Sunday, 31 July 2022

অদ্বৈতবেদান্তে "জগৎ মিথ্যা" বিষয়ে দ্বৈতবাদীদের আপত্তির খণ্ডনঃ—(পর্ব-০১)

 


প্রথমত এই লেখার উদ্দেশ্য অদ্বৈতবাদের বিরুদ্ধে ভেদবাদীদের আক্ষেপ নিরসন। শুধুমাত্র দার্শনিক তত্ত্ব বিশ্লেষণ ও অদ্বৈতবেদান্তের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপাদনের নিমিত্ত আমি এই কর্মে প্রবৃত্ত হচ্ছি।

পূর্বপক্ষ— জগৎ সত্যই। 'জগৎমিথ্যা' শব্দটা সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন ও শঙ্করাচার্যের নিজ কল্পিত।

সিদ্ধান্ত— পরমার্থতঃ ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা। ইহা শঙ্করাচার্যের নিজকল্পিত সিদ্ধান্ত নয় বরংচ শ্রুতি সিদ্ধান্ত। শুক্ল যজুর্বেদীয় নিরালম্বোপনিষদে বর্ণিত আছে— "তপ ইতি চ ব্রহ্ম সত্যং জগন্মিথ্যেতি"-(নিরালম্ব উপনিষৎ-৩৫)

পূর্বপক্ষ— শব্দবোধ্য ব্রহ্ম সত্য হলে ব্রহ্মবিষয়ক শাব্দজ্ঞানের প্রামাণ্যও সত্য। ফলতঃ ব্রহ্মের সত্যতা রক্ষার জন্য প্রামাণ্যকেও সত্য বলতে হবে। কারণ বিষয়ের বাধ না হওয়ারূপ প্রামাণ্য অসত্য হলে বিষয়ও সত্য হতে পারে না। এরূপে ব্রহ্মাতিরিক্ত সত্যবস্তু বিদ্যমান থাকায় অবশ্যই দ্বৈতসিদ্ধি হবে, পরন্ত অদ্বৈতসিদ্ধি হবে না অতএব আকাশাদি জগৎপ্রপঞ্চও সত্য হোক।

সিদ্ধান্ত— ঘটের প্রামাণ্য যেরূপ ঘটাতিরিক্তের দ্বারা সংঘটিত হয়, তেমনি সত্যভূত ব্রহ্মজ্ঞানের প্রামাণ্য ব্রহ্মাতিরিক্তের দ্বারা সংঘটিত হওয়ায় ঐ প্রামাণ্য মিথ্যা হতে পারে। কেননা ব্রহ্ম ও ব্রহ্মজ্ঞানের প্রামাণ্য এক নয়। সুতরাং ব্রহ্মসূত্রের আরম্ভণাধিকরণের যুক্তি অনুসারে সমগ্র আকাশাদি প্রপঞ্চের মিথ্যাত্ব বজ্রলেপসদৃশ সুস্থির।

 "তদনন্যত্বমারম্ভণশব্দাদিভ্যঃ"(ব্রহ্মসূত্র, ২/১/১৪)। তৎ-অনন্যত্বম (ব্রহ্মরূপ অভিন্ন-নিমিত্ত-উপাদান-কারণ হতে তৎকার্যভূত এই জগৎপ্রপঞ্চ ভিন্ন নয়; কেন না)  আরম্ভণশব্দাদিভ্যঃ ("বাচারম্ভণং বিকারো নামধেয়ং মৃত্তিকেত্যেব সত্যম"—ছান্দোগ্যোপনিষৎ,৬/১/৪— ঘটাদি কার্য কেবল নাম, অর্থাৎ শব্দকে অবলম্বন করে বিদ্যমান আছে, কারণরূপী মৃত্তিকাই সত্য; "ঐতদাত্মাম ইদং সর্বম্"—কার্যভূত এই সমস্তই ব্রহ্মসত্তায় সত্তাবান—ছান্দোগ্যোপনিষৎ,৬/৮/৭; "ব্রহ্মৈবেদং সর্বম্"—ব্রহ্মই এই সমস্ত— ইত্যাদি শ্রুতিপ্রমাণ রয়েছে)।

পূর্বপক্ষ—মাধ্ব প্রভৃতি জগৎসত্যতাবাদী বৈষ্ণব-বেদান্ত সম্প্রদায় ভেদের সত্যতা-সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কারণ বস্তুভেদ অসত্য হলে, বিবিধ যাগযজ্ঞাদি কর্মভেদের উপপাদক মীমাংসাশাস্ত্র অপ্রমাণ হয়ে পড়ে। জগতের সত্যতার সমর্থক ন্যায়-বৈশেষিক, সাংখ্য-যোগ প্রভৃতি শাস্ত্ররাজির প্রামাণ্য ব্যাহত হয়। এই অবস্থায় বিচিত্র বিবিধ বিশ্ব প্রপঞ্চের পরস্পর ভেদের সত্যতা স্বীকার করায় যুক্তিসঙ্গত।

সিদ্ধান্ত—ভেদের সত্যতার সাধক মাধ্বোক্ত অনুমানের বিরুদ্ধে অদ্বৈতবেদান্তী বলেন, বস্তুভেদ সত্য নয়, মিথ্যায় বটে। মিথ্যা বলে দৃশ্য বস্তুরাজি অদ্বৈতবেদান্তের সিদ্ধান্তে আকাশকুসুমের ন্যায় অলীক বা অসৎ নয়। বস্তুরাজির ব্যবহারিক সত্যতা অবশ্যই স্বীকার্য। শঙ্করাচার্য ব্রহ্মসূত্রের আরম্ভণাধিকরণের ভাষ্যে স্পষ্ট বলেছেন—" ব্রহ্মাত্মবিজ্ঞানের (জীব ও ব্রহ্মের একত্বজ্ঞানের) পূর্বে সকল প্রকার ব্যবহারেরই সত্যতা সঙ্গত; যেমন জাগরণের পূর্বে স্বপ্নব্যবহারের সত্যতা সঙ্গত। যেহেতু যতদিন পর্যন্ত না আত্মার সত্য একত্বের জ্ঞান হয়, ততদিন পর্যন্ত প্রমাণ প্রমেয় ও ফলরূপ কার্যসকলে কারও মিথ্যাত্ববুদ্ধি উৎপন্ন হয় না।"

সত্য কথা এই যে, পরিদৃশ্যমান ঘটপ্রমুখ দৃশ্যরাজি আকাশকুসুমের ন্যায় অসৎ নয়, আবার তা পরব্রহ্মের ন্যায় ধ্রুব সত্যও নয়। দৃশ্য বস্তুরাজি অনির্বচনীয়। বিশ্বপ্রপঞ্চ অনির্বচনীয় হলেও "সর্বং ব্রহ্মময়ং জগৎ", এইরূপে জাগতিক বস্তুবর্গের মধ্য দিয়ে এক অদ্বিতীয় সচ্চিদানন্দ পরব্রহ্মের স্ফুরণ না হওয়া পর্যন্ত মায়াময় জগতের মায়িক প্রপঞ্চের ব্যবহারিক সত্যতা অস্বীকার করা চলে না। কর্মময় এই জগতে কর্মধারা অক্ষুণ্ন রাখার জন্যই বস্তুভেদের আপেক্ষিক অর্থাৎ ব্যবহারিক সত্যতা অবশ্য স্বীকার্য। জাগতিক প্রপঞ্চকে আত্মার ন্যায় ধ্রুবসত্য কোনমতেই বলা চলে না। এইরূপে অদ্বৈতবেদান্তী জগতের সত্যতা ব্যাখ্যা করায় কর্মমীমাংসা, ন্যায়-বৈশেষিক, সাংখ্য-যোগ প্রভৃতি কোন শাস্ত্রেরই অপ্রামাণ্যের প্রশ্ন আসে না। অদ্বৈতবেদান্তী এরূপ সমন্বয়ের দৃষ্টিতে কর্মভেদের প্রতিপাদক শাস্ত্ররাজির মর্যাদা রক্ষা করেছেন, ক্ষুণ্ন করেন নি। বিরুদ্ধবাদী দার্শনিকগণ প্রতিবাদের তমিস্রায় জ্ঞানচক্ষু অন্ধ করে, সামঞ্জস্যের দৃষ্টি খুঁজে পান নি।

শঙ্কাঃ—জগৎ যদি চিদাত্মা হইতে ভিন্ন নহে তবে উহা ভিন্নরূপে প্রতিভাত হয় কেন?

উত্তরঃ—এই শঙ্কার উত্তরে অষ্টাবক্র মুনি বলছেন-"আত্মবিষয়ক অজ্ঞানবশতই জগৎ প্রতিভাত হইয়া থাকে, অধিষ্ঠানভূত আত্মার জ্ঞান হইলে আর আত্মা হইতে পৃথকরূপে কোন জগৎ দৃষ্টিগোচর হয় না। যেমন রজ্জুস্বরূপের অজ্ঞানবশতই ভ্রান্তিসর্প দেখা যায়, রজ্জুর জ্ঞান হইলে আর ঐ সর্পপ্রতীতি হয় না।" -(অষ্টাবক্র গীতা, শিষ্যোক্তমাত্মানুভবোল্লাসঃ, ৭)

অর্থাৎ রজ্জুতে যেমন পরমার্থতঃ সর্প কোন কালেই থাকে না তদ্রূপ ব্রহ্মরূপ অধিষ্ঠানে পরমার্থতঃ এই জগৎ কোন কালেই নেই। ব্রহ্মসূত্রের (২।১।১৪) এর ভাষ্যে ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য্য তা স্পষ্ট করেছেন-"পারমার্থিক দৃষ্টিতে শুদ্ধ চৈতন্যে ঈশ্বরত্ব ও জীবত্ব প্রভৃতি দ্বৈতবুদ্ধি উপপন্ন হয় না, সেই বিষয়ে শ্রুতি প্রমাণ-

'যত্র নান্যত্পশ্যতি নান্যচ্ছৃণোতি নান্যদ্বিজানাতি স ভূমা' -(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৭/২৪/১)।

অর্থাৎ 'যেখানে অপর কিছু দর্শন করে না, অপর কিছু শ্রবণ করে না, অপর কিছু জানিতে পারে না, তাহাই ভূমা।'

'যত্র ত্বস্য সর্বমাত্মৈবাভূত্তত্কেন কং পশ্যেৎ'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪/৫/১৫)।

অর্থাৎ 'কিন্তু সমস্তই যখন ইহার আত্মাই হইয়া গেল, তখন কাহার দ্বারা কাহাকে দর্শন করিবে?'

ইত্যাদি শ্রুতিবাক্যের দ্বারাও তাহাই বর্ণিত হচ্ছে। এই প্রকারে সকল উপনিষদই পরমার্থ অবস্থাতে সকলপ্রকার ব্যবহারের অভাবের কথা বলছেন। সেইরূপেই শ্রীভগবান ভগবদ্গীতাতে বলিতেছেন-

'ন কর্তৃত্বং ন কর্মাণি লোকস্য সৃজতি প্রভুঃ৷ ন কর্মফলসংযোগং স্বভাবস্তু প্রবর্ততে' 'নাদত্তে কস্যচিত্পাপং ন চৈব সুকৃতং বিভুঃ৷ অজ্ঞানেনাবৃতং জ্ঞানং তেন মুহ্যন্তি জন্তবঃ'।-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা- ৫।১৪,১৫)

অর্থাৎ 'কারণ প্রভু আত্মা মনুষ্যের কর্তৃত্ব, কর্ম ও কর্মফলপ্রাপ্তি সৃষ্টি করেন না; কিন্তু স্বভাব অর্থাৎ নিজ বা পরমাত্মার যে সদসদাত্মিকা ভাব অর্থাৎ অবিদ্যালক্ষণা মায়াশক্তি কর্তৃত্বাদিরূপে প্রবর্তিত হয়। অর্থাৎ অবিদ্যাপ্রভাবে কর্তৃত্ব ও কারয়িতৃত্বাদি আত্মাতে আরোপিত হয় । পরমার্থতঃ বিভু আত্মা কাহারও পাপ বা পূজা জপহোমাদিরূপ পুণ্যও গ্রহণ করেন না । পূর্বোক্ত অবিদ্যা দ্বারা ‘আমি কর্তৃত্ব ও কারয়িতৃত্বাদিরহিত’ - এই বিবেকজ্ঞান আত্মজ্ঞান দ্বারা আবৃত বলিয়া প্রাণিগণ মোহগ্রস্থ হয়, অর্থাৎ মোহবশে ‘আমি করি ও করাই’, ‘আমি ভোগ করি ও করাই’ - ইত্যাদি ভ্রম করিয়া থাকে।'এইপ্রকারে পারমার্থিক অবস্থাতে শাসক (ঈশ্বর) ও শাসিত (জীব) ইত্যাদি ব্যবহারের অভাব প্রদর্শিত হইতেছে।"

ভাষ্যকার আচার্য শঙ্কর তাঁর অধ্যাসভাষ্যে "অধ্যাসো মিথ্যেতি ভবিতুং যুক্তম্'', 'অধ্যাস মিথ্যা হওয়াই উচিত' এইরূপে যে 'মিথ্যা' পদটির প্রয়োগ করেছেন, তার ব্যাখ্যায় আচার্য পদ্মপাদ তাঁর 'পঞ্চপাদিকায়' বলেছেন, মিথ্যাশব্দের দুইটি অর্থ দেখা যায়—একটি অসম্ভব দ্বিতীয়টি অনির্বচনীয়তা। প্রথম অর্থে 'অধ্যাসো মিথ্যা', অর্থাৎ চিৎ ও অচিতের গ্রন্থিরূপ অধ্যাস সম্ভবপর নয়; দ্বিতীয় অর্থে অধ্যাস অনির্বচনীয়, ইহাই স্পষ্টতঃ বুঝা যায়। অনির্বচনীয়, অর্থাৎ সৎও নয়, অসৎও নয়; সদসৎও নয়; যে বস্তুকে সৎ বা সত্যরূপেও নির্বচন করা হয় না, অসত্যরূপেও নিরূপণ করা যায় না, সত্যাসত্যরূপেও ব্যাখ্যা করা সম্ভবপর হয় না; এরূপ বস্তুই অনির্বচনীয় আখ্যা লাভ করে। অনির্বচনীয় বস্তুমাত্রই মিথ্যা। ফলে, 'সদসদ্বিলক্ষণত্ব'ই মিথ্যাত্ব, এরূপ মিথ্যাত্বের লক্ষণই এসে পড়ে।‌ আচার্য পদ্মপাদ্ এই দৃষ্টিতেই তার মিথ্যাত্বের লক্ষণ বা পরিচয় লিপিবদ্ধ করেছেন। পদ্মপাদের এই লক্ষণটি চিৎসুখাচার্য তাঁর গ্রন্থে মিথ্যাত্বের পঞ্চম লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

পূর্বপক্ষঃ— প্রতিবাদী দ্বৈতবেদান্তী প্রভৃতি সৎ ও অসৎ এই উভয়ের অনধিকরণ বস্তু অপ্রসিদ্ধ বলে আলোচ্য লক্ষণের অসঙ্গতি প্রদর্শন করেছেন।

