্য ফলভোগ করে ও অন্তে শিবলােক প্রাপ্ত হয় ||১৩||

শ্রীশৈলেশভ্রমরাম্বাস্তুতিঃ/ভ্রমরাম্বাষ্টকম্ অথবা শ্রীমাতৃস্তবঃ

চাঞ্চল্যারুণলোচনাঞ্চিতকৃপাচন্দ্রার্কচূড়ামণিং

চারুস্মেরমুখাং চরাচরজগৎসংরক্ষণীং তৎপদাম্ ।

চঞ্চচ্চম্পকনাসিকাগ্রবিলসন্মুক্তামণীরঞ্জিতাং

শ্রীশৈলস্থলবাসিনীং ভগবতীং শ্রীমাতরং ভাবয়ে ||১||

ভাবার্থ - যার আরক্ত নয়নে চঞ্চলতা দ্বারা কূপা অভিব্যক্ত, অর্দ্ধচন্দ্র যার চূড়ামণি, দোদুল্যমান চম্পকাকৃতি স্বর্ণভূষণভূষি ত নাসিকার অগ্রভাগ দিব্যমুক্তা-বিরাজিত হয়ে যার প্রীতিবর্দ্ধন করছে, সেই স্মেরচারু-বদনা, চরাচরজগৎ-পালিনী, তৎপদ প্রতিপাদ্য অর্থাৎ ঈশ্বরস্বরূপা শ্রীশৈলবাসিনী ভগবতী

শ্ৰীমাতাকে ভাবনা করি ||১||

কস্তূরীতিলকাঞ্চিতেন্দুবিলসৎপ্রোদ্ভাসিভালস্থলীং

কর্পূরদ্রবমিশ্রচূর্ণখদিরামোদোল্লসদ্বীটিকাম্ ।

লোলাপাঙ্গতরঙ্গিতৈরধিকৃপাসারৈর্নতানন্দিনীং

শ্রীশৈলস্থলবাসিনীং ভগবতীং শ্রীমাতরং ভাবয়ে ||২||

ভাবার্থ - যার কস্তূরীতিলক যােগে শােভমান শশিকলা-সমুদ্ভাসিত স্বভাবসুন্দর ললাট, মুখে কর্পূরদ্রব সংযুক্ত স-চূর্ণ খদির-সুরভি তাম্বুল, করুণা- পূরিত অচল অপাঙ্গভঙ্গী দ্বারা প্রণত জনগণের আনন্দবিধায়িনী সেই শ্রীশৈলবাসিনী ভগবতী মাতাকে ভাবনা করি ||২||

রাজন্মত্তমরালমন্দগমনাং রাজীবপত্রেক্ষণাং

রাজীবপ্রভবাদিদেবমকুটৈ রাজৎপদাম্ভোরুহাম্ ।

রাজীবায়তমন্দমণ্ডিতকুচাং রাজাধিরাজেশ্বরীং

শ্রীশৈলস্থলবাসিনীং ভগবতীং শ্রীমাতরং ভাবয়ে ||৩||

ভাবার্থ - যার সুঠাম ধীরগমন মত্তমরালগমনতুল্য, নয়ন পদ্মপলাশ সদৃশ, পাদপদ্ম পদ্মযোনিপ্রমুখ দেবতাগণের মুকুটনিচয়ে রঞ্জিত এবং স্তনযুগল প্রফুল্লকমলবৎ আয়ত ও ময়ূরপুচ্ছে ভূষিত, সেই শ্রীশৈলস্থলবাসিনী শ্রীমাতা ভগবতী রাজরাজেশ্বরীকে ভাবনা করি ||৩||

ষট্তারাং গণদীপিকাং শিবসতীং ষড়্বৈরিবর্গাপহাং

ষট্চক্রান্তরসংস্থিতাং বরসুধাং ষড়্যোগিনীবেষ্টিতাম্ ।

ষট্চক্রাঞ্চিতপাদুকাঞ্চিতপদাং ষড়্ষভাবগাং ষোড়শীং

শ্রীশৈলস্থলবাসিনীং ভগবতীং শ্রীমাতরং ভাবয়ে ||৪||

ভাবার্থ - যিনি ষট্তারা ও গণদীপিকা নামে কথিত, যিনি মহাদেবের সহধর্মিণী, যিনি কামাদি ষড়রিপুকে সংহার করেন, ( জীবশরীরস্থিত ) ষট্চক্রাভ্যন্তরে যার অধিষ্ঠান, যিনি পরমামৃতরূপিণী, ( ডাকিনী, রাকিণী, লাকিনী, সাকিনী, শাকিনী, ও হাকিনী ) এই ছয়টি যােগিনী যাকে পরিবেষ্টন করে রয়েছে, ( ষােড়শদল চক্র, অষ্টদল চক্র, চতুর্দশার চক্র, বহির্দশার চক্র, অন্তর্দশার চক্র এবং অষ্টার চক্র) এই ষটচক্রস্থিত পাদুকাতে যার পদম্বয় বিদ্যমান, যিনি ষড়ভাবের ( জন্ম, বিদ্যমানতা, বৃদ্ধি, হ্রাস, পরিবর্তন ও ধ্বংস এই ছয় অবস্থায় ) অধিষ্ঠাত্রী, এবং যিনি ষোড়শীরূপা, সেই শৈলবাসিনী ভগবতী মাতাকে আমি ভাবনা করি ||৪||

( বিশেষ কথা – ষট্তারা–ছয়টি তার অর্থাৎ প্রণব বাহার মন্ত্রমূর্তিতে বিদ্যমান, তিনি ষট্তারা। তন্ত্রশান্ত্রে এ বিষয়ে প্রমাণ, যথা-

শ্রীপরা বাগভবাদ্যৈশ্চ ঈশ্বরী তারমন্মথৈঃ।

আদ্যভুতৈর্ভিদ্যমানা সুন্দরী ষড়্ বিধা ভবেৎ ॥

ত্রিপুরসুন্দরীর বীজমন্ত্রপূর্ণ এই তান্ত্রিক বচনের ব্যাখ্যা করব না, কেবল 'ষট্' আর 'তার' এই দুইটি পদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য প্রমাণ উদ্ধত হইল ।

গণদীপিকা – গণ এবং কূট একার্থক শব্দ ; ত্রিপুরসুন্দরীমন্ত্র ত্রিকুট, 'দীপনী' বিদ্যা প্রত্যেক কুটেরই আছে। মন্ত্রসমূহের দীপ্তি সম্পাদন কযরেন বলে এই বিদ্যার নাম 'দীপনী', মন্ত্রের বীর্য্যই দীপ্তি। তন্ত্রশান্ত্রে কথিত হয়েছে;-

‘এষা তু দীপনী বিদ্যা অজপা প্রাণরূপিণী

********************************

দীপনেনৈৰ যুক্তা সর্বে মন্ত্রা বীর্ঘ্যবস্তো ভবন্তি।’  ত্রিকুটমন্ত্রের পূর্বে উচ্চারণীয় পঞ্চাক্ষর প্রভৃতি মন্ত্র দীপনী বিদ্যা। মন্ত্রগণের দীপ্তিবিধায়িনী বলে দীপনীই গণদীপিকা নামে গৃহীত হয়েছে। )

শ্রীনাথাদৃতপালিতাত্রিভুবনাং শ্রীচক্রসঞ্চারিণীং

জ্ঞানাসক্তমনোজযৌবনলসদ্গন্ধর্বকন্যাদৃতাম্ ।

দীনানামাতিবেলভাগ্যজননীং দিব্যাম্বরালঙ্কৃতাং

শ্রীশৈলস্থলবাসিনীং ভগবতীং শ্রীমাতরং ভাবয়ে ||৫||

ভাবার্থ - শ্রীশব্দযোগে 'নাথ'সমূহস্বরূপ স্থানে যিনি আদৃতা, ( সংস্থার প্রাপ্ত ) ত্রিভুবনকে যিনি ( মূর্তি প্রদান করে ) পালন করেন, শ্রীচক্রে যার সঞ্চার, জ্ঞান-রত কামদেব এবং যুবতী গন্ধর্ব্বকন্যাগণ যার অর্চনা করেন, যিনি দরিদ্রগণেরও অত্যন্ত সৌভাগ্য-সম্পাদন করেন, দিব্য-বসনভূষণ সজ্জিতা সেই শ্রীশৈলস্থলবাসিনী ভগবতী শ্রীমাতাকে ভাবনা করি ||৫||

লাবণ্যাধিকভূষিতাঙ্গলতিকাং লাক্ষালসদ্রাগিণীং

সেবায়াতসমস্তদেববনিতাং সীমন্তভূষান্বিতাম্ ।

ভাবোল্লাসবশীকৃতপ্রিয়তমাং ভণ্ডাসুরচ্ছেদিনীং

শ্রীশৈলস্থলবাসিনীং ভগবতীং শ্রীমাতরং ভাবয়ে ||৬||

ভাবার্থ - যার অঙ্গলতিকা অসামান্য লাবণ্যে বিমণ্ডিত, সেবার্থ সমাগত সমস্ত দেববনিতাগণের সীমন্তভূষণে রঞ্জিত হওয়াতে যার চরণস্থ লাক্ষারাগ অধিকতর উজ্জ্বল, ভাবাবেশে প্রিয়তম মহাদেবকে যিনি একান্ত বশীভূত করেছেন, সেই ভণ্ডাসুরবিমর্দিনী শ্রীশৈলস্থলবাসিনী ভগবতী মাতাকে ভাবনা করি ||৬||

ধন্যাং সোমবিভাবনীয়চরিতাং ধারাধরশ্যামলাং

মুন্যারাধনমেধিনীং সুযুবতীং মুক্তিপ্রদানব্রতাম্ ।

কন্যাপূজনসুপ্রসন্নহৃদয়াং কাঞ্চীলসন্মধ্যমাং

শ্রীশৈলস্থলবাসিনীং ভগবতীং শ্রীমাতরং ভাবয়ে ||৭||

ভাবার্থ - যিনি ধন্যা, যার চরিত্র সােম-বিভাবনীয়, যিনি মেঘসদৃশ শ্যামকান্তি, মুনিগণের আরাধনা-সামর্থ্যের বৃদ্ধিদায়িনী, পূর্ণযুবতী ও মুক্তিদানপরায়ণা ; কুমারী পূজা করলে যার হৃদয় প্রসন্ন হয়, যার মধ্যভাগ কাঞ্চীভূষণশােভিত, সেই শ্রীশৈলস্থলবাসিনী ভগবতী শ্ৰীমাতাকে ভাবনা করি ||৭||

কর্পূরাগরুকুঙ্কুমাঙ্কিতকুচাং কর্পূরবর্ণস্থিতাং

কৃষ্টোৎকৃষ্টসুকৃষ্টকর্মদহনাং কামেশ্বরীং কামিনীম্ ।

কামাক্ষীং করুণারসার্দ্রহৃদয়াং কল্পান্তরস্থায়িনীং

শ্রীশৈলস্থলবাসিনীং ভগবতীং শ্রীমাতরং ভাবয়ে ||৮||

ভাবার্থ - যার স্তনদ্বয় কর্পূর, অগুরু ও কুঙ্কুমে লিপ্ত, যিনি কর্পূরবর্ণস্থিতা, কৃষ্ট ( বিপ্রকৃষ্ট সঞ্চিত ), উৎকৃষ্ট ( প্রারদ্ধ ) এবং সুকৃষ্ট ( সন্নিহিত ক্রিয়মাণ ) ত্রিবিধকর্ম্ম যার কৃপায় দগ্ধ হয়ে যায়, যিনি কামেশ্বরী এবং কামিনীশক্তি, যিনি কামাক্ষী, যার হৃদয় করুণারসে আর্দ্র, কল্পান্তরেও যার স্থিতি অব্যাহত, সেই শ্রীশৈলস্থলবাসিনী ভগবতী শ্রীমাতাকে ভাবনা করি ||৮||

গায়ত্রীং গরুড়ধ্বজাং গগনগাং গান্ধর্বগানপ্রিয়াং

গম্ভীরাং গজগামিনীং গিরিসুতাং গন্ধাক্ষতালঙ্কৃতাম্ ।

গঙ্গাগৌত্মগর্গসন্নুতপদাং গাং গৌতমীং গোমতীং

শ্রীশৈলস্থলবাসিনীং ভগবতীং শ্রীমাতরং ভাবয়ে ||৯||

ভাবার্থ - যিনি গায়ত্রীস্বরূপা ( ব্রাহ্মীশক্তি ), গরুড়ধ্বজা ( বৈষ্ণবীশক্তি ), যিনি শূন্যচারিণী ও গন্ধর্বকৃত গানে প্রীতিমতী, যার মূর্তি গম্ভীর, গতি গজেন্দ্রের ন্যায়, যিনি পর্ব্বতরাজের কন্যা ( শৈবীশক্তি ) ও চন্দনাক্ষতে বিমণ্ডিতা, গঙ্গা, গৌতম ও গর্গ যার চরণ বন্দনা করেন এবং যিনি বসুমতী, গােদাবরী ও গােমতীরূপিণী, আমি সেই শ্রীশৈলস্থলবাসিনী ভগবতী শ্রীমাতাকে ভাবনা করি ||৯||

|| ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্যস্য শ্রীমচ্ছঙ্কর ভগবতঃ কৃতৌ উমামহেশ্বর ও শ্রীশৈলভ্রমরাম্বাস্তুতি সম্পূর্ণম্ ||

ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্য শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য বিরচিত উমামহেশ্বর ও শ্রীশৈলভ্রমরাম্বাস্তুতি সমাপ্ত।

Thursday, 23 June 2022

ব্রহ্মের স্বরূপলক্ষণ ও তটস্থলক্ষণ কি?



বস্তুর স্বরূপই বস্তুর স্বরূপলক্ষণ, যা বস্তুর স্বরূপ হয়ে অন্য বস্তু হতে সেই বস্তুকে ভিন্নভাবে বোধ করায়, তাই স্বরূপলক্ষণ। যেমন— "সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম", ইহা ব্রহ্মের স্বরূপলক্ষণ; কারণ সত্যাদি পদার্থ ব্রহ্মের স্বরূপ হয়ে অন্য বস্তু হতে ব্রহ্মকে ভিন্নভাবে বোধ করায়।

আবার লক্ষ্যবস্তু যতকাল থাকে, ততকাল তার সাথে না থেকে যা লক্ষ্যবস্তুকে অন্য বস্তু হতে ভিন্নভাবে বোধ করায়, তাই তটস্থলক্ষণ। যেমন— পারমার্থিক দৃষ্টিতে জগৎ মিথ্যা হওয়ায় সেই কল্পিত জগতের কর্তৃত্ব ব্রহ্মে পরমার্থতঃ না থাকলেও, ব্যবহারিক দৃষ্টিতে জগতের জন্মাদির কারণ হওয়া-রূপ লক্ষণটি অন্য বস্তু হতে ভিন্নভাবে ব্রহ্মকে বোধ করায় বলে ইহা ব্রহ্মের তটস্থলক্ষণ।

Saturday, 11 June 2022

আর্যসমাজের দয়ানন্দ সরস্বতী প্রচারিত ভ্রান্তমত ত্রৈতবাদ খণ্ডনঃ- (পর্ব-০২)

 


বিগতপর্বেই বলিয়াছি এই অপ্রামাণিক ভ্রান্ত মতবাদ খণ্ডনে আমার বিন্দুমাত্র রুচিও নাই, কিন্তু বর্তমানে মাত্রাতিরিক্ত হারে কিছু অর্বাচীন সংগঠন শঙ্করাদি আচার্যের নিন্দা ও বশিষ্ঠ-ব্যাসাদি গুরুপরম্পরার সনাতন অদ্বৈতবাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করিয়াছে, তাই এই দার্শনিক খণ্ডনগুলি ধারাবাহিকভাবে পর্ব আকারে লিখছি। অদ্য আলোচ্য বিষয় "ঈশ্বর সাকার হইতে পারে না ও অবতীর্ণ হইতে পারে না" এই শ্রুতি ও স্মৃতি বিরুদ্ধ মতের নিরাকরণ।

পূর্বপক্ষঈশ্বর নিরাকার। যাহা সাকার অর্থাৎ শরীর বিশিষ্ট তাহা ঈশ্বর নহে।

সিদ্ধান্তপারমার্থিক দৃষ্টিতে তৎপদের লক্ষ্য নিত্যশুদ্ধবুদ্ধমুক্তস্বরূপ জ্ঞেয় নির্গুণ রূপবিহীন ব্রহ্ম সিদ্ধ হন, কিন্তু ব্যবহারিক দৃষ্টিতে তিনি মায়া নামক স্বীয় শক্তিযোগে ক্রমমুক্তি ও উপাসনার জন্য উপাধিরূপ নিমিত্তবশত তৎপদের বাচ্য সগুণ সর্বজ্ঞ সর্বশক্তিমান এবং সাকারূপেও অঙ্গীকৃত হন। ব্রহ্মের সাকারতা একেবারে অস্বীকার করা যায় না।

শঙ্কাকেন ঈশ্বরের সাকারতা একেবারে অস্বীকার করা যায় না?

