Tuesday, 18 May 2021

জীবের কর্তৃত্ব স্বাভাবিক নয় বরংচ ঔপাধিক

 

ইতোমধ্যে বিবিধ শাস্ত্রীয়যুক্তি দ্বারা আলোচনা করেছি উপাধিযুক্ত জীবই কর্তা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সেই কর্তৃত্ব স্বাভাবিক (বাস্তব) হবে অথবা উপাধিরূপ নিমিত্তবশতঃ কল্পিত হবে, বেদান্ত মীমাংসাশাস্ত্রের তক্ষাধিকরণে এটাই বিচার করা হয়েছে। এই অধিকরণের সিদ্ধান্ত হলজীবের কর্তৃত্ব স্বাভাবিক নয়, পরন্তু তা অধ্যস্ত। ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য ব্রহ্মসূত্রের (২।৩।৪০) ভাষ্যে বলছেন

(পূর্বপক্ষী মীমাংসক নৈয়ায়িক) সেই বিষয়ে বলেনশাস্ত্রের স্বার্থকতা প্রভৃতি এই হেতুসকলের দ্বারাই সিদ্ধ হয় জীবের কর্তৃত্ব স্বাভাবিক, যেহেতু 'আমি কর্তা' এই প্রকার অনুভব এবং সেই কর্তৃত্বের নিরাকরণের প্রতিহেতু নেই। কিন্তু এইপ্রকার পূর্বপক্ষ প্রাপ্ত হলে বলছিআত্মার স্বাভাবিক কর্তৃত্ব সম্ভব নয়, যেহেতু মুক্তির অভাব হয়ে পড়বে। যেহেতু কর্তৃত্ব আত্মার স্বভাব হলে কর্তৃত্ব হতে নির্মোক্ষ (-নিঃশেষে কর্তৃত্বত্যাগ) সম্ভব হয় না; যেমন উষ্ণতা হতে অগ্নির নির্মোক্ষ সম্ভব নয়। আর যিনি কর্ত্তৃত্ব হতে মুক্ত নন, তাঁর দুঃখাভাব পরমানন্দ প্রাপ্তিরূপ পুরুষার্থ সিদ্ধ হয় না, কারণ কর্ত্তৃত্ব দুঃখস্বরূপ।

আবার শুদ্ধব্রহ্মাত্মজ্ঞানে মোক্ষ। শ্রুতি বিদ্বানের অনুভববলে জীবের কর্ত্তৃত্ব স্বাভাবিক নয়। নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধ মুক্ত আত্মবিষয়ক প্রতিপাদন (-অবগতি) হতে মোক্ষ সিদ্ধ হয়, এটা শ্রুতি ব্রহ্মবিদ্গণ কর্তৃক স্বীকৃত। কিন্তু তাদৃশ আত্মার প্রতিপাদন জীবের কর্তৃত্ব স্বাভাবিক হলে সঙ্গত হবে না। সেহেতু স্বীকার করতে হবে যে, অন্তঃকরণরূপ উপাধিগত ধর্মের অধ্যাস দ্বারাই জীবের কর্ত্তৃত্ব সিদ্ধ হয়, তা স্বাভাবিক নয়। শ্রুতিও তাই বলছেন

'ধ্যায়তীব লেলায়তীব'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪।৩।৭)

অর্থাৎ "যেন ধ্যানই করেন, যেন ক্রিয়াশীলই হন", ইত্যাদি।

 'আত্মেন্দ্রিয়মনোযুক্তং ভোক্তেত্যাহুর্মনীষিণঃ'-(কঠ উপনিষৎ-১।৩।৪)

অর্থাৎ "আত্মা (—শরীর) ইন্দ্রিয় মনোযুক্তকে মনীষিগণ ভোক্তা বলে থাকেন", এই শ্রুতি উপাধির সহিত সম্বন্ধযুক্ত আত্মারই ভোক্তৃত্ব প্রভৃতি বিশেষের লাভকে প্রদর্শন করছে। দেখ, বিবেকিগণের নিকট পরমাত্মা হতে ভিন্ন জীব নামক কর্ত্তা, অথবা ভোক্তা কেউ বিদ্যমান নেই, যেহেতু

'নান্যোতোস্তি দ্রষ্টা'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৩।৭।২৩)

অর্থাৎ ইহা হতে ভিন্ন দ্রষ্টা কেউ নেই", ইত্যাদিপ্রকার শ্রুতি আছে।

আচার্য ভারতী তীর্থ বৈয়াসিক ন্যায়মালায় এই বিষয়ের  সিদ্ধান্তে বলছেন"অসঙ্গঃ হি"-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪।৩।১৫) অর্থাৎ "এই পুরুষ অসঙ্গ", এই শ্রুতির দ্বারা কর্তৃত্বের সাথে পুরুষের সম্বন্ধ বাধিত হওয়ায় বুদ্ধি এবং চক্ষু প্রভৃতি করণরূপ উপাধির নৈকট্যবশতঃ স্ফটিকে রক্ততার ন্যায় সেই কর্তৃত্ব আত্মাতে অধ্যস্ত।

তথ্যসূত্রঃ- বেদান্তদর্শনম্, দ্বিতীয় খণ্ড, ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য বিরচিত 'শাঙ্করভাষ্য', আচার্য ভারতী তীর্থের 'বৈয়াসিক ন্যায়মালা', স্বামী বিশ্বরূপানন্দ কর্তৃক অনূদিত, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।

শ্রীশুভ চৌধুরী

মে ১৮, ২০২৬ খৃষ্টাব্দ। See less




No comments:

অদ্বৈতবেদান্তোক্ত 'অখণ্ডার্থবোধ' কাকে বলে?

  বেদ , উপনিষৎ প্রভৃতি অধ্যাত্ম শাস্ত্রমূলে যে তুরীয় ভূমা ব্রহ্মের সাক্ষাৎ অপরোক্ষ পরিচয় পাওয়া যায় , তাকে অদ্বৈতবেদান্তের ...