সিদ্ধান্তঃ—এই প্রসঙ্গে অদ্বৈতবাদী বলেন, সৎ না হলেই অসৎ হবে, অসৎ না হলেই তা সৎ হবে, কোন বস্তুই সৎ ও অসৎ, এই উভয়ের অনধিকরণ হবে না, হতে পারে না। এরূপে প্রতিবাদী যে আপত্তি তুলেছেন, সেই আপত্তির বিশেষ কিছু মূল্য নেই। সৎ এবং অসৎ এই উভয়ের অভাব যে একই ধর্মীতে থাকতে পারে তা নিম্নোক্ত অনুমানের সাহায্যে সহজেই উপপাদন করা যায়। 'চিৎসুখী' গ্রন্থের মিথ্যাত্বলক্ষণবিচারে বর্ণিত আছে—"সত্ত্ব এবং অসত্ত্ব এই উভয়েরই অত্যন্তাভাব কোন এক ধর্মী বা আশ্রয়ে বর্তমান থাকবে (সাধ্য), যেহেতু এই সত্ত্ব ও অসত্ত্ব কোন-না-কোন বিশেষ্যেরই ধর্ম (হেতু), যেমন রূপ ও রস (সপক্ষ দৃষ্টান্ত)।"

রূপ ও রস এই উভয়ই পৃথিবী ও জলের ধর্ম বটে অথচ, এদের অভাব বায়ুতে দেখতে পাওয়া যায়। ফলে রূপ ও রসে ধর্মত্বরূপ হেতু যেমন আছে, সেইরূপ একই ধর্মীতে (বায়ুতে) রূপ ও রসের অত্যন্তাভাব থাকায় রূপ ও রসের অত্যন্তাভাবের প্রতিযোগিত্বরূপ সাধ্যও থাকল। এইরূপে অনুমানাঙ্গ হেতু, সাধ্য এবং হেতু ও সাধ্যের ব্যাপ্তি প্রসিদ্ধই হলো। আলোচ্য অনুমানের পক্ষ—সত্ত্ব ও অসত্ত্বে ধর্মত্বরূপ বিদ্যমান থাকায় হেতুর পক্ষবৃত্তিতাও পাওয়া গেল এবং অনুমানটি যে নির্দোষ তাও বুঝা গেল। উক্ত অনুমানবলে সত্ত্ব এবং অসত্ত্বরূপ ধর্মের অত্যন্তাভাবও যে কোন একটি ধর্মী বা বিশেষ্যে পাওয়া যাবে তাও সাব্যস্ত হলো।

পূর্বপক্ষঃ— এখন প্রতিবাদী দ্বৈতবাদী হয়ত বলবেন যে, রূপ ও রসের অভাব বায়ুতে আছে, তা কে অস্বীকার করেছে? রূপ ও রসের অভাব কোন এক ধর্মীতে থাকলেও, সত্ত্ব এবং অসত্ত্ব এই পরস্পর বিরুদ্ধ ধর্মদ্বয়ের অভাব কোথাও থাকবে না। ধর্মী বা বিশেষ্য পদার্থটি হয় সৎ হবে, নয় অসৎ হবে। সৎ এবং অসৎ এমন পরস্পরবিরোধী যে এরা কোন এক বস্তুতে কদাচ থাকবে না, এদের উভয়ের অত্যন্তাভাবও কোন এক স্থানে পাওয়া যাবে না। এই অবস্থায় অদ্বৈতবাদীর উল্লেখিত অনুমান সত্ত্ব ও অসত্ত্বের একত্র (কোন এক ধর্মী বা বিশেষ্যে) অবস্থানের সহায়ক হবে কিরূপে?

সিদ্ধান্তঃ— অদ্বৈতবাদীর উল্লেখিত অনুমানের মর্ম এবং প্রতিবাদী মাধ্বের আপত্তির ভিত্তি কোথায় তা জানতে হলে সর্বাগ্রে সত্ত্ব ও অসত্ত্ব বলতে বাদী, প্রতিবাদী কে কি বোঝেন, তা স্পষ্টতঃ জানা আবশ্যক। সতের অভাবই অসৎ, অসতের অভাবই সৎ। সৎ ও অসৎ এরূপ পরস্পরবিরোধী যে, যা সৎ নয়, তাই অসৎ, আর যা অসৎ নয়, তাই সৎ। সৎ ও অসতের এরূপ অর্থ অদ্বৈতবাদী গ্রহণ করে না। অদ্বৈতবাদী আচার্য মধুসূদন সরস্বতী 'অদ্বৈতসিদ্ধি' তে বলেছেন— "যা ভূত, ভবিষ্যত ও বর্তমান এই তিন কালের কোন কালেই বাধিত হয় না, তাই একমাত্র সৎ বা ‌সত্য বস্তু। পরব্রহ্মই সুতরাং একমাত্র সত্য বস্তু। আর যা কোন স্থলেই (কোন আশ্রয়ে বা আধারেই) সদ্রূপে প্রতীতির বিষয় হয় না, যাতে কোনরূপ বস্তুত্বই নেই, সেইরূপ 'বস্তুশূন্য' অর্থাৎ বাস্তবতার সর্বপ্রকার সংস্পর্শবর্জিত অলীক আকাশকুসুম প্রভৃতিই 'অসৎ' বলে জানবে।"

সদ্রূপে কেন? যা সত্য বা মিথ্যা কোনোরূপ প্রতীতিরই কদাচ গোচর হয় না, তাই অসৎ। 'অয়ং বন্ধ্যা পুত্রো যাতি', 'ইদম আকাশকুসুমং সুরভী', এরূপ সত্য বা মিথ্যা কোনরূপ অনুভবই জন্মে না। এইজন্য বন্ধ্যাপুত্র , আকাশকুসুম প্রভৃতিকে অলীক বা অসৎ বলা হয়ে থাকে। শুক্তিরজতের রজত অদ্বৈতবাদীর দৃষ্টিতে মিথ্যা হলেও তা অসৎ নয়। সত্যজ্ঞানের তা বিষয় না হলেও, ভ্রমপ্রতীতির তা বিষয় হয়। রূপার খণ্ড মনে করে তা নেওয়ার জন্য ভ্রান্তব্যক্তি তার প্রতি ধাবিতও হয়। এইরূপ রজতকে আকাশকুসুমের মত অসৎ বলা যায় কিরূপে? সৎ ও অসৎ অদ্বৈতবেদান্তের সিদ্ধান্তে এমনই দুইটি বিরুদ্ধ কোটি যে তাদের মিলন সম্ভবপর না হলেও, তাদের অন্তরালে মিথ্যা জগতেরও স্থান আছে।

শঙ্কাঃ— শুক্তিরজত বা ঘট প্রমুখ বস্তুকে সদসদ্বিলক্ষণ বা মিথ্যা বলতে আপত্তি কি?

উত্তরঃ— জাগতিক বস্তুকে আলোচ্য দৃষ্টিতে 'সদসদ্বিলক্ষণ' বা মিথ্যা বলে ব্যাখ্যা করায়, প্রতিবাদী মাধ্ব 'সদসদ্বিলক্ষণ' রূপ সাধ্য অপ্রসিদ্ধ বলে পঞ্চপাদিকোক্ত মিথ্যাত্বলক্ষণে যে 'সাধ্যাপ্রসিদ্ধি' দোষের উদ্ভাবন করেছেন, ঐ দোষও এখন অচল হয়ে দাঁড়িয়েছে। পঞ্চপাদিকাবিবরণের রচয়িতা আচার্য প্রকাশাত্মযতি বলেন—"যে বস্তুর যা আধার বলে প্রতিভাত হয়, সেই আধার বা আশ্রয়েই যদি সেই বস্তুর অত্যন্তাভাব থাকে, তবে সেই বস্তু অবশ্যই মিথ্যাই হবে।"

এইরূপে 'সদসদ্বিলক্ষণত্ব'ই মিথ্যাত্ব, এই প্রকার পদ্মপাদাচার্যের লক্ষণ নির্দোষ বলে প্রতিভাত হলেও, একটি কথা এ প্রসঙ্গে মনে রাখা আবশ্যক যে, শুক্তিরজতের রজতকে অদ্বৈতবাদী 'অসৎ' বলেন না, প্রাতিভাসিকভাবে সৎ বলেন। ওটাকে অসৎ বলেন মাধ্ব। অসৎখ্যাতিবাদী মাধ্বের মতে ভ্রমস্থলে অত্যন্ত অসৎ বস্তুরই খ্যাতি হয়ে থাকে। মাধ্বসম্প্রদায়ের মতে যা অবাধ্য, তাই সৎ, যা বাধ্য তাই অসৎ। বিশ্বপ্রপঞ্চ এবং পরব্রহ্ম-পুরুষোত্তম, এই উভয়ই অবাধ্য, উভয়ই সৎ। শুক্তিরজত এবং আকাশকুসুম এরা উভয়েই বাধ্য এবং উভয়েই অসৎ। আকাশকুসুম প্রভৃতি যা সত্য বা মিথ্যা কোনরূপ প্রতীতিরই বিষয় হয় না, তাদেরকে ভ্রমের ক্ষেত্রে 'শুক্তিরজতং সৎ' এই প্রকারে সত্যরূপে প্রতীয়মান রজতের সাথে এক জাতীয় বলে গ্রহণ করতে অদ্বৈতবাদী কোনমতেই প্রস্তুত নয়। শুক্তিরজত ভ্রমপ্রতীতির বিষয় হয়, আকাশ কুসুম সত্য-মিথ্যা কোনরূপ জ্ঞানেই ভাসেনা। এজন্য অত্যন্ত অসৎ অলীক আকাশকুসুম প্রভৃতিকে শুক্তিরজতের ন্যায় অসৎ বলতে অসৎখ্যাতিবাদী মাধ্বের আগ্রহ থাকলেও, অদ্বৈতবাদীর কোন আগ্রহ নেই।.........

ঋণঃ—

১. আচার্য অপ্পয় দীক্ষিত বিরচিত "সিদ্ধান্তলেশ সংগ্রহ"।

২. ভগবান শঙ্করাচার্যের শারীরকমীমাংসা ভাষ্য।

৩. প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ স্কলার কাব্য ব্যাকরণ সাংখ্য বেদান্ততীর্থ ড. আশুতোষ শাস্ত্রী বিদ্যাবাচস্পতির

"বেদান্তদর্শন ও অদ্বৈতবাদ"।

Monday, 18 July 2022

অদ্বৈতবেদান্তে জ্ঞানমার্গ ও উপাসনামার্গঃ—

 

সাধনচতুষ্টয়সম্পন্ন উৎপন্ন বিবিদিষা, সুতরাং কথঞ্চিৎ দেহাত্মবুদ্ধিরহিত এবং উপাসনা-প্রভাবে বিক্ষেপরহিত চিত্তবিশিষ্ট ব্যক্তির হয় ব্রহ্মবিচারে প্রবৃত্তি। স্বীয় সংস্কার অনুসারে কারও হয় সদ্যোমুক্তির জন্য ১.জ্ঞানমার্গে নির্গুণব্রহ্মবিদ্যার অনুশীলনে প্রবৃত্তি, কারও বা হয় ক্রমমুক্তি লাভের জন্য ২.উপাসনামার্গে প্রবৃত্তি।

১. প্রথমোক্তগণের, ইনি নিবৃত্তপ্রতিবন্ধক উত্তম অধিকারী হলে, "তত্ত্বমসি" মহাবাক্য শ্রবণমাত্রেই "অহং ব্রহ্মাস্মি" ইত্যাকারা নির্বিশেষ ব্রহ্মবিদ্যার উদয় হয়। এতাদৃশ অধিকারী না হলে তাঁদের হয় শ্রবণমননাদি সাধন অনুষ্ঠানে প্রবৃত্তি। ব্রহ্মবিষয়ক শ্রবণ ও মননের দ্বারা অসম্ভাবনার এবং নিদিধ্যাসনের  দ্বারা বিপরীত ভাবনার নিবৃত্তি হয়। নিদিধ্যাসনের পরিপক্ক অবস্থাই সমাধি। ইহার সহকারিরূপে পাতঞ্জলোক্ত অষ্টাঙ্গযোগও পরিগৃহীত হয়। এই অবস্থা চলবার সময় পঞ্চকোশবিবেক দ্বারা পরবৈরাগ্যযুক্ত অধিকারীর ত্বং পদার্থের শোধন হয়, অর্থাৎ আমি শরীরচতুষ্টয় হতে ভিন্ন, তার অধিষ্ঠান শুদ্ধচৈতন্যমাত্রস্বরূপ, এইপ্রকার অনুভূতি হয়। তৎ পদার্থের শোধনও এই সময় হতে থাকে, অর্থাৎ উপাধিবিরহিত ব্রহ্ম বস্তুতঃ সর্বজ্ঞ সর্বশক্তিমান নন, পরন্তু নির্বিশেষ শুদ্ধচৈতন্যমাত্রস্বরূপ, এইপ্রকার জ্ঞানোদয় হয়। এতাদৃশ অধিকারী জগৎপ্রপঞ্চকে স্বপ্নের ন্যায় প্রাতিভাসিকরূপে দর্শন করতে অভ্যাস করেন এবং ক্রমশঃ তাতে প্রতিষ্ঠিত হন। ইঁহার পক্ষে তখন আর নিত্যনৈমিত্তিক কর্মের অনুষ্ঠান সম্ভব হয় না। এতাদৃশ চতুর্থাশ্রমী অধিকারীর জন্যই ভগবান শঙ্করাচার্য জ্ঞানকর্মের সমুচ্চয় নিরাকরণ করেছেন স্বীয় শ্রীগীতাভাষ্যে। এতাদৃশ অধিকারীর "শুদ্ধচৈতন্যমাত্রস্বরূপ আমি" "শুদ্ধনির্গুনব্রহ্মচৈতন্যের" সহিত অভিন্ন এইপ্রকার নিদিধ্যাসনের দ্বারা বিপরীতভাবনার নিবৃত্তি হলে "তত্ত্বমসি" এই মহাবাক্যোত্থ "অহং ব্রহ্মাস্মি", এইপ্রকার নির্গুণব্রহ্মাত্মজ্ঞানের উদয় হয়।