উত্তরযেহেতু প্রত্যেক বিদ্যাতে ব্রহ্মের বিভিন্ন আকারসকল উপদিষ্ট হইতেছে, যথাঃ- 'চারিটী চরণযুক্ত ব্রহ্ম'-(ছান্দোগ্য উপনিষদ্-৩।১৮।২), 'ষোলটী কলাযুক্ত ব্রহ্ম'-(ছান্দোগ্য উপনিষদ্-৪।৫।২), 'বামনী প্রভৃতি লক্ষণযুক্ত ব্রহ্ম'-(ছান্দোগ্য উপনিষদ্-৪।১৫।৩), 'বৈশ্বানরশব্দের দ্বারা বর্ণিত ত্রৈলোক্যশরীর ব্রহ্ম'-(ছান্দোগ্য উপনিষদ্-৫।১৮।২) ইত্যাদি এই জাতীয় শ্রুতি রহিয়াছে সেইহতু ব্রহ্মের সবিশেষতাও অঙ্গীকৃত হইতেছে। কিন্তু শঙ্কা হইল, আমাদের সিদ্ধান্ত তো ব্রহ্মের সবিশেষ ও নির্বিশেষ উভয়াত্মকতা সম্ভব নহে, ব্রহ্ম নির্বিশেষই। এই পূর্বসমাধানও বিরুদ্ধ নহে, যেহেতু ব্রহ্মের আকারভেদ উপাধিকৃত। আর শাস্ত্র প্রত্যেকটী উপাধিভেদে ব্রহ্মের অভেদতাই অর্থাৎ অভিন্নতাই শ্রবণ করাইতেছেন, যথা-

যশ্চাযমস্যাং পৃথিব্যাং তেজোময়োমৃতময়ঃ পুরুষো যশ্চাযমধ্যাত্মং শারীরস্তেজোমযোমৃতময়ঃ পুরুষোযমেব স যোয়মাত্মা'-(বৃহদারণ্যক উপনিষদ্-২।৫।১)

'এই পৃথিবীতে যিনি এই তেজোময় অমৃতময় পুরুষ এবং যিনি শরীরসম্বন্ধী ও শরীরে অবস্থিত তেজোময় অমৃতময় পুরুষ, ইনিই তিনি, যিনি এই আত্মা' ইত্যাদি।

পূর্বপক্ষঈশ্বর সাকার হইলে তিনি পরিমিত শক্তিসম্পন্ন, দেশ-কাল-বস্তুসমূহে পরিচ্ছিন্ন এবং ক্ষুধা-তৃষ্ণা-ছেদন-ভেদন, শীতোষ্ণ ও জ্বরপীড়াদিযুক্ত হইবেন। অর্থাৎ স্বরূপের নাশ হইবে।

সংশয়কিপ্রকারে স্বরূপের নাশ ব্যতিরেকেই এক ব্রহ্মে অনেকপ্রকার আকারবিশিষ্ট সৃষ্টি হইবে?

সিদ্ধান্তীর উত্তরযেহেতু-'ন তত্র রথা ন রথযোগা ন পন্থানো ভবন্ত্যথ রথান্রথযোগান্পথঃ সৃজতে'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪/৩/১০)

অর্থাৎ "সেখানে (স্বপ্নে) রথসকল থাকে না, অশ্বসকল থাকে না এবং পথসকল থাকে না অথচ তিনি রথসকল অশ্বসকল ও পথসকল সৃষ্টি করেন", ইত্যাদি শ্রুতিবাক্যের দ্বারা স্বপ্নদর্শী এক আত্মাতেও স্বরূপের নাশ ব্যতিরেকেই অনেকপ্রকার আকারবিশিষ্ট সৃষ্টি পঠিত হইতেছে। আর লোকমধ্যেও দেবতা প্রভৃতিতে এবং মায়াবী প্রভৃতিতে স্বরূপের নাশ ব্যতিরেকেই হস্তী ও অশ্ব প্রভৃতি বিচিত্র সৃষ্টিসকল পরিদৃষ্ট হইতেছে। এইপ্রকারে এক ব্রহ্মেও স্বরূপের নাশ ব্যতিরেকেই অনেকপ্রকার আকারবিশিষ্ট সৃষ্টি হইবে।

আর তাছাড়া বিভিন্ন প্রকার অর্থ প্রতিপাদক পিতা, পুত্র, ভ্রাতা, জামাতা ইত্যাদি শব্দসকল এক দেবদত্তকে বুঝাইলেও যেমন বিরোধ হয় না, তদ্রূপ যথার্থ বচনরূপ লৌকিক অর্থেই নিরূঢ় সত্যাদিশব্দ অখণ্ডকেই লক্ষ্য করে অর্থাৎ লক্ষণাবৃত্তিদ্বারা অখণ্ড ব্রহ্মকেই সমর্পণ করে।

ইঁহার যে অপারমার্থিক সবিশেষস্বরূপতা, তাহাকে অভিপ্রায় করিয়া মোক্ষশাস্ত্রসকলে 'জলমধ্যগত সূর্য্যাদি প্রতিবিম্বের ন্যায়' এই উপমা পরিগৃহীত হইতেছে,যথা-

'যেমন জ্যোতিঃস্বরূপ এই সূর্য্য এক হইলেও বিভিন্ন জলকে অনুগমনকরতঃ বিভিন্ন পাত্রস্থ জলে প্রতিবিম্বিত হইয়া বহুপ্রকার হইয়া থাকেন, এইপ্রকারে এই স্বয়ংপ্রকাশ দেব জন্মরহিত আত্মা, মায়ারূপ উপাধির দ্বারা ক্ষেত্রসকলে অর্থাৎ মায়ার পরিণামভূত দেহেন্দ্রিয়াদি সংঘাত সকলে অনুগমন করতঃ প্রতিবিম্বিত হইয়া বিভিন্নরূপে কৃত বা প্রতিভাত হন।'-(ব্রহ্মবিন্দু উপনিষদ্-১২)

'যেহেতু প্রাণিগণের এই একই আত্মা বিভিন্ন প্রাণীতে বিশেষভাবে অবস্থিত আছেন, তিনি জলমধ্যস্থ চন্দ্রের ন্যায় একরূপে ও বহুরূপে পরিদৃষ্ট হন।'-(ঐ) ইত্যাদি এই সকল স্থলেও 'তাঁহার ঔপাধিক সবিশেষতা প্রদর্শিত হইয়াছে।'

পূর্বপক্ষনিত্য ঈশ্বর অবতীর্ণ হইতে পারেন না, অর্থাৎ তাহার জন্ম সম্ভব নহে।

সিদ্ধান্ত"ধর্ম্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে"-(ভগবদ্গীতা-৪/৮) ধর্ম্মের সম্যক্ স্থাপনের জন্য প্রতিযুগে আমি সম্ভাবিত হই অর্থাৎ অবতীর্ণ হই।

সংশয়নিত্য ঈশ্বরের জন্ম কিরূপে সম্ভব?

সিদ্ধান্তীর উত্তরশ্রীভগবান বলিতেছেন-"অজোহপি সন্নব্যয়াত্মা ভূতানামীশ্বরোহপি সন্। প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া"-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৪/৬)

অর্থাৎ আমি অজ অর্থাৎ জন্মরহিত হইয়াও; অব্যয়াত্মা অর্থাৎ যাঁহার জ্ঞানশক্তির ক্ষয় নাই এইরূপ অক্ষীণ জ্ঞানশক্তি স্বভাব হইয়াও; ব্রহ্মাদি থেকে তৃণ পর্য্যন্ত সর্ব্বভূতের ঈশ্বর হইয়াও; আমার যে স্বপ্রকৃতি, অর্থাৎ ত্রিগুণাত্মিকা বৈষ্ণবী মায়া, সমস্ত জগৎ যাহার বশে বর্তমান, যদ্দ্বারা মোহিত হইয়া লোকে নিজের আত্মা বাসুদেবকে জানিতে পারে না, সেই নিজ প্রকৃতিতে অধিষ্ঠিত হইয়া অর্থাৎ তাঁহাকে বশীভূত করিয়া আমি সম্ভাবিত হই অর্থাৎ আত্মমায়ার দ্বারা যেন লোকবৎ দেহধারণ করিয়া জন্মগ্রহণ করি; কিন্তু পরমার্থতঃ নহে।

ঋণ- ভগবান শঙ্করাচার্যকৃত শারীরকমীমাংসা ও শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ভাষ্য ও শ্রীভারতী তীর্থকৃত বৈয়াসিক ন্যায়মালা।

Thursday, 9 June 2022

স্বপ্নসাক্ষী ও মায়াবীর দৃষ্টান্তাবলম্বনে ব্রহ্মের বিবর্ত্তোপাদানতা প্রতিপাদনঃ-

 


ভগবান সূত্রকার স্বপ্নের প্রকাশক সাক্ষিচৈতন্যকে দৃষ্টান্তরূপে গ্রহণদ্বারা ব্রহ্মের বিবর্ত্তোপাদানতাকে দৃঢ়করতঃ অদ্বৈতবাদকে পরিস্ফুট করিতেছেন-

আত্মনি চেব বিচিত্রাশ্চ হি৷৷- (ব্রহ্মসূত্র-২.১.১৮)

ভগবান শঙ্করাচার্য ভাষ্যে বলিতেছেন—কিপ্রকারে স্বরূপের নাশ ব্যতিরেকেই এক ব্রহ্মে অনেকপ্রকার আকারবিশিষ্ট সৃষ্টি হইবে?

যেহেতু-'ন তত্র রথা ন রথযোগা ন পন্থানো ভবন্ত্যথ রথান্রথযোগান্পথঃ সৃজতে'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪/৩/১০)

অর্থাৎ "সেখানে (—স্বপ্নে) রথসকল থাকে না, অশ্বসকল থাকে না এবং পথসকল থাকে না অথচ তিনি রথসকল অশ্বসকল ও পথসকল সৃষ্টি করেন", ইত্যাদি শ্রুতিবাক্যের দ্বারা স্বপ্নদর্শী এক আত্মাতেও স্বরূপের নাশ ব্যতিরেকেই অনেকপ্রকার আকারবিশিষ্ট সৃষ্টি পঠিত হইতেছে। আর লোকমধ্যেও দেবতা প্রভৃতিতে এবং মায়াবী প্রভৃতিতে স্বরূপের নাশ ব্যতিরেকেই হস্তী ও অশ্ব প্রভৃতি বিচিত্র সৃষ্টিসকল পরিদৃষ্ট হইতেছে। এইপ্রকারে এক ব্রহ্মেও স্বরূপের নাশ ব্যতিরেকেই অনেকপ্রকার আকারবিশিষ্ট সৃষ্টি হইবে।

 

Monday, 6 June 2022

"উপনিষৎ বেদ নহে", এই ভ্রান্তমতের খণ্ডনঃ—

 


পূর্বপক্ষঃ- শুধুমাত্র সংহিতা ভাগই বেদ, উপনিষৎ বেদ নহে।

সিদ্ধান্তঃ- বেদের গুহ্যভাগ উপনিষৎ।

শঙ্কা- কি হেতু?

উত্তর- 'তদ্ বেদগুহ্যোপনিষৎসু গূঢ়ং', স্বয়ং এই শ্রুতিই বলিতেছেন বেদের গুহ্যভাগ উপনিষৎ। কৃষ্ণযজুর্বেদীয় শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎ এর পঞ্চম অধ্যায়ে বর্ণিত আছে-

তদ্ বেদগুহ্যোপনিষৎসু গূঢ়ং

তদ্ ব্রহ্মা বেদতে ব্রহ্মযোনিম্ ।-(শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎ-৫।৬)

অর্থাৎ বেদগুহ্য অর্থ উপনিষৎ। যে আত্মতত্ত্বের প্রস্তাব চলিতেছে, তাহা বেদের গুহ্যভাগ উপনিষৎসমূহে গূঢ় অর্থাৎ প্রচ্ছন্নভাবে নিহিত আছে। বেদই এইসকল বিষয়ে একমাত্র প্রমাণ এইকারণে উহা ব্রহ্মযোনি। ব্রহ্মা-হিরণ্যগর্ভই সেই পূর্ব্বপ্রস্তাবিত আত্মার স্বরূপ জানেন, অথবা হিরণ্যগর্ভ নামক ব্রহ্মের যোনি, কিংবা ব্রহ্ম অর্থ বেদ, তাহার যোনি-ব্রহ্মযোনি।

Sunday, 5 June 2022

আত্মাশ্রিতা মায়া তিন প্রকারে বিনাশ প্রাপ্ত হয়ঃ-

 


শ্রুতিতে এই বিষয়ে স্পষ্ট আলোচনা হইয়াছে। যথা—

"শাস্ত্রেণ ন স্যাৎ পরমার্থদৃষ্টিঃ, কার্য্যক্ষমং পশ্যতি চাপরোক্ষম্। প্রারব্ধনাশাৎ প্রতিভাসনাশঃ, এবং ত্রিধা নশ্যতি চাত্মমায়া।।"- (বরাহ উপনিষৎ-২/৬৯)

১. শাস্ত্রের দ্বারা অর্থাৎ বেদান্তশাস্ত্র অধ্যয়নজনিত ব্রহ্মাত্মবিষয়ক পরোক্ষ জ্ঞানের দ্বারা, মায়া ও তৎকার্য্য জগৎপ্রপঞ্চে পরমার্থ দৃষ্টি থাকে না। অর্থাৎ 'মায়া ও তৎকার্য্য জগৎ পরমার্থতঃ আছে' এইপ্রকার বুদ্ধি বিনষ্ট হয়।

২. আর অবিদ্যাধ্বংসী ব্রহ্মাত্মবিষয়ক অপরোক্ষকে জ্ঞানী কার্য্যক্ষমরূপে অর্থাৎ মায়া, তৎকার্য্য জগৎ ও বন্ধনের বাধকরূপে দর্শন করেন।

৩. প্রারব্ধের নাশ হইলে প্রতিভাস অর্থাৎ ব্রহ্মাত্মবিষয়ক অপরোক্ষ জ্ঞানের দ্বারা আবরণ ও বিক্ষেপশক্তিযুক্তা মায়ার নাশ হইলেও, প্রারব্ধ কর্ম্মরূপ প্রতিবন্ধকবশতঃ বিক্ষেপশক্তির অবিনষ্ট অংশবিশেষের বলে ব্রহ্মজ্ঞের দৃষ্টিতে 'দগ্ধ বস্ত্রের ন্যায়' যে মায়া ও তৎকার্য্য জগৎপ্রপঞ্চের প্রতীতি হয়, তাহা বিনষ্ট হয়।

এইরূপে আত্মাশ্রিতা মায়া তিন প্রকারে বিনাশ প্রাপ্ত হয়।

Friday, 3 June 2022

আর্যসমাজের দয়ানন্দ সরস্বতী প্রচারিত ভ্রান্তমত ত্রৈতবাদ খণ্ডনঃ- (পর্ব-০১)

অদ্য আলোচ্য বিষয়, দয়ানন্দ সরস্বতী প্রচারিত অপ্রামাণিক ত্রৈতবাদসম্মত সিদ্ধান্ত 'ঈশ্বর কেবলমাত্র নিমিত্তকারণ, উপাদানকারণ নহে', এই মতবাদ নিরাকরণ। এই ভ্রান্তমতের সমালোচনায় আমার খুব একটা রুচি নাই, তবে ইদানিং কিছু অর্বাচীন সংগঠন শঙ্করাদি আচার্যের নিন্দাপূর্বক শাশ্বত অদ্বৈতবাদ খণ্ডনের দুঃসাহস প্রদর্শন করিতেছেন, তাই আমি এই কর্ম্মে প্রবৃত্ত হইতেছি।

পূর্বপক্ষ—ব্রহ্ম কেবল নিমিত্তকারণ, আর ব্রহ্ম হইতে ভিন্ন প্রকৃতি উপাদানকারণ।

সিদ্ধান্ত—এইপ্রকার পূর্ব্বপক্ষ প্রাপ্ত হইলে আমরা বলিতেছি—ব্রহ্মকে প্রকৃতিরূপেও, অর্থাৎ উপাদানকারণরূপেও অঙ্গীকার করিতে হইবে এবং নিমিত্তকারণরূপেও 'অঙ্গীকার করিতে হইবে'। তিনি কেবল নিমিত্তকারণই নহেন।

শঙ্কা— কেন ঈশ্বরের কেবল নিমিত্তকারণমাত্রতা মান্য নহে?

সিদ্ধান্ত—এইহেতু অবৈদিক মতের দ্বারা বেদান্তসমন্বয়ে এইপ্রকার বিরোধ হয়ে পড়ে বলিয়া উত্তর কথিত হইতেছে—"পত্যুরসামঞ্জস্যাৎ" অর্থাৎ— পতির অর্থাৎ ঈশ্বরের প্রধান ও পুরুষের প্রেরকরূপে জগৎকারণতা (-জগতের নিমিত্তকারণতা) যুক্তিসঙ্গত নহে। তাহাতে হেতু কি? উত্তর— যেহেতু সামঞ্জস্য হয় না। আচ্ছা, অসামঞ্জস্যটী কি? হীন মধ্যম ও উত্তমভাবে (—যথাক্রমে কীটপতঙ্গাদি, মনুষ্য ও দেবতা প্রভৃতিরূপে) প্রাণীসকলের ভেদের বিধানকর্ত্তা (—উচ্চাবচ প্রাণীর সৃষ্টিকর্ত্তা) ঈশ্বরের অনুরাগ ও দ্বেষ প্রভৃতি দোষ হইয়া পড়ে বলিয়া আমাদিগের ন্যায় তাঁহার অনীশ্বরতা হইয়া পড়িবে। অর্থাৎ বৈষম্যাদি দোষ হইয়া পড়ে বলিয়া ব্রহ্মের কেবল নিমিত্তকারণমাত্রতা যুক্তিসঙ্গত নহে।

সংশয়— আচ্ছা, আমরা তাহা হইলে এই দোষ কিপ্রকারে পরিহার করিয়াছি?

