Sunday, 3 April 2022

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা- ‘ধ্যানযোগ’ (শাঙ্করভাষ্য অনুযায়ী ভাবার্থ)

 


‘ধ্যানযোগ’

পূর্ব্ব অধ্যায়ের অন্তভাগে ২৭-২৯ ইত্যাদি শ্লোকে সম্যগ্ দর্শনের অন্তরঙ্গ সাধন যে ধ্যানযোগের সূত্রস্থানীয় শ্লোকসকল উপদিষ্ট হইয়াছে, তাহাদের বৃত্তিস্থানীয় (ব্যাখ্যা স্বরূপ) এই ষষ্ঠ অধ্যায় আরম্ভ হইতেছে। এখন ধ্যানযোগের বহিরঙ্গ হইল ফলত্যাগপূর্ব্বক বাহ্য লোকহিতকর গার্হস্থ্য কর্মযোগ। যতদিন পর্যন্ত ধ্যানযোগে আরোহনে অসমর্থ, সেই পর্য্যন্ত অধিকৃত গৃহস্থের দ্বারা কর্ম্ম কর্ত্তব্য। এইজন্য ষষ্ঠাধ্যায়ের প্রথম শ্লোকে শ্রীভগবান্ বাহ্যকর্ম্মযোগের স্তুতি করিতেছেন। ধ্যানযোগে আরোহণেচ্ছু গার্হস্থ্যাশ্রমে স্থিত মুনির অগ্নিহোত্রাদি কর্ম্মের ফলনিরপেক্ষ কর্ম্মযোগের অনুষ্ঠান করা হইলে চিত্তশুদ্ধি দ্বারা ধ্যানযোগারোহন-সাধনত্ব হইতে পারে। এইজন্য নিষ্কামকর্ম্মীকে ‘তিনিই সন্ন্যাসী, তিনিই যোগী’ বলে স্তুতি করা হইতেছে-

শ্রীভগবানুবাচ -

অনাশ্রিতঃ কর্মফলং কার্যং কর্ম করোতি যঃ ৷

স সংন্যাসী চ যোগী চ ন নিরগ্নির্ন চাক্রিয়ঃ ৷৷ ১ ৷৷

'শাঙ্করভাষ্য' অনুসারে ভাবার্থঃ- কর্ম্মফলে অনাশ্রিত অর্থাৎ কর্ম্মফলতৃষ্ণারহিত হইয়া যিনি কাম্য-বিপরীত অগ্নিহোত্রাদি নিত্য কর্ত্তব্যকর্ম্ম নির্বর্তন করেন, ঈদৃশ কর্ম্মী কোন ইতর কাম্য কর্ম্মী হইতে বিশিষ্ট– এইরূপ অর্থে ভগবান বলিতেছেন, ‘তিনিই সন্ন্যাসী এবং তিনিই যোগী’। সন্ন্যাস ত্যাগের অপর নাম, এইগুণ যাঁহার মধ্যে তিনিই সন্ন্যাসী, আর চিত্তের সমাধানের নাম যোগ, ইহা যাঁহার মধ্যে আছে তিনিই যোগী অর্থাৎ ঐ কর্ম্মযোগীও এইরূপ গুণসম্পন্ন মনে করা উচিত। কেবল নিরগ্নি অর্থাৎ অগ্নি প্রভৃতি কর্ম্মাঙ্গভূত ব্যাপারাদি নির্গত হইলে এবং অক্রিয় অর্থাৎ অগ্নিসাধন বা যজ্ঞাদি ক্রিয়া ও সমস্ত তপোদানাদি ক্রিয়া অবিদ্যমান হইলেই সন্ন্যাসী বা যোগী হয় এইরূপ মনে করা উচিত নহে।১

যং সংন্যাসমিতি প্রাহুর্যোগং তং বিদ্ধি পাণ্ডব ৷

ন হ্যসংন্যস্তসঙ্কল্পো যোগী ভবতি কশ্চন ৷৷ ২ ৷।

'শাঙ্করভাষ্য' অনুসারে ভাবার্থঃ- শ্রুতি-স্মৃতিবিদেরা সর্ব্বকর্ম্ম আর তার ফলত্যাগরূপ যে ভাবকে পরমার্থ সন্ন্যাস বলিয়াছেন, হে পাণ্ডব! কর্ম্মানুষ্ঠানরূপ যোগকেও (নিষ্কাম কর্মযোগকেও) তুমি ঐ পরমার্থ সন্ন্যাস বলিয়া জানিবে ৷ প্রবৃত্তিরূপ কর্মযোগের তদ্বিপরীত নিবৃত্তিরূপ পরমার্থ-সন্ন্যাসের সহিত কিরূপ সমানতা স্বীকার করিয়া একতা বলা হইয়াছে? এই প্রশ্নের উত্তর হইল- পরমার্থ-সন্ন্যাসের সহিত কর্ম্মযোগের কর্তৃবিষয়ক সমানতা আছে; কেননা যিনি পরমার্থ-সন্ন্যাসী তিনি সর্ব্বকর্ম্ম-সাধনকে ত্যাগ করায় সর্ব্বকর্ম্ম আর ফলবিষয়ক সংকল্প, যাহা প্রবৃত্তির হেতু কামের কারণ, তাহা ত্যাগ করেন ৷ আর কর্ম্মরত কর্ম্মযোগীও ফলবিষয়ক সংকল্পকে ত্যাগ করেন। (এই দুইটীর মধ্যে এইরূপ সমানতা) এই অভিপ্রায়ে ভগবান বলিতেছেন- যিনি ফলবিষয়ক সংকল্প অর্থাৎ ইচ্ছাকে ত্যাগ করেন নি, এইরকম কেহই কর্ম্মী বা যোগী হতে পারে না ৷ অর্থাৎ এইরূপ পুরুষের চিত্ত সমাধিস্থ হওয়া অসম্ভব; কেননা ফলের সংকল্পই চিত্ত বিক্ষেপের কারণ ৷ এইজন্য যে কর্ম্মী ফলবিষয়ক সংকল্পকে ত্যাগ করে দেন তিনিই যোগী ৷ অভিপ্রায় এই যে চিত্তবিক্ষেপের কারণ যে ফলবিষয়ক সংকল্প তাহার ত্যাগেই মনুষ্য সমাধানযুক্ত অর্থাৎ চিত্তবিক্ষেপরহিত যোগী হন ৷ ২

ফলনিরপেক্ষ যে কর্ম্মযোগ তাহা ধ্যানযোগের বহিরঙ্গ সাধন। এই উদ্দেশ্যে তাহাকে কর্ম্মফলত্যাগরূপ সংন্যাসরূপে স্তুতি করিয়া এখন কর্ম্মযোগ যে ধ্যানযোগের সাধন তাহা দেখান হইতেছে-

আরুরুক্ষোর্মুনের্যোগং কর্ম কারণমুচ্যতে ৷

যোগারূঢ়স্য তস্যৈব শমঃ কারণমুচ্যতে ৷৷৩৷৷

‘শাঙ্করভাষ্য’ অনুসারে ভাবার্থঃ- ধ্যানযোগের আরূঢ় হইতে ইচ্ছুক কর্ম্মফলসংন্যাসী মুনির কর্ম্মযোগই কারণ বা সাধন বলা হয়। পুনশ্চ সেই ব্যক্তি যোগারূঢ় হইলে তাঁহার পক্ষে শম বা উপশম অর্থাৎ সর্ব্বকর্ম্ম হইতে নিবৃত্তিই কারণ বা যোগারূঢ়ত্বের সাধন বলা হইয়া থাকে-এইরূপ অর্থ। যেমন যেমন কর্ম্ম হইতে উপরত হয়, তেমনি তেমনি নিরায়াস জিতেন্দ্রিয়ের চিত্ত সমাধান হয়। এইরকম হইলে তিনি শীঘ্র ধ্যান-যোগারূঢ় হন। মহর্ষি ব্যাস কর্ত্তৃকও এইরূপ উক্ত হইয়াছে-“ব্রাহ্মণের পক্ষে-একতা, সমতা, সত্যতা, শীল, স্থিতি, অহিংসা, আর্জব (সরলতা) এবং সেই সেই ক্রিয়া সকল হইতে উপরম-এর সদৃশ আর বিত্ত (গুণ) নাই।”-(মহাভারত, শান্তিপর্ব্ব ১৭৫।৩৭) ৩

অতঃপর ইদানীং কখন সাধক ঠিক্ ঠিক্ ধ্যানযোগারূঢ় হন তাহাই বলা হইতেছে-

যদা হি নেন্দ্রিয়ার্থেষু ন কর্মস্বনুষজ্জতে ৷

সর্বসঙ্কল্পসংন্যাসী যোগারূঢস্তদোচ্যতে ৷৷ ৪ ৷৷

‘শাঙ্করভাষ্য’ অনুসারে ভাবার্থঃ- যখন সমাধীয়মানচিত্ত যোগী ইন্দ্রিয়ার্থেতে অর্থাৎ ইন্দ্রিয় সকলের অর্থ শব্দাদিতে এবং নিত্য-নৈমিত্তিক-কাম্য ও নিষিদ্ধ কর্ম্মে প্রয়োজন-অভাব-বুদ্ধি হেতু অনুষঙ্গ বা আসক্ত হয় না অর্থাৎ কর্ত্তব্যতা বুদ্ধি করে না তখন ঐ সর্ব্ব সংকল্পত্যাগী অর্থাৎ ইহলোক আর পরলোকের ভোগকামনার কারণরূপ সর্ব্বসংকল্প ত্যাগ করা যাঁহার স্বভাব হইয়া গিয়াছে, এইরূপ সর্বসঙ্কল্পসন্ন্যাসী যোগারূঢ় অর্থাৎ ধ্যানযোগ প্রাপ্ত হইয়াছেন-এইরূপ বলা হইয়া থাকে ৷ সমস্ত কামনাই সংকল্প মূলা। “কাম মাত্রই সংকল্প মূল, যজ্ঞসকল সংকল্পসম্ভব”-(মনুস্মৃতি-২।৩); “হে কাম! তোমার মূল জানি, তুমি সংকল্প হইতে জন্মাও। আমি তোমাকে কখনও সংকল্প করিব না, তাহা হইলে তুমি আর আমাতে জন্মাতে পারিবে না”-(মহাভারত, শান্তিপর্ব্ব-১৭৭।২৫)-ইত্যাদি স্মৃতিতে আছে। সর্ব্বকামনা পরিত্যাগ করিলে সর্ব্বকর্ম্মসন্ন্যাস সিদ্ধ হইয়া থাকে, “যে যেমন কামনাবান্ হয়, সে সেইরূপ নিশ্চয়বান্ হয়; যে যেমন নিশ্চয়বান হয়, সে সেইরূপ কর্ম্ম করে”-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪।৪।৫) ইত্যাদি শ্রুতিসকল হইতে পাওয়া যায় এবং “লোকে যা যা কর্ম্ম করে, তা তা কামেরই চেষ্টা বলিয়া জানিবে”-(মনুস্মৃতি-২।৪) -ইত্যাদি স্মৃতি হইতে পাওয়া যায়। সেইজন্য ‘সর্বসঙ্কল্পসংন্যাসী’ এইরূপ বচন আছে বলিয়া বুঝিতে হইবে ভগবান্ এখানে সন্ন্যাসীর সমস্ত কামনা এবং কর্ম্ম ত্যাগ করাইতেছেন। ৪

যখন সাধক এইরূপ যোগারূঢ় হন, তখন সেই যোগারূঢ় আত্মা (বিবেকযুক্ত মন) দ্বারা আত্মা অনর্থসমূহপূর্ণ সংসার হইতে উদ্ধৃত হইয়া থাকেন, এইজন্য-

উদ্ধরেদাত্মনাত্মানং নাত্মানমবসাদয়েৎ ৷

আত্মৈব হ্যাত্মনো বন্ধুরাত্মৈব রিপুরাত্মনঃ ৷৷ ৫ ৷৷

‘শাঙ্করভাষ্য’ অনুসারে ভাবার্থঃ- সংসার-সাগরে নিমগ্ন আত্মাকে আত্মা (বিবেকযুক্ত মন) দ্বারা উদ্ধার করা উচিত অর্থাৎ যোগারূঢ় অবস্থা প্রাপ্ত হওয়া উচিত ৷ আত্মাকে অবসন্ন করিবে না অর্থাৎ আত্মার অধোগতি করিবে না। কারণ বিবেকযুক্ত মনই আত্মার বন্ধু, যেহেতু আত্মার সংসার-মুক্তির নিমিত্ত হন, এমন অন্য কোনও বন্ধু নাই। সাংসারিক বন্ধু যে দেখিতে পাওয়া যায় তা স্নেহাদি বন্ধনের ক্ষেত্র হওয়ায় মোক্ষের প্রতি প্রতিকূল হইয়া থাকে; সেইজন্য ভগবানের এই সিদ্ধান্ত যুক্তিযুক্ত-‘আত্মাই (বিবেকযুক্ত মনই) আত্মার বন্ধু’। আবার বিষয়াসক্ত মনই আত্মার শত্রু। যে কেহ অন্য অপকারী বাহ্যশত্রু তাহাও আত্মপ্রযুক্তই হইয়া থাকে, সেই জন্য ঠিকই বলা হইয়াছে যে, ‘আত্মাই (বিষয়াসক্ত মনই) আত্মার শত্রু’।৫

এখন কি লক্ষণ বিশিষ্ট আত্মা আত্মার বন্ধু এবং কি লক্ষণ বিশিষ্ট আত্মা আত্মার শত্রু-তাই বলা হইতেছে-

বন্ধুরাত্মাত্মনস্তস্য যেনাত্মৈবাত্মনা জিতঃ ৷

অনাত্মনস্তু শত্রুত্বে বর্তেতাত্মৈব শত্রুবৎ ৷৷ ৬ ৷৷

‘শাঙ্করভাষ্য’ অনুসারে ভাবার্থঃ- যে বিবেকযুক্ত মন দ্বারা দেহেন্দ্রিয়াদি বশীভূত হইয়াছে, সেই সংযত মনই আত্মার বন্ধু, কারণ উচ্ছৃঙ্খল প্রবৃত্তি রহিত হইয়া সেই মনই মুক্তির সহায়ক হয় । কিন্তু অজিতেন্দ্রিয় ব্যক্তির বিবেকশূন্য মন উচ্ছৃঙ্খল প্রবৃত্তিবশে শত্রুর ন্যায় স্বীয় অনিষ্টসাধনে প্রবৃত্ত হয় । ৬

জিতাত্মনঃ প্রশান্তস্য পরমাত্মা সমাহিতঃ ৷

শীতোষ্ণসুখদুঃখেষু তথা মানাপমানয়োঃ ৷৷ ৭ ৷৷

‘শাঙ্করভাষ্য’ অনুসারে ভাবার্থঃ- যিনি মন, ইন্দ্রিয়াদি সংঘাতরূপ এই দেহ জিত হইয়াছেন এইরূপ জিতাত্মা আর যিনি প্রশান্ত অর্থাৎ যাঁহার অন্তঃকরণ সদা প্রসন্ন থাকে এইরূপ সন্ন্যাসী পরমাত্মা সমাহিত অর্থাৎ সাক্ষাৎ আত্মভাবেই বর্তমান থাকেন। এইরূপ ব্যক্তি শীত ও উষ্ণে, সুখ ও দুঃখে এবং সম্মান ও অপমানে অর্থাৎ পূজা ও তিরস্কারে সমভাবে অবস্থিতি করেন।৭

জ্ঞানবিজ্ঞানতৃপ্তাত্মা কূটস্থো বিজিতেন্দ্রিয়ঃ ৷

যুক্ত ইত্যুচ্যতে যোগী সমলোষ্টাশ্মকাঞ্চনঃ ৷৷ ৮ ৷৷

‘শাঙ্করভাষ্য’ অনুসারে ভাবার্থঃ- শাস্ত্রোক্ত পদার্থ বোধগম্য হওয়ার নাম 'জ্ঞান' আর শাস্ত্র হইতে জ্ঞাত ভাবকে স্বীয় অন্তঃকরণে প্রত্যক্ষ অনুভব করার নাম 'বিজ্ঞান', এইরূপ 'জ্ঞান' ও 'বিজ্ঞান' এ যাঁহার অন্তঃকরণ তৃপ্ত অর্থাৎ যাঁহার অন্তঃকরণে এই বিশ্বাস উত্পন্ন হইয়াছে যে আর কিছুই জানিবার অবশিষ্ট নাই, এইপ্রকার যিনি জ্ঞানবিজ্ঞানতৃপ্তাত্মা তথা যিনি কূটস্থ অর্থাৎ অবিচল আর জিতেন্দ্রিয়, তিনি যুক্ত অর্থাৎ সমাহিত, এইরূপ বলা হইয়া থাকে। সেই যোগী মৃৎখণ্ড, প্রস্তর ও স্বর্ণে সমদর্শী (হেয়-উপাদেয়-বুদ্ধিশূন্য) অর্থাৎ উনার দৃষ্টিতে মাটি, পাথর আর সোনা সবই সমান।৮

