Friday, 17 July 2020

ঈশ্বরে পক্ষপাতিত্ব এবং নিষ্ঠুরতারূপ দোষের অভাবঃ-


ইতোমধ্যে আলোচনা করিয়াছি মায়ারূপ অপরিমিত শক্তিযুক্ত পরমেশ্বর কোন প্রয়োজন ব্যতিরেকেই লীলাচ্ছলেই সৃষ্টিকর্ম করেন। কিন্তু এখন আপত্তি হইল, এই সৃষ্টির মধ্যে যে জাগতিক বৈষম্য বা নিষ্ঠুরতা দেখা যায়, যেমন দেবতা প্রভৃতি কাহাকেও কাহাকেও নিরতিশয় সুখভাগী করেন আবার পশু প্রভৃতি কাহাকেও কাহাকেও অত্যন্ত দুঃখভাগী করেন, এবং মনুষ্য প্রভৃতিকে কাহাকেও কাহাকেও মধ্যম (সুখদুঃখমিশ্রিত) ভোগভাগী করেন ইত্যাদি এইপ্রকারে বিষমা সৃষ্টি যিনি নির্ম্মাণ করেন, সেই ঈশ্বরের দুর্বৃত্ত ব্যক্তির ন্যায় আসক্তি ও দ্বেষ যুক্তিযুক্ত হওয়ায় শ্বেতাশ্বতর(৬।১৯) শ্রুতিতে যে 'নিরবদ্যং অর্থাৎ অনিন্দনীয়, নিরঞ্জনম্ অর্থাৎ নির্লেপ' এবং শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাতে(৯।২৯) যে 'আমার প্রিয় ও অপ্রিয় নাই', এইরূপ অবধারিত স্বচ্ছতা (কূটস্থতা) প্রভৃতিরূপ ঈশ্বরের স্বভাব, তাহার বিলোপ হইয়া পড়িবে। এই আপত্তির উত্তরে ভগবান সূত্রকার বাদরায়ণ বলেন-
বৈষম্যনৈর্ঘৃণ্যে ন, সাপেক্ষত্বাৎ, তথা হি দর্শয়তি’।। (ব্রহ্মসূত্র-২/১/৩৪)।।
শাঙ্করভাষ্য অনুবাদঃ- আচার্য্য শঙ্করের ভাষ্য হইল- এইরূপ আপত্তির উত্তরে আমরা বলিতেছি-ঈশ্বরের পক্ষপাতিতা ও নিষ্ঠুরতা হইয়া পড়ে না। কোন হেতু বলে? যেহেতু সাপেক্ষতা আছে। যেহেতু যদি নিরপেক্ষ, অর্থাৎ কেবল অন্য নিমিত্তনিরপেক্ষ ঈশ্বর বিষম সৃষ্টি নির্ম্মাণ করিতেন, তাহা হইলে বৈষম্য ও অতিক্রূরত্ব, এই দোষ হইতে পারিত। কিন্তু নিরপেক্ষের নির্ম্মাতৃত্ব নাই। কারণ সাপেক্ষ ঈশ্বর বিষম (উচ্চাবচ ভেদবিশিষ্ট) সৃষ্টি নির্ম্মাণ করেন। আচ্ছা, তিনি কাহাকে অপেক্ষা করেন? তাহার উত্তরে আমরা বলিতেছি-ধর্ম্ম ও অধর্ম্মকে অপেক্ষা করেন। অতএব যে প্রাণিগণ সৃষ্ট হয়, তাহাদের ধর্ম্ম ও অধর্ম্মকে অপেক্ষা করিয়া বিষম সৃষ্টি হইয়া থাকে, এইহেতু ইহা ঈশ্বরের অপরাধ নহে।
ঈশ্বরকে কিন্তু পর্জ্জন্যের (মেঘের) ন্যায় অবগত হইতে হইবে। দেখ, যেমন ধান্য ও যবাদির উৎপত্তিতে মেঘ সাধারণ কারণ, কিন্তু এইটী ধান্য, এইটী যব, এইপ্রকারে ধান্য ও যবাদিগত বিভিন্নতাতে তত্তৎ বীজগত অসাধারণ শক্তি সকলই কারণ হইয়া থাকে; এইপ্রকারে দেবতা ও মনুষ্য প্রভৃতির সৃষ্টিতে ঈশ্বর হন সাধারণ কারণ। দেবতা ও মনুষ্যাদির বিভিন্নতাতে কিন্তু তত্তৎ জীবগত অসাধারণ কর্ম্মসকলই কারণ। এইপ্রকারে সাপেক্ষ হন বলিয়া অর্থাৎ প্রাণিগণের কর্ম্মকে অপেক্ষা করেন বলিয়া পক্ষপাতিতা ও নিষ্ঠুরতার দ্বারা ঈশ্বর দূষিত হন না।
আচ্ছা, কি প্রকারে ইহা অবগত হওয়া যায় যে, ধর্ম্ম অধর্ম্ম সাপেক্ষ ঈশ্বর (পশ্বাদি, মনুষ্য ও দেবাদিরূপ) অধম, মধ্যম ও উত্তম সংসার নির্ম্মাণ করেন? শ্রুতি সেইপ্রকারই প্রদর্শন করিতেছে-
'এষ হ্যেব সাধু কর্ম কারযতি তং যমেভ্যো লোকেভ্য উন্নিনীষত এষ উ এবাসাধু কর্ম কারযতি তং যমধো নিনীষতে'।-(কৌষিতকি ব্রাহ্মণ ৩।৮)
অর্থাৎ 'ইনিই (পূর্ব্বানুষ্ঠিত কর্ম্মের সংস্কারানুযায়ী) তাহাকে অর্থাৎ সেই মনুষ্যকে সাধু কর্ম্ম করান, যাহাকে এই লোক হইতে উর্ধ্বে অর্থাৎ স্বর্গে লইয়া যাইতে ইচ্ছা করেন, ইনিই (পূর্ব্বানুষ্ঠিত কর্ম্মের সংস্কারানুযায়ী) তাহাকে অসাধু কর্ম্ম করান, যাহাকে নিম্নে অর্থাৎ পশ্বাদি যোনিতে লইয়া যাইতে ইচ্ছা করেন।'
আবার শ্রুতিতে অন্যত্র বর্ণিত আছে-'পুণ্যো বৈ পুণ্যেন কর্মণা ভবতি পাপঃ পাপেন'।-(বৃহদারণ্যক উপনষৎ-৩।২।১৩)
অর্থাৎ পুণ্য কর্ম্মের দ্বারা পুণ্যবান্ ও পাপ কর্ম্মের দ্বারা পাপী হয়।'

আবার 'যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্' -(শ্রীদ্ভগবদ্গীতা-৪।১১) অর্থাৎ 'যে, যে প্রকারে, যে প্রয়োজনে, যে ফলের অর্থী হইয়া আমাকে উপাসনা করে, তাহাকে আমি সেই ফলদানের দ্বারা অনুগৃহীত করি।'
ইত্যাদি এইজাতীয় স্মৃতিও ঈশ্বরের অনুগ্রহকারিতা ও নিগ্রহকারিতা প্রাণিগণের কর্ম্মবিশেষকে অপেক্ষা করিয়াই হইয়া থাকে, ইহা প্রদর্শন করিতেছে।

বেদান্তে বিশ্বপ্রেম ও হিতবাদঃ-


প্রথমেই এই বিষয়ে স্বামী বিবেকানন্দের কিছু উদ্ধৃতি উল্লেখ করব। স্বামীজী বলছেন-"আজকাল দেখা যায় অনেকে বলে, তাহাদের নীতির ভিত্তি হিতবাদ। এই নীতির ভিত্তি কি? সর্বাপেক্ষা অধিকসংখ্যক লোকের সর্বাধিক সুখের ব্যবস্থা করা-কেন এরূপ করিব? যদি আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়, তাহা হইলে আমি অধিকাংশ লোকের অত্যধিক অনিষ্ট সাধন করিব না কেন? হিতবাদিগণ এই প্রশ্নের কি উত্তর দিবেন? কোনটি ভাল কোনটি মন্দ, তাহা তুমি কি করিয়া জানিবে? আমি আমার সুখের বাসনার দ্বারা পরিচালিত হইয়া উহার তৃপ্তিসাধন করিলাম, উহা আমার স্বভার, উহা অপেক্ষা অধিক কিছু জানি না। আমার এইসব বাসনা আছে, আমি এগুলি পূর্ণ করিব, তোমার আপত্তি করিবার কি অধিকার আছে? নীতি, আত্মার অমরত্ব, ঈশ্বর, প্রেম ও সহানুভূতি, সাধুত্ব ও সর্বোপরি নিঃস্বার্থতা-মনুষ্যজীবনের এই-সকল ভাব ও মহৎ সত্যগুলি কোথা হইতে আসিল?
তাহার যুক্তি দেখাও। অবশ্য কবিত্ব হিসাবে নিঃস্বার্থতা অতি সুন্দর হইতে পারে, কিন্তু কবিত্ব তো যুক্তি নয়। আমাকে যুক্তি দেখাও-কেন আমি নিঃস্বার্থ হইব, কেন আমি সৎ হইব? অমুক এই কথা বলে-এরূপ কথার কোন মূল্য আমার কাছে নাই। আমার নিঃস্বার্থ হওয়ার উপযোগিতা কোথায়? ‘হিত’ বলিতে যদি ‘অধিকতম সুখ’ বুঝায়, তবে স্বার্থপর হইলেই আমার পক্ষে হিত। ইহার কি উত্তর? হিতবাদিগণ ইহার কোন উত্তর দিতে পারেন না। ইহার উত্তর-এই পরিদৃশ্যমান জগৎ এক অনন্ত সমুদ্রের একটি ক্ষুদ্র বিন্দু, অনন্ত শৃঙ্খলের একটি ক্ষুদ্র শিকলি। যাঁহারা নিঃস্বার্থতা প্রচার করিয়াছিলেন ও মনুষ্য-জাতিকে উহা শিক্ষা দিয়াছিলেন, তাঁহারা এ তত্ত্ব কোথায় পাইলেন? আমরা জানি, ইহা সহজাত বৃত্তি নয়। সহজাত-জ্ঞানসম্পন্ন পশুগণ ইহা জানে না, বিচার বুদ্ধিতেও ইহা পাওয়া যায় না, যুক্তিদ্বারা এই-সকল তত্ত্বের কিছুমাত্র জানা যায় না। তবে ঐ-সকল তত্ত্ব কোথা হইতে আসিল?"- (স্বামী বিবেকানন্দ রচনাবলী » ০১ম খণ্ড » ০৫. রাজযোগ » ০৭. ধ্যান ও সমাধি)
বেদ বেদান্তই ইহার উৎস। বস্তুত ইহার উত্তর বেদান্ত ভিন্ন আর কেহ দিতে পারে না । যদি শুক্লযজুর্বেদের বাজসনেয় সংহিতার শেষ অধ্যায় ঈশ উপনিষৎ পাঠ করি, তবে দেখব-
যস্তু সর্বাণি ভূতান্যাত্মন্যেবানুপশ্যতি ৷
সর্বভূতেষু চাত্মানং ততো ন বিজুগুপ্সতে ৷৷ ঈশ উপনিষৎ- ৬৷৷