সিদ্ধান্ত— যেহেতু 'ঈশ্বর প্রাণিগণের কর্ম্মকে অপেক্ষা করেন', ইহাই আমরা বলিতেছি। সেই অঙ্গীকারের প্রতি বেদই আমাদের প্রমাণ। আর যদি তোমরাও বেদকে অঙ্গীকার কর, তাহা হইলে বেদপ্রতিপাদিত ঈশ্বর স্বীকৃত হইলে "বহু স্যাং প্রজায়েয়"-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬/২/৩) "বহু হইব, প্রকৃষ্ট রূপে উৎপন্ন হইব", এই সামবেদীয় ছান্দোগ্য শ্রুতির বিরোধবশতঃ ঈশ্বরের মাত্র নিমিত্তকারণতা তোমাকেও পরিত্যাগ করিতে হইবে।

শঙ্কা— 'ব্রহ্মই অভিন্ননিমিত্তোপাদান কারণ' তাহাতে হেতু কি?

সিদ্ধান্ত— তদুত্তরে বলিতেছেন-'প্রতিজ্ঞাদৃষ্টান্তানুপরোধাতৎ' অর্থাৎ "যেহেতু প্রতিজ্ঞা ও দৃষ্টান্তের সঙ্কোচ হয় না"। পরিষ্কারভাবে যদি বলি, এইপ্রকারে ব্রহ্ম উপাদানকারণ ও নিমিত্তকারণ উভয়ই হইলে শ্রুতিতে বর্ণিত প্রতিজ্ঞা ও দৃষ্টান্ত বাধিত হয় না। প্রতিজ্ঞা এইপ্রকার—

'উত তমাদেশমপ্রাক্ষ্যো যেনাশ্রুতং শ্রুতং ভবত্যমতং মতমবিজ্ঞাতং বিজ্ঞাতম্'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬/১/২) "তুমি কি সেই আদেশটী জিজ্ঞাসা করিয়াছিলে, যাহার দ্বারা অশ্রুত বিষয় বিজ্ঞাত হয়", ইত্যাদি। উক্ত শ্রুতিবাক্যে বিজ্ঞাত একটীর দ্বারা, অবিজ্ঞাত হইলেও অন্য সমস্ত বিজ্ঞাত হয়, এই প্রকার অর্থ প্রতিভাত হইতেছে। আর সেই সর্ব্ববিজ্ঞান উপাদানকারণবিষয়ক জ্ঞান হইলে হয় সম্ভব, যেহেতু কার্য্যবস্তু উপাদানকারণ হইতে অভিন্ন।

সংশয়—কিন্তু নিমিত্তকারণবিষয়ক জ্ঞান হইতে সর্ব্ববিজ্ঞান কেন হয় না?

সিদ্ধান্ত— তদুত্তরে বলিতেছেন—কিন্তু নিমিত্তকারণ হইতে অভিন্নতা কার্য্যবস্তুর নাই, যেহেতু তক্ষা (—সুত্রধর) হইতে প্রাসাদের ভিন্নতা লোকমধ্যে পরিদৃষ্ট হয়। আবার, 'যথা সোম্যৈকেন মৃৎপিণ্ডেন সর্বং মৃন্মযং বিজ্ঞাতং স্যাদ্বাচারম্ভণং বিকারো নামধেযং মৃত্তিকেত্যেব সত্যম্'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬/১/৪) অর্থাৎ "হে সৌম্য, যেমন একটী মৃৎপিন্ডের দ্বারা সমস্ত মৃন্ময় বস্তু বিজ্ঞাত হয়, কারণ যাহা বিকার (—কার্য্যবস্তু), তাহা বাগবলম্বনে অবস্থিত নামমাত্র, কেবল মৃত্তিকাই সত্য", ইত্যাদি দৃষ্টান্তও উপাদানকারণবিষয়েই পঠিত হইতেছে।

এইরূপে, 'একেন লোহমণিনা সর্বং লোহমযং বিজ্ঞাতং স্যাৎ' 'একেন নখনিকৃন্তনেন সর্বং কার্ষ্ণাযসং বিজ্ঞাতং স্যাৎ'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬/১/৫,৬) "একটী লোহমণির (—সুবর্ণপিন্ডের) দ্বারা সুবর্ণময় সমস্ত বস্তু বিজ্ঞাত হয়" এবং "একটী নখকৃন্তনের (—নরুণের অর্থাৎ লৌহপিন্ডের) দ্বারা লৌহের পরিণামভূত সমস্ত বস্তু বিজ্ঞাত হয়" ইত্যাদি দৃষ্টান্তসকলও উপাদানকারণ বিষয়েই পঠিত হইতেছে।

এইরূপে অন্যত্রও (—শ্রুতির অন্য শাখাতেও) ''কস্মিন্নু ভগবো বিজ্ঞাতে সর্বমিদং বিজ্ঞাতং ভবতি'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-১/১/৩) ইতি প্রতিজ্ঞা; 'যথা পৃথিব্যামোষধযঃ সংভবন্তি'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-১/১/৭) ইতি দৃষ্টান্তঃ "হে ভগবন, কোন বস্তুটী বিজ্ঞাত হইলে এই সমস্ত বিজ্ঞাত হয়", এই প্রকার প্রতিজ্ঞা এবং "যেমন পৃথিবী হইতে ধান্য যবাদি ওষধিসকল উৎপন্ন হয়", এইপ্রকার দৃষ্টান্ত 'উপাদানকারণবিষয়েই পঠিত হইতেছে।

এইরূপে অপর শাখাতে 'ইদং সর্বং বিদিতম্' ইতি প্রতিজ্ঞা; 'স যথা দুন্দুভের্হন্যমানস্য ন বাহ্যাঞ্শব্দাঞ্শক্নুযাদ্গ্রহণায দুন্দুভেস্তু গ্রহণেন দুন্দুভ্যাঘাতস্য বা শব্দো গৃহীতঃ'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪/৫/৬,৮) ইতি দৃষ্টান্তঃ' "প্রিয়ে, আত্মা দৃষ্ট শ্রুত বিচারিত ও বিজ্ঞাত হইলে এই সমস্ত বিজ্ঞাত হয়" এইপ্রকার প্রতিজ্ঞা এবং "তাহা (—উক্ত বিষয়ে দৃষ্টান্ত) যমন দুন্দুভি (—দামামা) বাদিত হইতে থাকিলে বাহ্য শব্দসকলকে (—দুন্দুভির বিশেষ শব্দসকলকে) গ্রহণ করিতে পারা যায় না, কিন্তু দুন্দুভির গ্রহণের দ্বারা অথবা দুন্দুভির আঘাতের গ্রহণের দ্বারা শব্দ গৃহীত হয়", এইপ্রকার দৃষ্টান্ত 'উপাদানকারণ বিষয়েই পঠিত হইতেছে'।

এইরূপে প্রত্যেক উপনিষদে প্রতিজ্ঞা ও দৃষ্টান্তকে যথাসম্ভব ব্রহ্মের উপাদানকারণতার সাধনরূপে অবগত হইতে হইবে। এইরূপে প্রতিজ্ঞা ও দৃষ্টান্তের সামঞ্জস্যরূপ লিঙ্গপ্রমাণ বলে ব্রহ্মের উপাদানকারণতা প্রতিপাদিত হইল। এক্ষণে পঞ্চমীবিভক্তিরূপ শ্রুতিপ্রমাণবলে পুনরায় তাহাই প্রতিপাদন করিতেছি—যতো বা ইমানি ভূতানি জাযন্তে'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-৩/১) "যাহা হইতে এই প্রাণিগণ জন্মগ্রহণ করে", ইত্যাদি এইস্থলে "যতঃ" এই পঞ্চমী বিভক্তিটী, "জনিকর্ত্তুঃ প্রকৃতিঃ"(পাণিনী সূত্র-১.৪.৩০) 'জায়মান কার্য্যের যাহা প্রকৃতি—উপাদান, তাহা অপাদান সংজ্ঞা লাভ করে', ব্যাকরণস্মৃতির এই বিশেষ সূত্রবশতঃ প্রকৃতিলক্ষণ (—উপাদানকারণস্বরূপ) অপাদানেই প্রযুক্ত হইয়াছে, বুঝিতে হইবে।

সংশয়—কিন্তু কোন হেতুবশতঃ আত্মার নিমিত্তকারণতা ও উপাদানকারণতা সিদ্ধ হয়?

সিদ্ধান্ত— 'অভিধ্যোপদেশাচ্চ' অভিধ্যানের অর্থাৎ ভাবী সৃষ্টিবিষয়ক সঙ্কল্পের উপদেশও ব্রহ্মের নিমিত্তকারণতা ও উপাদানকারণতা জ্ঞাপন করিতেছে, যথা-

'সোকাময়ত বহু স্যাং প্রজায়েয়'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ ২।৬) অর্থাৎ তিনি কামনা করিয়াছিলেন, "আমি বহু হইব, প্রকৃষ্টরূপে উৎপন্ন হইব", ইত্যাদি শ্রুতি। এবং 'তদৈক্ষত বহু স্যাং প্রজায়েয়'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬/২/৩) অর্থাৎ তাহা (-সেই সৎপদার্থ) ঈক্ষণ করিয়াছিলেন,"আমি বহু হইব, প্রকৃষ্টরূপে উৎপন্ন হইব", ইত্যাদি শ্রুতি। সেইস্থলে অভিধ্যানপূর্ব্বক স্বাধীনভাবে প্রবৃত্তি বর্ণিত হওয়ায় ব্রহ্ম নিমিত্তকারণ, ইহা অবগত হওয়া যাইতেছে। "বহু হইব" এইপ্রকার যে বহু হইবার সঙ্কল্প, তাহা প্রত্যাগাত্মাকে বিষয় করে বলিয়া ব্রহ্ম উপাদানকারণ, ইহা অবগত হওয়া যাইতেছে। 

আর এই হেতুবশতঃও ব্রহ্ম জগতের উপাদান কারণ, যেহেতু সাক্ষাৎভাবে ব্রহ্মকেই কারণরূপে গ্রহণ করিয়া উৎপত্তি ও প্রলয়, এই দুইটী পঠিত হইতেছে, যথা- 'সর্বাণি হ বা ইমানি ভূতানি আকাশাৎ এব সমুত্পদ্যন্তে৷ আকাশং প্রত্যস্তং যন্তি' -(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-১।৯।১) অর্থাৎ "স্থাবরজঙ্গমাত্মক এই সমস্ত ভূতবর্গ আকাশ হইতেই সমুৎপন্ন হয় ও আকাশে অস্তগমন করে।" ইত্যাদি শ্রুতি।

যাহা হইতে যাহা উৎপন্ন হয় এবং যাহাতে প্রলীন হয়, তাহা তাহার উপাদান, ইহা প্রসিদ্ধ, যেমন পৃথিবী ধান্য ও যবাদির উপাদান। উপরোক্ত 'আকাশাৎ এব' শ্রুতিবাক্যগত 'এব' কারণটীর দ্বারা যে অন্য উপাদানের অগ্রহণ সূচিত হয়, তাহাকে ভগবান সূত্রকার 'সাক্ষাৎ' এই পদটীর দ্বারা প্রদর্শন করিতছেন। আর কার্য্যবস্তুর যে প্রলয়, তাহা উপাদান হইতে অন্যস্থলে পরিদৃষ্ট হয় না। সুতরাং আকাশশব্দিত ব্রহ্মবস্তুই জগতের উপাদান, ইহাই নির্ণীত হয়।

সংশয়—আচ্ছা এখন প্রশ্ন হইল, যিনি পূর্ব্বসিদ্ধ (পূর্ব্ব হইতে বিদ্যমান) কর্ত্তৃরূপে অবস্থিত সদ্বস্তু, তাঁহার ক্রিয়মানতা (-জগৎরূপে উৎপন্ন হওয়া) কি প্রকারে সম্পাদন করা যায়?

সিদ্ধান্ত— তদুত্তরে আমরা বলিব-যেহেতু পরিণাম হয়। আত্মা পূর্ব্বসিদ্ধ হইলেও বিশেষ বিকারাত্মকরূপে (মিথ্যা কার্য্যরূপে) নিজেকে পরিণত (বিবর্ত্তিত) করিয়াছিলেন। ঠিক যেমন মৃত্তিকা প্রভৃতি উপাদানকারণ সকলে (ঘটাদি) কার্য্যরূপে পরিণাম উপলব্ধ হয়। 'পরিণামাৎ' তাঁহার অর্থ এই -আর এই হেতুবশতঃ ব্রহ্ম জগতের উপাদান কারণ, যেহেতু-

'সচ্চ ত্যচ্চাভবন্নিরুক্তং চানিরুক্তং চ' -(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২।৬) অর্থাৎ "তিনি সৎ(মূর্ত্ত) এবং ত্যৎ (অমূর্ত্ত) হইলেন। মূর্ত্তামূর্ত্ত অর্থাৎ আত্মাতে স্থিত অনভিব্যক্তি নামরূপ, অন্তঃপ্রবিষ্ট আত্মার নিমিত্ত মূর্ত্তামূর্ত্ত শব্দসংজ্ঞায় অভিব্যক্ত হইল। তিনি নিরুক্ত (পরিচ্ছিন্ন) ও অনিরূক্ত (অপরিচ্ছিন্ন) হইলেন। নিরূক্ত হইতেছে সজাতীয় বিজাতীয় পদার্থসকল হইতে পৃথক্ করিয়া স্থানকালবিশিষ্টরূপে অর্থাৎ 'ইহা তাহা' এই রূপে যাহা কথিত আর অনিরুক্ত হইতছে তাহার বিপরীত।" ইত্যাদি এইরূপ সামানাধিকরণ্যের দ্বারা অর্থাৎ সমান বিভক্তিযুক্ত পদপ্রয়োগের দ্বারা ব্রহ্মেরই বিকারাত্মকরূপে (কার্য্যবস্তুরূপে) পরিণাম (বিবর্ত্ত) শ্রুতিতে পঠিত হইতেছে।

আর এইহেতুবশতঃও ব্রহ্ম জগতের উপাদান কারণ, যেহেতু উপনিষৎ সকলে ব্রহ্ম 'যোনি', এইরূপেও পঠিত হইতেছেন, যথা- 'কর্তারমীশং পুরুষং ব্রহ্মযোনিম্'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-৩.১.৩) অর্থাৎ 'জগতের কর্ত্তা ঈশ্বর পুরুষ ব্রহ্মযোনি অর্থাৎ যিনি ব্রহ্ম আবার সর্ব্বকারণও।'

তদব্যয়ং যদ্ভূতযোনিং পরিপশ্যন্তি ধীরাঃ৷৷-(মুণ্ডক উপনিষৎ-১.১.৬) অর্থাৎ 'এইরূপ লক্ষণবিশিষ্ট ভূতযোনি অর্থাৎ প্রাণিগণের সৃষ্টির কারণস্বরূপ, স্থাবর-জঙ্গমের কারণস্বরূপ পৃথিবীর ন্যায় যাঁহাকে তথা সকলের স্বরূপভূত সেই অব্যয়কে বিবেকিগণ সর্বত্র উপলব্ধি করেন।'ইত্যাদি শ্রুতি।

আর 'যোনি' শব্দটী প্রকৃতির (-উপাদানকারণের) বাচক, ইহা লোকমধ্যে অবগত হওয়া যায়, যথা-'পৃথিবী ওষধি ও বনস্পতিসকলের যোনি' ইত্যাদি। স্ত্রী যোনিও স্বীয় অবয়বের (-শোনিতের) দ্বারা হয় গর্ভের প্রতি উপাদানকারণ। কোন কোন স্থলে 'যোনি' শব্দ স্থানের বাচকরূপেও পরিদৃষ্ট হয়, যথা-

'যোনিষ্ট ইন্দ্র নিষদে অকারি'-(ঋগ্বেদ সংহিতা ১।১০৪।১) অর্থাৎ 'হে ইন্দ্র!, তোমার উপবেশনের জন্য আমি যোনি (-স্থান) নির্ম্মাণ করিয়াছি।'

কিন্তু এখানে 'যথোর্ণনাভিঃ সৃজতে গৃহ্ণতে চ'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-১.১.৭) 'মাকড়সা কোন অন্যকারণের অপেক্ষা না করিয়া নিজেই সৃষ্টি করে অর্থাৎ নিজ শরীর হইতে অভিন্ন তন্তুরাশিকে বাহিরে প্রসারিত করে, আবার সেই সকলকে গ্রহণও করে অর্থাৎ নিজের সহিত একীভূত করিয়া ফেলে।' ইত্যাদি এইজাতীয় বাক্যশেষবশতঃ যোনিশব্দটীর উপাদানকারণতারূপ অর্থ পরিগৃহীত হইতেছে। এইপ্রকারে ব্রহ্মের উপাদানকারণতা প্রকৃষ্টরূপে সিদ্ধ হইল।

এইরূপ মাকড়সার শরীরের তন্তুরূপে পরিণামের ন্যায় ঈশ্বরের উপাধিভূতা মায়ার জগদ্রূপে পরিণামে ঈশ্বরের উপাদানকারণতাও সিদ্ধ হয়। এইরূপে মায়া-শবলিত ঈশ্বররূপ ব্রহ্মই হন জগতের অভিন্ননিমিত্তোপাদান কারণ।.......ইতি।