সুহৃন্মিত্রার্যুদাসীনমধ্যস্থদ্বেষ্যবন্ধুষু ৷

সাধুষ্বপি চ পাপেষু সমবুদ্ধির্বিশিষ্যতে ৷৷ ৯ ৷৷

‘শাঙ্করভাষ্য’ অনুসারে ভাবার্থঃ- সুহৃৎ অর্থাৎ যিনি প্রত্যুপকারের অপেক্ষা না করে উপকার করে, মিত্র অর্থাৎ স্নেহবান, শত্রু, উদাসীন অর্থাৎ যিনি কাহারও ভজনা করেন না, মধ্যস্থ অর্থাৎ যিনি বিরুদ্ধ উভয়পক্ষেরই হিতৈষী, দ্বেষ্য অর্থাৎ নিজের অপ্রিয়, বন্ধু অর্থাৎ কুটুম্ব, সাধু অর্থাৎ শাস্ত্রানুবর্তী ও নিষিদ্ধকর্ম্মকারী পাপী প্রভৃতি সকলেতেই যাঁহার সমবুদ্ধি অর্থাৎ লোকটী কিরূপ বা তাঁহার কর্ম্ম কিরূপ এইসব বিচারবুদ্ধি যাঁহার নাই, সমস্ত যোগারূঢ়দের মধ্যে তিনিই উত্তম।৯ 

অতএব এইরূপ উত্তম ফল প্রাপ্তির জন্য-

যোগী যুঞ্জীত সততমাত্মানং রহসি স্থিতঃ ৷

একাকী যতচিত্তাত্মা নিরাশীরপরিগ্রহঃ ৷৷ ১০ ৷৷

‘শাঙ্করভাষ্য’ অনুসারে ভাবার্থঃ- যোগী (ধ্যানী) একান্তে গিরিগুহাদিতে একাকি (অসহায়ভাবে) স্থিত হইয়া, নিরাশী (বীততৃষ্ণ) ও পরিগ্রহরহিত সন্ন্যাসী হইয়া দেহ ও মন সংযমপূর্বক অন্তঃকরণকে সর্বদা সমাহিত করিবেন। ১০

অতঃপর ইদানীং ধ্যানযোগীর আসন, আহার, বিহারাদির যোগসাধনত্ব হেতু নিয়ম বলা হইবে এবং যোগপ্রাপ্ত পুরুষের লক্ষণ এবং তাহার ফলাদিও কীর্ত্তন করা হইবে; তাহার মধ্যে প্রথমে আসন কি বলা হইতেছে-

শুচৌ দেশে প্রতিষ্ঠাপ্য স্থিরমাসনমাত্মনঃ ৷

নাত্যুচ্ছ্রিতং নাতিনীচং চৈলাজিনকুশোত্তরম্ ৷৷ ১১ ৷৷

‘শাঙ্করভাষ্য’ অনুসারে ভাবার্থঃ- স্বভাবতঃ (প্রাকৃতিক সৌন্দর্যবিশিষ্ট) বা সংস্কারতঃ (পরিস্কৃত দেবালয়াদিতে) শুদ্ধ স্থানে যোগী প্রথমে কুশ, তদুপরি যথাক্রমে মৃগব্যাঘ্রাদির চর্ম ও বস্ত্রদ্বারা রচিত নাতি উচ্চ বা নাতি নিম্ন স্বীয় স্থির (অচল) আসন স্থাপন করিবেন।

ব্যাখ্যাউপাসনা বা ধ্যান আসনে উপবেশন করিয়াই সম্ভব। বেদান্তমীমাংসা শাস্ত্রের আসীনাধিকরণের প্রতিপাদ্য বিষয় হইল উপাসনাকালে #আসন বা উপবেশনের আবশ্যকতা। অনেকে মনে করেন আসনাদি নিয়মের আবশ্যকতা নাই কারণ উপাসনা মানস ব্যাপার হওয়ায় শরীর স্থিতির নিয়ম নাই, যেহেতু শরীর হইতে মন ভিন্ন পদার্থ। ভগবান সূত্রকার বাদরায়ণ সিদ্ধান্ত করিতেছেন-

"আসীনঃ সম্ভবাৎ"-(ব্রহ্মসূত্র- ৪/১/৭শঙ্করাচার্য শারীরক মীমাংসা ভাষ্যে বলিতেছেন- আসনে উপবিষ্ট হইয়াই উপাসনা করিবে। তাহাতে হেতু কি?- যেহেতু তাহা সম্ভব। সমানাকারা মানসবৃত্তির যে প্রবাহকরণ তাহার নাম উপাসনা। তাহা কিন্তু যিনি গমন করেন, বা যিনি ধাবিত হন, তাঁহার পক্ষে সম্ভব নহে; যেহেতু গতি প্রভৃতি চিত্তের বিক্ষেপকারক। যিনি দণ্ডায়মান থাকেন তাঁহার পক্ষেও দেহধারণে ব্যাপৃত মন সূক্ষ্মবস্তু নিরীক্ষণ করিতে সমর্থ হয় না। আর যিনি শয়ান থাকেন, তাঁহারও মন অকস্মাৎ নিদ্রার দ্বারা অভিভূত হইয়া পড়ে। যিনি আসনে উপবিষ্ট থাকেন, তাঁহার পক্ষে কিন্তু এই জাতীয় বহুদোষ সহজে পরিহৃত হইয়া থাকে, এইহেতু তাঁহার পক্ষে উপাসনা সম্ভব।

আসন সিদ্ধেরই ধ্যান সিদ্ধ হয়। পতঞ্জলি যোগসূত্রে বলছেন- স্থিরসুখামাসনম্ ।।-(পাতঞ্জল যোগসূত্র, সাধনপাদ্- ৪৬) অর্থাৎ যেভাবে অনেকক্ষণ স্থিরভাবে সুখে বসিয়া থাকা যায়, তাহার নাম আসন। ভাষ্যকার ব্যাস বলছেন- "তা যেমন পদ্মাসন, বীরাসন, ভদ্রাসন স্বস্তিক (আসন), দণ্ডাসন সোপাশ্রয়, পর্যঙ্ক, ক্রৌঞ্চ-নিষদন, হস্তি-নিষদন, উষ্ট্র-নিষদন ও সমসংস্থান এগুলি স্থির সুখজনক ও যথা সুখকারক হলেই হলো আসন। যেভাবে উপবেশন করলে শরীর অক্লেশে স্থৈর্যসম্পন্ন হয় তাকে স্থিরসুখ বা যথাসুখ বলে।"

আসন প্রতিষ্ঠা করিয়া কি করিতে হইবে?

তত্রৈকাগ্রং মনঃ কৃত্বা যতচিত্তেন্দ্রিয়ক্রিয়ঃ ৷

উপবিশ্যাসনে যুঞ্জ্যাদ্যোগমাত্মবিশুদ্ধয়ে ৷৷ ১২ ৷৷

‘শাঙ্করভাষ্য’ অনুসারে ভাবার্থঃ- সেই আসনে উপবেশন করিয়া ইন্দ্রিয়সকলকে সমস্ত বিষয় হইতে মনে গুটাইয়া নিয়া অর্থাৎ মনকে একাগ্র করিয়া, চিত্ত ও ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়া সংযমপূর্বক আত্মবিশুদ্ধির জন্য অর্থাৎ চিত্তশুদ্ধির জন্য যোগাভ্যাস করিবেন। ১২

বাহ্য আসনের কথা বলা হইয়াছে, এক্ষণে ধ্যানকালে কিরূপে শরীরকে ধারণ করিতে হইবে তাহাই বলা হইতেছে-

সমং কায়শিরোগ্রীবং ধারয়ন্নচলং স্থিরঃ ৷

সংপ্রেক্ষ্য নাসিকাগ্রং স্বং দিশশ্চানবলোকয়ন্ ৷৷ ১৩ ৷৷

প্রশান্তাত্মা বিগতভীর্ব্রহ্মচারিব্রতে স্থিতঃ ৷

মনঃ সংযম্য মচ্চিত্তো যুক্ত আসীত মৎপরঃ ৷৷ ১৪ ৷৷

‘শাঙ্করভাষ্য’ অনুসারে ভাবার্থঃ- কায় (শরীর), শিরঃ ও গ্রীবা সমান ও অচলভাবে ধারণ করে, (সমান দণ্ডাকারে ধারণ করিলেও দেহ দুলিতে পারে, এইজন্য ‘অচল’ এই বিশেষণটি বলিতেছেন), স্থির হইয়া স্বীয় নাসিকাগ্রে দৃষ্টি রাখিয়া অর্থাৎ অন্তঃকরণের সমাধান করিয়া (কারণ চিত্ত একাগ্র হইলেই স্বতঃই চক্ষু নাসাগ্রদৃষ্টি হইয়া যায়) এবং অপর কোন দিশা অবলোকন না করিয়া প্রশান্তাত্মা (প্রকৃষ্টরূপে অন্তঃকরণ যাঁহার), বিগতভয়, গুরুশুশ্রূষা-ভিক্ষাভোজনাদি ব্রহ্মচারিব্রতে স্থিত, মৎপর (অর্থাৎ আমিই যাঁহার মতে সর্ব্বশ্রেষ্ঠ), মনঃসংযম অর্থাৎ মনের বৃত্তিসকলকে উপসংহার করিয়া আমি যে পরমেশ্বর, সেই আমাতে চিত্ত যাঁহার সেই এই মচ্চিত্ত সমাহিত হইয়া যোগে আসীন হইবেন অর্থাৎ উপবেশন করিবেন। ১৩,১৪

অতঃপর ধ্যানযোগের ফল বলা হইতেছে-

যুঞ্জন্নেবং সদাত্মানং যোগী নিয়তমানসঃ ৷

শান্তিং নির্বাণপরমাং মত্সংস্থামধিগচ্ছতি ৷৷ ১৫ ৷৷

‘শাঙ্করভাষ্য’ অনুসারে ভাবার্থঃ- নিয়তমানস অর্থাৎ সংযত মন যাঁহার সেই সদাসংযতমানস যোগী আত্মাকে (মনকে) এইরূপ যথোক্ত বিধানে সমাধান করিয়া মোক্ষে পরমা নিষ্ঠা (সর্ববৃত্তির উপরতিরূপা) যে শান্তি তাহাই নির্বাণপরমা, সেই মদাধীনা (মদাত্মিকা) অর্থাৎ মৎস্বরূপ পরমানন্দরূপা নিষ্ঠা প্রাপ্ত হন।১৫

অতঃপর যোগীদের আহারাদির নিয়ম বলা হইতেছে-

নাত্যশ্নতস্তু যোগোঽস্তি ন চৈকান্তমনশ্নতঃ ৷

ন চাতিস্বপ্নশীলস্য জাগ্রতো নৈব চার্জুন ৷৷ ১৬ ৷৷

‘শাঙ্করভাষ্য’ অনুসারে ভাবার্থঃ- আত্মসংযমিত অর্থাৎ নিজের যতটুকু অন্ন প্রয়োজন তা অতিক্রম করিয়া যিনি অতিভোজন করেন তাঁহার যোগ হয় না। আবার যাঁহারা একেবারে ভোজন করন না তাঁহাদেরও যোগ হয় না। শ্রুতিতেও আছে-“যিনি নিজের শরীরের শক্তির অনুযায়ী অন্ন ভক্ষণ করিয়া থাকেন, সেই অন্ন তাঁহাকে রক্ষা করেন, কষ্ট দেন না। যিনি তাঁহার অধিক ভোজন করেন সেই অন্ন তাঁহাকে কষ্ট দেন। আর যিনি যাহা দরকার তাহা থেকে কম খান, ঐ অন্ন তাঁহাকে রক্ষা করেন না।”-(শতপথ ব্রাহ্মণ।। বৌধায়ন সূত্র ২।৭।২২) সেইজন্য যোগী নিজের উপযুক্ত অন্ন হইতে অধিক বা অল্প অন্ন ভোজন করিবেন না। যোগীরা যোগশাস্ত্রে উপদিষ্ট অন্নের পরিমাণ হইতে অতিমাত্র ভোজন করিলে যোগ হইবে না। যোগশাস্ত্রে উক্ত হইয়াছে-“যোগী উদরের অর্ধভাগ ভুক্ত ব্যঞ্জনের সহিত অন্নের দ্বারা ও তৃতীয়ভাগ জলের দ্বারা পূর্ণ করিবে এবং চতুর্থভাগ বায়ু সঞ্চরণের জন্য অবশিষ্ট রাখিবে।” হে অর্জুন! সেইরূপ অতিনিদ্রালুরও যোগ হয় না, আবার অতিমাত্র জাগরণশীলেরও যোগ হয় না। ১৬

তাহা হইলে পুনরায় কি হইলে যোগ হয়, তাহাই বলা হইতেছে-

যুক্তাহারবিহারস্য যুক্তচেষ্টস্য কর্মসু ৷

যুক্তস্বপ্নাববোধস্য যোগো ভবতি দুঃখহা ৷৷ ১৭ ৷৷

‘শাঙ্করভাষ্য’ অনুসারে ভাবার্থঃ- যিনি পরিমিত আহার (অন্ন) ও বিহার (পাদক্রম বা পাইচারী) করেন এবং প্রণবজপ, উপনিষদ্ প্রভৃতি শাস্ত্রপাঠাদি কর্মে নিয়ত প্রচেষ্টা করেন, যাঁহার স্বপ্ন (নিদ্রা) ও অববোধ (জাগরণ) নিয়মিত (অর্থাৎ কালে ও পরিমাণে নির্দিষ্ট, যথা- রাত্রির আদি ও অন্ত ভাগে জাগরণ এবং মধ্যভাগে নিদ্রা), তাঁহার ধ্যানযোগ সর্বসংসারদুঃখের হরণ করে বলিয়া দুঃখহা। ১৭

ব্যাখ্যা- আহারশুদ্ধি বস্তুতঃ কি? এই বিষয়ে সামবেদীয় ছান্দোগ্য শ্রুতি বলিতেছেন-"আহারশুদ্ধৌ সত্ত্বশুদ্ধিঃ সত্ত্বশুদ্ধৌ ধ্রুবা স্মৃতিঃ, স্মৃতিলম্ভে সর্বগ্রন্থীনাং বিপ্রমোক্ষঃ"-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৭।২৬।২) শঙ্করাচার্য এই শ্রুতির ভাষ্যে বলিতেছেন-'যাহা আহৃত বা আহরণ করা যায়, তাহাই আহার অর্থাৎ শব্দাদিবিষয়ক জ্ঞান যাহা ভোক্তার ভোগের নিমিত্ত আহৃত হইয়া থাকে। শব্দাদি ভোগ্যবিষয়ের উপলব্ধিরূপ যে বিজ্ঞান তাহার শুদ্ধিকেই আহারশুদ্ধি বলে, অর্থাৎ রাগদ্বেষ মোহ প্রভৃতি দোষ দ্বারা অসংস্পৃষ্ট বিষয়রূপ ভোগ্যবিষয়সমূহের বিজ্ঞান বা উপলব্ধি বা অনুভূতি। সেই আহার বিশুদ্ধ হইলে তদ্বিশিষ্ট জ্ঞানীর সত্ত্বশুদ্ধি অর্থাৎ অন্তঃকরণের নির্মলতা সিদ্ধ হয়। সত্ত্বশুদ্ধি হইলে ভূমানামক আত্মার স্বরূপ, যাহা একবার ধারণা করা গিয়াছে, সে সম্বন্ধে ধ্রুব বা অবিচ্ছিন্ন স্মৃতি-ধারা উপস্থিত হয় অর্থাৎ জ্ঞাত বিষয়ের আর কখনও ভুল হয় না। সেই ধ্রুবা স্মৃতি লাভ হইলে অবিদ্যাকৃত সর্বানর্থপাশরূপ জন্মজন্মান্তরীয় অনুভব এবং ভাবনার দ্বারা কঠিনীকৃত হৃদয়াশ্রিত গ্রন্থিসকলের বিপ্রমোক্ষ অর্থাৎ বিশেষভাব মোক্ষণ বা বিনাশ হইয়া থাকে। যেহেতু আহারশুদ্ধি উত্তরোত্তর বর্দ্ধিত এই সমস্ত সাধনের মূল, এইজন্য আহারশুদ্ধি বিশেষরূপে কর্ত্তব্য।

এক্ষণে যোগী কখন সমাধিস্থ হইয়া থাকেন তাহা বলা হইতেছে-

যদা বিনিয়তং চিত্তমাত্মন্যেবাবতিষ্ঠতে ৷

নিঃস্পৃহঃ সর্বকামেভ্যো যুক্ত ইত্যুচ্যতে তদা ৷৷ ১৮ ৷৷

‘শাঙ্করভাষ্য’ অনুসারে ভাবার্থঃ- যখন বিনিয়ত-চিত্ত অর্থাৎ বিশেষভাবে নিয়ত, সংযত, একাগ্রতা সম্পন্ন চিত্ত বাহ্য চিন্তা ত্যাগ করিয়া কেবল আত্মাতেই অবস্থান করে অর্থাৎ স্বীয় আত্মাতেই স্থিতি লাভ করে, সেই সময়ে সর্ব্বকামনা হইতে নিস্পৃহ অর্থাৎ দৃষ্ট ও অদৃষ্ট বিষয় হইতে যে যোগীর স্পৃহা বা তৃষ্ণা নির্গত হইয়াছে তিনিই যুক্ত সমাহিত, এইরূপ বলা হইয়া থাকে। ১৮