শাঙ্করভাষ্য অনুবাদঃ- ভগবৎপূজ্যপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের ভাষ্য হইল- "যে মুমুক্ষু পরিব্রাজক সন্ন্যাসী অব্যক্ত প্রকৃতি হইতে স্থাবর বৃক্ষলতাদি পর্য্যন্ত সমস্ত শরীরকে আত্মাতেই দেখেন অর্থাৎ তাহাদিগকে আত্মা হইতে পৃথক্ দেখেন না; আবার সেই সমস্ত শরীরেতেই আত্মাকে দেখেন, মানে সেই সকল শরীরের আত্মাকে নিজের আত্মা বলিয়া জানেন অর্থাৎ এই বোঝেন যে, যেভাবে আমি এই কার্য্যকারণ সংঘাতরূপ দেহের আত্মা এবং ইহার সমস্ত প্রতীতির সাক্ষী, চেতন, কেবল নির্গুণ হইয়া থাকি, ঠিক সেইভাবে এইরূপ স্বরূপে অব্যক্ত প্রকৃতি হইতে স্থাবর পর্য্যন্ত পদার্থের আত্মা আমিই। এই প্রকার যিনি সকল প্রাণিতে নির্বিশেষ আত্মাকে দেখেন তিনি এইরূপ উপলব্ধির ফলে কাহাকেও বিজুগুপ্সা অর্থাৎ ঘৃণা করেন না। নিজ হইতে অন্যকে দোষযুক্ত দর্শনহেতুই সব ঘৃণা হইয়া থাকে। অত্যন্ত বিশুদ্ধ ব্যবধানরহিত আত্মাকে দর্শনহেতু ঘৃণার নিমিত্ত অন্য কোন পদার্থ থাকে না, এই ঘৃণার অভাব জ্ঞাতই। সেই কারণে সম্যগ্দর্শী ঘৃণা করেন না।"
অপরদিকে বৃহদারণ্যক শ্রুতিতেও একই তত্ত্ব প্রস্ফুটিত হচ্ছে-
'লোকসমূহের প্রতি অনুরাগবশত লোকসমূহ জীবগণের প্রিয় হয় না, জীবগণের আত্মপ্রয়োজনেই লোকসমূহ প্রিয় হয়। সর্বভূতের প্রতি অনুরাগবশত সর্বভূত প্রিয় হয় না, আত্মার জন্য সর্বভূত প্রিয় হয়।' - (বৃহদারণ্যক উপনিষদৎ-২|৪|৫)

Thursday, 16 July 2020

মায়াপঞ্চকম্ঃ-




শঙ্করাচার্য্য বিরচিত মায়াপঞ্চকম্ঃ-
নিরুপমনিত্যনিরংশকে প্যখণ্ডে
ময়ি চিতি সর্ববিকল্পনাদিশূন্যে।
ঘটয়তি জগদীশজীবভেদং
ত্বঘটিতঘটনাপটীয়সী মায়া।। ১

যাহা পূর্বে ঘটে নাই, এইরূপ বস্তুর নির্ম্মাণে নিপূণতরা মায়া উপমাবিহীন, নিত্য, নিরবয়ব, অখণ্ড, সমস্ত কল্পনাশূন্য, জ্ঞানস্বরূপ আত্মাতে জগৎ, ঈশ্বর ও জীববিশেষ অথবা জীবভেদ সৃষ্টি করে।১
শ্রুতিশতনিগমান্তশোধকান-
প্যহহ ধনাদিনিদর্শনেন সদ্যঃ।
কলুষয়তি চতুষ্পদাদ্যভিন্নান্
ত্বঘটিতঘটনাপটীয়সী মায়া।। ২

অঘটিত বস্তুর উৎপাদনে পটীয়সী মায়া চতুষ্পদ-পশ্বাদিতুল্য জনগণকে শত শত শ্রুতিবাক্য ও বেদান্ত দ্বারা শোধিত করিলেও হায়! সর্ব্বদা ধনাদি প্রদর্শনের দ্বারা তাহাদিগকে সদ্যঃ কলুষিত করে।২
সুখচিদখণ্ডবিবোধমদ্বিতীয়ং
বিয়দনিলাদিবিনির্মিতে নিয়োজ্য।
ভ্রময়তি ভবসাগরে নিতান্তং
ত্বঘটিতঘটনাপটীয়সী মায়া।। ৩

অঘটিত বস্তুর উৎপাদনে পটীয়সী মায়া, আনন্দ, জ্ঞান ও অখণ্ড অববোধস্বরূপ অদ্বিতীয় আত্মাকে আকাশ, বহ্নি ইত্যাদি দ্বারা নির্ম্মিত সংসার সাগরে প্রেরণ করিয়া তাহাতে সর্ব্বদা ভ্রমণ করাইতেছে। ৩
অপগতগুণবর্ণ জাতিভেদে
সুখচিতি বিপ্রবিডাদ্যহংকৃতিং চ।
স্ফুটয়তি সুতদারগেহ মোহং
ত্বঘটিতঘটনাপটীয়সী মায়া।। ৪

অঘটিত বস্তুর উৎপাদনে পটীয়সী মায়া, গুণ, বর্ণ, জাতিভেদরহিত, আনন্দ ও জ্ঞানস্বরূপ আত্মাতে ব্রাহ্মণ, বৈশ্য ইত্যাদি অহঙ্কার এদং পুত্র, কলত্র (পত্নী) ও গৃহ বিষয়ে মোহ উৎপাদন করে। ৪
বিধিহরিহরভেদমপ্যখণ্ডে
বত বিরচয্য বুধানপি প্রকামম্।
ভ্রময়তি হরিহরবিভেদভাবান্
নঘটিতঘটনাপটীয়সী মায়া।। ৫

অনুৎপাদিত পদার্থের উৎপাদনে পটিয়সী মায়া, হায় অখণ্ডব্রহ্ম-স্বরূপে হরি (বিষ্ণু) ও হর (শিব) ইত্যাদি ভেদ নির্ম্মাণ করিয়া পণ্ডিতগণকেও হরিহরের ভেদ বুদ্ধিতে ভাবিত করিয়া তাঁহাদিগকে সংসারে ভ্রমণ করাইতেছে। ৫
ইতি শ্রীমৎপরমহংসপরিব্রাজকাচার্যস্য
শ্রীগোবিন্দভগবৎপূজ্যপাদশিষ্যস্য
শ্রীমচ্ছঙ্করভগবতঃ কৃতৌ
মায়াপঞ্চকম্
সম্পূর্ণম্ ॥

পরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্য গোবিন্দভগবৎপাদ্ শিষ্য শ্রীমৎ শঙ্কর ভগবৎ প্রণীত 'মায়াপঞ্চকম্' সম্পূর্ণ ॥

Monday, 13 July 2020

মনীষাপঞ্চকম্ঃ-


সত্যাচার্যস্য গমনে কদাচিন্মুক্তি দায়কম্ ।
কাশীক্ষেত্রং প্রতি সহ গৌর্যা মার্গে তু শঙ্করম্ ॥
অন্ত্যবেশধরং দৃষ্ট্বা গচ্ছ গচ্ছেতি চাব্রবীৎ ।
শঙ্করঃসোঽপি চাণ্ডালস্তং পুনঃ প্রাহ শঙ্করম্ ॥

সত্যাচার্য্য শঙ্কর মুক্তিপ্রদ কাশীক্ষেত্রে (অবগাহন মানসে উত্তর-বাহিনী সুর-তরঙ্গিণীতে) গমন করিতেছিলেন, মহাদেব শঙ্করও গৌরীর সহিত সেইপথে যাইতেছিলেন। শঙ্করাচার্য্য (কুকুর চতুষ্টয়যুক্ত) চণ্ডালবেশধারী শিবকে দেখিয়া বলিলেন-“সরিয়া যাও, সরিয়া যাও”। সেই চণ্ডালও শঙ্করের উক্তি শ্রবণ করিয়া হাস্য বদনে বেদান্ত সংসিদ্ধ এই ন্যায়যুক্ত বাক্য কহিলেন-
অন্নময়াদন্নময়মথবা চৈতন্যমেব চৈতন্যাৎ ।
যতিবর দূরীকর্তুং বাঞ্ছসি কিং ব্রূহি গচ্ছ গচ্ছেতি ॥

অর্থাৎ হে যতিবর! তুমি “সরিয়া যাও সরিয়া যাও’ কি কহিতেছ? অন্নময় হইতে অন্নময়কে, কি চৈতন্য হইতে চৈতন্যকে, দূরীকৃত করিতে বাঞ্ছা করিয়াছ? তোমার শরীরও অন্নের বিকার আমার শরীরও অন্নময়, তাহা হইলে তোমার দেহ আর আমার দেহের মধ্যে কি পার্থক্য আছে যে আমি সরিয়া যাইব? আর দেহ ছাড়িয়া যদি চৈতন্য ধর, তাহা হইলে বা আমি সরিয়া যাইব কেন? তোমার চৈতন্য আর আমার চৈতন্যে কি পার্থক্য আছে?
প্রত্যগ্বস্তুনি নিস্তরঙ্গসহজানন্দাববোধাম্বুধৌ
বিপ্রোঽয়ং শ্বপচোঽয়মিত্যপি মহান্কোঽয়ং বিভেদভ্রমঃ ।
কিং গঙ্গাম্বুনি বিম্বিতেঽম্বরমণৌ চাণ্ডালবীথীপয়ঃ
পূরে বাঽন্তরমস্তি কাঞ্চনঘটীমৃৎকুম্ভয়োর্বাঽম্বরে ॥

তরঙ্গহীন সহজানন্দ বোধ-সিন্ধু প্রত্যগাত্মাতে, এ বিপ্র (ব্রাহ্মণ), এ শ্বপচ (চাণ্ডাল) ইত্যাদি ভেদ কল্পনা কি? গঙ্গাতে বা চাণ্ডাল বীথিকাস্থ (গৃহাঙ্গনস্থ) জলে প্রতিবিম্বিত সূর্য্যের, আর কাঞ্চন-ঘটে ও মৃৎ-কুম্ভে আকাশের কি অন্তর আছে?
চাণ্ডালরূপী শিব এরূপ অনেক শ্লোক কহিয়া বিরত হইলে, শঙ্করাচার্য্য বিস্ময়াপন্ন হইয়া কহিলেন, হে উদার! তুমি যাহা কহিলে তাহা সত্য। অধুনা আমি ভেদবুদ্ধি পরিত্যাগ করিলাম। শ্রুতিশাস্ত্র-বিশারদ পণ্ডিতগণ অনেক আছেন, কিন্তু তন্মধ্যে কোন বিশুদ্ধ-বুদ্ধিরই অভেদ বুদ্ধি হয় ।
জাগ্রৎস্বপ্নসুষুপ্তিষু স্ফুটতরা যা সংবিদুজ্জৃম্ভতে
যা ব্রহ্মাদিপিপীলিকান্ততনুষু প্রোতা জগৎসাক্ষিণী ।
সৈবাহং ন চ দৃশ্যবস্ত্বিতি দৃঢপ্রজ্ঞাপি যস্যাস্তি চে-
চ্চাণ্ডালোঽস্তু স তু দ্বিজোঽস্তু গুরুরিত্যেষা মনীষা মম ॥ ১॥

অর্থঃ- যে সম্বিৎ (জ্ঞান) জাগ্ৰৎ, স্বপ্ন,সুষুপ্তি তিন অবস্থাতে প্রকাশ পাইতেছেন । যিনি ব্রহ্মাদি পিপীলিকা পৰ্য্যন্ত সকল শরীরে ওতপ্রোত ভাবে জগতের সাক্ষীরূপ হইয়া আছেন। আমি সেই সম্বিৎ (চৈতন্য), দৃশ্যবস্তু নহি, এরূপ দৃঢ় প্রজ্ঞা যাহার, তিনি চাণ্ডাল হউন বা দ্বিজই হউন, আমার গুরু, এই আমার জ্ঞান। ১.
ব্রহ্মৈবাহমিদং জগচ্চ সকলং চিন্মাত্রবিস্তারিতং
সর্বং চৈতদবিদ্যয়া ত্রিগুণয়াঽশেষং ময়া কল্পিতম্ ।
ইত্থং যস্য দৃঢ়া মতিঃ সুখতরে নিত্যে পরে নির্মলে
চাণ্ডালোঽস্তু স তু দ্বিজোঽস্তু গুরুরিত্যেষা মনীষা মম ॥ ২॥