ঋণ- ভগবান শঙ্করাচার্যকৃত শারীরকমীমাংসা ভাষ্য ও শ্রীভারতী তীর্থকৃত বৈয়াসিক ন্যায়মালা।

Tuesday, 31 May 2022

শঙ্করাচার্যের মত মায়াবাদ ও প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধশাস্ত্র, বিরুদ্ধবাদীদের এই দাবির খণ্ডনঃ-

 


পূর্বপক্ষঃ- পদ্মপুরাণে উত্তরখণ্ডে ৯৩ অধ্যায়ে রুদ্র স্বয়ং দেবীকে বলিতেছেন-রুদ্র উবাচ--শৃণু দেবী প্রবক্ষ্যামি তামসানি যথাক্রমম্।.......নিরীশ্বরেণ বাদেন কৃতং শাস্ত্রং মহত্তরম।।

এইস্থলে দেখা যায়,বলা হইতেছে-

(১) জ্ঞানিগণের পাতিত্যকারক যে সকল তামসশাস্ত্র, তাহারা শৈব, পাশুপত, বৈশেষিক, ন্যায়, সাংখ্য, চার্বাক, বৌদ্ধ ও জৈনশাস্ত্র।

(২) মায়াবাদটি অসৎশাস্ত্র ও প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধশাস্ত্র।

(৩) ইহা ব্রাহ্মণরূপী রুদ্রকর্তৃক কলিতে কথিত।

(৪) ইহাতে শ্রুতিবাক্যের অন্যথা করা হইয়াছে, কর্মের ত্যাগ উপদিষ্ট হইয়াছে, জীব ও ঈশ্বরের ঐক্য উক্ত হইয়াছে, ব্রহ্মকে নির্গুণ বলা হইয়াছে ইত্যাদি।

উত্তরপক্ষঃ- ভগবান শঙ্করের মত মায়াবাদ নহে-কিন্তু ব্রহ্মবাদ বা ঔপনিষদবাদ। এস্থলে ব্রাহ্মণরূপী রুদ্র মায়াবাদপ্রচারকর্তা বলিয়া নির্দেশ থাকায় বৈষ্ণবগণ আচার্য শঙ্কর ও তাঁহার মতবাদ বলিয়া বুঝিয়া থাকেন। কিন্তু শঙ্করসম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিগণ বলেন- ইহাতে আচার্য শঙ্করের ব্রহ্মবাদ লক্ষ্য করা হয় নাই।কারণ, শঙ্করের মতবাদটি মায়াবাদই নহে; উহা ব্রহ্মবাদ। যেহেতু শঙ্কর নিজ বেদান্তসূত্রভাষ্যে (২/২/৯) সূত্রের ভাষ্যে নিজেই বলিয়াছেন- 'জ্ঞানশক্তিও সাংখ্য অনুমান করিলে প্রতিবাদকার্য হইতে তিনি নিবৃত্ত হইলেন,আর তখন এক চেতনই অনেকস্বরুপ জগৎ প্রপঞ্চের উপাদান হইল এইরুপে ব্রহ্মবাদই স্বীকার করা হইল।' বস্তুতঃ শঙ্করমতকে মায়াবাদ বলা হয়, তাহা বিপক্ষগণের কথা। বৈষ্ণবগণ প্রবল হইয়া শঙ্কর সম্প্রদায়কে যাহা বলিয়া নিন্দা করিতেন, শঙ্করসম্প্রদায়ের অজ্ঞব্যক্তিগণ তাহা নিন্দার সূচক না বুঝিয়া নিজেকেই তাই বলিয়া নির্দেশ করিতে লাগিল। পরে প্রসিদ্ধি অনুরোধে বিজ্ঞেও তাহাই বলিতে লাগিলেন।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শঙ্করমতকে মায়াবাদ বলাই যায় না। কারণ, যে মতে যাহাকে সর্বমূলতত্ত্ব বলিয়া নির্দেশ করা হয়, তাহারই নামে সেই মতবাদের নামকরণ করা হয়। যেমন- শিব শক্তি বিষ্ণু প্রভৃতি যে যে মতে মূলতত্ত্ব বলা হয়, সেই সেই মতের নাম শৈব শাক্ত বৈষ্ণব প্রভৃতি। শঙ্করমতে জগৎ মিথ্যা (আবার এ মিথ্যা মানে অলীক বা অসৎ মনে করবেন না।) অর্থ্যাৎ মায়া, সত্য একমাত্র ব্রহ্ম। তাহাই সকলের মূলতত্ত্ব। এই ব্রহ্মে এই জগৎ কল্পিত বলিয়া জগৎ মিথ্যা বলা হয়। সুতরাং মায়া মূলতত্ত্ব নহে, প্রত্যুত ব্রহ্মই মূলতত্ত্ব। এজন্য শঙ্করমতকে ব্রহ্মবাদই বলা সঙ্গত।অন্যত্র বহু স্থলে মীমাংসক ও ন্যায়াচার্যগণ এবং স্বমতের আচার্যগণ ইহাকে ঔপনিষদবাদ নামে আখ্যাত করিয়াছে। এজন্য কুসুমাঞ্জলি, শাস্ত্রদীপিকা এবং মধুসূদনী প্রভৃতি গ্রন্থ দ্রষ্টব্য।

বিরুদ্ধবাদিগণের ইহাকে মায়াবাদ বলিবার কারণ এই যে, ইহার সঙ্গে বৌদ্ধমতের কিঞ্চিৎ সাদৃশ্য আছে।সে সাদৃশ্য এই যে, বৌদ্ধগণ জগৎকে অসতে অর্থ্যাৎ শূন্যে, মায়া বা অবিদ্যাকল্পিত বলিয়া থাকেন, সুতরাং বৌদ্ধমতেও জগৎ নাই। শঙ্করমতে জগৎ সতে অর্থাৎ ব্রহ্মে মায়াকল্পিত বলিয়া পরমার্থতঃই নাই।এখন জগতের না থাকা অংশে বা কল্পিতত্ব অংশে ঐক্যই একটু সাদৃশ্য বলিতে হইবে। বৈষ্ণবাদি বিপক্ষগণ এই সাদৃশ্য অংশকে লক্ষ্য করিয়া নিজমতে নিষ্ঠার বৃদ্ধি উদ্দেশ্যে পরমতের নিন্দা করিয়া ইহাকে মায়াবাদ বলিয়াছেন। বস্তুতঃ বৌদ্ধমতে জগৎকল্পনার অধিষ্ঠান অর্থ্যাৎ মূলতত্ত্ব অসৎ বা শূন্য এবং শঙ্করমতে সেই অধিষ্ঠান বা মূলতত্ত্ব সৎ ব্রহ্ম,আর তাহাতে এই দুই মতের যে অত্যন্ত বিরোধ তাহা কেহই অস্বীকার করিতে পারেন না। অতএব মায়াবাদ শঙ্করের বাদ নহে। শঙ্কর যদি জগতের মূলতত্ত্ব বা অধিষ্ঠানকে মায়া বা শূন্য বলিতেন তাহা হইলে তাঁহার মতবাদ মায়াবাদ হইত। যেহেতু মূলত্ত্বানুসারেই মতবাদের নামকরণ হয়-ইহাই রীতি। মায়া উভয় মতেই নিমিত্তকারণ বটে, কিন্তু তাই বলিয়া তাহা যে অধিষ্ঠানরুপ উপাদান কারণ, তাহা শঙ্কর বলেন নাই। বৌদ্ধমতে উপাদানরুপ এই অধিষ্ঠান স্বীকার করা হয় না, তাঁহাদের মতে নিরধিষ্ঠান ভ্রম স্বীকার করা হয়। অতএব পদ্মপুরাণের এই নিন্দা প্রকৃতপক্ষে শঙ্করমতের নিন্দা নহে, পরন্তু অন্য কোন মতবাদের নিন্দা। পরবর্তী বিপক্ষগণ শঙ্করমতে এইরুপ মায়াবাদত্ব আরোপ করিয়া নিন্দা করিয়া থাকেন মাত্র।

তাহাদের যুক্তি অনুসারে তাহারাই বিপদে পড়ে চৈতন্যস্বরুপ আত্মার জ্ঞানরুপে পরিণাম স্বীকার করায়, রামানুজ জৈনমতের প্রভাবে প্রভাবিত হইয়াছেন বলিয়া মনে করার সঙ্গত কারণ আছে। সর্বদর্শনসংগ্রহে মাধবাচার্য মধ্বের মুখে ভেদাভেদবাদী রামানুজকে জৈন পদাঙ্কনুসারী বলিতে কুন্ঠিত হন নাই। রামানুজ যে পাঞ্চরাত্রমতাবলম্বী,সেই পাঞ্চরাত্র মত সম্বন্ধে বরাহ পুরাণে ৬৬ অধ্যায়ে আছে--

অলভা বেদমন্ত্রাণাং পাঞ্চরাত্রোদিতেন হি....শুদ্রাদীনান্ত ন শ্রোতপদবী মুপাযাস্যতি।।১২ তাহার পর অপরাপর পুরাণ মধ্যে আছে- পাঞ্চরাত্রং ভাগবতং তন্ত্রং-----এবং বিধানি চান্যানি মোহনার্থানি তানি তু।।।

কুর্ম ১১ অধ্যায়, সুতসংহিতা ৪র্থ মুক্তিখণ্ড এইরুপ পুরাণজাতীয় অপরাপর বহু গ্রন্থেই ভাগবত ও রামানুজমতের বহু নিন্দা আছে। যাহা হউক ইহা হইতে জানা যায়--

(১) বেদমন্ত্র লভ্য না হইলে পাঞ্চরাত্র আচারে ভগবান লাভ।

(২) পাঞ্চরাত্রমত ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যের জন্য,শূদ্রের জন্য নহে।

(৩) পাঞ্চরাত্র ভাগবত ও বৈখানসতন্ত্র বেদভ্রষ্টের জন্য বিষ্ণু উপদেশ করিয়াছেন।

(৪) পাঞ্চরাত্রাদির বেদমূলকত্ব নাই ।

(৫) পাঞ্চরাত্রাদি শাস্ত্র মোহনার্থ রচিত।

(৬) ভাগবত ও সাত্ত্বত শাস্ত্র অভিন্ন।

(৭) ইহা কুণ্ড ও গোলকগণের জন্য অভিপ্রেত।কুণ্ড অর্থ--পতিসত্ত্বে জারজ পুত্র এবং গোলক অর্থ--পতি মরণান্তে জারজ পুত্র।।

এদিকে অদ্বৈতমতে জগৎকে বলা হয় মিথ্যা অর্থ্যাৎ অনির্বচনীয়। কেবলমাত্র জগতের ব্যবহারিক সত্যতাই এই মতে স্বীকৃত হইয়া থাকে। দ্বৈতবাদীও এই ব্যবহারিক সত্তার বাহিরে যাইতে পারেন না। আর, ব্যবহারিক সত্তাতো প্রাতিভাসিক সত্তারই সামগ্রিক উন্নতর সংস্করণমাত্র। এই অবস্থায় বিজ্ঞানে বিজ্ঞেয় বিষয়ের প্রাতিভাসিক সত্তা দ্বৈতবাদীকেও নত মস্তকে স্বীকার করিতে হইবে। এই প্রাতিভাসিক সত্তার ক্ষেত্রে তাহা হইলে দ্বৈতবাদী, অদ্বৈতবাদী, বিজ্ঞানবাদী বৌদ্ধ প্রভৃতি সকলেই একমত। বিজ্ঞেয় বিষয়ের প্রাতিভাসিক সত্তার অতিরিক্ত পারমার্থিক সত্তার প্রশ্নে দ্বৈতবাদের সহিত অদ্বৈত ও বৌদ্ধমতের মতদ্বৈধ আছে সন্দেহ নাই। কিন্তু অন্ততঃ একটি ক্ষেত্রে (প্রাতিভাসিক সত্তার ব্যাখায়) তো সকল মতেরই অনুমোদন রহিয়াছে দেখা গেল। অতএব বিজ্ঞানের আধারে জগৎ কল্পিত,এই সিদ্ধান্তের জন্য অদ্বৈতবেদান্তবাদ ও বিজ্ঞানবাদ যদি অভিন্ন হয়, তবে বিজ্ঞান জ্ঞেয় বিষয়ের প্রাতিভাসিক সত্তা আছে,এইরুপ সিদ্ধান্ত স্বীকার করার জন্য দ্বৈতবাদীকেও বিজ্ঞানবাদী বলিতে আপত্তি কী? দ্বৈতবাদীর অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রকাশত্মযতি তদীয় 'বিবরণে' যে প্রত্যুত্তর দিয়াছেন, ইহাই তাঁহার (প্রকাশত্মযতির) নিগূঢ় রহস্য বলিয়া মনে হয়। প্রকাশত্মযতির বক্তব্যের সহিত আমরা আরও একটু যোগ করিয়া বলিতে পারি- বহির্জগতের বস্তুসত্তা অস্বীকার করার জন্য যদি বিজ্ঞানবাদ ও অদ্বৈতবাদ এক হইয়া যায়,তবে পরিদৃশ্যমান বিশ্বের বাস্তব সত্তা স্বীকার করার জন্য চার্বাক দর্শন ও দ্বৈতদর্শন এক বা অভিন্ন হইয়া যায় না কেন? দ্বৈতবাদীরা কি নিজেদের চার্বাকপন্থী বলিতে রাজি হইবেন?

আর শঙ্করকে, চার্বাকমতপ্রবর্তক বৃহস্পতি অথবা বৌদ্ধমতপ্রবর্তক বুদ্ধের ন্যায় দৈত্যবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিগণকে মোহিত করিবার জন্য রুদ্রাবতার বলিতে পারা যায় না। কারণ, তাঁহার প্রচারিত মত ব্যাসদেবেরই পুরাণমধ্যে বিস্তৃতভাবে বর্ণিত। পুরাণাদিমধ্যে বৌদ্ধ বা চার্বাকমত থাকিলেও তাহাতে অশ্রদ্ধা উৎপাদনের জন্য সেই পুরাণমধ্যেই বলা হইয়াছে। কিন্তু শঙ্করমতের সম্বন্ধে সে চেষ্টা করা হয় নাই। যে পুরাণে শঙ্করমত উক্ত তাহাতে তাহার নিন্দা নাই। যে পুরাণে অন্যমত বর্ণিত, তাহাতেই নিন্দা আছে। অতএব এইরুপ যে মতনিন্দা তাহা মতবিশেষে শ্রদ্ধা উৎপাদনের জন্য, তাহা কোন মতের নিন্দার জন্য নহে।

(ঋণঃ- স্বামীচিদঘনানন্দ পুরী ও মহামহোপাধ্যায় আশুতোষ শাস্ত্রী, কাব্য-ব্যাকরণ-সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ, প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ স্কলার, এম-এ পিএইচডি, বিদ্যাবাচস্পতি।)

Friday, 27 May 2022

স্বাভাবিক বা স্বভাবজাত কর্ম্ম কি?



পূর্ববর্তী লেখাতে আমি সাত্ত্বিকাদি ত্রিবিধ কর্ম্মের আলোচনা করেছি। আজকের আলোচ্য বিষয় স্বাভাবিক বা স্বভাবজাত কর্ম্ম। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় (১৮/৪১) বর্ণিত আছে—"ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিশাং শূদ্রাণাং চ পরংতপ৷ কর্মাণি প্রবিভক্তানি স্বভাবপ্রভবৈর্গুণৈঃ৷" অর্থাৎ হে পরন্তপ! স্বভাবজাত ত্রিগুণানুসারেই ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্রেরও কর্মসমূহ পৃথক্‌ পৃথগ্‌রূপে বিভক্ত হইয়াছে।

এখন প্রশ্ন স্বভাব কি? শঙ্করাচার্য্য উক্ত শ্লোকের ভাষ্যে বলিতেছেন—"স্বভাবঃ ঈশ্বরস্য প্রকৃতিঃ ত্রিগুণাত্মিকা মায়া" অর্থাৎ স্বভাব হইতেছে ঈশ্বরের প্রকৃতি— ত্রিগুণাত্মিকা মায়া। সেই স্বভাবজাত সত্ত্ব-রজ-তম গুণসমূহ দ্বারা জীবের স্ব স্ব কার্য্যানুরূপ শমদমাদি কর্ম্মসকল বিভক্ত হইয়াছে। আচার্য্য শঙ্কর স্বভাবের বিষয়টা আরও স্পষ্ট করিতেছেন—

"জন্মান্তরকৃতসংস্কারঃ প্রাণিনাং বর্তমানজন্মনি স্বকার্যাভিমুখত্বেন অভিব্যক্তঃ স্বভাবঃ" অর্থাৎ প্রাণীদের পূর্বজন্মে কৃত কর্ম্মের সংস্কার বর্তমান জন্মে স্বকার্য্য অভিমুখ হইয়া যখন অভিব্যক্ত হয়, তখন তাকে স্বভাব বলে।

এখন গুণ ও কর্ম্মভেদে ব্রাহ্মণাদি চতুর্বর্ণের স্বাভাবিক কর্ম্মসমূহ গীতা শাস্ত্রের আলোকে ব্যাখ্যা করিব।

ব্রাহ্মণের স্বভাবজাত কর্ম্ম কি?