২. ব্রহ্মলোকে ঈশ্বরীয় ঐশ্বর্যভোগ এবং মুক্তি, এই উভয়প্রকার আকাঙ্ক্ষাযুক্ত ব্যক্তির হয় উপাসনাতে প্রবৃত্তি। উপাসনা (উপ+আস্+অনট্+আপ্) শব্দের অর্থ—'নিকটে অবস্থিতি'; অর্থাৎ তৈলধারাবৎ উপাস্যাকারা চিত্তবৃত্তি দ্বারা উপাস্য চিন্তন। ওঙ্কার উপাসনা ব্যতিরিক্ত উপাসনাসকল সগুণব্রহ্মেরই হয়ে থাকে। মায়াশক্তিযোগে নির্গুণপরব্রহ্মই সগুণপরব্রহ্মরূপে অঙ্গীকৃত হন। সগুণব্রহ্মের উপাসনা দ্বিবিধ—প্রতীকাবলম্বনা ও অপ্রতীকাবলম্বনা। অপ্রতীকাবলম্বনা উপাসনাকে 'অহংগ্রহোপাসনা' বলে। ইহাতে নিজেকে শুদ্ধচৈতন্যমাত্রস্বরূপে চিন্তনকরতঃ সগুণপরব্রহ্মের সহিত নিজের অভিন্নতা চিন্তন করতে হয়। শ্রুত্যুক্ত দহরবিদ্যা (ছান্দোগ্য উপনিষদ- ৮।১), শাণ্ডিল্য বিদ্যা (ছান্দোগ্য উপনিষদ-৩।১৪) প্রভৃতি এই উপাসনার অন্তর্গত। ইহার ফলে ক্রমমুক্তি লব্ধ হয়। আবার নানাপ্রকার ফলপ্রদ বিদ্যুল্লোক পর্যন্ত গতিপ্রদ নানাপ্রকার প্রতীকোপাসনাও আছে। প্রতীকাবলম্বনা সাকার ব্রহ্মের উপাসনাও অদ্বৈতবেদান্তে অঙ্গীকৃত হয়। ব্রহ্মসূত্রের (৩/২/১৫) ভাষ্যে শঙ্করাচার্য বলেছেন— "ব্রহ্মাপি পৃথিব্যাদ্যুপাধিসংবন্ধাত্ তদাকারতামিব প্রতিপদ্যতে; তদালম্বনো ব্রহ্মণ আকারবিশেষোপদেশ উপাসনার্থো ন বিরুধ্যতে" অর্থাৎ 'ব্রহ্মও পৃথিবী প্রভৃতি উপাধির সহিত সম্বন্ধবশতঃ যেন সেই আকারকেই প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। উপাধি যাহার অবলম্বন, এতাদৃশ যে ব্রহ্মের আকারবিশেষের উপদেশ, তাহা উপাসনার জন্য এইজন্য সবিশেষতা ও নির্বিশেষতা জ্ঞাপিকা শ্রুতি বিরোধগ্রস্ত হয় না।'

শ্রুতিতেও উপাসনার জন্য সাকার ব্রহ্মের বর্ণনা আছে, যথা— "হিরণ্ময়ঃ পুরুষঃ হিরণ্যশ্মশ্রুঃ হিরণ্যকেশঃ" (ছান্দোগ্য উপনিষৎ-১/৬/৬), "বহুশোভমানাম্ উমাং হৈমবতীম্" (কেন উপনিষৎ ৩/১২) ইত্যাদি। লক্ষ্য করতে হইবে— 'সাকার উপাসনা' শব্দে শঙ্করাচার্য বিভিন্ন শাস্ত্রে প্রতিপাদিত শিব, বিষ্ণু, শক্তি প্রভৃতি যাবতীয় সাকার বিগ্রহই গ্রহণ করলেন; সুতরাং আচার্য শঙ্করের অদ্বৈত মতবাদকে অসাম্প্রদায়িক বলতে হবে। প্রতিমাদি প্রতীকাবলম্বনা সাকার ব্রহ্মোপাসনাও ক্রমশঃ অপ্রতীকাবলম্বনা উপাসনাতে পরিণত হয়ে সিদ্ধ সাধককে ক্রমমুক্তি প্রদান করে। "সর্ব্বকালে সর্ব্বাবস্থাতে শ্রীভগবানের শ্রীমূর্ত্তি যাঁর হৃদয়ে প্রতিভাত হতে থাকেন, তিনিই সিদ্ধপুরুষ"। শমদমাদি সহকৃত শুভকর্মানুষ্ঠান, স্বাধ্যায়, বিষয়বৈরাগ্য, ভগবান্ নামগুণকীর্তন, তন্নামজপ, তন্মূর্তিধ্যান ইত্যাদি, প্রসিদ্ধ সাধনসকলই এই মতে সাধনরূপে অঙ্গীকৃত হয়। ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য ব্রহ্মসূত্রের (২/২/৪২) ভাষ্যে বলছেন—

 "পরমেশ্বরংভগবন্তমভিগমনোপাদানেজ্যাস্বাধ্যায়যোগৈর্বর্ষশতমিষ্ট্বা ক্ষীণক্লেশো ভগবন্তমেব প্রতিপদ্যত ইতি৷" অর্থাৎ পরমেশ্বরকে অভিগমন, উপাদান, ইজ্যা, স্বাধ্যায় এবং যোগের দ্বারা শতবর্ষ অর্থাৎ যাবজ্জীবন উপাসনাকরতঃ ক্ষীণক্লেশ হয়ে জীব ভগবানকেই প্রাপ্ত হয়। এই সূত্রের ভাষ্যে ভাষ্যকার আর বলছেন—

"ভগবতোভিগমনাদিলক্ষণমারাধনমজস্রমনন্যচিত্ততযাভিপ্রেয়তে" অর্থাৎ 'সেই ভগবানের অভিগমনাদিরূপ আরাধনা অনন্যচিত্ত হয়ে অজস্রভাবে অভিপ্রায় করা হয়।' সর্বোপরি পরমেশ্বরের অনুগ্রহই ব্রহ্মবিদ্যালাভ ও মোক্ষের হেতুরূপে এই মতে অঙ্গীকৃত হয়, ব্রহ্মসূত্রের (২/৩/৪২) সূত্রের ভাষ্যে "তদনুগ্রহহেতুকেনৈব চ বিজ্ঞানেন মোক্ষসিদ্ধিঃ" অর্থাৎ 'তাঁহার অনুগ্রহই যাহার হেতু, সেই বিজ্ঞান দ্বারা জীবের মোক্ষ সিদ্ধ হয়' ইত্যাদি ভাষ্যকারের বচন দ্রষ্টব্য।

তথ্যসূত্রঃ- বেদান্তদর্শন, প্রথম খণ্ড (শাঙ্করভাষ্য, বৈয়াসিক ন্যায়মালা ও ভাষ্যরত্নপ্রভা টীকা সমন্বিত)

অন্তরঙ্গ সাধনঃ—

 


ব্রহ্মজ্ঞানের উৎপত্তিতে বহিরঙ্গ সাধনের কথা ইতোমধ্যে বলা হয়েছে, অদ্য #অন্তরঙ্গসাধন বিষয়ে আলোচনা করব। ভগবান শংকরাচার্য ব্রহ্মসূত্রের সর্বাপেক্ষা অধিকরণের ভাষ্যে বলছেন—

ব্রহ্মবিদ্যা এতটাই মহাপ্রভাবশালিনী যে, যজ্ঞাদির দ্বারা ইহাকে প্রাপ্ত হতে ইচ্ছে করে, কিন্তু তাহলেও ব্রহ্মবিদ্যা যজ্ঞাদি সাধনান্তর নিরপেক্ষ ও তত্ত্বমস্যাদি শব্দমাত্রগম্য হলেও ব্রহ্মবিদ্যার্থী শমদমাদিযুক্ত হবেন, যেহেতু

'তস্মাদেবংবিচ্ছান্তো দান্ত উপরতস্তিতিক্ষুঃ সমাহিতো ভূত্বাত্মন্যেবাত্মানং পশ্যতি'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪/৪/২৩)

"সেইহেতু ধর্মাধর্মরূপ কর্মের সহিত আত্মা সম্পর্কযুক্ত নহে এপ্রকার যিনি জানেন, তিনি শান্ত অর্থাৎ বাহ্যেন্দ্রিয়ব্যাপাররহিত, দান্ত অর্থাৎ অন্তঃকরণগত তৃষ্ণানিবৃত্ত, উপরত অর্থাৎ সমস্ত কামনাশূন্য, তিতিক্ষু অর্থাৎ সুখদুঃখাদি দ্বন্দ্বসহিষ্ণু এবং সমাহিত অর্থাৎ একাগ্রচিত্ত হয়ে আত্মাতে (-শরীরমধ্যে, প্রত্যক্ চৈতন্যস্বরূপ) আত্মাকে দর্শন করেন", এইপ্রকারে ব্রহ্মবিদ্যার সাধনরূপে শমদমাদি বিহিত হয়েছে এবং যেহেতু যা বিহিত, তা অবশ্যই অনুষ্ঠেয়; সুতরাং ব্রহ্মবিদ্যাতে শমদমাদিরও আবশ্যকতা আছে, তদ্বিহীন ব্যক্তির পক্ষে সেই বিদ্যা তত্ত্বমস্যাদি শব্দমাত্রগম্যা নহে। আমি সাধনচতুষ্টয় শীর্ষক লেখাতে এই শমদমাদি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। ইতি.....

বিবিদিষা কি?

 


অদ্বৈতবেদান্তে সাধন বিষয়ক আলোচনায় আজকের আলোচ্য বিষয় "বিবিদিষা"। শমদমাদির অভ্যাস সহ নিষ্কামভাবে অনুষ্ঠিত নিত্যনৈমিত্তিক শুভকর্মানুষ্ঠানের ফলে অন্তঃকরণের পাপাদি মল বিনষ্ট হলে বিবিদিষার উৎপত্তি হয়। ভগবান শঙ্করাচার্য ব্রহ্মসূত্রের সর্বাপেক্ষা অধিকরণের ভাষ্যে বলছেন—

'তমেতং বেদানুবচনেন ব্রাহ্মণা বিবিদিষন্তি যজ্ঞেন দানেন তপসানাশকেন '-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪/৪/২২)

অর্থাৎ সেই উপনিষৎপ্রতিপাদ্য ব্রহ্মকে ব্রাহ্মণগণ বেদপাঠ, যজ্ঞ, দান ও যথেচ্ছ ভোজন না করারূপ তপস্যার দ্বারা জানিতে ইচ্ছা করেন", ইত্যাদি শ্রুতি যজ্ঞ ও দান প্রভৃতির ব্রহ্মবিদ্যা সাধনতা প্রদর্শন করছে। আর বিবিদিষার সহিত সম্বন্ধবশতঃ কাম্যবর্জিত নিত্যনৈমিত্তিক কর্মের, ব্রহ্মজ্ঞানের উৎপত্তিতে সাধনভাব নিশ্চিত হচ্ছে।

'অথ যদ্যজ্ঞ ইত্যাচক্ষতে ব্রহ্মচর্যমেব তৎ'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৮/৫/১) "আর লোকে যাহাকে যজ্ঞ বলে, তাহা ব্রহ্মচর্যই", ইত্যাদি এই স্থলেও ব্রহ্মবিদ্যার সাধনভূত ব্রহ্মচর্যের যজ্ঞাদিশব্দের দ্বারা স্তুতি হওয়ায় যজ্ঞাদিরও ব্রহ্মজ্ঞানের প্রতি সাধনভাব সূচিত হচ্ছে। আর 'সর্বে বেদা যৎপদমামনন্তি তপাংসি সর্বাণি চ যদ্বদন্তি৷ যদিচ্ছন্তো ব্রহ্মচর্যং চরন্তি তত্তে পদং সংগ্রহেণ ব্রবীমি'—(কঠ উপনিষৎ-১/২/১৫) " সকল বেদ জ্ঞান সাধনভূত কর্মদ্বারা যে পদকে প্রতিপাদন করেন, তপস্যা সকল যাঁহার কথা বলে, যাঁহাকে অভিলাষ করিয়া ব্রহ্মচর্য পালন করে, সেই পদ তোমাকে সংক্ষেপে বলিতেছি", ইত্যাদি এই সকল শ্রুতি আশ্রমবিহিত কর্মসকলের বিদ্যাসাধনতা সূচনা করছে। তাছাড়া 'কর্মসকল পাপকে নাশ করে, জ্ঞান কিন্তু পরমা গতি, কর্মসকলের দ্বারা পাপ বিনষ্ট হলে তদনন্তর জ্ঞান প্রবৃত্ত হয়', ইত্যাদি এই সকল স্মৃতিও আশ্রমকর্মসকল যে ব্রহ্মজ্ঞানের সাধন, ইহা সূচনা করছে।

কিন্তু কতকাল কর্মানুষ্ঠান করতে হবে সেই বিষয়ে পূজ্যপাদ্ সুরেশ্বরাচার্য বলেছেন—"প্রত্যক্প্রবণতাং বুদ্ধেঃ কর্মাণ্যুৎপাদ্য শুদ্ধিতঃ। কৃতার্থান্যস্তমায়ান্তি প্রাবৃডন্তে ঘনা ইব।"-(নৈষ্কর্মসিদ্ধি-১/৪৯)

"কর্মসকল শুদ্ধতা সম্পাদন দ্বারা বুদ্ধির প্রত্যক্ প্রবণতাকে অর্থাৎ দেহান্দ্রিয়াদি হতে ভিন্ন শুদ্ধচৈতন্যস্বরূপ আত্মাতে আত্মবুদ্ধিকে উৎপাদনকরতঃ কৃতার্থ হয়ে বর্ষান্তে মেঘরাজির ন্যায় অস্তগমন করে।" বুদ্ধির এই যে প্রত্যক্ প্রবণতা যাহা চিত্তের শুদ্ধতাদ্বারা নিষ্কামকর্মসাধ্য, ইহারই অপর নাম 'বিবিদিষা'; ব্রহ্মকে জানবার ইচ্ছামাত্রই বিবিদিষা নহে। পূজ্যপাদ্ শ্রীধর স্বামীও তাই বলেছেন, যথা—"বিবিদিষা চ নিত্যানিত্যবস্তুবিবেকন নিবৃত্তদেহাদ্য-ভিমানতয়া বুদ্ধেঃ প্রত্যক্প্রবণতা"-(গীতা ১৮/২, শ্রীধর স্বামী টীকা)।

Tuesday, 5 July 2022

বিবেকিগণ বিজ্ঞান দ্বারা সেই আনন্দঘন অমৃতস্বরূপ প্রত্যাগাত্মাকে সর্বত্র উপলব্ধি করেনঃ—

 


অথর্ববেদীয় মুণ্ডক শ্রুতিতে বর্ণিত আছে—"তদ্বিজ্ঞানেন পরিপশ্যন্তি ধীরা আনন্দরূপমমৃতং যদ্বিভাতি।।"-(মুণ্ডক উপনিষৎ-২/২/৮)

আচার্য শঙ্কর এই শ্রুতির ভাষ্যে বলিতেছেন—"সেই আত্মতত্ত্বকে বিজ্ঞানদ্বারা অর্থাৎ শাস্ত্র ও আচার্যের উপদেশ হইতে লব্ধ পরোক্ষজ্ঞানের সহিত শম, দম, ধ্যান, সর্বকর্মসন্ন্যাস ও বৈরাগ্য হইতে উদ্ভূত বিশেষ জ্ঞান অর্থাৎ অনুভবের দ্বারা বিবেকিগণ চতুর্দিকে দেখেন অর্থাৎ সর্বত্র পূর্ণরূপে উপলব্ধি করেন, যে আনন্দঘন অর্থাৎ সম্পূর্ণ অনর্থদুঃখক্লেশরহিত সুখস্বরূপ এবং অমৃতস্বরূপ যিনি সর্বদা স্বীয় অন্তঃকরণে বিশেষরূপে অর্থাৎ বিবিধ বৃত্তিবিশিষ্টরূপে প্রকাশিত হইতেছেন।"

Saturday, 25 June 2022

উমামহেশ্বরস্তোত্রম্ ও শ্রীশৈলভ্রমরাম্বাস্তুতিঃ-

 