সেই যোগীর যে সমাহিত চিত্ত তাহার উপমা বলা হইতেছে-

যথা দীপো নিবাতস্থো নেঙ্গতে সোপমা স্মৃতা ৷

যোগিনো যতচিত্তস্য যুঞ্জতো যোগমাত্মনঃ ৷৷ ১৯ ৷৷

‘শাঙ্করভাষ্য’ অনুসারে ভাবার্থঃ- নিবাতস্থ অর্থাৎ বায়ুপ্রবাহ বর্জিত স্থানে অবস্থিত প্রদীপ যেমন কম্পিত হয় না, সংযত অন্তঃকরণের অর্থাৎ আত্মার সমাধিতে অবস্থানকারী যোগীর একাগ্রীভূত চিত্তেরও সেই উপমা জানিবে, সেই উপমা চিত্ত-গতির প্রত্যক্ষদর্শী যোগবেত্তাগণ কর্ত্তৃক স্মৃত বা চিন্তিত হইয়াছে। ১৯ 

এইরূপ যোগাভ্যাসবলহেতু একাগ্রীভূত নিবাত প্রদীপকল্প হইয়াছে এমন যে-

যত্রোপরমতে চিত্তং নিরুদ্ধং যোগসেবয়া ৷

যত্র চৈবাত্মনাত্মানং পশ্যন্নাত্মনি তুষ্যতি ৷৷ ২০ ৷৷

সুখমাত্যন্তিকং যত্তদ্বুদ্ধিগ্রাহ্যমতীন্দ্রিয়ম্ ৷

বেত্তি যত্র ন চৈবায়ং স্থিতশ্চলতি তত্ত্বতঃ ৷৷ ২১ ৷৷

‘শাঙ্করভাষ্য’ অনুসারে ভাবার্থঃ- যখন যোগানুষ্ঠানের দ্বারা চিত্ত উপরতি প্রাপ্ত হয় এবং নিরুদ্ধ অর্থাৎ সর্বতোভাবে তাহার প্রচার বা চঞ্চলতা নিবারিত হয় এবং যখন সমাধিপরিশুদ্ধ অন্তঃকরণের দ্বারা পরম চৈতন্য জ্যোতিঃস্বরূপ আত্মাকে উপলব্ধি করিয়া যোগী নিজের আত্মাতেই তুষ্ট হন, তথা যে সুখ অত্যন্ত অর্থাৎ অন্তরহিত অনন্ত, সেই আত্যন্তিক সুখ বাহ্য ইন্দ্রিয় ব্যতিরেকে কেবলমাত্র বুদ্ধিদ্বারা গৃহীত হয় ও ইন্দ্রিয়গোচরাতীত অর্থাৎ অবিষয়জনিত ঈদৃশ সুখ যখন যোগী অনুভব করেন, তখন আত্মস্বরূপে স্থিতিহেতু এই বিদ্বান তত্ত্বস্বরূপে সংস্থিতি হইতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হন না। ২০, ২১

পূর্ব্বের ‘যত্রোপরমতে’-(গীতা ৬।২০) শ্লোক হইতে আরম্ভ করিয়া এই শ্লোকদ্বয় পর্য্যন্ত যাবতীয় বিশেষণ দ্বারা বিশিষ্ট আত্মার অবস্থাবিশেষকে যোগ বলা হইয়াছে-

যং লব্ধ্বা চাপরং লাভং মন্যতে নাধিকং ততঃ ৷

যস্মিন্স্থিতো ন দুঃখেন গুরুণাপি বিচাল্যতে ৷৷ ২২ ৷৷

তং বিদ্যাদ্ দুঃখসংযোগবিয়োগং যোগসংজ্ঞিতম্ ৷

স নিশ্চয়েন যোক্তব্যো যোগোনির্বিণ্ণচেতসা ৷৷ ২৩ ৷৷

‘শাঙ্করভাষ্য’ অনুসারে ভাবার্থঃ- যাহা লাভ করিয়া অর্থাৎ যে আত্মলাভ করিয়া যোগী অন্য লাভ তদপেক্ষা অধিক মনে করেন না, কারণ আত্মলাভ অপেক্ষা পুরুষার্থভূত লাভ্যান্তর নাই। এবং যে আত্মতত্ত্বে স্থিত হইয়া শস্ত্রনিপাতাদিরূপ মহাদুঃখেও বিচলিত হন না সেই দুঃখসংযোগের বিয়োগ অর্থাৎ দুঃখের আত্যন্তিক নিরোধরূপ সেই আত্মস্থিতিকে যোগ বলিয়া জানিবে। নির্বেদশূন্য চিত্তে অধ্যবসায় সহকারে এই যোগাভ্যাস করা উচিত। ‘এতকালেও তো আমার যোগসিদ্ধি হইল না, ইহা অপেক্ষা কষ্টের কি আছে’- এইরূপ যে অনুতাপ তাহাই নির্বেদ। এইরূপ নির্বেদরহিত চিত্তে এবং ‘ইহজন্মেই হোক অথবা জন্মান্তরেই হোক, অবশ্যই যোগসিদ্ধি হইবে, ত্বরায় প্রয়োজন কি’-এইরূপ ধৈর্য্যযুক্ত মনে যোগাভ্যাস করিতে হয়। ২২, ২৩

এক্ষণে যোগের পরম বিধি বলিতেছেন—

সঙ্কল্পপ্রভবান্কামাংস্ত্যক্ত্বা সর্বানশেষতঃ ৷

মনসৈবেন্দ্রিয়গ্রামং বিনিয়ম্য সমন্ততঃ ৷৷২৪।।

শনৈঃ শনৈরুপরমেদ্ বুদ্ধ্যা ধৃতিগৃহীতয়া ৷

আত্মসংস্থং মনঃ কৃত্বা ন কিঞ্চিদপি চিন্তয়েৎ ৷৷ ২৫ ৷৷

'শাঙ্করভাষ্য' অনুসারে ভাবার্থঃ- সঙ্কল্পজাত সমস্ত কামনা নিঃশেষে নির্লিপ্তভাবের দ্বারা পরিত্যাগ করিয়া বিবেকযুক্ত মনের দ্বারা ইন্দ্রিয়সমূহকে সর্ব্বদিক হইতে নিয়মিত করিয়া, ধৈর্যযুক্ত বুদ্ধি দ্বারা মনকে ধীরে ধীরে উপরত করিবে (অর্থাৎ সহসা চিত্তকে উপরত করিবার চেষ্টা করিবে না) এবং 'আত্মাতে যিনি সংস্থিত অর্থাৎ আত্মাই সব, তদ্ভিন্ন আর কিছুই নাই'— মনকে এইরূপ আত্মসংস্থ করিয়া অন্য কিছুই চিন্তা করিবে না— এই হইতেছে যোগের পরম বিধি। ২৪,২৫

এই প্রকারে মনকে আত্মসংস্থ করিবার জন্য প্রবৃত্ত যোগী—

যতো যতো নিশ্চরতি মনশ্চঞ্চলমস্থিরম্ ৷

ততস্ততো নিয়ম্যৈতদাত্মন্যেব বশং নয়েৎ ৷৷ ২৬ ৷৷

'শাঙ্করভাষ্য' অনুসারে ভাবার্থঃ- চঞ্চল ও অস্থির মন স্বভাবদোষবশতঃ যে যে শব্দাদি বিষয়ে ধাবিত হয় সেই সেই বিষয় হইতে নিবৃত্ত করিয়া ইহাকে আত্মাতেই বশীভূত করেন। শব্দাদি বিষয়ের যাথাত্ম্য অর্থাৎ তাহাদের স্বরূপ নিরূপণের দ্বারা তাহাদিগকে মিথ্যা প্রমাণ করিয়া বৈরাগ্য ভাবনা দ্বারা মনকে আত্মবশে আনিতে হয়। এইরূপ যোগাভ্যাস বলে যোগিগণ আত্মাতেই মনকে প্রশমিত করিয়া থাকেন। ২৬

প্রশান্তমনসং হ্যেনং যোগিনং সুখমুত্তমম্ ৷

উপৈতি শান্তরজসং ব্রহ্মভূতমকল্মষম্ ৷৷২৭৷৷

'শাঙ্করভাষ্য' অনুসারে ভাবার্থঃ- প্রশান্তচিত্ত, মোহাদি ক্লেশরূপ রজোবৃত্তিশূন্য, নিষ্পাপ (ধর্ম্মাধর্ম্মাদিবর্জ্জিত) ও জীবন্মুক্ত অর্থাৎ 'ব্রহ্মই সব'—এইরূপ নিশ্চয়বন্ত যোগীই উত্তম (নিরতিশয়) সুখ প্রাপ্ত হন। ২৭

যুঞ্জন্নেবং সদাত্মানং যোগী বিগতকল্মষঃ ৷

সুখেন ব্রহ্মসংস্পর্শমত্যন্তং সুখমশ্নুতে ৷৷২৮৷৷

'শাঙ্করভাষ্য' অনুসারে ভাবার্থঃ- এইভাবে যথোক্তক্রমে মনকে সদা যোগস্থ করিয়া যোগান্তরায়-বর্জ্জিত নিষ্পাপ যোগী অনায়াসে ব্রহ্মসংস্পর্শজনিত অর্থাৎ পরব্রহ্মের সহিত স্পর্শ অর্থাৎ তাদাত্ম্য (অভিন্নতা) যাহাতে আছে বা বিষয়সংস্পর্শবিহীন ব্রহ্মস্বরূপে অত্যন্ত উৎকৃষ্ট নিরতিশয় সুখ প্রাপ্ত হইয়া থাকেন। ২৮

ব্যাখ্যাঃ- এখানে ভগবান্ ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য 'যোগান্তরায়বর্জ্জিত' শব্দটি উল্লেখ করেছেন। যোগসূত্রকার ভগবান পতঞ্জলি যোগান্তরায়গুলি বলিতেছেন- 'ব্যাধিস্ত্যানসংশয়প্রমাদালস্যাবিরতিভ্রান্তিদর্শনালব্ধ-ভূমিকাত্বানবস্থিতত্বানি চিত্তবিক্ষেপাস্তেহন্তরায়াঃ।।' (পাতঞ্জল যোগসূত্র-১/৩০) অর্থাৎ রোগব্যাধি, চিত্তের অকর্মণ্যতা অর্থাৎ মানসিক জড়তা, সংশয়, প্রমাদ (উদ্যমরাহিত্য) অর্থাৎ সমাধির সাধনের অননুষ্ঠান, আলস্য, অবিরতি বা বিষয়তৃষ্ণা, ভ্রান্তিদর্শন অর্থাৎ বিপর্যয়জ্ঞান, একাগ্রতা লাভ না করা, ঐ অবস্থা লাভ হইলেও তাহা হইতে পতিত হওয়া-এইগুলিই চিত্তবিক্ষেপকর অন্তরায়।

চিত্ত-বিক্ষেপগুলির প্রতিষেধক কি? ভগবান পতঞ্জলি যোগদর্শনের সমাধিপাদে বলেছেন—তৎপ্রতিষেধার্থমেকতত্ত্বাভ্যাসঃ।।৩২।।-ইহা প্রতিষেধার্থ ‘এক-তত্ত্ব’ অভ্যাস আবশ্যক। যোগসূত্রের ভাষ্যকার ব্যাস বলেছেন— "চিত্ত-বিক্ষেপগুলি প্রতিষেধের জন্য এক-তত্ত্বের অবলম্বন অভ্যাস করতে হবে।" এক-তত্ত্ব অভ্যাস বিষয়ে বাচষ্পতিজী বলেছেন, 'তা ঈশ্বরই তত্ত্ব হিসেবে প্রধান আলম্বন।' ভোজরাজ লিখেছেন— 'যেকোনো একটি অভিমত তত্ত্বে অভ্যাস, অর্থাৎ বারংবার একটি তত্ত্বে চিত্তের নিবেশন বা স্থাপন।'

এখন প্রশ্ন অভ্যাস কি? ভগবান পতঞ্জলি সমাধিপাদেই বলেছেন— তত্র স্থিতৌ যত্নোহভ্যাসঃ ।।১৩।। -ঐ বৃত্তিগুলিকে সম্পূর্ণরূপে বশে রাখিবার যে নিয়ত চেষ্টা, তাহাকে ‘অভ্যাস’ বলে। ভগবান ভাষ্যকার ব্যাস বলেছেন—"বৃত্তিশূন্য হয়েছে এমন চিত্তের প্রশান্তবাহিতা বিমলধারার মত অবস্থান হল স্থিতি। সেই স্থিতির জন্য অদম্য চেষ্টা, বীর্য ও উৎসাহ চাই। সেই স্থিতি সম্পাদনের ইচ্ছায়, তার জন্য সাধনাত্মক অনুষ্ঠান হল অভ্যাস।" এখন প্রশ্ন শাস্ত্রসহায়ে এই যে চিত্তের পরিষ্কার ধারার নির্দেশ অর্থাৎ চিত্তশুদ্ধ করার প্রণালী তা কিভাবে? ভগবান পতঞ্জলি সমাধিপাদেই বলেছেন—মৈত্রী-করুণা-মুদিতোপেক্ষাণাং সুখদুঃখপুণ্যা-পুণ্যবিষয়াণাং ভাবনাতশ্চিত্তপ্রসাদনম্ ।।৩৩।। -সুখী, দুঃখী, পুণ্যবান্ ও পাপীর প্রতি যথাক্রমে বন্ধুতা, দয়া, আনন্দ ও উপেক্ষার ভাব ধারণ করিতে পারিলে চিত্ত প্রসন্ন হয়।

ইদানিং যোগের যে ফল ব্রহ্মৈকত্বদর্শন, যাহা সর্ব্বসংসার বিচ্ছেদের কারণ তাহাই প্রদর্শিত হইতেছে

সর্বভূতস্থমাত্মানং সর্বভূতানি চাত্মনি৷

ঈক্ষতে যোগযুক্তাত্মা সর্বত্র সমদর্শনঃ৷৷২৯৷৷

"শাঙ্করভাষ্য" অনুসারে ভাবার্থঃ—সর্বত্র সমদর্শী যোগযুক্তাত্মা অর্থাৎ সমাহিত অন্তঃকরণ যাঁহার এইরূপ যোগযুক্ত পুরুষ সর্বভূতে স্থিত স্বীয় আত্মাকে এবং ব্রহ্মাদিস্থাবর পর্য্যন্ত সর্বভূতসকলকে স্বীয় আত্মাতে একতাপ্রাপ্ত দর্শন করেন। ব্রহ্মাদিস্থাবরান্তে বিভক্ত সর্বভূতে সম অর্থাৎ নির্বিশেষ ব্রহ্মাত্মৈকত্ব (জীব ও ব্রহ্মের একত্ব) বিষয়ক দর্শনরূপ জ্ঞান যাঁহার তিনিই সর্বত্র সমদর্শী। ২৯

এই আত্মৈকত্ব দর্শনের ফল বলা হইতেছে—

যো মাং পশ্যতি সর্বত্র সর্বং চ ময়ি পশ্যতি৷

তস্যাহং ন প্রণশ্যামি স চ মে ন প্রণশ্যতি ৷৷ ৩০ ৷।

"শাঙ্করভাষ্য" অনুসারে ভাবার্থঃ—যিনি আমাকে (বাসুদেবকে) সর্ব্বত্র সর্ব্বভূতে সকলের আত্মস্বরূপে দর্শন করেন এবং সর্ব্বাত্মা আমাতে ব্রহ্মাদি যাবতীয় ভূতসমূহকে দর্শন করেন, সেই বিদ্বান আত্মৈকত্ব-দর্শীর নিকট আমি (ঈশ্বর) কখন প্রণষ্ট হই না অর্থাৎ কখনও পরোক্ষ বা অদৃশ্য হই না এবং তিনিও আমার নিকট প্রণষ্ট (অদৃশ্য) হন না। কেন? তাঁহার ও আমার একাত্মতা হেতু। ইহা সর্ব্বজনসিদ্ধ যে আত্মা আত্মার প্রিয়ই হইয়া থাকে; কারণ সর্ব্বাত্মৈক্যদর্শী আমা হইতে ভিন্ন নহেন। ৩০

পূর্ব্বশ্লোকার্থ যে সম্যগ্ দর্শন বর্ত্তমান শ্লোকে তাহারই অনুবাদ করিয়া তাহার ফল যে মোক্ষ ইহার বিধান করিতেছেন—

সর্বভূতস্থিতং যো মাং ভজত্যেকত্বমাস্থিতঃ৷

সর্বথা বর্তমানোপি স যোগী ময়ি বর্ততে ৷৷ ৩১ ৷৷

"শাঙ্করভাষ্য" অনুসারে ভাবার্থঃ—যিনি সর্বভূতে প্রত্যগাত্মরূপে অবস্থিত আমাকে স্বীয় আত্মরূপে অভেদজ্ঞানে ভজনা করেন, অর্থাৎ 'আমিই সেই' - এইরূপ অপরোক্ষানুভব করেন, সেই সম্যগ্দর্শী যোগী সর্বথা অর্থাৎ সর্ব্বপ্রকার অবস্থার সহিত বর্ত্তমান থাকিয়াও আমাতে অর্থাৎ বৈষ্ণব পরম পদে বর্ত্তমান থাকেন। তিনি নিত্য মুক্তই, তাঁহার মোক্ষের প্রতিবন্ধক কিছুই হইতে পারে না । ৩১