শমো দমস্তপঃ শৌচং ক্ষান্তিরার্জবমেব চ ৷

জ্ঞানং বিজ্ঞানমাস্তিক্যং ব্রহ্মকর্ম স্বভাবজম্৷৷ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮.৪২)

শম অর্থাৎ অন্তঃকরণের উপশম, দম অর্থাৎ বাহ্যকরণের নিগ্রহ, কায়িক, বাচিক ও মানসিক তপস্যা; অন্তর্বহিঃ শৌচ, ক্ষমা, সরলতা, শাস্ত্রজ্ঞান ও তত্ত্বানুভূতি এবং আত্মায় অস্তিভাব অর্থাৎ বেদার্থ ও ঈশ্বরে শ্রদ্ধা- এই সকল ব্রাহ্মণের স্বভাবজাত (সত্ত্বগুণ জাত) কর্ম্ম।

ক্ষত্রিয়ের স্বভাবজাত কর্ম্ম কি?

শৌর্যং তেজো ধৃতির্দাক্ষ্যং যুদ্ধে চাপ্যপলায়নম্৷

দানমীশ্বরভাবশ্চ ক্ষাত্রং কর্ম স্বভাবজম্৷৷

(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮.৪৩)

শৌর্য অর্থাৎ শূরভাব, তেজ, ধৃতি, কর্মকুশলতা, যুদ্ধে অপরাঙ্মুখতা, দানে মুক্তহস্ততা ও ঈশ্বরভাব অর্থাৎ প্রভুভাব - এইগুলি ক্ষত্রিয়ের স্বভাবজাত (স্বভাবজ সত্ত্বমিশ্র রজোগুণ দ্বারা প্রবিভক্ত) কর্ম্ম। ৪৩

বৈশ্য ও শুদ্রের স্বভাবজাত কর্ম্ম কি?

কৃষিগৌরক্ষ্যবাণিজ্যং বৈশ্যকর্ম স্বভাবজম্৷

পরিচর্যাত্মকং কর্ম শূদ্রস্যাপি স্বভাবজম্৷৷

(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮.৪৪)

কৃষি, গোরক্ষা অর্থাৎ পশুপালন ও বাণিজ্য অর্থাৎ ক্রয়বিক্রয়াদি বণিক কর্ম্ম বৈশ্যের স্বভাবজাত (স্বভাবজ তমোমিশ্র রজোগুণ দ্বারা প্রবিভক্ত) কর্ম্ম । পরিচর্যা অর্থাৎ শুশ্রূষাস্বভাব শূদ্রদিগের স্বভাবজাত (রজোমিশ্র তমোগুণের দ্বারা প্রবিভক্ত) কর্ম্ম । ৪৪

 

Friday, 20 May 2022

ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্যের অদ্বৈতবাদের বিরুদ্ধে রামানুজাচার্যের আপত্তির খণ্ডন:-

 



শ্রীরামানুজাচার্য ব্রহ্মসূত্রেরশ্রীভাষ্যেঅদ্বৈতবেদান্তোক্ত অবিদ্যার বিরুদ্ধে সাতটি আপত্তি (দোষ) উত্থাপিত করেছেন। এই সাতটি আপত্তি সপ্তধা অনুপপত্তি নামে দার্শনিক পণ্ডিত সমাজে পরিচিত। তবে রামানুজ পরবর্তী অদ্বৈতবাদী আচার্যরা ঐসব আপত্তির খণ্ডনও দিয়েছেন। রামানুজাচার্যের প্রথম অনুপপত্তিটি হলো আশ্রয়ানুপপত্তি।

(১) "আশ্রয়ানুপপত্তির খণ্ডন"—

. ব্রহ্মাশ্রয়ানুপপত্তি-

পূর্বপক্ষরামানুজাচার্যের মতে অদ্বৈতবেদান্তী জ্ঞানরূপ ব্রহ্মকে যে অজ্ঞানের আশ্রয় বলে সিদ্ধান্ত করেছেন তা সঙ্গত হয় নি। কেননা, জ্ঞান অজ্ঞান আলোক অন্ধকারের মত পরস্পর বিরোধী পদার্থ। অর্থাৎ অন্ধকারের নাশক আলোক যেমন অন্ধকারের আশ্রয় হয় না, ঠিক তেমনি অজ্ঞানের নাশক বিশুদ্ধ জ্ঞানও সেরূপ অজ্ঞানের আশ্রয় হতে পারে না।

উত্তরপক্ষআচার্য রামানুজোক্ত এই অনুপপত্তি বিশ্লেষণ করলে সুধী পাঠক দেখতে পাবেন যে, তিনি অজ্ঞানকে জ্ঞানের অভাব বলে বুঝেছেন। ঘট ঘটাভাব যেমন একজায়গায় থাকে না, জ্ঞান এবং জ্ঞানাভাবও সেরূপ একত্র থাকতে পারে না। রামানুজ স্বামী অজ্ঞান, অবিদ্যা প্রভৃতি শব্দে ''এর বা অকারের প্রয়োগ দেখেই এরূপ অনুপপত্তির জালে জড়িয়ে পড়েছেন এবং অজ্ঞানকে জ্ঞানের প্রাগভাব বলেই ব্যাখ্যা করেছেন। জ্ঞানের প্রাগভাবের অতিরিক্ত অনাদি ভাবরূপ (অভাব বিলক্ষণ) অজ্ঞান যা প্রত্যক্ষ, অনুমান প্রভৃতির সাহায্যে অদ্বৈতবেদান্তী নিঃসংশয়ে প্রমাণ করেছেন, তা রামানুজ স্বামীর অন্তর স্পর্শ করে নি। এই সত্ত্বরজস্তমো-গুণময়ী ভাবরূপ অবিদ্যাকে জগজ্জননী ব্রহ্মশক্তিরূপে অদ্বৈতবাদী গ্রহণ করেছেন। জগৎপ্রসবিনী এই মহাশক্তিকে অভাবরূপ বলা যায় কি? অভাব বিশ্বের পরিণামী উপাদান হতে পারে কি?

পূর্বপক্ষব্রহ্মশক্তি অবিদ্যা বা অজ্ঞান যে অভাবরূপ নয়, তা বুঝা গেল। এখন কথা এই, অদ্বৈতবাদীর সিদ্ধান্ত অনুসারে 'অবিদ্যা বিদ্যাবিরোধী ভাবরূপ বস্তু', এটা স্বীকার করলেই বা বিদ্যাকে বিদ্যাবিরোধী অবিদ্যার আশ্রয় বিষয় বলে গ্রহণ করা যাবে কিরূপে? জ্ঞানাভাবের কথা ছেড়ে দিলেও জ্ঞানস্বরূপ পরব্রহ্মের সহিত অজ্ঞানের বিরোধ থাকায়, জ্ঞানময় ব্রহ্মকে কোনমতেই অজ্ঞানের আশ্রয় বলা চলে না"জ্ঞানস্বরূপস্য ব্রহ্মণো বিরোধাদেব নাজ্ঞানাশ্রয়ত্বম্।"-(শ্রীভাষ্য)

উত্তরপক্ষরামানুজাচার্যের এইরূপ আপত্তির উত্তরে মধুসূদন সরস্বতী অদ্বৈতসিদ্ধিতে বলেছেন

"ননু  কথং চৈতন্যমজ্ঞানাশ্রয়ঃ; তস্য প্রকাশস্বরূপত্বাৎ, তয়োশ্চ তমঃ প্রকাশবদ্ বিরুদ্ধস্বভাবত্বাদিতি চেন্ন, অজ্ঞানবিরোধি জ্ঞানং হি চৈতন্যমাত্রম্, কিন্তু বৃত্তিপ্রতিবিম্বিতম্; তচ্চ নাবিদ্যাশ্রয়ঃ, যচ্চাবিদ্যাশ্রয়ঃ, তচ্চ নাজ্ঞানবিরোধি।"-(অদ্বৈতসিদ্ধিঃ)

অর্থাৎ জ্ঞান এবং অজ্ঞান আলোক অন্ধকারের মত পরস্পর বিরুদ্ধ হলেও, অজ্ঞানবিরোধী জ্ঞান চৈতন্যমাত্রই নয়, কিন্তু অন্তঃকরণ-বৃত্তিতে প্রতিফলিত চৈতন্য। বৃত্তিপ্রতিবিম্বিত চৈতন্যই অজ্ঞানের বিরোধী হয়ে থাকে। বৃত্তিপ্রতিফলিত চৈতন্য অজ্ঞানের আশ্রয় নয়। শুদ্ধ পরব্রহ্ম চৈতন্যই অজ্ঞানের আশ্রয়। এই আশ্রয় শুদ্ধ চৈতন্য অজ্ঞানের বিরোধী নয়।

পূর্বপক্ষজ্ঞান যদি অজ্ঞানের বিরোধী হয়, তবে জ্ঞানের জ্ঞানত্বই অজ্ঞানের বিরোধিতার হেতু হবে। শুদ্ধ ব্রহ্মজ্ঞানেও জ্ঞানত্ব আছে, বৃত্তিপ্রতিবিম্বিত জ্ঞানেও জ্ঞানত্ব আছে। এই অবস্থায় বৃত্তিপ্রতিফলিত জ্ঞান অজ্ঞানের বিরোধী হবে, শুদ্ধ ব্রহ্মবিজ্ঞান অজ্ঞানের বিরোধী হবে না, আশ্রয় হবে, এরূপ অদ্বৈতবাদীর সিদ্ধান্ত কিরূপে নির্বিবাদে গ্রহণ করা যায়। "জ্ঞানস্বরূপংব্রহ্মেতি জ্ঞানমবিদ্যায়া বাধকং, স্বরূপভূতং জ্ঞানমিতি চেন্ন, উভয়োরপি ব্রহ্মস্বরূপপ্রকাশত্বে সত্যন্যতরস্য অবিদ্যাবিরোধিত্বম্ অন্যতরস্য নেতি বিশেষানবগমাৎ। জ্ঞানমজ্ঞানবিরোধি চেৎ স্বয়মেব বিরোধি ভবতীতি নাস্যা ব্রহ্মাশ্রয়ত্ব সম্ভবঃ।"-(শ্রীভাষ্য)

উত্তরপক্ষএই অনুপত্তি বিরুদ্ধে অদ্বৈতবাদী বলেন, জ্ঞানের অজ্ঞানবিরোধিতায় জ্ঞানত্বই হেতু নয়, জ্ঞানের বৃত্তিসম্পর্কই হেতু বলে জানবে। অন্তঃকরণবৃত্তিতে প্রতিফলনের ফলে জ্ঞানে এক বিশেষ শক্তির সঞ্চারিত হয় এবং শক্তির সঞ্চারবশতঃই জ্ঞানে অজ্ঞানবিরোধিতা স্ফূর্তিলাভ করে। এমন কি চরম অদ্বয় ব্রহ্মজ্ঞানের ক্ষেত্রেও 'ব্রহ্ম জ্ঞানস্বরূপ", এই বৃত্তিবোধই ব্রহ্মতিরস্করণী অবিদ্যার বিলয়ের কারণ হয়ে থাকে। অবিদ্যার আশ্রয় এবং ভাসক শুদ্ধচৈতন্য যখন বৃত্তি প্রতিবিম্বিত হয়, তখন তাই অজ্ঞানের বিলুপ্তি ঘটায়। জ্ঞানের অজ্ঞান-নাশকতা-শক্তির সঞ্চার বৃত্তিতে প্রতিবিম্বনের ফলেই আত্মপ্রকাশ লাভ করে। এজন্যই অদ্বৈতসিদ্ধান্তে জ্ঞানকে (জ্ঞানত্বকে) অজ্ঞানের নাশক না বলে, জ্ঞানের বৃত্তি সম্পর্ককেই অজ্ঞানের নাশক বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বৃত্তিজ্ঞানই অজ্ঞানের নিবৃত্তি ঘটায়"বৃত্তিজ্ঞানেনৈবাজ্ঞাননিবৃত্তিঃ।" শতভূষণী দ্রষ্টব্য।

পূর্বপক্ষযদি মূল ব্রহ্ম চৈতন্যের সহিত অজ্ঞানের বিরোধিতা নাই থাকে তবে ব্রহ্মচৈতন্য প্রকাশস্বরূপ কিনা, এরূপ আশঙ্কা স্বাভাবিক নয় কি?

উত্তরপক্ষপ্রতিবাদীর এরূপ প্রশ্নের উত্তরে মধুসূদন সরস্বতী অদ্বৈতসিদ্ধিতে বলেছেন'সূর্যরশ্মি তৃণ তূলা প্রভৃতিকে প্রকাশিত করে। সূর্যরশ্মি যখন সূর্যকান্তমণিতে প্রতিফলিত হয়ে তৃণ তূলা প্রভৃতির উপর পতিত হয়, তখন মণিতে প্রতিফলিত সৌরকিরণ তৃণ, তূলা প্রভৃতিকে দগ্ধ করে। অনুরূপভাবে অজ্ঞানের ভাসক শুদ্ধচৈতন্য যখন অন্তঃকরণবৃত্তিতে প্রতিফলিত হয়, তখন সেই প্রতিফলিত চৈতন্যই অজ্ঞানকে বিনাশ করে।'-(অদ্বৈতসিদ্ধিঃ)

পূর্বপক্ষস্বয়ংপ্রকাশ ব্রহ্ম অজ্ঞানের আশ্রয় হবেন কিরূপে?

উত্তরপক্ষএই প্রশ্নের উত্তরে আনন্দবোধ ভট্টারকাচার্য ন্যায়মকরন্দে বলেছেন"নহি বয়ং প্রকাশাভাবমবিদ্যামাচক্ষ্মহে যেন সা প্রকাশাত্মনি ব্রহ্মণি ভবেদিতি; উক্তং হি ভাবো নাপ্যভাবঃ কিন্তু অনির্বাচৈবাবিদ্যা"-(ন্যায়মকরন্দ)

অবিদ্যা যদি প্রকাশের অভাব হত, তবেই প্রকাশস্বরূপ ব্রহ্মে প্রকাশাভাব অবিদ্যা থাকতে পারত না, অবিদ্যার ব্রহ্মাশ্রয়ত্ব উপপাদন অসঙ্গত হত। অবিদ্যা আমাদের মতে অভাবরূপ নয়, এটা ভাবাভাব-বিলক্ষণ অনির্বচনীয়।অবিদ্যার লক্ষণে অবিদ্যাকে ভাবরূপা বলা হলেও অবিদ্যা প্রকৃতপক্ষে ভাবরূপা নয়এটা 'ভাবাভাববিলক্ষণা', অনির্বাচ্যা।

অদ্বৈতবাদী অবিদ্যালক্ষণোক্ত ভাব শব্দের স্বাভাবিক ভাবরূপতা অর্থ পরিত্যাগ করে ভাব শব্দের 'অভাববিলক্ষণরূপ গৌণ অর্থ গ্রহণ করেছেন। অবিদ্যা কেবল অভাবেরই উপাদান নয়অবিদ্যা ভাব বস্তুরও উপাদান।এই অবস্থায় অবিদ্যাকে শুধু অভাববিলক্ষণ বললে চলবে নাএটাকে ভাববিলক্ষণও বলতে হবে। ফলে ভাব শব্দের 'ভাবাভাববিলক্ষণাবা অনির্বাচ্যই হবে প্রকৃত অর্থ। এই অনির্বাচ্য অবিদ্যার সাথে ব্রহ্মের স্বতঃ কোন বিরোধ নেই, সুতরাং ব্রহ্মের অবিদ্যার আশ্রয় হতে বাধা কি?

সুতরাং জ্ঞানস্বরূপ শুদ্ধব্রহ্মের সহিত ব্রহ্মশক্তি অবিদ্যার স্বতঃ কোনও বিরোধ নেই। এই অনাদি মায়াশক্তির সহায়তায় নির্গুণ সগুণ হন, সৃষ্টি-সংহার লীলার অভিনয় করেন। শুদ্ধ পরব্রহ্মেরও অজ্ঞান বা মায়াশক্তিযোগ অবশ্য স্বীকার্য। এরূপ মূলাজ্ঞানের জ্ঞানময় ব্রহ্মের কোন বিরোধ নেই। বিরোধ তখনই ঘটে, যখন জ্ঞান অজ্ঞান অন্তঃকরণবৃত্তিতে প্রতিফলিত হয়ে দেখা দেয়।

পূর্বপক্ষকি প্রকারে ইহা অবগত হওয়া যায় যে, পরব্রহ্ম বিচিত্র শক্তিযুক্ত?