উমামহেশ্বরস্তোত্রম্ 

নমঃ শিবাভ্যাং নবয়ৌবনাভ্যাম্

পরস্পরাশ্লিষ্টবপুর্ধরাভ্যাম্  ।

নাগেন্দ্রকন্যাবৃষকেতনাভ্যাম্

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||১||

ভাবার্থ - নবযৌবনবিশিষ্ট পরস্পর মিলিত শরীরধারী ( অর্ধনারীশ্বর মূর্তি ) শিব ও শিবাকে নমস্কার ।নাগেন্দ্রকন্যা, বৃষকেতনযুক্ত শঙ্কর ও পার্বতীকে পুনঃ পুনঃ নমস্কার ||১||

নমঃ শিবাভ্যাং সরসোৎসবাভ্যাম্

নমস্কৃতাভীষ্টবরপ্রদাভ্যাম্  ।

নারায়ণেনার্চিতপাদুকাভ্যাং

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||২||

ভাবার্থ - নমস্কৃত হইলে অভীষ্ট বরপ্রদানকারী সরস অনন্দময় শিব ও শিবাকে নমস্কার, যাদের পাদুকা নারায়ণ অর্চ্চনা করেছেন ( এমন ) শঙ্কর ও পার্বতীকে পুনঃ পুনঃ নমস্কার ||২||

নমঃ শিবাভ্যাং বৃষবাহনাভ্যাম্

বিরিঞ্চিবিষ্ণ্বিন্দ্রসুপূজিতাভ্যাম্  ।

বিভূতিপাটীরবিলেপনাভ্যাম্

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||৩||

ভাবার্থ - ব্ৰহ্মা, বিষ্ণু ও ইন্দ্র কর্তৃক সুপূজিত বৃষবাহন শিব ও শিবাকে নমস্কার: বিভূতি ও চন্দন বিলেপনযুক্ত শিব ও পার্বতীকে পুনঃ পুনঃ নমস্কার ||৩||

নমঃ শিবাভ্যাং জগদীশ্বরাভ্যাম্

জগৎপতিভ্যাং জয়বিগ্রহাভ্যাম্  ।

জম্ভারিমুখ্যৈরভিবন্দিতাভ্যাম্

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||৪||

ভাবার্থ - জগতের অধিপতি জগতের ঈশ্বর জয়রূপী শরীরধারী শিব ও শিবা কে নমস্কার ( অর্থাৎ জগতের পালক, জগৎ সম্বন্ধে সর্বপ্রকার সামর্থ্য বিশিষ্ট এবং জয়রূপ অর্থাৎ সংসারজয়কারী বা মুক্তিদায়ক বিগ্রহ বা শরীরধারী– এ স্থলে এটাই তাৎপর্য যে, শিব ও ভবানীর শরীর ভক্তের সংসার-শৃঙ্খলা মোচন করে সুতরাং ওটাই জয় ) জম্ভারি ইন্দ্রপ্রমুখ দেবগণ কর্তৃক অভি বন্দিত শঙ্কর-পার্বতীকে পুনঃ পুনঃ নমস্কার ||৪||

নমঃ শিবাভ্যাং পরমৌষধাভ্যাম্

পঞ্চাক্ষরী পঞ্জররঞ্জিতাভ্যাম্  ।

প্রপঞ্চসৃষ্টিস্থিতি সংহৃতাভ্যাম্

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||৫||

ভাবার্থ - শিব ও শিবাকে নমস্কার। পরম ঔষধস্বরূপ পঞ্চাক্ষর ও পঞ্জরাখ্য স্তব দ্বারা রচিত ( স্তুত ) প্রপঞ্চ ( জগৎ ) সৃষ্টিস্থিতিসংহারকারী শঙ্কর-পার্বতীকে পুনঃ পুনঃ নমস্কার ||৫||

নমঃ শিবাভ্যামতিসুন্দরাভ্যাম্

অত্যন্তমাসক্তহৃদম্বুজাভ্যাম্  ।

অশেষলোকৈকহিতঙ্করাভ্যাম্

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||৬||

ভাবার্থ - শিব ও শিবাকে প্রণাম। অতি সুন্দর, যাদের হদয়কমল অত্যন্ত আসক্ত ( অর্থাৎ পরস্পর অত্যন্ত সংবদ্ধ ), নিখিল লােকের একমাত্র হিতকর শঙ্কর-পার্বতীকে পুনঃ পুনঃ নমস্কার ||৬||

নমঃ শিবাভ্যাং কলিনাশনাভ্যাম্

কঙ্কালকল্যাণবপুর্ধরাভ্যাম্  ।

কৈলাসশৈলস্থিতদেবতাভ্যাম্

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||৭||

ভাবার্থ - শিব ও শিবাকে প্রণাম। কলিনাশকারী অস্থিমালা ও কল্যাণদায়ক শরীরবিশিষ্ট কৈলাসপর্বতস্থিত দেবতা শঙ্কর ও পার্বতীকে পুনঃ পুনঃ প্রণাম ||৭||

নমঃ শিবাভ্যামশুভাপহাভ্যাম্

অশেষলোকৈকবিশেষিতাভ্যাম্  ।

অকুণ্ঠিতাভ্যাম্  স্মৃতিসম্ভৃতাভ্যাম্

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||৮||

ভাবার্থ - শিব ও শিবা কে নমস্কার, অশুভাপহারী অশেষলোকবিলক্ষণ, অকুণ্ঠিত, স্মৃতিতে অবস্থিত ( চিন্তার বিষয় ) শঙ্কর পার্বতী কে পুনঃ পুনঃ নমস্কার ||৮||

নমঃ শিবাভ্যাং রথবাহনাভ্যাম্

রবীন্দুবৈশ্বানরলোচনাভ্যাম্  ।

রাকাশশাঙ্কাভমুখাম্বুজাভ্যাম্

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||৯||

ভাবার্থ - শিব ও শিবাকে প্রণাম। রথ ও বাহনযুক্ত, সূর্য্য, চন্দ্র ও অগ্নিরূপ চক্ষুবিশিষ্ট, পূর্ণিমাচন্দ্রের ন্যায় মুখপদ্মের কান্তিবিশিষ্ট শঙ্কর ও পার্বতীকে পুনঃ পুঃ প্রণাম ||৯||

নমঃ শিবাভ্যাং জটিলন্ধরভ্যাম্

জরামৃতিভ্যাং চ বিবর্জিতাভ্যাম্  ।

জনার্দনাব্জোদ্ভবপূজিতাভ্যাম্

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||১০||

ভাবার্থ - শিব ও শিবাকে নমস্কার। জটাধারী জরা ও মৃত্যু কর্তৃক বিবর্জিত ( অর্থাৎ অজর ও অমর ), বিষ্ণু ও ব্ৰহ্মা কর্ক্তৃক পূৃজিত শঙ্কর ও পার্বতীকে পুনঃ পুনঃ নমস্কার ||১০||

নমঃ শিবাভ্যাং বিষমেক্ষণাভ্যাম্

বিল্বচ্ছদামল্লিকদামভৃদ্ভ্যাম্  ।

শোভাবতী শান্তবতীশ্বরাভ্যাম্

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||১১||

ভাবার্থ - শিব ও পার্বতীকে নমঙ্কার। বিষম সংখ্যক চক্ষুর্যুক্ত, বিল্বপত্র ও মল্লিকামালাধারী, শােভাবর্তী ও শান্তবতীশর শঙ্কর-পার্ব্বতীকে বারংবার প্রণাম ||১১||

নমঃ শিবাভ্যাং পশুপালকাভ্যাম্

জগত্রয়ীরক্ষণ বদ্ধহৃদ্ভ্যাম্  ।

সমস্ত দেবাসুরপূজিতাভ্যাম্

নমো নমঃ শঙ্করপার্বতীভ্যাম্  ||১২||

ভাবার্থ - শিব ও শিবাকে নমস্কার. পশু (জীব) পালক, জগত্রয়ের রক্ষণে বদ্ধহৃদয়, সমস্ত দেবাসুরপূজিত শঙ্কর ও পার্বতীকে পুনঃ পুনঃ নমস্কার ||১২||

স্তোত্রং ত্রিসন্ধ্যং শিবপার্বতীভ্যাম্

ভক্ত্যা পঠেদ্দ্বাদশকং নরো যঃ ।

স সর্বসৌভাগ্য ফলানি ভুঙ্ক্তে

শতায়ুবন্তে শিবলোকমেতি ||১৩||

ভাবার্থ - যে ব্যাক্তি ত্রিসন্ধ্যায় ভক্তিপূর্বক শিবপার্বতীর দ্বাদশ (শিবপার্বতীভ্যাম্ উপলক্ষিতং দ্বাদশকং) সংখ্যক স্তব পাঠ করে, সে শতায়ু লাভ করে সর্বপ্রকার সৌভাগ্য ফলভোগ করে ও অন্তে শিবলােক প্রাপ্ত হয় ||১৩||

শ্রীশৈলেশভ্রমরাম্বাস্তুতিঃ/ভ্রমরাম্বাষ্টকম্ অথবা শ্রীমাতৃস্তবঃ

চাঞ্চল্যারুণলোচনাঞ্চিতকৃপাচন্দ্রার্কচূড়ামণিং

চারুস্মেরমুখাং চরাচরজগৎসংরক্ষণীং তৎপদাম্ ।

চঞ্চচ্চম্পকনাসিকাগ্রবিলসন্মুক্তামণীরঞ্জিতাং

শ্রীশৈলস্থলবাসিনীং ভগবতীং শ্রীমাতরং ভাবয়ে ||১||

ভাবার্থ - যার আরক্ত নয়নে চঞ্চলতা দ্বারা কূপা অভিব্যক্ত, অর্দ্ধচন্দ্র যার চূড়ামণি, দোদুল্যমান চম্পকাকৃতি স্বর্ণভূষণভূষি ত নাসিকার অগ্রভাগ দিব্যমুক্তা-বিরাজিত হয়ে যার প্রীতিবর্দ্ধন করছে, সেই স্মেরচারু-বদনা, চরাচরজগৎ-পালিনী, তৎপদ প্রতিপাদ্য অর্থাৎ ঈশ্বরস্বরূপা শ্রীশৈলবাসিনী ভগবতী

শ্ৰীমাতাকে ভাবনা করি ||১||

কস্তূরীতিলকাঞ্চিতেন্দুবিলসৎপ্রোদ্ভাসিভালস্থলীং

কর্পূরদ্রবমিশ্রচূর্ণখদিরামোদোল্লসদ্বীটিকাম্ ।

লোলাপাঙ্গতরঙ্গিতৈরধিকৃপাসারৈর্নতানন্দিনীং

শ্রীশৈলস্থলবাসিনীং ভগবতীং শ্রীমাতরং ভাবয়ে ||২||

ভাবার্থ - যার কস্তূরীতিলক যােগে শােভমান শশিকলা-সমুদ্ভাসিত স্বভাবসুন্দর ললাট, মুখে কর্পূরদ্রব সংযুক্ত স-চূর্ণ খদির-সুরভি তাম্বুল, করুণা- পূরিত অচল অপাঙ্গভঙ্গী দ্বারা প্রণত জনগণের আনন্দবিধায়িনী সেই শ্রীশৈলবাসিনী ভগবতী মাতাকে ভাবনা করি ||২||

রাজন্মত্তমরালমন্দগমনাং রাজীবপত্রেক্ষণাং

রাজীবপ্রভবাদিদেবমকুটৈ রাজৎপদাম্ভোরুহাম্ ।

রাজীবায়তমন্দমণ্ডিতকুচাং রাজাধিরাজেশ্বরীং

শ্রীশৈলস্থলবাসিনীং ভগবতীং শ্রীমাতরং ভাবয়ে ||৩||

ভাবার্থ - যার সুঠাম ধীরগমন মত্তমরালগমনতুল্য, নয়ন পদ্মপলাশ সদৃশ, পাদপদ্ম পদ্মযোনিপ্রমুখ দেবতাগণের মুকুটনিচয়ে রঞ্জিত এবং স্তনযুগল প্রফুল্লকমলবৎ আয়ত ও ময়ূরপুচ্ছে ভূষিত, সেই শ্রীশৈলস্থলবাসিনী শ্রীমাতা ভগবতী রাজরাজেশ্বরীকে ভাবনা করি ||৩||

ষট্তারাং গণদীপিকাং শিবসতীং ষড়্বৈরিবর্গাপহাং

ষট্চক্রান্তরসংস্থিতাং বরসুধাং ষড়্যোগিনীবেষ্টিতাম্ ।

ষট্চক্রাঞ্চিতপাদুকাঞ্চিতপদাং ষড়্ষভাবগাং ষোড়শীং

শ্রীশৈলস্থলবাসিনীং ভগবতীং শ্রীমাতরং ভাবয়ে ||৪||

ভাবার্থ - যিনি ষট্তারা ও গণদীপিকা নামে কথিত, যিনি মহাদেবের সহধর্মিণী, যিনি কামাদি ষড়রিপুকে সংহার করেন, ( জীবশরীরস্থিত ) ষট্চক্রাভ্যন্তরে যার অধিষ্ঠান, যিনি পরমামৃতরূপিণী, ( ডাকিনী, রাকিণী, লাকিনী, সাকিনী, শাকিনী, ও হাকিনী ) এই ছয়টি যােগিনী যাকে পরিবেষ্টন করে রয়েছে, ( ষােড়শদল চক্র, অষ্টদল চক্র, চতুর্দশার চক্র, বহির্দশার চক্র, অন্তর্দশার চক্র এবং অষ্টার চক্র) এই ষটচক্রস্থিত পাদুকাতে যার পদম্বয় বিদ্যমান, যিনি ষড়ভাবের ( জন্ম, বিদ্যমানতা, বৃদ্ধি, হ্রাস, পরিবর্তন ও ধ্বংস এই ছয় অবস্থায় ) অধিষ্ঠাত্রী, এবং যিনি ষোড়শীরূপা, সেই শৈলবাসিনী ভগবতী মাতাকে আমি ভাবনা করি ||৪||

( বিশেষ কথা – ষট্তারা–ছয়টি তার অর্থাৎ প্রণব বাহার মন্ত্রমূর্তিতে বিদ্যমান, তিনি ষট্তারা। তন্ত্রশান্ত্রে এ বিষয়ে প্রমাণ, যথা-

শ্রীপরা বাগভবাদ্যৈশ্চ ঈশ্বরী তারমন্মথৈঃ।

আদ্যভুতৈর্ভিদ্যমানা সুন্দরী ষড়্ বিধা ভবেৎ ॥

ত্রিপুরসুন্দরীর বীজমন্ত্রপূর্ণ এই তান্ত্রিক বচনের ব্যাখ্যা করব না, কেবল 'ষট্' আর 'তার' এই দুইটি পদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য প্রমাণ উদ্ধত হইল ।

গণদীপিকা – গণ এবং কূট একার্থক শব্দ ; ত্রিপুরসুন্দরীমন্ত্র ত্রিকুট, 'দীপনী' বিদ্যা প্রত্যেক কুটেরই আছে। মন্ত্রসমূহের দীপ্তি সম্পাদন কযরেন বলে এই বিদ্যার নাম 'দীপনী', মন্ত্রের বীর্য্যই দীপ্তি। তন্ত্রশান্ত্রে কথিত হয়েছে;-

‘এষা তু দীপনী বিদ্যা অজপা প্রাণরূপিণী

********************************

দীপনেনৈৰ যুক্তা সর্বে মন্ত্রা বীর্ঘ্যবস্তো ভবন্তি।’  ত্রিকুটমন্ত্রের পূর্বে উচ্চারণীয় পঞ্চাক্ষর প্রভৃতি মন্ত্র দীপনী বিদ্যা। মন্ত্রগণের দীপ্তিবিধায়িনী বলে দীপনীই গণদীপিকা নামে গৃহীত হয়েছে। )