 আত্মৌপম্যেন সর্বত্র সমং পশ্যতি যোর্জুন ৷

সুখং বা যদি বা দুঃখং সঃ যোগী পরমো মতঃ৷৷ ৩২ ৷৷

'শাঙ্করভাষ্য' অনুসারে ভাবার্থঃ- আত্ম ঔপম্যের দ্বারা অর্থাৎ আত্মা নিজেই তুলিত হন নিজের দ্বারা এই জন্য আত্মা নিজেই নিজের উপমা, সেই উপমার ভাব ঔপম্য; হে অর্জুন! এই আত্মঔপম্যের দ্বারা যিনি সর্বত্র অর্থাৎ সর্বভূতে সম অর্থাৎ তুল্য দেখেন, যেমন আমার সুখ অনুকূল ও আমার দুঃখ প্রতিকূল, তেমনি সকল প্রাণীর সুখ অনুকূল ও দুঃখ প্রতিকূল - ইহা জানিয়া তিনি সকল প্রাণীর সুখ আকাঙ্ক্ষা করেন এবং কোন প্রাণীর দুঃখ ইচ্ছা করেন না। সুতরাং তাঁহার প্রবৃত্তি অন্যের দুঃখের কারণ হয় না; বরং অন্যের দুঃখের নিবৃত্তির কারণ হয়। যিনি এইরূপ অহিংসক সম্যগ্ দর্শননিষ্ঠ, সেই যোগীই সমস্ত যোগীদের মধ্যে পরম অর্থাৎ উৎকৃষ্ট, ইহাই আমার মত অর্থাৎ অভিপ্রায়।

এই যথোক্ত সম্যগ্দর্শনলক্ষণ যোগের দুঃখসম্পাদ্যতা দেখে তার প্রাপ্তির নিশ্চিত উপায় শ্রবণেচ্ছু

অর্জুন উবাচ

যোয়ং যোগস্ত্বয়া প্রোক্তঃ সাম্যেন মধুসূদন ৷

এতস্যাহং ন পশ্যামি চঞ্চলত্বাৎ স্থিতিং স্থিরাম্ ৷৷ ৩৩ ৷৷

'শাঙ্করভাষ্য' অনুসারে ভাবার্থঃ- অর্জ্জুন কহিলেনসাম্য অর্থাৎ সমত্বযুক্ত এই যে যোগ তোমাকর্তৃক প্রকৃষ্টরূপে বলা হইল, হে মধুসূদন! এই যোগের সমাধান আমি দেখছি না অর্থাৎ উপলব্ধি করিতে পারিতেছি না। কেন?— মনের চঞ্চলতাহেতু। কি সমাধান দেখিতে পারিতেছ না?—স্থির অচলা স্থিতি; কারণ মনের এই চঞ্চলতা প্রসিদ্ধ।

চঞ্চলং হি মনঃ কৃষ্ণ প্রমাথি বলবদ্দৃঢ়ম্ ৷
তস্যাহং নিগ্রহং মন্যে বায়োরিব সুদুষ্করম্ ৷৷ ৩৪ ৷৷

'শাঙ্করভাষ্যঅনুসারে ভাবার্থঃ- হে কৃষ্ণ, মন অতি চঞ্চল, প্রবল এবং শরীর ইন্দ্রিয়াদির বিক্ষেপ-উৎপাদক ইহাকে বিষয়বাসনা হইতে নিবৃত্ত করা অতিশয় কঠিন সেইজন্য উহার নিরোধ আকাশস্থ বায়ুকে পাত্রবিশেষে আবদ্ধ করার ন্যায় দুঃসাধ্য মনে করি ৩৪

শ্রীভগবানুবাচ

অসংশয়ং মহাবাহো মনো দুর্নিগ্রহং চলং৷

অভ্যাসেন তু কৌন্তেয় বৈরাগ্যেণ গৃহ্যতে৷৷ ৩৫ ৷৷

'শাঙ্করভাষ্যঅনুসারে ভাবার্থঃ- শ্রীভগবান্ কহিলেন "হে মহাবাহো! মন যে দুর্নিরোধ চঞ্চল তাহাতে কোন সংশয় নাই। কিন্তু হে কৌন্তেয়! অভ্যাস বৈরাগ্যের দ্বারা ইহার নিগ্রহ সম্ভব হইতে পারে। অভ্যাস বলিতে চিত্তভূমিতে চিত্তের কোন বৃত্তির একই প্রত্যয়ের অর্থাৎ একজাতীয় বুদ্ধিবৃত্তির বারংবার আবৃত্তি। বৈরাগ্য বলিতে দৃষ্ট, অদৃষ্ট ইষ্ট ভোগে দোষদর্শনের অভ্যাসহেতু বিতৃষ্ণা। সেই বৈরাগ্যের দ্বারা বিক্ষেপরূপ চিত্তের প্রচারকে অর্থাৎ সঙ্কল্পবিকল্পকে গ্রহণ করা যায়। অর্থাৎ এই প্রকারে মনের চাঞ্চল্যকে নিগ্রহ অর্থাৎ নিরোধ করা যায়।" ৩৫

অসংযতাত্মনা যোগো দুষ্প্রাপ ইতি মে মতিঃ

বশ্যাত্মনা তু যততা শক্যোবাপ্তুমুপায়তঃ৷। ৩৬।। 

'শাঙ্করভাষ্য' অনুসারে ভাবার্থঃ- অসংযতাত্মা অর্থাৎ অভ্যাস এবং বৈরাগ্যের দ্বারা সংযত নহে এমন যে আত্মা অর্থাৎ অন্তঃকরণ যাহার, তাহার দ্বারা যোগ দুষ্প্রাপ্য অর্থাৎ দুঃখের দ্বারা প্রাপ্ত হইয়া থাকেইহাই আমার অভিমত। পুনশ্চ যিনি বশ্যাত্মা অর্থাৎ অভ্যাস এবং বৈরাগ্যের দ্বারা যাঁহার আত্মা (মন) বশ্যত্ব প্রাপ্ত হইয়াছে, যিনি পুনঃপুনঃ প্রযত্নশীল, তিনি যথোক্ত উপায়ের দ্বারা যোগ প্রাপ্তিতে সমর্থ।

 অর্জুন উবাচ

অযতিঃ শ্রদ্ধযোপেতো যোগাচ্চলিতমানসঃ ৷

অপ্রাপ্য যোগসংসিদ্ধিং কাং গতিং কৃষ্ণ গচ্ছতি ৷৷৩৭৷৷

'শাঙ্করভাষ্যঅনুসারে ভাবার্থঃহে কৃষ্ণ! যিনি শ্রদ্ধাবান্অর্থাৎ আস্তিক্যবুদ্ধিযুক্ত অথচ যোগমার্গে  যত্নের শিথিলতাবশতঃ যোগ হইতে ভ্রষ্টচিত্ত হওয়ায় সম্যগ্ দর্শনরূপ যোগসিদ্ধি লাভে অসমর্থ হন, তিনি কি প্রকার গতি প্রাপ্ত হন?

কচ্চিন্নোভয়বিভ্রষ্টশ্ছিন্নাভ্রমিব নশ্যতি ৷

 অপ্রতিষ্ঠো মহাবাহো বিমূঢ়ো ব্রহ্মণঃ পথি ৷৷ ৩৮ ৷৷

'শাঙ্করভাষ্যঅনুসারে ভাবার্থঃহে মহাবাহো! ব্রহ্মপ্রাপ্তির পথে কর্মমার্গ যোগমার্গ হইতে বিভ্রষ্ট, বিমূঢ় নিরাশ্রয় যোগী ছিন্ন অভ্র মেঘখণ্ডের ন্যায় কি বিনষ্ট হন?

এতন্মে সংশয়ং কৃষ্ণ ছেত্তুমর্হস্যশেষতঃ ৷ 

ত্বদন্যঃ সংশয়স্যাস্য ছেত্তা হ্যুপপদ্যতে ৷৷ ৩৯ ৷৷

'শাঙ্করভাষ্যঅনুসারে ভাবার্থঃহে কৃষ্ণ! আমার এই সংশয় নিঃশেষে দূর করিতে একমাত্র আপনিই সমর্থ। কারণ আপনি ভিন্ন অন্য কোনও ঋষি বা দেবতা আমার এই সংশয় দূর করিতে পারিবেন না।

শ্রীভগবানুবাচ

পার্থ নৈবেহ নামুত্র বিনাশস্তস্য বিদ্যতে

নহি কল্যাণকৃৎ কশ্চিদ্দুর্গতিং তাত গচ্ছতি ।। ৪০।।

'শাঙ্করভাষ্য' অনুসারে ভাবার্থঃ-শ্রীভগবান্বলিলেনহে পার্থ! যোগভ্রষ্ট ব্যক্তির ইহলোকে কি পরলোকে কুত্রাপি বিনাশ নাই অর্থাৎ  পূর্বজন্ম হইতে হীনজন্ম প্রাপ্তি সেই যোগভ্রষ্টের হয় না। কারণ, হে তাত (বৎস)! কল্যাণকৃৎ অর্থাৎ শুভকর্মকারী পুরুষ কখনও দুর্গতি প্রাপ্ত হন না। ৪০

সেই শ্রদ্ধাবান অথচ যত্নহীন যোগভ্রষ্টের দেহত্যাগের পর কিরূপ গতি হয়ে থাকে?

প্রাপ্য পুণ্যকৃতাং লোকানুষিত্বা শাশ্বতীঃ সমাঃ

শুচীনাং শ্রীমতাং গেহে যোগভ্রষ্টোভিজায়তে ৷৷ ৪১ ।।

'শাঙ্করভাষ্য' অনুযায়ী ভাবার্থঃ- যোগমার্গে প্রবৃত্ত সন্ন্যাসী (অল্পকাল যোগাভ্যাসী) সামর্থ্যহেতু পুণ্যকৃৎ অশ্বমেধাদি যাজীদের লোকসকলে গমন করিয়া তথায় বহু বৎসর বাস করেন, সেই ভোগক্ষয়ে পুনরায় শুচি অর্থাৎ শাস্ত্রানুমোদিত কর্ম্মকারী এবং শ্রীমান্ অর্থাৎ বিভূতিমানদের গৃহে জন্মগ্রহণ করেন। ৪১

অথবা যোগিনামেব কুলে ভবতি ধীমতাম্ ৷

এতদ্ধি দুর্লভতরং লোকে জন্ম যদীদৃশম্ ।।৪২।।

'শাঙ্করভাষ্যঅনুযায়ী ভাবার্থঃ- অথবা, যোগভ্রষ্ট পুরুষ বুদ্ধিমান্যোগিগণের কুলে জন্মগ্রহণ করেন ঈদৃশ জন্ম জগতে অতি দুর্লভ। কারণ ধনীর গৃহাপেক্ষা দরিদ্র যোগিগণের কুলে জন্ম সত্যিই দুর্লভ। ৪২

তত্র তং বুদ্ধিসংযোগং লভতে পৌর্বদেহিকম্ ৷ 

যততে ততো ভূয়ঃ সংসিদ্ধৌ কুরুনন্দন ৷৷ ৪৩ ৷৷ 

'শাঙ্করভাষ্যঅনুযায়ী ভাবার্থঃ- হে কুরুনন্দন, যে কারণে সেই যোগিগণের কুলে বুদ্ধিসংযোগ অর্থাৎ পূর্ব্ব জ্ঞানের সংস্কার লাভ করিয়া থাকে; ঐ সংস্কার কি প্রকার? পৌর্ব্বদেহিক অর্থাৎ পূর্ব্বজন্মের দেহে উৎপন্ন, সেই কারণে সেই সংস্কারের বশে যোগসিদ্ধি লাভ করিবার নিমিত্ত বহুতর প্রযত্ন করিয়া থাকেন। ৪৩

পূর্ব্বদেহের বুদ্ধিসংযোগ কি প্রকারে হয়? 

পূর্বাভ্যাসেন তেনৈব হ্রিযতে হ্যবশোপি সঃ ৷ 

জিজ্ঞাসুরপি যোগস্য শব্দব্রহ্মাতিবর্ততে ৷৷ ৪৪ ।৷ 

'শাঙ্করভাষ্যঅনুযায়ী ভাবার্থঃ- তিনি (যোগভ্রষ্ট) পূর্বজন্মের অভ্যাসবশে যেন অবশ হইয়াও যোগসাধনে প্রবৃত্ত হন যোগের স্বরূপ জানিতে ইচ্ছুক হইয়া যোগমার্গে প্রবৃত্ত যোগভ্রষ্টও বেদোক্ত যজ্ঞানুষ্ঠানের ফল অতিক্রম করেন আর যিনি যোগের স্বরূপ জানিয়া তন্নিষ্ঠ হইয়া যোগাভ্যাস করেন, তাঁহার সাফল্যের নিশ্চয়তা বলাই বাহুল্য ৪৪

কেন যোগিত্ব শ্রেয়? 

প্রযত্নাদ্যতমানস্তু যোগী সংশুদ্ধকিল্বিষঃ৷ 

অনেকজন্মসংসিদ্ধস্ততো যাতি পরাং গতিম্ ৷ ৷৪৫ ৷৷ 

'শাঙ্করভাষ্যঅনুযায়ী ভাবার্থঃযোগী ইহজন্মে পূর্বজন্মকৃত যত্ন অপেক্ষা অধিকতর যত্ন করিয়া পাপমুক্ত হইয়া পূর্ব পূর্ব জন্মের সাধনসঞ্চিত সংস্কার দ্বারা সিদ্ধিলাভ করিয়া মোক্ষপ্রাপ্ত হন

তপস্বিভ্যোধিকো যোগী জ্ঞানিভ্যোপি মতোধিকঃ৷

কর্মিভ্যশ্চাধিকো যোগী তস্মাদ্যোগী ভবার্জুন৷৷ ৪৬

যোগিনামপি সর্বেষাং মদ্গতেনান্তরাত্মনা৷

শ্রদ্ধাবান্ভজতে যো মাং মে যুক্ততমো মতঃ৷৷ ৪৭ 

শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- যোগী কৃচ্ছ্র চান্দ্রায়ণাদি তপোনিষ্ঠ ব্যক্তিগণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতগণ অপেক্ষা এবং অগ্নিহোত্রাদি যজ্ঞপরায়ণ কর্মিগণ অপেক্ষাও যোগী শ্রেষ্ঠ। অতএব হে অর্জুন! তুমি যোগী হও। যিনি শ্রদ্ধার সহিত মদ্গত চিত্তে অর্থাৎ বাসুদেব আমাতে সমাহিত অন্তঃকরণের দ্বারা আমার ভজনা করেন অর্থাৎ সেবা করেন, তিনি রুদ্রাদিত্যাদি দেবতাগণের ধ্যানপরায়ণ সকল যোগীর মধ্যে অতিশয় যুক্ত, ইহা আমার অভিপ্রায়।

ইতি শ্রীমহাভারতে শতসাহস্র্যাং সংহিতায়াং বৈয়াসিক্যাং

ভীষ্মপর্বণি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে

শ্রীকৃষ্ণার্জ্জুনসম্বাদে সন্ন্যাসযোগো নাম ষষ্ঠোঽধ্যায়।

 

 নমো ভগবতে বাসুদেবায়।

॥ শ্রীবেদব্যাসায় নমঃ ॥ শ্রীশঙ্করভগবত্পাদাচার্যস্বামিনে নমঃ ॥

 


Thursday, 31 March 2022

ওঙ্কারের স্বরূপ ব্রহ্ম, এই সমস্তই ওঙ্কারের স্বরূপঃ-

 


কৃষ্ণযজুর্বেদীয় তৈত্তিরীয়োপনিষদের শীক্ষাবল্লীর অষ্টম অনুবাকে বর্ণিত আছে—"ওমিতি ব্রহ্ম। ওমিতীদং সর্বম্।"-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-১/৮/১)

শঙ্করাচার্য এই শ্রুতির ভাষ্যে বলিতেছেন—'ওমিতি' অংশের 'ইতি' শব্দ স্বরূপবোধক; ওঙ্কারের স্বরূপ অর্থাৎ এই শব্দস্বরূপকে ব্রহ্ম এইরূপ মনে ধারণ করিবে অর্থাৎ উপাসনা করিবে; কেননা ওঙ্কারের স্বরূপ, এই সমুদয় শব্দস্বরূপই ওঙ্কারের দ্বারা ব্যাপ্ত, আর 'যেহেতু অশ্বত্থ পত্র যেরূপ শিরাজালে ব্যাপ্ত'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-২/২৩/৩) এই রূপ অন্যশ্রুতিও আছে। আর যেহেতু অভিধেয় (শব্দার্থ) ঐ শব্দের অধীন হয় এইজন্য 'এই সমস্তই ওঙ্কার' এইরূপ বলা হইতেছে।