উত্তরপক্ষভগবান্ সূত্রকার বলেছেন'সর্বোপেতা তদ্দর্শনাৎ৷' ভগবান্ শঙ্করাচার্য শারীরকমীমাংসা ভাষ্যে বলেছেনশ্রেষ্ঠ দেবতা (ব্রহ্ম) সর্ব্বশক্তিযুক্ত, এটা অঙ্গীকার করতে হবে। কোন হেতবলে? তা বলছেন'তদ্দর্শনাৎ' অর্থাৎ যেহেতু তিনি

'সর্বকর্মা সর্বকামঃ সর্বরসঃ সর্বমিদমভ্যাত্তোবাক্যনাদরঃ'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-/১৪/) অর্থাৎ তিনি সর্বকর্মা (এই বিশ্ব তাঁর কর্ম), সর্ববিধ বিশুদ্ধ কামনাবান, সকল প্রকার সুখকর গন্ধযুক্ত, সর্বপ্রকার উত্তম রসযুক্ত, এই সমগ্র জগৎব্যাপিয়া বর্তমান, বাগিন্দ্রিয় বিবর্জ্জিত এবং নিষ্কাম্।

'সত্যকামঃ সত্যসংকল্পঃ'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-//) অর্থাৎ তিনি সত্যকামও সত্যসঙ্কল্প।

'যঃ সর্বজ্ঞঃ সর্ববিৎ'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-//) যিনি সর্বজ্ঞ সর্ববিৎ।

'এতস্য বা অক্ষরস্য প্রশাসনে গার্গি সূর্যাচন্দ্রমসৌ বিধৃতৌ তিষ্ঠতঃ'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-//) 'হে গার্গি, এই অক্ষরের (নাশরহিত পরমেশ্বরের) প্রকৃষ্ট শাসনে সূর্য চন্দ্রমা বিধৃত হয়ে অবস্থান করছে।'

ইত্যাদি এইজাতীয় শ্রুতি পরদেবতার সকলপ্রকার শক্তির সহিত সম্বন্ধ সেইপ্রকারেই প্রদর্শন করছে। তাছাড়া বহুশ্রুতিবচনই ঘোষণা করে যে, ব্রহ্ম শক্তিমান্। যেমন মায়াং তু প্রকৃতিং বিদ্যান্মায়িনং মহেশ্বরম্।-(শ্বেতাশ্বতর উপনিষৎ-.১০) 'প্রকৃতিকে মায়া এবং পরমেশ্বরকে মায়াধীশ বলে জানবে।'

যাঁতে সকলপ্রকার বিশেষ প্রতিষিদ্ধ হয়েছে, সেই ব্রহ্মেরও সকলপ্রকার শক্তির সহিত সম্বন্ধ সম্ভব, ইত্যাদি এটাও অবিদ্যার দ্বারা কল্পিত যে রূপের বিভিন্নতা, তার উল্লেখের দ্বারা বলা হয়েছে। আর দেখ শাস্ত্রও 'অপাণিপাদো জবনো গ্রহীতা পশ্যত্যচক্ষুঃ শ্রৃণোত্যকর্ণঃ' -(শ্বেতাশ্বতর উপনিষৎ-৩।১৯) অর্থাৎ 'হস্তপদ না থাকলেও তিনি দ্রুত গমন করেন, চক্ষুবিহীন হলেও দর্শন করেন, কর্ণবিহীন হলেও শ্রবণ করেন।' এইপ্রকারে করণবিহীন অর্থাৎ দেহেন্দ্রিয়াদিরহিত ব্রহ্মের সকলপ্রকার শক্তির সহিত সম্বন্ধ প্রদর্শন করছেন।

. জীবাশ্রয়ানুপপত্তিঃ-

পূর্বপক্ষ- জীব অবিদ্যারই সৃষ্টি, অবিদ্যাসৃষ্ট জীব অবিদ্যার আশ্রয় হবে কিরূপে? এতে তো পরস্পরাশ্রয় দোষ অপরিহার্য হয়।

উত্তরপক্ষ- উক্ত আপত্তির উত্তরে অদ্বৈতবেদান্তীরা বলেন যে, জীব অবিদ্যা উভয়েই অদ্বৈতমতে অনাদি। অনাদি বস্তুকে উৎপন্ন বলা ব্যবহার মাত্র, তা যথার্থ উৎপত্তি নয়। দর্পণ প্রতিবিম্বের কি জন্যজনকভাব আছে? তাছাড়া বীজ অঙ্কুরের ন্যায় জীব অবিদ্যার অনাদি পরস্পরাশ্রয়তা দোষাবহ নয়। বীজ হতে বৃক্ষ হয় এবং বৃক্ষ হতে বীজ হয়, আর সেই বীজ বৃক্ষের আশ্রয় হয় এবং বৃক্ষও বীজের আশ্রয় হয়, এতে কি অন্যোন্যাশ্রয় দোষ হয়? অনাদি বস্তুতে দোষ হয় না। তাছাড়া জীবের ব্রহ্মবিষয়ে অনাদি অজ্ঞান দেখতে পাওয়া যায়, সুতরাং জীব অজ্ঞানের আশ্রয়। বাচস্পতি মিশ্র বলেন"নচ অবিদ্যোপাধিভেদাধীনোজীবভেদঃ, জীবভেদাধীনশ্চ অবিদ্যোপাধিভেদ ইতি পরস্পরাশ্রয়াদুভয়াসিদ্ধিরিতি সাম্প্রতম্। অনাদিত্বাদ্ বীজাঙ্কুরবদুভয় সিদ্ধেঃ।"-(ভামতী-১।৪।৩)

সুতরাং রামানুজাচার্যের আশ্রয়ানুপপত্তির মূলে যে কোন বলিষ্ঠ প্রমাণ নেই, উপরের আলোচনা হতে সুধীপাঠক তা সহজেই বুঝতে পারবেন।

(২) তিরোধানানুপপত্তির খণ্ডনঃ- 

পূর্বপক্ষঃ- প্রকাশের তিরোধান অর্থে প্রকাশের অনুৎপত্তি অথবা প্রকাশের নাশকে বুঝায়। প্রকাশস্বরূপ ব্রহ্ম যখন উৎপন্ন বস্তু নয়, তখন প্রকাশ-তিরোধান বললে প্রকাশের নাশকেই বুঝাবে। স্বপ্রকাশ পরব্রহ্মের বিনাশ অবশ্য কোনমতেই কল্পনা করা চলে না। অতএব প্রকাশের তিরোধানও সম্ভবপর হয় না।

অবিদ্যা ব্রহ্মকে আবৃত (তিরোহিতকরে কিরূপেস্বপ্রকাশ পরব্রহ্মের তিরোধান সম্ভবই বা হয় কিরূপে?শ্রীভাষ্যে বলা হইয়াছে-‘নিত্যমুক্ত-স্বপ্রকাশজ্ঞানস্বরূপস্যাবিদ্যোপাধি তিরোধানাসম্ভবাৎ। তিরোধানং নাম বস্তুস্বরূপে বিদ্যমানে তৎপ্রকাশনিবৃত্তিঃ। প্রকাশ এব বস্তুস্বরূপম্ ইত্যঙ্গীকারে তিরোধানাভাবঃ স্বরূপনাশো বা স্যাৎ।’- (শ্রীভাষ্য-ব্রহ্মসূত্র-১/৪/২২) অর্থাৎ নিত্যমুক্ত ও নিত্যপ্রকাশময় জ্ঞানস্বভাব ব্রহ্মের অবিদ্যা-জনিত আবরণের অপগম সম্ভব হয় না। কেননা, তিরোধান অর্থ- বস্তুর স্বরূপ বিদ্যমান সত্ত্বেও তাহার প্রকাশ বা প্রতীতিযোগ্যতা নিবৃত্তি, (উচ্ছেদ নয়); অতএব, ‘প্রকাশই ব্রহ্মের স্বরূপ’ একথা স্বীকার করলে হয় আবরণের অভাব, না হয়, ব্রহ্মেরই স্বরূপোচ্ছেদ হয়ে যেতে পারে। 

সিদ্ধান্তঃ- তিরোধান শব্দের স্বেচ্ছানুরূপ দ্বিবিধ অর্থ কল্পনা করে অদ্বৈত সিদ্ধান্তে অনুপপত্তি প্রদর্শন ব্যর্থ প্রয়াস মাত্র। প্রকাশের তিরোধান শব্দের প্রকৃত অর্থ, প্রকাশের বিনাশ নয়, প্রকাশের স্ফুর্তি না হওয়া। গাঢ় মেঘের আবরণে সূর্য তিরোহিত হলে, প্রকাশময় সূর্য বিনষ্ট হয়েছে, কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি এরূপ মনে করেন কি? মেঘের আবরণবশতঃ সূর্য প্রকাশ পাচ্ছে না, বায়ুবেগে মেঘ অন্তর্হিত হলেই সূর্য দৃষ্টিগোচর হবে। এক্ষেত্রেও অবিদ্যার আবরণে আবৃত ব্রহ্ম জীবের দৃষ্টিতে প্রতিভাত হচ্ছে না, প্রকাশ পাচ্ছে না, এরূপ মনে করাই স্বাভাবিক। ব্রহ্মের এই তিরস্করনী অবিদ্যা বিদ্যার উদয়ে অন্তর্হিত হলে, জ্ঞানময় ব্রহ্ম পূর্ণসচ্চিদানন্দরূপেই বিরাজ করবেন। জীব এবং শিবের মধ্যে অজ্ঞানের যবনিকা যে বিভেদের সৃষ্টি করেছে, যবনিকা সরে গেলে, জীব নিজের শিবভাব প্রত্যক্ষ করে ধন্য হবেন।

শঙ্কাঃ- প্রকাশই যার স্বরূপ, তার সেই স্বরূপ কোন কারণেই আবৃত হতে পারে না, আবৃত হলে তার স্বরূপই নষ্ট হয়ে যায়। সুতরাং স্বপ্রকাশের আবরণ কিরূপে সম্ভবপর হয়?

উত্তরঃ- প্রতিবাদীর এই প্রশ্নের উত্তরে অদ্বৈতবেদান্তী বলেন, প্রকাশস্বরূপ ব্রহ্মের যথার্থ আবরণ হয় না, এটা সত্য কথা। তবে, স্বয়ংজ্যোতিঃ ব্রহ্মের কল্পিত আবরণ অসম্ভব নয়। এই কল্পিত অজ্ঞানাবরণবশতঃ 'ব্রহ্ম প্রকাশতে', এরূপ ব্যবহারও সম্ভবপর। সূর্য মেঘের আবরণে আবৃত হলে, আকাশে সূর্য নেই, সূর্য দেখা যাচ্ছে না, প্রকাশিত হচ্ছে না, এরূপ ব্যবহার পণ্ডিত মূর্খ সকলেই করেন। তমঃস্বভাবা অবিদ্যার আবরণে আবৃত পরিপূর্ণ স্বয়ংজ্যোতিঃ সম্পর্কেও 'ব্রহ্ম ভাতি প্রকাশতে', এইপ্রকার ব্যবহার অজ্ঞানান্ধ জীব করবে, তাতে আর আশ্চর্য কি? এই ব্যবহার অবিদ্যার কার্য। স্বয়ংপ্রকাশ ব্রহ্মে ' প্রকাশতে', এরূপ ব্যবহারের যোগ্যতা সম্পাদনই ব্রহ্মের আবরণ, পরব্রহ্মের তিরোধান প্রভৃতিরূপে অদ্বৈতবেদান্তে ব্যাখ্যাত হয়েছে। "নাস্তি প্রকাশত ইতি ব্যবহার এবাভিজ্ঞাদিসাধারণঃ, অস্তি প্রকাশতে ইতি ব্যবহারাভাবো বা আবরণকৃত্যম্। আবরণমহিমৈব পরিপূর্ণং ব্রহ্ম নাস্তি প্রকাশত ইতি ব্যবহারঃ, অস্তি প্রকাশত ইতি ব্যবহার প্রতিবন্ধশ্চ।"-(অদ্বৈতসিদ্ধি দ্রষ্টব্য)

শঙ্কাঃ- কিপ্রকারে স্বরূপের নাশ ব্যাতিরেকেই একব্রহ্মে অনেকপ্রকার আকারবিশিষ্ট সৃষ্টি হবে?

উত্তরঃ- ব্রহ্মসূত্রের (২।১।২৭) সূত্রভাষ্যে ভগবান্ শঙ্করাচার্য বলেছেন—"অবিদ্যার দ্বারা কল্পিত রূপের বিভিন্নতা অঙ্গীকার করা হয়।"

তাছাড়া 'আত্মনিচৈবং বিচিত্রাশ্চ হি৷'-(..২৮) সূত্রের ভাষ্যে ভগবান্ ভাষ্যকার স্পষ্ট করেছেনআর দেখ এই বিষয়ে বিবাদ করা উচিত নয় যে, কিপ্রকারে স্বরূপের নাশ ব্যাতিরেকেই একব্রহ্মে অনেকপ্রকার আকারবিশিষ্ট সৃষ্টি হবে? যেহেতু

 '' তত্র রথা রথযোগা পন্থানো ভবন্ত্যথ রথান্রথযোগান্পথঃ সৃজতে'

-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-//১০)

অর্থাৎ 'সেখানে (স্বপ্নে) রথসকল থাকে না, অশ্বসকল থাকে না এবং পথসকল থাকে না অথচ তিনি রথসকল অশ্বসকল পথসকলকে সৃষ্টি করেন।'

ইত্যাদি শ্রুতিবাক্যের দ্বারা স্বপ্নদর্শী এক আত্মাতেও স্বরূপের নাশ ব্যাতিরেকেই অনেকপ্রকার আকারবিশিষ্ট সৃষ্টি পঠিত হচ্ছে। আর লোকমধ্যেও দেবতা প্রভৃতিতে এবং মায়াবী প্রভৃতিতে স্বরূপের নাশ ব্যতিরেকেই হস্তী অশ্ব প্রভৃতি বিচিত্র সৃষ্টিসকল পরিদৃষ্ট হচ্ছে। এই প্রকার এক ব্রহ্মেও স্বরূপের নাশ ব্যতিরেকেই অনেকপ্রকার আকার বিশিষ্ট সৃষ্টি হবে।

(৩) স্বরূপানুপপত্তির খণ্ডনঃ- 

পূর্বপক্ষঃ- স্বরূপানুপপত্তি অর্থাৎ অবিদ্যাকে যখন একটা কিছু বলতে হবে, তখন এটা হয় সৎস্বরূপ, কিংবা অসৎস্বরূপ। কিন্তু অদ্বৈতমতে এটাকে সৎস্বরূপও বলা হয় না বা অসৎস্বরূপও বলা হয় না। বস্তুতঃ যতক্ষণ এটাকে যথার্থ অনর্থকারক ভ্রম এবং ব্রহ্মভিন্ন না বলা যায়, ততক্ষণ এটার মায়িকত্বই সিদ্ধ হয় না। মায়াই তো যত অনর্থের মূল। অতএব অদ্বৈতমতে অবিদ্যা যে সদসদ্ভিন্নস্বরূপ তাই উৎপন্ন হয় না। এজন্য অদ্বৈতমতে অবিদ্যার স্বরূপই অসিদ্ধ। আচার্য রামানুজ তাঁর শ্রীভাষ্যে বলেছেন—"স্বপ্রকাশ চিদ্রূপ পরব্রহ্মের আবরক যে অবিদ্যা-দোষের কথা বলা হয়েছে সেখানে প্রশ্ন এই, উক্ত অবিদ্যা-দোষ সত্য, না মিথ্যা? অবিদ্যা সত্য হলে অদ্বৈতবাদ দ্বৈতবাদে পরিণত হয়, মিথ্যা হলে, মিথ্যার মূল হিসেবেও অপর দোষের কল্পনা আবশ্যক হয়। ফলে 'অনবস্থাদোষ' অনিবার্যরূপেই দেখা দেয়।

উত্তরপক্ষঃ- এই আপত্তির উত্তরে অদ্বৈতবাদী বলেন—'অবিদ্যার স্বরূপই সিদ্ধ হয় না'—এটা যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ সৎ এবং অসৎ ভিন্ন যে কিছু নেইএটা বলা যায় না। যা মিথ্যা, তা সৎও নয় এবং অসৎও নয়। তাকে সদসদ্ভিন্নই বলা হয়; কারণ যা সৎ তার বিনাশ হতে পারে না এবং যা অসৎ তার জ্ঞানও হয় না। যেমন সদ্ ব্রহ্মের বিনাশ নেই এবং অসৎ বন্ধ্যাপুত্রের কখনও জ্ঞান হয় না। 'বন্ধ্যাপুত্র' এই শব্দজন্য যে জ্ঞান তাও জ্ঞান নয়। তা বিকল্প নামক বৃত্তিবিশেষ। কিন্তু রজ্জুতে যে সর্পের জ্ঞান হয়, সেই জ্ঞানের বিষয় যে সর্প, সেই সর্প দেখাও যায় এবং নাইও বটে। রজ্জুতে সর্প সৎ হলে তার অন্যথাজ্ঞান হত না এবং অসৎ হলে দেখাও যেত না। অতএব অবিদ্যা 'একটা কিছু' বলে যে তা হয় সৎ, না হয় অসৎ হবে এরূপ বলা যায় না। তারপর যা মায়িক হবে, তা যে যথার্থ অনর্থকর হবে বলা হয়েছে, তাও অসঙ্গত। কারণ, মায়ার অনর্থকারিতা যথার্থ বলবার আবশ্যকতা নেই। মায়াজন্য যে অনর্থ, তা মায়ারই মত যথার্থ, মায়ার নাশে তার নাশ হয়। যথার্থ অনর্থ নেই তথাপি তাকে যথার্থ মনে করা হয়এটাই অদ্বৈতমতে মায়া।