অর্থঃ- আমি ব্রহ্মস্বরূপ, এই সমস্ত জগৎ কেবলমাত্র চৈতন্য দ্বারা অবভাসিত হইতেছে, এই সমস্ত জগৎ ত্রিগুণাত্মক অবিদ্যা দ্বারা আমাকর্তৃক অথবা আমাতে কল্পিত, যাঁহার সচ্চিদানন্দরূপ নিষ্কলঙ্ক পরমাত্মাতে এইরূপ দৃঢ়বুদ্ধি জন্মিয়াছে, তিনি চাণ্ডাল হউন বা ব্রাহ্মণই হউন, তিনি আমার গুরু, এই আমার মণীষা। ২.
শশ্বন্নশ্বরমেব বিশ্বমখিলং নিশ্চিত্য বাচা গুরো-
র্নিত্যং ব্রহ্ম নিরন্তরং বিমৃশতা নির্ব্যাজশান্তাত্মনা ।
ভূতং ভাতি চ দুষ্কৃতং প্রদহতা সংবিন্ময়ে পাবকে
প্রারব্ধায় সমর্পিতং স্ববপুরিত্যেষা মনীষা মম ॥ ৩॥

অর্থঃ- গুরুর বাক্যের দ্বারা এই সমুদায় জগৎকে সতত অনিত্য নিশ্চয় করিয়া, অকপট শান্তচিত্তে নিরন্তর নিত্যব্রহ্মের বিচার করিয়া এবং অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত সমস্ত পাপ দগ্ধ করিয়া জ্ঞানময় অগ্নিতে প্রারব্ধভোগের নিমিত্ত নিজদেহ অর্পিত হইয়াছে, ইহাই আমার মণীষা।৩
যা তির্যঙ্নরদেবতাভিরহমিত্যন্তঃ স্ফুটা গৃহ্যতে
যদ্ভাসা হৃদয়াক্ষদেহবিষয়া ভান্তি স্বতোঽচেতনাঃ ।
তাং ভাস্যৈঃ পিহিতার্কমণ্ডলনিভাং স্ফূর্তিং সদা ভাবয়-
ন্যোগী নির্বৃতমানসো হি গুরুরিত্যেষা মনীষা মম ॥ ৪॥

অর্থঃ- তির্য্যক, মনুষ্য ও দেবতাগণ যে আত্মপ্রকাশকে 'আমি' এইরূপে অন্তঃকরণে পরিস্ফুটরূপে জানিয়া থাকে, হৃদয়, ইন্দ্রিয়, দেহ ও বিষয়সমূহ স্বভাবতঃ অচেতন হইলেও যাহার প্রকাশের দ্বারা প্রকাশিত হইয়া থাকে, যে যোগী সূর্য্যপ্রকাশ্য মেঘের দ্বারা আবৃত সূর্য্যমণ্ডলসদৃশ স্বয়ং-প্রকাশ সংবিৎকে সর্ব্বদা চিন্তা করিয়া শান্তচিত্ত হইয়া থাকেন, তিনিই গুরু ইহাই আমার মণীষা।৪
যৎসৌখ্যাম্বুধিলেশলেশত ইমে শক্রাদয়ো নির্বৃতা
যচ্চিত্তে নিতরাং প্রশান্তকলনে লব্ধ্বা মুনির্নির্বৃতঃ ।
যস্মিন্নিত্যসুখাম্বুধৌ গলিতধীর্ব্রহ্মৈব ন ব্রহ্মবিদ্
যঃ কশ্চিৎস সুরেন্দ্রবন্দিতপদো নূনং মনীষা মম ॥ ৫॥

অর্থঃ- যে সুখসমুদ্রের কণারও কণা প্রাপ্ত হইয়া এই ইন্দ্রপ্রভৃতি প্রভৃতি দেবসকল শান্তিলাভ করিয়াছেন, যে মুনি প্রশান্ত চিত্তে যাহা লাভ করিয়া নিরতিশয় শান্তিলাভ করিয়াছেন, সেই নিত্য সুখসমুদ্রে যাহার চিত্ত বিগলিত হইয়াছে, তিনি ব্রহ্মবিৎ নহেন, কিন্তু ব্রহ্মই, তাঁহার চরণ দেবরাজও বন্দনা করেন-ইহাই আমার নিশ্চিত মতি।৫
শঙ্কর যাবৎ এইরূপ কহিতেছিলেন, ইতিমধ্যে সেই শরীরকে স্বয়ং শিব চতুৰ্ব্বেদ-যুক্ত দর্শন করিলেন। তখন তিনি ভক্তি ও ধৈৰ্য্যের সহিত প্রত্যগাত্মা মহেশ্বরের স্তুতি করিতে লাগিলেন।
দাসস্তেঽহং দেহদৃষ্ট্যাঽস্মি শংভো
জাতস্তেংঽশো জীবদৃষ্ট্যা ত্রিদৃষ্টে ।
সর্বস্যাঽঽত্মন্নাত্মদৃষ্ট্যাৎবমেবে-
ত্যেবং মে ধীর্নিশ্চিতা সর্বশাস্ত্রৈঃ ॥

হে শম্ভু! দেহ দৃষ্টিতে আমি তোমার দাস , জীব দৃষ্টিতে তোমার অংশ, এবং আত্ম দৃষ্টিতে তুমিই আমি, এই আমার নিশ্চিত মতি। আমি আমার বুদ্ধি এবং সর্ব্বশাস্ত্রগ্রন্থের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছিয়াছি।
॥ ইতি শ্রীমচ্ছঙ্করভগবতঃ কৃতৌ মনীষাপঞ্চকং সম্পূর্ণম্ ॥
ইতি আচার্য্য শ্রীশঙ্কর ভগবৎ বিরচিত মনীষাপঞ্চকম্ সম্পূর্ণ॥

Saturday, 11 July 2020

সর্ব্বজ্ঞ, নিত্যতৃপ্ত চেতন ব্রহ্ম কী প্রয়োজনে সৃষ্টি করেন ?


চেতন পরমাত্মাই এই সুন্দর জগতের নির্ম্মাণকর্তা। সেই নিত্য, মুক্ত, পরিতৃপ্ত ব্রহ্ম কী প্রয়োজনে সৃষ্টি করেন? যেহেতু প্রবৃত্তিসকল প্রয়োজন বিশিষ্ট। যদি চেতন পরমাত্মার এই প্রবৃত্তিকে তাঁহার নিজের প্রয়োজনের উপযোগিরূপে কল্পনা করা হয়, তাহা হইলে "আপ্তকামম্", "আত্মকামম্"- বৃহদারণ্যক উপনিষৎ ৪।৩।২১ ইত্যাদি শ্রুতিতে বর্ণিত পরমাত্মার পরিতৃপ্ততা বাধিত হইয়া পড়িবে। অথবা প্রয়োজনের অভাবে জগন্নির্ম্মাণে প্রবৃত্তির অভাবও হইয়া পড়িতে পারে, ফলে জগতের উৎপত্তি হইবে না। আর যদি বলা হয়-চেতন হইলেও উন্মক্তব্যক্তিকে যেমন বুদ্ধির অপরাধ বশতঃ নিজের প্রয়োজন ব্যতিরেকেই প্রবৃত্ত হইতে দেখা যায়, এইরূপে পরমাত্মাও স্বপ্রয়োজন ব্যতিরেকেই প্রবৃত্ত হইবেন। তাহা হইলে পরমাত্মার যে সর্ব্বজ্ঞতা শ্রুতিতে বর্ণিত হইতেছে, তাহা বাধিত হইয়া পড়িবে। সেইহেতু চেতন ব্রহ্ম হইতে সৃষ্টি অসঙ্গত এইরূপ অনেক আপত্তি উত্থাপিত হয়। এই আপত্তির উত্তরে ভগবান সূত্রকার বাদরায়ণ বলেন-
‘লোকবত্তু লীলাকৈবল্যম্’।। (ব্রহ্মসূত্র-২/১/৩৩)।
শারীরকভাষ্য অনুবাদঃ-পূজ্যপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের ভাষ্য হইল- 'তু' শব্দটীর দ্বারা আক্ষেপ পরিহার করিতেছেন। যেমন লোকমধ্যে লীলা ব্যতিরিক্ত কোনপ্রকার প্রয়োজনের আকাঙ্ক্ষা না করিয়া কোন পূর্ণকাম রাজা বা রাজমন্ত্রীর ক্রীড়াবিহারাদিতে কেবল লীলারূপা (বিলাসরূপা) প্রবৃত্তিসকল হইয়া থাকে। অথবা যেমন বাহ্য কোন প্রয়োজনের আকাঙ্ক্ষা না করিয়া শ্বাস ও প্রশ্বাস প্রভৃতি স্বভাববশতঃই সম্ভব হইয়া থাকে। এইরূপে অন্য কোন প্রয়োজন ব্যতিরেকেই ঈশ্বরেরও কাল ও কর্ম্মসহকৃত মায়াশক্তিরূপ স্বভাববশতঃই কেবল লীলারূপা প্রবৃত্তি হয়।
ঈশ্বরের অন্য যে প্রয়োজন নিরূপণ করা হয়, শ্রুতির আপ্তকামত্বাদি যুক্তি এবং "আনন্দং ব্রহ্ম"-বৃহদারণ্যক ৩।৯।২৮।৭ ইত্যাদি শ্রুতির বলে তাহা নিশ্চয়ই সম্ভব হয় না। আর স্বভাবকে দোষারোপ করিতে পারা যায় না। যদিও এই জগৎ-বিম্বরচনা আমাদিগের নিকট অতিশয় আয়াসসাধ্যরূপেই প্রতিভাত হইতেছে, তাহা হইলেও ইহা পরমেশ্বরের পক্ষে কেবল লীলামাত্রই, যেহেতু তিনি মায়ারূপ অপরিমিত শক্তিযুক্ত। আর যদি লোকমধ্যে রাজা প্রভৃতির লীলাসকলেও কোনপ্রকার সূক্ষ্মফল কল্পনা করা হয়, তাহা হউক, কিন্তু তাহা হইলেও এখানে ঈশ্বরের জগন্নির্ম্মাণ প্রবৃত্তিতে স্বকীয় বা পরকীয় কোনপ্রকার প্রয়োজন কল্পনা করিতে পারা যায় না, যেহেতু আপ্তকামত্ববোধক শ্রুতিবাক্য আছে। আর অপ্রবৃত্তি, অথবা উন্মত্ত পুরুষের ন্যায় প্রবৃত্তি কল্পনা করিতে পারা যায় না, যেহেতু "ইমান্ লোকান্ অসৃজত"- ঐতরেয়োপনিষৎ ১।১।২ ইত্যাদি সৃষ্টিপ্রতিপাদিকা শ্রুতি এবং "য সর্বজ্ঞঃ"-মুণ্ডক উপনিষৎ ২।২।৭ ইত্যাদি সর্ব্বজ্ঞত্বপ্রতিপাদিকা শ্রুতিসকল আছে।
আচ্ছা তাহা হইলে সৃষ্টিবিষয়ক শ্রুতির প্রামাণ্যবলেই ব্রহ্মের নিজের কোন প্রয়োজন কল্পনা করিতেছ না কেন? উত্তর- আর এই সৃষ্টিপ্রতিপাদিকা শ্রুতি পরমার্থবিষয়িণী নহে, যেহেতু ইহা অবিদ্যার দ্বারা কল্পিত নাম ও রূপাত্মক ব্যবহারের বিষয় এবং যেহেতু ব্রহ্মাত্মভাব (জীব ও ব্রহ্মের একত্ব) প্রতিপাদনপর ইত্যাদি ইহাও বিস্মৃত হওয়া উচিত নহে।
ইতি ভাষ্যানুবাদ।..