শ্রীনাথাদৃতপালিতাত্রিভুবনাং শ্রীচক্রসঞ্চারিণীং

জ্ঞানাসক্তমনোজযৌবনলসদ্গন্ধর্বকন্যাদৃতাম্ ।

দীনানামাতিবেলভাগ্যজননীং দিব্যাম্বরালঙ্কৃতাং

শ্রীশৈলস্থলবাসিনীং ভগবতীং শ্রীমাতরং ভাবয়ে ||৫||

ভাবার্থ - শ্রীশব্দযোগে 'নাথ'সমূহস্বরূপ স্থানে যিনি আদৃতা, ( সংস্থার প্রাপ্ত ) ত্রিভুবনকে যিনি ( মূর্তি প্রদান করে ) পালন করেন, শ্রীচক্রে যার সঞ্চার, জ্ঞান-রত কামদেব এবং যুবতী গন্ধর্ব্বকন্যাগণ যার অর্চনা করেন, যিনি দরিদ্রগণেরও অত্যন্ত সৌভাগ্য-সম্পাদন করেন, দিব্য-বসনভূষণ সজ্জিতা সেই শ্রীশৈলস্থলবাসিনী ভগবতী শ্রীমাতাকে ভাবনা করি ||৫||

লাবণ্যাধিকভূষিতাঙ্গলতিকাং লাক্ষালসদ্রাগিণীং

সেবায়াতসমস্তদেববনিতাং সীমন্তভূষান্বিতাম্ ।

ভাবোল্লাসবশীকৃতপ্রিয়তমাং ভণ্ডাসুরচ্ছেদিনীং

শ্রীশৈলস্থলবাসিনীং ভগবতীং শ্রীমাতরং ভাবয়ে ||৬||

ভাবার্থ - যার অঙ্গলতিকা অসামান্য লাবণ্যে বিমণ্ডিত, সেবার্থ সমাগত সমস্ত দেববনিতাগণের সীমন্তভূষণে রঞ্জিত হওয়াতে যার চরণস্থ লাক্ষারাগ অধিকতর উজ্জ্বল, ভাবাবেশে প্রিয়তম মহাদেবকে যিনি একান্ত বশীভূত করেছেন, সেই ভণ্ডাসুরবিমর্দিনী শ্রীশৈলস্থলবাসিনী ভগবতী মাতাকে ভাবনা করি ||৬||

ধন্যাং সোমবিভাবনীয়চরিতাং ধারাধরশ্যামলাং

মুন্যারাধনমেধিনীং সুযুবতীং মুক্তিপ্রদানব্রতাম্ ।

কন্যাপূজনসুপ্রসন্নহৃদয়াং কাঞ্চীলসন্মধ্যমাং

শ্রীশৈলস্থলবাসিনীং ভগবতীং শ্রীমাতরং ভাবয়ে ||৭||

ভাবার্থ - যিনি ধন্যা, যার চরিত্র সােম-বিভাবনীয়, যিনি মেঘসদৃশ শ্যামকান্তি, মুনিগণের আরাধনা-সামর্থ্যের বৃদ্ধিদায়িনী, পূর্ণযুবতী ও মুক্তিদানপরায়ণা ; কুমারী পূজা করলে যার হৃদয় প্রসন্ন হয়, যার মধ্যভাগ কাঞ্চীভূষণশােভিত, সেই শ্রীশৈলস্থলবাসিনী ভগবতী শ্ৰীমাতাকে ভাবনা করি ||৭||

কর্পূরাগরুকুঙ্কুমাঙ্কিতকুচাং কর্পূরবর্ণস্থিতাং

কৃষ্টোৎকৃষ্টসুকৃষ্টকর্মদহনাং কামেশ্বরীং কামিনীম্ ।

কামাক্ষীং করুণারসার্দ্রহৃদয়াং কল্পান্তরস্থায়িনীং

শ্রীশৈলস্থলবাসিনীং ভগবতীং শ্রীমাতরং ভাবয়ে ||৮||

ভাবার্থ - যার স্তনদ্বয় কর্পূর, অগুরু ও কুঙ্কুমে লিপ্ত, যিনি কর্পূরবর্ণস্থিতা, কৃষ্ট ( বিপ্রকৃষ্ট সঞ্চিত ), উৎকৃষ্ট ( প্রারদ্ধ ) এবং সুকৃষ্ট ( সন্নিহিত ক্রিয়মাণ ) ত্রিবিধকর্ম্ম যার কৃপায় দগ্ধ হয়ে যায়, যিনি কামেশ্বরী এবং কামিনীশক্তি, যিনি কামাক্ষী, যার হৃদয় করুণারসে আর্দ্র, কল্পান্তরেও যার স্থিতি অব্যাহত, সেই শ্রীশৈলস্থলবাসিনী ভগবতী শ্রীমাতাকে ভাবনা করি ||৮||

গায়ত্রীং গরুড়ধ্বজাং গগনগাং গান্ধর্বগানপ্রিয়াং

গম্ভীরাং গজগামিনীং গিরিসুতাং গন্ধাক্ষতালঙ্কৃতাম্ ।

গঙ্গাগৌত্মগর্গসন্নুতপদাং গাং গৌতমীং গোমতীং

শ্রীশৈলস্থলবাসিনীং ভগবতীং শ্রীমাতরং ভাবয়ে ||৯||

ভাবার্থ - যিনি গায়ত্রীস্বরূপা ( ব্রাহ্মীশক্তি ), গরুড়ধ্বজা ( বৈষ্ণবীশক্তি ), যিনি শূন্যচারিণী ও গন্ধর্বকৃত গানে প্রীতিমতী, যার মূর্তি গম্ভীর, গতি গজেন্দ্রের ন্যায়, যিনি পর্ব্বতরাজের কন্যা ( শৈবীশক্তি ) ও চন্দনাক্ষতে বিমণ্ডিতা, গঙ্গা, গৌতম ও গর্গ যার চরণ বন্দনা করেন এবং যিনি বসুমতী, গােদাবরী ও গােমতীরূপিণী, আমি সেই শ্রীশৈলস্থলবাসিনী ভগবতী শ্রীমাতাকে ভাবনা করি ||৯||

|| ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্যস্য শ্রীমচ্ছঙ্কর ভগবতঃ কৃতৌ উমামহেশ্বর ও শ্রীশৈলভ্রমরাম্বাস্তুতি সম্পূর্ণম্ ||

ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্য শ্রীগোবিন্দ ভগবৎ পূজ্যপাদ শিষ্য শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য বিরচিত উমামহেশ্বর ও শ্রীশৈলভ্রমরাম্বাস্তুতি সমাপ্ত।

Thursday, 23 June 2022

ব্রহ্মের স্বরূপলক্ষণ ও তটস্থলক্ষণ কি?



বস্তুর স্বরূপই বস্তুর স্বরূপলক্ষণ, যা বস্তুর স্বরূপ হয়ে অন্য বস্তু হতে সেই বস্তুকে ভিন্নভাবে বোধ করায়, তাই স্বরূপলক্ষণ। যেমন— "সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম", ইহা ব্রহ্মের স্বরূপলক্ষণ; কারণ সত্যাদি পদার্থ ব্রহ্মের স্বরূপ হয়ে অন্য বস্তু হতে ব্রহ্মকে ভিন্নভাবে বোধ করায়।

আবার লক্ষ্যবস্তু যতকাল থাকে, ততকাল তার সাথে না থেকে যা লক্ষ্যবস্তুকে অন্য বস্তু হতে ভিন্নভাবে বোধ করায়, তাই তটস্থলক্ষণ। যেমন— পারমার্থিক দৃষ্টিতে জগৎ মিথ্যা হওয়ায় সেই কল্পিত জগতের কর্তৃত্ব ব্রহ্মে পরমার্থতঃ না থাকলেও, ব্যবহারিক দৃষ্টিতে জগতের জন্মাদির কারণ হওয়া-রূপ লক্ষণটি অন্য বস্তু হতে ভিন্নভাবে ব্রহ্মকে বোধ করায় বলে ইহা ব্রহ্মের তটস্থলক্ষণ।

Saturday, 11 June 2022

আর্যসমাজের দয়ানন্দ সরস্বতী প্রচারিত ভ্রান্তমত ত্রৈতবাদ খণ্ডনঃ- (পর্ব-০২)

 


বিগতপর্বেই বলিয়াছি এই অপ্রামাণিক ভ্রান্ত মতবাদ খণ্ডনে আমার বিন্দুমাত্র রুচিও নাই, কিন্তু বর্তমানে মাত্রাতিরিক্ত হারে কিছু অর্বাচীন সংগঠন শঙ্করাদি আচার্যের নিন্দা ও বশিষ্ঠ-ব্যাসাদি গুরুপরম্পরার সনাতন অদ্বৈতবাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করিয়াছে, তাই এই দার্শনিক খণ্ডনগুলি ধারাবাহিকভাবে পর্ব আকারে লিখছি। অদ্য আলোচ্য বিষয় "ঈশ্বর সাকার হইতে পারে না ও অবতীর্ণ হইতে পারে না" এই শ্রুতি ও স্মৃতি বিরুদ্ধ মতের নিরাকরণ।

পূর্বপক্ষ—ঈশ্বর নিরাকার। যাহা সাকার অর্থাৎ শরীর বিশিষ্ট তাহা ঈশ্বর নহে।

সিদ্ধান্ত—পারমার্থিক দৃষ্টিতে তৎপদের লক্ষ্য নিত্যশুদ্ধবুদ্ধমুক্তস্বরূপ জ্ঞেয় নির্গুণ রূপবিহীন ব্রহ্ম সিদ্ধ হন, কিন্তু ব্যবহারিক দৃষ্টিতে তিনি মায়া নামক স্বীয় শক্তিযোগে ক্রমমুক্তি ও উপাসনার জন্য উপাধিরূপ নিমিত্তবশত তৎপদের বাচ্য সগুণ সর্বজ্ঞ সর্বশক্তিমান এবং সাকারূপেও অঙ্গীকৃত হন। ব্রহ্মের সাকারতা একেবারে অস্বীকার করা যায় না।

শঙ্কা—কেন ঈশ্বরের সাকারতা একেবারে অস্বীকার করা যায় না?

উত্তর—যেহেতু প্রত্যেক বিদ্যাতে ব্রহ্মের বিভিন্ন আকারসকল উপদিষ্ট হইতেছে, যথাঃ- 'চারিটী চরণযুক্ত ব্রহ্ম'-(ছান্দোগ্য উপনিষদ্-৩।১৮।২), 'ষোলটী কলাযুক্ত ব্রহ্ম'-(ছান্দোগ্য উপনিষদ্-৪।৫।২), 'বামনী প্রভৃতি লক্ষণযুক্ত ব্রহ্ম'-(ছান্দোগ্য উপনিষদ্-৪।১৫।৩), 'বৈশ্বানরশব্দের দ্বারা বর্ণিত ত্রৈলোক্যশরীর ব্রহ্ম'-(ছান্দোগ্য উপনিষদ্-৫।১৮।২) ইত্যাদি এই জাতীয় শ্রুতি রহিয়াছে সেইহতু ব্রহ্মের সবিশেষতাও অঙ্গীকৃত হইতেছে। কিন্তু শঙ্কা হইল, আমাদের সিদ্ধান্ত তো ব্রহ্মের সবিশেষ ও নির্বিশেষ উভয়াত্মকতা সম্ভব নহে, ব্রহ্ম নির্বিশেষই। এই পূর্বসমাধানও বিরুদ্ধ নহে, যেহেতু ব্রহ্মের আকারভেদ উপাধিকৃত। আর শাস্ত্র প্রত্যেকটী উপাধিভেদে ব্রহ্মের অভেদতাই অর্থাৎ অভিন্নতাই শ্রবণ করাইতেছেন, যথা-

‘যশ্চাযমস্যাং পৃথিব্যাং তেজোময়োমৃতময়ঃ পুরুষো যশ্চাযমধ্যাত্মং শারীরস্তেজোমযোমৃতময়ঃ পুরুষোযমেব স যোয়মাত্মা'-(বৃহদারণ্যক উপনিষদ্-২।৫।১)

'এই পৃথিবীতে যিনি এই তেজোময় অমৃতময় পুরুষ এবং যিনি শরীরসম্বন্ধী ও শরীরে অবস্থিত তেজোময় অমৃতময় পুরুষ, ইনিই তিনি, যিনি এই আত্মা' ইত্যাদি।

পূর্বপক্ষ— ঈশ্বর সাকার হইলে তিনি পরিমিত শক্তিসম্পন্ন, দেশ-কাল-বস্তুসমূহে পরিচ্ছিন্ন এবং ক্ষুধা-তৃষ্ণা-ছেদন-ভেদন, শীতোষ্ণ ও জ্বরপীড়াদিযুক্ত হইবেন। অর্থাৎ স্বরূপের নাশ হইবে।

সংশয়—কিপ্রকারে স্বরূপের নাশ ব্যতিরেকেই এক ব্রহ্মে অনেকপ্রকার আকারবিশিষ্ট সৃষ্টি হইবে?

সিদ্ধান্তীর উত্তর— যেহেতু-'ন তত্র রথা ন রথযোগা ন পন্থানো ভবন্ত্যথ রথান্রথযোগান্পথঃ সৃজতে'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪/৩/১০)

অর্থাৎ "সেখানে (—স্বপ্নে) রথসকল থাকে না, অশ্বসকল থাকে না এবং পথসকল থাকে না অথচ তিনি রথসকল অশ্বসকল ও পথসকল সৃষ্টি করেন", ইত্যাদি শ্রুতিবাক্যের দ্বারা স্বপ্নদর্শী এক আত্মাতেও স্বরূপের নাশ ব্যতিরেকেই অনেকপ্রকার আকারবিশিষ্ট সৃষ্টি পঠিত হইতেছে। আর লোকমধ্যেও দেবতা প্রভৃতিতে এবং মায়াবী প্রভৃতিতে স্বরূপের নাশ ব্যতিরেকেই হস্তী ও অশ্ব প্রভৃতি বিচিত্র সৃষ্টিসকল পরিদৃষ্ট হইতেছে। এইপ্রকারে এক ব্রহ্মেও স্বরূপের নাশ ব্যতিরেকেই অনেকপ্রকার আকারবিশিষ্ট সৃষ্টি হইবে।

আর তাছাড়া বিভিন্ন প্রকার অর্থ প্রতিপাদক পিতা, পুত্র, ভ্রাতা, জামাতা ইত্যাদি শব্দসকল এক দেবদত্তকে বুঝাইলেও যেমন বিরোধ হয় না, তদ্রূপ যথার্থ বচনরূপ লৌকিক অর্থেই নিরূঢ় সত্যাদিশব্দ অখণ্ডকেই লক্ষ্য করে অর্থাৎ লক্ষণাবৃত্তিদ্বারা অখণ্ড ব্রহ্মকেই সমর্পণ করে।

ইঁহার যে অপারমার্থিক সবিশেষস্বরূপতা, তাহাকে অভিপ্রায় করিয়া মোক্ষশাস্ত্রসকলে 'জলমধ্যগত সূর্য্যাদি প্রতিবিম্বের ন্যায়' এই উপমা পরিগৃহীত হইতেছে,যথা-

'যেমন জ্যোতিঃস্বরূপ এই সূর্য্য এক হইলেও বিভিন্ন জলকে অনুগমনকরতঃ বিভিন্ন পাত্রস্থ জলে প্রতিবিম্বিত হইয়া বহুপ্রকার হইয়া থাকেন, এইপ্রকারে এই স্বয়ংপ্রকাশ দেব জন্মরহিত আত্মা, মায়ারূপ উপাধির দ্বারা ক্ষেত্রসকলে অর্থাৎ মায়ার পরিণামভূত দেহেন্দ্রিয়াদি সংঘাত সকলে অনুগমন করতঃ প্রতিবিম্বিত হইয়া বিভিন্নরূপে কৃত বা প্রতিভাত হন।'-(ব্রহ্মবিন্দু উপনিষদ্-১২)

'যেহেতু প্রাণিগণের এই একই আত্মা বিভিন্ন প্রাণীতে বিশেষভাবে অবস্থিত আছেন, তিনি জলমধ্যস্থ চন্দ্রের ন্যায় একরূপে ও বহুরূপে পরিদৃষ্ট হন।'-(ঐ) ইত্যাদি এই সকল স্থলেও 'তাঁহার ঔপাধিক সবিশেষতা প্রদর্শিত হইয়াছে।'

পূর্বপক্ষ— নিত্য ঈশ্বর অবতীর্ণ হইতে পারেন না, অর্থাৎ তাহার জন্ম সম্ভব নহে।

সিদ্ধান্ত— "ধর্ম্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে"-(ভগবদ্গীতা-৪/৮) ধর্ম্মের সম্যক্ স্থাপনের জন্য প্রতিযুগে আমি সম্ভাবিত হই অর্থাৎ অবতীর্ণ হই।

সংশয়— নিত্য ঈশ্বরের জন্ম কিরূপে সম্ভব?