তাছাড়া জগজ্জননী অবিদ্যা পরব্রহ্মেরই শক্তি। পরিদৃশ্যমান বিশ্বপ্রপঞ্চ এই অবিদ্যাশক্তিরই পরিণাম। শক্তি বিশ্বের উপাদান কারণ। সত্ত্বরজস্তমোগুণময়ী অবিদ্যা বা মায়াশক্তি মহৎ, অহঙ্কার প্রভৃতিরূপে পরিণত হয়ে, সমষ্টি-ব্যষ্টিরূপে বিচিত্র বিশ্ব রচনা করে। তন্মধ্যে মহতত্ত্ব বা বুদ্ধিতত্ত্বই মায়াশক্তির প্রথম পরিণাম। বুদ্ধি স্বভাবতঃ স্বচ্ছ, শুদ্ধচৈতন্যের ওটা দর্পণস্বরূপ। স্বচ্ছ ব্যষ্টিবুদ্ধিতে চৈতন্যের যে প্রতিবিম্ব পড়ে, তাই জীব আখ্যা লাভ করে। সমষ্টিবুদ্ধিতে চৈতন্যের প্রতিবিম্বের নাম ঈশ্বর। চিৎস্বরূপ শুদ্ধ বিম্বচৈতন্য নিরাশ্রয় নির্বিষয় হলেও, তার প্রতিবিম্ব জীব বা ঈশ্বর নিরাশ্রয় নির্বিষয় নয়। জীব ঈশ্বর বিম্বশুদ্ধচৈতন্যে অধিষ্ঠিত থেকে বিবিধ বিচিত্র বিষয় দর্শন করে, নিজেকেও প্রত্যক্ষ করে। নিরূপাধি শুদ্ধ চৈতন্য তা করে না। অনন্ত বিষয়জালের অন্তরালে অবস্থান করে শুদ্ধ শুদ্ধই থাকে। বিষয়ের উপাধি কালিমা তাঁকে স্পর্শ করে না। ভাবরূপ অবিদ্যা-শক্তির এই পরিণামে অবিদ্যার কোনরূপ স্বাতন্ত্র্য নেই। শুদ্ধ ব্রহ্মকে আশ্রয় করেই অবিদ্যা পরিণাম প্রাপ্ত হয়ে থাকে। পরিণামই অবিদ্যার স্বভাব। অবিদ্যার এই স্বাভাবিক পরিণামে তার অধিষ্ঠান বা আশ্রয় শুদ্ধ চৈতন্য ব্যতীত অপর কোনও প্রেরকের অপেক্ষাও নেই, প্রয়োজনও নেই। সুতরাং শ্রীরামানুজোক্ত মিথ্যা অবিদ্যা-দোষের মূলে অপরাপর দোষের কল্পনা এবং তন্নিবন্ধন অনবস্থার আপত্তির কোনই ভিত্তি দেখা যায় না।

() অনির্বচনীয়ত্বানুপপত্তি খণ্ডনঃ- 

পূর্বপক্ষআচার্য রামানুজ শ্রীভাষ্যে বলেছেন, প্রতীতি বা উপলব্ধিই হল দার্শনিক পদার্থ কল্পনার ভিত্তি। পদার্থের মধ্যে কতগুলো সৎ (সত্য) রূপে, কতগুলো অসৎ (অসত্য) রূপে প্রতীতির গোচর হয়ে থাকে। ভাব অভাব, সৎ অসৎ এই দুইপ্রকার পদার্থের পরিচয় পাওয়া যায়। 'সর্বাচ প্রতীতিঃ সদসদাকারা।'(শ্রীভাষ্য) পদার্থ হয় সত্য হবে, নতুবা অসত্য হবে। সৎও নয়, অসৎও নয়, সদসৎও নয়, এরূপ অনির্বাচ্য পদার্থ কিরূপে কল্পনা করা যায়? মাধ্বতার্কিক ব্যাসরাজও রামানুজোক্ত যুক্তি অনুসরণ করে অনির্বাচ্যবাদ খণ্ডনের প্রয়াস করেছেন। এই অনির্বাচ্য বস্তুর দার্শনিক চিন্তাজগতে কোন স্থান আছে কিনা? অবিদ্যাকে অনির্বাচ্য বলে অদ্বৈতবেদান্তী যে সিদ্ধান্ত করেছেন, সিদ্ধান্ত কতটুকু যুক্তিযুক্ত?

উত্তরপক্ষরামানুজাচার্যের মতে "সদ্ভিন্নমসৎ, অসদ্ভিন্নং সৎ", অর্থাৎ যা সৎ নয়, সদ্ভিন্ন তাই অসৎ, এবং যা অসৎ নয়, অর্থাৎ অসদ্ভিন্ন তাই সৎ বা সত্য। রামানুজ স্বামী সত্য অসত্যের এরূপ পরস্পর বিরহ ব্যাপক অর্থ প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু অদ্বৈতবাদীর মতে সৎশব্দে পরমার্থ সৎ পরব্রহ্মকে বুঝায়, অসৎশব্দে অলীক আকাশকুসুম প্রভৃতিকে বুঝায়। অদ্বৈতসিদ্ধান্তে সৎ অসৎশব্দ গোত্ব এবং গোত্বাভাবের মত পরস্পর বিরহব্যাপক নয়। এরা গোত্ব অশ্বত্বের ন্যায় পরস্পর বিরহব্যাপ্য। 'সত্ত্বাসত্ত্বয়োর্ন পরস্পরবিরহরূপত্বম্, কিন্তু পরস্পরবিরহব্যাপ্যতামাত্রম্।' (অদ্বৈতসিদ্ধিঃ) অর্থাৎ সৎ অসৎ গোত্ব এবং অশ্বত্বের ন্যায় একত্র থাকে না, তবে গজত্বে গোত্ব অশ্বত্ব এই উভয়েরই অভাব থাকে। পরিদৃশ্যমান এই বিশ্বপ্রপঞ্চ পরব্রহ্মের ন্যায় সত্যও নয়, আকাশকুসুমের ন্যায় অলীকও নয়। এজন্য বিশ্বপ্রপঞ্চে সৎ এবং অসৎ, এই উভয়েরই অভাব পাওয়া যায়। এরূপ প্রপঞ্চকেই অদ্বৈতবেদান্তের পরিভাষায় অনির্বাচ্য বলা হয়েছে। এই প্রপঞ্চ এবং এর মূল অবিদ্যা সত্যব্রহ্মও নয়, অসৎ আকাশকুসুমও নয়। ফলে, প্রপঞ্চ সদসৎও নয়, সদসদ্ভিন্নও নয়। চতুষ্কোটি বিনির্মুক্ত, এটাই অনির্বাচ্যত্বের পরিচয়। এরূপ পরিচয়মূলেই অদ্বৈতসিদ্ধিতে মধুসূদন সরস্বতী ব্যাসরাজের আপত্তির বিরুদ্ধে অনির্বাচ্যত্বের নিম্নোক্ত লক্ষণ নির্বচন করেছেন"সদ্বিলক্ষণত্বে সতি অসদ্বিলক্ষণত্বে সতি সদসদ্বিলক্ষণত্বম্" (অদ্বৈতসিদ্ধি) অর্থাৎ সতের বিলক্ষণ অসতের বিলক্ষণ হয়ে, যা সদসতেরও বিলক্ষণ হয়, তাই অনির্বাচ্য বলে জানবে। সুতরাং রামানুজ শঙ্করের মতে সৎ অসতের অর্থের (বাচ্যতার) ভেদ স্বীকার করায়, অনির্বাচ্যত্বের বিরুদ্ধে রামানুজাচার্যের অনুপপত্তি ভগবান্ শঙ্করের মতকে স্পর্শ করেনি।

পূর্বপক্ষঃ- অনির্বাচ্য অবিদ্যায় প্রমাণ কি? এটা তো অদ্বৈতবাদীদের নিছক কল্পনা মাত্র।

উত্তরপক্ষঃ- এরূপ প্রশ্নোত্তরে অদ্বৈতবাদী বলেন, প্রত্যক্ষ, অনুমান প্রভৃতিই অনির্বাচ্য অবিদ্যায় প্রমাণ হয়ে থাকে। শুক্তিরজত, রজ্জুসর্প প্রভৃতি স্থলে শুক্তি প্রভৃতি আধারে মিথ্যা রজতের যে প্রত্যক্ষ হয়ে থাকে, এরূপ প্রত্যক্ষই অনির্বাচ্য অবিদ্যায় প্রমাণ বলে গণ্য হবে। শুক্তির জ্ঞানোদয়ে রজত যখন তিরোহিত হয়, তখন 'মিথৈব রজতমভাৎ' এতকাল পর্যন্ত আমার দৃষ্টিতে মিথ্যা রজতেরই ভাতি হয়েছিল, এরূপ যে প্রত্যক্ষ জ্ঞানোদয় হয়, সেখানে মিথ্যা শব্দে অনির্বচনীয় রজতকেই বুঝায়।

তাছাড়া এই অনির্বচনীয় অবিদ্যায়"নাসদাসীন্নোসদাসীৎ", "তম আসীত্তমসা গূঢ়মগ্রেঽপ্রকেতম্", ইত্যাদি নাসদীয়সুক্তও প্রমাণ। তাছাড়া এটা নিছক কল্পনা নয়, এটা শ্রুতি সিদ্ধান্ত। অথর্ববেদীয় সর্বসারোপনিষৎ বর্ণিত আছে

"অনাদিরন্তবতী প্রমাণাপ্রমাণসাধারণা সতী নাসতী সদসতী স্বয়মধিকা বিকাররহিতা নিরূপ্যমাণা সতীতরলক্ষণশূন্যা সা মায়েত্যুচ্যতে।"-(সর্বসারোপনিষৎ-১৩)

"শুরু নেই কিন্তু শেষ আছে, প্রমাণ আছে আবার প্রমাণ নেই, আছে বলা যায় না আবার নেইও বলা যায় না। সৎ অসৎ একসঙ্গে বলা যায় না, (ব্রহ্ম) স্বয়ং বিকারশূন্য হওয়ায় বিকারের হেতুরূপে নিরূপ্যমান (জ্ঞাত) হলে নেই এবং বিকারের হেতুরূপে নিরূপিত না হলে আছে-এইরূপ লক্ষণশূন্য যা (ভাব) তাই- মায়া বলে কথিত হয়।"

নিম্নে প্রদর্শিত অনুমানও মিথ্যারজত প্রভৃতি যে অনির্বাচ্য তা প্রমাণিত করে।

"বিমতং (পক্ষ) সত্ত্বরহিতত্বে সতি অসত্ত্বরহিতত্বে সতি সত্ত্বাসত্ত্বরহিতম্ (সাধ্য), বাধ্যত্বাদ্দোষপ্রযুক্তভানাদ্বা (হেতু), যন্নৈবং তন্নৈবং (ব্যতিরেক ব্যাপ্তি), যথা ব্রহ্ম (দৃষ্টান্ত)" অদ্বৈতসিদ্ধিঃ দ্রষ্টব্য।

বিবাদগোচর মিথ্যা শুক্তিরজত প্রভৃতি সৎও নয়, অসৎও নয়, সদসৎও নয়। সুতরাং শুক্তিরজত প্রভৃতি অনির্বাচ্য। যেহেতু ওটা অধিষ্ঠান শুক্তি প্রভৃতির জ্ঞানোদয়ে বাধিত হয় এবং দোষবশতঃই মিথ্যারজত প্রভৃতির ভাতি হয়ে থাকে। যা অনির্বাচ্য নয় তা কদাচ বাধিত হয় না, সেই বস্তুর ভাতি বা প্রকাশের মূলে কোনরূপ দোষও বিরাজ করে না, যেমন শুদ্ধ নির্বিশেষ পরব্রহ্ম। মিথ্যা শুক্তিরজত যেমন অনির্বাচ্য, তথাকথিত সত্য রজত এবং ওদের মূল অবিদ্যাও অদ্বৈতবাদীর সিদ্ধান্তে অনির্বাচ্য। সুতরাং আলোচ্য অনুমানে সপক্ষ দৃষ্টান্ত সম্ভবপর নয় বলে ব্যতিরেকী দৃষ্টান্তের উপন্যাস করা হয়েছে বুঝতে হবে। এরূপ অনুমানই অনির্বাচ্যত্বে প্রমাণ বলে জানবে'তস্মাদনুমানমত্রপ্রমাণম্' অদ্বৈতসিদ্ধিঃ দ্রষ্টব্য।

(৫) প্রমাণানুপপত্তির খণ্ডনঃ-

পূর্বপক্ষএতাদৃশ অবিদ্যার কোন প্রমাণ নেই। অর্থাৎ এটার কি প্রত্যক্ষ, কি অনুমান এবং কি শব্দকোন প্রমাণই নেই। অতএব অবিদ্যা স্বীকারে প্রমাণেরও অনুপপত্তি হয়।

উত্তরপক্ষঅবিদ্যার প্রমাণ নেই যে বলা হয়েছে এটা অসঙ্গত। কারণ, 'আমি অজ্ঞ' এটাই এটার প্রত্যক্ষ প্রমাণ। 'দেবাত্মশক্তিং স্বগুণৈঃ নিগূঢ়াম্'-(শ্বেতাশ্বতর উপনিষৎ-.)এইরূপ প্রভৃতি শ্রুতি এটার শাব্দ প্রমাণ।

পূর্বপক্ষঅদ্বৈতবাদীর উল্লিখিত প্রত্যক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী বলেন যে, আলোচিত প্রত্যক্ষের দ্বারা জ্ঞানের অভাবই প্রকাশ পায়, অদ্বৈতসম্মত ভাবরূপ অজ্ঞান প্রমাণিত হয় না। -জ্ঞান কথাটির মধ্যে যে '' শব্দটি আছে, তা নিঃসন্দেহে জ্ঞানের অভাবই ব্যক্ত করে, ভাবরূপ অজ্ঞান প্রতিপাদন করে না। ভাবরূপ অজ্ঞানসাধনে উক্ত প্রত্যক্ষ প্রমাণই নয়, ওটা প্রমাণাভাস।

উত্তরপক্ষপ্রতিবাদীর এরূপ মন্তব্যের বিরুদ্ধে অদ্বৈতবাদী বলেন, প্রদর্শিত প্রত্যক্ষের স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে হলে অজ্ঞানকে ভাবরূপ বলেই গ্রহণ করতে হবে। 'আমি অজ্ঞ' প্রভৃতি প্রত্যক্ষে জ্ঞানের অভাবই প্রকাশ পায়, এরূপ সিদ্ধান্ত সমর্থন করা চলে না। 'আমি অজ্ঞ' এই প্রকার প্রত্যক্ষের ক্ষেত্রে স্বীয় অজ্ঞতা জ্ঞাতা সাক্ষাৎসম্বন্ধেই উপলব্ধি করে থাকেন। অভাব সাক্ষাৎসম্বন্ধে জ্ঞাতার জ্ঞানের গোচর হয় না; পরোক্ষভাবেই ভাসে। অভাবের সহিত চক্ষুরিন্দ্রিয় প্রভৃতির মুখ্যতঃ কোনরূপ যোগ ঘটে না। ভূতল প্রভৃতি যে সকল আধারে অভাবের প্রত্যক্ষ হয়ে থাকে, সেই ঘটশূন্য ভূতল প্রভৃতির সহিতই চক্ষুর সংযোগ ঘটে এবং ঘটশূন্য ভূতল প্রভৃতির প্রত্যক্ষই ঘটাভাবের প্রত্যক্ষ। 'অনুপলব্ধি' নামক স্বতন্ত্র একটি প্রমাণের সাহায্যে অভাবের জ্ঞানোদয় হয়। অনুপলব্ধি পরোক্ষ প্রমাণ। পরোক্ষ প্রমাণমূলে উৎপন্ন অভাবের বোধও সুতরাং পরোক্ষ। ঐরূপ পরোক্ষ জ্ঞানাভাবের দ্বারা অজ্ঞানের প্রত্যক্ষ উপপাদন কিরূপে সম্ভবপর?

তাছাড়া অজ্ঞানের প্রতিযোগী জ্ঞান উপস্থিত থাকলে, সেখানে জ্ঞানের অভাব থাকতে পারে না। ভূতলে ঘট থাকলে, ঘটের অভাব সেখানে থাকে কি? অভাবের সহিত তার প্রতিযোগীর জ্ঞান তো সুস্পষ্ট। "আমি অজ্ঞ" এটাও অবশ্য এক শ্রেণির জ্ঞান। এরূপ জ্ঞান বর্তমান থাকলে, সেখানে জ্ঞানের অভাবের বোধ প্রতিবাদী কিভাবে উপপাদন করতে পারেন?

পূর্বপক্ষ 'অহম্ অজ্ঞঃ' প্রভৃতি এসকল প্রত্যক্ষ যে ভাবরূপ অজ্ঞানেরই প্রত্যক্ষ তা অদ্বৈতবাদী বুঝলেন কিরূপে?

উত্তরপক্ষঅজ্ঞানের যবনিকায় জ্ঞান যখন ঢাকা পড়ে, তখন সত্য-শিব-সুন্দর জীব তার নিজের স্বরূপ ভুলে গিয়ে, নিজেকে অহম্ অভিমানী মনে করে সংসারের সাগর দোলায় দোল খেতে থাকে। অজ্ঞ জীবের এরূপ পরিচয়ই 'অহম্ অজ্ঞঃ' এই প্রত্যক্ষের মূলে বিরাজ করছে। এটা ভাবরূপ অজ্ঞানেরই প্রত্যক্ষ। ভাবরূপ অজ্ঞানই যবনিকা; ভাবরূপ অজ্ঞানবশেই জীবের শিবরূপ ঢাকা পড়ে। অজ্ঞান জ্ঞানের অভাবরূপ হলে তা দ্বারা জীবের শিবভাব ঢাকা পড়ত না। কেননা, অভাবের কোন কিছু ঢেকে রাখবার ক্ষমতা নেই।

প্রশ্ন ভাবরূপ অবিদ্যায় অনুমান কি?