মুণ্ডক শ্রুতিতে সৃষ্টিক্রমঃ-



অথর্ববেদীয় মুণ্ডকোপনিষদের প্রথম মুণ্ডকের প্রথম খণ্ডে বর্ণিত আছে—

তপসা চীয়তে ব্রহ্ম ততোঽন্নমভিজায়তে ।

অন্নাৎ প্রাণো মনঃ সত্যং লোকাঃ কর্মসু চামৃতম্ ॥ -(মুণ্ডক উপনিষৎ- ১/১/ ৮)

আচার্য শঙ্কর এই শ্রুতির ভাষ্যে বলিতেছেন–"সৃষ্টির উৎপত্তি ক্রম জানেন বলিয়া প্রাণীদের উৎপত্তির কারণ অবিনাশী ব্রহ্ম তপসা অর্থাৎ ওই জ্ঞানের (সঙ্কল্পের) দ্বারা (সৃষ্ট্যুন্মুখ) হন অর্থাৎ অঙ্কুরসদৃশ এই জগৎ উৎপন্ন করিতে ইচ্ছা করিয়া বীজসদৃশ নিজে স্ফীত হন যেভাবে পুত্র সমুৎপাদনার্থ পিতা আনন্দে উল্লসিত হন।

সর্বজ্ঞতানিবন্ধন সৃষ্টি, স্থিতি ও সংহারশক্তির এইরূপ জ্ঞানবশতঃ স্ফীত হওয়ার ফলে তন্নিমিত্ত অর্থাৎ ব্রহ্মের নিমিত্ত অন্ন— অদন অর্থাৎ ভোগ করা যায় বলিয়া অন্ন (ভোগ্য) অর্থাৎ অব্যক্ত যাহা সকল সংসারী জীবের সাধারণ কারণ (কেননা যেহেতু অব্যক্ত হইতে সকল প্রাণীর ভোগ্যশরীর সৃষ্ট হয়), সেই অব্যক্ত অভিব্যক্তেচ্ছু অবস্থারূপে উৎপন্ন হয়। তদনন্তর অভিব্যক্তেচ্ছু অবস্থা বিশিষ্ট ভোগ্য অব্যক্ত হইতে প্রাণ অর্থাৎ হিরণ্যগর্ভ যিনি কার্যব্রহ্মের (জগতের) জ্ঞানশক্তি ও ক্রিয়াশক্তিবিশিষ্ট, জগৎজীবের সমষ্টিস্বরূপ, প্রেয়ঃ কামনা ও কামনা জনিত কর্মফলের সমষ্টিরূপ বীজের অঙ্কুরসদৃশ, স্থূলজগতের, সূক্ষ্মস্বরূপ তিনি 'উৎপন্ন হন'।

আমার সেই প্রাণ (হিরণ্যগর্ভ) হইতে মন অর্থাৎ সঙ্কল্প, বিকল্প, সংশয় ও নিশ্চয়াদি স্বভাববিশিষ্ট মনসংজ্ঞক (সমষ্টি অন্তঃকরণ) উৎপন্ন হয়। তাহার পর আবার সঙ্কল্পাদ্যাত্মক (সমষ্টি) মন হইতে সত্য অর্থাৎ সত্যসংজ্ঞক আকাশাদি সূক্ষ্ম ভূতপঞ্চক সৃষ্ট হয়। এবং সত্যনামক সেই ভূতপঞ্চক হইতে ব্রহ্মাণ্ড ও তারপর ভূর্লোক প্রভৃতি সপ্তলোক উৎপন্ন হয়। আর সেই সকল লোকেতে (শরীরে) মনুষ্যাদি প্রাণিবর্গের বর্ণ ও আশ্রম অনুযায়ী নানাবিধ কর্ম এবং নিমিত্তস্বরূপ ঐ কর্মসকলেতে অমৃত অর্থাৎ ঐ কর্ম জনিত ফল উৎপন্ন হয়। শতকোটি কল্প অতিক্রম হইলেও যাবৎকাল পর্যন্ত (জ্ঞানোদয়ে)কর্মসমূহ বিনষ্ট না হয় তাবৎকাল পর্যন্ত (কর্মের সহিত) তৎফলও অক্ষুণ্ণ থাকিতেছে বলিয়া কর্মফলকে অমৃত বলা হইতেছে।

Sunday, 20 March 2022

মুখ্য প্রাণের স্বরূপ নির্ণয়ঃ-

 


বেদান্তমীমাংসা শাস্ত্রের বায়ুক্রিয়াধিকরণের প্রতিপাদ্য বিষয় মুখ্য প্রাণের স্বরূপ নির্ণয়। মুখ্য প্রাণ কি বায়ু মাত্র? অথবা ইন্দ্রিয়গণের ক্রিয়া? অথবা অন্য কিছু? ভগবান সূত্রকার বাদরায়ণ বলিতেছেন-

ন বায়ুক্রিয়ে পৃথগুপদেশাত্৷৷- (ব্রহ্মসূত্র-২/৪/৯)

আচার্য শঙ্কর সূত্রভাষ্যে সিদ্ধান্ত করিতেছেন—"মুখ্য প্রাণ বায়ু নহে এবং ইন্দ্রিয় সকলের ব্যাপারও নহে। কেন নহে? যেহেতু পৃথগ্ভাবে উপদিষ্ট হইয়াছে। বায়ু হইতে মুখ্যপ্রাণের পৃথগ্ভাবে উপদেশ আছে। যথা-

প্রাণ এব ব্রহ্মণশ্চতুর্থঃ পাদঃ স বাযুনা জ্যোতিষা ভাতি চ তপতি চ'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৩/১৮/৪)

'মুখ্যপ্রাণই ব্রহ্মের চতুর্থ পাদ, তাহা বায়ুরূপ জ্যোতির দ্বারা প্রকাশিত হয় ও কার্য্যক্ষম হয়।' মুখ্যপ্রাণ বায়ু হইলে নিশ্চয়ই বায়ু হইতে পৃথগ্ভাবে উপদিষ্ট হইত না। এইপ্রকারে ইন্দ্রিয় সকলের বৃত্তি হইতেও মুখ্যপ্রাণের পৃথগ্ভাবে উপদেশ আছে। যথা- "এই পুরুষ হইতে প্রাণ জাত হয় এবং মন সর্বেন্দ্রিয়..."-(মুণ্ডক উপনিষৎ-২/১/৩) সুতরাং বৃত্তি ও বৃত্তি মানের অভিন্নতাবশতঃ মুখ্যপ্রাণ ইন্দ্রিয়সকলের সাধারণ বৃত্তি হইয়াই ইন্দ্রিয়সকল হইতে নিশ্চয়ই পৃথগ্ভাবে উপদিষ্ট হইত না।..."

তাহলে মুখ্যপ্রাণ কি? মুখ্য প্রাণ বায়ুরূপ মহাভূতের কার্য্য, বায়ুমাত্র নহে, তদ্ভিন্নও নহে। আচার্য শঙ্কর ভাষ্যে তাহাই সিদ্ধান্ত করিতেছেন—"এই বায়ুই অধ্যাত্মভাবকে প্রাপ্ত হইয়া প্রাণ ও অপান প্রভৃতি পাঁচ প্রকার ব্যূহরূপ বিশেষস্বরূপে অবস্থানকরতঃ মুখ্যপ্রাণ নামে কথিত হয়। তাহা বায়ু হইতে তত্ত্বান্তর (সম্পূর্ণ ভিন্ন বস্তু) নহে, অথবা বায়ুমাত্রও নহে।"

মনের ন্যায় ইহারও পাঁচটি বৃত্তি আছে বলিয়া শাস্ত্রে উপদেশ করা হইয়াছে। 'পঞ্চবৃত্তির্মনোবদ্ব্যপদিশ্যতে'-(ব্রহ্মসূত্র-২/৪/১২)

আচার্য শঙ্কর ভাষ্যে বলিতেছেন— "আর এই হেতুবশতঃ মুখ্যপ্রাণের বিশেষ কার্য্য বর্তমান আছে, যেহেতু শ্রুতিসকলে ইহা পঞ্চবৃত্তিযুক্তরূপে (—ক্রিয়াভেদে পাঁচ প্রকার অবস্থাযুক্তরূপে) বর্ণিত হইতেছে, যথা—"প্রাণ, অপান, ব্যান, উদান ও সমান", ইত্যাদি। আর এই বৃত্তি ভেদ‌ কার্য্যভেদকে অপেক্ষা করে। সেই কার্য্য প্রদর্শন করিতেছেন—সম্মুখভাগে যাহার বৃত্তি এবং উচ্ছ্বাস (–প্রশ্বাস এবং দেহধারণ) প্রভৃতি যাহার কর্ম্ম, তাহা প্রাণ। অধোভাগে যাহার বৃত্তি এবং নিঃশ্বাসাদি (—শ্বাসগ্রহণ ও অধোবায়ুত্যাগ) যাহার কর্ম্ম, তাহা অপান। সেই দুইটীর (—প্রাণ ও অপানের) সন্ধি স্থলে (—নাভিতে) বর্ত্তমান যাহা অগ্নিমন্থনাদি বলসাধ্য কর্ম্মের হেতু, তাহা ব্যান। ঊর্ধ্ব দিকে যাহার বৃত্তি এবং উৎক্রমণ গত্যাগতি ও উদগার প্রভৃতির যাহা হেতু, তাহা উদান। অন্নরসকে যাহা সকল অঙ্গে সমানভাবে লইয়া যায়, তাহা সমান।

এই প্রকারে মুখ্যপ্রাণ মনের ন্যায় পঞ্চবৃত্তিযুক্ত, অর্থাৎ মনের যেমন পাঁচপ্রকার বৃত্তি, মুখ্যপ্রাণেরও এইপ্রকার।

 

Thursday, 17 March 2022

হিরণ্যগর্ভ কি?

 


কঠশ্রুতির (১/৩/১০) শাঙ্করভাষ্যে উল্লেখ রহিয়াছে-"অব্যক্ত হইতে প্রথম উৎপন্ন হিরণ্যগর্ভতত্ত্ব যাহা জ্ঞানশক্তি ও ক্রিয়াশক্তিস্বরূপ, সেই মহান আত্মা (–সমষ্টিবুদ্ধি হিরণ্যগর্ভ) ঐ বুদ্ধি-উৎপাদক ভূতসূক্ষ্ম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।"

ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞের সংযোগই যে ভূতকারণ সেই বিষয়ে শ্রীভগবান বলিতেছেন- "সর্বকার্য (উৎপত্তিশীল বস্তু) হইতে মহত্ত্বহেতু এবং আত্মবিকারস্বরূপ সর্বকার্যের ভরণকারী 'মহৎ' নামে প্রসিদ্ধ ব্রহ্ম, আমার স্বভূতা মদীয়া মায়া ত্রিগুণাত্মিকা প্রকৃতি— যিনি স্বীয় বিকারজাত সর্বভূতের যোনি অর্থাৎ উৎপত্তির কারণ। সেই মহদ্ব্রহ্মরূপ যোনিতে আমি (ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ প্রকৃতিদ্বয় দ্বারা শক্তিমান ঈশ্বর) গর্ভাধান (হিরণ্যগর্ভ জন্মের বীজ অর্থাৎ সর্বভূত জন্মকারণের বীজ নিক্ষেপ) করি অর্থাৎ অবিদ্যা, কাম ও কর্ম-রূপ উপাধি অনুবিধায়ী ক্ষেত্রজ্ঞকে ক্ষেত্রের সহিত সংযোজন করি। সেই গর্ভাধান হইতে হিরণ্যগর্ভের উৎপত্তিদ্বারা সর্বভূতের উৎপত্তি হইয়া থাকে।"-(শাঙ্করভাষ্য, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৪/৩)

সৃষ্টির আরম্ভে প্রকৃতির এই প্রথম পরিণামকে মহত্তত্ত্বও বলা হয়। আধুনিক সাংখ্যকারগণ উহাকেই বুদ্ধিতত্ত্ব বলেন। শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণে প্রকৃতি থেকে চিত্তের উৎপত্তিপূর্বক তাহার লক্ষণ বর্ণিত আছে-"সেই পরমপুরুষ দৈববশত (জীবের অদৃষ্টবশত) ক্ষুভিতধর্মিণী স্বীয়া প্রকৃতিতে বীর্য (চিদরূপা শক্তি) আধান করেন। তখন সেই প্রকৃতি হিরণ্ময় অর্থাৎ প্রকাশবহুল মহৎতত্ত্বকে সৃষ্টি করেন।"-(শ্রীধর স্বামী টীকা, শ্রীমদ্ভাগবতম্-৩/২৬/১৯)

 

Wednesday, 16 March 2022

অব্যক্ত কি?

 


প্রথমে শ্রুতিতে কি বলছে এ বিষয়ে দেখে নেয়া যাক। কৃষ্ণযজুর্বেদীয় কঠশ্রুতিতে বর্ণিত আছে- "মহতঃ পরম্ অব্যক্তম্"-(কঠ উপনিষৎ-১/৩/১১) শঙ্করাচার্য এই শ্রুতির ভাষ্যে বলেছেন- "মহৎ (হিরণ্যগর্ভ) হইতেও শ্রেষ্ঠ অর্থাৎ সূক্ষ্মতর ও প্রত্যগাত্মভূত এবং ব্যাকৃত সকলের অপেক্ষাও মহত্তর এই অব্যক্ত, যাহা সম্পূর্ণ জগতের বীজভূত অর্থাৎ উপাদান কারণ স্বরূপ, অব্যাকৃত নাম ও রূপের সত্তাস্বরূপ, সমস্ত কার্য ও কারণশক্তির সমষ্টি, অব্যক্ত অব্যাকৃত আকাশাদি নামে প্রলয়কালে কথনীয় এবং বটবীজকণিকায় নিহিত বটবৃক্ষের শক্তির ন্যায় পরমাত্মাতে ওতপ্রোতভাবে সম্যক আশ্রিত।"

স্মৃতিতে শ্রীভগবান্ সাংখ্যের চতুর্বিংশতি তত্ত্বের বর্ণনায় বলছেন-"বুদ্ধিরব্যক্তমেব চ"-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৩/৫) শঙ্করাচার্য ভাষ্যে বলছেন-"অধ্যবসায় লক্ষণা বুদ্ধিরও কারণ অব্যক্ত অর্থাৎ যা ব্যক্ত নয় তাই অব্যক্ত বা অব্যাকৃত অর্থাৎ ঈশ্বর-শক্তি, যিনি শ্রীভগবানকর্তৃক 'আমার দুরতিক্রমণীয়া মায়া'-(ভগবদ্গীতা-৭/১৪) বলে উক্ত হয়েছেন।"

ব্রহ্মসূত্রের 'তদধীনত্বাদর্থবৎ৷৷১.৪.৩৷৷' এইসূত্রে তাহা স্পষ্ট। শঙ্করাচার্য উক্ত সূত্রের ভাষ্যে বলছেন-

"অবিদ্যারূপা যে প্রসিদ্ধা বীজশক্তি, তাহা 'অব্যক্ত' এই শব্দের দ্বারা নির্দ্দেশের যোগ্য, তাহা পরমেশ্বরকে আশ্রয়করতঃ অবস্থান করে, মায়াময়ী এবং মহাসুপ্তিস্বরূপা, যাহাতে স্বরূপজ্ঞানরহিত সংসারী জীবগণ শয়ন করে অর্থাৎ আবদ্ধ হইয়া জন্মমৃত্যু অনুভব করে। সেই এই অব্যক্ত কোন কোন স্থলে 'আকাশ' এই শব্দের দ্বারা নির্দিষ্ট হইয়াছে, যেহেতু এইপ্রকার শ্রুতি আছে-

'এতস্মিন্নু খল্বক্ষরে গার্গ্যাকাশ ওতশ্চ প্রোতশ্চ'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৩/৮/১১)

অর্থাৎ 'হে গার্গি, এই অক্ষরে (ক্ষয়রহিত ব্রহ্মে) 'আকাশ' ওতপ্রোতভাবে অবস্থিত আছে।'...."

 

Saturday, 12 March 2022

বেদের নাসদীয় সূক্তে মুখ্য প্রাণের অনাদিত্ব প্রতিপাদ্য নহেঃ-



আজকের আলোচনায় মুখ্যপ্রাণোৎপত্তি বিচার্য বিষয়। "ব্রহ্ম হইতে মুখ্যপ্রাণ উৎপন্ন হয়" এই মুণ্ডক শ্রুতির সহিত ঋগ্বেদ্ সংহিতার নাসদীয় সূক্তে "সৃষ্টির পূর্বে মুখ্যপ্রাণের অস্তিত্ব প্রতিভাত হয়" এই শ্রুতির বিরোধ মনে হয়। আর শ্রুতিদ্বয়ের বিরোধবশতঃ সংশয় হয়—মুখ্যপ্রাণ কি অনাদি অথবা উৎপন্ন হয়?