সিদ্ধান্তীর উত্তর— শ্রীভগবান বলিতেছেন-"অজোহপি সন্নব্যয়াত্মা ভূতানামীশ্বরোহপি সন্। প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া"-(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৪/৬)

অর্থাৎ আমি অজ অর্থাৎ জন্মরহিত হইয়াও; অব্যয়াত্মা অর্থাৎ যাঁহার জ্ঞানশক্তির ক্ষয় নাই এইরূপ অক্ষীণ জ্ঞানশক্তি স্বভাব হইয়াও; ব্রহ্মাদি থেকে তৃণ পর্য্যন্ত সর্ব্বভূতের ঈশ্বর হইয়াও; আমার যে স্বপ্রকৃতি, অর্থাৎ ত্রিগুণাত্মিকা বৈষ্ণবী মায়া, সমস্ত জগৎ যাহার বশে বর্তমান, যদ্দ্বারা মোহিত হইয়া লোকে নিজের আত্মা বাসুদেবকে জানিতে পারে না, সেই নিজ প্রকৃতিতে অধিষ্ঠিত হইয়া অর্থাৎ তাঁহাকে বশীভূত করিয়া আমি সম্ভাবিত হই অর্থাৎ আত্মমায়ার দ্বারা যেন লোকবৎ দেহধারণ করিয়া জন্মগ্রহণ করি; কিন্তু পরমার্থতঃ নহে।

ঋণ- ভগবান শঙ্করাচার্যকৃত শারীরকমীমাংসা ও শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ভাষ্য ও শ্রীভারতী তীর্থকৃত বৈয়াসিক ন্যায়মালা।

Thursday, 9 June 2022

স্বপ্নসাক্ষী ও মায়াবীর দৃষ্টান্তাবলম্বনে ব্রহ্মের বিবর্ত্তোপাদানতা প্রতিপাদনঃ-

 


ভগবান সূত্রকার স্বপ্নের প্রকাশক সাক্ষিচৈতন্যকে দৃষ্টান্তরূপে গ্রহণদ্বারা ব্রহ্মের বিবর্ত্তোপাদানতাকে দৃঢ়করতঃ অদ্বৈতবাদকে পরিস্ফুট করিতেছেন-

আত্মনি চেব বিচিত্রাশ্চ হি৷৷- (ব্রহ্মসূত্র-২.১.১৮)

ভগবান শঙ্করাচার্য ভাষ্যে বলিতেছেন—কিপ্রকারে স্বরূপের নাশ ব্যতিরেকেই এক ব্রহ্মে অনেকপ্রকার আকারবিশিষ্ট সৃষ্টি হইবে?

যেহেতু-'ন তত্র রথা ন রথযোগা ন পন্থানো ভবন্ত্যথ রথান্রথযোগান্পথঃ সৃজতে'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪/৩/১০)

অর্থাৎ "সেখানে (—স্বপ্নে) রথসকল থাকে না, অশ্বসকল থাকে না এবং পথসকল থাকে না অথচ তিনি রথসকল অশ্বসকল ও পথসকল সৃষ্টি করেন", ইত্যাদি শ্রুতিবাক্যের দ্বারা স্বপ্নদর্শী এক আত্মাতেও স্বরূপের নাশ ব্যতিরেকেই অনেকপ্রকার আকারবিশিষ্ট সৃষ্টি পঠিত হইতেছে। আর লোকমধ্যেও দেবতা প্রভৃতিতে এবং মায়াবী প্রভৃতিতে স্বরূপের নাশ ব্যতিরেকেই হস্তী ও অশ্ব প্রভৃতি বিচিত্র সৃষ্টিসকল পরিদৃষ্ট হইতেছে। এইপ্রকারে এক ব্রহ্মেও স্বরূপের নাশ ব্যতিরেকেই অনেকপ্রকার আকারবিশিষ্ট সৃষ্টি হইবে।

 

Monday, 6 June 2022

"উপনিষৎ বেদ নহে", এই ভ্রান্তমতের খণ্ডনঃ—

 


পূর্বপক্ষঃ- শুধুমাত্র সংহিতা ভাগই বেদ, উপনিষৎ বেদ নহে।

সিদ্ধান্তঃ- বেদের গুহ্যভাগ উপনিষৎ।

শঙ্কা- কি হেতু?

উত্তর- 'তদ্ বেদগুহ্যোপনিষৎসু গূঢ়ং', স্বয়ং এই শ্রুতিই বলিতেছেন বেদের গুহ্যভাগ উপনিষৎ। কৃষ্ণযজুর্বেদীয় শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎ এর পঞ্চম অধ্যায়ে বর্ণিত আছে-

তদ্ বেদগুহ্যোপনিষৎসু গূঢ়ং

তদ্ ব্রহ্মা বেদতে ব্রহ্মযোনিম্ ।-(শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎ-৫।৬)

অর্থাৎ বেদগুহ্য অর্থ উপনিষৎ। যে আত্মতত্ত্বের প্রস্তাব চলিতেছে, তাহা বেদের গুহ্যভাগ উপনিষৎসমূহে গূঢ় অর্থাৎ প্রচ্ছন্নভাবে নিহিত আছে। বেদই এইসকল বিষয়ে একমাত্র প্রমাণ এইকারণে উহা ব্রহ্মযোনি। ব্রহ্মা-হিরণ্যগর্ভই সেই পূর্ব্বপ্রস্তাবিত আত্মার স্বরূপ জানেন, অথবা হিরণ্যগর্ভ নামক ব্রহ্মের যোনি, কিংবা ব্রহ্ম অর্থ বেদ, তাহার যোনি-ব্রহ্মযোনি।

Sunday, 5 June 2022

আত্মাশ্রিতা মায়া তিন প্রকারে বিনাশ প্রাপ্ত হয়ঃ-

 


শ্রুতিতে এই বিষয়ে স্পষ্ট আলোচনা হইয়াছে। যথা—

"শাস্ত্রেণ ন স্যাৎ পরমার্থদৃষ্টিঃ, কার্য্যক্ষমং পশ্যতি চাপরোক্ষম্। প্রারব্ধনাশাৎ প্রতিভাসনাশঃ, এবং ত্রিধা নশ্যতি চাত্মমায়া।।"- (বরাহ উপনিষৎ-২/৬৯)

১. শাস্ত্রের দ্বারা অর্থাৎ বেদান্তশাস্ত্র অধ্যয়নজনিত ব্রহ্মাত্মবিষয়ক পরোক্ষ জ্ঞানের দ্বারা, মায়া ও তৎকার্য্য জগৎপ্রপঞ্চে পরমার্থ দৃষ্টি থাকে না। অর্থাৎ 'মায়া ও তৎকার্য্য জগৎ পরমার্থতঃ আছে' এইপ্রকার বুদ্ধি বিনষ্ট হয়।

২. আর অবিদ্যাধ্বংসী ব্রহ্মাত্মবিষয়ক অপরোক্ষকে জ্ঞানী কার্য্যক্ষমরূপে অর্থাৎ মায়া, তৎকার্য্য জগৎ ও বন্ধনের বাধকরূপে দর্শন করেন।

৩. প্রারব্ধের নাশ হইলে প্রতিভাস অর্থাৎ ব্রহ্মাত্মবিষয়ক অপরোক্ষ জ্ঞানের দ্বারা আবরণ ও বিক্ষেপশক্তিযুক্তা মায়ার নাশ হইলেও, প্রারব্ধ কর্ম্মরূপ প্রতিবন্ধকবশতঃ বিক্ষেপশক্তির অবিনষ্ট অংশবিশেষের বলে ব্রহ্মজ্ঞের দৃষ্টিতে 'দগ্ধ বস্ত্রের ন্যায়' যে মায়া ও তৎকার্য্য জগৎপ্রপঞ্চের প্রতীতি হয়, তাহা বিনষ্ট হয়।

এইরূপে আত্মাশ্রিতা মায়া তিন প্রকারে বিনাশ প্রাপ্ত হয়।

Friday, 3 June 2022

আর্যসমাজের দয়ানন্দ সরস্বতী প্রচারিত ভ্রান্তমত ত্রৈতবাদ খণ্ডনঃ- (পর্ব-০১)

অদ্য আলোচ্য বিষয়, দয়ানন্দ সরস্বতী প্রচারিত অপ্রামাণিক ত্রৈতবাদসম্মত সিদ্ধান্ত 'ঈশ্বর কেবলমাত্র নিমিত্তকারণ, উপাদানকারণ নহে', এই মতবাদ নিরাকরণ। এই ভ্রান্তমতের সমালোচনায় আমার খুব একটা রুচি নাই, তবে ইদানিং কিছু অর্বাচীন সংগঠন শঙ্করাদি আচার্যের নিন্দাপূর্বক শাশ্বত অদ্বৈতবাদ খণ্ডনের দুঃসাহস প্রদর্শন করিতেছেন, তাই আমি এই কর্ম্মে প্রবৃত্ত হইতেছি।

পূর্বপক্ষ—ব্রহ্ম কেবল নিমিত্তকারণ, আর ব্রহ্ম হইতে ভিন্ন প্রকৃতি উপাদানকারণ।

সিদ্ধান্ত—এইপ্রকার পূর্ব্বপক্ষ প্রাপ্ত হইলে আমরা বলিতেছি—ব্রহ্মকে প্রকৃতিরূপেও, অর্থাৎ উপাদানকারণরূপেও অঙ্গীকার করিতে হইবে এবং নিমিত্তকারণরূপেও 'অঙ্গীকার করিতে হইবে'। তিনি কেবল নিমিত্তকারণই নহেন।

শঙ্কা— কেন ঈশ্বরের কেবল নিমিত্তকারণমাত্রতা মান্য নহে?

সিদ্ধান্ত—এইহেতু অবৈদিক মতের দ্বারা বেদান্তসমন্বয়ে এইপ্রকার বিরোধ হয়ে পড়ে বলিয়া উত্তর কথিত হইতেছে—"পত্যুরসামঞ্জস্যাৎ" অর্থাৎ— পতির অর্থাৎ ঈশ্বরের প্রধান ও পুরুষের প্রেরকরূপে জগৎকারণতা (-জগতের নিমিত্তকারণতা) যুক্তিসঙ্গত নহে। তাহাতে হেতু কি? উত্তর— যেহেতু সামঞ্জস্য হয় না। আচ্ছা, অসামঞ্জস্যটী কি? হীন মধ্যম ও উত্তমভাবে (—যথাক্রমে কীটপতঙ্গাদি, মনুষ্য ও দেবতা প্রভৃতিরূপে) প্রাণীসকলের ভেদের বিধানকর্ত্তা (—উচ্চাবচ প্রাণীর সৃষ্টিকর্ত্তা) ঈশ্বরের অনুরাগ ও দ্বেষ প্রভৃতি দোষ হইয়া পড়ে বলিয়া আমাদিগের ন্যায় তাঁহার অনীশ্বরতা হইয়া পড়িবে। অর্থাৎ বৈষম্যাদি দোষ হইয়া পড়ে বলিয়া ব্রহ্মের কেবল নিমিত্তকারণমাত্রতা যুক্তিসঙ্গত নহে।

সংশয়— আচ্ছা, আমরা তাহা হইলে এই দোষ কিপ্রকারে পরিহার করিয়াছি?

সিদ্ধান্ত— যেহেতু 'ঈশ্বর প্রাণিগণের কর্ম্মকে অপেক্ষা করেন', ইহাই আমরা বলিতেছি। সেই অঙ্গীকারের প্রতি বেদই আমাদের প্রমাণ। আর যদি তোমরাও বেদকে অঙ্গীকার কর, তাহা হইলে বেদপ্রতিপাদিত ঈশ্বর স্বীকৃত হইলে "বহু স্যাং প্রজায়েয়"-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬/২/৩) "বহু হইব, প্রকৃষ্ট রূপে উৎপন্ন হইব", এই সামবেদীয় ছান্দোগ্য শ্রুতির বিরোধবশতঃ ঈশ্বরের মাত্র নিমিত্তকারণতা তোমাকেও পরিত্যাগ করিতে হইবে।

শঙ্কা— 'ব্রহ্মই অভিন্ননিমিত্তোপাদান কারণ' তাহাতে হেতু কি?

সিদ্ধান্ত— তদুত্তরে বলিতেছেন-'প্রতিজ্ঞাদৃষ্টান্তানুপরোধাতৎ' অর্থাৎ "যেহেতু প্রতিজ্ঞা ও দৃষ্টান্তের সঙ্কোচ হয় না"। পরিষ্কারভাবে যদি বলি, এইপ্রকারে ব্রহ্ম উপাদানকারণ ও নিমিত্তকারণ উভয়ই হইলে শ্রুতিতে বর্ণিত প্রতিজ্ঞা ও দৃষ্টান্ত বাধিত হয় না। প্রতিজ্ঞা এইপ্রকার—

'উত তমাদেশমপ্রাক্ষ্যো যেনাশ্রুতং শ্রুতং ভবত্যমতং মতমবিজ্ঞাতং বিজ্ঞাতম্'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬/১/২) "তুমি কি সেই আদেশটী জিজ্ঞাসা করিয়াছিলে, যাহার দ্বারা অশ্রুত বিষয় বিজ্ঞাত হয়", ইত্যাদি। উক্ত শ্রুতিবাক্যে বিজ্ঞাত একটীর দ্বারা, অবিজ্ঞাত হইলেও অন্য সমস্ত বিজ্ঞাত হয়, এই প্রকার অর্থ প্রতিভাত হইতেছে। আর সেই সর্ব্ববিজ্ঞান উপাদানকারণবিষয়ক জ্ঞান হইলে হয় সম্ভব, যেহেতু কার্য্যবস্তু উপাদানকারণ হইতে অভিন্ন।

সংশয়—কিন্তু নিমিত্তকারণবিষয়ক জ্ঞান হইতে সর্ব্ববিজ্ঞান কেন হয় না?