Monday, 6 July 2020

দ্বাদশজ্যোতির্লিঙ্গস্তোত্রম্ঃ-


শঙ্করাচার্য্য বিরচিত দ্বাদশজ্যোতির্লিঙ্গস্তোত্রম্ঃ-
সৌরাষ্ট্রদেশে বসুধাবকাশে জ্যোতির্ময়ং চন্দ্রকলাবতংসম্ ।
ভক্তিপ্রদানায় কৃপাবতারং তং সোমনাথং শরণং প্রপদ্যে ॥ ১॥

অনুবাদঃ- ভূমণ্ডলের অনাবৃত অংশ সৌরাষ্ট্রদেশে ভক্তিপ্রদানার্থ অবতীর্ণ চন্দ্রকলাবতংস প্রসিদ্ধ জ্যোতির্ময় সোমনাথ শিবের শরণাপন্ন হইতেছি।১
শ্রীশৈলশৃঙ্গে বিবুধাতিসঙ্গে শেষাদ্রিশৃঙ্গেঽপি সদা বসন্তম্ ।
তমর্জুনং মল্লিকপূর্বমেনং নমামি সংসারসমুদ্রসেতুম্ ॥ ২॥

অনুবাদঃ- বিবিধ-প্রসঙ্গে শ্রীশৈলশৃঙ্গে এবং সদা শেষাদ্রিশৃঙ্গে অধিষ্ঠিত সেই যে মল্লিকার্জ্জুন শিব, ভবসাগরসেতুস্বরূপ-ইঁহাকে নমস্কার করি।২
অবন্তিকায়াং বিহিতাবতারং মুক্তিপ্রদানায় চ সজ্জনানাম্ ।
অকালমৃত্যোঃ পরিরক্ষণার্থং বন্দে মহাকালমহাসুরেশম্ ॥ ৩॥

অনুবাদঃ- সজ্জনগণের অকালমৃত্যু হইতে রক্ষা এবং মুক্তিপ্রদানের জন্য অবন্তীদেশে অবতীর্ণ মহাকাল মহাসুরেশ শিবকে আমি বন্দনা করি।৩
কাবেরিকানর্মদয়োঃ পবিত্রে সমাগমে সজ্জনতারণায় ।
সদৈবমান্ধাতৃপুরে বসন্তমোঙ্কারমীশং শিবমেকমীড়ে ॥ ৪॥

অনুবাদঃ- কাবেরী ও নর্মদা নদীর পবিত্রে সঙ্গমেক্ষেত্রে মান্ধাতৃপুরে সজ্জননিস্তার্থ অবতীর্ণ ওঙ্কারেশ্বর শিবের স্তব করি।৪
পূর্বোত্তরে পারলিকাভিধানে সদা শিবং গিরিজাসমেতম্ ।
সুরাসুরারাধিতপাদপদ্মং শ্রীবৈদ্যনাথং সততং নমামি ॥ ৫॥

অনুবাদঃ- পূর্বোত্তর প্রান্তে পারলিক-নামক স্থানে পার্ব্বতীসমন্বিত সেই সদাশিব- যাঁহার পাদপদ্ম সুরাসুরের দ্বারা অর্চ্চিত সেই শ্রীবৈদ্যনাথকে সতত নমস্কার করি। ৫
আর্ম্মদ্দসংজ্ঞে নগরে চ রম্যে বিভূষিতাঙ্গং বিবিধৈশ্চ ভোগৈঃ ।
সদ্ভুক্তিমুক্তিপ্রদমীশমেকং শ্রীনাগনাথং শরণং প্রপদ্যে ॥ ৬॥

অনুবাদঃ- আর্ম্মদ্দনামক রমণীয় নগরে বিবিধ ভোগযুক্ত বিভুষিতদেহ সজ্জনের ভুক্তিমুক্তি প্রদাতা শ্রীনাগনাথ মহাদেবের শরণাপন্ন হইতেছি॥ ৬॥


হিমাদ্রিপার্শ্বেহপি তটেহরমন্তং সম্পূজ্যমানং সততং মুনীন্দ্রৈঃ ।
সুরাসুরৈর্যক্ষ মহোরগাদ্যৈঃ কেদারসংজ্ঞং শিবমেকমীড়ে ॥ ৭॥

অনুবাদঃ- হিমালয়পার্শ্বতটে, মুনীন্দ্রবৃন্দ, সুরাসুর, যক্ষ ও মহোরগাদি কর্ত্তৃক পূজিত কামনাশন কেদারনাথ নামক এক শিবকে স্তব করি।৭
সিংহাদ্রিশৃঙ্গেহপি তটে রমন্তং গোদাবরিতীরপবিত্রদেশে ।
যদ্দর্শনাৎ পাতকজাতনাশঃ প্রজায়তে ত্র্যম্বকমীশমীড়ে ॥ ৮॥

অনুবাদঃ- যাঁহার দর্শনমাত্রে পাপসমূহ বিনষ্ট হয়, গোদাবরীর পবিত্র তীর প্রদেশে সিংহাদ্রিপার্শ্বতটে কমনীয় ( অথবা অকাম) সেই ত্র্যম্বকেশ্বরের স্তব করি।৮
শ্রীতাম্রপর্ণীজলরাশিয়োগে নিবধ্য সেতুং নিশি বিল্বপত্রৈঃ।
শ্রীরামচন্দ্রেণ সমর্চ্চিতং তং রামেশ্বরাখ্যং সততং নমামি ॥ ৯॥

অনুবাদঃ- শ্রীতাম্রপর্ণী-সাগরসঙ্গমক্ষেত্রে, সেতুবন্ধনান্তে রাত্রিকালে শ্রীরামচন্দ্র কর্ত্তৃক অর্চ্চিত সেই রামেশ্বর শিবকে সতত নমস্কার করি। ৯
যো ডাকিনীশাকিনিকা-সমাজে নিষেব্যমাণং পিশিতাশনৈশ্চ ।
সদৈব ভীমাদিপদপ্রসিদ্ধং তং শঙ্করং ভক্তহিতং নমামি ॥ ১০॥

অনুবাদঃ- যিনি ডাকিনীশাকিনী সমাজে এবং রাক্ষসগণ কর্ত্তৃক সদা সেবিত হইয়া আসিতেছেন সেই ভক্তহিতকারী 'ভীম' আদিপদ প্রসিদ্ধ ভীমেশ্বর শঙ্করকে নমস্কার করি। ১০
সানন্দমানন্দবনে বসন্তমানন্দকন্দং হতপাপবৃন্দম্ ।
বারাণসীনাথমনাথনাথং শ্রীবিশ্বনাথং শরণং প্রপদ্যে ॥ ১১॥

অনুবাদঃ- আনন্দকাননে সর্ব্বদা সানন্দে অবস্থিত, পাপরাশি বিনাশী, আনন্দমূল, অনাথনাথ শ্রীবিশ্বনাথের শরণাপন্ন হইতেছি॥ ১১
এলাপুরীরম্যশিবালয়েঽস্মিন্ সমুল্লসন্তং ত্রিজগদ্বরেণ্যম্ ।
বন্দে মহোদারতরস্বভাবং সদাশিবং তং ধিষণেশ্বরাখ্যম।। ১২॥

অনুবাদঃ- এই এলাপুরীস্থ রম্য শিবালয়ে বিরাজমান, ত্রিজগদ্বরেণ্য, মহোদার-তর-স্বভাব-অর্থাৎ যাঁহার স্বরূপ তুলনায় সর্ব্বশ্রেষ্ঠ মহামহিমপূর্ণ- সেই প্রসিদ্ধ ধিষণেশ্বর বা ঘৃষ্ণেশ্বর নামক সদাশিবকে বন্দনা করি।
এতানি লিঙ্গানি সদৈব মর্ত্ত্যাঃ প্রাতঃ পঠন্তোহমলমানসাশ্চ।
তে পুত্রপৌত্রৈশ্চ ধনৈরুদারৈঃ সৎকীর্ত্তিভাজঃ সুখিনো ভবন্তি।।১৩

অনুবাদঃ- যেসকল মানব প্রত্যহ প্রাতঃকালে নির্ম্মলমানসে এই সকল লিঙ্গস্তব পাঠ করে তাহারা সৎকীর্ত্তিভাজন হইয়া পুত্র, পৌত্র, ধনসমৃদ্ধি দ্বারা সুখী হইয়া থাকে।১৩
॥ ইতি পরমহংস শ্রীমদ্শঙ্করভগবতঃ বিরচিতং
দ্বাদশজ্যোতির্লিঙ্গস্তোত্রং সম্পূর্ণম্ ॥

পরমহংস ভগবান শ্রীশঙ্করাচার্য্য বিরচিত
দ্বাদশজ্যোতির্লিঙ্গস্তোত্র সম্পূর্ণ ॥

Friday, 3 July 2020

উপনিষৎসকলে 'যোনি' শব্দের দ্বারা বর্ণিত হইয়াছেন বলিয়া ব্রহ্ম জগতের উপাদান কারণঃ-


শ্রীমৎ মহর্ষি বাদরায়ণ ভগবৎ প্রণীত বেদান্ত মীমাংসাশাস্ত্রের প্রকৃত্যধিকরণে বর্ণিত আছে-

যোনিশ্চ হি গীয়তে৷৷ -(ব্রহ্মসূত্র ১.৪.২৭)

শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- আচার্য্য শঙ্কর ভগবৎ ভাষ্যে বলিতেছেন- আর এইহেতুবশতঃও ব্রহ্ম জগতের উপাদান কারণ, যেহেতু উপনিষৎ সকলে ব্রহ্ম 'যোনি', এইরূপেও পঠিত হইতেছেন, যথা-

'কর্তারমীশং পুরুষং ব্রহ্মযোনিম্'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-৩.১.৩)

অর্থাৎ 'জগতের কর্ত্তা ঈশ্বর পুরুষ ব্রহ্মযোনি অর্থাৎ যিনি ব্রহ্ম আবার সর্ব্বকারণও।'

তদব্যয়ং যদ্ভূতযোনিং পরিপশ্যন্তি ধীরাঃ৷৷-(মুণ্ডক উপনিষৎ-১.১.৬)

অর্থাৎ 'এইরূপ লক্ষণবিশিষ্ট ভূতযোনি অর্থাৎ প্রাণিগণের সৃষ্টির কারণস্বরূপ, স্থাবর-জঙ্গমের কারণস্বরূপ পৃথিবীর ন্যায় যাঁহাকে তথা সকলের স্বরূপভূত সেই অব্যয়কে বিবেকিগণ সর্বত্র উপলব্ধি করেন।'ইত্যাদি শ্রুতি।

আর 'যোনি' শব্দটী প্রকৃতির (-উপাদানকারণের) বাচক, ইহা লোকমধ্যে অবগত হওয়া যায়, যথা-'পৃথিবী ওষধি ও বনস্পতিসকলের যোনি' ইত্যাদি। স্ত্রী যোনিও স্বীয় অবয়বের (-শোনিতের) দ্বারা হয় গর্ভের প্রতি উপাদানকারণ। কোন কোন স্থলে 'যোনি' শব্দ স্থানের বাচকরূপেও পরিদৃষ্ট হয়, যথা-

'যোনিষ্ট ইন্দ্র নিষদে অকারি'-(ঋগ্বেদ সংহিতা ১।১০৪।১)

অর্থাৎ 'হে ইন্দ্র!, তোমার উপবেশনের জন্য আমি যোনি (-স্থান) নির্ম্মাণ করিয়াছি।'

কিন্তু এখানে 'যথোর্ণনাভিঃ সৃজতে গৃহ্ণতে চ'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-১.১.৭)

'মাকড়সা কোন অন্যকারণের অপেক্ষা না করিয়া নিজেই সৃষ্টি করে অর্থাৎ নিজ শরীর হইতে অভিন্ন তন্তুরাশিকে বাহিরে প্রসারিত করে, আবার সেই সকলকে গ্রহণও করে অর্থাৎ নিজের সহিত একীভূত করিয়া ফেলে।'

ইত্যাদি এইজাতীয় বাক্যশেষবশতঃ যোনিশব্দটীর উপাদানকারণতারূপ অর্থ পরিগৃহীত হইতেছে। এইপ্রকারে ব্রহ্মের উপাদানকারণতা প্রকৃষ্টরূপে সিদ্ধ হইল।...........ইতি ভাষ্যানুসারে ভাবার্থ।

এইরূপ মাকড়সার শরীরের তন্তুরূপে পরিণামের ন্যায় ঈশ্বরের উপাধিভূতা মায়ার জগদ্রূপে পরিণামে ঈশ্বরের উপাদানকারণতাও সিদ্ধ হয়। এইরূপে মায়া-শবলিত ঈশ্বররূপ ব্রহ্মই হন জগতের অভিন্ননিমিত্তোপাদান কারণ।