ভগবান ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য বেদান্তমীমাংসা শাস্ত্রের প্রাণশ্রৈষ্ঠ্যাধিকরণের ভাষ্যে এই সংশয়ের নিরাকরণ করিতেছেন—

মুখ্যপ্রাণ অন্যান্য প্রাণ (–ইন্দ্রিয়) সকলের ন্যায় ব্রহ্মের কার্য্য, ইহা ভগবান সূত্রকার বাদরায়ণ অতিদেশ করিতেছেন। আর অবিশেষভাবে (মুখ্য ও অমুখ্য) সকল প্রাণেরই সেই ব্রহ্মবিকারতা (—তাহারা ব্রহ্ম হইতে উৎপন্ন, ইহা ২/৪/১ অধিকরণে) বর্ণিত হইয়াছে। যেহেতু-

'এতস্মাজ্জায়তে প্রাণো মনঃ সর্বেন্দ্রিয়াণি চ'-(মুণ্ডক উপনিষৎ- ২/১/৩)

"ইঁহা (–ব্রহ্ম) হইতে মুখ্য প্রাণ মন ও ইন্দ্রিয়সকল উৎপন্ন হয়", এই প্রকারে ইন্দ্রিয়ের সহিত মন হইতে ভিন্নভাবে মুখ্যপ্রাণের উৎপত্তি শ্রুত হইতেছে। আর যেহেতু-

'স প্রাণমসৃজত'-(প্রশ্ন উপনিষৎ-৬/৪)

"তিনি প্রাণকে সৃষ্টি করিলেন" ইত্যাদি শ্রুতিসকলও আছে।

আচ্ছা তাহলে কোন প্রয়োজনে অতিদেশ হইতেছে? অধিক আশঙ্কাকে নিরাকরণ করিবার জন্য। নাসদীয় নামক ব্রহ্মপ্রধান সূক্তে এইপ্রকার মন্ত্রবর্ণ আছে–

'ন মৃত্যুরাসীদমৃতং ন তর্হি ন রাত্র্যা অহ্ন আসীত্প্রকেতঃ৷ আনীদবাতং স্বধয়া তদেকং তস্মাদ্ধান্যন্নপরঃ কিংচনাস'।।-(ঋগ্বেদ্ সংহিতা-১০/১২৯/২)

"তখন (–মহাপ্রলয়কালে) মৃত্যু (–বিনাশশীল কার্য্য বস্তু) ছিল না, অমৃত ছিল না, রাত্রি ও দিনের প্রকেত (–চিহ্ন, অর্থাৎ চন্দ্র ও সূর্য) ছিল না, স্বধার (–স্বকর্ত্তৃক ধৃতা মায়ার) সহিত অবাত (–প্রাণবায়ুবর্জিত, অবিক্রিয়) সেই এক ব্রহ্ম আনীৎ (–বর্ত্তমান) ছিলেন, তাঁহা হইতে শ্রেষ্ঠ কিছুই ছিল না", ইত্যাদি।

"আনীৎ" এই প্রকারে মুখ্যপ্রাণের কর্ম্ম গৃহীত হওয়ায় এই শ্রুতিবাক্য জগতের উৎপত্তির পূর্ব্বে প্রাণের অস্তিত্ব বর্তমান আছে অর্থাৎ প্রাণ অজ (–জন্মরহিত) এই প্রকার বুদ্ধি কাহারও কাহারও উৎপন্ন হয়। ভগবান সূত্রকার তাদৃশ বুদ্ধিকে অতিদেশের দ্বারা অপনোদন করিতেছেন। যথা—

আনীৎ শব্দটিও উৎপত্তির পূর্বে মুখ্যপ্রানের অস্তিত্ব সূচনা করিতেছে না; যেহেতু অবাত (–প্রাণবায়ুরহিত), এইপ্রকার বিশেষণ আছে। আর

'অপ্রাণো হ্যমনাঃ শুভ্রঃ'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-২/১/২)

"সেই অক্ষর পুরুষ প্রাণরহিত মনোবিহীন এবং শুদ্ধ", এইপ্রকারে মূলপ্রকৃতির (–জগতের মূলকারণ ব্রহ্মের) প্রাণাদি সমস্ত বিশেষরাহিত্য প্রদর্শিত হওয়ায় মহাপ্রলয়ে মুখ্যপ্রাণের সত্তা সিদ্ধ হয় না। সেইহেতু নাসদীয় সূক্তের এই "আনীৎ" শব্দটি মহাপ্রলয়ে ব্রহ্মরূপ কারণের অস্তিত্ব প্রদর্শনের জন্য, ইহা অবগত হইতে হইবে।

 

Thursday, 10 March 2022

"তোটকাষ্টকম্"

 


"বিদিতাখিলশাস্ত্রসুধাজলধে মহিতোপনিষদ্ কথিতার্থনিধে।

হৃদয়ে কলয়ে বিমলম্ চরণম্ ভব শঙ্কর দেশিক মে শরণম।।"

"হে সমস্ত শাস্ত্রের অমৃততত্ত্বের জ্ঞাতা, হে উপনিষদোক্ত আত্মবিজ্ঞানের দাতা। আমার হৃদয়ে আপনার পবিত্র চরণের ধ্যান করছি, হে গুরু শঙ্কর আপনি আমায় শরণ প্রদান করুন।।" (১)

"করুণাবরুণালয় পালয় মাম্ ভবসাগরদুঃখবিদুনহৃদম।

রচয়াখিলদর্শনতত্ত্ববিদম্ ভব শঙ্কর দেশিক মে শরণম্।।"

"হে করুণার সাগর, আমাকে ভবসাগরের ভীষণ দুঃখ থেকে উদ্ধার করুন। আমাকে সমস্ত দর্শনের সারতত্ত্বের জ্ঞান প্রদান করুন, হে গুরু শঙ্কর আপনি আমায় শরণ প্রদান করুন।।" (২)

"ভবতা জনতা সুহিতা ভবিতা নিজবোধবিচারণ চারুমতে।

কলয়েশ্বরজীববিবেকবিদম্ ভব শঙ্কর দেশিক মে শরণম্।।"

"আপনি আত্মস্বরূপ বিচারে অতি দক্ষ, আপনার প্রভাবে অসংখ্য জীব সুখী হয়েছে। আপনি আমাকে ঈশ্বর এবং জীব এই উভয় তত্ত্বের বোধ করান, হে গুরু শঙ্কর আপনি আমায় শরণ প্রদান করুন।।" (৩)

"ভব এব ভবানিতি মে নিতরাম্ সমজায়ত চেতসি কৌতুকিতা।

মম বারয় মোহমহাজলধিম্ ভব শঙ্কর দেশিক মে শরণম্।।"

"আপনি স্বয়ং শিব, এটা উপলব্ধি করতে পেরে আমার চিত্তে পরমানন্দের স্পন্দন হয়। আমাকে এই বিরাট মোহসমুদ্র হতে উদ্ধার করুন, হে গুরু শঙ্কর আপনি আমায় শরণ প্রদান করুন।।" (৪)

"সুকৃতেধিকৃতে বহুধা ভবতো ভবিতা সমদর্শনলালসতা।

অতিদীনমিমম্ পরিপালয় মাম্ ভব শঙ্কর দেশিক মে শরণম্।।"

"আমি বহুজন্মের পূণ্যের ফলে আপনার কৃপালাভ করার সুযোগ পেয়েছি। এই কিঙ্করকে এখন আপনি রক্ষা করুন, হে গুরু শঙ্কর আপনি আমায় শরণ প্রদান করুন।।" (৫)

"জগতীমবিতুম্ কলিতাকৃতয়ো বিচরন্তি মহামহসশ্ছলতঃ।

অহিমাংশুরিবাত্র বিভাসি গুরো ভব শঙ্কর দেশিক মে শরণম্।।"

"হে গুরু, এই জগতের মঙ্গলের জন্য অনেক মহাপুরুষগণ বিভিন্ন রূপ ধারণ করে সর্বত্র বিচরণ করেন। তাঁদের মধ্যে আপনিই সূর্যের মতো তেজস্বী এবং জাজ্বল্যমান, হে গুরু শঙ্কর আপনি আমায় শরণ প্রদান করুন।।" (৬)

"গুরুপুঙ্গব পুঙ্গবকেতন তে সমতাময়তাম্ নহি কোপি সুধীঃ।

শরণাগতবৎসল তত্ত্বনিধে ভব শঙ্কর দেশিক মে শরণম্।।"

"হে শ্রেষ্ঠ গুরু, হে প্রভো আপনার ধ্বজে বৃষ শোভায়মান, কেউই আপনার সমকক্ষ নয়। হে শরণাগতদের আশ্রয়প্রদানকারী, হে তত্ত্বজ্ঞানের রত্ন, হে গুরু শঙ্কর আপনি আমায় শরণ প্রদান করুন।।" (৭)

"বিদিতা ন ময়া বিশদৈককলা ন চ কিণ্চন কাঞ্চনমস্তি গুরো।

দ্রুতমেব বিধেহি কৃপাম্ সহজাম্ ভব শঙ্কর দেশিক মে শরণম্।।"

"আমি শাস্ত্রের তত্ত্ব জানিনা, আমার কোনো ধনসম্পদও নেই গুরু। দ্রুত আমার প্রতি আপনার কৃপা বিধান করুন যা আপনার পক্ষে অতি সহজ, হে গুরু শঙ্কর আপনি আমায় শরণ প্রদান করুন।।" (৮)

ইতি শ্রীমত্তোটকাচার্য বিরচিতং তোটকাষ্টকম্ বা শ্রীশঙ্করদেশিকাষ্টকং সম্পূর্ণম্ ||

ইতি শ্রীমদ্ তোটকাচার্য বিরচিত তোটকাষ্টক বা শ্রীশঙ্করদেশিকাষ্টক স্তোত্র সমাপ্ত।

 

Sunday, 6 March 2022

অদ্বৈতবেদান্ত আসুরিক মত, এই দাবির খণ্ডনঃ-


ভগবদ্গীতা (১৬/৮) অনুসারে অনেকেই দাবি করেন, আসুরিক প্রবৃত্তির লোকেরাই নাকি জগৎকে মিথ্যা বলে। তাই সেই ভেদবাদীদের দৃষ্টিতে 'ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা' এই অদ্বৈতমত আসুরিক। এই বিষয়ে আজকের আলোচনা।

প্রথমত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শ্লোকের মূল তাৎপর্য কি দেখা নেয়া যাক।

অসত্যমপ্রতিষ্ঠং তে জগদাহুরনীশ্বরম্ ৷

অপরস্পরসম্ভূতং কিমন্যত্কামহৈতুকম্ ৷৷১৬.৮৷৷

ভগবান ভাষ্যকার শঙ্করাচার্যের ভাষ্যানুবাদ-

আসুরস্বভাববিশিষ্ট ব্যক্তিগণ বলে, যেরূপ আমরা মিথ্যা-পরিপূর্ণ সেইরূপ এই সমস্ত জগৎই অসত্য (বেদাদি প্রমাণশূন্য) এবং অপ্রতিষ্ঠ অর্থাৎ জগতে কোন ধর্মাধর্মের প্রতিষ্ঠা নেই। যেহেতু (বেদকর্তা) ধর্মাধর্মের অনুপাতী এই জগতের শাসিতা ঈশ্বর বলে কিছু বিদ্যমান নেই। অতএব তারা বলে এই জগৎ অনীশ্বর। তারা আর কি বলে? কামবশতঃ স্ত্রী-পুরুষের সংযোগেই এই জগৎ উৎপন্ন; ইহার উৎপত্তির অদৃষ্ট ধর্মাধর্মাদি অন্য কারণ নাই। এই হলো লোকায়তিক দৃষ্টি। ৮

অর্থাৎ এখানে স্পষ্ট যে, অনীশ্বরবাদী লোকায়ত (চার্বাকাদি) দর্শনকেই এখানে আসুরিক মত বলা হয়েছে। যারা এইরকম লোক-গাথা অবলম্বন করে অর্থ এবং কামকেই পুরুষার্থ মনে করে পারলৌকিক বিষয় অস্বীকার করে। অপরদিকে অদ্বৈতবেদান্ত শাশ্বত সনাতন ব্রহ্মবাদী দর্শন, অনীশ্বরবাদী নয়।

এবার আসি বিবেকচূড়ামণির ২০ নং শ্লোকের 'ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা' বিষয়ে। এই 'মিথ্যা' শব্দের অর্থ-বন্ধ্যাপুত্রের ন্যায় অলীকত্ব নয়, পরন্তু অনির্বচনীয়ত্ব। বাস্তব সত্তারহিত যার প্রতীতি হয়, যার স্বরূপকে 'ইহা এই প্রকার' এইরূপে শৃঙ্গগ্রাহিতয়া নির্ব্বচন করা যায় না এবং বাক্যের দ্বারা বর্ণনা করা যায় না, তাহাকে বলে 'অনির্বচনীয়' বা 'মিথ্যা'। এই মিথ্যা শব্দ এই অর্থে এই দর্শনে পারিভাষিক। যোগবাশিষ্ঠসারে শ্রীবশিষ্ঠ তাই বলছেন-"হে রাম! (সংসারকারণ) এই মায়া স্বনাশে আনন্দ দান করে। উহার স্বভাব দেখা বা বুঝা যায় না; কারণ (বিচারদৃষ্টিতে) দেখিলে উহাকে পাওয়াই যায় না, উহার নাশ হয় (উহা তাই অনির্বচনীয়)।"-(যোগবাশিষ্ঠসারঃ, জগৎ মিথ্যাত্ব প্রকরণ-৬)

এই বিবেকচূড়ামণির অন্যান্য শ্লোকে আবার জগৎকে ব্রহ্ম হতে অভিন্ন বলা হয়েছে। যথা-

"সকল অবস্থায় এই জগৎ ব্রহ্ম প্রতীতির প্রবাহ মাত্র, অতএব সর্বপ্রকারে এই জগৎ ব্রহ্ম মাত্র।"-(বিবেকচূড়ামণি-৫২১)

"এই বিস্তৃত জগতের সবকিছুই অবশ্য ব্রহ্মমাত্র"-(বিবেকচূড়ামণি-৩৯৪)

সুতরাং জগতের স্বতন্ত্র নিরপেক্ষ সত্তা নেই। ইহার অধিষ্ঠান আত্মার সত্যতার জন্য ইহা সত্যরূপে প্রতীত হয়। বিবেকচূড়ামণিতে (২৩২,২৩৩) এই বিষয়ে বলা হচ্ছে-

"এই জগৎ যদি স্বরূপতঃ সত্য হত অর্থাৎ ইহার নিত্য বর্তমান স্বতন্ত্র সত্ত্বা থাকত, তাহলে সত্যস্বরূপ জগতের কখনো নাশ হতো না। বস্তু স্বরূপের জ্ঞাতা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ 'আমি সে সকল বস্তুতে নেই' আর 'সে সকল বস্তু আমাতে নেই' এইরূপ বলে জগৎ মিথ্যাত্বের সমর্থন করেছেন।"

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ে শ্রীভগবান তাই বলছেন-

ময়া ততমিদং সর্বং জগদব্যক্তমূর্তিনা৷

মত্স্থানি সর্বভূতানি ন চাহং তেষ্ববস্থিতঃ৷৷

ন চ মত্স্থানি ভূতানি পশ্য মে যোগমৈশ্বরম্৷

ভূতভৃন্ন চ ভূতস্থো মমাত্মা ভূতভাবনঃ৷৷৪,৫

অর্থাৎ আমি ইন্দ্রিয়ের অগোচর ও অব্যক্তমূর্তি; আমার দ্বারা এই সমগ্র বিশ্ব পরিব্যাপ্ত । ব্রহ্মাদি স্থাবর পর্যন্ত সমস্ত ভূত আমাতে অবস্থিত; কিন্তু আমি আকাশবৎ অপরিচ্ছিন্ন অসংসর্গী বলিয়া তৎসমুদয়ে আধেয়ভাবে অবস্থিত নহি । ৪

আমার ঈশ্বরীয় যোগ দর্শন কর । বস্তুতঃ ব্রহ্মাদিস্তম্ভপর্যন্ত ভূতগণ সর্বসঙ্গবর্জিত আমাতে পারমার্থিকভাবে অবস্থিত নহে; অসংসর্গীত্ব নিবন্ধন আমার আত্মা ভূতগণে অবস্থিত না হইয়াও তাহাদের ধারক ও জনক । ৫

এখন আবার প্রশ্ন জগৎ যদি চিদাত্মা হতে ভিন্ন নয় তবে উহা ভিন্নরূপে প্রতিভাত হয় কেন? এই শঙ্কার উত্তরে বলছেন-

"আত্মবিষয়ক অজ্ঞানবশতই জগৎ প্রতিভাত হইয়া থাকে, অধিষ্ঠানভূত আত্মার জ্ঞান হইলে আর আত্মা হইতে পৃথকরূপে কোন জগৎ দৃষ্টিগোচর হয় না। যেমন রজ্জুস্বরূপের অজ্ঞানবশতই ভ্রান্তিসর্প দেখা যায়, রজ্জুর জ্ঞান হইলে আর ঐ সর্পপ্রতীতি হয় না।" -(অষ্টাবক্র গীতা, শিষ্যোক্তমাত্মানুভবোল্লাসঃ, ৭)

অর্থাৎ রজ্জুতে যেমন পরমার্থতঃ সর্প কোন কালেই থাকে না তদ্রূপ ব্রহ্মরূপ অধিষ্ঠানে পরমার্থতঃ এই জগৎ কোন কালেই নেই। ব্রহ্মসূত্রের ২।১।১৪ এর ভাষ্যে ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্য তা স্পষ্ট করেছেন-

"পারমার্থিক দৃষ্টিতে শুদ্ধ চৈতন্যে ঈশ্বরত্ব ও জীবত্ব প্রভৃতি দ্বৈতবুদ্ধি উপপন্ন হয় না, সেই বিষয়ে শ্রুতি প্রমাণ-

'যত্র নান্যত্পশ্যতি নান্যচ্ছৃণোতি নান্যদ্বিজানাতি স ভূমা' -(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৭/২৪/১)।

অর্থাৎ 'যেখানে অপর কিছু দর্শন করে না, অপর কিছু শ্রবণ করে না, অপর কিছু জানিতে পারে না, তাহাই ভূমা।'

'যত্র ত্বস্য সর্বমাত্মৈবাভূত্তত্কেন কং পশ্যেৎ'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪/৫/১৫)।

অর্থাৎ 'কিন্তু সমস্তই যখন ইহার আত্মাই হইয়া গেল, তখন কাহার দ্বারা কাহাকে দর্শন করিবে?'