সিদ্ধান্ত— তদুত্তরে বলিতেছেন—কিন্তু নিমিত্তকারণ হইতে অভিন্নতা কার্য্যবস্তুর নাই, যেহেতু তক্ষা (—সুত্রধর) হইতে প্রাসাদের ভিন্নতা লোকমধ্যে পরিদৃষ্ট হয়। আবার, 'যথা সোম্যৈকেন মৃৎপিণ্ডেন সর্বং মৃন্মযং বিজ্ঞাতং স্যাদ্বাচারম্ভণং বিকারো নামধেযং মৃত্তিকেত্যেব সত্যম্'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬/১/৪) অর্থাৎ "হে সৌম্য, যেমন একটী মৃৎপিন্ডের দ্বারা সমস্ত মৃন্ময় বস্তু বিজ্ঞাত হয়, কারণ যাহা বিকার (—কার্য্যবস্তু), তাহা বাগবলম্বনে অবস্থিত নামমাত্র, কেবল মৃত্তিকাই সত্য", ইত্যাদি দৃষ্টান্তও উপাদানকারণবিষয়েই পঠিত হইতেছে।

এইরূপে, 'একেন লোহমণিনা সর্বং লোহমযং বিজ্ঞাতং স্যাৎ' 'একেন নখনিকৃন্তনেন সর্বং কার্ষ্ণাযসং বিজ্ঞাতং স্যাৎ'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬/১/৫,৬) "একটী লোহমণির (—সুবর্ণপিন্ডের) দ্বারা সুবর্ণময় সমস্ত বস্তু বিজ্ঞাত হয়" এবং "একটী নখকৃন্তনের (—নরুণের অর্থাৎ লৌহপিন্ডের) দ্বারা লৌহের পরিণামভূত সমস্ত বস্তু বিজ্ঞাত হয়" ইত্যাদি দৃষ্টান্তসকলও উপাদানকারণ বিষয়েই পঠিত হইতেছে।

এইরূপে অন্যত্রও (—শ্রুতির অন্য শাখাতেও) ''কস্মিন্নু ভগবো বিজ্ঞাতে সর্বমিদং বিজ্ঞাতং ভবতি'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-১/১/৩) ইতি প্রতিজ্ঞা; 'যথা পৃথিব্যামোষধযঃ সংভবন্তি'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-১/১/৭) ইতি দৃষ্টান্তঃ "হে ভগবন, কোন বস্তুটী বিজ্ঞাত হইলে এই সমস্ত বিজ্ঞাত হয়", এই প্রকার প্রতিজ্ঞা এবং "যেমন পৃথিবী হইতে ধান্য যবাদি ওষধিসকল উৎপন্ন হয়", এইপ্রকার দৃষ্টান্ত 'উপাদানকারণবিষয়েই পঠিত হইতেছে।

এইরূপে অপর শাখাতে 'ইদং সর্বং বিদিতম্' ইতি প্রতিজ্ঞা; 'স যথা দুন্দুভের্হন্যমানস্য ন বাহ্যাঞ্শব্দাঞ্শক্নুযাদ্গ্রহণায দুন্দুভেস্তু গ্রহণেন দুন্দুভ্যাঘাতস্য বা শব্দো গৃহীতঃ'-(বৃহদারণ্যক উপনিষৎ-৪/৫/৬,৮) ইতি দৃষ্টান্তঃ' "প্রিয়ে, আত্মা দৃষ্ট শ্রুত বিচারিত ও বিজ্ঞাত হইলে এই সমস্ত বিজ্ঞাত হয়" এইপ্রকার প্রতিজ্ঞা এবং "তাহা (—উক্ত বিষয়ে দৃষ্টান্ত) যমন দুন্দুভি (—দামামা) বাদিত হইতে থাকিলে বাহ্য শব্দসকলকে (—দুন্দুভির বিশেষ শব্দসকলকে) গ্রহণ করিতে পারা যায় না, কিন্তু দুন্দুভির গ্রহণের দ্বারা অথবা দুন্দুভির আঘাতের গ্রহণের দ্বারা শব্দ গৃহীত হয়", এইপ্রকার দৃষ্টান্ত 'উপাদানকারণ বিষয়েই পঠিত হইতেছে'।

এইরূপে প্রত্যেক উপনিষদে প্রতিজ্ঞা ও দৃষ্টান্তকে যথাসম্ভব ব্রহ্মের উপাদানকারণতার সাধনরূপে অবগত হইতে হইবে। এইরূপে প্রতিজ্ঞা ও দৃষ্টান্তের সামঞ্জস্যরূপ লিঙ্গপ্রমাণ বলে ব্রহ্মের উপাদানকারণতা প্রতিপাদিত হইল। এক্ষণে পঞ্চমীবিভক্তিরূপ শ্রুতিপ্রমাণবলে পুনরায় তাহাই প্রতিপাদন করিতেছি—যতো বা ইমানি ভূতানি জাযন্তে'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-৩/১) "যাহা হইতে এই প্রাণিগণ জন্মগ্রহণ করে", ইত্যাদি এইস্থলে "যতঃ" এই পঞ্চমী বিভক্তিটী, "জনিকর্ত্তুঃ প্রকৃতিঃ"(পাণিনী সূত্র-১.৪.৩০) 'জায়মান কার্য্যের যাহা প্রকৃতি—উপাদান, তাহা অপাদান সংজ্ঞা লাভ করে', ব্যাকরণস্মৃতির এই বিশেষ সূত্রবশতঃ প্রকৃতিলক্ষণ (—উপাদানকারণস্বরূপ) অপাদানেই প্রযুক্ত হইয়াছে, বুঝিতে হইবে।

সংশয়—কিন্তু কোন হেতুবশতঃ আত্মার নিমিত্তকারণতা ও উপাদানকারণতা সিদ্ধ হয়?

সিদ্ধান্ত— 'অভিধ্যোপদেশাচ্চ' অভিধ্যানের অর্থাৎ ভাবী সৃষ্টিবিষয়ক সঙ্কল্পের উপদেশও ব্রহ্মের নিমিত্তকারণতা ও উপাদানকারণতা জ্ঞাপন করিতেছে, যথা-

'সোকাময়ত বহু স্যাং প্রজায়েয়'-(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ ২।৬) অর্থাৎ তিনি কামনা করিয়াছিলেন, "আমি বহু হইব, প্রকৃষ্টরূপে উৎপন্ন হইব", ইত্যাদি শ্রুতি। এবং 'তদৈক্ষত বহু স্যাং প্রজায়েয়'-(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-৬/২/৩) অর্থাৎ তাহা (-সেই সৎপদার্থ) ঈক্ষণ করিয়াছিলেন,"আমি বহু হইব, প্রকৃষ্টরূপে উৎপন্ন হইব", ইত্যাদি শ্রুতি। সেইস্থলে অভিধ্যানপূর্ব্বক স্বাধীনভাবে প্রবৃত্তি বর্ণিত হওয়ায় ব্রহ্ম নিমিত্তকারণ, ইহা অবগত হওয়া যাইতেছে। "বহু হইব" এইপ্রকার যে বহু হইবার সঙ্কল্প, তাহা প্রত্যাগাত্মাকে বিষয় করে বলিয়া ব্রহ্ম উপাদানকারণ, ইহা অবগত হওয়া যাইতেছে। 

আর এই হেতুবশতঃও ব্রহ্ম জগতের উপাদান কারণ, যেহেতু সাক্ষাৎভাবে ব্রহ্মকেই কারণরূপে গ্রহণ করিয়া উৎপত্তি ও প্রলয়, এই দুইটী পঠিত হইতেছে, যথা- 'সর্বাণি হ বা ইমানি ভূতানি আকাশাৎ এব সমুত্পদ্যন্তে৷ আকাশং প্রত্যস্তং যন্তি' -(ছান্দোগ্য উপনিষৎ-১।৯।১) অর্থাৎ "স্থাবরজঙ্গমাত্মক এই সমস্ত ভূতবর্গ আকাশ হইতেই সমুৎপন্ন হয় ও আকাশে অস্তগমন করে।" ইত্যাদি শ্রুতি।

যাহা হইতে যাহা উৎপন্ন হয় এবং যাহাতে প্রলীন হয়, তাহা তাহার উপাদান, ইহা প্রসিদ্ধ, যেমন পৃথিবী ধান্য ও যবাদির উপাদান। উপরোক্ত 'আকাশাৎ এব' শ্রুতিবাক্যগত 'এব' কারণটীর দ্বারা যে অন্য উপাদানের অগ্রহণ সূচিত হয়, তাহাকে ভগবান সূত্রকার 'সাক্ষাৎ' এই পদটীর দ্বারা প্রদর্শন করিতছেন। আর কার্য্যবস্তুর যে প্রলয়, তাহা উপাদান হইতে অন্যস্থলে পরিদৃষ্ট হয় না। সুতরাং আকাশশব্দিত ব্রহ্মবস্তুই জগতের উপাদান, ইহাই নির্ণীত হয়।

সংশয়—আচ্ছা এখন প্রশ্ন হইল, যিনি পূর্ব্বসিদ্ধ (পূর্ব্ব হইতে বিদ্যমান) কর্ত্তৃরূপে অবস্থিত সদ্বস্তু, তাঁহার ক্রিয়মানতা (-জগৎরূপে উৎপন্ন হওয়া) কি প্রকারে সম্পাদন করা যায়?

সিদ্ধান্ত— তদুত্তরে আমরা বলিব-যেহেতু পরিণাম হয়। আত্মা পূর্ব্বসিদ্ধ হইলেও বিশেষ বিকারাত্মকরূপে (মিথ্যা কার্য্যরূপে) নিজেকে পরিণত (বিবর্ত্তিত) করিয়াছিলেন। ঠিক যেমন মৃত্তিকা প্রভৃতি উপাদানকারণ সকলে (ঘটাদি) কার্য্যরূপে পরিণাম উপলব্ধ হয়। 'পরিণামাৎ' তাঁহার অর্থ এই -আর এই হেতুবশতঃ ব্রহ্ম জগতের উপাদান কারণ, যেহেতু-

'সচ্চ ত্যচ্চাভবন্নিরুক্তং চানিরুক্তং চ' -(তৈত্তিরীয় উপনিষৎ-২।৬) অর্থাৎ "তিনি সৎ(মূর্ত্ত) এবং ত্যৎ (অমূর্ত্ত) হইলেন। মূর্ত্তামূর্ত্ত অর্থাৎ আত্মাতে স্থিত অনভিব্যক্তি নামরূপ, অন্তঃপ্রবিষ্ট আত্মার নিমিত্ত মূর্ত্তামূর্ত্ত শব্দসংজ্ঞায় অভিব্যক্ত হইল। তিনি নিরুক্ত (পরিচ্ছিন্ন) ও অনিরূক্ত (অপরিচ্ছিন্ন) হইলেন। নিরূক্ত হইতেছে সজাতীয় বিজাতীয় পদার্থসকল হইতে পৃথক্ করিয়া স্থানকালবিশিষ্টরূপে অর্থাৎ 'ইহা তাহা' এই রূপে যাহা কথিত আর অনিরুক্ত হইতছে তাহার বিপরীত।" ইত্যাদি এইরূপ সামানাধিকরণ্যের দ্বারা অর্থাৎ সমান বিভক্তিযুক্ত পদপ্রয়োগের দ্বারা ব্রহ্মেরই বিকারাত্মকরূপে (কার্য্যবস্তুরূপে) পরিণাম (বিবর্ত্ত) শ্রুতিতে পঠিত হইতেছে।

আর এইহেতুবশতঃও ব্রহ্ম জগতের উপাদান কারণ, যেহেতু উপনিষৎ সকলে ব্রহ্ম 'যোনি', এইরূপেও পঠিত হইতেছেন, যথা- 'কর্তারমীশং পুরুষং ব্রহ্মযোনিম্'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-৩.১.৩) অর্থাৎ 'জগতের কর্ত্তা ঈশ্বর পুরুষ ব্রহ্মযোনি অর্থাৎ যিনি ব্রহ্ম আবার সর্ব্বকারণও।'

তদব্যয়ং যদ্ভূতযোনিং পরিপশ্যন্তি ধীরাঃ৷৷-(মুণ্ডক উপনিষৎ-১.১.৬) অর্থাৎ 'এইরূপ লক্ষণবিশিষ্ট ভূতযোনি অর্থাৎ প্রাণিগণের সৃষ্টির কারণস্বরূপ, স্থাবর-জঙ্গমের কারণস্বরূপ পৃথিবীর ন্যায় যাঁহাকে তথা সকলের স্বরূপভূত সেই অব্যয়কে বিবেকিগণ সর্বত্র উপলব্ধি করেন।'ইত্যাদি শ্রুতি।

আর 'যোনি' শব্দটী প্রকৃতির (-উপাদানকারণের) বাচক, ইহা লোকমধ্যে অবগত হওয়া যায়, যথা-'পৃথিবী ওষধি ও বনস্পতিসকলের যোনি' ইত্যাদি। স্ত্রী যোনিও স্বীয় অবয়বের (-শোনিতের) দ্বারা হয় গর্ভের প্রতি উপাদানকারণ। কোন কোন স্থলে 'যোনি' শব্দ স্থানের বাচকরূপেও পরিদৃষ্ট হয়, যথা-

'যোনিষ্ট ইন্দ্র নিষদে অকারি'-(ঋগ্বেদ সংহিতা ১।১০৪।১) অর্থাৎ 'হে ইন্দ্র!, তোমার উপবেশনের জন্য আমি যোনি (-স্থান) নির্ম্মাণ করিয়াছি।'

কিন্তু এখানে 'যথোর্ণনাভিঃ সৃজতে গৃহ্ণতে চ'-(মুণ্ডক উপনিষৎ-১.১.৭) 'মাকড়সা কোন অন্যকারণের অপেক্ষা না করিয়া নিজেই সৃষ্টি করে অর্থাৎ নিজ শরীর হইতে অভিন্ন তন্তুরাশিকে বাহিরে প্রসারিত করে, আবার সেই সকলকে গ্রহণও করে অর্থাৎ নিজের সহিত একীভূত করিয়া ফেলে।' ইত্যাদি এইজাতীয় বাক্যশেষবশতঃ যোনিশব্দটীর উপাদানকারণতারূপ অর্থ পরিগৃহীত হইতেছে। এইপ্রকারে ব্রহ্মের উপাদানকারণতা প্রকৃষ্টরূপে সিদ্ধ হইল।

এইরূপ মাকড়সার শরীরের তন্তুরূপে পরিণামের ন্যায় ঈশ্বরের উপাধিভূতা মায়ার জগদ্রূপে পরিণামে ঈশ্বরের উপাদানকারণতাও সিদ্ধ হয়। এইরূপে মায়া-শবলিত ঈশ্বররূপ ব্রহ্মই হন জগতের অভিন্ননিমিত্তোপাদান কারণ।.......ইতি।