 

Thursday, 2 July 2020

জ্ঞানীর ও অজ্ঞানীর কৃত কর্ম্মফলের ভেদঃ-



ভগবান সনৎসুজাত বলিতেছেন- 
অস্মিন্ লোকেতপস্তপ্তং ফলমন্যত্র ভুজ্যতে। 
ব্রাহ্মণানাং তপঃসু-ঋদ্ধম্ অন্যেষাং তাবদেব তৎ।
-(শ্রীমহাভারত, উদ্যোগপর্ব, ৪৩তম অধ্যায়, সনৎ-সুজাতীয় সম্বাদ-১০)
শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- ইহলোকে যে তপস্যাদি অনুষ্ঠিত হয় তাহার ফল পরলোকে ভোগ হইয়া থাকে-ইহাই সাধারণ নিয়ম। অনাত্মবিদ্ অর্থাৎ সকাম কর্ম্মীর অনুষ্ঠিত তপস্যা ততটাই ফল প্রদান করে যতটা শাস্ত্রে উল্লেখিত আছে কিন্তু ব্রহ্মবিদের তপস্যার ফল অধিক সমৃদ্ধ হইয়া থাকে।
ব্রহ্মবিদের তপস্যা ফলবৃদ্ধির হেতু হয়। কারণ শাস্ত্র বলেন-'যে কর্ম্মবিজ্ঞান, শ্রদ্ধা ও উপাসনাদিসহ সশ্রদ্ধচিত্তে জ্ঞানপূর্ব্বক অনুষ্ঠিত হয় তাহা অধিক ফলপ্রদ ও শক্তিশালী হইয়া থাকে।'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ ১।১।১০)
তাৎপর্য্য এই যে, সকাম কর্ম্মীর কর্ম্মফল পরলোকে ভোগ হয়, উহা সীমিত, স্বল্পকাল স্থায়ী। কিন্তু তত্ত্ববিদের যে জ্ঞানফল তাহা তিনি ইহলোকেই প্রাপ্ত হন এবং ঐ জ্ঞানফল মোক্ষ, অনন্তকাল স্থায়ী। কর্ম্ম অদৃষ্ট (পরলোক প্রাপ্তব্য) ফল প্রদান করে কিন্তু জ্ঞান দৃষ্ট ফল প্রদাতা-ইহাই বিশেষ। জ্ঞানী দৃষ্ট ফল মোক্ষ, বর্তমান শরীরেরই অনুভব করিয়া কৃতার্থ হইয়া থাকেন-ইহাই জ্ঞানের পরম বৈশিষ্ট্য।

তত্ত্বোপদেশ ১-৯


শঙ্করাচার্য্য বিরচিত তত্ত্বোপদেশঃ-

তত্ত্বংপদার্থশুদ্ধ্যর্থং গুরুঃ শিষ্যং বচোঽব্রবীৎ ।

বাক্যে তত্ত্বমসীত্যত্র ত্বং-পদার্থং বিবেচয় ॥ ১॥ 

গুরু শিষ্যকে বলিলেন-'তত্ত্বমসি'(তৎ, ত্বম্, অসি) এই শ্রুতিবাক্যে তৎ ও ত্বং পদের প্রতিপাদ্য পদার্থের শোধনের নিমিত্ত পূর্ব্বে ত্বং পদার্থের বিবেক কর, অর্থাৎ দেহাদি হইতে পৃথক করিয়া জান। ১

ন ত্বং দেহোঽসি দৃশ্যৎবাদুপজাত্যাদিমত্ত্বতঃ ।

ভৌতিকৎবাদশুদ্ধৎবাদনিত্যত্ত্বাত্তথৈব চ ॥ ২॥ 

ত্বং-পদের প্রতিপাদ্য তুমি শরীর নহ; কারণ দেহ-দৃশ্য জড়, ব্রাহ্মণত্বাদি অবান্তর জাতিযুক্ত, পঞ্চভূতনির্ম্মিত, অশুদ্ধ ও অনিত্য। ২

অদৃশ্যো রূপহীনস্ত্বং জাতিহীনোঽপ্যভৌতিকঃ ।

শুদ্ধনিত্যোঽসি দৃগ্রূপো ঘটো যদ্বন্ন দৃগ্ভবেৎ ॥ ৩॥ 

কিন্তু ত্বং পদ প্রতিপাদ্য তুমি অদৃশ্য, রূপহীন, জাতিশূন্য, ভূতসম্ভূত নহ, তুমি শুদ্ধ, নিত্য ও জ্ঞানস্বরূপ, ঘটাদি জড়বস্তু যেমন জ্ঞানস্বরূপ হয় না, দেহও তদ্রূপ জ্ঞানস্বরূপ হয় না। ৩

ন ভবানিন্দ্রিয়াণ্যেষাং করণৎবেন যা শ্রুতিঃ ।

প্রেরকস্ত্বং পৃথক্তেভ্যো ন কর্তা করণং ভবেৎ ॥ ৪॥ 

ত্বং পদ প্রতিপাদ্য তুমি ইন্দ্রিয়সমূহ নহ, কারণ শ্রুতিতে ইন্দ্রিয়সমূহকে করণ বলা হইয়াছে। তুমি সেই ইন্দ্রিয়গণের প্রেরকরূপ কর্ত্তা, এইজন্য সেইসকল ইন্দ্রিয় হইতে তুমি ভিন্ন, কারণ কর্ত্তা কখন করণ হয় না। ৪

নানৈতান্যেকরূপস্ত্বং ভিন্নস্তেভ্যঃ কুতঃ শৃণু ।

ন চৈকেন্দ্রিয়রূপস্ত্বং সর্বত্রাহম্প্রতীতিতঃ ॥ ৫॥ 

ইন্দ্রিয়গুলি নানারূপ, তুমি কিন্তু একরূপ, এইজন্য তুমি সেই সকল ইন্দ্রিয় হইতে ভিন্ন। কেন তুমি ইন্দ্রিয় হইতে ভিন্ন তাহা আমার নিকট শ্রবণ কর। সর্ব্বত্র 'আমি'-এইরূপ প্রতীতি হওয়ায় তুমি একটী ইন্দ্রিয়েরও স্বরূপ নহ। ৫

ন তেষাং সমুদায়োঽসি তেষামন্যতমস্য চ ।

বিনাশেঽপ্যাত্মধীস্তাবদস্তি স্যান্নৈবমন্যথা ॥ ৬॥

ইন্দ্রিয়সমষ্টি তুমি নহ, তাহাদের মধ্যে অন্যতম অর্থাৎ কোন একটী তুমি নহ, কারণ ইন্দ্রিয়ের বিনাশ হইলেও 'আমি' এইরূপ আত্মজ্ঞান অব্যাহত থাকে। অন্যথা যে আমি দেখিয়াছিলাম, সেই আমি স্মরণ করিতেছি এইরূপ অনুভব হইত না। ৬

প্রত্যেকমপি তান্যাত্মা নৈব তত্র নয়ং শৃণু ।

নানাস্বামিকদেহোঽয়ং নশ্যেদ্ভিন্নমতাশ্রয়ঃ ॥ ৭॥

সেইসকল ইন্দ্রিয়ের মধ্যে প্রত্যেক ইন্দ্রিয় আত্মা হইতে পারে না। কেন হয় না, তদ্বিষয়ে যুক্তি শ্রবণ কর। প্রত্যেক ইন্দ্রিয় আত্মা হইলে এইদেহের অনেক স্বামী হইল, স্বতন্ত্র অনেক স্বামীর অনেক মত, সুতরাং শরীর নষ্ট হইতে পারে। ৭

নানাত্মাভিমতং নৈব বিরুদ্ধবিষয়ৎবতঃ ।

স্বাম্যৈক্যে তু ব্যবস্থা স্যাদেকপার্থিবদেশবৎ ॥ ৮॥

যদি এইদেহের বহু স্বামী হয়, তাহা হইলে তাহাদের মত পরস্পর বিরুদ্ধ হইবে, সুতরাং নানা আত্মা, ইহা কাহারও অভিমত নহে। যেমন রাজ্যের একটী রাজা হইলে ব্যবস্থা হয়, দেহের স্বামী এক হইলে ব্যবস্থা সঙ্গত হয়। ৮

 মনস্ত্বং  বা প্রাণো জডত্বাদেব চৈতয়োঃ 

গতমন্যত্র মে চিত্তমিত্যন্যত্বানুভূতিতঃ  ৯॥

তুমি মন কিংবা প্রাণ হইতে পার না; কেননা, মন এবং প্রাণ উভয়ই জড়। আরও 'আমার মন অন্যত্র গিয়াছে' এইরূপ পার্থক্য অনুভব হয় বলিয়া মন আত্মা নহে। ৯

 

Monday, 29 June 2020

আত্মবোধ (১-৫)


শঙ্করাচার্য্য বিরচিত আত্মবোধঃ-
॥ আত্মবোধঃ ॥
তপোভিঃ ক্ষীণপাপানাং শান্তানাং বীতরাগিণাম্ ।
মুমুক্ষূণামপেক্ষ্যোঽয়মাত্মবোধো বিধীয়তে ॥ ১॥

বিবিধ তপস্যার দ্বারা যাহাদিগের পাপ ক্ষয় প্রাপ্ত হইয়াছে, যাঁহারা শান্ত ও বিষয়ে অনুরাগশূন্য, তাদৃশ মুমুক্ষুগণের অপেক্ষণীয় আত্মবোধ নামক গ্রন্থ রচিত হইতেছে।১
বোধোঽন্যসাধনেভ্যো হি সাক্ষান্মোক্ষৈকসাধনম্ ।
পাকস্য বহ্নিবজ্জ্ঞানং বিনা মোক্ষো ন সিধ্যতি ॥ ২॥

অন্য সাধন অপেক্ষা একমাত্র জ্ঞানই সাক্ষাৎ মোক্ষের কারণ, যেমন অন্নাদি পাকের মত যত কিছু উপায় আছে, তন্মধ্যে অগ্নিই প্রধান সাধন। কারণ জ্ঞান ব্যতীত মুক্তি লাভ হয় না।২
অবিরোধিতয়া কর্ম নাবিদ্যাং বিনিবর্তয়েৎ ।
বিদ্যাবিদ্যাং নিহন্ত্যেব তেজস্তিমিরসঙ্ঘবৎ ॥ ৩॥

অবিদ্যার সহিত কর্ম্মের কোন বিরোধ না থাকায়, কর্ম্ম কখনও অবিদ্যাকে নিবৃত্ত করিতে পারে না। (বিরোধিতাবশতঃ) আলোক যেমন অন্ধকাররাশি দূর করে, সেইরূপ বিদ্যা (জ্ঞান), অবিদ্যাকে (অজ্ঞানকে) নিবৃত্ত করিয়া থাকে।৩
পরিচ্ছন্ন ইবাজ্ঞানাত্তন্নাশে সতি কেবলঃ ।
স্বয়ং প্রকাশতে হ্যাত্মা মেঘাপায়েংঽশুমানিব ॥ ৪॥

আত্মা অজ্ঞানবশতঃ পরিচ্ছিনের ন্যায় প্রতীত হন, মেঘ অপসৃত হইলে সূর্য্য যেমন প্রকাশিত হয়, সেইরূপ অজ্ঞান বিনাশ প্রাপ্ত হইলে, শুদ্ধ স্বয়ংপ্রকাশ আত্মা প্রকাশিত হইয়া থাকেন।৪
অজ্ঞানকলুষং জীবং জ্ঞানাভ্যাসাদ্বিনির্মলম্ ।
কৃৎবা জ্ঞানং স্বয়ং নশ্যেজ্জলং কতকরেণুবৎ ॥ ৫॥