ইত্যাদি শ্রুতিবাক্যের দ্বারাও তাহাই বর্ণিত হইতেছে। এই প্রকারে সকল উপনিষদই পরমার্থ অবস্থাতে সকলপ্রকার ব্যবহারের অভাবের কথা বলিতেছেন। সেইরূপেই ঈশ্বর ভগবদ্গীতাতে বলিতেছেন-

'ন কর্তৃত্বং ন কর্মাণি লোকস্য সৃজতি প্রভুঃ৷ ন কর্মফলসংযোগং স্বভাবস্তু প্রবর্ততে' 'নাদত্তে কস্যচিত্পাপং ন চৈব সুকৃতং বিভুঃ৷ অজ্ঞানেনাবৃতং জ্ঞানং তেন মুহ্যন্তি জন্তবঃ'।-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা- ৫।১৪,১৫)

অর্থাৎ 'কারণ প্রভু আত্মা মনুষ্যের কর্তৃত্ব, কর্ম ও কর্মফলপ্রাপ্তি সৃষ্টি করেন না; কিন্তু স্বভাব অর্থাৎ নিজ বা পরমাত্মার যে সদসদাত্মিকা ভাব অর্থাৎ অবিদ্যালক্ষণা মায়াশক্তি কর্তৃত্বাদিরূপে প্রবর্তিত হয়। অর্থাৎ অবিদ্যাপ্রভাবে কর্তৃত্ব ও কারয়িতৃত্বাদি আত্মাতে আরোপিত হয় । পরমার্থতঃ বিভু আত্মা কাহারও পাপ বা পূজা জপহোমাদিরূপ পুণ্যও গ্রহণ করেন না । পূর্বোক্ত অবিদ্যা দ্বারা ‘আমি কর্তৃত্ব ও কারয়িতৃত্বাদিরহিত’ - এই বিবেকজ্ঞান আত্মজ্ঞান দ্বারা আবৃত বলিয়া প্রাণিগণ মোহগ্রস্থ হয়, অর্থাৎ মোহবশে ‘আমি করি ও করাই’, ‘আমি ভোগ করি ও করাই’ - ইত্যাদি ভ্রম করিয়া থাকে।'

এইপ্রকারে পারমার্থিক অবস্থাতে শাসক (ঈশ্বর) ও শাসিত (জীব) ইত্যাদি ব্যবহারের অভাব প্রদর্শিত হইতেছে।"-(ব্রহ্মসূত্র-২।১।১৪, শাঙ্করভাষ্য)

তাছাড়া আত্মবোধে আচার্য বলছেন-‘রাগ ও দ্বেষাদিযুক্ত এই সংসার স্বপ্নতুল্য, যেমন স্বপ্নসময়ে দৃশ্যমান বস্তু সত্য বলিয়া বোধ হয়, জাগ্রতকালে মিথ্যা বলিয়া জানা যায়, সেইরূপ যতকাল অজ্ঞান থাকে, ততকাল জগৎ সত্য বলিয়া প্রতীত হয়, কিন্তু তত্ত্বজ্ঞান উৎপন্ন হইলে জগতের মিথ্যাত্বই জ্ঞাত হওয়া যায়। যতকাল সকলের অধিষ্ঠানরূপ অদ্বিতীয় ব্রহ্মের জ্ঞান না হয়, তাবৎকাল শুক্তিকাতে (ঝিনুকে) রৌপ্যের ন্যায় জগৎ সত্য বলিয়া প্রতীত হয়।‘ -(শঙ্করাচার্য, আত্মবোধ-৬,৭)

সবশেষে গৌড়পাদাচার্য্যৈর মাণ্ডুক্যকারিকা দিয়ে আলোচনার সারতত্ত্ব প্রস্ফুটিত করব।

অনিশ্চিতা য়থা রজ্জুরন্ধকারে বিকল্পিতা ।

সর্পধারাদিভির্ভাবৈস্তদ্বদাত্মা বিকল্পিতঃ ॥- (মাণ্ডুক্যকারিকা-২।১৭)

অর্থাৎ অজ্ঞাত রজ্জু যেমন সর্পরূপে প্রতীতির হেতু, অজ্ঞাত নির্বিশেষ ব্রহ্মই তদ্রূপ জগৎরূপে প্রতীতির হেতু।

অতএব অদ্বৈতবেদান্ত আসুরিক মত নয়, বরংচ শ্রুতি, স্মৃতি ও ন্যায় সিদ্ধ বেদান্ত দর্শন।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (২/২৪) শ্লোক প্রক্ষিপ্ত, এই আপত্তির খণ্ডনঃ-


ইদানিং কিছু নির্দিষ্ট অর্বাচীন সম্প্রদায় দাবি করছে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সাংখ্যযোগের ২৪ নং শ্লোক নাকি প্রক্ষিপ্ত। সেই অতিজ্ঞানীদের মতে এই শ্লোকের প্রক্ষিপ্ততার কারণ হল পুনরুক্তি দোষ। এই বিষয়ে আজকের আলোচনার সূত্রপাত করছি। ভগবান ভাষ্যকার শঙ্করাচার্য বহু পূর্বেই এই আপত্তির খণ্ডন করেছেন গীতার এই শ্লোকের ভাষ্যে। যথা-

ভাষ্যানুবাদ- (পূর্বপক্ষ) এই সকল শ্লোকের প্রতি পুনরুক্তি দোষারোপ করা কি উচিত নয়? যেহেতু "ন জায়তে ম্রিয়তে বা" ইত্যাদি একটি শ্লোকের দ্বারা আত্মার নিত্যত্ব এবং অবিক্রিয়ত্ব পূর্বেই বলা হয়েছে। সেখানে আত্মবিষয়ক যা কিছু বলা হয়েছে তা এই শ্লোকার্থ হতে অতিরিক্ত নয়, কেবল কিছু শব্দের পুনরুক্তি এবং কিঞ্চিৎ অর্থের পুনরুক্তি।

(উত্তরপক্ষ) আত্মবস্তুর দুর্বোধত্বহেতু (সহজে বোধগম্য নহে, এই হেতু), শ্রীভগবান বাসুদেব পুনঃ পুনঃ ঐ প্রসঙ্গ উত্থাপিত করে বিভিন্ন শব্দ দ্বারা সেই একই বস্তু নিরুপণ করছেন এই চিন্তা করে যে সেই সূক্ষ্মতত্ত্ব সংসারীদের বুদ্ধিগোচর হয়ে সংসার নিবৃত্তির হেতু হবে।......

বেদান্তমীমাংসা শাস্ত্রে এই বিষয়ের আরও স্পষ্ট মীমাংসা আছে। যথা-

"শ্রবণ, মনন, নিদিধ্যাসন, এ সকল অনুষ্ঠান একবার করলে যদি আত্মদর্শন না হয়—তবে পুনঃ পুনঃ করতে হবে। যতদিন না আত্মদর্শন হয় ততদিন পর্যন্ত করতে হবে। শাস্ত্র সেই অভিপ্রায়েই বার বার এবং শ্রবণাদি বহুবিধ উপায় উপদেশ করেছেন।"

-(সূত্রার্থ সংক্ষেপ, ব্রহ্মসূত্র ৪/১/১)

 

Friday, 11 February 2022

এই আত্মা অসঙ্গঃ-


শ্রীবশিষ্ঠদেব বলিতেছেন-"এই ব্রহ্মাণ্ডে বায়ু যেরূপ বিদ্যমান থাকিয়াও অসঙ্গ, পরমেশ্বরও তদ্রূপ সর্বপ্রাণীতে ব্যাপক থাকিয়াও সর্বপ্রাণী-শরীর হইতে মুক্ত অর্থাৎ অসঙ্গরূপে স্থিত। তিনিই আত্মা।"-(যোগবাশিষ্ঠসারঃ, আত্মনিরূপণ-প্রকরণ-২৬)

কৃষ্ণযজুর্বেদীয় কঠোপনিষদের দ্বিতীয়া বল্লীতে একই তত্ত্ব বর্ণিত আছে-

বায়ুর্যথৈকো ভুবনং প্রবিষ্টো রূপং রূপং প্রতিরূপো বভূব ।

একস্তথা সর্বভূতান্তরাত্মা রূপং রূপং প্রতিরূপো বহিশ্চ ॥ -(কঠোপনিষৎ-২/২/১০)

শাঙ্করভাষ্য অনুসারে ভাবার্থঃ- একই বায়ু প্রাণরূপে দেহসমূহে অনুপ্রবিষ্ট হইয়া প্রত্যেক দেহানুসারে তদনুরূপ হইয়াছেন সেইরূপ সকল প্রাণীর একই প্রত্যগাত্মা প্রত্যেক দেহেরই অনুরূপ যেন হইয়া গিয়াছেন।

বৃহদারণ্যকের শ্রুতিও তাহাই বলিয়াছেন-'অসঙ্গো হ্যয়ং পুরুষঃ'-(বৃহদারণ্যকোপনিষৎ-৪/৩/১৫,১৬)

'এই পুরুষ অর্থাৎ হৃদয়শায়ী চেতন অসঙ্গ।'

স্বয়ং দেবী জগদম্বা দেবতাদের উদ্দেশ্য করে বলিতেছেন- মিথ্যা এই প্রপঞ্চের সঙ্গে আত্মার কোন সম্বন্ধ নেই। তাই আমার আত্মা অসঙ্গ। অপরদিকে আর সব পদার্থই মিথ্যা, কারণ- মায়া কল্পিত। পরিচ্ছেদ রচনাকারী প্রপঞ্চময় আর সব যখন মিথ্যা, তখন আত্মাও অপরিচ্ছন্ন (অবিভক্ত)। -(দেবীভাগবত পুরাণের ৭ম স্কন্দের অন্তর্গত দেবীগীতা, আত্মতত্ত্ব যোগ-১৮,১৯)

 

Thursday, 3 February 2022

সুবর্ণমালাস্তুতিঃ




অথ কথমপি মদ্রসনাং ত্বদ্গুণলেশৈর্বিশোধয়ামি বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||১||

ভাবার্থ - হে বিভো। এক্ষণে কোনও প্রকারে তােমার গুণলেশ দ্বারা আমার রসনাকে পবিত্র করছি (কারণ) হে সাম্ব, (যিনি জগন্মাতা পার্বতীর সহিত অবস্থিত) হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||১||

আখণ্ডলমদখণ্ডনপণ্ডিত তণ্ডুপ্রিয় চণ্ডীশ বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||২||

ভাবার্থ - দেবরাজ ইন্দ্রের অহঙ্কার (দর্প) চূর্ণ করতে চতুর। তণ্ডুর প্রতি প্রীতিযুক্ত। (তণ্ডু-শিবের দ্বারপালগণের অন্যতম) হে চণ্ডীপতি, হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||২||

ইভচর্মাম্বর শম্বররিপুবপুরপহরণোজ্জ্বলনয়ন বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৩||

ভাবার্থ - হস্তিচর্ম যার পরিধেয়, কামদেবের শরীর নাশের নিমিত্ত প্রজ্বলিত চক্ষু, হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৩||

ঈশ গিরীশ নরেশ পরেশ মহেশ বিলেশয় ভূষণ ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৪||

ভাবার্থ - হে ঈশ্বর, হে গিরীশ, হে নরেশ, হে পরেশ, হে মহেশ্বর, হে সর্পভূষণ, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৪||

উময়া দিব্যসুমঙ্গলবিগ্রহয়ালিঙ্গিতবামাঙ্গ বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্||৫||

ভাবার্থ - দিব্য ও মঙ্গলজনক শরীরধারিণী উমা কর্তৃক আলিঙ্গিতবামাঙ্গ, হে প্রভু, হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৫||

ঊরীকুরু মামজ্ঞমনাথং দূরীকুরু মে দুরিতং ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৬||

ভাবার্থ - (তুমি) অনাথ, অজ্ঞ, আমাকে স্বীকার কর, আমার পাপ দূর কর, হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৬||

ঋষিবরমানসহংস চরাচরজননস্থিতিলয়কারণ ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৭||

ভাবার্থ - হে ঋষিশ্রেষ্ঠগণের মানসে (সরোবরে) হংসবৎ অবস্থিত (ধ্যানের বিষয়), চরাচর (জগতের) সৃষ্টি স্থিতি সংহার কারণ, হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৭||

ঋক্ষাধীশকিরীট মহোক্ষারূঢ় বিধৃতরুদ্রাক্ষ বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৮||

ভাবার্থ - নক্ষত্রপতি চন্দ্র তােমার চূড়ায় বিরাজিত হে বৃষবাহন। হে রুদ্রাক্ষশোভিত, হে প্রভূ, হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৮||

৯বর্ণদ্বন্দ্বমবৃন্তসুকুসুমমিবাঙ্ঘ্রৌ তবার্পয়ামি বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৯||

ভাবার্থ - বৃন্তরহিত মনােহর কুসুমবৎ '৯' নামক বর্ণদ্বয়কে তােমার চরণে অর্পণ করছি, হে প্রভু, হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৯||

একং সদিতি শ্রুত্যা ত্বমেব সদসীত্যুপাস্মহে মৃড় ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||১০||

ভাবার্থ - হে মৃড়, 'সদ্বস্তু একই' এই শ্রুতিবাক্য দ্বারা তুমিই সেই সদ্বস্তু ( জেনে ) উপাসনা করছি, হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||১০||

ঐক্যং নিজভক্ত্যেভ্যো বিতরসি বিশ্বম্ভরোঽত্র সাক্ষী ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||১১||

ভাবার্থ - হে বিশ্বম্ভর! নিজ ভক্তগণকে নিজের সহিত ঐক্য বিতরণ কর (অর্থাৎ তারা তােমারই সহিত এক হয়ে যান) এ বিষয়ে তুমিই সাক্ষী; হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল। (এস্থলে আচার্য্য 'বিশ্বম্ভর' বিশেষণটি বিশেষ তাৎপর্য্যে ব্যবহার করেন। ওটা এই যে, হে শিব, তুমি নিজ ভক্তকে তােমাতে লীন করে তােমার সহিত তার ঐক্য সাধন কর, এ বিষয়ে সন্দেহ নাই। এ সম্বন্ধে আশঙ্কা হতে পারে যে, শিবের ঐ প্রকার সামর্থ্য সীমাবন্ধ, তদুত্তরে তিনি বলেন যে, হে শিব, তুমি "বিশ্বম্ভর" অর্থাৎ 'বিশ্বকে তুমি ধারণ কর' সুতরাং তুমি ইচ্ছা করলে সমগ্র বিশ্বকেই আপনাতে লীন করে লইতে পার। সুতরাং কারও ( কোনও ভক্তের ) আশঙ্কার কারণ নাই।) ||১১||

ওমিতি তব নির্দেষ্ট্রী মায়াঽস্মাকং মৃড়োপকর্ত্রী ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||১২||

ভাবার্থ - হে মৃড়, 'ওম্'রূপ তোমার নির্দেশকারিণী মায়া (শব্দরূপা) ওটা আমার উপকারিনী (অর্থাৎ মায়া হলেও ওটা আমারই উপকারক, ওটা বন্ধনাশক), হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||১২||

ঔদাস্যং স্ফুটয়তি বিষয়েষু দিগম্বরতা চ তবৈব বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||১৩||

ভাবার্থ - হে প্রভু, তোমার দিগম্বরতা বিষয়ে ঔদাসীন্যই প্রকাশ করে। হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||১৩||

অন্তঃকরণবিশুদ্ধিং ভক্তিং চ ত্বয়ি সতীং প্রদেহি বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||১৪||

ভাবার্থ - হে প্রভু, অন্তঃকরণবিশুদ্ধি ও তােমাতে সৎভক্তি প্রদান কর, হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||১৪||

অস্তোপাধিসমস্তব্যস্তৈ রূপৈর্জগন্ময়োঽসি বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||১৫||

ভাবার্থ - হে প্রভু, যার উপাধি (ধর্ম) অন্তর্গত, এরূপ সমস্ত ও ব্যস্তরূপ দ্বারা তুমি জগন্ময় (জগৎস্বরূপ), হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||১৫||

করুণাবরুণালয় ময়ি দাস উদাসস্তবোচিতো নহি ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||১৬||

ভাবার্থ - হে করুণাসাগর, দাসের প্রতি তােমার ঔদাস্য উচিত নয়। হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||১৬||