উত্তর প্রকাশাত্ম যতি তদীয় 'পঞ্চপাদিকাবিবরণে' নিম্নে উদ্ধৃত অনুমানের প্রয়োগ করেছেন

বিবাদাধ্যাসিতং প্রমাণ জ্ঞানম্ (পক্ষ), স্বপ্রাগভাবব্যতিরিক্ত-স্ববিষয়াবরণ-স্বনিবর্ত্য-স্বদেশগতবস্ত্বন্তর পূর্বকম্ (সাধ্য)

অপ্রকাশিতার্থ প্রকাশকত্বাৎ (হেতু)

অন্ধকারে প্রথমোৎপন্নপ্রদীপশিখাবৎ (দৃষ্টান্ত)

জ্ঞানোদয়ের ফলে যেখানে অপ্রকাশিত ঘট প্রমুখ বস্তু জ্ঞাতার জ্ঞানে ভাসে, সেসকল ক্ষেত্রেই প্রমাণমূলে উৎপন্ন জ্ঞান অজ্ঞাত ঘট প্রভৃতি বস্তুসম্পর্কে জ্ঞাতার যে অজ্ঞান ছিল, সেই অজ্ঞানকে নিঃশেষে নিবৃত্ত করেই আত্মপ্রকাশ লাভ করে। দৃষ্টান্ত হিসেবে অন্ধকারাচ্ছন্ন বস্তুর প্রকাশক প্রদীপ শিখার উল্লেখ করা যেতে পারে। এই দৃষ্টান্তটি অজ্ঞান যে ভাবরূপ বস্তু, জ্ঞানোৎপত্তির পূর্বতনীন অভাব নয়, তাই স্পষ্টতঃ বুঝিয়ে দেয়। কারণ, অভাব কোন বস্তুর আবরক হয় না। জ্ঞান যে সকল বস্তু প্রকাশ করে, অজ্ঞান তাই ঢেকে রাখে। ঢেকে রাখার এই ক্ষমতা ভাববস্তুরই কেবল আছে। সুতরাং বস্তুর আবরক জ্ঞাননাশ্য অজ্ঞান ভাবরূপই বটে।

পূর্বপক্ষআচার্য রামানুজ স্বামী তাঁর শ্রীভাষ্যে বলেছেন, আলোচিত অনুমান প্রকৃত অনুমান নয়, ওটা অনুমানাভাস বা দুষ্ট অনুমান। তিনি বলেন, অপ্রকাশিত অর্থের (বস্তুর) প্রকাশক (অপ্রকাশিতার্থ প্রকাশকত্বাৎ) এরূপ হেতুমূলে অদ্বৈতবাদী যে ভাবরূপ অবিদ্যার সাধন করেছেন, সেখানে জিজ্ঞাস্য এই যে, অবিদ্যা তাঁর মতে উক্ত অনুমানবলে সিদ্ধ হয়েছে বলে ভাবরূপ অজ্ঞানও যে প্রমাণ-জ্ঞান (প্রমাণ-মূলে উৎপন্ন জ্ঞান) তাতে সন্দেহ কি? এরূপ অজ্ঞান অপ্রকাশিত প্রপঞ্চের প্রকাশকবিধায় অর্থাৎ ওতে অনুমানের হেতু বিদ্যমান থাকায় অজ্ঞানের আবরক দ্বিতীয় একটি ভাবরূপ অজ্ঞান সাধন করতেও কোনরূপ বাধা দেখা যায় না। অজ্ঞানের আবরক আরেকটি অজ্ঞান অদ্বৈতবাদী অবশ্যই স্বীকার করবেন না। ফলে, উল্লিখিত অনুমানের হেতু মে অদ্বৈতবাদীর অভিপ্রেত সাধ্য সাধন করে না, এই রহস্যই অদ্বৈতবাদীকে মেনে নিতে হবে এবং সহজ কথায় অপ্রকাশিতার্থের প্রকাশকত্বরূপ হেতু 'অনৈকান্তিক' হেত্বাভাসই হয়ে দাঁড়ায়।

উত্তরপক্ষএরূপ আপত্তির উত্তরে অদ্বৈতবাদী বলেন, ভাবরূপ অবিদ্যা দৃশ্যমান বিশ্বপ্রপঞ্চের উপাদান কারণ সন্দেহ নেই। নিখিল বিশ্বের তা উপাদান হলেও, বিশ্বপ্রপঞ্চের তা প্রকাশক নয়। ঘটের উপাদান মাটি ঘটের প্রকাশক হয় কি? স্বপ্রকাশ জ্ঞানই একমাত্র প্রকাশকএটা রামানুজাচার্য মুক্তকণ্ঠেই তাঁর শ্রীভাষ্যে ঘোষণা করেছেন। অবিদ্যা ব্রহ্মের তিরস্করণী, স্বয়ংজ্যোতিঃ ব্রহ্মই অবিদ্যার ভাসক (প্রকাশক) অবিদ্যা জড় সাক্ষি-ভাস্য। এরূপ জড় অবিদ্যার বিশ্বপ্রপঞ্চকে প্রকাশ করবার ক্ষমতা কোথায়? ফলে দেখা যাচ্ছে যে, অবিদ্যায় অপ্রকাশিত অর্থের প্রকাশকত্বরূপ হেতু অজ্ঞানের আবরক অজ্ঞানান্তরে (সাধ্যে) বর্তমান না থাকায়, ঐরূপ হেতু যে সাধ্যের ব্যভিচারী হওয়ায় হেত্বাভাস হবে তাতে সন্দেহ কি?

অজ্ঞানের আবরক এই অজ্ঞানান্তরের সহিত ব্রহ্মের তো কোন সংস্পর্শ নেই, পরব্রহ্মের ওটা আবরক নয়, ওটা অজ্ঞানেরই আবরক। সাক্ষীর সহিত সংস্পর্শ না থাকায় এরূপ অজ্ঞানান্তর সাক্ষি-ভাস্যও হবে না। অজ্ঞান জড় বস্তু। জয় অজ্ঞানের নিজেকে বা অপরকে প্রকাশ করবার ক্ষমতা নেই। এরূপ ক্ষেত্রে অজ্ঞানের আবরক অজ্ঞানান্তরকে প্রকাশ করবে কে? প্রকাশক না থাকায় অজ্ঞানান্তর অপ্রকাশিতই থেকে যাবে। এরূপ অপ্রকাশিত অজ্ঞান কল্পনার সার্থকতাই বা কোথায়? জ্ঞানরূপ ব্রহ্মকে আবৃত না করলে, সেই অজ্ঞানকে অদ্বৈতবেদান্তের সিদ্ধান্তে অজ্ঞানই বলা চলবে না। রামানুজ স্বামীর এরূপ অজ্ঞান কল্পনা অদ্বৈতবাদীর দৃষ্টিতে নিষ্ফল প্রয়াস বলে গণ্য হবে।.

(৬) নিবর্তকানুপপত্তির খণ্ডনঃ-

পূর্বপক্ষঅনাদি ভাবরূপ অবিদ্যার নিবর্তক কোনও হেতু দেখা যায় না। নির্গুণ ব্রহ্মজ্ঞানে এই অবিদ্যার নিবৃত্তি হতে পারে না। কারণ, নির্গুণব্রহ্মের জ্ঞানই অসম্ভব। জ্ঞান যারই হয় তাই সগুণ। রামানুজাচার্য বলেন শ্রুতি-স্মৃতি-পুরাণ প্রভৃতি কোন শাস্ত্রই ব্রহ্মকে নির্বিশেষ বলে না। "বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তমাদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ"-(শ্বেতাশ্বতর উপনিষৎ-/) ইত্যাদি এই সকল শ্রুতি স্পষ্টতঃ পরব্রহ্মকে অনন্তকল্যাণগুণময় সবিশেষ তত্ত্ব বলেই বিবৃত করেছেন। 'সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-//), এই শ্রুতিপ্রতিপাদিত ব্রহ্ম যে অনেক ধর্মবিশিষ্ট হবেন, এবং এটা দ্বারা অদ্বৈতবেদান্তের অভিপ্রেত নির্বিশেষ ব্রহ্মের সিদ্ধি হবে না, তাতে সন্দেহ কি?

উত্তরপক্ষনির্গুণের জ্ঞানই হয় নাইত্যাদি যা বলেছেন তা অসঙ্গত। কারণ গুণের যে জ্ঞান তা তো নির্গুণেরই জ্ঞান। যেহেতু গুণ নির্গুণই হয়। আর যাবতীয় সগুণ বস্তুর জ্ঞানেই নির্গুণের জ্ঞান প্রকারান্তরে পূর্বেই হয়ে থাকে। গুণযুক্ত বললে গুণশূন্য কিছুর একটা জ্ঞানই হয়। প্রথমে নির্গুণের জ্ঞান না হলে, গুণযুক্তের জ্ঞানই হয় না। ব্রহ্মের গুণযোগ বা সবিশেষভাব অবিদ্যাকল্পিত। অবিদ্যাই ব্রহ্মকে সগুণ করে বলে নির্গুণব্রহ্মের জ্ঞানে অবিদ্যার নিবৃত্তি হয়। অবিদ্যার খোলস বিদ্যার উদয়ে খসে পড়লে, ব্রহ্মের অবিদ্যাকল্পিত গুণযোগও খসে পড়বে। তখন চরম পরম নির্বিশেষ তত্ত্বই বিরাজ করবে।

তাছাড়া শ্রুতি স্মৃতি সমুদ্র মন্থন করলে ব্রহ্মের সবিশেষ নির্বিশেষ এই দ্বিবিধ রূপেরই পরিচয় পাওয়া যায়। সবিশেষ ব্রহ্মবাদ বা ভক্তিবাদ নির্বিশেষে পৌঁছাবার সোপানস্বরূপ। কোনরূপ বিশেষ ধর্ম বা গুণের দ্বারা ব্রহ্মের পরিচয় দেওয়া চলে না। যিনি সেরূপ ভাবে ব্রহ্মের পরিচয় দিতে যান, তিনি যে বস্তুতঃ ব্রহ্মজ্ঞ নন, এটাই "অবিজ্ঞাতং বিজ্ঞানতাং বিজ্ঞাতমবিজানতাম্'-(কেন উপনিষৎ-/) এরূপ শ্রুতিবাক্য দ্বারা স্পষ্টতঃ বুঝা যায়।

ব্রহ্ম নির্বিশেষ বলেই তো শ্রুতি কেবল "নেতি নেতি"--(বৃহদারণ্যক উপনিষদ্-২।৫।৬) দ্বারা অর্থাৎ "ইহা ব্রহ্ম নহে", "উহা ব্রহ্ম নহে", এইরূপে নিষেধমুখে নির্বিশেষ ব্রহ্মের স্বরূপ বুঝাতে চেষ্টা করছেন ; ব্রহ্মের স্বরূপ বুঝাবার জন্য নিষেধসূচক ''-এর অসংখ্য প্রয়োগ করেছেন। 'অস্থূলমনণ্বহ্রস্বমদীর্ঘম্'-(বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ ৩।৮।৮) 'ইনি স্থুল নন, অণু নন, হ্রস্ব নন, দীর্ঘ নন', এইসকল শ্রুতি নির্বিশেষ ব্রহ্মের জ্ঞাপক। পুনশ্চ 'অশব্দমস্পর্শমরূপমব্যয়ম্'-(কঠ উপনিষদ্-১।৩।১৫) অর্থাৎ 'শব্দরহিত, স্পর্শরহিত, রূপবিহীন, ক্ষয়রহিত' ইত্যাদি এই বাক্যসকলে যাঁ হতে সমস্ত বিশেষ নিরাকৃত হয়েছে, সেই ব্রহ্মই উপদিষ্ট হচ্ছেন।

'সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম' এইসকল শ্রুতিতেও সেই নেতি নেতি পথেই ব্রহ্মের লক্ষণ নিরূপণের চেষ্টা করা হয়েছে। ব্রহ্মের সদ্ভাব, চিদ্ভাব আনন্দভাব ব্যাখ্যা করায় আপাতদৃষ্টিতে ব্রহ্মকে সগুণ, সবিশেষ বলে মনে হলেও ব্রহ্ম সেরূপ নন। সৎ, চিৎ, আনন্দ এই পদত্রয় বস্তুতঃ 'নেতি'রই প্রতিরূপ, অভাবের সূচক মাত্র। সৎ শব্দের অর্থ মিথ্যা নয়, চিৎ শব্দের অর্থ জড় নয়, আনন্দ শব্দের অর্থ দুঃখরূপ নয়। পরব্রহ্মকে সৎ বললে বুঝায় যে, জগৎ যেমন ভঙ্গুর মিথ্যা, সেইরূপ মিথ্যা নয়। চিদ্ বললে বুঝায়, জড়বস্তু যেমন অপ্রকাশ এবং তমঃস্বভাব, ব্রহ্মবস্তু সেরূপ নয়, ব্রহ্ম স্বয়ংজ্যোতিঃ এবং স্বপ্রকাশ; আনন্দ বললে বুঝায় যে, ব্রহ্ম সুখস্বরূপ, দুঃখস্বরূপ নয়। এইরূপে সৎ, চিৎ, আনন্দ এই তিনটি পদ অভাব পরিচয়েই ব্রহ্মের স্বরূপ প্রতিপাদন করে; এবং ব্রহ্ম যে অন্য সকল জাগতিক পদার্থ হতে বিলক্ষণ তা বুঝিয়ে দেয়।.....

(৭) নিবৃত্তানুপপত্তির খণ্ডনঃ-

অদ্বৈতবেদান্তোক্ত অবিদ্যার বিরুদ্ধে রামানুজাচার্যের সর্বশেষ আপত্তিটি হলো নিবৃত্তানুপপত্তি।

পূর্বপক্ষঃ- নিবৃত্তি অর্থ নাশ। অদ্বৈতবাদীর মতে নির্বিশেষ জ্ঞানের দ্বারা অর্থাৎ, 'অহম্ ব্রহ্মাস্মি’—এই ব্রহ্মজ্ঞানের দ্বারা মায়া বা অবিদ্যা নিবৃত্ত বা দূর হয়। কিন্তু রামানুজাচার্য আপত্তি করে বলেন যে, অবিদ্যার নিবৃত্তি সম্ভব নয়। কারণ, অদ্বৈতমতে অবিদ্যা অনাদি ভাবরূপ। অনাদি ভাবরূপ বস্তুর আত্যন্তিক বিনাশ অসম্ভব।

উত্তরপক্ষঃ- এই আপত্তির উত্তরে অদ্বৈতবাদী বলেনঅবিদ্যার নিবৃত্তানুপপত্তি হল একটি অন্যায় আশঙ্কা। কারণ অধিষ্ঠানজ্ঞানে যে ভ্রমনিবৃত্তি হয়, তা রজ্জুসর্পাদিস্থলে প্রত্যক্ষই হয়। অবিদ্যা ভাবরূপ অনাদি বলে যে তার নাশ অসম্ভবএকথাও বলা যায় না। কারণ, অনাদি প্রাগভাবের নাশ আছে এবং ভাববিরোধী অনাদি অত্যন্তাভাবেরও বিনাশ নেই। অতএব ভাববস্তু অনাদি বলেই যে অবিদ্যার নিবৃত্তি হয় নাতাও বলা যায় না।

তাছাড়া ব্রহ্মজ্ঞানের দ্বারা যে অবিদ্যা নিবৃত্তি হয়, এর শ্রুতিপ্রমাণ রয়েছে। যথা

"তস্যাভিধ্যানাদ্যোজনাত্তত্ত্ব-ভাবাৎ ভূয়শ্চান্তে বিশ্বমায়ানিবৃত্তিঃ॥"

-(শ্বেতাশ্বতর উপনিষৎ-/১০)

অর্থাৎ সেই পরমাত্মার অভিধ্যানে অর্থাৎ চিন্তার ফলে, (অভিধ্যান কি প্রকারে?) জীবাত্মাকে পরমাত্মাতে সংযোজিত করায়, 'আমিই ব্রহ্ম' এইরূপ তত্ত্ববোধ উপস্থিত হলে, পুনঃ পুনঃ এইসকল কর্ম অনুষ্ঠিত হলে, অন্তে প্রারব্ধকর্ম্ম শেষ হলে পর যেসময় আত্মজ্ঞান সমুদিত হয়, ঠিক সেই সময়ই বিশ্বমায়ার নিবৃত্তি হয়, অর্থাৎ সুখ-দুঃখমোহাত্মক সমস্ত সংসাররূপ মায়ার নিবৃত্তি হয়।

সুতরাং, অদ্বৈতবাদের বিরুদ্ধে রামানুজাচার্যের আপত্তিগুলি যুক্তিযুক্ত নয়, এটা প্রমাণিত।.....

তথ্যসূত্রঃ-

.ভগবান্ শঙ্করাচার্যের শারীরকমীমাংসা ভাষ্য ও বাচস্পতি মিশ্রের ভামতী।

২.মধুসূদন সরস্বতীর অদ্বৈতসিদ্ধিঃ।

৩.উদ্বোধন প্রকাশিত বেদ গ্রন্থমালা (অপ্রধান উপনিষদ সমূহ)

৪.বেদান্তদর্শন অদ্বৈতবাদ,তৃতীয় খণ্ড,শ্রীআশুতোষ শাস্ত্রী,কাব্য-ব্যাকরণ-সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ বিদ্যাবাচস্পতি।

৫.রাজেন্দ্রনাথ ঘোষের "আচার্য শঙ্কর  রামানুজশীর্ষক গ্রন্থ।


ইতি

শ্রীশুভ চৌধুরী।

জ্ঞানী ভোগ্যবিষয়ে মনের কঠিনতা আর ভগবদ্বিষয়ে মনের কোমলতা সম্পাদন করে—

  আচার্য মধুসূদন সরস্বতী ভক্তিরসায়নে বলছেন — কাঠিন্যং বিষয়ে কুর্যাদ্ দ্রবত্বং ভগবৎপদে। উপায়ৈঃ শাস্ত্রনির্দিষ্টৈরনুক্ষণমতো ব...