কতকরেণু (কতকবৃক্ষের ফল অর্থাৎ নির্মলী ফল কলুষিত জলে ফেলে দিলে তার দ্বারা জল স্বচ্ছ ও শুদ্ধ হয়) যেমন জলের মালিণ্য দূর করিয়া স্বয়ং বিলয়প্রাপ্ত হয়, সেইরূপ জ্ঞান অজ্ঞানের দ্বারা কলুষিত জীবকে অত্যন্ত নির্ম্মল করিয়া স্বয়ং বিনাশ প্রাপ্ত হয়। এখানে 'জ্ঞান' শব্দে ব্রহ্মাকার অন্তঃকরণের বৃত্তি বুঝিতে হইবে।৫

Friday, 19 June 2020

শ্রুতিবাক্য হইতে কর্তৃত্ব ও কর্ম্মত্ব প্রদর্শন দ্বারা মায়ারূপ উপাধিযুক্ত ব্রহ্মের নিমিত্তকারণতা ও উপাদানকারণতা প্রদর্শনঃ-


মহর্ষি বাদরায়ন ভগবৎ প্রণীতম্ বেদান্তমীমাংসা শাস্ত্রের ১ম অধ্যায়ের ৪র্থ পাদে বর্ণিত আছে-

আত্মকৃতেঃ পরিণামাৎ ৷৷ ব্রহ্মসূত্র ১.৪.২৬ ৷৷

শাঙ্করভাষ্য অনুবাদঃ-এই সূত্রাবলম্বনে ভগবৎপূজ্যপাদ্ শঙ্করাচার্য্যের ভাষ্য হইল-আর এইহেতু বশতঃ ব্রহ্ম জগতের উপাদান কারণ, যেহেতু শ্রুতি ব্রহ্মবোধক প্রক্রিয়াতে 'তদাত্মানং স্বয়মকুরুত'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২।৭) অর্থাৎ "তিনি নিজেই নিজেকে জগৎরূপ করিয়াছিলেন' এই প্রকারে আত্মার কর্ম্মত্ব (উপাদানকারণতা) এবং কর্ত্তৃত্ব (নিমিত্তকারণতা) প্রদর্শন করিতেছেন। 'নিজেকে' এইরূপে কর্ম্মত্ব এবং 'নিজেই করিয়াছিলেন' এইরূপে কর্ত্তৃত্ব প্রদর্শিত হইয়াছে।
আচ্ছা এখন প্রশ্ন হইল, যিনি পূর্ব্বসিদ্ধ (পূর্ব্ব হইতে বিদ্যমান) কর্ত্তৃরূপে অবস্থিত সদ্বস্তু, তাঁহার ক্রিয়মানতা (-জগৎরূপে উৎপন্ন হওয়া) কি প্রকারে সম্পাদন করা যায়? তদুত্তরে আমরা বলিব-যেহেতু পরিণাম হয়। আত্মা পূর্ব্বসিদ্ধ হইলেও বিশেষ বিকারাত্মকরূপে (মিথ্যা কার্য্যরূপে) নিজেকে পরিণত (বিবর্ত্তিত) করিয়াছিলেন। ঠিক যেমন মৃত্তিকা প্রভৃতি উপাদানকারণ সকলে (ঘটাদি) কার্য্যরূপে পরিণাম উপলব্ধ হয়। আর উক্ত শ্রুতিবাক্যে 'স্বয়ম' এই প্রকার বিশেষণ থাকায় তিনি যে অন্য নিমিত্তকারণের অপেক্ষা করেন না, ইহাও প্রতীত হইতেছে।
অথবা 'পরিণামাৎ' ইহা পৃথকসূত্র। তাঁহার অর্থ এই -আর এই হেতুবশতঃ ব্রহ্ম জগতের উপাদান কারণ, যেহেতু-
'সচ্চ ত্যচ্চাভবন্নিরুক্তং চানিরুক্তং চ' -(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২।৬)
অর্থাৎ "তিনি সৎ(মূর্ত্ত) এবং ত্যৎ (অমূর্ত্ত) হইলেন। মূর্ত্তামূর্ত্ত অর্থাৎ আত্মাতে স্থিত অনভিব্যক্তি নামরূপ, অন্তঃপ্রবিষ্ট আত্মার নিমিত্ত মূর্ত্তামূর্ত্ত শব্দসংজ্ঞায় অভিব্যক্ত হইল। তিনি নিরুক্ত (পরিচ্ছিন্ন) ও অনিরূক্ত (অপরিচ্ছিন্ন) হইলেন। নিরূক্ত হইতেছে সজাতীয় বিজাতীয় পদার্থসকল হইতে পৃথক্ করিয়া স্থানকালবিশিষ্টরূপে অর্থাৎ 'ইহা তাহা' এই রূপে যাহা কথিত আর অনিরুক্ত হইতছে তাহার বিপরীত।"
ইত্যাদি এইরূপ সামানাধিকরণ্যের দ্বারা অর্থাৎ সমান বিভক্তিযুক্ত পদপ্রয়োগের দ্বারা ব্রহ্মেরই বিকারাত্মকরূপে (কার্য্যবস্তুরূপে) পরিণাম (বিবর্ত্ত) শ্রুতিতে পঠিত হইতেছে।
ইতি ভাষ্যানুবাদ।

Monday, 8 June 2020

প্রশ্নোত্তররত্নমালিকা


ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্য বিরচিত 'প্রশ্নোত্তর রত্নমালিকা':-

এই প্রশ্নোত্তররূপ রত্নমালা কন্ঠে ধারণ করিলে দৃষ্ট ও অদৃষ্ট অর্থ সাধনে সমর্থ কোন ব্যক্তি অলঙ্কৃত না হন। যদি প্রশ্নোত্তররূপ রত্নমালা কন্ঠে ধারণ করা যায়, তাহা হইলে লোকের নিকটে সমাদরলাভরূপ দৃষ্ট প্রয়োজন সাধিত হয়। আর প্রশ্নোত্তররত্নমালিকানামক গ্রন্থ কন্ঠস্থ করিলে অদৃষ্ট অর্থাৎ অলৌকিক তত্ত্বজ্ঞান উদিত হয় যদ্যপি তত্ত্বজ্ঞান দৃষ্টফল, তথাপি লোকসিদ্ধ নহে বলিয়া অদৃষ্টফল বলা হয়েছে।।১।।

শিষ্য গুরুকে জিজ্ঞাসা করিলেন-"ভগবান! উপাদেয় কি? অর্থাৎ কোন বস্তু গ্রহণযোগ্য?".. গুরু বলিলেন- "গুরুর বাক্য।"

শিষ্য-"হেয় অর্থাৎ ত্যাজ্য কি?"... গুরু বলিলেন-"অসৎকার্য্য।"

শিষ্য-"গুরু কে?"... গুরু-"যিনি ব্রহ্মতত্ত্ব লাভ করিয়াছেন এবং যিনি সর্ব্বদা শিষ্যের হিতে রত।"২ 

শিষ্য-"বিদ্বান ব্যক্তির কোন কার্য্য শীঘ্র করণীয়?", গুরু-"অবিচ্ছিন্ন সংসারের বিনাশ।" শিষ্য-"মুক্তি বৃক্ষের কারণ কি? ,গুরু-"সম্যক্ জ্ঞান অর্থাৎ তত্ত্বজ্ঞান, যে জ্ঞান কর্ম্মানুষ্ঠান করিতে করিতে সিদ্ধ হয়।"৩

শিষ্য-"অতিশয় হিতকর বস্তু কি?" ....গুরু-"ধর্ম্ম।" শিষ্য-"এই সংসারে শুচি কে?"...গুরু-"যাঁহার চিত্তশুদ্ধ।" শিষ্য-"পণ্ডিত কে?..গুরু-"বিবেকী অর্থাৎ যিনি আত্মা ও অনাত্মার বিবেক করিয়াছেন।" শিষ্য-"বিষ কি? গুরু-"গুরুর প্রতি অবজ্ঞা।"৪ 

শিষ্য-সংসারে সার কি? গুরু-যাহা অনেকবার চিন্তার দ্বারা নির্ণীত হইয়াছে। শিষ্য-নিরতিশয় অভিলষিত বস্তু কি? গুরু-যিনি নিজ ও পরের হিতে রত তাদৃশ ব্যক্তির জন্মলাভ।৫

শিষ্য- মদিরার ন্যায় মোহজনক বস্তু কি? গুরু-স্নেহ। শিষ্য-দস্যু কাহারা? গুরু-বিষয়সমূহ। শিষ্য-সংসার বন্ধনের রজ্জু কি? গুরু-বিষয়তৃষ্ণা। শিষ্য-শত্রু কে? গুরু-যাহার কোনরূপ উদ্যোগ বা চেষ্টা নাই।৬

শিষ্য-এই সংসারে জীব কোন বস্তু হইতে ভীত হয়? গুরু-মরণ হইতে। শিষ্য-অন্ধ হইতে বিশিষ্ট অর্থাৎ অত্যন্ত অন্ধ কে? গুরু-সংসারে যাঁহার অনুরাগ। শিষ্য-শূর কে? গুরু-যিনি রমণীগণের নয়নবাণের দ্বারা বিদ্ধ হন না।৭ 

শিষ্য- এই সংসারে কোন্ অমৃত কর্ণরূপ অঞ্জলির দ্বারা পান করা যুক্তিসঙ্গত? গুরু- সদুপদেশ।

শিষ্য- গৌরবের কারণ কি? গুরু- কাহারও নিকট প্রার্থনা না করা।।৮।।

শিষ্য- গহন অর্থাৎ দুর্বোধ বস্তু কি? গুরু- স্ত্রীচরিত্র।

শিষ্য- চতুর কে? গুরু- যিনি স্ত্রীজিত নহেন, অথবা স্ত্রীচরিত্রে মুগ্ধ নহেন।

শিষ্য- দুঃখ বা দারিদ্র্য কাকে বলে? গুরু- অসন্তোষ।

শিষ্য- লঘুতা কাহাকে বলে? গুরু- অধমের নিকট প্রার্থনা।।৯।।

শিষ্য- প্রাণীগণের জীবন অর্থাৎ বেঁচে থাকা কাহাকে বলে? গুরু- দোষশূন্যতা।

শিষ্য- জড়তা কাহাকে বলে? গুরু- শরীরের সামর্থ্য থাকিলেও বিষয় প্রকাশ না হওয়া অথবা অধ্যয়ন করিলেও অভ্যাস না করা।

শিষ্য- কে জাগরিত থাকেন? গুরু- বিবেকী।

শিষ্য- নিদ্রা কাহাকে বলে? গুরু- মূঢ়তা।। ১০।।

শিষ্য- পদ্মপত্রস্থ জলের ন্যায় চঞ্চল কি? গুরু- যৌবন, ধন ও আয়ুঃ।

শিষ্য- চন্দ্রকিরণের তুল্য নির্ম্মল চরিত্র কারা? গুরু- সজ্জনগণ।।১১।।

শিষ্য- নরক কাহাকে বলে? গুরু- পরাধীনতা।

শিষ্য- সুখ কি? গুরু- সমস্তসঙ্গ-নিবৃত্তি।

শিষ্য- সত্য বা সাধ্য কি? গুরু- প্রাণীগণের কল্যাণসাধন।

শিষ্য- প্রাণীগণের প্রিয় কি? গুরু- প্রাণ।।১২।।

শিষ্য- যাহার ফল অনর্থ এমন বস্তু কি? গুরু- মান।

শিষ্য- সুখপ্রদ বস্তু কি? গুরু- সাধু ব্যক্তির সহিত মিত্রতা।

শিষ্য- কোন ব্যক্তি সর্ব্বপ্রকার ব্যসন দূরীভূত করিতে সমর্থ? গুরু- যিনি ত্যাগী।।১৩।।

শিষ্য- মরণ কাহাকে বলে? গুরু- মূর্খতা।।

শিষ্য- অনর্ঘ অর্থাৎ অমূল্য বস্তু কে? গুরু- যথাসময়ে দান।৷

শিষ্য- মরণকাল পর্য্যন্ত শল্য অর্থাৎ শল্যের ন্যায় ব্যথাপ্রদ কি? গুরু- গোপনীয় পাপ।।১৪।।