ঋণ- ভগবান শঙ্করাচার্যকৃত শারীরকমীমাংসা ভাষ্য ও শ্রীভারতী তীর্থকৃত বৈয়াসিক ন্যায়মালা।

Tuesday, 31 May 2022

শঙ্করাচার্যের মত মায়াবাদ ও প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধশাস্ত্র, বিরুদ্ধবাদীদের এই দাবির খণ্ডনঃ-

 


পূর্বপক্ষঃ- পদ্মপুরাণে উত্তরখণ্ডে ৯৩ অধ্যায়ে রুদ্র স্বয়ং দেবীকে বলিতেছেন-রুদ্র উবাচ--শৃণু দেবী প্রবক্ষ্যামি তামসানি যথাক্রমম্।.......নিরীশ্বরেণ বাদেন কৃতং শাস্ত্রং মহত্তরম।।

এইস্থলে দেখা যায়,বলা হইতেছে-

(১) জ্ঞানিগণের পাতিত্যকারক যে সকল তামসশাস্ত্র, তাহারা শৈব, পাশুপত, বৈশেষিক, ন্যায়, সাংখ্য, চার্বাক, বৌদ্ধ ও জৈনশাস্ত্র।

(২) মায়াবাদটি অসৎশাস্ত্র ও প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধশাস্ত্র।

(৩) ইহা ব্রাহ্মণরূপী রুদ্রকর্তৃক কলিতে কথিত।

(৪) ইহাতে শ্রুতিবাক্যের অন্যথা করা হইয়াছে, কর্মের ত্যাগ উপদিষ্ট হইয়াছে, জীব ও ঈশ্বরের ঐক্য উক্ত হইয়াছে, ব্রহ্মকে নির্গুণ বলা হইয়াছে ইত্যাদি।

উত্তরপক্ষঃ- ভগবান শঙ্করের মত মায়াবাদ নহে-কিন্তু ব্রহ্মবাদ বা ঔপনিষদবাদ। এস্থলে ব্রাহ্মণরূপী রুদ্র মায়াবাদপ্রচারকর্তা বলিয়া নির্দেশ থাকায় বৈষ্ণবগণ আচার্য শঙ্কর ও তাঁহার মতবাদ বলিয়া বুঝিয়া থাকেন। কিন্তু শঙ্করসম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিগণ বলেন- ইহাতে আচার্য শঙ্করের ব্রহ্মবাদ লক্ষ্য করা হয় নাই।কারণ, শঙ্করের মতবাদটি মায়াবাদই নহে; উহা ব্রহ্মবাদ। যেহেতু শঙ্কর নিজ বেদান্তসূত্রভাষ্যে (২/২/৯) সূত্রের ভাষ্যে নিজেই বলিয়াছেন- 'জ্ঞানশক্তিও সাংখ্য অনুমান করিলে প্রতিবাদকার্য হইতে তিনি নিবৃত্ত হইলেন,আর তখন এক চেতনই অনেকস্বরুপ জগৎ প্রপঞ্চের উপাদান হইল এইরুপে ব্রহ্মবাদই স্বীকার করা হইল।' বস্তুতঃ শঙ্করমতকে মায়াবাদ বলা হয়, তাহা বিপক্ষগণের কথা। বৈষ্ণবগণ প্রবল হইয়া শঙ্কর সম্প্রদায়কে যাহা বলিয়া নিন্দা করিতেন, শঙ্করসম্প্রদায়ের অজ্ঞব্যক্তিগণ তাহা নিন্দার সূচক না বুঝিয়া নিজেকেই তাই বলিয়া নির্দেশ করিতে লাগিল। পরে প্রসিদ্ধি অনুরোধে বিজ্ঞেও তাহাই বলিতে লাগিলেন।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শঙ্করমতকে মায়াবাদ বলাই যায় না। কারণ, যে মতে যাহাকে সর্বমূলতত্ত্ব বলিয়া নির্দেশ করা হয়, তাহারই নামে সেই মতবাদের নামকরণ করা হয়। যেমন- শিব শক্তি বিষ্ণু প্রভৃতি যে যে মতে মূলতত্ত্ব বলা হয়, সেই সেই মতের নাম শৈব শাক্ত বৈষ্ণব প্রভৃতি। শঙ্করমতে জগৎ মিথ্যা (আবার এ মিথ্যা মানে অলীক বা অসৎ মনে করবেন না।) অর্থ্যাৎ মায়া, সত্য একমাত্র ব্রহ্ম। তাহাই সকলের মূলতত্ত্ব। এই ব্রহ্মে এই জগৎ কল্পিত বলিয়া জগৎ মিথ্যা বলা হয়। সুতরাং মায়া মূলতত্ত্ব নহে, প্রত্যুত ব্রহ্মই মূলতত্ত্ব। এজন্য শঙ্করমতকে ব্রহ্মবাদই বলা সঙ্গত।অন্যত্র বহু স্থলে মীমাংসক ও ন্যায়াচার্যগণ এবং স্বমতের আচার্যগণ ইহাকে ঔপনিষদবাদ নামে আখ্যাত করিয়াছে। এজন্য কুসুমাঞ্জলি, শাস্ত্রদীপিকা এবং মধুসূদনী প্রভৃতি গ্রন্থ দ্রষ্টব্য।

বিরুদ্ধবাদিগণের ইহাকে মায়াবাদ বলিবার কারণ এই যে, ইহার সঙ্গে বৌদ্ধমতের কিঞ্চিৎ সাদৃশ্য আছে।সে সাদৃশ্য এই যে, বৌদ্ধগণ জগৎকে অসতে অর্থ্যাৎ শূন্যে, মায়া বা অবিদ্যাকল্পিত বলিয়া থাকেন, সুতরাং বৌদ্ধমতেও জগৎ নাই। শঙ্করমতে জগৎ সতে অর্থাৎ ব্রহ্মে মায়াকল্পিত বলিয়া পরমার্থতঃই নাই।এখন জগতের না থাকা অংশে বা কল্পিতত্ব অংশে ঐক্যই একটু সাদৃশ্য বলিতে হইবে। বৈষ্ণবাদি বিপক্ষগণ এই সাদৃশ্য অংশকে লক্ষ্য করিয়া নিজমতে নিষ্ঠার বৃদ্ধি উদ্দেশ্যে পরমতের নিন্দা করিয়া ইহাকে মায়াবাদ বলিয়াছেন। বস্তুতঃ বৌদ্ধমতে জগৎকল্পনার অধিষ্ঠান অর্থ্যাৎ মূলতত্ত্ব অসৎ বা শূন্য এবং শঙ্করমতে সেই অধিষ্ঠান বা মূলতত্ত্ব সৎ ব্রহ্ম,আর তাহাতে এই দুই মতের যে অত্যন্ত বিরোধ তাহা কেহই অস্বীকার করিতে পারেন না। অতএব মায়াবাদ শঙ্করের বাদ নহে। শঙ্কর যদি জগতের মূলতত্ত্ব বা অধিষ্ঠানকে মায়া বা শূন্য বলিতেন তাহা হইলে তাঁহার মতবাদ মায়াবাদ হইত। যেহেতু মূলত্ত্বানুসারেই মতবাদের নামকরণ হয়-ইহাই রীতি। মায়া উভয় মতেই নিমিত্তকারণ বটে, কিন্তু তাই বলিয়া তাহা যে অধিষ্ঠানরুপ উপাদান কারণ, তাহা শঙ্কর বলেন নাই। বৌদ্ধমতে উপাদানরুপ এই অধিষ্ঠান স্বীকার করা হয় না, তাঁহাদের মতে নিরধিষ্ঠান ভ্রম স্বীকার করা হয়। অতএব পদ্মপুরাণের এই নিন্দা প্রকৃতপক্ষে শঙ্করমতের নিন্দা নহে, পরন্তু অন্য কোন মতবাদের নিন্দা। পরবর্তী বিপক্ষগণ শঙ্করমতে এইরুপ মায়াবাদত্ব আরোপ করিয়া নিন্দা করিয়া থাকেন মাত্র।

তাহাদের যুক্তি অনুসারে তাহারাই বিপদে পড়ে চৈতন্যস্বরুপ আত্মার জ্ঞানরুপে পরিণাম স্বীকার করায়, রামানুজ জৈনমতের প্রভাবে প্রভাবিত হইয়াছেন বলিয়া মনে করার সঙ্গত কারণ আছে। সর্বদর্শনসংগ্রহে মাধবাচার্য মধ্বের মুখে ভেদাভেদবাদী রামানুজকে জৈন পদাঙ্কনুসারী বলিতে কুন্ঠিত হন নাই। রামানুজ যে পাঞ্চরাত্রমতাবলম্বী,সেই পাঞ্চরাত্র মত সম্বন্ধে বরাহ পুরাণে ৬৬ অধ্যায়ে আছে--

অলভা বেদমন্ত্রাণাং পাঞ্চরাত্রোদিতেন হি....শুদ্রাদীনান্ত ন শ্রোতপদবী মুপাযাস্যতি।।১২ তাহার পর অপরাপর পুরাণ মধ্যে আছে- পাঞ্চরাত্রং ভাগবতং তন্ত্রং-----এবং বিধানি চান্যানি মোহনার্থানি তানি তু।।।

কুর্ম ১১ অধ্যায়, সুতসংহিতা ৪র্থ মুক্তিখণ্ড এইরুপ পুরাণজাতীয় অপরাপর বহু গ্রন্থেই ভাগবত ও রামানুজমতের বহু নিন্দা আছে। যাহা হউক ইহা হইতে জানা যায়--

(১) বেদমন্ত্র লভ্য না হইলে পাঞ্চরাত্র আচারে ভগবান লাভ।

(২) পাঞ্চরাত্রমত ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যের জন্য,শূদ্রের জন্য নহে।

(৩) পাঞ্চরাত্র ভাগবত ও বৈখানসতন্ত্র বেদভ্রষ্টের জন্য বিষ্ণু উপদেশ করিয়াছেন।

(৪) পাঞ্চরাত্রাদির বেদমূলকত্ব নাই ।

(৫) পাঞ্চরাত্রাদি শাস্ত্র মোহনার্থ রচিত।

(৬) ভাগবত ও সাত্ত্বত শাস্ত্র অভিন্ন।

(৭) ইহা কুণ্ড ও গোলকগণের জন্য অভিপ্রেত।কুণ্ড অর্থ--পতিসত্ত্বে জারজ পুত্র এবং গোলক অর্থ--পতি মরণান্তে জারজ পুত্র।।

এদিকে অদ্বৈতমতে জগৎকে বলা হয় মিথ্যা অর্থ্যাৎ অনির্বচনীয়। কেবলমাত্র জগতের ব্যবহারিক সত্যতাই এই মতে স্বীকৃত হইয়া থাকে। দ্বৈতবাদীও এই ব্যবহারিক সত্তার বাহিরে যাইতে পারেন না। আর, ব্যবহারিক সত্তাতো প্রাতিভাসিক সত্তারই সামগ্রিক উন্নতর সংস্করণমাত্র। এই অবস্থায় বিজ্ঞানে বিজ্ঞেয় বিষয়ের প্রাতিভাসিক সত্তা দ্বৈতবাদীকেও নত মস্তকে স্বীকার করিতে হইবে। এই প্রাতিভাসিক সত্তার ক্ষেত্রে তাহা হইলে দ্বৈতবাদী, অদ্বৈতবাদী, বিজ্ঞানবাদী বৌদ্ধ প্রভৃতি সকলেই একমত। বিজ্ঞেয় বিষয়ের প্রাতিভাসিক সত্তার অতিরিক্ত পারমার্থিক সত্তার প্রশ্নে দ্বৈতবাদের সহিত অদ্বৈত ও বৌদ্ধমতের মতদ্বৈধ আছে সন্দেহ নাই। কিন্তু অন্ততঃ একটি ক্ষেত্রে (প্রাতিভাসিক সত্তার ব্যাখায়) তো সকল মতেরই অনুমোদন রহিয়াছে দেখা গেল। অতএব বিজ্ঞানের আধারে জগৎ কল্পিত,এই সিদ্ধান্তের জন্য অদ্বৈতবেদান্তবাদ ও বিজ্ঞানবাদ যদি অভিন্ন হয়, তবে বিজ্ঞান জ্ঞেয় বিষয়ের প্রাতিভাসিক সত্তা আছে,এইরুপ সিদ্ধান্ত স্বীকার করার জন্য দ্বৈতবাদীকেও বিজ্ঞানবাদী বলিতে আপত্তি কী? দ্বৈতবাদীর অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রকাশত্মযতি তদীয় 'বিবরণে' যে প্রত্যুত্তর দিয়াছেন, ইহাই তাঁহার (প্রকাশত্মযতির) নিগূঢ় রহস্য বলিয়া মনে হয়। প্রকাশত্মযতির বক্তব্যের সহিত আমরা আরও একটু যোগ করিয়া বলিতে পারি- বহির্জগতের বস্তুসত্তা অস্বীকার করার জন্য যদি বিজ্ঞানবাদ ও অদ্বৈতবাদ এক হইয়া যায়,তবে পরিদৃশ্যমান বিশ্বের বাস্তব সত্তা স্বীকার করার জন্য চার্বাক দর্শন ও দ্বৈতদর্শন এক বা অভিন্ন হইয়া যায় না কেন? দ্বৈতবাদীরা কি নিজেদের চার্বাকপন্থী বলিতে রাজি হইবেন?

আর শঙ্করকে, চার্বাকমতপ্রবর্তক বৃহস্পতি অথবা বৌদ্ধমতপ্রবর্তক বুদ্ধের ন্যায় দৈত্যবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিগণকে মোহিত করিবার জন্য রুদ্রাবতার বলিতে পারা যায় না। কারণ, তাঁহার প্রচারিত মত ব্যাসদেবেরই পুরাণমধ্যে বিস্তৃতভাবে বর্ণিত। পুরাণাদিমধ্যে বৌদ্ধ বা চার্বাকমত থাকিলেও তাহাতে অশ্রদ্ধা উৎপাদনের জন্য সেই পুরাণমধ্যেই বলা হইয়াছে। কিন্তু শঙ্করমতের সম্বন্ধে সে চেষ্টা করা হয় নাই। যে পুরাণে শঙ্করমত উক্ত তাহাতে তাহার নিন্দা নাই। যে পুরাণে অন্যমত বর্ণিত, তাহাতেই নিন্দা আছে। অতএব এইরুপ যে মতনিন্দা তাহা মতবিশেষে শ্রদ্ধা উৎপাদনের জন্য, তাহা কোন মতের নিন্দার জন্য নহে।

(ঋণঃ- স্বামীচিদঘনানন্দ পুরী ও মহামহোপাধ্যায় আশুতোষ শাস্ত্রী, কাব্য-ব্যাকরণ-সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ, প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ স্কলার, এম-এ পিএইচডি, বিদ্যাবাচস্পতি।)

নিত্যকর্মসমূহ কিরূপে মোক্ষের হেতু হয়?

  সুরেশ্বরাচার্য তদীয় নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধিতে বলছেন — কদাচিৎ কোন প্রকারে পুণ্য অনুশীলন দ্বারা এবং নিত্যকর্মানুষ্ঠান দ্বারা বুদ্ধি ব...