খলসহবাসং বিঘটয় ঘটয়সতামেব সঙ্গমনিশং ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||১৭||

ভাবার্থ - (তুমি) (আমার) খল (দুর্জ্জন)-গণের সঙ্গ দূর কর (নিবারণ কর) এবং নিরন্তর সাধুগণের সঙ্গ ঘটাও, হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||১৭||

গরলং জগদুপকৃতয়ে গিলিতম্ভবতাসমোঽস্তিকোঽত্র বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||১৮||

ভাবার্থ - হে প্রভু, জগতের উপকারের জন্য গরল গলাধঃকরণ করেন আপনার তুল্য এ ভুবনে কে আছে? হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||১৮||

ঘনসারগৌরগাত্র প্রচুরজটাজূটবদ্ধগঙ্গ বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||১৯||

ভাবার্থ - হে প্রভো! (তােমার) কর্পূরবৎ গৌরবর্ণ শরীর, (তােমা) কর্তৃক প্রচুর জটাসমূহ মধ্যে গঙ্গা আবদ্ধা। হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||১৯||

জ্ঞপ্তিঃ সর্বশরীরেষ্বখণ্ডিতা যা বিভাতি সাত্বং ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||২০||

ভাবার্থ - সমগ্র শরীর অখণ্ডভাবে যে বােধ বিরাজমান তা তুমিই, হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||২০||

চপলং মম হৃদয়কপিং বিষয়দ্রুচরং দৃঢং বধান বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||২১||

ভাবার্থ - হে প্রভু, বিষয়স্বরূপ বৃক্ষচর চঞ্চল আমার হৃদয়রূপ কপিকে (বানরকে) দূঢ়ভাবে বন্ধন কর, হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||২১||

ছায়া স্থাণোরপি তব তাপং নমতাং হরত্যহো শিব ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||২২||

ভাবার্থ - হে শিব, হে আশ্চর্য্য, স্থাণু তােমার ( অর্থাৎ স্থিতিশীল অচঞ্চল; এ শিবের বাচক শব্দ, এস্থলে তাৎপর্য্য এই যে স্থাণু অর্থাৎ শাখা-পল্লবাদিরহিত বৃক্ষ মনুষ্যকে ছায়া প্রদান করতে পারে না কিন্তু হে শিব, তুমি স্থাণু, তবুও তুমি প্রণত ব্যক্তির সমস্ত তাপ দূর কর। এস্থলে স্থাণুশব্দটি দ্ব্যর্থবােধক ) ছায়া প্রণতগণের (ভক্তগণের) তাপ দূর করে, হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||২২||

জয় কৈলাসনিবাস প্রমথগণাধীশ ভূসুরার্চিত ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||২৩||

ভাবার্থ - হে কৈলাসবাসি, হে প্রমথগণাধীশ, হে ব্রাহ্মণগণপূজিত, ( তোমার জয় হোক ), হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||২৩||

ঝণুতকঝিঙ্কিণুঝণুতৎ কিটতক শব্দৈর্নটসি মহানট ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||২৪||

ভাবার্থ - হে মহানট (নটশ্রেষ্ঠ) ঝণুতৎ...কিটতৎ‌ শব্দে নৃত্য করে। হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||২৪||

জ্ঞানং বিক্ষেপাবৃতিরহিতং কুরু মে গুরূস্ত্বমেব বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||২৫||

ভাবার্থ - হে প্রভু, (আমার) জ্ঞানকে বিক্ষেপ ও আবরণ (চাঞ্চল্য ও ভ্রম) শূন্য কর। (কারণ) তুমিই আমার গুরু (অর্থাৎ জ্ঞানের নির্মলতা সম্পাদন গুরুরই কর্তব্য), হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||২৫||

টঙ্কারস্তব ধনুষো দলয়তি হৃদয়ং দ্বিপামশনিরিব ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||২৬||

ভাবার্থ - তোমার ধনুর টঙ্কার দ্বেষিগণের হৃদয় বজ্রের ন্যায় ভেদ করে। হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||২৬||

ঠাকৃতিরিব তব মায়া বহিরন্তঃ শূন্যরূপিণী খলু ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||২৭||

ভাবার্থ - তোমার মায়া 'ঠ' বর্ণের আকৃতির ন্যায় বাহ্য, অন্তঃশূন্যরূপিণী (অর্থাৎ 'ঠ' বর্ণটি যেমন মধ্যভাগে শূন্যাকার সেরূপ তােমার মায়াও অন্তঃসারশন্য)। হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||২৭||

ডম্বরমম্বুরুহামপি দলয়ত্যনঘং ত্বদঙ্ঘিয়ুগলং ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||২৮||

ভাবার্থ - নির্মল (পবিত্র) তােমার চরণযুগল পদ্মসমূহেরও শোভা বিদলিত করে, হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||২৮||

ঢক্কাক্ষসূত্রশূলদ্রুহিণকরোটীসমুল্লসৎকর ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||২৯||

ভাবার্থ - ঢক্কা, জপমালা, শূল, ব্রহ্মার কপাল (মস্তাস্থি বক্ষ কপাল) সংশোভিত হস্তবিশিষ্ট, হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||২৯||

ণাকারগর্ভিণী চেচ্ছুভদা তে শরগতির্নৃণামিহ ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৩০||

ভাবার্থ - তােমার শরগতি ( বাণের গতি ) 'ণা'কার গর্ভিত ( যুক্ত ) ( অর্থাৎ শর-গতি এর মধ্যে "ণা" যােগ করলে শরণাগতি' হয়, সুতরাং শরগতি ভয়ঙ্কর হলেও "ণা" যোগে মঙ্গলকর হয় ) হলে মনুষ্যের ইহলোকে শুভদায়ক হয়; হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৩০||

তব মন্বতিসঞ্জপতঃ সদ্যস্তরতি নরো হি ভবাব্ধিং ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৩১||

ভাবার্থ - মনুষ্য নিশ্চয়ই তােমার মন্ত্র নিরন্তর জপদ্বারা সহসা ভবসমুদ্র উত্তীর্ণ হয়। হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৩১||

থূৎকারস্তস্য মুখে ভূয়াত্তে নাম নাস্তি যস্য বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৩২||

ভাবার্থ - প্রভূ, তােমার নাম যার ( মুখে ) নাই, তার মুখে থুৎকার হোক। হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৩২||

দয়নীয়শ্চ দয়ালুঃ কোঽস্তি মদন্যস্ত্বদন্য ইহ বদ ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৩৩||

ভাবার্থ - এ জগতে তুমি ভিন্ন দয়ালু ও আমি ভিন্ন দয়ার পাত্র কে আছে বল? হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৩৩||

ধর্মস্থাপনদক্ষ ত্র্যক্ষ গুরো দক্ষয়জ্ঞশিক্ষক ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৩৪||

ভাবার্থ - হে ধর্মস্থাপনকূশল, হে ত্রিনয়ন, হে গুরু, হে দক্ষযজ্ঞশিক্ষক, হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৩৪||

ননু তাড়িতোঽসি ধনুষা লুব্ধধিয়া ত্বং পুরা নরেণ বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৩৫||

ভাবার্থ - হে প্রভু, পুরাকালে তুমি (কিরাত ভ্রমে) মনুষ্য (অর্জ্জুন কর্তৃক) ধনুঃ দ্বারা তাড়িত হয়েছ। হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৩৫||

পরিমাতুং তব মূর্তিং নালমজস্তৎ পরাৎপরোঽসি বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৩৬||

ভাবার্থ - হে প্রভু, ব্রহ্মা তোমার মুর্তির পরিমাণ নির্ণয় করিতে সমর্থ হয়েন নাই, এজন্য তুমি পরাৎপর (শ্রেষ্ঠ হতেও শ্রেষ্ঠ), হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৩৬||

ফলমিহ নৃতয়া জনুষস্ত্বৎপদসেবা সনাতনেশ বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৩৭||

ভাবার্থ - হে সনাতন ঈশ্বর, হে প্রভু, ইহলোকে মনুষ্যরূপে জন্মের ফল তােমার পদসেবা। ( অর্থাৎ তােমার পদসেবাই মনুষ্যজন্ম সার্থক করে, অন্যথা সেটি ব্যর্থ )। হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৩৭||

বলমারোগ্যং চায়ুস্ত্বদ্গুণরুচিতাং চিরং প্রদেহি বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৩৮||

ভাবার্থ - হে প্রভু, বল আরােগ্য আয়ু ও তােমার গুণে রুচি চিরকালের জন্য দান কর। হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৩৮||

ভগবন্ ভর্গ ভয়াপহ ভূতপতে ভূতিভূষিতাঙ্গ বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৩৯||

ভাবার্থ - হে ভগবন্ , হে ভর্গ ( শিবের নাম ), হে ভয়াপহারী, হে ভূৃতপতে, হে ভম্মভূষিতশরীর, হে প্রভু, হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৩৯||

মহিমা তব নহি মাতি শ্রুতিষু হিমানীধরাত্মজাধব ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৪০||

ভাবার্থ - হে হিমালয়কন্যাভর্তা ( গৌরীপতি ), তোমার মহিমা শ্রুতিতে পরিমিত হয় না। হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৪০||

যমনিয়মাদিভিরঙ্গৈর্যমিনো হৃদয়ে ভজন্তি স ত্বং ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৪১||

ভাবার্থ - সংযমিগণ যমনিয়মাদি অঙ্গ ( আবশ্যকীয় সাধনার অঙ্গ ) দ্বারা যাকে হৃদয়ে ভজনা করেন, তুমিই সেই (আরাধ্য), হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৪১||

রজ্জাবহিরিব শুক্তৌ রজতমিব ত্বয়ি জগন্তিভান্তি বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৪২||

ভাবার্থ - হে প্রভু, রজ্জুতে সর্পের ন্যায়, শুক্তিতে রজতের ন্যায় তোমারে জগৎসমূহ প্রতীত হয়। হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৪২||

লব্ধ্বা ভবৎপ্রসাদাচ্চক্রং বিধুরবতি লোকমখিলং ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৪৩||

ভাবার্থ - আপনার প্রসাদে চক্রলাভ করে চন্দ্র অখিললোক রক্ষা করেন। হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৪৩||

বসুধাতদ্ধরতচ্ছয়রথমৌর্বীশর পরাকৃতাসুর ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৪৪||

ভাবার্থ - পৃথিবী-তদ্ধারণকারি-তৎশায়ি-রূপ রথ-ধনুর্গুণ-শর (অর্থাৎ পৃথিবীরূপ রথ, পৃথিবীধারণকর্তা অনন্তনাগরূপ ধনু্গুণ, অনন্তনাগশায়ী বিষ্ণু রূপ বাণ এ (শিবের সন্বোধন) আসুর পরাজয়কারী। হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৪৪||

শর্ব দেব সর্বোত্তম সর্বদ দুর্বৃত্তগর্বহরণ বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৪৫||

ভাবার্থ - হে প্রভু, হে শর্ব (শিবের নাম), হে দেব, হে সর্বোত্তম, হে সর্বদাতা, দুর্বৃত্তগণের গর্বহারী, হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৪৫||

ষড্রিপুষড়ুর্ন্মিষড়্বিকারহর সন্মুখ ষণ্মুখজনক বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৪৬||

ভাবার্থ - ষড়রিপু, ষট্ ঊর্মি, (শোক, মােহ, জরা, মৃত্যু, ক্ষুধা, পিপাসা), হে বিকারহারী, হে সন্মুখ, হে ষণ্মুখ (কার্তিকেয়ের), হে জনক, হে প্রভু, হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৪৬||

সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্মেত্যেতল্লক্ষণলক্ষিত ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৪৭||

ভাবার্থ - হে সত্য জ্ঞান অনন্ত ব্রহ্ম এইরূপ লক্ষণ দ্বারা লক্ষিত। হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৪৭||

হাহাহূহূমুখসুরগায়কগীতাপদানপদ্য বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৪৮||

ভাবার্থ - হাহা-হুহু প্রমুখ গন্ধর্বগণ কর্তৃক ( যার ) লীলা ( সৎকীর্তি ) বিষয়ক পদ্যসমূহ গীত হয় ( শিবের সম্বোধন), হে প্রভু, হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল ||৪৮||

ল্লাদির্ন হি প্রয়োগস্তদন্তমিহ মঙ্গলং সদাঽস্তু বিভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৪৯||

ভাবার্থ - প্রভু ( ভাষায় ) ল্লকারাদি ( কোনও শব্দের ) ব্যবহার নাই ( এজন্য ) তদন্ত ( ল্লকারান্ত ) মঙ্গল ইহকালে সর্বদা হোক। হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল। ('ল্ল' এই অক্ষরটি দক্ষিণ-ভারতের বর্ণমালায় পাওয়া যায়, উত্তরভারতে প্রচলিত নাই মঙ্গল শব্দটি দক্ষিণ ভারতীয় লিপি অনুসারে 'ল্ল' কার দ্বারা লিখিত হয়, সুতরাং এস্থলে আচার্য উল্লিখিত প্রার্থনা করেছেন ||৪৯||

ক্ষণমিবদিবসান্নেষ্যতিত্বৎপদসেবাক্ষণোৎসুকঃ শিব ভো ।

সাম্ব সদাশিব শম্ভো শঙ্কর শরণং মে তব চরণয়ুগম্ ||৫০||

ভাবার্থ - হে শিব, তোমার পদসেবাক্ষণ প্রাপ্তি বিষয়ে উৎসুক ব্যক্তি দিবসগুলি ক্ষণবৎ যাপন করেন। হে বিভাে, হে সাম্ব, হে সদাশিব, হে শম্ভো, হে শঙ্কর, তােমার চরণযুগল আমার আশ্রয়স্থল। ( অর্থাৎ শিবভক্ত ব্যক্তি ইষ্টদেবতা শিবের পদসেবা করার কালটির অপেক্ষায় নিজ দিনগুলি ক্ষণবৎ যাপন করে ) ||৫০||

|| ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্যস্য শ্রীমচ্ছঙ্কর ভগবতঃ কৃতৌ সম্পূর্ণং ||

ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্য শ্রীমদ্ শঙ্করাচার্য ভগবতঃ বিরচিত সুবর্ণমালাস্তুতিঃ সমাপ্ত।

 

Tuesday, 1 February 2022

আহারশুদ্ধি বস্তুত কি?

 


এই বিষয়ে সামবেদীয় ছান্দোগ্য শ্রুতি বলিতেছেন-"আহারশুদ্ধৌ সত্ত্বশুদ্ধিঃ সত্ত্বশুদ্ধৌ ধ্রুবা স্মৃতিঃ, স্মৃতিলম্ভে সর্বগ্রন্থীনাং বিপ্রমোক্ষঃ"-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৭।২৬।২)

শঙ্করাচার্য ভাষ্যে বলিতেছেন-'যাহা আহৃত বা আহরণ করা যায়, তাহাই আহার অর্থাৎ শব্দাদিবিষয়ক জ্ঞান যাহা ভোক্তার ভোগের নিমিত্ত আহৃত হইয়া থাকে। শব্দাদি ভোগ্যবিষয়ের উপলব্ধিরূপ যে বিজ্ঞান তাহার শুদ্ধিকেই আহারশুদ্ধি বলে, অর্থাৎ রাগদ্বেষ মোহ প্রভৃতি দোষ দ্বারা অসংস্পৃষ্ট বিষয়রূপ ভোগ্যবিষয়সমূহের বিজ্ঞান বা উপলব্ধি বা অনুভূতি। সেই আহার বিশুদ্ধ হইলে তদ্বিশিষ্ট জ্ঞানীর সত্ত্বশুদ্ধি অর্থাৎ অন্তঃকরণের নির্মলতা সিদ্ধ হয়। সত্ত্বশুদ্ধি হইলে ভূমানামক আত্মার স্বরূপ, যাহা একবার ধারণা করা গিয়াছে, সে সম্বন্ধে ধ্রুব বা অবিচ্ছিন্ন স্মৃতি-ধারা উপস্থিত হয় অর্থাৎ জ্ঞাত বিষয়ের আর কখনও ভুল হয় না। সেই ধ্রুবা স্মৃতি লাভ হইলে অবিদ্যাকৃত সর্বানর্থপাশরূপ জন্মজন্মান্তরীয় অনুভব এবং ভাবনার দ্বারা কঠিনীকৃত হৃদয়াশ্রিত গ্রন্থিসকলের বিপ্রমোক্ষ অর্থাৎ বিশেষভাব মোক্ষণ বা বিনাশ হইয়া থাকে। যেহেতু আহারশুদ্ধি উত্তরোত্তর বর্দ্ধিত এই সমস্ত সাধনের মূল, এইজন্য আহারশুদ্ধি বিশেষরূপে কর্ত্তব্য।

নিত্যকর্মসমূহ কিরূপে মোক্ষের হেতু হয়?

  সুরেশ্বরাচার্য তদীয় নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধিতে বলছেন — কদাচিৎ কোন প্রকারে পুণ্য অনুশীলন দ্বারা এবং নিত্যকর্মানুষ্ঠান দ্বারা বুদ্ধি ব...