শিষ্য- কোন বিষয়ে যত্ন করা উচিত? গুরু- সর্ব্বদা বিদ্যার্জ্জনে, ঔষধসেবনে ও দানে।

শিষ্য- কোন্ বস্তুতে অবজ্ঞা প্রদর্শনকরা কর্ত্তব্য? গুরু- খল, পরস্ত্রী ও পরধনে।।১৫।।

শিষ্য- দিবারাত্রি কোন্ বিষয়ের চিন্তা করা উচিত? গুরু- সংসারের অসারতা, কিন্তু স্ত্রীবিষয়ে চিন্তা করা উচিত নহে।

শিষ্য- প্রিয়তর বস্তু বলিয়া কি চিন্তনীয়? গুরু- দীনে দয়া ও সজ্জনের সহিত মিত্রতা৷।১৬।।

শিষ্য- প্রাণ কন্ঠাগত হইলেও কাহার চিত্ত জয় করিতে পারা যায় না? গুরু- মূর্খের, শঙ্কিত ব্যক্তির, বিষাদগ্রস্ত ও কৃতঘ্ন ব্যক্তির।।১৭।।

শিষ্য- সাধু কে? গুরু- যিনি সচ্চরিত্র।

শিষ্য- কাহাকে অধম বলা যায়? গুরু- যে অসচ্চরিত্র।

শিষ্য- কে এই জগৎকে জয় করিয়াছেন? গুরু- সত্যনিষ্ঠ ও শীতোষ্ণাদি দ্বন্দসহিষ্ণু ব্যক্তি।১৮।।

শিষ্য- দেবগণ কাহাকে নমস্কার করিয়া থাকেন? গুরু- দয়াপ্রধান ব্যক্তিকে।

শিষ্য- সংসারারণ্য হইতে কাহাদের উদ্বেগ উপস্থিত হয়? গুরু- সুধী ব্যক্তি।।১৯।।

শিষ্য- প্রাণীগণ কাহার বশীভূত? গুরু- সত্য ও প্রিয়ভাষী বিনীত ব্যক্তির।

শিষ্য- কোথায় স্থাতব্য? গুরু- দৃষ্টাদৃষ্টলাভযুক্তন্যায্য পথে।।২০।।

শিষ্য- অন্ধ কে? গুরু- যিনি অসৎকার্য্যে নিরত।

শিষ্য- বধির কে? গুরু- যে হিতোপদেশ শ্রবণ না করে।

শিষ্য- মূক (বোবা) কে? গুরু- যে যথাকালে প্রিয়বাক্য বলিতে জানে না।।২১।।

শিষ্য- দান কি? গুরু- যাহাতে আকাঙ্ক্ষা নাই।

শিষ্য- মিত্র কে? গুরু- যিনি পাপ হইতে নিবারণ করেন।

শিষ্য- অলঙ্কার কি? গুরু- চরিত্র।

শিষ্য- বাক্যের ভূষণ কি? গুরু- সত্য।।২২।।

শিষ্য- বিদ্যুৎ প্রভার ন্যায় চঞ্চল বস্তু কি? গুরু- দুর্জ্জনসঙ্গ ও যুবতীগণ।

শিষ্য- কুল ও চরিত্রের দ্বারা অটল অর্থাৎ কুলশীলবান্ কাহারা? গুরু- যাহারা কলিকালেও সজ্জন।। ২৩।।

শিষ্য -এই সংসার এ চিন্তামণির ন্যায় দুর্লভ কি? গুরু-বলিতেছি, তাহা 'চতুভদ্র' অর্থাৎ চারিটী কল্যাণপ্রদ বস্তু। শিষ্য - অজ্ঞানশূন্য ব্যক্তিরা তাহাকে আবার বিশেষভাবে কি বলেন?।।২৪।।

গুরু- প্রিয়বাক্যসহিত দান,গর্ব্ববিহীন জ্ঞান, ক্ষমাযুক্ত শৌর্য্য, ত্যাগসহিত ধন এই চতুভদ্র জগতে দুর্ল্লভ।। ২৫।।

শিষ্য- শোচ্য অর্থাৎ দুঃখের বিষয় কি? গুরু- ঐশ্বর্য থাকিতে কৃপণতা। শিষ্য- প্রশংসনীয় বস্তু কি? গুরু- উদারতা। শিষ্য- বিদ্বদগণেরও পূজ্য কে? গুরু- যিনি স্বভাবতঃ বিনীত।।২৬।।

শিষ্য- কুলরূপ পদ্মের সূর্য্যস্বরূপ কে অর্থাৎ কে কুলের গৌরব বর্দ্ধিত করে? গুরু- গুন থাকিতেও যিনি নম্র। শিষ্য- জগৎ কাহার বশীভূত? গুরু- যাঁহার বাক্য প্রিয় ও হিতকর যিনি ধর্ম্মপরায়ণ।।২৭।।

শিষ্য- কোন বস্তু বিদ্বদগণের চিত্তাকর্ষক? গুরু- উৎকৃষ্ট কবিতা ও বোধরূপ রমণী অর্থাৎ ভাল কবিতা ও জ্ঞান বিদ্বদগণের মনঃ হরণ করে। শিষ্য- বিপৎ কাহাকে স্পর্শ করে না? গুরু- যে ব্যক্তি বৃদ্ধবাক্যের অনুসরণ করেন এবং যিনি ইন্দ্রিয় নিগ্রহ করিয়াছেন।।২৮।।

শিষ্য- লক্ষ্মী কাহার প্রতি প্রসন্না হন? গুরু- যাহার চিত্তে অালস্য নাই এবং যিনি নীতিপথ অনুসরণ করেন। শিষ্য- লক্ষ্মী কাহাকে হঠাৎ পরিত্যাগ করেন? গুরু- যে ব্যক্তি ব্রাহ্মণ, গুরু ও দেবতার নিন্দা করে এবং আলস্যপরায়ণ।।২৯।।

শিষ্য- কোথায় বাস করা কর্ত্তব্য? গুরু- সাধুগণের নিকটে অথবা কাশীতে। শিষ্য- কোন দেশ পরিত্যায্য? গুরু- পিশুনযুক্ত অর্থাৎ ক্রূরজনযুক্ত স্থল এবং লোভী রাজা যেখানে আছে, সে দেশ।।৩০।।

শিষ্য- কাহার দ্বারা লোক শোচ্য অর্থাৎ দুঃখভাগী হয় না? গুরু- প্রণত অর্থাৎ বশীভূত স্ত্রী এবং স্থিতিশীল সম্পদের দ্বারা পুরুষ দুঃখভাগী হয় না। শিষ্য- এই সংসারে কে দুঃখভাগী হয়? গুরু- অর্থ থাকিতে যে দান করে না।।৩১।।

শিষ্য- লঘুতার কারণ কি? গুরু-সাধারণ লোকের নিকট প্রার্থনা। শিষ্য- রাম অপেক্ষা শূর কে? গুরু- কামবাণের আঘাতে যিনি চঞ্চল হন না।।৩২।।

শিষ্য- সর্ব্বদা চিন্তনীয় বস্তু কি? গুরু- ভগবানের চরণ,সংসার নহে। শিষ্য- কাহারা চক্ষুঃ থাকিতেও অন্ধ? গুরু- যাহারা নাস্তিক মানব।।৩৩।।

শিষ্য- এই সংসারে পঙ্গু বলিয়া প্রসিদ্ধ কে? গুরু- যে বৃদ্ধকালে তীর্থে গমন করে। শিষ্য- কোন তীর্থটী প্রধান? গুরু- যাহা চিত্তের মল দূরীভূত করে।।৩৪।।

শিষ্য- মানবের কোনটী স্মরণীয়? গুরু- হরিনাম স্মরণ করা কর্ত্তব্য কিন্তু যবনের ভাষা নহে। শিষ্য- সুধী ব্যক্তির কোন বিষয় বক্তব্য নহে? গুরু- পরদোষ ও মিথ্যাবাক্য।।৩৫।।

শিষ্য- মানবের কোনটী সম্পাদনীয়? গুরু- বিদ্যা,ধন,বল, যশঃ ও পুণ্য। শিষ্য- কোনটি সকল কোনটী সকল গুণনাশক? গুরু- লোভ। শিষ্য- শত্রু কে? গুরু- কাম।।৩৬।।

শিষ্য- কোন সভা ত্যাজ্য? গুরু- বৃদ্ধমন্ত্রিবিহীন। শিষ্য- এই সংসারে মানবের কোন বিষয়ে সাবধান হওয়া উচিত? গুরু- রাজ সেবাতে।।৩৭।।

শিষ্য- প্রাণ অপেক্ষা রমণীয় কি? গুরু- কুলধর্ম্ম ও সাধুসঙ্গ। শিষ্য- কোন কির্ত্তী রক্ষা করা উচিত? গুরু- পতিব্রতা স্ত্রী ও নিজের বুদ্ধি।।৩৮।।

শিষ্য- সংসারে কল্পবৃক্ষ কাহাকে বলে? গুরু- সাধুশিষ্যে অর্পিত বিদ্যাকে। শিষ্য- অক্ষয়বটবৃক্ষ কি? গুরু- বিধিপূর্ব্বকসৎপাত্রে দান।।৩৯।।

শিষ্য- সকলের শস্ত্র কি? গুরু- যুক্তি। শিষ্য- মাতা কে? গুরু- ধেনু। শিষ্য- বল কি? গুরু- ধৈর্য। শিষ্য- মৃত্যু কি? গুরু- অসাবধানতা।।৪০।।

শিষ্য- বিষ কোথায় থাকে? গুরু- দুষ্ট মনুষ্যে। শিষ্য- সংসারে মানবের অশৌচ কি? গুরু- ঋণ। শিষ্য- অভয় কোনটী? গুরু- বৈরাগ্য। শিষ্য- সকলের ভয় কোনটী? গুরু- ধন।।৪১।।

শিষ্য- মানবের দুর্ল্লভ কি? গুরু- হরিভক্তি। শিষ্য- পাপ কি? গুরু- হিংসা। শিষ্য- কে ভগবানের প্রিয়? গুরু- যিনি নিজে উদ্বেগশূন্য হইয়া অপরের উদ্বেগ জন্মান না।।৪২।।

শিষ্য- কোথা হইতে সিদ্ধিলাভ কর্ত্তব্য? গুরু- তপস্যা হইতে। শিষ্য- কোথায় বুদ্ধি স্থাপনীয়? গুরু- ব্রাহ্মণে। শিষ্য- বুদ্ধি কোথা হইতে উৎপন্ন হয়? গুরু- বৃদ্ধসেবার দ্বারা। শিষ্য- বৃদ্ধ কে? গুরু- যাঁহারা ধর্ম্মতত্ত্ব জানেন।।৪৩।।

শিষ্য- সম্মানিত ব্যক্তির মরণ অপেক্ষা অধিক কি? গুরু- নিন্দা। শিষ্য- এই সংসারে সুখী কে? গুরু- ধনবান। শিষ্য- ধন কাহাকে বলে? গুরু- যাহা হইতে অভিলাষিত ফল প্রাপ্ত হওয়া যায়।।৪৪।।

শিষ্য- সকল সুখের কারণ কি? গুরু- পুণ্য। শিষ্য- কোথা হইতে দুঃখ উৎপন্ন হয়? গুরু- পাপ হইতে। শিষ্য- কাহার নিকট ঐশ্বর্য্য আছে? গুরু- যিনি ভক্তি সহকারে শিবের আরাধনা করেন।।৪৫।।

শিষ্য- কাহার উন্নতি হয়? গুরু- বিনীত ব্যক্তির। শিষ্য- কে পরাভূত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়? গুরু-যে ব্যক্তি গর্ব্বিত। শিষ্য- কাহাকে বিশ্বাস করা উচিৎ নহে? গুরু- যে সর্ব্বদা মিথ্যা কথা বলে।।৪৬।।

শিষ্য- কিরূপ মিথ্যা বাক্যে পাপ নাই? গুরু- যাহা ধর্ম্মরক্ষার্থ কথিত হয়। শিষ্য- কোন ধর্ম্ম সকলের অভিমত? গুরু- যাহা শিষ্ট ব্যক্তিগণের নিজ নিজ কুলপরাপরাগত।।৪৭।।

শিষ্য- সাধুর বল কি? গুরু- দৈব। শিষ্য- সাধু কে? গুরু- যিনি সর্ব্বদা সন্তুষ্ট। শিষ্য- দৈব কি? গুরু- পুণ্য। শিষ্য- পুণ্যবান কে? গুরু- সাধুরা যাহার সুনাম করে।।৪৮।।

শিষ্য-গৃহস্থের মিত্র কে? গুরু- স্ত্রী। শিষ্য- গৃহী কে? গুরু- যিনি যাগ করে। শিষ্য- যজ্ঞ কাহাকে বলে? গুরু- যাহা বেদে বিহিত এবং যাহা মনুষ্যগণের শ্রেয়স্কর।।৪৯।।

শিষ্য- কাহার ক্রিয়া ফলবতী হয়? গুরু- যে শিষ্ট ব্যক্তি আচারবাণ্। শিষ্য- শিষ্ট কে? গুরু- যিনি বেদরূপ প্রমাণে বিশ্বাসী। শিষ্য- হত কে? গুরু- যিনি ক্রিয়াভ্রষ্ট।।৫০।।

শিষ্য- ধন্য কে? গুরু- সন্ন্যাসী। শিষ্য- মান্য কে? গুরু- যিনি পণ্ডিত ও সাধু। শিষ্য- কাহার সেবা করণীয়? গুরু- যিনি দাতা। শিষ্য- দাতা কে? গুরু- যিনি যাচকের তৃপ্তি সাধন করেন।।৫১।।

শিষ্য- প্রাণীগণের ভাগ্য কি? গুরু- আরোগ্য। শিষ্য- সফল কে? গুরু- কৃষিকার্য্যকারী মানব। শিষ্য- কাহার পাপ নাই? গুরু- জপকারী পুরুষের। শিষ্য- পূর্ণ কে? গুরু- যিনি সন্ততিযুক্ত।।৫২।।

শিষ্য- মানবগণের দুষ্কর কি? গুরু- সর্ব্বদা মনের নিগ্রহ। শিষ্য- কে ব্রহ্মচর্য্যবাণ অর্থাৎ ব্রহ্মচারী? গুরু- যিনি উর্দ্ধরেতাঃ হইতে স্খলিত হন নাই অর্থাৎ যিনি অস্খলিতবীর্য্য।।৫৩।।

শিষ্য- শাস্ত্রে কাহাকে শ্রেষ্ঠ দেবতা বলিয়াছেন? গুরু- চিচ্ছক্তি অর্থাৎ চৈতন্য। শিষ্য- কে জগৎ রক্ষা করেন? গুরু- সূর্য্য। শিষ্য- সকলের জীবনহেতু কে? গুরু- মেঘ।।৫৪।।

শিষ্য- শূর কে? গুরু- যিনি ভয় হতে রক্ষা করেন। শিষ্য- রক্ষক কে? গুরু- গুরু। শিষ্য - কাহাকে জগদগুরু বলা যায়? গুরু- মহাদেবকে। শিষ্য- জ্ঞান কোথা হইতে পাওয়া যায়? গুরু- শিব হইতে।।৫৫।।

শিষ্য- কোথা হইতে মুক্তি লাভ হয়? গুরু- মুকুন্দভক্তি হইতে। শিষ্য- মুকুন্দ কে? গুরু- যিনি অবিদ্যার পরপারে লইয়া যান। শিষ্য- অবিদ্যা কাহাকে বলে? গুরু- যাহা আত্নপ্রকাশের প্রতিবন্ধক।।৫৬।।

শিষ্য- কাহার শোক নাই? গুরু- যাঁহার ক্রোধ নাই। শিষ্য- সুখ কি? গুরু- সন্তোষ। শিষ্য- রাজা কে? গুরু- যিনি প্রজারঞ্জন করেন। শিষ্য- কুকুর কে? গুরু- যে নিচজনের সেবা করে।।৫৭।।

শিষ্য- মায়াবী কে? গুরু- পরমেশ্বর। শিষ্য- ইন্দ্রজালতুল্য কে? গুরু- এই সংসার। শিষ্য- স্বপ্নসদৃশ্য কি? গুরু- জাগ্রৎকালিক ব্যবহার। শিষ্য - সত্য কি? গুরু- ব্রহ্ম।।৫৮।।

শিষ্য- মিথ্যা কি? যাহা জ্ঞানের দ্বারা নাশ্য হয়। শিষ্য- তুচ্ছ কি? গুরু- শশশৃঙ্গ, আকাশকুসুম, বন্ধ্যাপুত্র, কূর্ম্মলোম প্রভৃতি। শিষ্য- অনির্ব্বচনীয় কি? গুরু- মায়া। শিষ্য- কল্পিত পদার্থ কি? গুরু- দ্বৈত।।৫৯।।

শিষ্য- পারমার্থিক অর্থাৎ যথার্থ বস্তু কি? গুরু- অদ্বৈত। শিষ্য- অজ্ঞান কোথা হইতে উৎপন্ন হয়? গুরু- অজ্ঞান অনাদিকাল হইতে অাছে। শিষ্য - শরীরের পোষক অর্থাৎ রক্ষক কি? গুরু- প্রারদ্ধকর্ম্ম। শিষ্য- অন্নদাতা কে? গুরু- আয়ুঃ।।৬০।

শিষ্য- ব্রাহ্মণের উপাস্য কি? গুরু- গায়ত্রী, সূর্য্য ও অগ্নির দ্বারা ভগবান শম্ভূই উপাস্য। শিষ্য- গায়ত্রী, সূর্য ও শম্ভূই উপাস্য কেন? গুরু- তাহা তত্ত্ব অর্থাৎ সত্য বস্তু।।৬১।।

শিষ্য- প্রত্যক্ষদেবতা কে? গুরু- মাতা। শিষ্য- পূজ্য ও গুরু কে? গুরু- পিতা। শিষ্য- সর্ব্বদেবতাস্বরূপ কে? গুরু- জ্ঞান - কর্ম্ম বিশিষ্ট ব্রাহ্মণ।।৬২।।

শিষ্য- কুলক্ষয়ের কারণ কি? গুরু- সজ্জনগণের প্রতি সন্তাপ অর্থাৎ দুখোঃৎপাদন করা। শিষ্য- কাহাদের বাক্য অমোঘ অর্থাৎ সত্য? গুরু- যাঁহাদের সত্য, মৌন ও শম অর্থাৎ ইন্দ্রিয় সংযম করিবার সামর্থ্য আছে।।৬৩।।

শিষ্য- জন্ম কি? গুরু- বিষয়সঙ্গ। শিষ্য- মানবের পরবর্তী জন্ম কি? গুরু- পুত্র। শিষ্য- কোন বস্তুকে ত্যাগ করা যায় না? গুরু- মৃত্যু। শিষ্য- কোথায় পাদবিন্যাস করা কর্ত্তব্য? গুরু- নয়নের দ্বারা প্রত্যক্ষীকৃত স্থানে।।৬৪।।

শিষ্য- অন্নদানের পাত্র কি? গুরু- ক্ষুধার্ত্ত ব্যক্তি। শিষ্য- কাহার অর্চ্চনা করা উচিত? গুরু- ভগবানের অবতারের। শিষ্য- ভগবান কে? গুরু- শঙ্কর ও নারায়ণের ঐক্যরূপ মহেশ্বর।।৬৫।।

শিষ্য- ভগবদ্ভক্তির ফল কি? গুরু- সেই সেই লোকের স্বরূপ সাক্ষাৎকার। শিষ্য- মোক্ষ কি? গুরু- অবিদ্যা নাশ। শিষ্য- সকল বেদের উৎপত্তিস্থান কি? গুরু- ওঁকার।।৬৭।।

এই প্রশ্নত্তোর রত্নমালিকা যাঁহাদের কন্ঠস্থ থাকে, তাঁহারা মুক্তাভরণপরিহিত ব্যাক্তিগণের ন্যায় নির্ম্মল হইয়া সমস্ত সাধুসমাজে শোভা পাইয়া থাকেন।।৬৭।।

ইতি পরমহংস পরিব্রাজক আচার্য গোবিন্দ ভগবৎপূজ্যপাদ শিষ্য শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য ভগবান বিরচিত প্রশ্নোত্তর রত্নমালিকা সমাপ্ত।

 

 

Saturday, 6 June 2020

ব্রহ্মের উপাদানকারণতা প্রতিপাদনের জন্য অন্য হেতুর সংগ্রহঃ-


ইতোমধ্যে আলোচনা করিয়াছি, অনাগত সৃষ্টিবিষয়ক সঙ্কল্প প্রদর্শন দ্বারা মায়ারূপ উপাধিযুক্ত সর্বজ্ঞ সর্বশক্তিমান্ পরমেশ্বর জগতের অভিন্ন নিমিত্তোপাদান কারণ। আবার ব্রহ্ম হইতে উৎপন্ন ও তাঁহাতেই প্রলীন হয় বলিয়া ব্রহ্ম জগতের উপাদান কারণ, তাহা স্পষ্ট করিবার জন্য মহর্ষি বাদরায়ণ ভগবৎ এই সূত্রটীর অবতারণা করিতেছেন-
'সাক্ষাচ্চোভয়াম্নানাৎ৷৷' -(ব্রহ্মসূত্র- ১.৪.২৫)
শঙ্করাচার্য্যের 'শাঙ্করভাষ্য' অনুবাদঃ- এই সূত্রটী উপাদানকারণতার অভ্যুচ্চয় অর্থাৎ ব্রহ্মের উপাদানকারণতা প্রতিপাদনের জন্য অন্য হেতুর সংগ্রহ। আর এই হেতুবশতঃও ব্রহ্ম জগতের উপাদান কারণ, যেহেতু সাক্ষাৎভাবে ব্রহ্মকেই কারণরূপে গ্রহণ করিয়া উৎপত্তি ও প্রলয়, এই দুইটী পঠিত হইতেছে, যথা-
'সর্বাণি হ বা ইমানি ভূতানি আকাশাৎ এব সমুত্পদ্যন্তে৷ আকাশং প্রত্যস্তং যন্তি' -(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-১।৯।১)
অর্থাৎ "স্থাবরজঙ্গমাত্মক এই সমস্ত ভূতবর্গ আকাশ হইতেই সমুৎপন্ন হয় ও আকাশে অস্তগমন করে।" ইত্যাদি শ্রুতি।

যাহা হইতে যাহা উৎপন্ন হয় এবং যাহাতে প্রলীন হয়, তাহা তাহার উপাদান, ইহা প্রসিদ্ধ, যেমন পৃথিবী ধান্য ও যবাদির উপাদান। উপরোক্ত 'আকাশাৎ এব' শ্রুতিবাক্যগত 'এব' কারণটীর দ্বারা যে অন্য উপাদানের অগ্রহণ সূচিত হয়, তাহাকে ভগবান সূত্রকার 'সাক্ষাৎ' এই পদটীর দ্বারা প্রদর্শন করিতছেন। আর কার্য্যবস্তুর যে প্রলয়, তাহা উপাদান হইতে অন্যস্থলে পরিদৃষ্ট হয় না। (সুতরাং আকাশশব্দিত ব্রহ্মবস্তুই জগতের উপাদান, ইহাই নির্ণীত হয়।)
ইতি ভাষ্যানুবাদ।

জ্ঞানী ভোগ্যবিষয়ে মনের কঠিনতা আর ভগবদ্বিষয়ে মনের কোমলতা সম্পাদন করে—

  আচার্য মধুসূদন সরস্বতী ভক্তিরসায়নে বলছেন — কাঠিন্যং বিষয়ে কুর্যাদ্ দ্রবত্বং ভগবৎপদে। উপায়ৈঃ শাস্ত্রনির্দিষ্টৈরনুক্ষণমতো ব...